মেঘবতী পর্ব ৩
মেঘবতী পর্ব ৩
পঞ্চম অনুবাক
বৃত্তাকারে গ্রাম্য জনতা একটি মানুষকে ঘিরে দাঁড়িয়েছে। কেন্দ্রস্থ মানুষটি বড় শীর্ণ। গায়ের রঙ মিশির মতো কালো। পরনে একটি মলিন বস্ত্র। ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত। মাথার চুল ঈষৎ কৃষ্ণ, ঈষৎ পলিত। গলায় একটি বনফুলের মালা। লোকটির বয়স পঞ্চাশোর্ধ্ব হবে। চারিপাশের লোকগুলির মধ্যে একজনের হাতে বাঁশের তৈরি একটি তারের যন্ত্র। আরেকজন একটি ঢোলক গলায় ঝুলিয়েছে। বাকিরা মজা দেখতে এসেছে। সকলের সমস্বরিত হো-হো শব্দে সকালের বাতাস পরিপূর্ণ।
জনকপুর গ্রামটি অতি ক্ষুদ্র। অদূরে একটি নদী আছে। এরা প্রধানত মৎস্যজীবী। নদী থেকে মাছ ধরে নগরে নিয়ে গিয়ে বিক্রয় করে। প্রভূত পরিশ্রমের কাজ। তবু গ্রামের মানুষগুলো সেই পরিশ্রমকে যেন গায়ে মাখে না। কাজ শেষ করে যেটুকু অবসর পায়, সেটুকু তারা নিঃশেষে প্রাণভরে উপভোগ করে। এদের উদ্ভাবনী শক্তিও অপূর্ব। একই প্রকার উপভোগ প্রতিদিন করে না। নিত্য নূতন উপভোগের বস্তু এদের। আজ প্রভাতবেলায় কোথা থেকে যেন এই প্রৌঢ় গায়ক গলায় ফুলমালা পরে দুজন বাদক সঙ্গে নিয়ে এই গ্রামে এসে হাজির। খবর পাওয়া মাত্রই গ্রামের ছেলেবুড়ো, নারীপুরুষ মজা নিতে চলে এসেছে। এখনই নৃত্যগীত আরম্ভ হবে।
উত্তিয় এই গ্রামে কয়দিন হল এসেছে। পিতার প্রাসাদ পরিত্যাগ করে যখন সে পথে নেমেছিল, তখন জানত না কোথায় যাবে। কে তার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে। দিকচিহ্নহীনভাবে ঘুরতে ঘুরতে এই গ্রাম জনকপুরে সে এসে পড়ল। গ্রামের মানুষ প্রায় সকলেই অতিথিবৎসল। উত্তিয়কে দেখলেই বোঝা যায়, সে সম্পন্ন পরিবারের সন্তান। এক বৃদ্ধ ধীবর উত্তিয়কে সস্নেহে সযত্নে তার গৃহে আশ্রয় দিয়েছে।
এই নূতন জীবনে উত্তিয় ক্রমশ মানিয়ে নিতে আরম্ভ করেছে। এ জীবন অনিকেত পথিকের জীবন। কোনো কিছু দাবি করলে চলে না। যা আসে, তাতেই সন্তুষ্ট হতে হয়। যেখানেই আশ্রয় জুটুক না কেন, সেখানেই চারিপাশের সকলের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করতে হয়। অথচ কোথাও স্থায়ী, প্রগাঢ় আত্মীয়তা পাতালে চলে না। যেকোনো মুহূর্তে ছেড়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়। একটা অনাবিল মুক্তি, একটা অপূর্ব চলিষ্ণুতার বোধ উত্তিয়র জীবনকে নির্ভার করে রেখেছে। তার শিরঃপীড়া সেরে গেছে। কিন্তু হৃদ্বেদনা সারেনি। বুকের ভিতর জিজ্ঞাসার কাঁটাটা ঠিকই বিঁধে আছে। সেই শব্দ ও ভাবের দ্বৈততার যন্ত্রণা। মাঝে মাঝে যেন রক্তক্ষরণ হয়—বুক ব্যথা করে। তবু এই নির্ভার উদাসীন জীবন সেই ব্যথা সহ্য করার, আর্তনাদ না-করে বহন করার শিক্ষা দিচ্ছে উত্তিয়কে প্রতিদিন।
আজ সকালে গ্রামের পথে হইহট্টগোল শুনতে পেয়ে সে ধীবরের গৃহ থেকে বাহির হয়ে এল। দেখল, যত লোকজন সব আনন্দ করতে করতে কোথায় যেন চলেছে। তাদেরই ভিড়ে মিশে এদিকে আসতে আসতে লোকগুলোর কথাবার্তা থেকে সে বুঝতে পারল, গ্রামের একপাশে চাষের ক্ষেতের ধারে বকুলতলায় নাচগান হবে। কে একজন লোক নাকি গ্রামের বাইরে থেকে তার দুজন বাজনদারসমেত সকালবেলাই এসে পড়েছে।
বকুলতলায় এসে উত্তিয় ভিড়ের মধ্যে মিশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল। শীর্ণ লোকটি একটি কাপড় দিয়ে শক্ত করে কোমরটা বাঁধল, যাতে পরনের বস্ত্র নাচতে গিয়ে খুলে না যায়। তারপর সে তার দুই বাজনদারের দিকে চোখ মটকে ইঙ্গিত করল। তখনই তারের যন্ত্রে আঙুল টেনে একজন সুর তুলল। অপরজন ছন্দোবদ্ধভাবে ঢোলকে করাঘাত করতে লাগল। সব মিলে বেশ একটি করুণ গ্রামীণ সুর বেরিয়ে এল। এক মুহূর্ত পরেই বাজনার সুরের একটি বিশিষ্ট বিন্দু থেকে শীর্ণ লোকটি হাত-পা নেড়ে উচ্চৈঃস্বরে গান ধরল। প্রাকৃত ভাষার রঙ্গরসিকতার গান। আর সেই গান ধরার সঙ্গে সঙ্গেই তার সমস্ত দেহ নৃত্যচ্ছন্দে স্পন্দিত হতে শুরু করল। কোনো পরিশীলিত নৃত্য নয়। যেমন প্রাণে আসছে, তেমনই হস্তপদ প্রসারিত সংকুচিত করে লোকটি নাচছে। মাঝে মাঝেই লম্ফ দিচ্ছে। শীর্ণ শরীরটি কার্তিক মাসের অগ্নিলুব্ধ পতঙ্গের মতো নানাদিকে ছুটে যাচ্ছে। লোকটা নাচছে আর গাইছে—
“হলা ণ অহিঅং বয়ো ণ মজ্ঝং।
হলা রে মঅনিআ-অম্ম।।
মজ্ঝং কেসা বলিঅং কিঞ্চি।
তত্থ তু বাঊ দুট্ঠো।।
অহং ণ পুত্তিং দদামি তুজ্ঝং ।
এব্বং ণ কহং কধেহি।।
দাণি মরিস্সং হদহিঅওহং।
বোল্লসি জই জই এব্বং।।
খজ্জুরতরুম্মি মজ্ঝং ছিন্নে।
পটিদিঅহং সা যাতি।।
ণিচ্চং খজ্জুররসং হি পিবই।
গচ্ছই সা মম ণিচ্চং।।
বহুদিঅহং সা হোই মএ সহ।
মজ্ঝং অহু কখু সঙ্কুঃ।।”
লোকটার সেই তড়িতজড়িত নৃত্য, মুখচোখের হাবভাব ও গানের ভাষা শুনে সমবেত জনতা হা হা হো হো করে হাসছিল। উত্তিয়ও গানের কথাগুলি শুনে হাসতে হাসতে একেবারে মাটিতে গড়িয়ে পড়ল। গানের সুরে সুরে লোকটা যে-কথাগুলো উচ্চারণ করে গাইছে, তার অর্থ খানিকটা হবে এইরকমঃ
লোকটা বলছে—‘ওগো মদনিকার মা! আমার বয়স বেশি নয়; কেবল বাতাস লেগে গায়ের দুয়েকটা চুল শুধু পেকে গেছে। তুমি স্বচ্ছন্দে তোমার মেয়ে মদনিকাকে আমার সঙ্গে বিবাহ দিতে পারো।’ তখন মদনিকার মা বলছে—‘আমি আমার মেয়ের বিবাহ তোমার সঙ্গে দেব না। ওই কথা বললে হাহুতাশ করে মরেই যাব আমি।’ তখন লোকটি আবার বলছে—‘আমি তো খেজুরগাছের গা কেটে রস বের করি। তোমার মেয়ে মদনিকাই তো আমার পাছু পাছু ঘুরে বেড়ায়, প্রতিদিন তিনবেলা খেজুর রস খায়। হয় তুমি সেই খেজুর রসের দাম দাও, অন্যথায় আমাকে জামাতারূপে বরণ কর। সে আমাকে বড় জ্বালাতন করেছে। তোমার মেয়ে মদনিকা এখন হয়ে উঠেছে আমার গলার কাঁটা।’
হৈহৈ করে নৃত্যগান সমাপ্ত হল। চারিদিক হতে গ্রামের লোকজন নর্তক-তথা-গায়ক এবং দুই বাজনদারকে ঘিরে ধরে রসালাপ করছে। শীর্ণ মানুষটি সত্যিই খর্জুরপাদপ নিড়িয়ে গ্রাসাচ্ছাদন করে। অবসর সময়ে এইসব গানবাজনা নিয়ে থাকে। বোঝা গেল, শুধু খেজুরের রসই নয়, লোকায়ত নান্দনিক রসেরও সে রসিক। গ্রামের একজন অপেক্ষাকৃত বর্ধিষ্ণু গৃহস্থ এই তিনজন গায়কবাদককে স্বগৃহে আমন্ত্রণ জানাল। তারা আজ এ গ্রামের অতিথি। গ্রামের লোক তাদের আহার-বিশ্রাম-পরিতোষের যথোপযুক্ত ব্যবস্থা করবে।
এই রঙ্গতামাশা দেখে উত্তিয় হৃষ্ট মনে নদীতে স্নান করতে গেল। স্নান সেরে ধীবরের গৃহে ফিরতে ফিরতে তার মনে হচ্ছিল, এই মানুষগুলি তো সত্যিই বেশ মজার লোক! এদের কোনো উৎকট জীবনপ্রশ্ন নেই। শিরঃপীড়া নেই। হৃদ্বেদনাও নেই। প্রভূত পরিশ্রম করে অন্নজল-বসতির ব্যবস্থা করে। ফুরসৎ পেলে হাসে, কাঁদে, নাচে, গায়। আচ্ছা, এরা সুরকে বা শব্দকে কোন্ দৃষ্টিতে দ্যাখে? নাকি তা নিয়ে আদৌ তাদের কোনো ভাবনা নেই?
ধীবরগৃহে আহারাদি সেরে দ্বিপ্রহরবেলায় উত্তিয় গ্রামের পথে পুনরায় বাহির হল। কিছুটা অলসভাবে হাঁটছে। কিছুক্ষণ পর সে দেখতে পেল, সেই বর্ধিষ্ণু গৃহস্থ বাটির দাওয়ায় সকালের গায়ক সেই শীর্ণ কৃষ্ণকায় লোকটি হস্তপদ প্রসারিত করে মহা আরামে বসে আছে। তারও স্নানাহারাদি সমাপ্ত হয়েছে মনে হয়। উত্তিয় লোকটির কাছে গিয়ে বলল, ‘নমস্কার, মহাশয়!’
লোকটি প্রতিনমস্কার করল না। কেবল আস্য আকর্ণ বিস্তৃত করে হাসল। নীচের পংক্তিতে তার একটা দাঁত নেই। উত্তিয় জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনার নিবাস কোথায়, মহাশয়?’
লোকটি প্রাকৃতভাষায় উত্তর দিল, ‘সুগন্ধিহট্ট। এখান হতে পাঁচ ক্রোশ দূরে। আপনি কি এই গ্রামেরই মানুষ?’
—না। আমি দূরবর্তী এক নগরীর নাগরিক। আপনি কীভাবে দিনাতিপাত করেন?
—আমি খেজুর গাছ ছানি আর গান গাই।
—বাহ, সকালে যে-গানটি গাইলেন, সে কি আপনার লেখা?
লোকটি নিতান্ত অবাক হয়ে বলল, ‘আর কার হবে? আমারই লেখা!’
—সুন্দর! আপনার নিজের লেখা গান আপনি নিজেই গাইলেন। আচ্ছা, এই গানে সুরারোপ কে করেছেন?
—সুরা? না, আমি তো সুরা পান করি না!
লোকটির উত্তর শুনে উত্তিয় কোনোমতে হাস্য সংবরণ করে বলল, ‘না, না! সেকথা বলছি না। বলছি, এই গানে সুর দিয়েছেন কে?’
লোকটি ততোধিক অবাক হয়ে বলল, ‘আমার গান! আমি লিখেছি, তো তাতে আমিই তো সুর দেব। আর কে সুর দেবে?’
উত্তিয় বুঝতে পারল, গানের যে একজন কথাকার, অন্য একজন সুরকার হতেও পারে, সেকথা এ জানে না। হয়ত এরা কেউই তা জানে না। তা বেশ!
উত্তিয় প্রশ্ন করল, ‘আচ্ছা, গানটি আগে লিখেছেন, সুরটি পরে দিয়েছেন—তাই না?’
সে বলল, ‘না তো! একসঙ্গেই দুইটা—সুর আর শব্দ এসে গেল।’
—কোথা থেকে এল?
লোকটি ফোকলা দাঁত বের করে হেসে বলল, ‘তা তো জানি না।’
—আচ্ছা, এমনিই কি গানটি বাঁধলেন, নাকি কোনো ঘটনা ঘটেছিল পূর্বে?
লোকটির মুখে যেন একটু বিষণ্ণতার মেঘ ঘনালো। তারপরেই মেঘ সরিয়ে কৌতুকের হাসি দেখা দিল। লোকটি হাসতে হাসতে বলল, ‘সে অনেক কথা, মশয়। আমি তো ওই খেজুরগাছ, তালগাছ চাঁছি। একটি যুবতী মেয়ে—’
—কে? তার নাম কি মদনিকা?
—না, না, মদনিকা নয়। তর্তরিকা। আমি গানের মধ্যে তার নামটি গোপন করেছি।
—তর্তরিকা? কী করেছিল তর্তরিকা?
—কিছু না। এই আমার সঙ্গে একটু—
—প্রণয়?
লোকটি চোখ মটকে বলল, ‘তা বটে। আমিও তাকে খুবই…। যা হোক, তাকে খেজুররস, গুড়পাটালি, তালের মোরব্বা—অনেক কিছুই খাওয়াতাম। তা একদিন তার মাকে বললাম, আমি তর্তরিকাকে বিবাহ করতে চাই। কিন্তু তর্তরিকার মা বলল, আমার নাকি বয়স হয়েছে। আমাকে মেয়ে দেওয়া যায় না। আচ্ছা, বলুন তো মশয়, কী এমন বয়স হয়েছে আমার?’
লোকটি অভিমানে ঠোঁট ফুলিয়ে জিজ্ঞাসা করল শেষ কথাটা। বালককে যেমন স্নেহভরে প্রবোধ দেয়, সেইভাবেই উত্তিয় বলল লোকটিকে, ‘না, না, কোথায় বয়স? বিবাহের বয়সই যায়নি এখনও আপনার মোটে। আপনি তো এখনও সমর্থ যুবা। তারপর? তারপর কী হল?’
—তারপর আর কী? মনে বড় দুঃখ হল। কদিন দুঃখ নিয়ে শুয়ে থাকলাম। কিন্তু তারপর ভাবলাম, না। এভাবে মুখ বুজে থাকব না। তারের যন্ত্র নিয়ে বসলাম। এই গানটা এল।
এই কথা বলেই লোকটি গুনগুন করে পুনরায় সকালের সেই গানটি গাইতে আরম্ভ করল।
“হলা ণ অহিঅং বয়ো ণ মজ্ঝং।
হলা রে মঅনিআ-অম্ম…”
উত্তিয় ভাবছিল, প্রশ্নটা সে লোকটিকে করবে কিনা। অর্থাৎ, প্রশ্ন করা ঠিক হবে কিনা। খানিক ইতস্তত করে শেষে সে বলেই ফেলল, ‘আচ্ছা, যে-বেদনা নিয়ে আপনি গানটা লিখতে বসেছিলেন, গান লেখা শেষ হয়ে যাওয়ার পর আপনার কি মনে হল, সেই মনোবেদনা আপনি গানটিতে পুরোপুরি ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন?’
লোকটি ডানদিকে ঘাড় কাত করে বলল, ‘হ্যাঁ-অ্যা!’
—সম্পূর্ণ প্রকাশ করতে পেরেছেন মনের ভাব?
—হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। মনের কষ্টটা বাইরে নিয়ে এসে গানটাতে একেবারে চিটিয়ে দিয়েছি। হুবহু। অবিকল!
উত্তিয় সামান্য বিভ্রান্ত বোধ করল। এ লোক বলে কী? মনের ভাব সম্পূর্ণ ভাষায় প্রকাশ করতে পেরেছে? তাই কখনও হয়? আচ্ছা, তা যদি পেরেও থাকে, তাহলে তারপর আর গান বেঁধেছে কিনা জিজ্ঞেস করে দেখা যাক তো! দেখি, কী বলে!
উত্তিয় আবার প্রশ্ন করল, ‘আচ্ছা, এই মদনিকার মা্যের গানটার পর আপনি আর কোনো গান বেঁধেছেন?’
লোকটা চক্ষু বিস্ফারিত করে উত্তর দিল, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই! বাঁধব না কেন? তারপর কতো গান বেঁধেছি!’
—সবই কি মদনিকাকে নিয়ে?
—না, না। সব মদনিকা হবে কেন? ফসল তোলার গান, আঁতুড় তোলার গান, উৎসবের গান…কতো কত্তো গান! শুনবেন নাকি দুচারটা? শুনুন!
এই বলেই সে আবার গান ধরল। একটা শেষ হচ্ছে, আবার আরেকটা শুরু করছে। সতেজ সুর, আনন্দপ্রোজ্জ্বল উচ্চারণ।
শুনতে শুনতে উত্তিয়র মনে প্রশ্ন আসছিল, তাহলে অনঙ্গসেনা তাকে যা বলেছিলেন, তার অর্থ কী দাঁড়াচ্ছে? অনঙ্গসেনা বলেছিলেন, অতৃপ্তিই কবির জীবনীশক্তি। অতৃপ্তির অবসানে কবির মৃত্যু হয়। যদি এমন হয় যে, কোনো কবিতা রচনা করে কবির মনে হয়, যা বলতে চেয়েছিলাম বলতে পেরেছি, তাহলে তারপর কবি আর লিখতে পারবেন না। লিখবার প্রয়োজনই ফুরিয়ে যাবে তাঁর। তাহলে এ লোকটা…
‘আপনিও কি গান বাঁধেন?’ লোকটির প্রশ্নে উত্তিয়র চিন্তাসূত্র ছিন্ন হয়ে গেল। ইতোমধ্যেই লোকটি কখন যেন গান থামিয়েছে।
—না, গান নয়। আমি কবিতা লিখি।
—কবিতা? সে কীরকম?
উত্তিয় কীভাবে লোকটিকে বোঝাবে বুঝে পেল না। একটু ইতস্তত করে বলল, ‘এই আপনারই মতো। তবে তাতে সুর নেই। শুধু শব্দ।’
—সুর নেই? সে কী! সুর না থাকলে ভালো লাগবে কেন?
—সুর নেই নয়। সুর আছে। তবে গানের সুর নয়। শব্দের সুর।
লোকটির মুখ দেখে বোঝা গেল, লোকটি কিচ্ছু বুঝতে পারেনি। ফ্যালফ্যাল করে শূন্যচোখে চেয়ে আছে। তারপর হঠাৎ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল তার। বলল, ‘ও বুঝেছি! ওই রাজসভায় যেসব পড়া হয়? নগরের লোকজন পড়ে ওইসব বটে। সুর নেই! শুধু শব্দ। হুঃ!’
তার শেষ কথাটায় বেশ একটা তাচ্ছিল্যের ভাব ফুটে উঠল। উত্তিয় বলল, ‘কেন? আপনি পুরোহিতদের পূজা করতে দেখেননি? তারা পূজার সময় যেসব মন্ত্র পড়ে, সে তো তারা কেবল উচ্চারণ করে। গায় না।’
—সে তো পূজাআচ্চার মন্ত্র! তাতে রসের খবর কই? আর তারাও সেই মন্ত্র সুর করেই পড়ে সব এদিকে। ওসব ধম্মকম্মের ব্যাপার। আমার অতো ভালো লাগে না।
উত্তিয় প্রসঙ্গ পরিবর্তন করতে চাইছিল। কিন্তু কীভাবে পরের প্রশ্নটা করবে ভেবে পাচ্ছিল না। যাকে শব্দের সুর, উচ্চারণের সুরের ব্যাপারটাই বোঝানো গেল না, তাকে এর পরের প্রশ্নটা কীভাবে বোঝানো যাবে? সে তো আরও গভীরতর ব্যাপার। অনেক ভেবে সে প্রশ্ন করল, ‘আচ্ছা, নীরবতার ভাষা বলে আপনি কিছু শুনেছেন কোথাও? কোনো কথা না বলে মনের ভাব কি কোনো মানুষ অন্য মানুষকে বোঝাতে পারে?’
উত্তিয়কে নিতান্ত অবাক করে দিয়ে লোকটি বলল, ‘হ্যাঁ-অ্যাঁ! অবশ্যই। কথা ছাড়াই অন্যকে মানুষ মনের ভাব বোঝাতে পারে বইকি। কখনও কখনও এমন হয়েছে, আমি আর তর্তরিকা দুজনে দুজনের মুখের দিকে তাকিয়ে পুকুরঘাটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মুখোমুখি চু-প করে বসে থেকেছি। চোখে-চোখে কথা হচ্ছে। কিন্তু আর কোনো শব্দ নাই। তা আপনি জানলেন কেমন করে? আপনি যে দেখছি, গোপন রসের কারবারি!’
শেষ কথাটার রসিকতায় মজে না গিয়ে উত্তিয় বলল, ‘তা না হয় হল কোনো বিশেষ ক্ষেত্রে। প্রণয়-আলাপের ভিতর। কিন্তু তা ছাড়া অন্য সময় তো হয় না?’
—কেন হবে না? শিশুর মুখে বোল ফোটার আগে মা-ও তো অমনি করেই শিশুর সঙ্গে কথা বলে। চোখে-চোখে! ঠিক বুঝতে পারে বাচ্চার খিদে লেগেছে। ঘুম পেয়েছে। এখন বাহ্যে প্রস্রাব করবে। তখনও তো কোনো কথা থাকে না। তারপর ধরুন, এই পিঁপড়েটা…
সত্যিই দাওয়ার উপর দিয়ে একটা পিঁপড়ে কোথায় যেন যাচ্ছিল। লোকটা পিঁপড়েটাকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল, ‘এই পিঁপড়েটার পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছেন? পাচ্ছেন না তো? কিন্তু ওর পায়ে শব্দ একটা আছেই। এই পিঁপড়েটার পায়ের নূপুরের শব্দ ঈশ্বর ঠিকই শুনতে পাচ্ছেন। ঈশ্বর খুব কানখড়কে!’
লোকটা বলে কী! এই যদি কবিতা না হয়, তবে আর কবিতা কাকে বলে? পিঁপড়ের পায়ের নূপুরের শব্দ!
উত্তিয় বলল, ‘তবে যে বললেন, ধম্মকম্মের ব্যাপার আপনার ভালো লাগে না। এখন আবার বলছেন, ঈশ্বর সব শুনতে পান। তাহলে?’
লোকটি মহা উত্তেজিত হয়ে উত্তর দিল, ‘ঈশ্বরের সঙ্গে ধম্মকম্মের সম্পর্ক কী? ধম্মকম্ম পূজাআচ্চা—এসব ব্রাহ্মণ ধার্মিক পুরোহিতদের ব্যাপার। ধার্মিকদের সঙ্গে ঈশ্বরের সম্পর্ক নেই।’
—অ্যাঁ! পুরোহিতদের সঙ্গে ঈশ্বরের সম্পর্ক নেই? ধার্মিক ব্যক্তিদের সঙ্গে ঈশ্বরের সম্পর্ক নেই? তাহলে কাদের সঙ্গে ঈশ্বরের সম্পর্ক আছে?
—কেন? আমাদের সঙ্গে। আমরা যারা হাসি-কাঁদি-নাচি-গাই, মধুর পদাবলী বাঁধি, মেয়েদের সঙ্গে প্রণয়ে পড়ি, আঘাত পাই, দুঃখ পাই, আবার ভালোবাসি, দিনরাত খাটি, তালগাছ খেজুরগাছ নিড়াই, চাষ করি, মাটি কাটি, মাছ ধরি, নেয়েখেয়ে জীবন কাটাই, তারপর একদিন পট করে মরে যাই—এই আমাদের সঙ্গেই ঈশ্বরের যতো সম্পর্ক। আর তা তো হবেই। বড় দুঃখী মানুষ যে তিনি!
—কে দুঃখী মানুষ? ঈশ্বর?
—হ্যাঁ তো। বড় দুঃখী মানুষ। বড় অভাবী মানুষ। মায়াবী মানুষ। অভিমানী মানুষ। আবার খুব মজার মানুষ!
—কেন দুঃখী বলছেন?
—আরে দুঃখী না হলে কি আর রাত-দিন গড়ে ,ভাঙে? ছবি আঁকে, ছিঁড়ে ফ্যালে? একবার গড়েও তার মনে হয় না যে মনোমত হল। অভিমান করে ভেঙে দেয়, ছিঁড়ে ফ্যালে। আবার গড়ে, আবার আঁকে। বড্ড অসহায় গো, বড্ড অসহায়! ভাবের মানুষ কিনা, তাই এত অসহায় ঈশ্বর।
এই বলেই লোকটি আবার প্রাকৃত ভাষায় গান ধরল।
…ওগো ভাবের মানুষ, তোমার শান্তি হবে কোন প্রভাতে? আবার তুমি গড়তে বসলে কাদামাখা হাতে…
মুগ্ধ হয়ে গান শুনছিল উত্তিয়। মুগ্ধ হচ্ছিল। তবু মানতে পারছিল না। মানতে পারছিল না। তবু মুগ্ধ হচ্ছিল।
গান শেষ করে লোকটি দূরের আকাশের দিকে নিষ্পলক চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর আবার হঠাৎ হেসে বলল, ‘আপনি এখন যান। আমি এই দাওয়ায় শুয়ে একটু ঘুমাই। বৈকালবেলা সুগন্ধিহট্ট ফিরতে হবে।’
সেদিন অপরাহ্ণবেলায় ধীবরের গৃহের পশ্চাতে বেতসঝোপের ভিতর অর্ধশায়িত অবস্থায় পড়ন্ত রৌদ্রের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে লোকটির কথা ভাবছিল উত্তিয়। বড় অদ্ভুত মানুষ! কিংবা অদ্ভুত এরা সবাই। অথবা, এরাই স্বাভাবিক। সে নিজেই অদ্ভুত। মুগ্ধ হয়, তথাপি জিজ্ঞাসা মেটে না। নীরবতার ভাষা বিষয়ে কী আশ্চর্য সব কথা বলছিল মানুষটি। তবু সেই ভাষার স্বরূপ, কীভাবে তার সুস্থিত অনুভব হতে পারে, সেকথা পরিষ্কার হল না। কেউ কি দিতে পারে তার অসংশয়িত ইঙ্গিত? এই জন্যেই পথে নামা, কিন্তু পথ কেন মূক হয়ে চেয়ে থাকে…উত্তর জানে না?
ভাবতে ভাবতে বেতসঝোপের ভিতর অপরাহ্নের আলোছায়ায় ঘুমিয়ে পড়ল উত্তিয়। ঘুমের ভিতর আলগোছে একটা স্বপ্ন এসে দেখা দিল তাকে। বড় অদ্ভুত, বড় মায়ামদির স্বপ্ন একটা…
ষষ্ঠ অনুবাক
…উঁচুনীচু জমি; সবুজ ঘাসে ঢাকা উঁচু উঁচু পাহাড় যেন। একটা পথ বেয়ে উত্তিয় যেন উপরে উঠছে। উঠছে, নাকি হাওয়ায় ভেসে ভেসে মেঘের মতো ঊর্ধ্বে বাহিত হচ্ছে, বুঝতে পারছে না। পথের দুপাশে কতো গাছ…মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে সেইসব মায়াতরু—সোনালি বাকল তাদের; বেগুনি রঙের, বাদামি রঙের পাতা… মহাপাদপ সব মুকুলিত হয়েছে, আকাশ স্পর্শ করে আছে তাদের উত্তুঙ্গ শাখাপ্রশাখা…উত্তিয়র শিরোদেশে সেই বৃক্ষপুরুষদের মঞ্জরীরেণু ঝরে ঝরে পড়ছে ত্রিদিবের আশীর্বাদের মতো। রাত্রিকাল; জ্যোৎস্না উঠেছে খুব, নিষাদের অব্যর্থ শানিত শরের মতো চাঁদের কিরণ আকাশ বেয়ে, মেঘ বেয়ে, গাছের ডাল বেয়ে, পাতায় চুঁইয়ে, কাণ্ডে পিছলে নেমে মাটির উপর আহত প্রণয়ীর অন্তিম পরিতাপের মতো পড়ে আছে। কোথায় যাচ্ছে উত্তিয় জানে না। এ মাটি, এসব গাছ তার চেনা নয়। এ অন্ধকার, এ রাকাসুষমা সে চেনে না। পায়ে কি পাখা আছে তার? তা না হলে এত ত্বরিতে পাহাড়ের উপর সে উঠে এল কী করে?
এতটা উঠে এল, অথচ হাঁপ ধরেনি। চারিদিকে তাকালো। চাঁদের আলোর ভিতর পাতায় ছাওয়া একটি কুটির মৌনবাক নিষুপ্ত পাখিটির মতো এই টিলার উপরে একপায়ে দাঁড়িয়ে আছে। কুটিরের আগড়ের ওদিক থেকে একটা ম্লান প্রদীপের শিখা ইশারায় উত্তিয়কে ডাকল। কেন জানি মনে হল ওই কুটিরদ্বারের দিকেই তাকে যেতে হবে। ভাবামাত্রই সে দেখল, সে আগড়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। এতটা পথ এক নিমেষে চলে এল। গা ছমছম করে উঠল তার।
কুটিরের ভিতর কার যেন পায়ের শব্দ। কে যেন ভিতর থেকে কুটিরের আগড় সরাচ্ছে। উত্তিয় একটু পিছিয়ে নেমে এল। একটি ছায়াশরীর আগড় খুলে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে চুপে দাঁড়াল জ্যোৎস্নায়।
কুটির থেকে বেরিয়ে এসেছে যে, তাকে দেখে উত্তিয় চমৎকৃত হয়ে গেল। কুটিরবাসিনী সে এক নারী। যুবতী সুন্দরী। মধ্যদেশের সৌন্দর্য নয়, আর্যভূমির সৌন্দর্য নয়। কালো কষ্টিপাথরে তৈরি পূর্বদেশীয় মন্দিরের সুঠাম একটি মূর্তি যেন। গাত্রবর্ণ কৃষ্ণশ্যাম। পৃথক পৃথকভাবে অঙ্গগুলি সুন্দরের পরাকাষ্ঠা নয়, কিন্তু সমস্ত মিলে বড়ো সুন্দর। কিংবা সুষমামণ্ডিত। পরনে তার ময়ূরের বর্ণিল পালক জুড়ে জুড়ে নির্মিত বিচিত্র এক আঙরাখা গলদেশ থেকে চরণতল অবধি নেমেছে। মাথার চুল চূড়া করে বাঁধা। কণ্ঠে গুঞ্জাফুলের মালা। শ্রাবণের আকাশের মতো কালো মায়াবী চোখদুটি। কর্ণে কুণ্ডলবজ্র। তাম্বুলরসে ওষ্ঠাধর আরক্তিম।
নারী উত্তিয়র চোখে চোখ রেখে হাসল। যেন সে কতই পরিচিত! এক মুহূর্ত যেন সমস্ত কথা থেমে গেল। পৃথিবী দুলে উঠল। তারপর সেই নারী মধুস্রাবী স্বরে বলে উঠল, ‘আমি জানতাম, তুমি আসবে!’
তারপর আরও কতো কথা যে সে বলে চলেছে অনর্গল!
যে-ভাষায় মেয়েটি কথা বলছে, সে-ভাষা উত্তিয়র পরিচিত ভাষা নয় মোটে। সংস্কৃত নয়, প্রাকৃত নয়। অথচ ভাঙা ভাঙা সংস্কৃত আছে, অনেকটা আবার শৌরসেনী ভাষার মতো। অথবা হয়ত মৈথিলী। কোনো কোনো শব্দ কলিঙ্গদেশের, কোনো কোনোটি বা প্রাগ্জ্যোতিষপুরের, অথবা এসব কিছুই নয়। উত্তিয়র পিতা শ্রেষ্ঠী স্যমন্তকের সঙ্গে পূর্বদেশ থেকে মধ্যে মধ্যে যেসব মানুষেরা আসত তাদের গৃহে, যাদের ভাষাকে ‘বয়াংসি’ বা পাখির কিচিরমিচির ডাক বলে অবজ্ঞা করতেন গর্বোদ্ধত মধ্যদেশীয় পণ্ডিতবর্গ, এ ভাষা যেন অনেকটা সেইরকম ছন্দোসুষমাময়, বিহগকাকলিমুখর।
ভাষা বুঝতে পারছে না উত্তিয়, অথচ কী আশ্চর্য! প্রতিটি কথার অর্থ বুঝতে পারছে। কথাগুলোই যেন ভাব হয়ে পরিবাহিত হচ্ছে তার মনে। মেয়েটি বলছে, সে এক শবরী। তার শবর পুরুষ ক-দিন হল শিকারে গিয়েছে। এ বনে শিকার নাই। তাই অন্য বনে গিয়েছে। কবে যে সে আসবে! এই টিলার উপরেই তারা থাকে। শবর বলে গেছে, মধ্যদেশ থেকে এক কবি নাকি আসবে। শবরী যেন তাকে কূটার্থ বলে।
কূ্টার্থ! সে কেমন? উত্তিয় বুঝতে পারল না। সে শুধু শবরীকে জিজ্ঞাসা করল, ‘কী নাম তোমার?’
মেয়েটি বলল, ‘আমার নাম নৈরামণি। আমি শবরের সহজসুন্দরী।’ এই বলে সে হাসল। হাসি জ্যোৎস্নায় মিলেমিশে একাকার।
উত্তিয় বিহ্বলভাবে ঘোরলাগা স্বরে বলল, ‘কিন্তু আমি—আমি কোথা থেকে এলাম, বলো তো?’
মেয়েটি আবার হাসতে হাসতে বলল, ‘তুমি? তুমি তো উত্তিয়। চারশো বছর আগে থেকে এসেছ।’
—এর অর্থ?
—অর্থ আর কী! আমি তোমার চারশো বছর পরে আসব। আমার শবরও আসবে তোমার থেকে চারশো বছর পরে। এখানে উঁচু উঁচু পাহাড়ে ঘর বেঁধে আমি আর শবর—আমরা দুজনে মহাসুখে থাকব। ময়ূরের পালকখচিত আঙরাখা পরব। গলায় পরব গুঞ্জাফুলের মালা। কানে দেব বজ্রকুণ্ডল। কর্পূরমিশ্রিত তাম্বুলচূর্ণে ঠোঁট রাঙাব। আমাদের ঘরের বাইরে এইসব তরুবর মুকুলিত হবে, তাদের ডাল গিয়ে ঠেকবে শূন্য গগনে। এই বনে একাকিনী আমি বিহার করব। আমার শবর শিকার সেরে ঘরে ফিরবে। এই জ্যোৎস্নার চন্দ্রাতপের নীচে তিন ধাতুর খাট পাতা হবে, তারই উপর পাতা হবে আমাদের সুখশয্যা। আমার অলঙ্কৃত রূপ দেখে আমাকে অন্য মেয়ে বলে শবর ভুল করবে। আমি তখন তার কণ্ঠ জড়িয়ে ধরে বলব, ওগো শবর! আমার উন্মত্ত শবর! আমার পাগল শবর! ভুল কোরো না, দোহাই তোমার। আমি যে তোমার, তোমার নিজেরই ঘরণী, আমাকে চিনতে পারছ না? আমি তোমার নৈরামণি, তোমার সহজসুন্দরী। তখন সে আমাকে চিনতে পারবে। আমার উন্মত্ত প্রেমিকের সঙ্গে প্রেমক্রীড়ায় রাত্রি হবে ভোর। গুরুবাক্যরূপ তীক্ষ্ণবাণে নিজের মনকে বিদ্ধ করবে শবর। পরম নির্বাণকে বিঁধে আনবে এক শরসন্ধানে।
মুগ্ধ হয়ে শুনছিল উত্তিয় মেয়েটির কথা। এ কী অশ্রুতপূর্ব বাণী! চারশো বছর পরের কবিতাবীজ।
সে প্রশ্ন করল, ‘আমার কথা কী বলেছে তোমাকে তোমার শবর?’
—বলেছে, তোমার নাকি কী প্রশ্ন আছে!
—প্রশ্ন? হ্যাঁ, প্রশ্ন আছে বটে। তুমি বলতে পারবে?
—বলোই না, কী প্রশ্ন। দেখি চেষ্টা করে উত্তর দিতে পারি কিনা গুরুকৃপায়।
—নৈঃশব্দ্যের ভাষা কী, জানো তুমি? নীরবতার ভাষা? অনেককে জিজ্ঞাসা করেছি। কেউ ঠিকমতো বলতে পারেনি।
—যাকে তাকে জিজ্ঞাসা করলে কি উত্তর পাবে? সহজকথা সহজই বুঝাবে।
—সহজ কে?
—সহজ গুরু। আমাদের এক আদিগুরু লুইপাদ। তিনি বলেছেন, গুরু পুচ্ছিঅ জাণ। গুরুকে জিজ্ঞাসা করে একথা জানো। তোমার গুরু কোথায়?
—গুরু? গুরু তো কেউ নেই। এক আছেন জনপদবধূ অনঙ্গসেনা।
শবরী এক মুহূর্ত কী যেন ভাবল। তারপর বলল, ‘না, তিনি তোমার গুরু নন। তিনি প্রদীপের শিখা। তোমাকে পথ দেখিয়েছেন। তোমার গুরু আসবেন। তিনিই তোমাকে এ প্রশ্নের উত্তর দেবেন।’
—তাহলে তুমি বলতে পারো না এ প্রশ্নের উত্তর?
—পারি। কিন্তু তুমি কি তা এখন বুঝবে? নীরবতার ভাষা আছে বইকি।
এই বলে শবরী গুনগুন করে একটি সুর তুলল। সুরটি ধীরে ধীরে গান হয়ে উঠল কখন। বিচিত্র সেই সুর। সেই সুর, সেই রাগ কখনও শোনেনি উত্তিয়। মেয়েটি গাইতে লাগল—
“জো মণগোএর আলাজালা।
আগম পোথা টন্টা মালা।।
ভণ কইসেঁ সহজ বোলবা জাঅ।
কাঅ বাক চিঅ জসু ণ সমাহ।।
আলে গুরু উএসই সীস।
বাকপথাতীত কাহিব কীস।।
জেতই বোলী তেতবি টাল।
গুরু বোব সে সীস কাল।।
ভণই কাহ্ন জিণরঅণ বি কইসা।
কালেঁ বোব সংবোহিঅ জইসা।।”
উত্তিয় আবিষ্ট স্বরে নৈরামণির কাছে সরে এসে বলল, ‘কী মধুস্রাবী তোমার এই গুঞ্জন!’
শবরী তার ভ্রমরের মতো কালো চোখ দুটি তুলে বলল, ‘হ্যাঁ গো। এ যে আমাদের এক সিদ্ধগুরু কাহ্নের রচনা!’
—গান তো শুনলাম। কিন্তু গানের বাণী ভালো বুঝলাম না। বড়ো প্রহেলিকাময় ভাষা।
—প্রহেলিকা ভাষায় নেই। প্রহেলিকা আছে তোমার মনে। একটু মন স্থির করে শুনলেই বুঝবে।
—আমার বোঝার মতন করে তুমি একবার বলো তো, নৈরামণি।
—শোনো, বলছি। মন দিয়ে শোনো। কাহ্ন বলছেন, যা কিছু আমাদের মনের গোচর, তাতেই মিথ্যার জাল পাতা। শাস্ত্রপুস্তক সব চালাকি কথার সংকলন। বলো, কেমন করে সহজকে বোঝানো যায়, যে-সহজে কায়, বাক্য, মন প্রবেশ না পায়? গুরু শিষ্যকে মিথ্যাই উপদেশ দেন, বাক্যপথের অতীত যা, তার কথা কীভাবে বা কওয়া যাবে? যা বলব, তাতেই ভুল হবে। গুরু বোবা আর শিষ্য কালা। কাহ্ন বলছেন, জিনরত্ন বা সহজানন্দ কেমন? কালার বোবাকে বোঝানো যেমন।
শুনতে শুনতে সত্তার অনেক গভীর প্রদেশে যেন ডুবে যেতে লাগল উত্তিয়। অনেকক্ষণ পর সে উঠে এসে বলল, ‘কীসের যেন একটা অস্ফুট আভাস আমার মনের মধ্যে ফুটে উঠছে। যেন পাহাড়ের একটা স্তব্ধ জনহীন নীল গুহার সামনে আমি দাঁড়িয়ে আছি। জানি না, গুহার ভিতরে কী আছে।’
নৈরামণি মায়াবী হেসে শরীরে লীলোর্মিমালা তুলে বলল, ‘কই, তোমার হাতটা আমাকে দাও তো দেখি!’
উত্তিয় সম্মোহিতের মতো তার হাতটা বাড়িয়ে দিল। শবরী হাতটা ধরল তার। পরমুহূর্তেই এক হ্যাঁচকায় উত্তিয়কে কাছে টেনে নিয়ে তাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরল শবরী। তার সুবিপুল উদ্ধত স্তনযুগ উত্তিয়র কপাট বক্ষে সঘন আলিঙ্গনে মর্দিত করতে লাগল। দুই হাত দিয়ে উত্তিয়র মুখখানি তুলে ধরে ওষ্ঠাধরে গভীর চুম্বন করল সে। উত্তিয়র সমস্ত শরীর থরথর করে কেঁপে জেগে উঠতে লাগল সহসা। দুহাত দিয়ে সেও শবরীকে জড়িয়ে ধরল। নিবিড় আশ্লেষ দিতে দিতে শবরীর মুখকমলে, কপালে, স্তনাগ্রচূড়ায়, নাভিকুহরে আবিষ্ট শিল্পীর মতো চুম্বন এঁকে দিতে লাগল। অব্যক্ত আনন্দের অভিব্যক্তিসূচক নিরবয়ব শব্দ নিঃসৃত হতে লাগল উত্তিয়র কণ্ঠ হতে। কী করছে না ভেবেই এই ময়ূরপুচ্ছের পরিধান, এই তপ্ত রমণীশরীর, মন-বুদ্ধি-চিত্ত-অহমিকা্র সুগন্ধ—শবরীর সত্তার সমস্ত আবরণ সে উন্মোচিত করে দেখতে চাইল দুরন্ত আবেগে।
আর তখনই নৈরামণি সবলে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে উত্তিয়কে দূরে ঠেলে সরিয়ে দিল হঠাৎ। গভীর শ্বাস নিতে নিতে দলিত ফণিনীর মতো বলল, ‘তোমার মন এখনও নিয়ন্ত্রিত হয়নি, যুবক। তোমার আত্মনিয়ন্ত্রণ কই আমার শবরের মতো? কেমন করে বুঝবে তুমি নীরবতার ভাষা? বাকপথাতীত সত্যের ইঙ্গিত?’
ধিক্কৃত, লজ্জিত হয়ে উত্তিয় অধোবদনে দাঁড়িয়ে রইল। কেন সে নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। কী যে হয়ে গেল তার!
শবরী তার মনের ভাব বুঝতে পেরে সহসাই শান্ত হয়ে গেল। উত্তিয়র দুই কাঁধের উপর নিজের দুটি হাত রেখে মায়ের মতন অন্তরঙ্গ আর স্নেহভরা কোমল কণ্ঠে বলল, ‘অনুশোচনা কোরো না, উত্তিয়। মন কি একদিনেই বশে আসে? কতটা প্রস্তুত তুমি…তোমাকে বাজিয়ে দেখলাম। তোমাকে মনের নিয়ন্ত্রণ শিখতে হবে। শোনো।’
নিভে আসা স্বরে উত্তিয় বলল, ‘বলো, শুনছি।’
—রেবা নদীর তটে পুষ্পাবসান বলে একটি গ্রাম আছে। তুমি সেখানে যাবে। সেই গ্রামে তোমার সঙ্গে এক বৃদ্ধ ও এক বালিকার দেখা হবে। তাদের কথামতো কাজ কোরো।
তারপরই সেই পাহাড়, সেই গুঞ্জাফুলের মালাপরিহিত শবরী, সেই জ্যোৎস্নাপ্রকাশ, সেই সব সমুন্নত বৃক্ষরাজি—সকলই এক লহমায় কী এক অনির্বচনীয় ইন্দ্রজালে মিলিয়ে গেল…
উত্তিয় দেখল, সে বেতসলতার ঝোপের মধ্যে সন্ধ্যার আসন্ন অন্ধকারের মধ্যে শুয়ে আছে। মন ভারাক্রান্ত, বিষণ্ণ। এতক্ষণ কাকে দেখছিল সে? কে নৈরামণি? তাকে ধরে রাখতে পারল না? এমন স্বপ্ন ভেঙে যায় যে কেন!
পরদিন প্রভাত হওয়ার আগেই ধীবরগৃহ পরিত্যাগ করে পুনরায় পথে নামল উত্তিয়। সকলে জেগে ওঠা অবধি অপেক্ষা করল না। জেগে উঠলে ধীবরপরিবার তাকে অত সহজে বিদায় দিত না।
সমস্ত দিনমান হাঁটতে হাঁটতে বহু ক্রোশ অতিক্রম করবার পর সন্ধ্যায় একটি বিশ্রামকুটি মিলল। আজ এখানেই রাত্রিযাপন করতে হবে। একটি আটচালার নীচে নানা দেশ থেকে আগত মানুষেরা কেউ বসে কেউ শুয়ে কালাতিপাত করছে। কিছুক্ষণ শুয়ে থেকে থেকে বিরক্ত লাগছিল। আটচালা ছেড়ে গ্রামের পথে পথে হাঁটতে লাগল উত্তিয়। রাত হয়েছে। কিছুটা হাঁটবার পর একটি বটবৃক্ষের নীচে কতগুলো লোককে দেখতে পেল। কাঠপাতাখড় দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে আগুন বেড়ে বসে তারা ভাপ নিচ্ছে। আগুন পোহানোর জন্য উত্তিয়ও বসল তাদের সঙ্গে। লোকগুলোর কথাবার্তা থেকে বুঝতে পারল, এরাও পান্থ। বিশ্রামকুটিতে স্থান পায়নি। ধীরে ধীরে উত্তিয়র সঙ্গে কথা শুরু হল তাদের। উত্তিয় জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনারা কোথা থেকে আসছেন? কোথায় যাবেন?’
—প্রয়াগ গিয়েছিলাম আমরা। তীর্থে। এখন নিজেদের গাঁয়ে ফিরছি। আপনি?
—আমি এক দূর নগরের অধিবাসী ছিলাম। এখন ঘরবাড়ি নেই। উদাসীন, অনিকেত।
—এদিকে যাবেন কোথায়?
উত্তিয় ভেবে পাচ্ছিল না, কী বলবে। এদের কি বলবে সে গ্রামটির নাম? স্বপ্নে তাকে বলেছে নৈরামণি। কিন্তু সত্যিই কি আছে অমন গ্রাম বাস্তবে? ধীরে ধীরে বলল, ‘যাবো রেবাতটের একটি গ্রামে।’
একজন জোয়ান লোক, মুখে তার কয়েক মাসের অযত্নে বেড়ে ওঠা দাড়িগোঁফ, আগুনের কাছে সরে এসে দুই হাত শিখার উপর মেলে ধরে উত্তিয়র দিকে তাকিয়ে সামান্য হেসে বলল, ‘তা গ্রামের নামটা কী? আমাদের বলতে কোনো বাধা আছে?’
উত্তিয় ইতস্তত করে বলল, ‘না, না, বাধা থাকবে কেন? রেবাতটের গ্রাম পুষ্পাবসান। আপনারা কেউ কি জানেন এই গ্রামের নাম?’
কথা শেষ হবার আগেই লোকগুলো হো-হো শব্দে হেসে উঠল। তাদের হাসিতে অপ্রতিভ হয়ে গেল উত্তিয়। কিছু কি ভুল বলেছে? বাস্তবে এরকম কোনো গ্রাম বোধহয় নেই।
হাসি থামিয়ে জোয়ান লোকটি বলল, ‘আরে মশায়, আমরা তো পুষ্পাবসান গ্রামেরই লোক। গ্রামেই ফিরছি। চলুন আমাদের সঙ্গে।’
কী আশ্চর্য সমাপতন! যে-গ্রাম সে খুঁজছে, সেই গ্রামের লোকেদের সঙ্গেই আচম্বিতে দেখা হল! সমাপতন, নাকি স্বপ্নজগতের সেই নৈরামণিই অলক্ষ্য থেকে অদৃশ্য সুতোর টানে তাকে এদের কাছে নিয়ে এসেছে?
একজন বৃদ্ধ মানুষ গম্ভীর স্বরে বললেন, ‘তা পুষ্পাবসান যাবেন কেন? কোনো বিশেষ প্রয়োজন?’
—প্রয়োজন? তা…তা আছে কিছু প্রয়োজন। আচ্ছা, আপনাদের গ্রামে কোনো বৃদ্ধ লোক আর তাঁরই সম্পর্কিত কোনো ছোটো মেয়ের কথা আপনারা জানেন? হয়ত তাঁর মেয়ে বা নাতনি?
বৃদ্ধ একইরকম গম্ভীরভাবে বললেন, ‘তা তেমন লোক কি কম আছে আমাদের গাঁয়ে? কত বৃদ্ধ, কত নাতনি…’
—না, বলছিলাম, হয়ত এই বৃদ্ধ আর বালিকা সব সময় একসঙ্গেই ঘোরে। বা, একসঙ্গে থাকে। তেমন কোনো—
লোকগুলো হাসি-হাসি মুখে এ ওর দিকে মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। তারপর একজন যুবক সহর্ষে বলে উঠল, ‘হ্যাঁ গো খুড়ো, সেই যে লাঠির খেলা দেখায়—বুড়ো বিরূপাক্ষ আর তার বাচ্চা বউ মেধাকথলিকা—তেনাদের কথাই ইনি বলছেন নাকি বলো তো?’
কিছুক্ষণের মধ্যেই সবাই বিড়বিড় করে আলাপ করে সিদ্ধান্তে পৌঁছালো, তাদের গ্রামের বৃদ্ধ বিরূপাক্ষ আর তাঁর বালিকা পত্নী মেধার কথাই উত্তিয় জানতে চেয়েছে। না হয়েই যায় না। জিগগেস করল, ‘তা তেনাদের সঙ্গে আপনার কী দরকার?’
—আছে দরকার। আচ্ছা, লাঠির খেলা কী? লাঠি নিয়ে যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা?
—না, না, লাঠিযুদ্ধ নয়।
—তবে কী খেলা?
—সে আপনি আমাদের গ্রামে চলুন। নিজের চোখেই দেখতে পাবেন।
জোয়ান লোকটি আরও বলতে লাগল, ‘বিরূপাক্ষ আর তার বউ মেধাকথলিকা ওই খেলা দেখিয়েই তো বেঁচে আছে। বৃদ্ধ বিরূপাক্ষর তৃতীয় পক্ষের স্ত্রী মারা যাওয়ার পর বুড়ো আবার এই তুরীয় বয়সে বালিকা মেয়েটিকে বিবাহ করেছে। তা বলতে নাই অন্যের বউ সম্পর্কে, মেয়েটি অত্যন্ত সুশ্রী, সুলক্ষণা। দুজনের মধ্যে ভাবও খুব। কিন্তু কপাল খারাপ! গত বছর বন্যায় ওদের বাড়ি, জমি—সব গ্রাস করে নিয়েছে রেবা। আবার কোনোমতে একটা খোড়ো ঘর তুলেছে ওরা গাঁয়ের সীমানায়। ভাগ্যিস, মেধা লাঠির খেলাটা জানত। গ্রামে গ্রামে ঘুরে তারা ওই লাঠির খেলা দেখিয়েই তো এখন দিন গুজরান করে।’
এই অসমবয়সী দম্পতি সম্পর্কে উত্তিয়র খুবই কৌতূহল হতে লাগল। সে জিজ্ঞাসা করল, ‘রেবার বন্যা ছাড়া আর তো কিছু উৎপাত নেই আপনাদের গ্রামে?’
লোকটি বলল, ‘উৎপাত? আপনি নিজেই গিয়ে দেখবেন চলুন। বড়ো ভাবসাব আমাদের সবার মধ্যে গাঁয়ে। একেবারে রসুনের কোয়ার মতো আমরা এ ওর গায়ে লেগে থাকি। ছাড়ানো মুশকিল। হে হে!’
‘রাত হল। আজ তবে আসি’, উত্তিয় বিদায় জানালো।
—হ্যাঁ, কাল সূর্যোদয়ের সময়েতেই চলে আসবেন এখানে। দেরি করবেন না যেন। আমরা সবাই একসাথেই যাত্রা করব বিহানবেলায় পুষ্পাবসানের পথে।
—————
ঋণস্বীকারঃ
১) খুলনা, বাংলাদেশের বিশিষ্ট লোকগানশিল্পী শ্রীগুরুপদ গুপ্ত
২) হায়দ্রাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যাংস্ক্রিট স্টাডিজ-এর গবেষক শ্রীমান আবিরলাল গঙ্গোপাধ্যায়