মেঘবতী পর্ব ৫
মেঘবতী পর্ব ৫
নবম অনুবাক
নদীতীর বলতে সচরাচর যা বোঝায় এখানে তা নেই। দুইপাশে উত্তুঙ্গ গিরিশৃঙ্গ থাকাতে নদীর পাড় প্রায় লম্বভাবে ঊর্ধ্বদিকে উঠে গেছে। সেই পর্বতের গাত্রদেশে অসুরের মুণ্ডের মতো উদ্গত প্রস্তরখণ্ডসমূহ অবলম্বন করে উত্তিয় পর্বতারোহণ করছিল। একে তো রুক্ষ গিরিগাত্র, তদুপরি শৈবালপিচ্ছিল—যেকোনো মুহূর্তে অতর্কিতে পদস্খলনের আশংকা। কিছুক্ষণ আরোহণের পরে সে একটি স্বল্পপরিসর সামতলিক স্থান খুঁজে পেল। ক্লান্ত, ঘর্মাক্ত উত্তিয় তির্যক প্রস্তরখণ্ডটির উপর বসে পড়ল। শ্রান্তিতে তার হস্তপদ অবশ হয়ে আসছে।
পুষ্পাবসান থেকে বাহির হয়ে বহু জনশূন্য প্রান্তর, শ্বাপদসংকুল অরণ্য, ভিড়াক্রান্ত জনপদ, কতো নদী, কতো নোনা গাঙে সোনার বজরা বেয়ে সে নর্মদাভিমুখে অগ্রসর হচ্ছিল। পথিমধ্যে বহুজনের সন্নিধি সে নর্মদার কথা জিজ্ঞাসা করেছে। অতিথিশালায় রাত্রিযাপনান্তে ঊষাকালে প্রাপ্ত নির্দেশানুযায়ী সে পুনরপি যাত্রা শুরু করেছে। কতোদিন, কতোমাস এইভাবে বিগত বিলীন হয়েছে, উত্তিয় তা গণনা করেনি।
নর্মদার নিকটস্থ অনার্য ইলিবিশদের গ্রাম চম্পাহিট্ঠী। সেই গ্রামের হট্টমধ্যে এক পথিকের নিকট সে জ্ঞানপ্রভ আরণ্য ও তাঁর অনুসারীদের অবস্থান সম্পর্কে সংবাদ পায়। নদীর ওই পারে আকাশস্পর্শী গিরিশ্রেণী, নিয়মিত কোনো মার্গের অভাব; কিন্তু কিয়দ্দূর সশ্রম আরোহণ করলে একটি পতনোন্মুখ অর্জুনদ্রুম পরিদৃষ্ট হবে। তারই তলদেশে শীর্ণ সর্পিল পার্বত্য পন্থায় অগ্রসর হলে গিরিগাত্রে লম্বিত মধুচক্রের মতো অগণ্য গিরিকুহর দেখা যাবে। ওই গুহাগুলিতেই জ্ঞানপ্রভ আরণ্য ও তাঁর অনুসারিবৃন্দ তপোনিষ্ঠায় অবস্থান করছেন।
কিন্তু কোথায় বা সেই অর্জুনবৃক্ষ, আর কোথায়ই বা তার তলদেশশায়ী পন্থা? শরীরে শক্তি লুপ্তপ্রায়, গতকাল দ্বিপ্রহরবেলায় গ্রামহট্টে ভিক্ষা মিলেছিল, তারপর আর কিছুই আহার্য জোটেনি। জঠরকুহর ক্ষুধানলে জ্বলমান, মন বিক্ষিপ্ত চিন্তায় উদ্ভ্রান্ত। এ কোন্ অলীক অনুসন্ধান? কোন্ মরীচিকার পশ্চাতে বা এই নিরর্থক ধাবমানতা? শ্রান্তি ও তন্দ্রা যেন অস্থিসার সখার মতো তার দুই হাত ধরে বসেছে এখন এই পাথরের উপর। অথচ এরই মধ্যে মন অলস কল্পনার লুতাতন্তু সীবন করে চলেছে। এমন বিষম দশায় এতাদৃশ বিচিত্র চিন্তা কীভাবে যে আসে!
নারী! নারী! জীবনের পথিপার্শ্বে যে-সব সর্বংসহা নারীরা তাকে আশ্রয় দিয়েছে, শুশ্রূষা করেছে, এখন তাদের মুখ এক এক করে মনে আসছে। জননী শৈশবেই গতায়ু হয়েছেন, ছোটোবেলায় দেখা মায়ের সেই অস্পষ্ট মুখ… একবার মনে উঠেই মিলিয়ে যায়। আবাল্যসহচরী আত্রেয়ী, যাকে যৌবনে সে বান্ধবীরূপে পেয়েছিল, সেই আত্রেয়ী যেন তার উদ্বিগ্ন চোখ দুটি তুলে চিন্তার অরণ্যের প্রান্তদেশ থেকে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে অপলক…পাতার আড়ালে মেয়েটির মুখ… নটী অনঙ্গসেনার মেধাবিদ্যুৎস্পৃষ্ট দুটি চোখ চেয়ে আছে যেন কতো বেদনার বাষ্পমেঘের অন্তরাল হতে… গ্রামীন গায়কের অদেখা সেই প্রণয়িনী তর্তরিকা—সেও যেন কতো মমতায় তাকে ফিরে যেতে বলছে অনিবার্য… মেধাকথলিকা আশ্চর্য মায়াভরা চোখে দাঁড়িয়ে রয়েছে পুষ্পাবসান গ্রামের প্রান্তে… তবু এই নারীপ্রেম তাকে শান্তি দিতে পারে না, সমাপ্তি টানতে পারে না তার শানিত জিজ্ঞাসার… শব্দের রহস্যময় প্রাসাদের রঙমহলের দরজার সামনে নিষেধের দৌবারিক ওষ্ঠে তর্জনী রেখে বলে, চুপ! শব্দ কোরো না।
বড়ো ঘুম পেতে লাগল উত্তিয়র। পৃথিবীর সমস্ত মায়াকুসুম প্রণয়িনী নারীদের কোলে মাথা রেখে ঘুমের অতলে তলিয়ে গেল সে কতক্ষণ বলতে পারে না।
ঘুম যখন ভাঙল, উত্তিয় দেখল, বেলা ঘুরে গেছে। নদীপরপারের নিসর্গ দৃশ্যাবলী কাজলরেখার মতো নীল! কতোক্ষণ ঘুমিয়েছে সে, অথচ কোনো স্বপ্ন দেখেনি। সংজ্ঞাবিহীন, আত্মপরভেদহীন, অহংতা-মমতারহিত সুগভীর নিদ্রা। কোথায় সে শুয়ে আছে, তার খেয়াল নেই। সে ভুলে গেল, এ গৃহস্থের পর্যঙ্ক নয়, সামতলিক ভূমির উপরেও সে শায়িত নয়। সে ভুলে গেল, সে একটা খাড়া পাহাড়ের গা-বরাবর একটা প্রাচীন চ্যাটালো পাথরের উপর অকাতরে নিদ্রা গিয়েছিল। সব ভুলে গিরিগাত্র যেদিকে, সেইদিকে সে পাশ ফিরে শুতে গেল।
আর অমনই ঘাসপাতায় আচ্ছন্ন একটা গর্তের ভিতর পড়ে যেতে লাগল উত্তিয়। প্রাণভয়ে সে চিৎকার করে উঠল, তার আর্তনাদ সেই গর্তের দেওয়ালের গায়ে বারংবার ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়ে মিলিয়ে গেল শূন্যে। সে অনুভব করল, সে একটা অকল্পনীয়ভাবে গভীর কূপের ভিতর নিরালম্ব পড়ে যাচ্ছে। এ কি কূপ, নাকি কোনো আদিম নাগমাতার গলদেশ? এর শেষ কোথায়? কোথায় এর তলদেশ? কতক্ষণ ধরে সে পড়ছে কূপের বাতাসের ভিতর দিয়ে সূর্যসারথি ঈগলের সোনালি পালকের মতো নির্ভার… এত হালকা হয়ে এত সময় ধরে সে পড়ছে যে, তার ভয় চলে গেছে…সে ভাসতে ভাসতে পড়তে পড়তে উলম্ব যাত্রাপথের দুপাশের দৃশ্যাবলী, শব্দাবলী শুনতে পাচ্ছে… কারা এরা এত কথা বলছে?… তার মনে বিচিত্র বেদনা, অপরিসীম কৌতুক এবং উন্মুখ কৌতূহল ক্রমাগত উদ্রিক্ত হতে লাগল…
কূপের গাত্রবিলগ্ন ও কারা এত হাসছে, কথা বলছে, কাঁদছে, তর্জন-গর্জন করছে, পরস্পরকে আদর করছে, আবার পরমুহূর্তেই আঘাত করছে? উল্লাপন, আলিঙ্গন, আহ্বান, চুম্বন, মিলন, অবঘাত, শীৎকার, ক্রন্দন, রণন, নিবেদনের যাবতীয় শব্দ কূপের গাত্র হতে মৃদঙ্গধ্বনির মতো বেজে বেজে উঠছে। কখনও তাদের কথা বোঝা যাচ্ছে, কখনও ভাষা দুর্বোধ্য। উত্তিয় সবই শুনতে পাচ্ছে। কৌতূহলাক্রান্ত হয়ে সে ভাবছিল, এ শব্দময় কূপের অর্থ কী?
প্রথমে কূপগাত্রদেশ হতে অপভ্রংশ ভাষার শব্দ নিঃসৃত হচ্ছিল। পুষ্পদন্ত, ধনপাল, হরিভদ্র প্রভৃতি রচনাকারের রচনায় যে ভাষা পাওয়া যায়, এ ভাষা ঠিক তেমন। নারী-পুরুষ, রাজা-প্রজা, দেব-কিন্নর-দাস সকলেই কূপের গা থেকে ঝুলছে…কূপের গা বেয়ে মাকড়সার মতো হেঁটে যাচ্ছে… চকিত তিত্তিরাজ পাখিদের মতো তারা অপভ্রংশ ভাষায় বাদানুবাদ করছে…
উত্তিয় কূপের আরও নিচের দিকে পড়তে লাগল কইতরের পালকের মতো। কূপগাত্র হতে অগণ্য মানুষের বিচিত্র সংবেদনা ও ভাবাবেগ শব্দরূপ ধরে বেরিয়ে আসছে। উত্তিয় লক্ষ করল, এই পর্যায়ে ভাষা পরিবর্তিত হয়ে গেল। অনুভূত হল, এরা একই ভাষায় কথা বলছে না। কেউ মাগধীতে কথা বলছে, কেউ পৈশাচীতে পরস্পর সম্বোধন করছে। কেউ বা অর্ধমাগধীতে চিৎকার করে উঠল। কেউ শৌরসেনীতে প্রণয় নিবেদন করছে। কেউ মাহারাষ্ট্রী বাঙ্ময়ে ললিত বাক্যবিন্যাসে কূপের বাতাস সুখাবহ করে তুলল।
সূর্যের একটি শানিত কিরণরেখার মতো কূপের অন্ধকার ভেদ করে উত্তিয় আরও নিচে পড়তে লাগল। কিছুক্ষণ কোনো শব্দ নেই। তারপর আবার কূপগাত্র হতে ভাষা জেগে উঠছে। দীর্ঘক্ষণ কারা যেন গান্ধারী ভাষায় কথা বলে চলেছে। তারও নিচ থেকে পালি ও কথ্যপ্রাকৃতে ভাববিনিময় হতে লাগল। উত্তিয় এ ভাষা শুধু অনুমানে বুঝতে পারছে। সম্যক উপলব্ধি হচ্ছে না আর।
রমণীর গ্রীবাদেশ হতে স্খলিত একটি শ্যামকুন্তলের মতো উত্তিয় আরও গভীর অন্ধকারে পড়তে লাগল। সহসা কতোগুলি ঝংকারময় শব্দ কূপের গাত্র হতে বেরিয়ে এসে তার কর্ণকুহরে প্রবেশ করামাত্রই সে সেই ভাষা বুঝতে পারল। এ ভাষা সে কেবল গ্রন্থে পড়েছে। শাস্ত্রচর্চার ভাষা, কাব্যচর্চার ভাষা, পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনার ভাষা!! ‘কঃ পততি? ত্বং কঃ? কিং নাম তে? কুত আগতোঽসি? অস্মাকং ভাষায়াঃ অববোধনে কিং বাধা জনয়তি?’—কে পতিত হয়? কে তুমি? কী তোমার নাম? আমাদের ভাষা বুঝতে কোনো অসুবিধা হচ্ছে?
উত্তিয় চিৎকার করে বলে উঠল, ‘না, না, কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। একেই তো আমরা সংস্কৃত ভাষা বলি! কবে কোনযুগে নির্মিত হয়েছিল, কে জানে। পুথির স্বর্ণপীঠিকায় ব্যাকরণের নিগড়ে বাঁধা থেকে থেকে যুগ যুগ ধরে কোনো পরিবর্তনই প্রায় তার হয়নি। ভাসের ভাষা, ব্যাসের ভাষা, কালিদাসের ভাষা, শূদ্রকের ভাষা, ভবভূতির ভাষা! কিন্তু কে তোমরা? কুঁয়োর গায়ে কী করছ? এখানে কেন…? কথা বলো…’
কূপের গাত্র হতে কোনো উত্তর এল না। সুগম্ভীর নিস্তব্ধতা। নৈঃশব্দ্যের ভিতর নিতল অন্ধকারে উত্তিয় পড়ছে। কিছুদূর পড়ার পর কূপের দেওয়াল আবার বাঙ্ময় হয়ে উঠল। কিন্তু সেই ভাষা আগের মতন উত্তিয় আর স্পষ্টভাবে বুঝতে পারছিল না। কিছু বুঝছে, কিছু বুঝছে না। বিচিত্র সে-ভাষায় ব্যাকরণের বন্ধন বড়ো শিথিল, সে যেন স্বতঃস্ফুর্ত প্রাণনার ভাষা, শতপথ ব্রাহ্মণ-এর ভাষা, বেদাঙ্গের ভাষা, বৃহদারণ্যক উপনিষদের ভাষা। এ ভাষা হাতুড়ির মতন অব্যর্থ, তরবারির ফলকের মতন দ্বর্থহীন, একটিও অপ্রয়োজনীয় শব্দ নেই, অতিকৃত একটিও উপমা নেই, এ ভাষা নগ্ন, নিরর্গল—বেদ বা অহং তং পুরুষং সর্বস্যাত্মনঃ পরায়ণং যমাত্থ…
এবার আর কূপের গাত্রদেশ দেখা যাচ্ছে না। নিকষ অন্ধকার অবরুদ্ধ করেছে উত্তিয়র দৃষ্টি। তবু অন্ধের স্পর্শের মতো অনিবার্য অনুমানে সে বুঝতে পারছিল, কূপের দেওয়াল বেয়ে কারা যেন নিঃশব্দে হাঁটছে। তাদের শব্দ কম, স্বনন অধিক। সেই স্বননের ভিতর কে যেন গভীর নিঃশ্বাস ফেলে বলে উঠল—
‘দিশঃ সূর্যো ন মিনাতি প্রদিষ্টা
দিবে দিবে হর্যশ্ব প্রসূতাঃ।
সঃ যদ্ আনল্ অধ্বন্ আদ্ ইদ্ আশ্বৈর্
বিমোচনং কৃণুতে তৎ ত্বস্য।।’
—দিকসমূহ নিয়মিত করেছেন ইন্দ্র,
সেই সব অলঙ্ঘনীয় দিশা বেয়ে প্রতিদিন সূর্য চলেন পথে,
যাত্রা সমাপ্ত হলেই অনিবার্য দিনাবসান,
সূর্য তখন মুক্ত করে দেন শ্রান্ত ঘোড়াদের তাঁর রথের,
সেসব অশ্বযূথ তখন অস্তাকাশের আভাকিরণ,
তাদের মুক্ত করে দেওয়া—সেও ইন্দ্রেরই আরোহণের জন্য।
বোধের অতীত শব্দ হতে লাগল এবার, উত্তিয় কূপের ভিতর পড়ছে। এ কোন্ ভাষা, সে জানে না। তীক্ষ্ণ, তির্যক, তীব্র, উদাত্ত, অনুদাত্ত, স্বরিত শব্দমালা প্রাচী, প্রতীচী, উদীচী, মধ্যদেশ, দক্ষিণ দিশ্ হতে ধ্বনিত হচ্ছে… তারপর জম্বুদ্বীপের ভাষা এ বুঝি আর নয়, কোন্ প্রাচীন পৃথিবীর শব্দ এসব… অতঃপর শব্দও আর নেই, কূপের ভিতর ছড়িয়ে আছে শুধু স্থলপদ্মের আভার মতন অস্ফুট আলোক। উত্তিয় দেখছে, কূপগাত্রস্থ মানব-মানবী পশুচর্মে আবৃত, কেবল অনিয়ত শব্দে আর গানের সুরে এ ওকে ডাকছে… তদনন্তর অলজ্জ নগ্ন নগ্নিকারা আর কথাও বলছে না, তাদের কণ্ঠে শব্দ ফোটেনি, হস্তপদের বিচিত্র মুদ্রায়, আকারে-ইঙ্গিতে ভাববিনিময় করছে… অবশেষে সকল অস্তিত্ববিরহিত এক প্রগাঢ় নৈঃশব্দ্য।
উত্তিয় কূপের তলদেশে এসে পড়ল বোধহয়। জল-কাদা-মাটির ভিতর। এত উপর থেকে পড়ল, ভেবেছিল খুব ব্যথা পাবে, কিন্তু কই পেল না তো! যেন কার্পাস তুলার বীজের মতন বাতাসে উড়ে উড়ে এসে পড়ল মাটিতে। ওহ্, কতোকাল ধরে যেন সে পড়েছে। কতোকাল! বুঝি সহস্র সহস্র বৎসর, সহস্র সহস্র মহাযুগ!
ব্যথাভয়ে সে চোখ বুজে ফেলেছিল। কিন্তু ব্যথা যখন পেলই না, তখন অবাক হয়ে ধীরে ধীরে চোখের পাতা খুলল উত্তিয়। কই, যে কূপ বেয়ে সে পড়ল এতক্ষণ, সে কূপ দেখা যাচ্ছে না তো! কয়েক মুহূর্ত পর দৃষ্টি স্বাভাবিক হলে সে দেখল, একটি বৃহৎ অর্জুন গাছ পতনোন্মুখভাবে তারই উপর যেন ঝুঁকে রয়েছে! আর সেই অর্জুন গাছের তলায় এক পার্বত্য পন্থার উপর অবলীলায় শুয়ে আছে সে।
দৃষ্টি ফেরাতেই উত্তিয় দেখল, তিনজন গৈরিক কাষায়পরিহিত তরুণ সন্ন্যাসী তার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে ঝুঁকে পড়ে কৌতূহলভরে তাকেই দেখছেন।
একজন বললেন, ‘না, জ্ঞান হারায়নি। স্নায়ুশক্তি বেশ প্রবল। নয় কি?’
আরেকজন উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ, সেকথা স্বীকার করতেই হবে, দ্রুহু। আমি তো এখানে আসার সময় অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম। কয়েক দণ্ড পর চেতনা ফিরে পেয়েছিলাম। আহা! সে কতোকাল আগের কথা!’
তৃতীয়জন বিরক্ত স্বরে উচ্চারণ করলেন, ‘স্মৃতিকাতর হয়ো না তো, উষ্ণিক। স্মৃতিকাতরতা…অতীতযাপন… পূর্বানুভূত বিষয়ের জাবর কাটা… এসব অলস গো-জাতির ধর্ম। ওতে চিত্ত বড়ো বৃত্তিমুখর হয়ে যায়।’
দ্রুহু বললেন, ‘তাহলে এখন কী করবে, বলো। এ কি নিজে নিজে হেঁটে গুহা অবধি যেতে পারবে?’
উষ্ণিক বললেন, ‘না-পারার তো কথা নয়। আঘাত কিছুই লাগে না পতনে। ওহে, অনিরুদ্ধ, তুমিই একবার একে জিজ্ঞাসা করে দেখো না হে! এ আমাদের ভাষা বুঝছে কি না?’
একটু আগে যিনি বিরক্ত হয়েছিলেন, সেই অনিরুদ্ধ এবার আরও বিরক্ত হয়ে বললেন, “যখন তখন আমাকে তোমরা ওই নামে ডেকো না তো! এসেছি চিত্তবৃত্তি-নিরোধের জন্য, এদিকে বাপ-মায়ে নাম দিয়ে রেখেছে ‘অনিরুদ্ধ’! আচার্যদেব তো আমাকে ‘বিবেক-খ্যাতি’ বলে ডাকেন। শুধু তোমরাই… যাকগে… বলি, ও মহাশয়, ও ভদ্রমুখ, আমাদের ভাষা বুঝতে পারছেন, বপ্র?”
উত্তিয় বুঝতে পারল এবার তাকেই বলা হচ্ছে। তরুতলস্থ সেই পাতাঝরা বনপথের উপর উঠে বসে সে অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনারা কারা? আমি কোথায় এসেছি? আমার কী হয়েছিল?’
দ্রুহু বললেন, ‘আমরা নিকটস্থ গুহাশ্রমের সাংখ্যবাদী যোগী। আপনার কী হয়েছিল, বপ্র, আপনি তা নিজেই বলুন। মস্তিষ্ক সুস্থ আছে কিনা, পরীক্ষা হয়ে যাক।’
—পড়ে গিয়েছিলাম। একটা কূপের ভিতর। অতলস্পর্শী একটা কূপ!
অনিরুদ্ধ ঠোঁট উলটে অবজ্ঞাসূচক শব্দ করে বললেন, ‘হন্ত! অতলস্পর্শী কীভাবে হবে? এই তো তলদেশে দিব্য বসে আছেন। যত্তোসব বাগাড়ম্বর!’
উষ্ণিক অনিরুদ্ধকে নিরস্ত করে বললেন, ‘তুমি থামো তো! সবেমাত্র স্বাভাবিক অবস্থা পেয়েছে, এখনই এর প্রতি এত খরবাকের কী প্রয়োজন?… তারপর বলুন ভদ্রমুখ, সে কূপ কীরকম?’
উত্তিয় বলল, ‘সে যেন একটা ভাষাকূপ। উপরের থেকে নিচের দিকে স্তরে স্তরে সময়ের বিপরীতক্রমে ভাষার নিদর্শন সাজানো রয়েছে। শেষে নির্ভাষা!’
দ্রুহুর দিকে চেয়ে চোখ মটকে উষ্ণিক বললেন, ‘অহো! বপ্র যথেষ্ট বুদ্ধিমান!’
উত্তিয় প্রশ্ন করল, ‘কিন্তু একটা জিনিস আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না।’
দ্রুহু বললেন, ‘জিজ্ঞাসা চেপে রাখার দরকার নেই। ওতে অম্লশূল হয়। বলে ফেলুন।’
—আচ্ছা, আমি যদি সময়ের বিপরীতক্রমেই পড়ে থাকি এবং কূপের সেই তলদেশে যদি ধারণাতীত অতীতেই পৌঁছে গিয়ে থাকি, তাহলে আপনারা কোন্ যুগের লোক?
উত্তিয়র এই কথা শুনে তিনজন একবার নিঃশব্দে মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন। তারপরই তিন তরুণ সন্ন্যাসী প্রচণ্ড অট্টহাসে ফেটে পড়লেন।
‘কেন, আমাদের দেখে কি আপনার কোনো প্রাগৈতিহাসিক জন্তু বলে মনে হচ্ছে?’ অনিরুদ্ধ শুধালেন।
—না, একেবারেই না। আপনারা, আপনাদের আচরণ, আপনাদের ভাষা সকলই আমার সমকালের।
দ্রুহু বললেন, ‘তাতে কোনো সন্দেহই নেই। আমরা আপনার জন্যই এখানে অপেক্ষা করছিলাম। এখন চলুন। আচার্যদেব জ্ঞানপ্রভ আরণ্য আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন।’
জ্ঞানপ্রভ আরণ্য! তাঁর আশ্রমের কাছেই সে এসে পড়েছে? উত্তিয় সচকিত হয়ে উঠল। কিন্তু তার পরমুহূর্তেই চিন্তার ভিতর তলিয়ে গেল সে। সে যে এখানেই আসবে, জ্ঞানপ্রভ আরণ্য তা জানলেন কী প্রকারে? সমস্তই কি পূর্বনির্ধারিত ছিল?
খানিক চিন্তা করে উত্তিয় পুনরায় প্রশ্ন করল, ‘আচ্ছা, আমাকে এখানে এত জটিল পন্থায় আসতে হল কেন?’
উষ্ণিক বলল, ‘আপনি কি কোনো সরল মার্গ আশা করেছিলেন, বপ্র? যে এখানে জিজ্ঞাসু হয়ে আসে, তাকে এভাবে কূপের মধ্যে নিপতিত হয়েই আসতে হয়। আমরাও এভাবেই এখানে এসেছি। অন্য উপায় নেই।’
—আচ্ছা, তাহলে ইলিবিশদের গ্রাম চম্পাহিট্ঠী-সমীপে এক হট্টে এক পথিক যে আমাকে পথ বলে দিল…সে বলল, এই পতনোন্মুখ অর্জুনবৃক্ষটির কথা…বলল, এরই তলা দিয়ে গুহাবাসে যাওয়ার পথ… সে তবে কীভাবে জানল?
—সে কি পথিক, নাকি আপণিক?
—আপণিক হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল। সে কীভাবে…?
—সেও এখানে এসেছিল।
—এই কূপের মধ্যে সেও পতিত হয়েছিল?
—না। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে পা দিয়ে দিয়ে উপরে উঠে এসেছিল।
—কেন? সে সোজাসুজি পথ খুঁজে পেয়ে গেল, আর আমাকে এই কূপের মধ্য দিয়ে আসতে হল কেন?
—কারণ, আপনি জিজ্ঞাসু। জিজ্ঞাসুকে এভাবেই আসতে হয়। সেই আপণিক জিজ্ঞাসু ছিল না। তার কাছে সবই প্রাকৃত। এমন অনেক প্রাকৃতজনই এখানে আসে। কোনো জিজ্ঞাসা নিয়ে নয়। সাধারণ লৌকিক প্রয়োজনে। তারা সহজলভ্য পার্বত্য পন্থা ধরেই আসে। সেই পথ ধরেই ফিরে যায়।
—তারা এখানে কী পায়?
—কী আর? কলা বিক্রি করে বাড়ি চলে যায়। এ স্থানের অর্থ তারা বুঝতে পারে না।
—আচ্ছা, সেই কূপটিই বা গেল কোথায়?
—প্রয়োজন ফুরিয়েছে, তাই শূন্যে বিলীন হয়ে গেছে। আপনার কৌতূহল চরিতার্থ হয়েছে? নাকি আরও প্রশ্ন করবেন?
উত্তিয় লজ্জিত মুখে উঠে দাঁড়াল। তিনজন যতি সম্মুখে চলতে শুরু করলেন। উত্তিয় তাঁদের অনুসরণ করতে লাগল। প্রাকৃতিক নিসর্গশোভায় স্থানটি পরিপূর্ণ। শীর্ণ পন্থার দুপাশে আকাশস্পর্শী বনস্পতিসমূহ। সেই শ্যাম বনশ্রীর আড়াল দিয়ে দেখা যায় বহুদূরে পর্বতের সানুদেশে ক্ষীণ রেখার মতো নর্মদা প্রবহমানা।
পথ এসে শেষ হল যেখানে, সেখানে পর্বতগাত্রে সত্যই মধুচক্রের মতো অগণ্য গুহার সমাহার। চম্পাহিট্ঠীর সেই আপণিক যেমন বলেছিল, অবিকল তেমনই। মধুমক্ষিকা যেরূপ বৃক্ষশাখায় মধুচক্র রচনা করে, একটি বৃহৎ মধুচক্র যেমন অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মধুকোশের সমাহারে রচিত, এ গিরিগাত্রেও সেইরূপ প্রকৃতিদেবী কী বিচিত্র বাসনায় গণনাতীত গহ্বর খোদিত করে রেখেছেন। গিরিগহ্বরের মুখগুলি শকুনের ধারালো চঞ্চুর মতন। প্রবেশপথ অতি সংক্ষিপ্ত, তিনজন সন্ন্যাসীকে অনুসরণ করে উত্তিয় কোনোমতে হামাগুড়ি দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করল। কিন্তু প্রবেশ করামাত্রই ভিতরে বিশাল আয়তনের গুহাকক্ষ দেখা গেল। প্রায়ান্ধকার গুহাকক্ষের গাত্রে একটি অনির্বাণ মশাল জ্বলছে। সেই মশালের আলোক তিনজন যতির মুখমণ্ডলে থরথর করে কাঁপছিল।
স্তব্ধতা ভঙ্গ করে যতি অনিরুদ্ধ বললেন, ‘আপাতত আপনাকে এখানেই থাকতে হবে। এই আপনার ভিক্ষাপাত্র, যদিচ আপাতত কয়েক মাস আপনার ভিক্ষাটনে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। গুহামুখে ভিক্ষাপাত্রটি রাখলেই আমাদের কেউ-না-কেউ প্রতিদিন এসে পাত্র পূর্ণ করে দিয়ে যাবে। এই গুহার পশ্চাতে একটি সংগুপ্ত জলধারা আছে, একটি পার্বত্য নির্ঝরের উৎস্রোত। স্নানপানাদি তাতেই সমাধা করবেন। ওইদিকে একটি আরণ্যক ভূমি আছে, সেখানেও মধ্যে মধ্যে বিহার করতে পারেন। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই এই পর্বত হতে অবতরণ করবেন না। এক্ষণে চিত্তসমাধান করুন। কোনোরূপ বিক্ষেপ যেন না আসে। অতীত সম্পূর্ণ ভুলে যান।’
উত্তিয় ত্বরিতে বলল, ‘কিন্তু জ্ঞানপ্রভ আরণ্য? আমি তো তাঁর সঙ্গে দেখা করবার জন্যই এতদূর থেকে এসেছি। আমার কতগুলি জিজ্ঞাসা আছে…’
দ্রুহু হাত তুলে উত্তিয়কে নিরস্ত করে বললেন, ‘তাঁর নির্দেশেই আমরা আপনাকে অপেক্ষা করতে বলেছি। আগে মন শান্ত হোক। তারপর জিজ্ঞাসা। বিক্ষিপ্ত চিত্তে জিজ্ঞাসা আপনার উপকার না-করে অপকারই সাধন করবে।’
উত্তিয়কে বড়ো অস্থির দেখাচ্ছিল। উষ্ণিক তা দেখে উত্তিয়কে আশ্বস্ত করবার ভঙ্গিতে বললেন, ‘সময় হলেই আচার্যদেব আপনাকে নিজ সন্নিধানে ডেকে নেবেন। অযথা উদ্বিগ্ন হবেন না। …আমরা এখন আসি।’
তাঁরা গুহা পরিত্যাগ করে চলে গেলেন।
উত্তিয় কিছুই বুঝতে পারছিল না। স্থানটি প্রায় শব্দহীন। গুহাগাত্রে মশালটি শুধু জ্বলছে। গুহার একপাশে প্রস্তরনির্মিত বেদী রয়েছে। এখানেই রাত্রে শয়ন করতে হবে। এ কঠোর একাকী জীবনে প্রথম প্রথম তার অসুবিধা হলেও সে নিশ্চয়ই এ জীবনে মানিয়ে নিতে পারবে। সে-আত্মবিশ্বাস তার আছে। কিন্তু আজকের সমস্ত ব্যাপারটি একটি দুর্বোধ্য ব্যাসকূটের মতো তার মস্তিষ্কে পীড়া দিচ্ছিল।
ভাষাকূপের ভিতর দিয়ে তার এখানে আসার তাৎপর্য কী? তিনজন যতি সেই অর্জুনবৃক্ষের তলে কেমন প্রগল্ভ হাস্যপরিহাস করছিলেন, গুহাবাসে উপনীত হওয়ামাত্রই তাঁরা এত গম্ভীর হয়ে গেলেন কেন? স্থান-মাহাত্ম্য? তাঁরা উত্তিয়র প্রায় সমবয়সী, অথচ তাঁরা উত্তিয়কে স্নেহসূচক ‘বপ্র’ সম্বোধন করছিলেন কেন? জ্ঞানপ্রভ আরণ্য কোথায় থাকেন? যতিগণ পথে বললেন, তিনি উত্তিয়র জন্যই অপেক্ষা করছেন, অথচ এখানে আসার পর বলছেন, এখন দেখা হবে না। আগে মন শান্ত হোক, তারপর প্রশ্ন। তাঁরা জ্ঞানপ্রভ আরণ্যের নির্দেশেই এরূপ বলছেন?
এ কোথায় সে এসে পড়ল? এখান থেকে নিঃশব্দে সে পালিয়ে যাবে? ফেরার পথই বা কোথায়? পালিয়ে গেলে যে-সুযোগ তার সামনে এসেছে, তা হাতছাড়া হয়ে যাবে। আর কখনও সে তার প্রশ্নের উত্তর পাবে না।
অতীতকে ভুলে যেতে হবে তাকে? আচ্ছা, অতীতকে কীভাবে মন থেকে মুছে ফেলা যায়?
দশম অনুবাক
‘তুমি যে বলেছিলে, গোধূলি হ’লে
সহজ হবে তুমি আমার মতো,
নৌকো হবে সব পথের কাঁটা,
কীর্তিনাশা পথে নমিতা নদী।
গোধূলি হ’ল।
তুমি যে বলেছিলে, রাত্রি হ’লে
মুখোশ খুলে দেবে বিভোর বিভা,
অহংকার ভুলে অরুন্ধতী
বশিষ্ঠের কোলে মূর্ছা যাবে।
রাত্রি হ’ল।’
যে-কথা তুমি নিজেকে দিয়েছিলে একদিন, আজ সেই কথা ফিরে এসে তোমাকে প্রশ্ন করে। তোমাকে বলে সে সহজ হওয়ার কথা, কিন্তু সহজ হতে তুমি পারলে কই? পথে যা বাধার কাঁটা হয়ে ছিল, আজ তা নৌকো হয়ে পার করে দেবে তোমাকে নদীর স্রোত, কুণ্ডলিনীর মূল থেকে খুলে গোধূলিবেলায় খেয়া ভাসিয়ে নিয়ে যাবে সহস্রসম্ভবের দিকে; গোধূলি তো হয়েছে, উত্তিয়! তবু সেসব তোমার হল কই? দিনের আলোতে যে-মুখোশ ঢেকে রেখেছিল তোমার মুখশ্রী, রাত্রি হলে মুগ্ধতার চাম্পেয় দীপ্তি সেই মুখোশ সরিয়ে বেরিয়ে আসবে, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের অমোঘ অরুন্ধতী ঘুমজড়িমায় লুটিয়ে পড়বে আত্মপরভেদহীন বশিষ্ঠের উন্মুক্ত ক্রোড়শিলার উপর; রাত্রিও তো হয়েছে, উত্তিয়! তবু তোমার প্রতিজ্ঞা, তোমার দেওয়া কথা আজ কি অপমৃত? তা না হলে এই গুহাবাসের পশ্চাতে এই বসন্তবাতাসে আন্দোলিত মর্মরিত হিল্লোলিত বনভূমির ভিতর কেন তুমি ঘুরে বেড়াও উদ্ভ্রান্তের মতন?
সে এসব কথার উত্তর জানে না। সেই যে অর্জুন গাছের তলা থেকে তিন তরুণ যতিকে অনুসরণ করে সে এই নির্জন গুহায় উপনীত হয়েছিল, তারপর কতো মাস কেটে গেছে। রুক্ষ শীত পার হয়ে বসন্ত এসেছে পাহাড়ের সানুদেশে। সেই সন্ন্যাসীদের সে আর কখনও দেখেনি। এখানেই অন্যান্য সংগুপ্ত গুহায় তারা থাকেন, অনুমান করেছে। তাঁদেরই নির্দেশমতো নিজ গুহামুখে ভিক্ষার পাত্রটি সে রেখে দেয়, মধ্যাহ্ন অতিক্রান্ত হওয়ার আগে বেরিয়ে এসে দেখে প্রতিদিন, পাত্র পূর্ণ হয়ে গেছে। কিন্তু কখন তাঁরা আসেন, আহার্য দিয়ে কখন ভরে দিয়ে যান ভিক্ষাপাত্র, সে বুঝতে পারেনি। তাঁরা বলে গিয়েছিলেন, এই পাত্রের মতনই সময় যেদিন পূর্ণ হবে, সেই দিন ডাক আসবে। কিন্তু কতো দিন তো অতীত হয়ে গেল, তবু ডাক আসেনি জ্ঞানপ্রভ আরণ্যের দিক থেকে। সেই আচার্যই বা কোথায় থাকেন? এখানেই আছেন কি?
নির্জন গুহার ভিতর আর কোনো শব্দ নেই, কেবল গুহার সন্নিধি এক নির্ঝরের জলপতনের ‘চোল্ চোল্’ শব্দ। নিরবচ্ছিন্ন একতান হওয়ায় সেই শব্দ এই নৈঃশব্দ্যের সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে। একটি আরেকটির থেকে আলাদা করা যায় না। গুহাগাত্রে যে-মশাল জ্বলছে, তার অনির্বাণ বিভার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে তাকিয়ে উত্তিয় আবিষ্কার করে, আগুনেরও এক প্রকার শব্দ আছে। দহন নিতান্ত শব্দহীন নয়। লোকালয়ে থাকার সময় চারিপাশের শব্দসমুদ্রের ভিতর দহনের এই সূক্ষ্ম শব্দ টের পাওয়া যায় না। কেমন একপ্রকার ‘ভুগু ভুগু’ ধ্বনি ওঠে। কখনও দগ্ধ ইন্ধনের চকিত ‘বৌষট্’ শব্দ। কোনো কোনো চৈত্রদিনান্তে বহুদূরে আকাশের গায় পুঞ্জীভূত মেঘ হতে ‘কড়্ কড়্’ ধ্বনি বাতাস বয়ে নিয়ে আসে শ্রুতিমূলে। পাথরের ফাটল দিয়ে বাতাস প্রবেশ করার ‘সোঁ সোঁ’ ধ্বনি—যেন পাতালপ্রদেশের আদিমা নাগমাতার অবদমিত গর্জন। সেই শব্দ শুনতে গিয়ে আরেক প্রকারের শব্দ শুনতে পায় উত্তিয়। শরীরের ভিতরে ফুসফুস থেকে শ্বাসনালী বেয়ে নাসাপথে বায়ুস্রোত উন্মুক্ত হওয়ার শব্দ, পুনরায় নাসাপথ দিয়ে শ্বাসনালী বেয়ে ফুসফুস বায়ুপূরিত হওয়ার শব্দ। সে তখনই দুই হাতের তালু দিয়ে দুই কান চেপে ধরে; ভিতরে কী একপ্রকার ‘গন্ গন্’ ধ্বনি ওঠে—প্রাণবায়ু ও জঠরাগ্নির শব্দ সে টের পায়। একদিন তার মনে হচ্ছিল, মধ্যরাত্রে গুহাগাত্রে কে যেন একটা হাতুড়ি দিয়ে সমতালে ও সমচ্ছন্দে আঘাত করে চলেছে। শয্যা হতে উঠে এসে অনেক অনুসন্ধান করবার পর সে বুঝতে পারল, শব্দ বাইরে হচ্ছে না, শব্দ ভিতরে হচ্ছে—এই শব্দ আসলে তার নিজেরই হৃৎপিণ্ডের শব্দ। মানুষের ভিড়ের ভিতর আজন্ম ডুবে থেকে সে এই শব্দ এর আগে কখনও শোনেনি।
এসব শব্দ, ধ্বনি মানুষের ভাষা আবিষ্কৃত হওয়ার বহু পূর্বেকার প্রকৃতির আদিতম উচ্চারণ। এও কি ভাষা নয়? বাক্ নয় প্রকৃতির? মনে মনে ভাবে উত্তিয়, অন্ধকার কি শুধু বাইরেই আছে? চোখ বুজলে শরীরের ভিতরের অন্ধকার ‘দেখা’ যায়। মধ্যাহ্নে ভিক্ষাপাত্রটি নিয়ে আহারে বসে, একটি মাটির পাত্র ভরে ঝরনা থেকে জল নিয়ে আসে, মৃন্ময় পাত্রে জলপান করে। আহার্য গলা দিয়ে নামবার সময় সেই আহারের দলার আন্তর-স্পর্শ অনুভব করা যায়। জলপানের সময় জল গলা দিয়ে নামতে নামতে শীতস্পর্শের অনুভূতি দিয়ে যায়। আহারের পর উদ্গার ওঠে, তখন পাকস্থলীতে সদ্যোজীর্ণ আহার্যের রস ও গন্ধের অনুভব হয়। দৃশ্য, শব্দ, স্পর্শ, স্বাদ, ঘ্রাণ—এরা শুধু শরীরের বাহিরেই নেই, শরীরের ভিতরেও আছে। এবং তারা কিছু অননুভূত বিষয় নয়।
এই ভিতরের দিকে মনোযোগ দিতে দিতেই মনের ছবিগুলি উঠে আসতে থাকে। চিন্তা, কল্পনা, চিত্রকল্প, সংশয়, বিশ্বাস, কাম, প্রেম, ঘৃণা, রিরংসা, ক্রোধ, স্মৃতি, নিদ্রা। কতগুলো মুখ। চেনা মুখ। আধোচেনা মুখ। অচেনা মুখ। কাদের যেন কণ্ঠস্বর। কখনও চিহ্নন সম্ভব। কখনও বা চেনা যায় না। উত্তিয় বুঝতে পারে, সে অতীত নিয়ে ঘাঁটছে মনে মনে। অতীতকে ভুলে যেতে বলেছিলেন না তাকে যতি অনিরুদ্ধ?
চিন্তাগুলি আসছে, চিন্তাগুলি থাকছে, চিন্তাগুলি যাচ্ছে; কিন্তু আমি আসছি না, আমি যাচ্ছি না—আমি থাকছি। শব্দগুলি উঠছে, শব্দগুলি থাকছে, শব্দ মিলিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু আমি উঠছি না, আমি মিলাচ্ছি না—আমি থাকছি। স্পর্শগুলি ছুঁয়ে যাচ্ছে, স্পর্শগুলি ছুঁয়ে থাকছে, স্পর্শগুলি সরে যাচ্ছে; কিন্তু আমি ছুঁয়ে যাচ্ছি না, আমি সরে যাচ্ছি না—আমি থাকছি। দৃশ্যগুলি গড়ে উঠছে, দৃশ্যগুলি গড়া থাকছে, দৃশ্যগুলি ভেঙে পড়ছে; কিন্তু আমি গড়ে উঠছি না, আমি ভেঙে পড়ছি না—আমি থাকছি। এইভাবে ভাবতে ভাবতে উত্তিয় এক ‘অনন্ত থাকা’-র মধ্যে, এক ‘চিরকালীন বর্তমান’-এর মধ্যে কাঠ জেগে উঠতে লাগল। অতীত ভুলে গেল না সে, অতীতকে ডাকও দিল না, অতীতকে চলে যেতেও বলল না আর। মন নির্বাক গুহামন্দিরের মাটির প্রদীপের শিখার মতো একাকী, শান্ত আর নির্জন হয়ে এল।
ভোররাতে পাথরের বিছানায় ঘুম ভেঙে উঠত। আধো-অন্ধকারে কুয়াশা সরিয়ে ঝরনার হিমনীল ধারাস্রোতে স্নান সেরে নিত। গুহায় ফিরে স্থির হয়ে বসত পাথরের উপর। শব্দহীন শেষ রাত্রি। সে কোনো সাধন জানে না। তার কিছু প্রশ্ন আছে। শব্দ সম্পর্কে। ভাষা সম্পর্কে। শব্দকে সে শুধু লিখতেই চায় না, শব্দকে সে বুঝতেও চায়। কে বোঝাবে? যিনি বোঝাবেন, তিনি ডাকবেন কোনোদিন মন তৈরি হলে। আচ্ছা, উত্তিয়র মন তৈরি হয়েছে কিনা, তিনি কেমন করে জানবেন? কোথায়ই বা থাকেন তিনি? এই গুহাশ্রমে কোথায়? কেউ কি থাকে এখানে? ছয় মাস আগেকার সেই তিনজন যতি, যাঁরা তাঁকে এই গুহায় পৌঁছে দিয়ে গিয়েছিলেন, তাঁরা তার স্বপ্ন নয় তো? ভাষাকূপটি যেমন মিলিয়ে গিয়েছিল হঠাৎ, এই তিনজন সন্ন্যাসীও সেই দিনের পর তেমনই যেন মিলিয়ে গেছেন। তাহলে ভিক্ষাপাত্র ভরে দিয়ে যান কে বা কারা? এইসব প্রশ্ন আসলে উদ্বেগ। এরা আসছে, থাকছে, চলে যাচ্ছে; আমি আসছি না, যাচ্ছি না—আমি থাকছি।
দিনান্তবেলায় ছায়া ছায়া অপরাহ্ণের ভিতর উত্তিয় গুহার পেছনের দিকে যেত। এখানে ধাপে ধাপে পাহাড় কিছুদূর নেমে গেছে। কিছুদূর নামবার পর একটি বনভূমি। ঘাসপাতায় ঢাকা। আকাশস্পর্শী তরুশ্রেণীতে ঢাকা বনান্তস্থলী। সেসব গাছেদের নিচের দিকে কোনো শাখাবিস্তার নেই, অনাদি স্বয়ম্ভু শিবলিঙ্গের মতো তারা ঊর্ধ্বে উঠে গিয়ে যেন আকাশের গায়ে অজস্র শ্যাম পত্রসম্ভারে খচিত চন্দ্রাতপ মেলে ধরেছে। সেই তরুদের মধ্য দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একটি অতলস্পর্শী খাদ। উপর থেকে সেই খাদের নিম্নের দৃশ্যাবলী মেঘজড়িমায় ঢাকা।
সন্ধ্যা আসত; উত্তিয় গুহায় ফিরতে ফিরতে দেখত আকাশের গায়ে মেঘ জমেছে। দুরন্ত বাতাস মেঘের ভিতর দিয়ে যেতে যেতে উলটপালট করে দিচ্ছে মেঘের বিস্তার। এক মেঘ ছিন্ন হয়ে বহু হচ্ছে। খণ্ড খণ্ড হয়ে যাচ্ছে। অস্তরাগ মেখে আকাশের নীলিমার ভিতর বিলীন হয়ে গেল। মন বড় বিষণ্ণ হয়ে যেত উত্তিয়র। তারও জীবন কি এইরকম হবে? সময়ের হাত এসে এইভাবে অখণ্ড জীবনসারল্যকে খণ্ড খণ্ড করে নষ্ট করে দেবে? এইভাবে চেতনার জল থেকে মাতৃগর্ভে বারবার মন্দারপুষ্পের মতো ফুটে উঠে পৃথিবীর আলোবাতাসের ভিতর বেরিয়ে এসে বেড়ে উঠে, ভালোবেসে, ভেসে গিয়ে প্রমত্ত কালের বাতাসে ছিন্নভিন্ন হয়ে পুনরপি গতির উজানভাটায় দুলে দুলে ফিরে আসতে হবে কোনো সমর্থ পুরুষ ও ধারয়িত্রী নারীর ফলবান সঙ্গমের মুহূর্তে? গর্ভগুহার গাত্রে সদ্যোস্থাপিত ভ্রূণানুর অনিয়ত শরীরের ভিতর প্রবেশ করে মানুষের আশাকে, আকাঙ্ক্ষাকে, প্রণয়কে, প্রশ্নকে, স্বপ্নকে সার্থক, প্রাণময় করে তুলতে হবে তাকে এইভাবে বারবার? তবুও উত্তর পাবে না, শব্দপীড়িত মানুষের প্রশ্নের উত্তর নেই কোনো…
একদিন ফিরে আসতে আসতে একটি বিল্ববৃক্ষমূলে সহসা সে এক সন্ন্যাসীকে দেখতে পেল। এতদিন পর কোনো জীবিত মানুষের আকস্মিক আবির্ভাবে সে একেবারে চমকে উঠল। ভয় পেল সে, বিস্মিত হল, সমস্ত শরীর রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল তার। সে কেমন অনুভূতি, তা বোঝানোর ভাষা নেই। উত্তিয় দেখল, বৃক্ষতলে উপবিষ্ট সন্ন্যাসী প্রবীণ। কটিদেশে একটি গৈরিক কৌপীনখণ্ডমাত্র পরিধান। বক্ষ ও শিরোদেশের কেশগুচ্ছ, ভ্রুলতা এবং গুম্ফশ্মশ্রুভার পলিত হওয়াতে তিনি যে বয়স্ক, তা অনুমিত হয়, কিন্তু তা ছাড়া দেহে আর কোথাও বয়সের চিহ্নমাত্র নেই। কপালে একটি বলিরেখার কুঞ্চনও নেই। দেহচর্ম মসৃণ, শরীর বলিষ্ঠ অথচ মেদহীন। চক্ষুদ্বয় অর্ধনিমীলিত, বাইরের বস্তুনিচয় দেখছেন কি দেখছেন না বোঝা যায় না। অধরোষ্ঠে আধোস্ফুট হাস্যরেখা, যেন আপন আনন্দে আপনই বিভোর হয়ে আছেন। শেষবেলার আলো অহংকার ভুলে অরুন্ধতীর মতো তাঁর কোলে মূর্ছা গেছে।
উত্তিয় হতবাক হয়ে তাঁর সামনে দাঁড়িয়েছিল। কয়েক মুহূর্ত পর তিনি ঈষৎ স্পষ্টভাবে তার দিকে তাকালেন, কোনো শব্দ উচ্চারণ করলেন না, অথচ দৃষ্টি দিয়ে তিনি যেন উত্তিয়কে কাছে ডাকলেন। কাছে গিয়ে নতজানু হয়ে উত্তিয় সন্ন্যাসীকে প্রণাম করল। সন্ন্যাসী দক্ষিণ হস্ত উত্তোলন করে বললেন, ‘স্বস্তি!’
প্রাচীন মন্দিরের দূরাগত ঘণ্টাধ্বনির মতো তার সুমধুর ও সুগম্ভীর কণ্ঠস্বর। মুগ্ধ অথচ সপ্রশ্ন উত্তিয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, ‘আমি এক নামহীন অস্তিত্ব। আমাকে অন্যরা জ্ঞানপ্রভ আরণ্য নামে চিহ্নিত করেন।’
জ্ঞানপ্রভ আরণ্য! ইনিই তিনি। যাঁর জন্য এতকাল প্রতীক্ষা করে থাকা? এমন অতর্কিতে দেখা হল? তবে কি উত্তিয়র সময় হয়েছে?
সমস্ত বিস্ময়কে অতিক্রম করে উত্তিয় জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি এখানে কোথায় থাকেন, আচার্য? কোন্টি আপনার গুহাবাস?’
—আমি গুহাবাসী নই। আমি অরণ্যে অবস্থান করি।
—শীতে? গ্রীষ্মে?
—শীতে, আতপে, প্রাবৃটে সব সময়ই এই অরণ্যে। আমার কোনো অসুবিধা হয় না।
—আপনার শিষ্যবৃন্দ?
—আমার তো কোনো শিষ্য নেই। ত্রিভুবনে আমার কোনো শিষ্য নেই। অনুসারী নেই।
—তবে তাঁরা যে আপনাকে ‘আচার্যদেব’ বলে সম্বোধন করেন?
—সে তাদের অভিরুচি। তারা এখানেই থাকে।
—কোথায়?
জ্ঞানপ্রভ আঙুল তুলে দূরে নির্দেশ করে বললেন, ‘পাহাড়ের গায়ে ওইসব গুহায়।’
—তাঁদেরকে আমি এখানে আসার প্রথম দিন দেখেছিলাম। তারপর তাঁরা যেন শূন্যে ভোজবাজির মতো মিলিয়ে গেলেন!
—সেটাই এদের রীতি। এখানকার রীতি। প্রয়োজন না হলে, কেউ কারও দেখা পান না।
—আমার তাঁদের সকলের সঙ্গে প্রথম দিন দেখা হয়েছিল।
বৃদ্ধ একটু হাসলেন। তারপর বললেন, ‘সবার সঙ্গে? তা নয়। তিনজনের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। আমিই তাদের বলেছিলাম।’
—তবে কি ওই তিনজন যতি ছাড়াও আরও সন্ন্যাসীরা এখানে আছেন?
—হ্যাঁ। প্রায় এক সহস্র সংখ্যক সন্ন্যাসী এখানে থাকেন।ওই গুহাগুলিতে।
—সে কী! এতদিন আছি, তাঁদের উপস্থিতি তো আমার অণুমাত্র অনুভূত হয়নি।
—আমি এ প্রশ্নের উত্তর আগেই দিয়েছি। অনুভব হোক বা না হোক, তাঁরা ওই গুহাগুলিতেই অবস্থান করেন। সকলেই পালিয়ে এসেছে।
উত্তিয় বিস্ময়াহত হয়ে প্রশ্ন করল, ‘পালিয়ে এসেছেন! কেন?’
বৃদ্ধ কৌতুকপূর্ণ কণ্ঠস্বরে উত্তর দিলেন, ‘দাক্ষিণাত্য হতে আগত এক কিশোরবয়স্ক সন্ন্যাসীর ভয়ে। পূর্বাশ্রমে সেই কিশোর ছিলেন কেরলদেশের নাম্বুদ্রি ব্রাহ্মণ। সেখান থেকে এখানে আসেন। এই নর্মদাতীরেই তাঁর ব্রহ্মজ্ঞান হয়। গুরুর আদেশে বারাণসী গমন করেন। সেখানেই প্রচার করে চলেছেন।’
—তাঁকে ভয় কীসের?
—ভয় তাঁর প্রচারিত মতকে। তাঁর প্রচারণার পদ্ধতিকে। আর তাঁর তেজোময় ব্যক্তিত্বকে।
—সে কীদৃশ?
—তাঁর মতটি নবীন নয়; প্রাচীন। উপনিষদে ওই মত ছিল। পূর্ব পূর্ব যুগে কাশকৃৎস্ন, ঔড়ুলোমি প্রভৃতি প্রাচীন আচার্যগণ ওই মত প্রচার করতেন। তাঁদের রচনা হারিয়ে গেছে। এই কিশোরের গুরু গোবিন্দ এবং পরমগুরু গৌড় এই মত সীমিত সংখ্যক শিষ্যদের মধ্যে এখানেই প্রচার করেছিলেন। কিন্তু তাঁদের আদেশে এই কিশোরবয়স্ক সন্ন্যাসী এবার কাশীতে গিয়ে বসেছেন। তিনি সরাসরি প্রবচন দান করেন না। প্রতিপক্ষমতাবলম্বীদের বিতর্কে আহ্বান করেন। বিতর্কের প্রারম্ভে শর্ত রাখেন, তর্কের শেষে পরাজিত পক্ষকে বিজয়ী পক্ষের মত গ্রহণ করতে হবে, নতুবা এ ভৌমমণ্ডল ছেড়ে চলে যেতে হবে।
—তা তর্কের ফলাফল হয় কীরূপ?
—এখনও অবধি সেই কিশোর কোথাও পরাস্ত হননি। অগণিতবার অগণিত বিরুদ্ধবাদীদের সঙ্গে তর্কসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। তাঁর মতকে তিনি ‘অদ্বৈত বেদান্ত’ আখ্যায় আখ্যায়িত করে থাকেন।
—অগণিত বিরুদ্ধবাদী!
—হ্যাঁ, অগণিত। বৌদ্ধ, তার্কিক, মীমাংসক, চার্বাক, জৈন, দ্বৈতবাদী উপাসক সম্প্রদায়, কে নয়? তারপর এই নর্মদাতীরের গুহাবাসী সাংখ্যযোগী সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসীরা—এরাও তাঁর বিরুদ্ধবাদী। এদের সঙ্গে বহুবার তাঁর বিতর্কবিচার হয়েছে। বারবার সেই দ্রবিড়পুত্র কিশোর যতি শঙ্করের হাতে পরাস্ত হয়ে শেষে এরা লোকালয় পরিত্যাগ করে আত্মগোপনেচ্ছু মূষিকের মতো এখন এই গিরিগুহায় লুকিয়ে আছে। যঃ পলায়তি, সঃ জীবতি। হা হা হা!
সন্ন্যাসী বালকের ন্যায় হাসতে লাগলেন। উত্তিয় জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি হাসছেন, স্বামিন! আমার খুব জানতে ইচ্ছা হচ্ছে, আপনি কোন্ সম্প্রদায়ের?’
সন্ন্যাসী সহসা শান্ত হয়ে বললেন, ‘আমার তো কোনো সম্প্রদায় নেই। কোনো সাধন নেই। সিদ্ধি নেই। আমার বন্ধন নেই, তাই মুক্তিও নেই।’
এই পর্যন্ত বলেই অপূর্ব সুরময় কণ্ঠে তিনি গেয়ে উঠলেন—
‘অদ্বৈতং কেচিদিচ্ছন্তি দ্বৈতমিচ্ছন্তি চাপরে।
সমং তত্ত্বং ন বিন্দন্তি দ্বৈতাদ্বৈতবিবর্জিতম্।।
কেউ অদ্বৈত চায়, কেউ দ্বৈত চায়। তারা উভয়েই প্রকৃত তত্ত্ব জানে না। প্রকৃত তত্ত্ব দ্বৈত-অদ্বৈত-বিবর্জিত।…তা তো হল, কিন্তু শ্রেষ্ঠী স্যমন্তকের পুত্র উত্তিয়! তুমি কী চাও?’
—আপনি আমার নাম, আমার পিতার নাম জানলেন কী প্রকারে?
—মেধা-মা তোমাকে এখানে পাঠিয়েছে, আর আমি তোমার পরিচয় জানব না? কী প্রকারে জানলাম, তা এখানে অবান্তর প্রশ্ন। শুনেছিলাম, তোমার কতিপয় জিজ্ঞাসা আছে।
উত্তিয় মহা উৎসাহের সঙ্গে বলল, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, সেই প্রশ্নগুলির মীমাংসার জন্যই আমি এখানে এসেছি। যদি উত্তর পাই। জানি না, উত্তর পাব কি না। সেই তিনজন সন্ন্যাসী আমাকে বলেছিলেন, প্রশ্ন করার আগে আমার মানসিক প্রস্তুতির প্রয়োজন। আগে মন শান্ত হওয়া দরকার। জানি না, আমার মন প্রস্তুত হয়েছে কি না…’
—প্রস্তুত না হলে তোমার সঙ্গে আমার দেখা হবে কেন? আমিই ওই তিন যতিকে বলেছিলাম, কিছুদিন নির্জনবাস করে তুমি যেন তোমার মনকে শান্ত সমাহিত করো। এখন তোমার মন বহুদূর পর্যন্ত নির্জিত হয়েছে, এখন আমি তোমাকে আমার প্রশ্নগুলি করতে পারি। তুমি ছাড়া আমার প্রশ্নের উত্তর কে দেবে আর?
—আপনি আমাকে প্রশ্ন করবেন? সে কী! আমিই তো এসেছি জিজ্ঞাসু হয়ে, আপনার সমক্ষে আমার প্রশ্নগুলি উত্থাপন করবার জন্য, তাদের মীমাংসার জন্য!
—তা ঠিক। তবে কি জানো, আমারও কতগুলি প্রশ্ন আছে, যেগুলোর সমাধান আমি করতে পারছি না। তোমার প্রশ্ন আমি পরে শুনব। তার আগে তুমি যদি আমার প্রশ্নসমূহের যথাযথ সমাধানের চেষ্টা করো…
উত্তিয় শুষ্ক কণ্ঠে উচ্চারণ করল, ‘কী প্রশ্ন?’
জ্ঞানপ্রভ আরণ্য ধীরে ধীরে বললেন, ‘যে যা ভাবে, শব্দ দিয়ে তা কি সম্পূর্ণ অনুবাদ করা যায়? যদি না যায়, তবে কেন যায় না? কীভাবে সত্য সত্যই একজন মানুষ তার ভাবকে, চিন্তাকে অন্য মানুষের কাছে সম্পূর্ণত পৌঁছে দিতে পারে? শব্দপীড়িত কবির জীবনসমস্যার সমাধান কী? শব্দ আর চিন্তা—এদের মধ্যে প্রথমটি কি দ্বিতীয়টির বাহক, নাকি তারা পরস্পর অভেদ? এইগুলিই আমার প্রশ্ন।’
বিস্ময়বিমূঢ় উত্তিয় নিজের অজান্তেই উচ্চৈঃস্বরে বলে উঠল, ‘এ কী! এগুলি তো আমারই প্রশ্ন!’
জ্ঞানপ্রভ মৃদু হেসে বললেন, ‘আমারও।’
বৃক্ষতলে অখণ্ড নীরবতা বিরাজ করছে। অবশেষে সেই নৈঃশব্দ্য ভেঙে নিতান্ত খিন্ন পরিতাপে হতাশ কণ্ঠস্বরে উত্তিয় বলল, ‘তাহলে এসব সমস্যার সমাধান আপনার কাছে নেই? বৃথাই আমার এখানে আসা হল।’
জ্ঞানপ্রভ বললেন, ‘না, এখানে নেই।’
—এখানে মানে?
—এখানে মানে এখানে। মনের যে-ভূমিতে তোমার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে, মনের এই ভূমিতে এই প্রশ্নগুলির, এই সমস্যাগুলির সমাধান সম্ভব হয় না। কিন্তু সেখানে সমাধান হয়।
—সেখানে…?
—এই মনের পেছনে আরেকটি মন আছে। উজ্জ্বল প্রভায় আলোকিত এক মন। তুমি যদি সেখানে যেতে পারো, এদের উত্তর পাবে। আমিও সেখানে গিয়েই পেয়েছি।
—তবে আপনি সেই উত্তরগুলি আমাকে বলছেন না কেন?
—কারণ, সেখানকার কথা এখানকার ভাষায় বলা যায় না বলে।
—আমি কি সেখানে যেতে পারব?
—তুমি তো সেখানেই আছ।
—আমি তো বুঝতে পারছি না।
—বেশ। তবে বুঝবার প্রযত্ন করো। তবে কী জানো? নৃত্যপটিয়সী নারী তোমাকে তার নৃত্যের কলানৈপুণ্য দেখাচ্ছে। আরও দেখাবে। নানা বিভঙ্গে। সকল আভরণ খুলে, সকল আবরণ খুলে ফেলে। যখনই সে জানবে, তুমি তাকে সম্পূর্ণ দেখে ফেলেছ— সে বড় লাজুক, সে বড় সুকুমারী—যে মুহূর্তে জানবে তোমার দেখা শেষ হয়ে গেছে, সেই মুহূর্তেই সে চলে যাবে তোমাকে ছেড়ে। তখন তোমার আর কোনো প্রশ্নই থাকবে না। তুমি বুঝতে পারবে, তুমি অসঙ্গ, উদাসীন।
—এই নারী কে? কার কথা বলছেন?
যেন কোন্ সুদূর থেকে শব্দগুলি উচ্চারিত হল, ‘তার অনেক নাম। কখনও তার নাম আত্রেয়ী, কখনও অনঙ্গসেনা, কখনও তর্তরিকা, কখনও মেধাকথলিকা। কখনও বা তার নাম পরাপ্রকৃতি, কখনও মায়া, কখনও চিৎশক্তি। কখনও বা সে এই অনামা বনভূমি। কখনও বা সে ওই দূরের সন্ধ্যাকাশ। কখনও জীবন, কখনও মৃত্যু। ওঠো উত্তিয়, তাকে জানো, ওঠো! অনেক দূর যেতে হবে।’
—————————–
কবিতাঋণঃ ‘একটি কথার মৃত্যুবার্ষিকীতে’/ যৌবন বাউল / অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত
আত্রেয়ী-খণ্ড
একাদশ অনুবাক
অপরাহ্ণকাল। চিন্ময়ীর জলে সন্ধ্যাস্নান সেরে উদাসী সূর্যদেব তটোপরি তাঁর গৈরিক উত্তরীয় ফেলে রেখে ধীরে ধীরে অস্তাচলে প্রস্থিত হচ্ছেন। নদীতীরে মৌনবাক এক আমক-শ্মশান। মৃতদেহ এখানে দাহ করা হয় না— সৎকারের ব্যয়ভারে অসমর্থ হতভাগ্য মনুষ্যকুল এমন আমক-শ্মশানে মৃতদেহ দাহ না করে ফেলে চলে যায়। শ্মশানের চারিপাশে প্রকৃতির স্বেচ্ছাচারে প্রবর্ধিত বনভূমি হতে বিনির্গত নরমাংসলোলুপ শৃগাল এবং শূন্যগর্ভ ঊর্ধ্বাকাশ হতে অবতরিত শকুন পরিত্যক্ত শবদেহে ক্ষুণ্ণিবৃত্তি করে। মৃতসৎকারের সামর্থ্য যাদের আছে, তারা এই শ্মশান থেকে সামান্য দূরে অন্য একটি শ্মশানে ভিড় করে। মৃত্যুকে উদ্যাপন করার বিলাসিতা ও কৌলীন্য সেসব শ্মশানে রয়েছে, এ আমক-শ্মশান কিন্তু সর্বরিক্ত, সর্বত্যাগী, শূন্যদৃষ্টি, জটাপিঙ্গল মহাদেবেরই অনুচ্চারিত মহিমা।
যদিও স্থানটি মোটের উপর তৃণাচ্ছাদিত, তথাপি মধ্যে মধ্যে অপ্রশস্ত ভূমি তৃণাবরণহীন—শুভ্র বালুকাকঙ্করময়। মাটির উপর পায়ের চাপে মড়মড় করে ভাঙে অর্ধক্ষয়িত করোটি, অস্থি, পঞ্জর; বহুদিন জলে কাদায় পড়ে থেকে থেকে মানুষের অহংকৃত হাড়ও একদিন নরম হয়ে আসে। ঘাসজলপাতার সঙ্গে মিশে যায় মৃত মানুষের অর্ধভুক্ত দেহাবশেষ। সেসব রক্তমাংসের সারাৎসার আত্তীকৃত করে চিন্ময়ী নদীর তীরে শ্মশানের ঘাসগুলি সতেজ, গভীর শ্যাম হয়ে উঠতে থাকে।
তারপর মেঘমাসে বৃষ্টি আসে, ঘাসের ভিতর দিয়ে সর্পিল জলধারা হতভাগ্য মৃতদের অন্তিম চিহ্নগুলিকে ভাসিয়ে নিয়ে চিন্ময়ীর বুকে সঁপে দেয়। নদীর উদাসীন স্রোত সেইসব অস্থিরাশি বহন করে যে কোথায় রেখে আসে, তা কে বলতে পারে!
শ্মশানের পরিধিতে দণ্ডায়মান বৃক্ষগুলির অন্তরালে একটি ক্ষুদ্রাকার সিন্দুরারুণ মন্দির। মন্দিরে যিনি পূজিতা হন, সাধারণের চক্ষে তিনি ভয়ংকরী—লোলজিহ্ব, করালবদনা। দেবী নগ্নিকা, আঘূর্ণিত চক্ষু, ভীষণোজ্জ্বলা। চতুর্ভুজা—বামহস্তদ্বয়ে নৃমুণ্ড ও খর্পর, দক্ষিণকরদ্বয়ে বর ও অভয়, পদতলে শিব শয়ান। তবে এমন ভয়ংকরীও যাঁর চক্ষে প্রেমময়ী জননী, তিনি নিশ্চয়ই অনন্যসাধারণ অকুতোভয় তান্ত্রিক। মন্দির হতে সামান্য দূরে কয়েকটি রক্তমৃত্তিকায় নির্মিত কুটির—সেখানেই সেই তান্ত্রিকের অবস্থান।
আজ সমস্ত দিন সূর্যের দীর্ঘনিঃশ্বাসের মতন উত্তপ্ত বায়ু শ্মশানের উপর দিয়ে বহে চলেছে, এখন দিনান্তে তার স্পর্শ সামান্য অনুষ্ণ হয়েছে। বনঝোপের ভিতর দিয়ে সেই বাতাস চলে যাচ্ছে দূরে, অতিদূরে। বাতাস এলোমেলো করে দিচ্ছে বনঝোপ। পত্রপুষ্পের সেই আলোড়নের ভিতর দিয়ে চকিতে দেখা যায় নদীতীরে কে এক রমণী একাকিনী চিন্ময়ীর স্রোতের দিকে মুখ করে শূন্যদৃষ্টি মেলে বসে আছে। বিকেলের বাতাসে তার উন্মুক্ত কেশপাশ উড়ছে।
রমণীর পরনে রক্তবাস, শিরোদেশ উন্মুক্ত। কেশকলাপ অগ্রন্থিত, আলুলায়িত। দেহে যৌবনের প্রাচুর্যসম্ভার, অথচ সেই যৌবন পূজাশেষের পরিত্যক্ত পুষ্পার্ঘ্যের মতন অবহেলিত। নারী শুভ্রাও নয়, ঘোরাও নয়, উজ্জ্বল ধাতুবর্ণ। মুখশ্রী বালিকার ন্যায়; দুই চক্ষু আয়ত অশ্রুভারাতুর। বামকপাল সামান্য উন্নত। ভ্রু দীর্ঘপক্ষ্মযুক্ত, অথচ মদনবাণক্ষেপণে সমুদ্গ্রীব নয়। নাসা ললিত, নাসাপুটপার্শ্বে দুটি সুগভীর রেখা ও সৃক্কণী অতি স্পষ্ট। ওষ্ঠ-অধর স্ফুরিত ও সামান্য উন্মুক্ত—দন্তের শুভ্র ঊর্ধ্বপংক্তি ঈষৎ দৃশ্যমান। সমস্ত মুখাবয়বে বালিকার সারল্যের সঙ্গে এক প্রগাঢ় নির্জনতা, মায়া ও বিষণ্ণতা মিশ্রিত। দৃঢ়পিনদ্ধ বর্তুলাকার স্তনমণ্ডল, সুগঠিত কটি ও সুবিপুল শ্রোণিদেশ আভাসিত। দেহ লাবণ্যদীপিত বটে, কিন্তু কোমলকান্ত নয়। হস্তপদ কমনীয় বলা যায় না—বরং তারা কর্মঠ ও দৃঢ়তাব্যঞ্জক। নারী মনোরমা, অথচ সম্পূর্ণ আভরণহীনা। যেন কোনো অলংকারই এ স্বাধীন দেহবল্লরীর উপযুক্ত হয়নি।
যদি চোখে চোখ রাখি, যদি জিজ্ঞাসা করি, ‘রমণী, তুমি কে?’—উত্তর পাবো না। শুধু অশ্রুভারে নয়নসরিৎ পূর্ণ হয়ে যাবে। যদি তার মাথায় হাত রেখে স্নেহভরে বলি, ‘কন্যা, তুমি এখানে কোথা থেকে এলে?’—উত্তর পাবো না। শুধু স্ফুরিত ওষ্ঠাধর প্রগাঢ় অভিমানে কম্পিত হবে। যদি করতলে আনত চিবুক তুলে ধরি, করাঙ্গুলি দিয়ে সেই অশ্রুপ্লাবিত মুখখানি মার্জনা করি, তখন, কেবল তখনই তাকে আমি চিনতে পারব।
সে আত্রেয়ী। স্যমন্তক শ্রেষ্ঠীর পুত্র উত্তিয়র বান্ধবী, উত্তিয়র প্রেমিকা আত্রেয়ী!
হা কন্যা! ধূসর অতীতের ধুলা সরিয়ে মধ্য ভারতের কোনো এক অধুনাবিস্মৃত রাজ্যের শ্রেষ্ঠীগৃহে তোমাকে যে আমি শেষ দেখেছিলাম। প্রাসাদের সেই প্রায়ান্ধকার কক্ষে তুমি কথা বলছিলে। সেখানেই আমি যে তোমাকে রেখে এসেছিলাম। সেই ঐশ্বর্যপ্রচুর প্রাসাদ—সেখান থেকে এই ভয়ংকর আমক-শ্মশানে তুমি এলে কীভাবে বলো তো? কাঁদছ কেন, আত্রেয়ী? আমাকে বলবে না, মা, তোমার বিড়ম্বিত জীবনের ইতিহাস?
দুর্ভাগা লেখকের মন থেকে যে বেরিয়েছে, সেই চরিত্রও দুর্ভাগাই তো হবে। তবু সেই জীবনের ঝটিকাবিক্ষুব্ধ মুহূর্তমালার একটি বর্ণিতব্য পরম্পরা তো আছেই।
কিন্তু তার জন্য আমাদের দশ বৎসর পূর্বের কোনো সময়খণ্ডে ফিরে যেতে হবে।
উত্তিয় যে-রাত্রে গৃহত্যাগ করে চলে যায়, তার পরদিন প্রভাতে আত্রেয়ী শ্রেষ্ঠীগৃহের এক ভৃত্যমুখাৎ এই দুঃসংবাদ পেয়েছিল। সে বুঝতে পারে না, সে কী করবে। সত্বর সে শ্রেষ্ঠীপ্রাসাদে আসে। স্যমন্তক শ্রেষ্ঠী দীর্ঘকাল বাণিজ্যব্যপদেশে বহির্গত। প্রাসাদ ও উত্তিয়র দায়িত্বভার স্যমন্তক আত্রেয়ীর হস্তেই সমর্পণ করে গিয়েছিলেন। আত্রেয়ীর পিতা শ্রেষ্ঠী মীনকেতু শ্রেষ্ঠী স্যমন্তকের বয়স্য, উত্তিয় ও আত্রেয়ী আবাল্য একই সঙ্গে খেলা করে বড়ো হয়ে উঠেছে। তাদের উভয়ের প্রণয়সম্পর্কও শ্রেষ্ঠীদ্বয়ের অগোচর ছিল না। উভয় বয়স্য আলোচনাক্রমে স্থির করেছিলেন, উত্তিয়-আত্রেয়ী বয়ঃপ্রাপ্ত হোক; তখন দুজনের চারহাত এক করে দিয়ে স্যমন্তক ও মীনকেতু দুই বন্ধু বৈবাহিক সম্বন্ধে আবদ্ধ হবেন। স্যমন্তক শ্রেষ্ঠীর গৃহে আত্রেয়ীর অবাধ গতাগতি। এখন এই উত্তিয়বিহীন প্রাসাদের অলিন্দে হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে আত্রেয়ী ভাবছিল, উত্তিয় কোথায় গেল?
ধীরে ধীরে অলিন্দ বেয়ে হেঁটে সে উত্তিয়র কক্ষের সামনে এসে দাঁড়াল। কক্ষের কবাট উন্মুক্ত। আত্রেয়ী অভ্যন্তরে প্রবেশ করল। স্তিমিত দীপশিখায় দেখা যায়, শয্যা এলোমেলো হয়ে আছে। ঘরের এককোণে একটি কাষ্ঠপেটিকা, পেটিকাটির উপর একটি স্থালিকায় অর্ধভুক্ত আহার্য ও তাম্রনির্মিত একটি পানপাত্রে অর্ধপীত পানীয়। ঘরের অন্যদিকে উৎপীঠিকার উপর ছিন্নভিন্ন তুলট কাগজের স্তূপ ও হলুদ হয়ে আসা একটি ছিন্নসূত্র যূথীমালিকা। এই কক্ষে এখনও এক বিশেষ ঘ্রাণ যেন স্তম্ভিত হয়ে আছে। এই ঘ্রাণ আত্রেয়ী আবাল্য চেনে। উত্তিয়র ঘ্রাণ।
প্রদীপটি ফুৎকারে নিভিয়ে দিয়ে আত্রেয়ী কক্ষের পশ্চিমদিকের বাতায়নদুটি খুলে দিল। অবারিত রৌদ্রালোক ও অনাবিল বায়ু কক্ষে প্রবেশ করছে। সেই আলোতে আত্রেয়ী পুনর্বার কক্ষের ভিতরে চেয়ে চেয়ে দেখছিল। দেখতে দেখতে ক্রোধে আত্রেয়ীর শিরোদেশের শোনিতবহাসমূহ কাঁপতে লাগল। ওষ্ঠাধর স্ফুরিত ও মুখমণ্ডল আরক্ত হয়ে উঠল।
মাত্র তিনদিন আগে সে এই ঘরে এসেছিল। উত্তিয়র উদ্ভ্রান্ত মানসিক অবস্থা দেখে তখনই সে শঙ্কিত হয়েছিল। বারবার করে বলে গিয়েছিল, উত্তিয় যেন আত্রেয়ীকে না বলে কোথাও না যায়। কিন্তু উত্তিয় তার কথা শুনল না। একটা কথাও বলে গেল না তাকে। কক্ষের মধ্যে অনেক খুঁজেও আত্রেয়ী উত্তিয়র কোনো বিদায়ী পত্র পেল না। গেলই বা কোথায়? কোথায় আর যাবে? নিশ্চয়ই অন্বেষণ করলে তার সন্ধান পাওয়া যাবে। এখনই গৃহে ফিরে পিতাকে সেই কথা বলতে হবে। নিশ্চয়ই। একলা ঘরে আত্রেয়ী আনমনা স্বরে বলে উঠল ‘নিশ্চয়ই’।
শুধু বাতায়নপথে একটা ছন্ন বাতাস ঘরের ভিতর ঢুকে পড়ে সহসা দীর্ঘশ্বাসের মতো তুলট কাগজের স্তূপ এলোমেলো করে দিয়ে চলে গেল।
কিন্তু যত নিশ্চয় সে ভেবেছিল, দেখা গেল তত নিশ্চয় নয়। সব শুনে পিতা মীনকেতু কিছুক্ষণ নীরব হয়ে রইলেন। তারপর উত্তিয়র অন্বেষণে চতুর্দিকে লোক পাঠাতে লাগলেন। মীনকেতু শ্রেষ্ঠী, সমাজে তাঁর প্রভাব-প্রতিপত্তি যথেষ্ট। কাজেই লোকাভাব হল না। কিন্তু প্রতিবারই প্রেরিত দূত ভগ্নমনোরথ হয়ে ফিরে এল। নাহ্, উত্তিয়র কোনো সংবাদ পায়নি।
একদিন দ্বিপ্রহরবেলায় নটী অনঙ্গসেনা আহারাদি সমাপ্ত করে বিশ্রামের আয়োজন করছিলেন। কোমল উপাধানে মাথা রেখে পর্যঙ্কে অর্ধশায়িত অবস্থায় একটি সরতা জাঁতিতে গুবাকখণ্ড সরু সরু করে কাটছিলেন। মাথার কাছে একটি ময়ূরাকৃতি তাম্রময় তাম্বুলসম্পূট, কর্তিত গুবাক সেই সম্পূটে রাখছেন। আবাল্য এই তাম্বুলের নেশা; যদিও প্রাসাদে তাম্বুলকরঙ্কবাহিনী আছে, তারা সাচী-মিঠা-কর্পূরী সর্বপ্রকার তাম্বুলরচনাতেই দক্ষা, তথাপি অন্যের সাজা পানে নটীর চিত্তপ্রসাদ হয় না। সম্পূট হতে একটি সুন্দর পানপাতা বেছে নিয়ে তাতে ঝিনুকচূর্ণে প্রস্তুত চুণক, গুবাকখণ্ড, জনকপুরী খদিরা ও কর্পূর দিয়ে তিনি পানের তবক রচনা করলেন। পানের খিলির অগ্রভাগ সুতীক্ষ্ণ দন্তের একদিক দিয়ে কেটে কর্তিতাংশ ফেলে দিলেন। পানের খিলির অগ্রভাগ কেটে খেলে নাকি পাপস্খালন হয়—কথাটা ভেবে অনঙ্গসেনা নিজের মনেই হেসে ফেললেন। নটীর আবার পাপস্খালন! কীই বা পাপ, কীই বা পুণ্য! তাম্বুল মুখে নিয়ে এইসব অলস অসংবদ্ধ চিন্তায় ডুবে আছেন, এমন সময় এক প্রতিহারী তাঁর সম্মুখে উপস্থিত হল। দক্ষিণ করপল্লবের উল্টোদিক দিয়ে ওষ্ঠপ্রান্তে লেগে থাকা তাম্বুলরস মুছে ফেলে, বাম হস্তে জাঁতিটি সম্মুখস্থ তাম্বুলসম্পূটের ভিতরে ফেলে দিয়ে ভ্রুপল্লব উত্থিত করে অনঙ্গসেনা জিজ্ঞাসার ভঙ্গি করলেন। প্রতিহারী জানাল, জনৈক নারী তাঁর দর্শনপ্রার্থিনী। অনঙ্গসেনা সামান্য তন্দ্রাজড়িত স্বরে বললেন, ‘কী নাম বলেছে রে?’
প্রতিহারী অনঙ্গসেনার হস্তে একটি তুলট কাগজের খণ্ড সমর্পণ করল। অনঙ্গসেনা বিস্মিত দৃষ্টিতে দেখলেন তাতে লেখা আছে: ‘শব্দ আর সুর যার ঘর ভেঙেছে, তেমনই একজন আরও সর্বনাশের অপেক্ষায় দুয়ারে দণ্ডায়মান।’
অনঙ্গসেনা অপেক্ষারতা নারীকে ভিতরে আনতে বললেন। কিছুক্ষণ পর কবাট ঠেলে কৃষ্ণ বস্ত্রে আপাদমস্তক আবৃত এক নারী প্রবেশ করল।
অনঙ্গসেনা বললেন, ‘আবৃত-অবয়ব ব্যক্তির সঙ্গে আমি আলাপ করি না। নটীগৃহে আসতে যখন এত সামাজিক ভয়, তখন এমন স্থানে না আসাই ভালো।’
মুখ ও মস্তকের আচ্ছাদন সরিয়ে দৃপ্তা ফণিনীর মতো এক যুবতী মাথা তুলে বলল, ‘অনাবৃত হওয়াই যার শিল্পকলার একমাত্র আঙ্গিক, সেই অলজ্জ নর্তকী আর আবরণের ব্যঞ্জনা বুঝবে কীভাবে?’
অনঙ্গসেনা দেখলেন, মেয়েটি সুন্দরী। তদুপরি তেজস্বিনী। এই সব মেয়েদের ভিতর এক ধরণের কাঁচা আগুন থাকে। এখনও জীবন দেখেনি। তালীপত্রের আগুন, ক্ষণপরেই নিভে যাবে। আগন্তুক যুবতীর এই গর্বিত উচ্চারণ অনঙ্গসেনা উপভোগ করতে লাগলেন। এ কোথাও একটা ঘা খেয়েছে। তিনি নিজেই কি যুবতীর প্রাণপুত্তলিকা অপহরণ করেছেন? হবেও বা!
অনঙ্গসেনা বিদ্রূপের সুরে বললেন, ‘এত আবরণ দিয়েও যে-সুন্দরী নিজের প্রেমিককে ধরে রাখতে পারে না, অতি সহজে একটি কটাক্ষমাত্রেই যার প্রেমিক বারাঙ্গনার বশীভূত হয়ে যায়, তার শিল্পকলা যে খুবই দুর্বল, তাতে আর সন্দেহ কী? কামকলা-অনভিজ্ঞা বালিকা, কী নাম তোমার?’
আহত ও সামান্য অপ্রতিভ হয়ে যুবতী বলল, ‘আমি আত্রেয়ী।’
আত্রেয়ী। আত্রেয়ী? আত্রেয়ী! হঠাৎ কয়েক রজনী-পূর্বে এক যুবকের কথা মনে এল অনঙ্গসেনার। তিনি আত্মগত স্বরে বললেন, ‘একজন যুবক এসেছিল বটে কয়েক রাত্রি পূর্বে। কী যেন নাম তার…তারই মুখে তোমার নাম আমি শুনেছি। মনে পড়ছে।’
—সেই যুবক উত্তিয়। শ্রেষ্ঠী স্যমন্তকের পুত্র। গতকাল হতে নিরুদ্দিষ্ট।
‘নিরুদ্দিষ্ট? সে কী!’ উত্তেজনা গোপন করতে না পেরে অনঙ্গসেনা এবার শয্যার উপর ত্বরিতে উঠে বসলেন। তারপর তাঁর ব্যথিত নীল চোখ দুটি তুলে বললেন, ‘উত্তিয়…চলে গেছে?’
আত্রেয়ীর মনে হল, এই নারী হয়ত উত্তিয়র সংবাদ রাখলেও রাখতে পারেন। সুতরাং সতর্ক হয়ে কথা বলতে হবে। রুষ্ট হলে চলবে না। আবার অধিক আগ্রহ দেখালেও কার্যসিদ্ধি হবে না। এই রমণী গোপনতাপ্রিয় হওয়াই স্বাভাবিক। এতক্ষণ কীভাবে উত্তেজনা গোপন করে আছেন, কিছুই বুঝতে দেননি!
আত্রেয়ী স্তিমিত স্বরে বলল, ‘সে কোথায় গেছে, আপনি কি তা জানেন?’
অনঙ্গসেনা অসহায়ের মতো ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বললেন, ‘না।’
আত্রেয়ী নটীর মুখ গভীর অভিনিবেশে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। বিকচনলিনীর ন্যায় মুখশ্রী, চোখের নীচে রাত্রিজাগরণের কালিমা পড়ে সে মুখকে যেন আরও অপরূপ করেছে। এ মুহূর্তে এক সম্ভ্রান্ত বিষাদের ছায়া এসে কারুণ্য ঘনিয়ে তুলেছে দুই চোখে। চোখদুটি জলে ভরে আসছে। দেখতে দেখতে আত্রেয়ীর নয়নও অশ্রুপরিপ্লুত হল।
ইনি কিছু গোপন করছেন না, উত্তিয় কোথায় গেছে সত্যিই ইনি জানেন না। আত্রেয়ী নিশ্চিত হল। আর সেই নিশ্চিততা তার অন্তরের আশাদীপের শেষ শিখাটিকেও নিভিয়ে দিয়ে চলে গেল।
‘সে এখানে আসত কেন?’ আত্রেয়ী জিজ্ঞাসা করল।
—সম্ভবত কবিতা আর গানের খোঁজে। আমার সঙ্গে কখনও তেমন পরিচয় হয়নি। কতোজনই তো আসে। বসে থাকে, চলে যায়। সেও তেমনই আসত। শুধু একদিন কথা হল। একান্তে।…তুমি দাঁড়িয়ে আছ কেন?
কাষ্ঠাসনের উপর বসে আত্রেয়ী দ্বিধাকম্পিত উদ্বিগ্ন স্বরে বলল, ‘কী কথা? প্রণয়সংবাদ?’
বিষণ্ণ হেসে অনঙ্গসেনা বললেন, ‘নাহ্। সে তার মনের কথা বলেছিল। মানসিক যন্ত্রণার কথা।’
—আশ্চর্য! আমাকে কোনোদিন বলেনি তো!
—অভিমানিনী! অভিমানের সময় এ নয়। তোমাকেও বলতে চেয়েছিল। কিন্তু সে বোঝাতে পারত না তার মনের ভাব। তার মনে হত, শব্দ বড়ো দুর্বল। যা সে ভাবছে, তা সে লিখতে পারছে না। তোমাকে বলতে পারছে না। তাই তার অভিমান হয়েছিল খুব।
—অভিমান? আমার উপর?
—তোমার উপর নয়। শব্দের উপর। শব্দপীড়িত সে। আমি তাকে বলেছিলাম, শব্দ আর ভাব আলাদা নয়। একাত্ম। অর্ধনারীশ্বর। সে বুঝতে পারেনি। কিন্তু বুঝতে চেয়েছিল। নিষ্পত্তি করতে চেয়েছিল তার প্রশ্নের। হয়ত এই প্রশ্নই তাকে ঘরছাড়া করেছে।
অনঙ্গসেনা থামলেন। কক্ষের ভিতর অস্বস্তিকর নীরবতা। সেই নীরবতা ভেঙে আত্রেয়ী অত্বরিত স্বরে বলল, ‘আমাকে বোঝাতে পারল না উত্তিয়? কেন? তাই চলে গেল?’
অনঙ্গসেনা তখনই এ প্রশ্নের উত্তর দিলেন না। কিছুক্ষণ পর থেমে থেমে বললেন, ‘আসলে কী জানো, আত্রেয়ী? পুরুষ ও নারীর ভিতর ভাবের সেতু নির্মাণ বোধহয় অসম্ভব। পুরুষ কল্পনাপ্রিয়। কল্পলোকেই তার বসবাস। আর আমরা নারীরা বাস্তববাদী। প্রতিনিয়ত বাস্তব কর্মে ব্যাপৃত। চিন্তা আর কর্মের ভিতর সেতুরচনা কি সম্ভব? বিশেষত, পুরুষের যেসব চিন্তা বিমূর্ত, কখনও বা অতিশয় আকাশকুসুমচয়ী, তার সঙ্গে আমাদের নারীদের প্রতিদিনের কঠোর কর্তব্য ও দায়বোধের মিল কি হতে পারে?’
কথাটা শুনে আত্রেয়ী কিছু বলল না। চুপচাপ বসে রইল। তারপর কী জানি ভেবে বলল, ‘কিন্তু এমন যদি হয়, অনেক অনেক দিন আগে, বহু বহু যুগ আগে পুরুষই নারীকে শিখিয়েছিল কঠোর বাস্তববাদী হতে? কর্মপ্রিয় হতে?’
—কতো যুগ আগে?
—হয়ত বহু বহু যুগ আগে। তখনও হয়ত সভ্যতার বিকাশ হয়নি। সূর্য ওঠারও আগে শেষরাতের হিরণ্য অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে পুরুষই নারীকে শিখিয়েছিল এই কথা… যদি এমন হয়?
—পুরুষ একথা শেখাল কেন নারীকে?
—সে নিজে চিন্তা করার, কল্পনা করার প্রচুর সুবিধা পাবে বলে। অবসর পাবে বলে। সংসারের সকল কঠোর কর্মের ভার, কর্তব্যপালনের ভার নারীর স্কন্ধে চাপিয়ে দিয়ে পুরুষ তার কল্পলোকের উদ্দেশ্যে পলাতক হয়েছিল।
—তারপর?
—তারপর নারী কাঠ কাটল, জল বইল, সন্তান গর্ভে ধরল, স্তন্যপান করাল, সংসার প্রতিপালন করল। নারীর আর চিন্তার অবকাশ রইল না। কল্পনার অবসর রইল না। শুধু কাজ, কাজ আর কাজ। ধীরে ধীরে সে ভাবতে ভুলে গেল। স্বপ্ন দেখতে ভুলে গেল। হয়ে উঠল স্বপ্নবিবর্জিত প্রখর বাস্তববাদী।
—বেশ। তারপর?
—তারপর একদিন পুরুষ চাইল নারী তার মনের ভাষা বুঝুক। তার ভাবনা-স্বপ্ন-কল্পনার অংশ নিক। হয়ে উঠুক তার মর্মসঙ্গিনী। কিন্তু ততোদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। নারীর হৃদয় অসাড় জড় হয়ে গেছে প্রবল কর্মতাড়নায়। কর্তব্যের মার্তণ্ডতেজে শুকিয়ে গেছে তার কমনীয় হৃদয়কুসুম।
—যদি তাই হয়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে:নারীই বা ওকথা শিখল কেন পুরুষের কাছ থেকে? পুরুষ তাকে কর্মপ্রবণ হতে বলল, আর অমনই বিনা আপত্তিতে সে সব কর্মের দুর্বহ ভার তুলে নিল তার কাঁধে? কেন?
—তুলে কি সহজেই নিতে চায়? নিশ্চয়ই তার উপর নিপীড়ন করা হয়েছিল। আজও হচ্ছে। বাধ্য করা হয়েছিল মেনে নিতে পুরুষের নির্দেশ। নারীকে কর্মপ্রবণ হতে শিখিয়েছিল স্বার্থপর পুরুষ। জোর করে শিখিয়েছিল। নিজে চিন্তা, কল্পনার প্রচুর সুবিধা পাবে বলে। অফুরন্ত অবসর পাবে বলে।
অনঙ্গসেনা মৃদু হাসলেন। তারপর বললেন, ‘জোর করে কি কিছু শেখানো যায়, আত্রেয়ী? তোমার ভিতর যদি সঙ্গীতের প্রবণতা না থাকে, সুরের সংস্কার না থাকে, আমি কি তোমাকে জোর করে গান শেখাতে পারব? নারীর ভিতর বাস্তববাদের, কর্মপ্রবণতার সংস্কার না থাকলে তাকে প্রহার করে, পদাঘাত করে, অত্যাচার করেও পুরুষ ওকথা শেখাতে পারত না।’
—কেন মানুষ কি প্রবণতার বিরোধী কর্মে ব্যাপৃত হতে বাধ্য হয় না? শিখে নিতে হয় না প্রবণতার বিরোধী বৃত্তি? গ্রাসাচ্ছাদনের জন্য? বেঁচে থাকার জন্য? টিকে থাকার জন্য? আপনি কি কখনও নিজে থেকে বারাঙ্গনা হতে চেয়েছিলেন?
অনঙ্গসেনা এ প্রশ্নের প্রথমে উত্তর দিলেন না। বাতায়নপথে দৃশ্যমান একটি উদ্বাহু তরুর শাখায় শুকিয়ে যাওয়া একটা বিবর্ণ পল্লবের দিকে নিষ্পলক চেয়ে রইলেন শুধু। তারপর বললেন, ‘কিন্তু এ কাজে আমার তো কোনো আনন্দ নেই। অথচ দ্যাখো, কুলকামিনীদের, গৃহিণীদের গৃহকর্মপালনে কতো আনন্দ। অন্তত আমার তো তাই মনে হয়। তেমনই তো দেখছি। দায়ে পড়ে যা শিখতে হয়েছে, অনুশাসিত হয়ে যা অবলম্বন করতে হয়েছে, তাতে কি আর এত আনন্দ আসতে পারে?’
—সে অনেকদিন একই কাজ করতে করতে ওরই মধ্যে আনন্দ খুঁজে নিতে হয়। সব মেয়ের তো ওতে আনন্দ নেই। অনেকেরই নেই। মেনে নিতে হয়েছে। মেনে নিতে হয়।
—সব পুরুষও তো আর তোমার তত্ত্ব-অনুযায়ী সর্বসময় কল্পনায় বুঁদ হয়ে থাকে না। তাকেও কতো কর্ম করতে হয়। কতো দায়িত্ব বহন করতে হয়। আভোরনিশান্ত কঠিন শারীরিক পরিশ্রমের কাজ।
—পুরুষের কর্ম কল্পনার জগৎ থেকে ক্ষণিক বিশ্রাম নেওয়া। নারীর কল্পনা কর্মের জগৎ থেকে সামান্য বিরতি।
হেসে ফেললেন অনঙ্গসেনা। মেয়েটি খুব জেদি। যা বলবে, তা যে করে হোক, প্রমাণ করে ছাড়বে। কিন্তু বড়ো ভালো আর সরল। হাসতে হাসতেই বললেন, ‘তুমি এই যে কর্ম আর কল্পনা, নারী আর পুরুষ—এ দুইকে এমন জল-অচল ভাগ করেছ না, এর মধ্যেই সমস্যার সমস্ত ব্যাসকূট লুকিয়ে আছে গো! ওরা যে একান্ত আলাদা নয়।’
—আলাদা নয়?
—নয় তো! কল্পনা আর বাস্তব একেবারে আলো-অন্ধকারের মতো আলাদা হবে কী করে? নারী আর পুরুষ সম্পূর্ণ পৃথক নয়, আত্রেয়ী। পার্থক্যটা অনেক পরের জিনিস। অনেকটাই আরোপিত।
আত্রেয়ী কথাটা ভালো বুঝতে পারল না। অবাক হয়ে চেয়ে রইল।
অনঙ্গসেনা আবার বললেন, ‘নারীর মধ্যেও পুরুষ আছে। পুরুষের মধ্যেও নারী রয়েছে। কল্পনাপ্রবণ নারী দেখোনি তুমি? কিংবা কর্মমুখর বাস্তববাদী কাষ্ঠল পুরুষ?’
—শরীরে তো নারী-পুরুষে এমনিতেই পার্থক্য আছে। মনেও কি তা নেই?
—মনের উপরিতলে পার্থক্য থাকলেও, মনের গভীর দেশে পার্থক্য নেই। ওই যে বললাম অর্ধনারীশ্বর। শব্দ আর ভাবের মতই একাত্ম। সমরস। সেই সমরস হচ্ছে আসল মানুষ। সে নারীও নয়, পুরুষও নয়। আবার উভয়ই।
—তাহলে যারা খুব ‘পুরুষ পুরুষ’, তারা কি তবে একপেশে মানুষ?
—একদমই তাই। আর যারা খুব ‘নারী নারী’, তারাও একপেশে মানুষ। হা হা হা!
অনঙ্গসেনা উচ্চস্বরে হেসে উঠলেন। তাম্বুলসম্পূট হতে পুনরায় পান নিয়ে সাজতে লাগলেন।
আত্রেয়ী প্রশ্ন করল, ‘তবে কি উত্তিয়র ভেতরেও নারী আছে?’
—আছেই তো। তোমার ভেতরেও পুরুষ আছে।… তাম্বুল সাজব? খাও?
আত্রেয়ী সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল। তারপর নিজের মনেই বলে উঠতে লাগল, ‘তবে কি সেই সমরস মানুষকে খুঁজতেই সে পথে নেমেছে? আমাকে সঙ্গে নিল না কেন? আমি এত অবাঞ্ছিত?’
অনঙ্গসেনা আত্রেয়ীর হাতে তাম্বুল দিয়ে বললেন, ‘তা তো আমি জানি না, আত্রেয়ী। কেন সে চলে গেল, তাও আমার জানা নেই। বোধহয় শব্দের থেকে নিষ্কৃতি চেয়েছে। হয়ত নৈঃশব্দ্যের ভাষা খুঁজতে গিয়েছে। অনেক মানুষের সঙ্গে তাকে দেখা করতে হবে। অনেকের কাছ থেকে শিক্ষা নিতে হবে হয়ত। আমি ঠিক জানি না। তবে একটা কথা আমি বলতে পারি।’
—কী কথা?
—এই সমরস মানুষকে খুঁজতে গিয়ে তাকে একদিন তোমার কাছে আসতেই হবে। দেখো, সে ঠিক তোমাকে খুঁজে নেবে। ততদিনে তোমার জীবনও পালটে যাবে হয়ত নানাভাবে।
অনঙ্গসেনার কথায় আত্রেয়ী খুব আশার আলো দেখতে পেল না কিন্তু। তার মনে হল, সে কতদিন পরে? ততদিনে আত্রেয়ীই হয়ত মরে গেছে। না-আত্রেয়ী হয়ে গেছে সে হয়ত। কিংবা মরে গেছে উত্তিয়ই। না-উত্তিয় হয়ে গেছে। শব্দের সঙ্গে ভাবের দেখা হবে না আর। কর্মের সঙ্গে কল্পনার। নারীর সঙ্গে পুরুষের। উত্তিয়র আত্রেয়ীর। দেখা হবে না আর কোনোদিন। আত্রেয়ী বাতায়নপথে চেয়ে রইল।
প্রাসাদ-সমীপস্থ জলাশয় হতে কোনো চক্রবাক পক্ষীর চিত্তদ্রাবী স্বর ভরে দিতে লাগল মধ্যাহ্নের জঠর।
দ্বাদশ অনুবাক
যদিও সময়ের আধারেই যাবতীয় গতি ও স্থিতি কল্পিত, তবু মনে হয়—সময়েরই যেন একেবারে এক নিজস্ব গতিবেগ আছে। কখনও সময় দ্রুত যায়, কখনও বা কাল শ্লথগামী। আত্রেয়ীর ইদানীং মনে হতে লাগল, সময় যেন চিত্রার্পিত হয়ে রয়েছে—বইছে না। একেকটি মুহূর্ত যেন যুগায়িতপ্রায়। চোখের পাতা ফেলা আর মেলার মধ্যে যেন কত শতাব্দীকাল কেটে গেছে। কখন সকাল এল, কখন দুপুর, কখন বিকেল, কখন রাত্রি টের পাওয়া যায় না। সব দিনই যেন এক বর্ণে একই তুলিকায় একই চিত্রকরের আঁকা। বৈচিত্র্যহীন। তিথি মনে থাকে না, বার ভুল হয়। কোনো কোনো দিন আত্রেয়ী রাত্রিবাস পরিবর্তন করে না, কেশসংস্কার করে না, একবার কোনোমতে স্নান সেরে নেয়। ধুনার ধোঁয়া দেয় না কুন্তলকলাপে, কুঙ্কুম-হরিদ্রাচূর্ণ একপাশে অবহেলিত হয়ে পড়ে থাকে, মূলতানী মৃত্তিকা বিশুষ্ক কঠিন হয়ে যায়। উদ্যানে অতসী ফুল ফোটে, কিন্তু তাদের রেণু আর মুখে মাখা হয় না। শিশির আর পরাগের ভারে ফুলগুলি যেন কুমারী মেয়েটির অস্পৃষ্ট স্তনবৃন্তের মতই নতমুখ হয়ে থাকে। চন্দন শীতল করে না আর অঙ্গ, জ্বালা বোধ হয়। চন্দ্রমাও এখন প্রবল সন্তাপদায়ী হৃদয়জর্জর। দূকুলের বন্ধন শিথিল হয়ে আসে, কণ্ঠবিলম্বিত হারলতাবল্লী কঞ্চুলিকার উপর অসাড় নির্বিষ অহিকুলের মতন প্রলম্বিত, অযথা ভারবর্ধক। কঙ্কন কিঙ্কিনীতে ধ্বনি আছে, কিন্তু ব্যঞ্জনা নেই আর।
এমন ক্লান্তিকর দিনপরিধির ভিতর তিত্তিরাজ পাখির মতো ঘুরতে ঘুরতে ঠোঁটে করে সে কাজ খুঁটে খুঁটে বেড়ায়। যেসব কাজ তার নয়, যেসব চিরদিন সূপকার, পরিচারক, কিঙ্কর, কিঙ্করীরা করে এসেছে, সেই সব শারীরিক শ্রমসাধ্য কর্মে সারা দিন ব্যাপৃত হতে থাকে আবাল্য মাতৃহীনা মেয়েটি। তবু কাজও দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনন্ত নয়। সামান্য অবসর পেলেই অবাধ্য মন তাকে গবাক্ষের কাছে নাগকন্যা উলূপীর মতো ফুসলিয়ে টেনে নিয়ে যায়। অপরাহ্ণের উদাস রৌদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অবচেতনার সম্পূট খুলে একের পর এক প্রশ্ন উঠে আসতে থাকে। চৈত্রপবনে স্খলিত বিবর্ণ পত্ররাজির মতন উত্তিয় তবে কোন বাতাসে ভেসে গেল? সে কি ভেসে গেছে বাণিজ্যপোতে সূর্পারক, মালয়, সুবর্ণদ্বীপ, পারাদ্বীপে উতরোল সাগরের ঢেউ ভেঙে? নাকি চম্পানগরীর রহস্যতন্দ্রিমাভরা অবগুণ্ঠন খুলে ধরে স্তিমিত দীপশিখায় সে দেখছে আলোলকুন্তলা সমুদ্রমেখলা পৃথিবীর মুখ? অথবা দিকচক্রবালের ওই পারে পথের ধুলা গায়ে মেখে মেখে সে চিনে চলেছে চলিষ্ণু জীবনশিল্পের বর্ণিকাবিভঙ্গ? কিংবা ওড্ডিয়ান প্রদেশের কোনো সুদুর্গম গুহার অন্ধকারে নিমীলিত-চক্ষু ধ্যানস্থ হয়ে বসে আছে বিভূতিভূষিতাঙ্গ উত্তিয়? কোনো আজীবকদের মঠে সে কি এ মুহূর্তে অন্য কোনো বাতায়নপাশে বিবর্ণ পুথির পৃষ্ঠার উপর আনতগ্রীব? নাকি প্রবল দস্যুতায় কোনো মরুভূমির দ্রাক্ষানিকুঞ্জপূর্ণ পাটক হতে কোনো এক কামনাসুন্দরীকে হরণ করে নিয়ে বেগবান অশ্বে আরূঢ় হয়ে সে চলেছে, তার দুরন্ত কুন্তলগুচ্ছ আজ বাতাসের দুর্বার স্পর্ধারও উপর সহর্ষ জয়োল্লাসে কম্পমান?
কোথায় গেল যে উত্তিয়! একবারও কি তার মনে পড়ে না আর আমার কথা? শব্দ আর ভাবের অমোঘসম্ভব সেতু বাঁধতে পারল সে? লিখতে কি পারল, যা সে লিখতে চেয়েছিল? বলতে পারল কাউকে হৃদয়ের ভাষা? এত কষ্ট হয়েছিল তোমার, আমাকে বলোনি তো! না বলে চলে গেলে কেন তুমি? তবে কি আমার মেধায় কোনোদিন আস্থা ছিল না তোমার? আমাকে চিরকাল সহচরী ভেবে এলে, মর্মচরী ভাবোনি কোনোদিন?
এমন ভাবনার বল্গাহীন ধাবনের ভিতর সহসা বিচিত্র আশঙ্কা উদ্যতফনা ভুজঙ্গের মতো মাথা তুলে দাঁড়ায়। শিহরিত হয়ে ওঠে তার সর্বাঙ্গ অজানা আতঙ্কে। উত্তিয় মরে যায়নি তো? সে আত্রেয়ীর মতই শৈশবে মাতৃহীন; এই দুটি মা-হারা বালকবালিকা একে অপরকে অবলম্বন করে বড়ো হয়ে উঠেছে। মায়ের অভাব টের পেতে দেয়নি তাকে আত্রেয়ী কোনোদিন, প্রেমকে আবিষ্কার করার আগেই সে যেন উত্তিয়র মা হয়ে গেছে। শ্রেষ্ঠী স্যমন্তকও বন্ধুকন্যার হাতে সংসারের দায়ভার তুলে দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়েছেন। আত্রেয়ীর বিপত্নীক পিতার সংসার আর এই স্যমন্তক শ্রেষ্ঠীর সংসার আত্রেয়ীর নির্দেশেই এই দুই সংসার পরিচালিত হয়ে এসেছে। তারপর একদিন সেই মাতৃত্বের মায়াবী পাতাদের আড়ালে আত্রেয়ীর তনুতরুতে যৌবনের প্রথম কুসুম যখন ভয়ে ভয়ে ফুটল, তখন খেয়ালি, উদাসী, প্রতিভাবান, চিন্তাশীল কবিযুবক উত্তিয়র প্রতি তার মনে উর্জিতা অনুরাগের জন্ম হয়েছে। মা থেকে প্রেমিকা হয়েছে আত্রেয়ী। জেনেছে, পাতার আড়ালে যে সংগোপন নিশিপদ্ম ফুটেছে, তার মধুতে শুধু উত্তিয়র অধিকার। কিন্তু সেই অধিকারের সংবাদ সে কখনও মুখফুটে উত্তিয়কে দেয়নি। উত্তিয় নিজেই আবিষ্কার করেছে। আবিষ্কার করে রোমাঞ্চিত হয়েছে। প্রণয়ের সেই হর্ষবেদনার বিদ্যুৎ বিনিময় হয়েছে দুজনের চোখের তারায়, আচম্বিত কোনো মুহূর্তে একান্ত কোনো সুগোপন স্পর্শের ভিতর। এই তো তাদের ভালোবাসা, তাদের ভালোবাসার অনতিস্ফুট ইতিহাস। এরই মধ্যে কেন মন্দ মন্দ পবনে মেঘ জড়ো হল হৃদয়াকাশে, কেন ঝড় এল, বৃষ্টির পর্দা নামল চোখের পাতায় আর প্রাবৃষায়িত চক্ষুর আড়ালে উত্তিয় হারিয়ে গেল কোথায়…
সে যদি খেতে না পায়? একদম খিদে সহ্য করতে পারে না যে উত্তিয়! যদি কোনো ঐন্দ্রজালিক তাকে বশীকরণ করে? কিংবা কোনো দস্যু তাকে যদি ধরে নিয়ে গিয়ে দেবীস্থানে বলি দেয়? যদি কোনো রাজকীয় ষড়যন্ত্রে সে নিক্ষিপ্ত হয় কারাগারে? কিংবা প্রাণদণ্ড হয় তার? উঃ! মা গো! আত্রেয়ী আর ভাবতে পারে না। অজানা ভয়ে, উদ্বেগে থরথর করে কাঁপে তার ক্লিষ্ট শরীর।
সে নিজে যদি মরে যেত এখন, তবে সব যন্ত্রণার অবসান হত। আবার সেই অবসাদ আর আশঙ্কার আকাশ ছুঁয়ে কেমন এক অব্যাখ্যাত আশা দ্বিতীয়ার চাঁদের মতন ফুটে উঠতে থাকে রোজ। নিশ্চয়ই বেঁচে আছে উত্তিয়। সে বেঁচে থাকুক। সুস্থ থাকুক। তার অভীষ্ট লক্ষ্যে উপনীত হোক। এমন ভাবতে না ভাবতেই অভিমান মন জুড়ে জেগে উঠে বলে, যেখানেই থাকো, আনন্দে থাকো, উত্তিয়। ভালোবাসা পাও প্রিয় কোনো নারীর। তুমি আর আসবে না আমি জানি। সুখী হও। এইভাবে প্রায় নিশ্চিত নিশ্ছিদ্র করে ফেলেছে যখন সে তার মনকে, ঠিক তখনই সেই আপাত-নিশ্চিততার দেওয়ালে ফাটল ধরিয়ে কোনো অনিবার্য স্বপ্নকুসুম তার যাবতীয় অভিমান, যাবতীয় নিয়ন্ত্রণের উপরে মুখ তুলে দুলে দুলে বলে, সে আসবে। ঠিক তোমার কাছে আসবে। তুমি বেঁচে থাকো সেই স্বপ্ন বুকে করে।
সংশয় যেন এক জলচর পক্ষী, চিত্তনদীর এপারে একবার বসে, পরমুহূর্তেই উড়ে গিয়ে নদী পার হয়ে ওইপারে গিয়ে বসে। এই বিরতিবিহীন দোলাচলে আত্রেয়ীর চোখের নীচে কালি পড়ে, তনুকনক ক্ষীণ হয়, মেঘলা হয়।
কয়েক মাস এইভাবে অতিবাহিত হলে একদিন আত্রেয়ী খবর পেল, আজই প্রাতে শ্রেষ্ঠী স্যমন্তক বিদেশ হতে ফিরেছেন। সংবাদ পাওয়া মাত্রই আত্রেয়ী স্যমন্তকগৃহে উপনীত হল। শ্রেষ্ঠী স্যমন্তকের কক্ষদ্বার উন্মুক্ত, কক্ষে প্রবেশ করে দেখল, স্যমন্তক পর্যঙ্কের উপর পাথরের মূর্তির মতন বসে আছেন। তাঁর মুখের একটি রেখাও কাঁপছে না। ভৃত্যরা নিশ্চয়ই তাঁকে এতক্ষণে উত্তিয়র গৃহত্যাগের সংবাদ দিয়েছে। তিনি শুধু একবার নিষ্প্রাণ চোখ তুলে আত্রেয়ীর মুখপানে চাইলেন। সেই শীতল চাহনির পেছনে যেন কত যুগের অন্তহীন শোকবেগ হিমায়িত হয়ে আছে। একবার মৃদুস্বরে শুধু বললেন, ‘আয়!’
তখনই উন্মূলিত অতিমুক্তলতার মতো আত্রেয়ী শ্রেষ্ঠীর দুটি পায়ের পাতার উপর লুটিয়ে পড়ে ফুলে ফুলে কাঁদতে লাগল। স্যমন্তক অতি যতনে তাকে ভূমি হতে তুলে ধরতে গেলেন; সেই স্নেহের স্পর্শে সে আরও উপশমহীন আবেগে স্যমন্তকের কোলের মধ্যে মুখ গুঁজে নিঃশব্দে কাঁদতে লাগল।
স্যমন্তক আত্রেয়ীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, ‘তোকেও কিছু বলে যায়নি, বচ্চে?’
আত্রেয়ী কোলের মধ্যেই দুদিকে মাথা নেড়ে বলল, ‘না! না! না! কিচ্ছু বলে যায়নি।’
স্যমন্তক আবার প্রশ্ন করলেন, ‘মিত্র মীনকেতু কি কোনো অনুসন্ধান করেননি?’
নিজেকে সামান্য সংযত করে নিয়ে সোজা হয়ে বসে চোখের জল মুছতে মুছতে অশ্রুপরিপ্লুত স্বরে আত্রেয়ী বলল, ‘পিতা নানাদিকে দূত প্রেরণ করেছিলেন। কিন্তু তার কোনো সংবাদ নেই।’
স্যমন্তক কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। তারপর শিরোদেশের উষ্ণীষটি ধীরে ধীরে উন্মোচন করে উত্তরীয়ের প্রান্তে ঘর্মাক্ত মুখমণ্ডল মুছতে মুছতে বড়ো খিন্ন স্বরে বললেন, ‘আমিও যত্ন নিতে পারিনি। মা-মরা ছেলেটা! ঘরের মায়া বুঝি তাকে আর ধরে রাখতে পারল না।’
এই কথার অভিঘাতে আত্রেয়ী পুনর্বার কান্নায় ভেঙে পড়ল। মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে বলতে লাগল, ‘আমি পারিনি। আমিই পারিনি, তাত! হেরে গেছি।’
আত্রেয়ীর কান্না স্যমন্তক সহ্য করতে পারছিলেন না আর। তিনি পর্যঙ্ক থেকে উঠে দাঁড়ালেন। কোমল করে কন্যাটির চোখ মুছিয়ে দিতে দিতে বললেন, ‘এমন করে কাঁদিস না। ছি! তুই তো যা করার, তার থেকে অনেক বেশি করেছিস, মা। দাঁড়া, এই তো এলাম। দেখি, খোঁজখবর করে। কোথায় আর যাবে? এত ভেঙে পড়লে চলবে? তুই ভেঙে পড়লে আমি কোথায় যাই!’
ধীরে ধীরে নিজেকে শান্ত করে নিয়ে আত্রেয়ী মনকে নিয়ন্ত্রণে আনল। সত্যিই তার এখন অনেক কাজ। তাত স্যমন্তকের স্নান-আহার কিছুই হয়নি। গৃহ, দ্বার, অলিন্দ অপরিষ্কৃত, ধুলায় আবিল। রন্ধনেরই বা এ প্রাসাদে ইদানীং কী অবস্থা? সে দ্রুতচরণে কিঙ্কর কিঙ্করীদের সন্ধানে চলল।
দিন যায়, রাত্রি আসে। পুনরাবৃত্তির পথ বেয়ে ভোর হয়, ভোর থেকে মধ্যদিন, মধ্যদিন থেকে মধ্যরাত্রি। কয়েক মাস অতিক্রান্ত হল। শ্রেষ্ঠী স্যমন্তক নানা দিকে উত্তিয়র সন্ধান করতে লাগলেন। কিন্তু তাঁর একটির পর একটি প্রয়াস ব্যর্থ হতে লাগল।
এরপর কী করা যায়, তারই মন্ত্রণা করতে প্রতিবার তিনি তাঁর বয়স্য মীনকেতুর সমীপে আসেন। দীর্ঘক্ষণ ধরে আলোচনা চলে। তারপর আবার নূতন উদ্যমে দুই বন্ধু আশায় বুক বেঁধে নূতন দিগন্তের দিকে উত্তিয়র অনুসন্ধানে প্রয়াসী হন।
মাস ছয়েক পরের এক মধ্যাহ্নবেলা। সেদিনও স্যমন্তক এসেছেন মীনকেতুর কাছে। তাঁদের কথা হচ্ছে। আত্রেয়ীর রচিত তাম্বুল স্যমন্তক ও মীনকেতু—উভয়েরই খুব প্রিয়। আত্রেয়ী তাই কতগুলি তাম্বুল রচনা করে সম্পূট হস্তে পিতার কক্ষের দিকে যাচ্ছিল। কিন্তু কক্ষে প্রবেশ করার আগে উভয় বয়স্যর বার্তালাপের দুয়েকটি শব্দ শ্রুতিগোচর হওয়া মাত্রই দ্বারের সম্মুখে এসে সে থেমে গেল। তিরস্করণীর অন্তরালে দাঁড়িয়ে শ্বাস রুদ্ধ করে তাঁদের কথালাপ শুনতে লাগল আত্রেয়ী।
‘না, না, বয়স্য! আপনার মনের অবস্থা আমি সম্যক অনুভব করতে পারছি। কিন্তু আমার কন্যা যে দিন দিন বয়স্থা হচ্ছে, তাও তো অস্বীকার করতে পারি না!’ মীনকেতুর কণ্ঠে অনু্যোগের সুর।
‘সে আর বলতে! কিন্তু আমিও যে পুত্রের অনুসন্ধানে অনলস—সেকথা তো আপনার থেকে কেউ বেশি ভালো জানে না। আপনি নিজেও চেষ্টা কম করছেন না। কিন্তু উত্তিয় যেন বাতাসের মধ্যে মিলিয়ে গেছে,’ স্যমন্তক নিজের অবস্থান বোঝানোর জন্য প্রাণপণে চেষ্টা করছেন।
—বাতাসে আপনার পুত্র মিলিয়ে গেলেও, ওই বাতাসেই আরও একটি কথা এই নগরীর পথে পথে রটিত হয়ে চলেছে, সে খবর কি রাখেন,বয়স্য?
—কোন কথা?
—আত্রেয়ী আর উত্তিয় আবাল্য এই নগরীতে পাশাপাশি বড় হয়ে উঠেছে, তাদের ঘনিষ্ঠতা, সেই ঘনিষ্ঠতার সম্ভাব্য পরিণতি এখানে কারও নিকটেই অবিদিত নয়… এখন উত্তিয়র সন্ধান না মিললে আমার এ কন্যার কী ভবিষ্যৎ? ওদের সম্পর্কের কথা জানা থাকায় কোনো সমর্থ যুবকই যে আমার কন্যাটির পাণিগ্রহণে সম্মত হবে না, এতে আর আশ্চর্য কী! আর আমিও তো যেকোনো মর্কটের কণ্ঠে মুক্তাহার তুলে দিতে পারি না!
—ধৈর্য, বন্ধু, ধৈর্য! বিপদি ধৈর্যং চাভ্যুদয়ে ক্ষমা…
—আর কত ধৈর্য ধরব, বলুন তো, বয়স্য? উত্তিয়ই বা এমন অপরিণামদর্শীর মতন কার্য করল কেন? সে একবার আমার কন্যাটির কথা ভাবল না? এত বৎসর কন্যাটি আমার আপনাদের গৃহেই পড়ে আছে… এখনও প্রতিদিন সে সেখানে যায়… এই নিয়েও আজ নগরপথে প্রভূত কানাকানি চলছে…
কক্ষের মধ্যে কিছুক্ষণ অস্বস্তিকর নীরবতা। তারপর সেই নীরবতা ভঙ্গ করে স্যমন্তকের হতোদ্যম কণ্ঠ শোনা গেল, ‘আপনি কি প্রকারান্তরে আত্রেয়ীকে আমার গৃহে যেতে নিষেধ করছেন?’
—আরে, না-না! তা বলছি না… বলছি, এর তো একটা উপায়ান্তর দেখতে হবে… আমরা উভয়ে একবার বারাণসী যাত্রা করেছিলাম, মনে আছে? সেখানে শ্রেষ্ঠী চিত্রসেনের গৃহে আতিথ্য গ্রহণ করেছিলাম…
আত্রেয়ী আর যেন শুনতে পারছে না। তাম্বুলসম্পূটটি দ্বারের একপাশে নামিয়ে রেখে ওই মন্ত্রণাকক্ষ হতে ত্রস্ত হরিণীর মতো পালিয়ে যাচ্ছে। কোথাও তার কোনো আশ্রয় নেই। হরিণীর বেগেই সে তার নিজ কক্ষের ভিতর ঢুকে শয্যায় উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল। তার পিঠ থরথর করে কাঁপছে। উপাধানের ভিতর মুখ গুঁজে সে যেন সংসার থেকে নিজেকে বিলুপ্ত করে দিতে চাইল। মা! ওহ, মা গো! তুমি আমার পাশে থাকো মা…আমার বড়ো ভয় করছে…
কোন্ অজ্ঞাত অপার রহস্যময়ী জননীর কাছে সে আশ্রয় ভিক্ষা করছিল, কে জানে। যে হতভাগিনী জন্মদাত্রী আত্রেয়ীর জন্মমুহূর্তে গর্ভের অন্ধকার থেকে সন্তানটিকে ধরিত্রীর আলোতে আনতে গিয়ে নিজেই পৃথিবীর আলো থেকে মৃত্যুর অননুভূত তমসায় চিরতরে মুখ লুকিয়েছে, কেমন করে সে দেবে আজ তার বালিকাকে আশ্রয়? তবু সেই চিরকুহেলিময় মৃত্যুর ওপার থেকে কোনো আঁধার-জননী এই রোরুদ্যমানা অসহায়া কন্যাটির দিকে করুণার্দ্র চোখ মেলে চেয়ে ছিলেন কিনা, বলতে পারি না।
স্যমন্তক শ্রেষ্ঠীর গৃহে আত্রেয়ীর গতাগতি বন্ধ হয়ে গেল। সে এখন পিঞ্জরাবদ্ধ শারিকার মতন এঘর থেকে ওঘরে উদ্দেশ্যহীনভাবে হেঁটে বেড়ায়। সে শুনেছে, পিতা মীনকেতু কয়েক মাসের মধ্যেই বেরিয়ে পড়বেন বাণিজ্যযাত্রায়। সমস্ত প্রাসাদব্যাপী সেই আয়োজনই চলছে। আত্রেয়ীও আকাঙ্ক্ষা করছিল পিতার বাণিজ্যযাত্রার। যেন মনে হচ্ছিল, পিতা বহির্গত হলে সে হাঁপ ছেড়ে বাঁচবে।
কিন্তু এই বিদেশ-যাত্রার আয়োজনের ভিতরেই অস্পষ্টভাবে আরেকপ্রকার আয়োজন সে কেমন যেন অনুভব করতে পারছিল। কিন্তু এই অতিরিক্ত আয়োজনটা ঠিক কীসের, তা কিছুতেই ঠাহর করতে পারছিল না।
প্রায় মাসাধিককাল পরে তাদের গৃহে এক অতিথি এসে উপস্থিত হল। অতিথিকে আত্রেয়ী চোখে দেখেনি। শুনল, কোনো শ্রেষ্ঠীপুত্র। আজ প্রভাতে এসেছে, কয়েকদিন পরে চলে যাবে। এমন অতিথি কত আসে এ গৃহে।
প্রাসাদের দ্বিতলের অলিন্দে হাঁটতে হাঁটতে সহসা সে পিতার কক্ষের ভিতর উচ্চৈঃস্বরে বার্তালাপ শুনতে পেল। এত উচ্চকণ্ঠে এ গৃহে তো কেউ কথা বলে না! সামান্য বিরক্ত হয়ে সে পিতার কক্ষের দ্বারপথের দিকে চাইল। দেখল, পিতা মীনকেতুর সম্মুখে অতি স্থূল এক ব্যক্তি উপবিষ্ট। সেই লোকটিই উচ্চকণ্ঠে কথা বলছে এবং কথার ফাঁকে ফাঁকে গাত্র দোলায়িত করে হাসছে।
আরেকটু অগ্রসর হতেই সে তাদের কথাবার্তা শুনতে পেল। মীনকেতু বলছেন, ‘কিন্তু আমার কন্যাটিকে তুমি তো এখনও দেখোইনি…’
লোকটা অমার্জিত ভঙ্গিতে হাসল। বলল, ‘দেখেছি বৈকি! আজই প্রাতে সে যখন প্রাসাদসংলগ্ন দেবদেউলে ফুলের সাজি হাতে পূজা দিতে যাচ্ছিল, তখনই দেখেছি। সর্বসুলক্ষণা পঞ্চকল্যাণী কন্যা! …এখন আমার প্রস্তাবটি যদি বিবেচনা করে দেখেন। আমার কুলপরিচয়, উচ্চবংশগৌরব… আমরা সাতপুরুষের বেনে… আর আমার বাণিজ্যসাফল্য, সামাজিক প্রতিপত্তি…’
মীনকেতু দুহাত তুলে লোকটির কথায় বাধা দিয়ে বললেন, ‘না-না, সেসকল আমাকে বলতে হবে না। তোমার পিতা বারাণসীপ্রখ্যাত বণিক চিত্রসেন… তাঁর গৃহে আমি ও আমার বন্ধু স্যমন্তক বহু বৎসর পূর্বে আতিথ্য গ্রহণ করেছিলাম। তুমি তখন নিতান্তই বালক। কাজেই কুলমান আমার জানা আছে। কিন্তু আমি ভাবছি অন্য কথা। তোমাকে এখানে আহ্বান করেছিলাম অন্য উদ্দেশ্যে। আমি বৃদ্ধ হচ্ছি। বাণিজ্যযাত্রা দিনদিন কঠিন হয়ে পড়ছে। এমতাবস্থায় তোমার সঙ্গে যৌথ ব্যবসায় করতে পারলে সুবিধা হয়। চিত্রসেনের দেহান্তের পর তুমিই তো তোমার পৈত্রিক ব্যবসায় সম্পন্ন করছ…তোমার খ্যাতিও আমি বহুমুখে শুনেছি। তাই তোমার সঙ্গে আলোচনা করার জন্যই নিমন্ত্রণ পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু তুমি বলছ…’
লোকটা আবার গা দুলিয়ে অদ্ভুতভাবে হেসে উঠল। তারপর বলল, ‘দেখুন তাত! আমি আপনার কন্যাটিতে মুগ্ধ। সে যদি আমার পাশে থাকে, তবে ধনলক্ষ্মী, সৌভাগ্যলক্ষ্মী, সন্তানলক্ষ্মী সকলেই একসঙ্গে রয়েছেন জানব। আর আপনার ও আমার উভয়ের ব্যবসায়ই উন্নত হতে পারবে।’
মীনকেতু চিবুকের উপর হাত বুলোতে বুলোতে চিন্তামগ্ন স্বরে বললেন, ‘অভাবিত প্রস্তাব! কিন্তু আমার কন্যাটি যে বড় খেয়ালি। আচ্ছা, আমি বলি কী, তুমি এ প্রাসাদে কিয়দ্দিন অবস্থান করো। কন্যাটির সম্পর্কে খোঁজখবর নাও। তারপর মনস্থির হলে না হয়—’
কেমন একটা দম্ভভরে তাচ্ছিল্যসহকারে লোকটা বলল, ‘বণিক জয়দ্রথ কখনও খোঁজখবর না নিয়ে কাউকে কোনও প্রস্তাব দেয় না। মন আমার স্থির করা হয়েই গেছে। আমি চাই আগামী জ্যৈষ্ঠ মাসেই শুভকাজ সুসম্পন্ন করতে। এখন আপনি সম্মত হলেই হয়। যাই হোক, আপনি বয়োজ্যেষ্ঠ, আপনার কথা আমি ফেলব না। তিনদিন এ গৃহে আমি থাকব। তৎপশ্চাৎ আপনার সম্মতি গ্রহণ করে তবেই বিদায় নেব।’
লোকটি গাত্রোত্থান করছে দেখেই আত্রেয়ী সভয়ে দ্রুতপদে নিজ কক্ষে ফিরে আসতে লাগল।
এই মানুষটির সঙ্গে পিতা তাঁকে বিবাহ দিতে চান? এত ত্বরা? কিন্তু উত্তিয় ছাড়া তার পাশে অন্য কোনো পুরুষের কথা সে যে ভাবতেও পারে না! এই লোকটা স্থূল, কর্কশ ও অহংকারী। আত্রেয়ীকে দেখে তার লোভ হয়েছে। যেন উদ্যানের মধ্যে একটা লোক ঢুকল আর হাত বাড়িয়ে ফুল পেড়ে নিয়ে চলে গেল—সে কি এত সস্তা! লোকটির নির্লজ্জ, দুর্বিনীত ব্যবহার পিতা কি দেখেও দেখতে পাচ্ছেন না?
নাকি চিত্রসেনপুত্র জয়দ্রথকে এখানে আমন্ত্রণ করে নিয়ে আসার পেছনে পিতার এই গূঢ় অভিসন্ধিই ছিল? জয়দ্রথ না বললে তিনি নিজেই হয়ত প্রস্তাব দিতেন। কন্যাদানই উদ্দেশ্য। যৌথ ব্যবসায় আসলে তার একটা ছলমাত্র। অথবা যৌথ ব্যবসায়ে প্রভূত অর্থাগমের স্বার্থেই কন্যাদান? ছি, ছি!
স্যমন্তক সেই দিনের পর এখানে আর আসেন না। কীভাবে আর তাঁকে সব কথা জানানো যাবে?
পরদিন। মধ্যাহ্ন সবেমাত্র অপরাহ্নের দিকে ঢলে পড়েছে। আত্রেয়ী ত্বরিত চরণে অলিন্দ বেয়ে রন্ধনশালার দিকে যাচ্ছিল। এমন সময় উদ্যানের একপ্রান্তে যে মাধবীবিতানটি আছে, তারই আড়ালে সে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পেয়ে দাঁড়িয়ে গেল। উদ্যানপালক দ্রুহু ও জয়দ্রথ পরস্পর ঘনিষ্ঠভাবে নিম্নস্বরে বাক্যালাপ করছে। জয়দ্রথের কণ্ঠস্বর নিম্ন হলে মনুষ্যোচিত স্বাভাবিক হয়। তবে তার গোপন শলাও নিকটবর্তী সকলেরই শ্রুতিগোচর হতে পারে। একটু মনোযোগ দিলে দ্রুহুর কথাও শোনা যায়।
দ্রুহু জয়দ্রথের স্কন্ধে হাত রেখে বয়স্যর মতো কথা বলছে। একজন সম্পন্ন অতিথির সঙ্গে আরেকজন নিম্নপদস্থ কর্মচারী এত অনর্গল, এত অন্তরঙ্গ হল কী প্রকারে?
পূর্বদিনে দূর হতে দেখেছিল, আজই প্রথম আত্রেয়ী জয়দ্রথকে ভালো করে দেখতে পেল। লোকটির গাত্রবর্ণ অনুজ্জ্বল তামাটে, অতি স্থূলবপু, হস্তপদ পেশল ও রোমশ। কেশপাশ মাথার উপর শঙ্কুর ন্যায় চূড়া করে বাঁধা। কর্ণে নবীন তালীপত্রের কুণ্ডল, হস্তে ধাতব বলয়, গলায় বণিকসুলভ বহু রত্নহার, দশ অঙ্গুলিতে দশটি উজ্জ্বল রত্নানুবিদ্ধ অঙ্গুরীয়ক, অঙ্গুলিসমূহ বালকের ন্যায় খর্ব ও অপরিণত। চক্ষু আরক্ত ও বিশাল, ওষ্ঠাধর তাম্বুলরসে রঞ্জিত। তার মুখমণ্ডল সর্বদাই মেধাহীন, পরিশীলনহীন স্থূলভাবের দ্যোতক— মুখভাবে কোথাও যেন একটা অমার্জিত রসিকতা ও ক্রূর নিষ্ঠুরতা একই সঙ্গে মিশে আছে।
দ্রুহু জয়দ্রথের নিকটে মুখ এনে বলল, ‘আপনি মহাশয় যখন আমাতে এতদূর বিশ্বাস স্থাপন করেছেন, তখন একথা আপনাকে না-জানানো আমার পক্ষে অন্যায্য কর্ম হবে যে, আমাদের প্রভুকন্যাটি কিন্তু আবাল্য শ্রেষ্ঠী স্যমন্তকের পুত্র উত্তিয়র বাগদত্তা ছিল। সেখানেই প্রায় সারাদিন পড়ে থাকত, পরে যখন শ্রেষ্ঠীপুত্রটি নিরুদ্দেশ হল…’
জয়দ্রথ দ্রুহুকে থামিয়ে দিয়ে মাথা নেড়ে বলল, ‘আরে জানি, জানি! সেকথা না জেনেই কি আমি আর শ্রেষ্ঠী মীনকেতুকে প্রস্তাব দিয়েছি? তবে ও কিছু না।’ তারপর কেমন একটা পিচ্ছিল হাসি হেসে জয়দ্রথ যোগ করল, ‘তোমার প্রভুকন্যা সমর্থ পুরুষের স্বাদ পায়নি, তাই এতদিন কাপুরুষের সঙ্গ করেছে। দেখো না, একবার সে-স্বাদ পেলেই ওসব বাল্যপ্রেম কেমন মন থেকে চলে যায়। হা হা হা!’
দ্রুহুও জয়দ্রথের সেই বর্বরোচিত হাসিতে যোগ দিল। তারপর একটু থেমে সতর্ক সুরে বলল, ‘ভালো বলেছেন। তবে কী জানেন, মহাশয়? প্রভুকন্যাটি বড় জেদি এবং রুচি-অরুচির ব্যাপারে সে বড়ো বেশি অসহিষ্ণু। এই বিহগীকে পোষ মানানো কিন্তু কঠিন।’
জয়দ্রথ আরও জোরে হেসে উঠে বলল, ‘রাখো, রাখো! পোষ মানানো কঠিন! সুখশয্যায় সমর্থ রতিকুশল পুরুষের বক্ষের নিম্নে মর্দিত হতে হতে মুগ্ধ, আবিষ্ট হয় না—এমন নারী আছে নাকি কোনো এই ধরাতলে? সে-সুখ জেনেছে কোনোদিন তোমার প্রভুকন্যা? কত দেখলাম!’
শবভুক শৃগালের মতন অনুচ্চস্বরে হেসে উঠে দ্রুহু বলল, ‘তাহলে অনেক দেখেছেন নাকি আপনি, ভদ্র?’
তারপরেই তারা দুজনেই অশালীন হাসিতে ফেটে পড়ল।
আত্রেয়ীর সমস্ত শরীরময় যেন কে নিষ্ঠীবন লেপন করেছে। ঘৃণায় তার সর্বেন্দ্রিয় গুলিয়ে উঠল। সে দ্রুত নিজ কক্ষে ফিরে এসে ভাবতে লাগল, এই পুরুষের হস্তে পিতা তাকে তুলে দিতে চান? এর সঙ্গে সমস্ত জীবন… না, না, না! কিছুতেই হতে পারে না।
সেই দিন, সেই রাত্রি সে কিছুই আহার করল না। সমস্ত প্রহর জুড়ে ভাবতে লাগল, এমতাবস্থায় সে কী করতে পারে? আচ্ছা, যদি এই নগরী হতে সংগোপনে সে পালিয়ে যায়? পালতে পারবে না সে? কোথায় যাবে? যেখানেই যাবে, শৃগাল-কুক্কুরে ছিঁড়ে খাবে। আচ্ছা বৌদ্ধ মঠে তো প্রব্রাজিকারা থাকেন। যদি সে শ্রমণা হয়ে যায়, তবে তো এই নারীমাংসলোলুপ জন্তুদের হাত থেকে বেঁচে যেতে পারে। কিন্তু কোথায় সেই মঠ? কীভাবে যাবে? কিছুই তো আত্রেয়ী জানে না। অন্তত স্যমন্তক শ্রেষ্ঠীর কাছে তো যাওয়া যায়।
ভাবতে ভাবতে কখন যেন সে ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুম যখন ভাঙল, দেখল চোখের সামনে অনড় গভীর অন্ধকার। মধ্যরাত্রি অনুমিত হয়। কোথা থেকে একটা ধাতব শব্দ পেয়ে সে দ্রুতবেগে শয্যা হতে উঠে দাঁড়াল। দ্বার খুলে অলিন্দের দিকে তাকিয়ে সে বড়ো অবাক হয়ে গেল।
তার কক্ষসংলগ্ন অলিন্দে স্তিমিত ঘৃতদীপ জ্বলছে। আর সেই আলো-আঁধারির ভিতর প্রাসাদের এক রক্ষী সতর্ক দৃষ্টি মেলে তার কক্ষের দিকে চেয়ে রয়েছে। রক্ষী হস্তধৃত লৌহময় দণ্ডটি মধ্যে মধ্যে ভূমিতে আঘাত করায় ধাতব শব্দ উঠছে।
পরদিন প্রভাত হতেই আত্রেয়ী পিতার কক্ষে ত্বরিত বেগে প্রবেশ করল। শয্যার পার্শ্বে স্থাপিত ভারি রত্নখচিত মঞ্জূষাটি খুলে মীনকেতু সঞ্চিত অর্থসম্পদ, কড়ি, মুদ্রা প্রভৃতি গণনা করছিলেন। তিনি মুখ তুলে বিরক্ত দৃষ্টিতে আত্রেয়ীর মুখপানে তাকালেন।
আত্রেয়ী উত্তেজিত স্বরে বলল, ‘পিতা! আমাকে বন্দী করা হয়েছে কেন?’
মীনকেতু মঞ্জুষা বন্ধ করে ধীরপদক্ষেপে হেঁটে এসে পর্যঙ্কে উপবেশন করলেন। তারপর নিস্পৃহ সুরে বললেন, ‘বন্দী করা হবে কেন? তোমার নৈশ প্রতিরক্ষার জন্য অতিরিক্ত রক্ষী নিযুক্ত করেছি। তুমি বয়স্থা হয়েছ, শীঘ্রই তোমার পরিণয়…’
—আমার পরিণয়? কিন্তু আপনি একবারও কি আমার মত আছে কিনা জানতে চেয়েছেন?
—না। আমি তার প্রয়োজন বোধ করিনি। তুমি নিশ্চয়ই পিতৃহীনা হওনি? তোমার যাতে মঙ্গল হয়, আমি তাই করব।
—পিতা! এই যুবককে বিবাহ করায় আমি সম্মত নই।
—কেন?
—সে শুধু কদাকার, স্থূলরুচিই নয়, সে একেবারে অসংযমী চরিত্রহীন।
—আর তুমি চরিত্রবতী? তোমার আর উত্তিয়র সম্পর্ক জানার পর কেউ তোমাকে বিবাহ করতে চাইবে? শোনো, অপরিণামদর্শিনী হয়ো না। চরিত্র কোনো বিরাট সমস্যা নয়। জয়দ্রথের সামাজিক প্রতিপত্তি কীরূপ তুমি জানো? তার ব্যবসায়ে প্রতি বৎসর উপার্জন কত হয়, তোমার ধারণা আছে? শোনো, বচ্চে! বিবাহ তোমার এখানেই হবে। এবং তুমি সুখী হবে।
—না, তাত! আমি শুধু একটা বিত্তবান, গণ্ডমূর্খ, অসংযমীকে বিবাহ করে কখনও সুখী হতে পারব না।
এই কথা শুনে মীনকেতু শীতল দৃষ্টিতে আত্রেয়ীকে একবার দেখে নিয়ে কঠিন, ধাতব, বিদ্রূপাত্মক স্বরে বললেন, ‘বেশ তো! তবে তুমি তোমার পছন্দমতো কাউকে খুঁজে নিয়ে এ গৃহ থেকে চিরতরে চলে যাও। তোমারও রুচির তৃপ্তি হবে, আর আমারও আনন দগ্ধ হবে! মন্দ কী?’
আত্রেয়ীর নয়নের সম্মুখে যেন সমস্ত পৃথিবীটা দুলে উঠল। এই তার পিতা? এমন নিষ্করুণ, সঙ্কীর্ণবুদ্ধি, হৃদয়হীন, স্বার্থপর মানুষ! তার চোখ দিয়ে জল পড়ছিল না আর। যেন ভিতরের ক্ষোভের আগুনে নয়নের বারি বাষ্পীভূত হয়ে যাচ্ছিল।
মন্ত্রচালিত নিষ্প্রাণ পুত্তলিকার মতো সে তার কক্ষে ফিরে এল। মনে হল, তার মৃত্যু হয়েছে। এর পরেও দেহটা চলছে দেখে তার বড়ো বিস্ময় হল। এ জীবন বড়ো অর্থহীন মনে হল আত্রেয়ীর। এখানে প্রেমের মূল্য নেই, বিশ্বাসের দাম নেই, সেবা বস্তুত অন্নজল নিরাপত্তালাভের উপায়। স্বার্থই এ সংসারের মূলমন্ত্র। মনে হল, সে যেন একটা অন্ধ গলির ভিতর ঢুকে পড়েছে। অথবা লেলিহজিহ্ব একটা অজগরের অন্ধকার মুখবিবরের ভিতর সে প্রবেশ করেছে। আর পরিত্রাণ নেই। অজগরের ক্লেদযুক্ত লালা তার সমস্ত শরীরে লিপ্ত হয়ে যাচ্ছে, এ মহাভুজঙ্গ তাকে ক্রমে ক্রমে গ্রাস করে নেবেই।
তিনদিন তিনরাত্রি সে আহার গ্রহণ করেনি, নিদ্রা যায়নি। অথচ আশ্চর্য, প্রাসাদের কেউ তার কোনো সংবাদ নিতেও আসেনি। একাকীত্বের দুঃসহ বেদনা যেন প্রহরের পর প্রহর ধরে তার মস্তিষ্ককে জীর্ণ করে চলেছে।
দিবসত্রয়পর তার মন অকস্মাৎ শান্ত হয়ে গেল। মনে হল, পরিত্রাণের উপায় পেয়েছে। এই তো সমস্ত জ্বালার উপশম! এতক্ষণ তার মনে পড়েনি কেন?
কক্ষসংলগ্ন অলিন্দে প্রহরা কেবল নিশাকালেই থাকে। অন্য সময় প্রাসাদের মূল ফটকের কাছেই প্রহরীরা অবস্থান করে। প্রাসাদ হতে বাহির হতে না পারলেও অন্তত দিবাভাগে প্রাসাদের নানা অংশে গতাগতিতে অন্তরায় ছিল না।
প্রাসাদের এক প্রান্তে একটি কক্ষ। গৃহস্থালীর সমস্ত প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি এখানেই রক্ষিত থাকে। কক্ষের কুঞ্চিকা আত্রেয়ীর কাছেই ছিল। কক্ষদ্বার উন্মুক্ত করে সে ভিতরে প্রবেশ করল। অল্প অনুসন্ধানেই অভীষ্ট বস্তুটি করায়ত্ত হল।
হরিতাল। কারও অঙ্গে দুরারোগ্য ঘা হলে এই হরিতাল চূর্ণ করে প্রলেপ লাগাতে হয়। এতে সহজেই ক্ষত নিরাময় হয়। তবে প্রলেপ লাগানোর পর শুশ্রূষাকারীর হস্তপদ ক্ষার দিয়ে দীর্ঘক্ষণ উত্তমরূপে ধৌত করা কর্তব্য। হরিতালস্পৃষ্ট হস্ত মুখে বা নাকে লাগলে কিংবা তা উদরে প্রবিষ্ট হলে সাক্ষাৎ মৃত্যু।
স্বকক্ষে প্রত্যাবৃত আত্রেয়ী সযত্নে হরিতাল চূর্ণ করল। তারপর পানপাত্রে দুগ্ধের সঙ্গে হরিতাল চূর্ণ মিশ্রিত করল। তদনন্তর পানপাত্রটি হাতে নিয়ে কক্ষ হতে বিনির্গত হয়ে প্রাসাদের পশ্চাতে বনঝোপের ভিতর এসে বসল।
চৈত্রঋতুর অপরাহ্ন। কেমন উদাসী মায়া রৌদ্রের ভিতর দিয়ে উদ্যানের বনঝোপ আর বনস্পতির শীর্ষদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এক আশ্চর্য সুপবন বনের ভিতর দিয়ে রৌদ্রতপ্ত ক্লান্ত পাতাগুলির উপর বহে যাচ্ছে। আকাশে লঘু মেঘ। ওই আকাশের নিম্নে কোথাও হয়ত উত্তিয় আছে। হয়ত নেই। উদ্যানসমীপস্থ তড়াগের জল শান্ত, ঢেউগুলি ধীরলয়ে পারাপার করছে। কোথাও যেন পুষ্পের সুগন্ধ, মৃদু মৃদু পূজার ঘণ্টা বাজছে কোনো মন্দিরে। সমস্ত পৃথিবীতে যেন আজ প্রেমের আভা ছড়িয়ে পড়ছে দশদিকে। একটু পরেই জ্যোৎস্না উঠবে আকাশ জুড়ে। আজ পূর্ণিমা। চাঁদের উৎসব।
পানপাত্রটি পাশ থেকে হাতে তুলে নিয়ে চুমুক দিতে গেল আত্রেয়ী। আর তখনই হঠাৎ কোথা থেকে যেন একটা অবাধ্য কোকিল দীর্ঘ কুহু কুহু তানে শূন্য আকাশ পূর্ণ করে দিতে লাগল।
সেই কূজনে বাধা পড়ল। পানপাত্রটি আর ঠোঁটে ঠেকানো হল না। সে অবাক হয়ে চারিদিকে ভালো করে দেখল একবার। সে মরে যাবে, আর ওই কোকিলটি বেঁচে থাকবে? এমনই ডেকে চলবে বসন্ত অপরাহ্ণে? এমনই দক্ষিণ সমীরণ ঘাসের ভিতর দিয়ে বহে যাবে। এমনই ধীরলয়ে পারাপার করে চলবে তড়াগের ওই ঊর্মিমালা। তাহলে সে একা মরে নীল হয়ে পড়ে থাকবে কেন বাগানের ঘাসের উপর?
ওই কোকিলটির সঙ্গে হয়ত তার দেখা হবে একদিন। ওই লুকোনো ফুলটির সঙ্গে। মন্দিরের মৃদুল ঘণ্টাধ্বনির সঙ্গে। পুষ্করিণীর ঢেউগুলির সঙ্গে। হয়ত দেখা হবে অন্য আকাশের নীচে তার প্রিয়তম যুবকের সঙ্গেও।
‘তাকে একদিন তোমার কাছে আসতেই হবে, আত্রেয়ী। দেখো, সে ঠিক তোমাকে খুঁজে নেবে। ততদিনে তোমার জীবনও পালটে যাবে হয়ত নানাভাবে।’ কে যেন তাকে বলেছিল এসব কথা?
মাসাধিককাল পর এক জ্যৈষ্ঠসন্ধ্যায় পূর্বনির্ধারিত লগ্নে মীনকেতুকন্যা আত্রেয়ীর সঙ্গে বারাণসীপ্রখ্যাত শ্রেষ্ঠী চিত্রসেনের পুত্র জয়দ্রথের বিবাহ সাড়ম্বরে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল।
——————
গবেষণা-সহায়তাঃ প্রীতম বাগচি, প্রত্নতত্ত্ববিদ