সাপ্তাহিক

১০ আশ্বিন ১৪২৭

ছবি: এস. এইচ. রাজা

সমর দেব

বিনির্মাণ

একটি একটি করে ইঁট খসাতে খসাতে

             উৎসের দিকে যেতে চাই

তারও আগে কেটে ফেলি গাছপালা,

ছুঁড়ে দিই টব, মুছে ফেলি ঘাস

গুঁড়িয়ে দিই সীমানা পাঁচিল

          ঘরে নিয়ে আসি আস্ত শ্মশান

পবিত্র গঙ্গা ছেঁচে তুলে আনি অস্থি

সব পূর্বপুরুষের, এইবার

গড়ে তোলা হবে ফের নতুন প্রতিমা

             আমিই গড়ে নেব ছাঁচ

একটি একটি করে নিজেই বসিয়ে নেব

সমস্ত বিকশিত জিন

নিগূঢ় পাপের মতো এইকথা

              চুপি চুপি উচ্চারিত হলে

সন্ধ্যা নামে, ইঁট ধরে টানি আমি

দিনরাত অক্লান্ত পাগল

 

অনপনেয় বিষাদগাথা জুড়ে

    মানবিক গ্লানি ছেয়ে ফেলে মহাকাশ

তখন কোথায় নদী, চলে গেছে দূরে,

              স্নান করি নাইল কুমিরে

কুয়োর সুগোল জলে ভেসে ওঠে

বিগলিত জ্যোৎস্নার চাঁদ

দর্পণ সরে গেছে মানুষের অপার লাঞ্ছনায়,

                       তখন গভীর রাত

ঘন কালো মেঘে আকাশ ঢেকে আছে আউসভিৎস যেন

মায়ের উষ্ণ কোলে মাথা রেখে শৈশবের ঘুম মনে পড়ে

ইঁট খুলে খুলে ক্লান্ত আমি প্রবল আত্মবিশ্বাস নিয়ে

 অটল শ্রমিকের মতো

সমস্ত শরীর ভেজা ঘামে, এইবার ভিত্তিমূলে

                               শাবলের দুর্মর আঘাত

কোনো শোক নেই তাপ নেই দুরন্ত কিশোরের মতো

 বিষাদের লেশমাত্র নেই

দিনরাত জুড়ে ক্রমাগত ইঁট খুলে চলি উৎসে যাবো বলে

 

 

সঞ্চিতা দাশগুপ্ত

অস্তিত্ব

উবু হয়ে বসে 

যে লোকটা আজীবন কাস্তে চালায়,

তার পিঠের ওপর নরম রোদ,

গা ঘেঁষে লেগে আছে কাচরঙা মেঘ,

এই দৃশ্যে পৃথিবীও পৃথুলা হয়।

 

কেবল খরস্রোতা অনাহার

                        সে নিংড়ে নেয় রোজ।

সুবীর সরকার

গান

শান্ত পুকুরে সাঁতার কাটতে গিয়ে তোমার কথা মনে

                                                    পড়ে গেল

 আমি এখন হাঁসের মতন।

 আমি এখন মঞ্চ থেকে দূরে একা একা জ্বলতে থাকা

                                                 প্রদীপ

 ভিড় থেকে সরে আসতে আসতে আমি ভাবি

                     পিনড্রপ সাইলেন্স-এর কথা

 এই দিক ও দিগন্ত।

 এই সহজিয়া সব নদী।

 যদি চোখের জল ধরে রাখবার জন্য কোনও জলাধার

                                                                থাকতো

 সতর্কবার্তায় মিশে থাকে ভেজা বারুদের ঘ্রাণ

 কান্না মুছিয়ে দেবার ক্ষমতা আমার নেই

 গন্তব্য থেকে অনেক দূরে মহিষের শরীর

 থেকে আমি সরিয়ে আনছি

                                             গান

 

 

 

 

নীলাদ্রি দেব

একক

কত গুপ্তহত্যা সেরে মানুষ উড়িয়ে দেয় মেঘ। আদিম সর্বনাশ থেকে চুঁইয়ে নামে আঙুরের রস। রিপুগুলো কুয়াশার মতো ম্লান। কখনও প্রকট। এরপরই যাবতীয় দড়ি টানাটানি। চিল ওড়ে। ওঠানামা নিয়ে গ্রাফপেপারের মাথাব্যথা নেই। কপালে ভাঁজ গেঁথে নিলে ছবিটিতে প্রাণ আসে। বিরতির শেষ কোথায়, কে জানে! যেভাবে চামড়া মানিয়ে নেয় তাপের আকার, তেমনি জীবন। বিরাট সূঁচের পেটে তন্তু জুড়ে জুড়ে সময়ের এফোঁড় ওফোঁড়। ব্যস। আর কিছু নেই। মার্জিনের দুটো বাহু যে বিন্দুতে উপেক্ষা করে নিজেদের, জেগে ওঠে না নেভা আগুন। প্রশ্ন! এসবের দিকে তর্জনী তুলে শ্বাসবায়ু আটকে রেখো না। ঘুমের আগে ঘুমঘুম চোখে দেখে নিও ধ্বংসের প্রতিটি একক।

সুদীপ্ত বিশ্বাস

মোম গলছে

সেদিন যখন আলতো করে আমার ডানায়

আদর মাখা অভিমানের স্পর্শ দিলে

সেই দুপুরে জীবন তখন শীতলপাটি

ফুরফুরিয়ে চলল উড়ে আকাশ পথে।

ভারচুয়ালি ফেসবুকে না, ঠোঁটের পাশে

উষ্ণ তোমার স্পর্শ পেয়ে পাগল পাগল

নাছোড়বান্দা তোমাকে আর কিই বা বলি?

হ্যাঁ হ্যাঁ তুমি সব লুটে নাও সব লুটে নাও।

ধকধকিয়ে উঠল জ্বলে বহ্নি শিখা

মোম গলছে মোম গলছে শরীর জুড়ে।

বিশেষ গদ্য

ছবি: এস. এইচ. রাজা

লোক প্রবাদে পুরুলিয়ার কৃষিকথা

তপন পাত্র

পুরুলিয়ার সাধারণ পরিচয় রুখা-শুখা, ডাঙা-ডহর, খরা- ধরা, ভখে-মরা পোড়া কপাল জেলা।  দারিদ্র তার দেহের ভূষণ।  অনাহার তার তপস্যা, অপুষ্টি যেন অঙ্গসজ্জা। তাই এখানে রূপসী বাংলা গেরুয়া শাড়ি পরে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডের সামনে এক কঠিন কঠোর তপস্যায় মগ্নপ্রাণ। তবুও এর অন্তরের সুড়ঙ্গ পথে বয়ে চলেছে এক সুস্থ-সংস্কৃতির অমলিন ঝর্ণাধারা। এই আলোকের ঝর্ণাধারার স্বচ্ছগতি,  আবেগমথিত সুর সহজ সরল মাটির কাছাকাছি আটপৌরে খাটোয়া মানুষজনের প্রেরণার উৎসমূল।

এই এলাকায় আগত আর্যরা প্রথমে ছিলেন বনচারী।  তারপর পল্লীবাসী হলেন।  প্রথমে তাঁদের ধর্ম বলতে ছিল ধেনু আর জীবিকা মানে ছিল পশুচারণ। আর্যরা যখন পশুপালনজীবী তখন পুরুলিয়ার আদিম অধিবাসী অস্ট্রিক এবং দ্রাবিড় গোষ্ঠীর প্রধান জীবিকা ছিল কৃষিকাজ। অস্ট্রিক ভাষাভাষী লোকজনের কাছ থেকেই আর্যরা কৃষিকাজ শিখেছিলেন।

যেহেতু কৃষিকাজ এবং পশুপালনই এখানে বাঁচার মূলমন্ত্র,  তাই স্বতোৎসারিত প্রাচীন পূজা-পার্বণগুলির বেশিরভাগেরই মূল কথা উৎপাদনের জন্য আরাধনা; সন্তান-সন্ততিদের দুধে ভাতে রাখার মনোবাসনা।

তাই ভাদু, টুসু, করম,  জাওয়া, ইঁদ, ছাতা,  ইতু,  জিতা –সকল পালা-পার্বণ বা  ব্রত ইত্যাদিরই অন্তরালে রয়েছে উৎপাদন বাসনা।

তেমনি এখানে এখনো যে লৌকিক প্রবাদ প্রবচন গুলি ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে,  ইতস্তত প্রক্ষিপ্ত শাল পলাশের মতো,  সেগুলিরও বেশির ভাগই যেন কৃষিকথা। একসময় কৃষি পরিবেশ থেকেই সেগুলির জন্ম। আবার আজ মনে হয়, সেগুলি যেন পশুপালন ও কৃষি কৃষ্টির নির্দেশমালা। আসলে এতো প্রাণবন্ত, জীবন্ত সেই সকল প্রবাদ যে দ্বন্দ্বে পড়তে হয়, তাই তো কৃষি অভিজ্ঞতা থেকে এগুলোর উৎপত্তি নাকি এগুলোই কৃষি উৎপাদন কর্মের নিয়মগাথা।

এই জেলার এক বহুল প্রচলিত প্রবাদ “কার-ও পৌষ মাস, আর কার্-অ সব্বনাশ”।

সর্বনাশের উল্টোপিঠে সব পেয়েছির তাৎপর্যটি কৃষিনির্ভর পুরুলিয়ার আলো-হাওয়ায় সুপরিস্ফুট এবং অনুভবযোগ্য।

পৌষ মাস পুরুলিয়ার কৃষিজীবী মানুষের চোখে পূর্ণতার প্রতীক। আমরা শুনতে পাই পল্লীপ্রেমিক কবিগুরুর পরিচিত কণ্ঠস্বর :  “ডালা যে তোর ভরেছে আজ পাকা ফসলে …”। প্রাচুর্যের স্বর্ণময়ী পৌষ তো কৃষক,  শ্রমিক, ক্ষেতমজুরের জীবনে সম্বৎসরে একবারই আসে। বাতাসে ভেসে আসে যেন মহালয়ার ভোরবেলার আবাহন সঙ্গীত : “আসচে মকর দুদিন সবুর কর, তরা বাঁকা পিঠার জগাড় কর …”।

সত্যিই মকর মানে সে কী লাবণ্যে পূর্ণ দেহ, সে কী আনন্দধারায় বিগলিত প্রাণ! এই মকরের প্রকৃত সূচনা অঘ্রাণ সংক্রান্তিতে। জেলার কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে অঘ্রাণের গৌরব ও গুরুত্ব অপরিসীম । মাঠের ধান ঘরে আসে। কর্মহীন কাজ পায়। শূন্য গৃহ হয় পূর্ণ। তাইতো এমন প্রবাদ জমে ঝুলিতে  — “আঘন মাসে চু’টার্ অ সাতটা বহু”। এখানে হয়তো বড়লোকি ঠাট -এর প্রতি শ্লেষ আছে। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা শ্রী ও সম্পদের সংশয়াতীত স্বীকৃতি রয়েছে। ভাদরে যখন রাজার ভাঁড়ারও খালি, তখন যে কৃষক এক দুখিনী গৃহিণীকে একমুঠো ভাত দিতে পারে না, পৌষে সে সাতটি বউকে ভাত দেবার ক্ষমতা ধরে। ভাদর তো সব অর্থেই “শূন্য মন্দির”। যে কৃষক ভাদরে সামান্য দু’মুঠো ভাতের জন্য কাঙাল, অঘ্রাণ পৌষে সে সাজিয়ে তোলে রসনালোভন পিঠের থালা।  

কিন্তু এ সবই নির্ভর করে আষাঢ়-শ্রাবণের ভালো বৃষ্টিপাতের ওপর। এখানে মৃত্তিকা অনুর্বর,কাঁকড়যুক্ত,  দ্রুত ধৌত ও মৃদু জলধারণ শক্তি সম্পন্ন। জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদী কংসাবতী বা কাঁসাই,  কুমারী, সুবর্ণরেখা, 

টটক, কারও যৌবন তেমন উচ্ছল, উজ্জল গতি তরঙ্গময় নয়। আজও এখানে জলসেচের সুচারু বন্দোবস্ত নেই। আকাশের প্রসন্ন দাক্ষিণ্যের উপরই নির্ভর করেই চাষবাস সম্পাদিত হয়। তাই তো এমন রসঘন প্রবাদটি জন্ম নেয় – “চাষ নাই বাস,  টুরুই ব্যাঙের আশ”। অর্থাৎ চাষের কোনও নিশ্চয়তা নেই, যদি প্রবল বৃষ্টিপাত হয়, তবেই উগাল, সামাল,  জাবট, কাদা। আর চারাতলা রোপন।

এখানকার চাষজমির জল ধারণের ক্ষমতা এবং বৃষ্টির জল বয়ে আসার সুবিধা অনুপাতে তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত । বাদ, কানালি ও বহাল । বাদ জমিতে জলের আধার কম। কানালিতে মাঝামাঝি আর বহালে বেশ ভালো । তবে এখনকার অধিকাংশ জমিই বাদ জমি। যে সকল জমির চাষ নির্ভর করে “টুরুই ব্যাঙ” ডাকার ওপর । “টুরুই ব্যাঙ”   হলো এমন এক প্রজাতির ব্যাঙ, যারা টানা চার-পাঁচ দিন প্রবল বৃষ্টি না হলে ডাক ছাড়ে না। এই প্রবাদটির প্রায় সম মানের আর একটি প্রবাদ রয়েছে – “জল পড়ে গা’দে ,  ধান লাগাব বা’দে”। একই উচ্চারণ, একই প্রত্যাশা – প্রবল বর্ষণ।

আবার বহাল জমিতে চাষের ক্ষেত্রে এক বিপরীতধর্মী অনিশ্চয়তা। বহাল জমি সাধারণত নদী জলাধারের জলস্রোতের সঙ্গে সংযুক্ত। এখানকার মূল নদী বাঘমুন্ডি পাহাড় থেকে উৎপন্ন,  দক্ষিণ-পূর্ব অভিমুখে প্রবাহিত। সৃষ্টি হয়েছে অনেকগুলি উপনদী ও শাখা নদী।  আবার শাখা নদী ও উপনদী থেকে বেরিয়ে আসা ছোট ছোট জলাধার গুলি স্থানীয় ভাষায় জোড় নামে পরিচিত। বহাল জমি এগুলির সাথে কোন না কোন ভাবে সংযুক্ত। পুরুলিয়ার উচ্চভূমি বাঘমুন্ডি এলাকায় হঠাৎ বৃষ্টি হলে আচমকাই নদীতে বন্যা নামে। এর নাম “হড়পা বান”। হড়পা বান এলে নদীর নিম্নবর্তী এলাকার জমির ধান নষ্ট হয়ে যায়। পঁচে গলে যায় । সেই দুর্ভাবনা থেকে সঞ্জাত প্রবাদ “নদীধারের চাষ, আর মিছাই কর আশ”। স্থানভেদে  “নদী নাময় চাষ , মিছাই কর আশ”।

কৃষিকাজ যে এখানে আজও প্রকৃতির করুণার উপর নির্ভর এবং আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার নিতান্তই নগণ্য সে কথাও নানা প্রবাদ থেকে সকালের আলোর মতোই সুস্পষ্ট। একটি প্রবাদ “অবলার সঙ্গে চাষ, আর অদেখার সঙ্গে গৃহবাস”। অবলা মানে গরু, মোষ আর অদেখা মানে প্রকৃতি, মৌসুমী বায়ু, নিম্নচাপ । সমগোত্রীয় একটি প্রবাদ  “রাজার হাতি ঘড়া, চাষার গরু কাড়া”।

ট্রাক্টর, রোপন ও নিড়ান যন্ত্র খুব একটা জায়গা করে নিতে পারেনি এখানকার এক ফসলি কৃষি ব্যবস্থায় । তাই “হাল বাহে ব্যাটার বাপ” প্রবাদটি এখনো এখানে মুখে মুখে ফেরে। যার হাল আছে অর্থাৎ লাঙ্গল ও বলদ বা কাড়া আছে , যে লাঙল বাইতে পারে , সে ব্যাটার বাপ । “বেটার বাপ” শব্দবন্ধটি এখানে সৌভাগ্যবান ও ক্ষমতাবান শব্দ দুটির একত্র পরিপূরক , পৌরুষের দ্যোতক ।

পৌরুষত্ব বোঝাতে মরদ, মদ্দানি শব্দগুলির ব্যবহার আছে এতদঞ্চলে। যার কথার বা জবানের মূল্য নেই তাকে অলস প্রকৃতির বলদ এর সাথে উপমিত করা হয়েছে একটি প্রবাদে । প্রবাদটি হল “কথা কাটা মরদ , আর পঁদ ঠেলা বলদ”। এই “পঁদ” শব্দটি ঘুরে ফিরে একাধিক প্রবাদে এসেছে। তথাকথিত ভদ্র সমাজে শব্দটি ইষদাশ্লীল মনে হলেও, তা নয়। এর ব্যঞ্জনা টি অসাধারণ;  প্রয়োগ গুণে শব্দটির অর্থ দাঁড়ায় নেপথ্য শক্তি, বল , কোমরের জোর । “পঁদ ঠেলা বলদ” কে লেজ মোচড়িয়ে, পাছায় লাঠি মেরে লাঙ্গল চালাতে হয়।  অথবা  এক হাল বলদ -এর মধ্যে তেজস্বী বলদ কে এক কাঁধে করে হাল চালাতে হয়। কৃষক সুকৌশলে জোঁয়ালে দড়িটি এমনভাবে বাঁধেন যে অলস গরুটির পরিশ্রম কম হয়। অন্য একটি প্রবাদ “পঁদের যু’ত নাই আঠর বিঘার আঁক চাষ”,  বলতে চাওয়া হচ্ছে শক্তির বাইরে গিয়ে কাজ করার ব্যর্থ প্রয়াস।

তাহলে কৃষিকাজে যেমন বলবান কৃষিশ্রমিক দরকার তেমনি তেজস্বী কাড়া- বলদও প্রয়োজন। তার সমর্থনে শুনতে পাই “ছাগল দিয়ে চাষ হ’লে কেউ গরু পু’ষথ নাই”। আবার কম পয়সার বলদেও ভালো চাষ করা অসম্ভব। কারণ “কম পয়সার গরু ভিতা পায়না” । “ভিতা” হল চাষ জমির আলের অব্যবহিত পার্শ্ববর্তী অংশ। দুর্বল গরু দিয়ে লাঙ্গল বাইলে লাঙ্গলের ফলা সেখান পর্যন্ত যায় না।

চাষ শারীরিক পরিশ্রমের ফসল। মাঠে চাষবাসের কাজ করলে দেহসৌন্দর্য লোপাট হয়ে যায়। লোকে বলে “চাষে রূপ নাশে”। শক্তি ক্ষয় হয় । তাই সাধারণ বাণী ঘুরে বেড়ায় –“কমরে যদি আছে বল, তবে মুঢ়া কদাল ধর”। চাষবাসে যত্ন-আত্তি, মেহনতের বিষয়টিও বেশ মূল্য পেয়েছে প্রবাদে। “অল্প চষি বিস্তর ঘা”। তাহলে ভালো চাষের জন্য বারবার লাঙ্গল দেবার কথা বলা হচ্ছে। বলা হচ্ছে “চাষা চিন্ হায় আ’ড়ে আর তাঁতী চিন্ হায় পা’ড়ে”। যত্নবান কৃষকের ক্ষেতের আলটি গৃহীর সুন্দর করে গুছাটি দেওয়া উঠোন, দাওয়া, ধারীর মতো চকচক করে। এটি তাঁর আভিজাত্যের, যত্নশীলতা এবং রুচি ও নৈপুণ্যের পরিচায়ক। যেমন তাঁতীর পরিচয় তার তৈরি শাড়ির পা’ড়ে, আঁচলের কারুকাজে।

কিন্তু কৃষক যদি অনভিজ্ঞ হয়, বোকা হয়, তাহলে তার পদে পদে বিপদ। বোকা চাষার “কাটানো জল যায়, ভুলুকে তালি দেয়”। সে জানে না যে, “আগে রঁদ,  পরে খঁদ”। ধান গম ছাড়াও অন্যান্য শাক-সবজি আনাজপাতি চাষের জন্য আগে বেড়া তৈরির ব্যবস্থা করে পরে চাষের কাজ শুরু করতে হয় । তা না হলে সেই “লাভের গুড় পিপঁড়ায় খায়”।

কৃষিকাজে প্রচুর প্রতিকুলতা। বীজ বোনা থেকে ফসল খামারে এবং খামার থেকে ঘরে তোলা পর্যন্ত ঝঞ্ঝাট ঝামেলার শেষ নেই। তাই এখানকার লোকে বলে “চাষা ভাবছিস কী মনে মনে, চা’দ্দিকে তর ঘোঘ (জলস্রোত) ছুটচে, চাপ দিবি তুই কন খেনে”। কৃষিকাজ মানেই অনিশ্চয়তা। আজ যে রাজা, কাল সে ফকির। “চাষার দিন সাত তালে বয়, কখন যে কি হয়”। তবুও “আশায় মরে চাষা” যেমন “ধ্যানে মরে যোগী”। সত্যিই তো “পুরুষের দশ দশা”।

তবে কৃষিকাজে পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের অবদান অধিকতর। চালি ধানে থুপি দেওয়া, বীজ বোনা,  চারা তোলা, চারা বসানো, আগাছা নিকানো, ধান কাটা,  আঁটি বাঁধা, ধান ঝাড়া, ধান পরিষ্কার করা – এক কথায় সূচনা থেকে উপসংহার পর্যন্ত তাদের অবদানই বেশি। তাই নারী হৃদয়ের অনুশোচনা জাত একটি জীবন্ত প্রবাদ “ভাত দেয় কি ভাতারে , ভাত দেয় গতরে”। “ভাতার” শব্দটির অর্থ – “যে ভাত দেয়”। লোকসমাজ ভাতার অর্থে স্বামীকেই বোঝে। স্বামী স্ত্রীকে ভাত দেয় অর্থাৎ তার ভরণ পোষণ করে স্ত্রী গতর খাটায়  বলে ; শারীরিক পরিশ্রম করে বলে। আঞ্চলিক পরিভাষায় “সুয়াং খাটায়” বলে।

কৃষকের কৃষিকাজ তো শুধু নিজের পরিশ্রমেই সম্ভব নয়,  বেশির ভাগটাই সাধিত হয় কৃষি-শ্রমিক, দিনমজুরদের দ্বারা।  শ্রমের দৈনিক মজুরি নিয়ে মনোমালিন্য হয় মনিবের সাথে শ্রমিকের। অসহায় শ্রমিক বিপদে পড়ে কম মজুরিতে কাজে যেতে বাধ্য হয়। কিন্তু তার মনের ভাবনাটি তখন এইরকম: “কী ক’রব্যাক বেতনে, মা’রে দিব খেটনে”! যেহেতু গলা বা মনিব নাহ্য বেতন দেবেনা, তাই সে কাজে ফাঁকি দেবে। বিড়ি, চুটি টেনে; মন্থর গতিতে কাজ করে সময় পার করে দেবে। এমন পরিবেশে উত্থিত হয় জীবন্ত একটি প্রবাদ – “গলা গেল ঘর, ন লাঙ্গল তুলে ধর”। হালের গরু চলছে তো মন্থর গতিতেই চলছে। দিনমজুর হালের বোঁটায় হালকা ভাবে হাত দিয়ে আছে, কোন শক্তি প্রয়োগ করছে না,  ফলে আর লাঙ্গলের ফলা মাটির গভীর পর্যন্ত যাচ্ছে না ।

বাস্তব জীবন অভিজ্ঞতা থেকে কিছু সংস্কারেরও জন্ম হয়েছে। সেগুলো কুসংস্কার না কোথাও কোনো যুক্তি কেন্দ্রিক, তা বলা মুশকিল । যেমন “অমাবস্যা, পূর্ণিমায় ধরে হাল, তার দুঃখ চিরক্কাল” । প্রবাদটি একটু ভিন্ন রূপেও ঘুরে বেড়ায় “অম্বুবাচীতে ধরে হাল, তার দুঃখ চিরক্কাল”। আবার বলা হয় “আকালের মেঘ সকালে”। অর্থাৎ ভোরবেলা থেকে মেঘ ঘনিয়ে এসে সকালে বৃষ্টি হলে বুঝতে হবে এবার ভালো বর্ষা হবে না। আকাল বা খরা অবশ্যম্ভাবী। কেউ বলে, “শাবন পু’বা ধল্ল ভাই, বলদ বিকে কিন্অ গাই”। শ্রাবণ মাসের শুরু থেকেই যদি পূর্ব দিক থেকে বৃষ্টি নামে , তাহলে বুঝতে হবে অকালে বর্ষা-বিদায় নেবে । অতএব “সাধু সাবধান” বলদ বিক্রি করো আর গাই কিনে ফেল।

এসব প্রবাদকে বিজ্ঞানমনস্ক সুধীজন কুসংস্কার বলতেই পারেন, কিন্তু পুরুলিয়ায় এলে এখনো দেখা যাবে “মেঘ ধরেছে ঈশানে, তো কাঁধে কোদাল কিষানে”র। আজও মানুষের স্থির বিশ্বাস ঈশান কোণে মেঘ যখন ধরেছে, তখন বৃষ্টি নামবেই। সচেতন কৃষক আগেভাগেই কাঁধে কোদাল নিয়ে চাষ জমির দিকে এগিয়ে চলেছে, বৃষ্টি নামলো বলে, কোদাল দিয়ে তো আল বাঁধতে হবে; তা না হলে জল পালিয়ে যাবে যে। কাল সকালে ধান রুইবে কেমন করে? চাষার তো সেই আশা-ই বাঁচার সম্বল।

 

ছবি: এস. এইচ. রাজা

পূর্ববর্তী সংখ্যা

এখন বাড়িতে বসেই সংগ্রহ করতে পারবেন আমাদের প্রকাশিত বইগুলি। ভিজিট করুন আমাদের অনলাইন সপ, আর কিনুন আমাদের বই। নিচের BUY NOW বোতামে ক্লিক/ট্যাপ করলে পৌঁছে যাবেন আমাদের সপ পেজে।