সাপ্তাহিক কবিতা আশ্রম, ১১ পৌষ ১৪২৭
সাপ্তাহিক
১১ পৌষ ১৪২৭
Painting: Tony Soulie
নির্মল হালদার
কবিতা
যতই চন্দ্রহার গলাতে দোলাও
যতই ঝমর ঝমর করুক
আমাকে নিঃশব্দে নূপুর শোনায়
আমার টগর,
অপরাজিতা।
যতই গরব দেখাও সোনাদানার
যতই ঝলমল করতে থাকুক
আমাকে নীরব গীতের রং দেখায়,
আমার অন্তর।
২
তেজপাতা পরশ্রীকাতর
যেখানেই যাবে যার কাছে যাবে
গন্ধ ছড়াবে নিজের।
কেউ কেউ নিকটে এসেও
আমাকে করেছে শূন্য। কেউ কেউ
আমাকে নখ দিয়ে ছুঁয়ে দেখল না।
নিজের বুকেই পুঁতব তেজপাতার গাছ
দেবাশিস চন্দ
ভয়
ভোরের আলোয় হাঁসেদের চঞ্চল জলচুম্বন
সন্ন্যাসগম্ভীর পুকুরের জল তবু কথা কয় না
কতদিন হয়ে গেল যুবতীর আঁচলের ছায়া
পড়ে না, স্তনবৃন্তের কুসুমিত তাপে শরীর
সেঁকতে না পারার দুঃখ নিয়ে শুয়ে আছে
ঝুকে পড়া গাছ উঁকি মেরে দেখে
কেউ কোথাও নেই, শুকনো পাতা ঝরে
এত বেশি স্থির যে তাকাতে ভয় করে
রবীন বসু
অন্তিম পর্বে এসে
এই বেলাশেষ
সব আফশোস নিয়ে দাঁড়িয়েছে গাছ।
নিজস্ব ছায়ার চিহ্নে আকুলিবিকুলি করে স্মৃতি
উঠোনময় পড়ে থাকা ধান, আল পথে উড়ন্ত
ফড়িং সেও তো গমনের ক্লান্তিতে শ্লথ;
মেলাফেরত মানুষজন, ঝুমঝুমি বাজনা
পৌষ সংক্রান্তির শেষ হয়ে আসা বেলা
আপন মগ্নতায় খোঁজে পুণ্যের হদিশ;
তোমারও তো পাপপুণ্য আছে, খেলাঘর
মিথ্যে সাজানো সংসার, খসেপড়া পাতা
তির তির গোপন মনখারাপ, না-মানার
সবটুকু রাত্রি জল তোমাকে কাঁদায়;
যে হাত ছেড়েছে আগে তার স্পর্শটুকু
লেগে আছে শুধু; বিস্তৃত অরণ্য থেকে
মুঠোভর্তি সবুজ যার মুখ এঁকে রাখে
তাকেও তো স্মৃতি মনে করে হেঁটে যেতে পারো;
বালক হারায় কিছু, জীবন তো অনেক
স্বপ্নের ঘড়িঘর, চাঁদের বাড়ি
নাগাল রহিত হয়ে মানুষটাই উবে যায় শেষে;
অন্তিম পর্বে এসে নাটক তবু জমে ওঠে খুব।
মঞ্জরী গোস্বামী
তোমার কাছে যাব
যদি কান্না ফুরোয়
তোমার কাছে যাব
আশেপাশে পড়ে আছে
মরচে ধরা ছুরি কাঁচি
অথবা ক্লান্ত তলোয়ার
ভাবি আর চমক লাগে সারা গায়ে
কোথায় গেল সব হাহাকার
রক্তাক্ত শিমূল হওয়ার
সব দুঃখ মোম হয়ে গেলে
আমি তোমার কাছেই যাব
জ্বলতে জ্বলতে পোড়া পুড়তে পুড়তে ছাই
অস্থিকলস নিয়ে ভেসে যায় অনন্ত চিৎকার
হারাধন চৌধুরী
প্রথম গগনবিহার
এই আকাশেই দেখা হয় সবার সাথে সবার; তবু কী ভীষণ লুকোচুরি ভালোবাসি আমরা; পলকের ভাঁজে ভাঁজে ঘুম পাড়িয়ে রাখি পোষ্য বেড়াল, পাছে সঙ্গদোষ পেয়ে বসে লাল রুমালের, নীলবনে যেমনটা হয়েছিল সিন্ধুঘোটকের সাথে; আফ্রিকান ভ্যালির রূপকথা ভুলে গেছে বহুতলের সুইমিং পুল, না-হলে এই জামিন-অযোগ্য বিস্মরণ স্বাভাবিক নয়; তবু দ্যাখো সিন্ধু সেচে আনা মু্ক্তোগুলোর জেনারেশন ওয়াই তেঁতুলপাতার জীবন কাটিয়ে দিচ্ছে অনায়াসে; আকাশের স্নিগ্ধ ফলগুলির দিকে অপলক চেয়ে থাকো কিংবা একটি গনগনে অমৃতের জিহ্বায় সর্বস্ব আহুতি দাও, ফলাফল ইতরবিশেষ নয়; এই আকাশেই দেখা হবে সবার সাথে সবার; কড়া নাড়ছে বড়দিন, তুমি চাইলে এই দিনটিতেই উদযাপন হতে বাধা নেই তোমার প্রথম গগনবিহার।
Painting: Tony Soulie
“হৃদয়ের গান শিখে তো...”
পর্ব-৪
ফাল্গুনী ভট্টাচার্য
“ফাগুন ফাগুন ডাক পাড়ি।
ফাগুন গেছে কার বাড়ি?”
ফাগুন যায় গো এ বাড়ি। ও বাড়ি আর সে বাড়ি।
দাদু ডেকে যায় ‘ফাগুন ফাগুন’
ঠাকুমা ডাকে ‘কপিল কপিল’
দাদু ডাকে ‘জয়া জয়া’
ছোটকা ডাকে ‘কপিল কপিল’
সারাদিনে যে কতবার এই সব ডাক আসে। তোমরা তো অনেকগুলো ভাইবোন। জন্মে থেকে ভালো ক’রে মায়ের কোল পাওনি। একটু হাত পা শক্ত হতে হতে আর একটা ভাই বা বোন এসে গেছে। মায়ের তো কাজের অন্ত নেই। সকালের বাসি কাজ, গোবর চটকে মেখে ঘুঁটে দেওয়া, মুড়ি ভাজা, ভাতের যোগাড় করা, সোডায় সেদ্ধ করা কাপড় নিয়ে পুকুরে পাটা ফেলে হেঁচ্চো হেঁচ্চো করে কাচা, বাবা না পারলে গোরুর জন্য ছানি কাটা, শুকনো ডালকাঠি এনে উঠোন খামাড়বাড়ি গোবর দিয়ে নিকোনো,- নঙ্কার কাজ। মা তোমাকে কুকুর বাঁধা চেন-এ বেঁধে রেখে বাড়ির কাজ করে। তুমি তখন আড়াই বছরের, মনে করতে পারবে না। একদিন মাখলে তো কুকুরের গু? এ ম্যাগো ম্যাগো কী কাণ্ড কী কাণ্ড। মান্তু পিসি এসে মাকে কী বকুনিটা দিল- ‘এ কি রাণু, ছেলেটাকে মেরে ফেলবে না কি?’ রাগ করে চেন খুলে তোমাকে নিয়ে গেল। মান্তু পিসির বাড়িতেই বড় হলে ধীরে সুস্থে। কত ভালোবাসতো পিসি। তোমাকে না রুটি বানানো শিখিয়ে ছিল! তুমি কেমন গোল গোল বেলতে আর পিসি সেঁকত। আর হিং দেওয়া আলুর তরকারি? শেষবেলা তোমার হাতে রুটি আর তরকারি দিয়ে শান্তি। কানে একটু কম শুনত পিসি, তাই একটু জোরে জোরে কথা বলতো- ‘যা ফাগুন পড়তে বোস’। মান্তু পিসির ভালো নাম শান্তিলতা। অনেকগুলো ভাইবোন। তাই বামুনপাড়ার এই ক’বাড়ির ফাই-ফরমাস খেটে দেবার জন্য তোমরা হলে অনেকজন। উৎসব-অনুষ্ঠানে-ভোজে যেমন অনেকগুলি পাতা লাগে, অনেক পেট বলে প্রচুর পরিমাণে অন্ন ধ্বংস করো। তেমনি অন্যদিকে তোমরাই এই ছায়াময় গাঁয়ের ঢেউহীন বদ্ধ জীবনে নিয়ে আসো দোলন-আন্দোলন। যখন ক্লান্ত সন্ধেবেলা ধূপ-প্রদীপ জ্বেলেই সবাই চারটি খেয়েই সাত-সাড়ে সাতটার মধ্যেই ঘুমোতে চলে যায়, তোমরা তখন বারান্দায় দিদিমার দেওয়া লন্ঠনটিকে ঘিরে গোল করে বসেছ। বই খুলে জোরে জোরে কবিতা পড়ো-
“কুল-পাংশুলার গর্ভে জনম যাহার
সেই দাসীপুত্র হবে মেবারের রাজা?
খদ্যোতে হরিয়া লবে দ্যুতি চন্দ্রমার?
মৃগেন্দ্র-বিক্রমে বনে বিচরিবে অজা?…
যা কিছু হা হা হো হো হাসি, যাকিছু না পাবার মিউ মিউ কান্না শুধু তোমাদের ঐ মাটির উঠোনে।
দাদু ডাকে- ‘যা ফাগুন, দোকান যা এইটা নিয়ে আয়।’ ঠাকুমা বলে-‘যা তো ওকে ডেকে নিয়ে আয়।’
ছোটকা বলে- ‘এই কপিল, যা তো ছাগলগুলো বেঁধে দিয়ে আয়।’
মেজকা বলে- ‘যা খুশিলে পুকুরে, দেখ তো কে যেন আমের ডাল কাটছে।’
রাঙাপিসি এসেছে, আবদার করে বলে- ‘ও জয়া যা তো এই কাপড় দু’টো বাগানের তারে মেলে দে।’
ঠাকুমা বলে-এই তুই যা তো রেশন তুলে আন- এই! তুই কি একবার কোপাই যেতে পারবি?
এই, তুমি যাও তো ভাই কেঁউদহ, পুরুত মশাইকে খবর দাও।
‘পারব না’ বলার জো নেই।
‘যাব না’ বলা যাবে না।
‘পারছি না’ বলতে নেই। বলা যাবে না।
দাদু বলত, ডাকলে ‘কী’ ‘কী বলছ?’ ‘‘কী গো’ বলতে নেই। বলতে হয় ‘যাই’। বলতে হয় ‘আসছি’।
দিন চলে যায় কাজের স্রোতে। নানান কাজ। ইস্কুল থেকে ফিরে আবার টো টো করে এ পাড়া সে পাড়া ঘুরে বেড়ানো। পুকুর পাড়ে নানান গাছ অজু জেঠার রাধাপুকুরের পাড়ে বারোমেসে পেয়ারা। বাইরে সবুজ ভেতরে গোলাপি। আহা কি স্বাদ। মাঝের গড়েতে নোনা আতা পাকছে। কদম গড়ের পাড়ে কুরুত জাম মানে ক্ষুদি জাম পাকছে। তার পাশেই হেলে দাঁড়িয়ে আছে মিষ্টি আমড়া দুপুর বেলায় চুপিচুপি পাতকাটা দিয়ে পাড়তে হবে। একটু নুন লাগবে। ছেলেপিলেরা দুপুরবেলা কেউ ঘুমোয় না। বায়েনপাড়ার ছেলেমেয়েরা মজুমদারদের জলার ধারে গোরু চড়ায়। ছাগল ভেঁড়া টানা দেয়। ওদের সঙ্গে ডাং গুলি ঝেল্লু খেলতে যায় বামুনপাড়ার পাড়ার ছেলেরা। বাণীকন্ঠ যার ডাকনাম বানাই, গানের গলা বেশ সুরেলা, গোরু চড়াতে চড়াতে গান ধরে-
“শুনো শুনো অ(ও) কিশুরি (কিশোরী)
তুমার লেগে এই বাঁশুরি
আর কত দিন কাঁন্দাইবি
আমার পেরাণ জ্বালাইবি
দইয়া করে কদমতলায় আয়…”
কোন সে কিশোরী! যাকে বানাইদা গানে গানে অমন করে ডাকতো? সে তো আজও তুমি জানতে পারলে না ফাল্গুনী। সেই কেষ্টযাত্রার রাধা সাজা ছিপছিপে মায়া আর করুণায় ঢলোঢলো মেয়েটির মতো কাউকে কি ভালবেসেছিলে বানাই দা? ভাই কপিল সেভেনে পড়ছে। গোটা বিশেক ছাগল নিয়ে পুকুরপাড়ে, আখজমির ফাঁকে, কুর্তি-কলাই জমির ধারে চরাতে যায়, ঘাস দেয়। আর ভাত-মুড়িটা জুটেও যায় ঐ বাড়িতে। আর তুমিও নিত্যপূজা আর ফাই-ফরমাস খাটছ বলে তোমারও জুটে যায়
ভাত। দাদুর পাতে।
প্রথম বর্ষার জল পেয়ে রাণিবাহার চিনিচম্পা আখগাছ সবুজ লকলকে পাতা ছড়িয়ে হাসছে। ওদের হালকা দুধে-আলতা রঙের কোমর বেঁকে নেচে উঠছে। এবার পাতার বাঁধনে বেঁধে ফেলতেই হবে। না হলে কমবয়সী কিশোরী তন্বী আখগাছগুলো এ-ওর গায়ে ঢলে পড়বে। কুর্তি কলাইয়ে শুঁটি ধরেছে। শুঁয়োপোকাদের খুব উৎপাত। কদমগড়ের পাড়ে আতাবনে মোটা মোটা আতা কপিল দেখে রেখেছে। আজকালে পাড়বে। পেকে লুললুলে হল বলে। বড়দা অন্ডালে বড়কাকার বাসায় থেকে হায়ার সেকেন্ডারি পড়ে। একমাসের ছুটিতে দাদা, বড়কাকারা আসছে, বুড়ো এলে একসঙ্গে আতা খাবে। ছোটকাকার ছাগলগুলোর মধ্যে বেশির ভাগ পাঁটি আর খাঁসি। একটা মায়ের তিনটে করে ছানা। ম্যা ম্যা ম্যা ম্যা করে। ওর মধ্যে দু’টো বড় পাঁঠা আছে দুধ-সাদা রঙের। বোশেখ মাসেই ছানা দুটো কিনে এনেছে। এই ক’মাস কপিল ওদের চরিয়ে বড় করবে। তারপর কালীপুজোর রাতে খুঁটোয় ভরে “জয় মা ঝিং…”। কপিলের তখন খুব কষ্ট হবে। আড়ালে দাঁড়িয়ে কাঁদবে। বলির মাংস
পাতে পড়লে কপিল খেতে পারে না কেবল শোনে একটা সাদা পাঁঠার তীব্র বাঁচার আকুতি- ম্যা ম্যা মা মা মা মা… সারাদিন মাঠে-ঘাটে ঘুরে কপিলের পা ফাটে। পায়ের তলা জ্বালা করে। লন্ঠনের আলোয় বসে বই -এর পড়ায় আর চোখ চলে না। ঢুল আসে। তোমারও পড়া এগোয় না। রাতের রেডিও গান শোনায়-
“কত দূরে আর নিয়ে যাবে বলো কোথায় পথের প্রান্ত
ঠিকানা হারানো চরণের গতি হয়নি তবু ক্লান্ত?”
Painting: Tony Soulie
গত নভেম্বর থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত সন্মাত্রানন্দের অসামান্য উপন্যাস 'মেঘবতী'-র বারোটি অধ্যায় পড়ুন
পূর্ববর্তী সংখ্যা
পড়তে পারেন:
এখন বাড়িতে বসেই সংগ্রহ করতে পারবেন আমাদের প্রকাশিত বইগুলি। ভিজিট করুন আমাদের অনলাইন সপ, আর কিনুন আমাদের বই। নিচের BUY NOW বোতামে ক্লিক/ট্যাপ করলে পৌঁছে যাবেন আমাদের সপ পেজে।