সাপ্তাহিক কবিতা আশ্রম, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৭
সাপ্তাহিক
১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৭
Painting: Vincent van Gogh
তপন পাত্র
চাষবাস
হেমন্তের খোলা মাঠে সারি সারি শুয়ে আছে
বড়ান ধানের আঁটি
আদিবাসী হোস্টেলের আবাসিক ছাত্রদের মতো।
পাড়ার ছেলেরা বলছে—
ঝড় উঠেছে তামিলনাড়ুতে,
তার ঢেউ আসতে পারে পুরুলিয়াতেও।
আকাশে ছন্নছাড়া মেঘ,
দু’দিন পর রাস পূর্ণিমা
আবছা জোছনায় হড়বড় ক’রে
ক্ষেতের মাঝে ধান আঁটি গুলি
দুইপাশে জাঁগি দিচ্ছে সুকুমার, শক্তিপদ,
লালটু আর রেবতী মোহন।
গরুর গাড়ি নিয়ে বারবার ক্ষেত যাচ্ছে,
খামার ফিরছে জলধর কাকা।
বাঁদিকের কুঁইলা গরুটার ল্যাজ মচড়ে
হুঁকরি পিটে বলছে,
হীঁ—চল শালা—জোরে চল, চল্ …
খেজুর ডালের বেড়া দেওয়া খামার দুয়ারে
দাঁড়িয়ে প্রহর গুনছে পারুল খুড়ি।
কাঠের লিঘায় সান দিতেও অবসর হয়নি আজ।
ওই তো আবার ক্যাঁচের ক্যাঁচের শব্দে
ভেসে আসছে ধান লাড়ার শুভ সমাচার।
উজ্জ্বল রায়
অগ্নিশিখা
নীলকন্ঠ পাখির ডানায় ডানায় পালকের
পরিবর্তে কেমন ছত্রাক গজিয়ে উঠেছে আজ।
নিহত নক্ষত্রের শরীর বেয়ে উঠে আসছে
কামদুনি থেকে হাথরাস পোড়া পৃথিবীর গন্ধ;
আজ যেন কোন যন্ত্রণার হাহাকার নেই, কেবল
বোবা বাতাসের শ্বাস প্রশ্বাস ছাড়া; যে অগ্নিশিখায়
লেখা আছে প্রথম রন্ধন প্রণালীর শ্বাপদের দগ্ধ
অবয়ব কথা, তার বদভ্যেসে সে যেন আজও
ঝলসে দিচ্ছে নির্ভয়ার জ্যান্ত শরীর।
বিটু দাস
শীত বালক
বিকেল জ্বললেও মেয়ে, শীত বালকের মতো
একাকী জানালা দিয়ে অঙ্কুরোদগমের
আকাঙ্ক্ষাও রাখতে জানে।
জানালার কাচে হাত রেখে বায়ু মুছতে মুছতে তুমি
যেসব অব্যক্ত অশ্রু ঝির ঝির করে
অনবরত ঘুরপাক খায় আমাদের উদগমের পথে
আলোর সরল ছড়িয়ে পড়তেই ডালে ডালে
নিষ্পাপ খেলে বেড়াচ্ছে পাখি।
শান্ত মূর্ছা তার ডানার পালকে,
অন্তত ডাকনাম দিও,
এক পঙক্তি হতে আরেক চরণে যেতে
যে সময় লাগে মানুষের
সেটুকুও দিও।
মীম মিজান
তুমি যেও না সেখানে প্রসূন হাতে
তুমি ওখানে যাবে না!
তোমার হাতে করে বয়ে নেয়া প্রসূন
অর্পণ করবে না!
আমার শরীরের সারে পুষ্ট হবে লতা-পাতা।
সেই লতা-পাতার ভালোবাসা
আমাকে করবে মোহিত।
তোমার দেয়া ফুলে ঐ চতুষ্কোণে
আমি অনুভব করব দাবানল।
আমার অবস্থান হবে ভিসুভিয়াসে।
তুমি ওখানে যাবে না!
তোমার হাতে করে বয়ে নেয়া প্রসূন
অর্পণ করবে না!
ডাহুক ডাকবে, আমি শুনব।
তার সুরের মোহনায় আমাকে ভাসাব।
আমি তো ডাহুক, তোমায় ডেকেছিলাম সদা।
কিন্তু আয়েশের জন্য
আমাকে ছুঁড়ে ফেলেছিলে গুয়ান্তানামবে।
তুমি ওখানে যাবে না!
তোমার হাতে করে বয়ে নেয়া প্রসূন
অর্পণ করবে না!
ভোরের সমীরণ বয়ে যাবে
আমার সবুজ ছোট্ট অস্তিত্বের উপর দিয়ে।
আমাকে স্নিগ্ধতার পরশে সজীব করে
তোমার দেয়া কষ্টগুলোকে নিয়ে উড়াল দিবে।
যদি তুমি ঘুমভঙ্গে প্রাতঃকালে
সেই ঘুমের নগরীতে যাও,
তবে অন্য ঘুমন্তগণ চেপে ধরবে আমার টুটি।
কেননা আমি তাদের সাথে তোমার দেয়া
পাহাড়সম লাঞ্ছনার কথা ভাগাভাগি করেছিলাম।
তারা বলবে তুমি অসত্য বলেছিলে,
কেননা যদি তার তোমার প্রতি প্রীতি না থাকত
তবে এখানে আসত না।
তুমি ওখানে যাবে না!
তোমার হাতে করে বয়ে নেয়া প্রসূন
অর্পণ করবে না!
তোমার হাতের প্রসূন তুমি ময়লাস্তুপে ছুড়ে দিও,
তবুও প্রসূন এমনটা মনে করে সান্ত্বনা পাবে যে,
সে কিছুটা সহনীয় স্থানের পুরোধায় ভূষিত
ময়লাস্তুপে ঠাঁই পেয়েছে।
Painting: Vincent van Gogh
দূর্বা চট্টোপাধ্যায়
চান্দ্রজ্যামিতি
সুখের পেয়ালা সম্পৃক্ত হলে
চুঁইয়ে পড়ে দুঃখী জল।
নল খুলে রাখা আছে না জেনেই
জলাধার ভরতে চাওয়ার স্পর্ধা দেখায়—
হৈমন্তিক প্রেমের ত্রিকোণমিতি।
যারা চাঁদ দেখতে বনের গভীরে গিয়ে
জলে মেশা জোছনাকে দুধ ভেবে
পান করে বেবাক মাতাল—
তারাও কি আসলেই বোঝে
স্তন্যপায়ী চাঁদের নিখুঁত জ্যামিতি।
মহুয়া বৈদ্য
চাঁপা গাছ থেকে মৃদু ঝরে যায় ভাসা ভাসা হরিচন্দনের মতো ফুল
জ্বরের উলটোদিকে গাছটির নাম ছায়াময়
সে আমাকে সততই আগলিয়ে রাখে আজকাল।
বিপুল ঝড়ের পর ডানা ভেঙে ছটফট করে
মনের অচিন পাখি, তবু তারে রাখিনে খাঁচায়।
উত্তরণ-ভারগুলি অযাচিত, দূরে ঠেলে দিই
ফুল কিছু ফুটলেও জানি তাহা রক্ত-রাগ নয়।
বিশু পাগলের মতো মায়াময় অচিন বালক
লাল রঙ ফুটিয়েছে অরণ্যের গোপন ছায়ায়
রোজ ভোরে আমি তাকে একমুঠো শুভেচ্ছা পাঠাই…
আমার মেয়ের নাম ভালোবেসে শুভেচ্ছা রেখেছি।
Painting: Vincent van Gogh
উল্কা
নির্মল হালদার
মেয়েটি একা একা হাঁটছে। ভাবছিলাম, সামনে বা পিছনে কেউ আছে। অথবা আড়ালে আছে কোনও এক কারণে। অনেকক্ষণ আমিও ঘোরাঘুরি করছি, কাউকে দেখছি না। মেয়েটি একা একাই ঘুরছে। এই নির্জনে। মেয়েটির সঙ্গে আমার আলাপ হচ্ছে না। জানতে পারছি না তার নাম। আমি মনে মনে তাই, নামকরণ করে ফেললাম, উল্কা।
এখানে নদী নেই পাহাড় নেই। উল্কা কার সঙ্গে কথা বলছে? কয়েকটা গাছপালা আর একটি জলাধার। এদের সঙ্গে কথা বলা যায়?
আমার ইচ্ছে করছে উল্কার
কাছে যাই। কথা বলি।
এই তো এই তো আপনি—
—আপনার পরিচয়?
—আমি বৃক্ষ। বন্ধুরা মজা করে বলে, আমি ভিক্ষুক। আপনি যে কোন নামে ডাকতে পারেন।
—আমি বৃক্ষ বলব। ভারী সুন্দর নাম। শব্দটা উচ্চারণ করলেই, গাছপালার নিবিড়তা। বন্ধুত্ব। ভালোবাসা।
—আপনি একা একা ঘুরছেন সঙ্গে কেউ নেই?
—আমি একা ঘুরতে ভালোবাসি। আর শুনুন, আপনি আমাকে তুমি করে বললেই ভালো লাগবে।
—আচ্ছা আচ্ছা। তোমার বাড়ি?
—এটা জানা কি খুব জরুরী?
—না জরুরী নয়। তবু তো আমরা একটা ঠিকানা চাই।
—ঠিকানা? আমি যে আপনার সামনে দাঁড়িয়ে আছি, এই তো একটা বড় ঠিকানা।
—তুমি সুন্দর সুন্দর কথা বলো দেখছি।
—নির্জনের কাছে এলে কথারা সুন্দর হয়ে যায়।
—মানুষও সুন্দর হয়।
—সবাই হয় কি?
—সেভাবে সমীক্ষা করে দেখা হয়নি কোনওদিন।
—তর্ক বাদ দিলেই ভালো। এই নির্জনতা তর্কের রব পছন্দ করে না।
—তোমাকে নিশ্চয়ই করে।
—আমি দেবদ্যুতি নই। আমি সামান্য একজন মানুষ। আমাকে বড় করে দেখবেন না।
—তোমার অন্তরের সৌন্দর্য তোমাকে বড় করে দেখাচ্ছে। আমি কি করতে পারি।
—মনে হচ্ছে, আপনিও অন্তর থেকে একজন বড় মাপের মানুষ।
—না না একদম না। আমার কোনও অস্তিত্ব নেই কোথাও। অস্তিত্ব নিয়ে থাকলে নিজের মধ্যে অনেক টানাপোড়েন চলে। কে মূল্য দিল কে মূল্য দিল না, সব সময় হিসেবে থাকতে হয়। হিসেব কি সবাইকে মানায়?
—এই কথাটা অমূল্য। অস্তিত্বের যা জটিলতা তা নিয়ে চিন্তা করা উচিত নয়। বরং প্রকৃতির অস্তিত্বকে নিয়ে আমরা চিন্তাভাবনা করব। কিভাবে প্রকৃতিকে রক্ষা করা যায়।
একি, উল্কা দাঁড়িয়ে পড়লো কেন? হঠাৎ তার মুখ থমথম করছে। কি হল?
আমি বিচলিত হয়ে মুখোমুখি হই। প্রশ্ন করি, কি হল তোমার? শরীর খারাপ লাগছে না তো? উল্কা চুপ করে আছে। আমিওনীরব থাকি। কিছুক্ষণ পর সে বলে ওঠে, চলুন একটা চায়ের দোকান খুঁজি। খুঁজতে খুঁজতে এই কথা সেই কথা। এলোমেলো কথারাও আমাদের চারপাশে ঘুরতে থাকে।
দোকান খুঁজে না পেয়ে উল্কা বসে পড়ে একটা পাথরে। সঙ্গে আমিও। তারপর, রোদ পড়তে থাকে। হেমন্তের হাওয়ায় শিরশিরানি। ঠাণ্ডা। রং পাল্টে যাচ্ছে আকাশের। হঠাৎ উল্কা আমার পিছনে এসে কাঁধে মুখ রাখে। সে কাঁদছে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে।
তার চোখের জল আমার কাঁধ বহন করতে পারবে তো?
Painting: Vincent van Gogh
গত নভেম্বর থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত সন্মাত্রানন্দের অসামান্য উপন্যাস 'মেঘবতী'-র বারোটি অধ্যায় পড়ুন
পূর্ববর্তী সংখ্যা
এখন বাড়িতে বসেই সংগ্রহ করতে পারবেন আমাদের প্রকাশিত বইগুলি। ভিজিট করুন আমাদের অনলাইন সপ, আর কিনুন আমাদের বই। নিচের BUY NOW বোতামে ক্লিক/ট্যাপ করলে পৌঁছে যাবেন আমাদের সপ পেজে।