সাপ্তাহিক কবিতা আশ্রম, ১৩ ভাদ্র ১৪২৭
সাপ্তাহিক
১৩ ভাদ্র ১৪২৭
Painting: Pablo Picasso
কবিতা
সমর রায় চৌধুরী
এলিট-গ্লোব-নিউ এম্পায়ার
‘মিষ্টি খেতে ভালোবাসি’ মানে হতেও পারে আসলে মিষ্টি খেতে ভালোবাসি না! ‘চেষ্টা করব’ মানে চেষ্টা যে করবই তার নিশ্চয়তা নেই। ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, কাউকেই বলব না’ মানে আপাতত বলছি না বটে, কিন্তু পরে কী হবে তা বলা যাচ্ছে না। বদল চাই বলতেও বোঝায় না সব কিছু বদলাক। শান্তির জন্য যুদ্ধ চাই ঠিকই, কিন্তু তা বলে যুদ্ধের জন্য চাই না শান্তি। ‘আমি লাল রং ভালবাসি’ মানে চিরদিন যে লাল রঙটাই ভালোবাসব তার কোনও গ্যারাণ্টি নেই, হতেই পারে নীল রং-টাকেও আমি একদিন… ‘আমি কিছুই জানিনা’ মানে, সব না হলেও একেবারেই যে কিছুই জানিনা তা নয়! ‘একথা আমি বলতে চাই না’ অথচ বলছি যখন ধরে নিতে হবে বলতেই চাই। বলছি বটে ‘পিঠের চামড়া তুলে নেব’ কিন্তু জানি তা সম্ভব নয়। এভাবে শেষ কথা বলে কিছু হয় না যদিও তবু কথা একদিন শেষ হয়ই, পড়ে থাকে শুধু নীরবতা ও নৈশব্দের রেশ। একা থাকতে থাকতে, অযত্নে পড়ে থাকতে থাকতে একদা সেখান থেকে ফের বের হয় নতুন কথার অঙ্কুর আর শেষে একদিন শিষ, কথা-মুকুলের পাশে উড়তে থাকে কথা-মৌমাছি।
পৌষালী চক্রবর্তী
রূপ কানোয়ার
জলের করতল জুড়ে আছে পায়ে চলা পথ
ভাঙনের বুকে মিশে যাবে বলে
সংসার খেলা শেষে সে চলে আসে
এই নদীমাতৃক দেশে
নতুন নতুনতর ঘর বাঁধার অধিকার চেয়ে।
ততক্ষণে জলের গায়ে আলিম্পন
আকাশে সুবেশা মেঘ
ঢেকে দিচ্ছে ব্যথার উপকথা
এদেশে নেমেছে বলে
আমরা তাকে মানুষ নয়, দেবী জন্ম দিই-
রূপ কানোয়ার!
সুবীর সরকার
হাঁস ও হসন্ত
একটু গ্যাপ দিন, কেননা ডিনার টেবিলে
আরশোলা
কারণ জানতে চাইবেন না প্লিজ
সময় পুরনো হয়। আর দুলে ওঠা পৃথিবীর কথা
লিখি।
জলে ভেসে যায় হাঁস ও হসন্ত।
নীলাদ্রি দেব
ক্যানভাস
শামুকখোল পাখিদের ডানায়
সন্ধের গুঁড়ো ছাপ, ছোপ
প্রত্যেকের বর্শির মুখে নিজস্ব ঠোঁট
রাত ফুরিয়ে গেলেই
এমন টুকরো ছবি ভিড় করে আসে
তবু ক্যানভাসে এলোপাথাড়ি ছিটিয়ে দিচ্ছি রং
ছেঁড়া ও ভেজা টিস্যুকাগজ
মঞ্জরী গোস্বামী
জাগতিক
তুমি স্বপ্নে এলে
আজও কেমন নীল হয়ে যাই প্রিয়তম বিষে
মাতামহী ঘুরে ঘুরে প্রদীপ জ্বালিয়ে দেয়
দুয়োরে তুলসি তলায়
বেশি করে ধুনো পোড়ে রোগ শয্যার আশেপাশে
কাঁঠালি চাঁপার গায়ে চিরকুমারীর চপলতা
অসুখের পর বুঝি
মুখ নয়, নখ নয়
সবটুকু দেহ জুড়ে খিদে হয় লোভ হয়
তোমাকে স্বপ্নে পেলে
আমার করুণা জাগে ছেঁড়া ফাটা বাসি বল্কলে
জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়
শব্দগন্ধ ঘাটে
(উৎসর্গঃ কবি বিনয় মজুমদার)
আরশিনগর যেতে একটা নদী পার হতেই হবে
এমন কোনও শর্ত আছে কেউ বলেনি।
রেলপথ ডাইনে রেখে হাঁটছেন বিনয়বাবু
ক্ষোভ আর অভিমানের আগুনে পুড়ছে তাঁর
ঢোলা সোয়েটার পাঞ্জাবি আর লুঙ্গির আংরাখা।
ঠাকুরনগর প্লাটফর্মের ভাঙাচোরা ঢাল বেয়ে
উঠছেন কিংবদন্তির বর্তমান কম্পনেও মেরুদণ্ডে
কোনও দোলাচল নেই কলমের ডগার মতো
নির্ভেজাল জিভের ধার।
বিনয়বাবু রেগে যাচ্ছেন তাঁর ছায়া দীর্ঘ হচ্ছে
আকাশ ভেদ করে যাচ্ছে চকমকি মাথা
বস্তুত আকাশছোঁয়া গাছেরা উচ্চতা হারিয়ে
মাটির কাছে ফিরে আসছে তবু অঘটনের ঘণ্টা
বাজছে না মানিয়ে যাচ্ছে।
অভাবন ধোঁয়া আর গরমজল পেট্রোলের মতো
সময় বেরিয়ে যাচ্ছে ইছামতীর নৌকো আজ
কোনো পলি বা শৈবাল নেই বাধাহীন ব্লেড……
আমি সেই আরশিনগরের পড়শির জন্য বসে
পারঘাটা ভেসে যায় বুনোফুল আর শব্দের গন্ধে।
গল্প
Painting: Jackson Pollock
গন্ধ ও গন্তব্য
প্রত্যয়ী দত্ত
মাছিগুলো তখন থেকে বার বার চোখের সামনে আসছে আর যাচ্ছে। অথচ বিজু কিছুতেই সরাতে পারছে না। হাত দুটো স্টিয়ারিং এর ওপর, খুব তাড়াতাড়ি পৌঁছাতে হবে ওকে, ভোরের মধ্যেই। নাহলে হয়তো কাজটাই আর থাকবে না। নিজের গাড়ি না ওর, অন্যের গাড়ি চালায়, মালের গাড়ি। এই লাইনে ড্রাইভারদের কোনো ইজ্জতের বালাই নেই। চোর অপবাদ লেগেই আছে। আর আছে মালিকের কাছে গিয়ে মিথ্যে কথা বলার লোক। সবই বোঝে ও। আগের মাসে রতন আর কালু ওকে মাল সরানোর জন্যে দলে টানতে চেয়েছিল, সেই নিয়ে এক প্রস্থ ক্যাচাল, রাগের চোটে ও কালুকে সপাটে এক থাপ্পড় মেরে দিয়েছিল। কালু কিছু বলেনি। কিন্তু ওই সাপের মতো হিসহিসে একটা নজর যেন ওর মধ্যে একটা ভয়ই ধরিয়ে দিয়েছে সেইদিন থেকে। বিজু এই লাইনে নতুন। এতো মার প্যাঁচ ও জানে না। একটা ভয় নিয়ে থাকতে থাকতে কাল বিকেলে মালিক বলেই দিয়েছে এইবার যদি সময় মতো না পৌঁছাতে পারে ওকে আর রাখবে না। বিজু জানে ও সাধারণত দেরী করেনি কোনোদিনই। তবু আজ এই দেরী কাল হয়তো অন্য কিছু অভিযোগ ওকে স্থির হতে দেবে না এখানেও। ওর ভীষণ তাড়া তাই। খাবার জন্যেও সময় নেই ওর। পেটের ভিতরটা মুচড়ে মুচড়ে উঠছে। খাবারটা ওর সিটের পাশে টিফিন কৌটোতে রাখা। রুটি আর আলুভাজা। আজকের খাবারের থেকে কালকের খাবার জোটানোর জন্যে বিজু ছুটেই চলেছে। কালকের খাবারের ভাবনা যেন ওকে হাত দুটো স্টিয়ারিং থেকে সরাতে দিচ্ছে না।
বাড়ি ফেরার পথ বিজু ভুলে যেতে যায়, যেভাবে মাতাল শ্রমিক ঘরে ফেরার পথ হারিয়ে ফেলে ভীষণ ক্লান্ত শরীরে। বাড়ির মধ্যে একটা গন্ধ থাকত আগে। কেমন গন্ধ সেসব কিছুই ও বলতে পারবে না। শুধু বাড়ি বাড়ি একটা গন্ধ। আজকাল আর নেই সেটা। আস্তে আস্তে কমতে কমতে একেবারে নেই হয়ে গেছে। বেশ বড়ই বাড়ি ওদের। পুরনো বাড়ি। দুই জেঠতুতো ভাইয়ের একজন ডাক্তার একজন পুলিশ। বিজু এসব কিছুই হতে পারেনি। কী হতে চেয়েছিল নিজেকে জিজ্ঞেস করলেও উত্তর নেই এখন। বিজুর ভালোবাসা ছিল রাস্তা, ধুলোবালি গায়ে মেখে নদীতে সাঁতার কাটা। নৌকা থেকে লাফ মেরে সাঁতরে গঙ্গা এপার ওপার করা ছিল প্রতিদিনের কাজ। বন্ধুরা ওর পিঠ চাপড়ে বলত, তুই একদিন অনেক বড় সাঁতারু হবি। বড় সাঁতারু কীভাবে হতে হয় ও জানে না, তবু সেইসব দিনে পিঠ চাপড়ানোগুলো ওর বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ানোর জন্যে যথেষ্ট ছিল। মাল গাড়ি নিয়ে রাস্তা পার পার হতে হতে ওর মনে হয়, রাস্তা বুঝি গঙ্গার থেকেও বড় কোনো নদী। কিন্তু ও যেন খড়কুটোর মতো ভেসে যাচ্ছে সেখানে। শুধু যেন টিকে থাকার লড়াই! শুধু যেন অস্তিত্ব বাঁচানোর জেদই বিজুকে চেপে ধরে চারিদিকে থেকে।
ঘরের নোনা ধরা দেওয়াল, সোঁদা গন্ধের সাথে ওর গন্ধ মিশে যায় যেন; যেভাবে বাসায় পাখির না-ফেরা নিস্তব্ধতা এসে মিশে যায় অন্ধকারের সাথে। বাড়ির সামনে দুই ভাইয়ের বাড়ি। বড়, চকচকে বাড়ি থেকে ভেসে আসে গন্ধ। বড়লোকদের নানাধরনের গন্ধ থাকে। বিজুর মনে হয় শুধু গন্ধই হয়তো ওদের মধ্যে এতো ব্যবধান করে দেয়। ওদের নামী পারফিউম, প্রতিদিনের দামী খাবারের গন্ধের থেকে বিজুর নিজের ঘরের মোটা চালের ভাতের গন্ধ, রাস্তার কল পাড়ে স্নানের সময় ঘামের নোনা গন্ধ মুছে দেওয়ার কমা সাবানর গন্ধ যেন বিজুকে আঁকড়ে ধরে বুনো লতানে গাছের মতো। কম পয়সার গন্ধ মেখে মাঝে মাঝে নিজেকে বড়লোক ভাবতে গিয়ে বুঝেছে ওর পা দুটো আসলে আটকে আছে মাটিতেই তবু স্কুলের পিছনের মাঠের পুরনো বট গাছটার মতো ও কোনোদিন হতে পারবে না। সেবার যখন বাড়িতে মিস্ত্রি লাগল, বড়দা দোতলা করল বিজু ওই মিস্ত্রিদের সাথে বসে বিড়ি খেয়েছে, ওদের শরীরের ঘামের গন্ধ যেন বিজুর শরীরের সাথে মিশে যাচ্ছিল। বিজু বুঝতে পারছিল ও আসলে ইমারতে থাকতে আসেনি, মালিক হয়ে ওঠা বিজুর এ জীবনে আর হবে না। সেইদিন সব কাজ ফেলে ও দৌঁড়েছিল গঙ্গায়। এপার-ওপার করতে করতে মনে হয়েছিল, জলেই যেন মৃত্যু হয় ওর। সব কিছু ভেসে যাক ওর। সব কিছু।
জীবনে কোনো কাজেই স্থির হতে পারেনি ও। বেশীদূর পড়েনি, স্কুলের গন্ডী পার করে ও কাজে চলে গেছিল পাহাড়ে। হোটেলের কাজ। হোটেলের সামনে বিশাল বিশাল পাহাড়। সেই প্রথম পাহাড় দেখা ওর। হোটেলে প্রতিদিন একটা মেয়ে ফুল দিতে আসত। হাসত ওর দিকে তাকিয়ে। হাসির মধ্যে অদ্ভুত টান একটা। চোখ দুটো যেন চুম্বকের মতো টানে ওকে। অবশ করে দিত ওর শরীর। একদিন ভীষণ শীতের রাতে মাতাল হয়ে বিজু আবিস্কার করেছিল ওর বিছানায় সেই মেয়েটা। ফর্সা শরীরে বিভাজনরেখাগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠছিল আরও। নাম কী মেয়েটার? নাম কী? মাথা যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছিল অদ্ভুত এক গন্ধে। গন্ধ, সেই দামি পারফিউমের গন্ধ! মেয়েটার গা দিয়ে! নেশা কেটে যাচ্ছিল ওর, সদ্য লেপ্টে যাওয়া শরীরটা চুম্বকের মতো টানছিল অথচ গন্ধটা যেন জোর করেই ছিটকে ফেলে দিয়েছিল খাট থেকে মেঝেতে। পরেরদিনই ও সব গুটিয়ে পালিয়ে আসার ট্রেন ধরেছিল। বাড়ি ফেরার আনন্দের থেকে অনেক বেশী ভালোলাগছিল ওই গন্ধ থেকে মুক্তি পাওয়ার। অন্যের দেওয়া গন্ধ নিজের গায়ে মেখে যারা জড়িয়ে নিতে চায় মানুষকে, তাদের প্রতি ঘেন্নায় গা গুলিয়ে ওঠে ওর। ওর তখন শুধু একটু আশ্রয় দরকার যে আশ্রয় ওর গায়ে লেগে থাকা এই গন্ধ ধুয়ে দিতে পারবে।
মাঝে মাঝে ভাবে বাড়িতে কার জন্যে ফিরবে? পিছনের এক ফালি দরজা দিয়ে কখন ঢোকে, কখন বেরোয় তার কোনো খোঁজ রাখেনা কেউই। মা মারা গেছিল সেই ছোটবেলায়। পাহাড় থেকে ফেরার কিছুদিন পরেই বাবাও চলে যাওয়াতে অনেকেই বলেছিল বিয়ে করতে। বিয়ে করতে ভয় পায় বিজু। চণ্ডালের মতো রাগ ওর। ওর বাবার রক্ত ওর শরীরে বইছে। বিয়ের কথা মাথায় আসলেই চোখের সামলে ভেসে ওঠে বাবার মারমুখী চেহারা, মায়ের শরীরে কালশিটে দাগ, একটা ঝুলন্ত দড়ি থেকে ঝুলে পড়া শরীর আর তারপর শীতের ভোরের মতো নিস্তব্ধতা। চুপ থাকতে থাকতে বিজু ভুলেই যায় মাঝে মাঝে, ও বহুদিন প্রাণ খুলে কথা বলেনি। দম বন্ধ হওয়া জীবনটা যেন পা দিয়ে মাড়িয়ে দেওয়া ঘাস। নিজের ওপর বিশ্বাস হারালে ভিতরের মানুষটা আস্তে আস্তে মরে যায়, এই অনুভবটা বিজু করতে পারে আজকাল।
সেবার পাহাড় থেকে ফিরে ও গিয়েছিল অখিলেশদের গ্রামে। ওদের মফস্বলের পাশের গ্রাম। অখিলেশদের গ্রাম ঘুরতে ঘুরতে একজায়গায় দেখেছিল একজন বুড়ি শুয়ে আছে। কতকালের চেনা মুখ যেন। অথচ মনে করতে পারছিল না কিছুতেই। একটু এগিয়ে দেখতে গিয়ে বুঝেছিল বুড়িটা দেখতে পায় না চোখে। বাড়ির সামনের চৌকাঠের পাশে শুয়ে আছে দুপুরের খাবারের অপেক্ষায়। ওর উপস্থিতি টের পেয়ে বুড়িটা ভুল করে ওর ছেলে ভেবেছিল, হাতদুটো বাড়িয়ে বলেছিল, “আজ খাবার দিবি তো!” বিজু দাঁড়াতে পারেনি আর; আবার পালিয়ে এসেছিল। ওর শরীর কাঁপছিল। বাড়িয়ে দেওয়া শীর্ণ হাতদুটো ধরে ও বলতে পারেনি, “দেবো, খেতে দেবো।” অথচ ওর ভিতরের থেকে কে যেন বারবার ওকে ফিরে গিয়ে ওই হাত দুটো ধরে ভরসা দিতে বলছিল। চলেই যেত কিন্তু সেই মুহূর্তে ওর হাত টেনে ধরেছিল একজন। পিছন ফিরে দেখেছিল, সোনালী। অখিলেশের বোন। অদ্ভুত দুটো চোখ। মায়ামাখা। কি সুন্দর ভাবে তাকিয়ে ছিল। শরীর থেকে ভেসে আসছিল গন্ধ, সাবানের গন্ধ, কল পাড়ে স্নান করার সময় ও যে সাবান মাখে। বিজুর পা মাটিতে বসে যাচ্ছিল আবার, সোনালী দূরত্ব কমাচ্ছিল আস্তে আস্তে। তারপর সেই অচেনা দুপুরে বিজুর এলোমেলো হয়ে গেল সব। বাবার মৃত্যুর পরে সোনালী ওর বাড়িতে এসেছে লুকিয়ে বহুবার। নোনা ধরা চার দেওয়ালের গন্ডির মধ্যে দুটো জড়িয়ে যাওয়া শরীর আয়নায় দেখতে দেখতে বহুবার মনে হয়েছে ওই যেন আদতে শিকার। সোনালীকে বোঝার চেষ্টা করেও বুঝতে পারেনি ও। অদ্ভুত খামখেয়ালী মেয়েটা দিনের পর দিন ওকে জড়িয়ে নিয়েছে নেশার মতো। দিনের পর দিন বিজু পাগলের মতো অপেক্ষা করে থেকেছে অথচ ওকে পাত্তাও দেয় নি সোনালী, আর যখন বিজু আস্তে আস্তে সরে আসতে চেয়েছে তখন আবার এসে সব এলোমেলো করে দিয়েছে। মাঝে মনে হয়েছিল একবার বিয়ের কথা। সে কথা সোনালীকে বলতে, ও কিছুই বলেনি। শুধু হেসেছিল। তারপর একদিন হঠাৎই শুনল সোনালীর বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। বিয়ের দিন বিজু সোনালীর সামনাসামনী যেতেই অদ্ভুত ধাক্কা পেয়েছিল, সোনালী শরীর থেকে সেই চেনা গন্ধটা আর আসছে না, অন্য অদ্ভুত ঝাঁঝালো গন্ধ আসছে। ও বুঝেছিল এবার আবার পালাতে হবে, নেশা কাটানোর সময় এসেছে, জাল থেকে বেরোতে হবে আবার। তারপর আবার দৌড়।
বাবার মৃত্যুর পরে শ্মশানের দিকটা ভীষণ টানত ওকে। শ্মশানের পাশেই গঙ্গা। অনেক গাছ ওইদিকে। পিছন দিকটায় কবরস্থান। ভীষণ গুমরে থাকা দিনগুলোতে ও ওখানে গিয়ে বসত। জীবনে দুইবার অস্থি বিসর্জনের পর ওর মনে হয় আদতে ওর নিজের অস্তিত্বটাও ভেসে গেছে। চুল্লীর মধ্যে মৃতদেহ যখন পোড়ে তখন কেমন লাগে এ কথা কেউ জানতে পারবে না কোনোদিন। অথচ একদিন সবাইকেই ওখানে যেতে হবে। বিজু চায় না ওখানে যেতে, কোনো শান্ত এক ভোরে ও যেন নিজেকে দেখতে পায় এমন কোনো খানে যেখানে কেউ ওকে দেখতে পাবে না। মৃত্যুর পরের জীবন বলে কিছু হয়? সেই জীবনের শুরু কি দেখতে পারে সদ্য ছেড়ে যাওয়া জীবনের শেষ অস্তিত্ব! আজকাল মৃত্যুভাবনা কাবু করে দেয় ওকে। সোনালী চলে যাওয়ার পর ওর মনে হয় কাউকে দেখে শান্তির হাসি আর ও হাসতে পারেনা, অথচ ওকে নিয়ে হাসাহাসি চলে। নিজেকে গুটিয়ে নিতে নিতে ও দৌঁড়ে যায় শ্মশান ঘাটে, শিউলি গাছের নীচে শুয়ে থাকে এলোমেলো ভাবে, শরীর জুড়ে তখন শুধু বাংলার গন্ধ।
বিজুর এক বন্ধু আছে নাম কবীর। সে আদতে সুখী মানুষ। খায়, ঘুমায়, কবিতা লেখে। কবিদের নাকি যন্ত্রণা প্রচুর। বিজুর হাসি পেয়েছিল শুনে, কবীরের যন্ত্রণা কীভাবে ওর থেকে বেশী হতে পারে। কবীর একবার একজনের একটা কবিতা ওকে পড়ে শুনিয়েছিল। কিছুই বোঝেনি ও, অতো কিছ বুঝলে আজ এই অবস্থা হতো না ওর। কিন্তু ওখানে একটা কথা ছিল, ‘কবর খুঁড়ে বেরিয়ে আসল খিদে’-কথাটা যেন বিজুর মধ্যে গেঁথে গেছিল। বিজু বুঝতেই পারেনি কীভাবে কবর খুঁড়ে খিদে বেরিয়ে আসতে পারে। কিন্তু খিদে শব্দটা ওকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। খিদে পাবেই। খিদে মানবে না ওর কেউ নেই, খিদে মানবে না ও স্থির হতে পারে না, খিদের কথা ওকে ভীষণ ভয় ধরিয়ে দিয়েছিল। বহুরাতে স্বপ্নের মধ্যে অখিলেশদের গ্রামে দেখা সেই বুড়ির মুখ ওর নিজের মুখ হয়ে গিয়ে ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছে। ওর মনে হয় আসলে বুড়িটা নয় ওই খিদেটাকে ওর চেনা লেগেছিল। ও জানে ও স্থির হতে পারবে না। অস্থিরতার কোনো কাজ কী হয়? ওদের ছোট শহরটা তাই একদিন ও চষে ফেলেছিল। তারপর থেকে এই মালের গাড়ি চালানো শুরু। কয়েকমাস হয়েছে। গাড়ি নিয়ে রাত বিরেতে ছুটে গেছে দূরদূরান্ত। রাস্তার নেশা ওকে পাগল করে দিয়েছে। রাস্তায় ধূলোর গন্ধ ওর সাথে মিশে গেছে আপন হয়ে। পথের পাশের দোকানে চা খেতে খেতে ভেবেছে, এই গ্লাসে আগে কেউ খেয়ে গেছে ওরই মতন, তাদের জীবন কেমন? তারা কি সুখী? ও কি সুখী হতে পেরেছে? ও কি স্থির হতে পারবে এই অস্থির জীবনে? নাকি একদিন অস্থিরতা থেকেও ওকে পালাতে হবে! হাজার হাজার প্রশ্ন বিজুকে পাগল করে দেয়। বাবা ওকে একটা ভাঙা বাড়ি দিয়ে গেছে বটে কিন্তু একটা ভাঙা বাড়ির মধ্যে পরিবার খুঁজতে হয় কীভাবে তা বিজু জানে না।
আজ খুব কুয়াশা, ভোর হয়ে এসেছে অথচ ও অনেক দূরে গন্তব্য থেকে। ব্রিজের ওপর দিয়ে যেতে এইসময়টায় ভয় লাগে খুব ওর। অথচ উপায় নেই। কাল রাতে খায়নি ও। তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়েছিল গাড়ি নিয়ে। ভেবেছিল রাস্তায় খাবারটা খেয়ে নেবে। অথচ এখনও সুযোগ এলোনা। খাবারের কৌটোটার দিলে তাকিয়ে কী যেন একটা ভাবতে যাবে এমন সময় ভীষণ জোরে এক ধাক্কা এলো পিছন থেকে। গাড়ি গিয়ে লাগল ব্রিজের পাশের দেওয়ালে, জোরে।
বিজুর হাত দুটো স্টিয়ারিং-এ ধরা শক্ত করে, শরীরটা এলিয়ে পড়েছে দরজার দিকে। সূর্যের আলোটা এসে পড়ছে ওর কাঁচের টুকরোয় থেতলে যাওয়া মুখের ওপর। ওর পায়ের কাছে খাবারের কৌটোটা ছিটকে পড়েছে দূরে, খাবারগুলো পড়ে গেছে চারিদিকে। বিজুর খোলা চোখ দুটো খিদে উপশমের কৌটোর দিকে তাকিয়ে। কয়েকটা মাছি এসে ঘুর ঘুর করছে ওর সামনে, কিন্তু ও সরাতে পারছে না। বিজুর চোখে তখন কোনো এক শান্ত ভোরে জলে ভেসে যাওয়ার স্বপ্ন!
Painting: Salvador Dali
পূর্ববর্তী সংখ্যা
এখন বাড়িতে বসেই সংগ্রহ করতে পারবেন আমাদের প্রকাশিত বইগুলি। ভিজিট করুন আমাদের অনলাইন সপ, আর কিনুন আমাদের বই। নিচের BUY NOW বোতামে ক্লিক/ট্যাপ করলে পৌঁছে যাবেন আমাদের সপ পেজে।