সাপ্তাহিক কবিতা আশ্রম, ১৫ কার্তিক ১৪২৭
সাপ্তাহিক
১৫ কার্তিক ১৪২৭
শুভঙ্কর বিশ্বাসের কবিতা
ঘর
কিছুটা অপেক্ষা করে ভোর
একটু সকাল হলে আলো ঝরা গান।
পূর্ব থেকে নেমে আসা নতুন আলোয়
সবুজ রঙের ধান, কৃষক লাঙল।
আবার মাটির কাছে ফসলের দাবি।
কিছুটা অপেক্ষা করে গাছেদের গ্রাম।
এইখানে ঘরবাড়ি; ঘর মানে পাখিদের বাসা,
ঘর মানে ছায়া দাও রোদের আলোতে।
চাষির মেয়ের মতো লাজুক স্বভাবে,
দুইমুঠো রোজ ভাতে আদর জড়িয়ে।
কিছুটা অপেক্ষা করে পাখি, গাছেদের ডালে
চেনা ঘর ভেঙে গেল; উড়ে যেতে হবে।
মফস্বল
এখনও অনেক রাত ঘুমহীন জেগে থাকে চাঁদ
তারার ভেতরে তাকে আলো নিয়ে ঝলকাতে দেখি
চাঁদের ভিতরে জমে আরো কত ঘোর ব্যাধি ক্ষত
এখনও অনেক দিন ঝলমলে আলো দিয়ে যাবে।
পৃথিবী রঙিন কেন? ফুটপাতে জেগে থাকে শিশু।
চাঁদের আলোর রাতে দাউদাউ চোখ দুটো জ্বলে
হাজার তারার নীচে এইভাবে শুয়ে থাকে চুপ
রোগে ভোগা হাড়গিলে খিদেপেটে ওরা দলে দলে।
চাবুক
পুরনো গোলকে যাই, যেখানে ফড়িং,
কাচপোকা রং দেবে আমাদের প্রেমে
তোমাকে যেখানে পাই ভেতরে আঁধার,
তোমাকে যেখানে পাই রক্তমাখা বমি।
আকাশে মেঘের দল… ভিজে যাব এবার বর্ষায়।
জীবন কতটা দামি? মানুষ কতটা?
অন্ধকার নেমে আসে প্রতিরাতে দেহের ভেতর
আলোদের খোঁজে ঢুকি গোপন ডেরায়
আমাকে পাবে না তুমি সহজ হিসেব
একটা বিশ্বাস ভাঙে নতুন বিশ্বাস
এক জন্ম চায় অন্য জন্মের ইশারা
এক মৃত্যু থেকে ফের
এক মৃত্যু তাড়া করে রোজ
নগরে রক্তের দাগ, ধুলোপথে জখম শরীর
নিয়ে ফিরে আসে ঘরে যে পথিক, বলো
চাবুক কতটা দামি, আর চাবুকের দাগ?
শুভঙ্কর বিশ্বাসের গল্প
হৃদয়
গাছের ছায়া স্বচ্ছ জলের উপর আল্পনা এঁকেছে। শুকনো পাতা হাওয়ায় দোল খেতে খেতে পড়ল নদীর উপর। মৃদু স্রোত তাকেও ভাসাল দূরের মাঝি বৈঠা বাওয়ার তালে গান গাচ্ছিল গুনগুন রবে। হলদে পাকা ধানখেতের দিকে তাকিয়ে হাঁক দিল, ‘ওহে চাষি ভাই !’
কৃষক দুহাত তুলে গলা ছেড়ে বলল, ‘ফসল ফলেছে মেলা, এ বছর দুঃখ নাই!’
একটা হলুদ ফড়িং শূন্যে উড়তে উড়তে এসে বসল জিয়লের শুকনো ডালে। একবার এদিক ওদিক চাইল স্থির ডানা মেলে। খুদে চড়ুই ধানখেত থেকে কিছু খাবার মুখে নিয়ে চলল কচি ছানাদের কাছে। আজ সারাদিন তারা ডেকেছে মা মা করে।
আলপথে ছোট্ট মেয়ে একা বসে। ধানের গোড়ায় জমা জলে সে দেখছে তে-চোখো মাছের চঞ্চলতা। আর ভাবছে, ‘মাছেদেরও বুঝি ঘরবাড়ি হয়। ওদের পেছনে গুড়িগুড়ি মাছগুলো কেমন সাঁতার দিয়ে চলে যায়। কোথায় যায়, সন্ধ্যা হলে বাড়ি ফেরে ওরা?’
পাশে জল থেকে মাথা উঁচু করে ওঠা ঘাস শিষ তুলে দাঁড়িয়ে। শুঁয়োপোকাটা একটা থেকে অন্য, এমন করে সেখানে পৌঁছাল, সবচেয়ে উঁচু কচি নরম পাতাটি সে খাবে। তার ভারে নরম ঘাস নুইয়ে যাচ্ছিল জলের কাছে। মেয়েটি দেখল পোকাটা জলেই পড়ে যেত, হঠাৎ পাশের শক্ত পাতাটা জড়িয়ে না নিলে।
জামগাছের উঁচু ডালটায় কোকিলের কুহু অবিরাম। দূরের বাঁশবনে পাপিয়ার ‘পিউ কাহা’ কেউ যেন খুব কান পেতে শুনছে।
আজ দিন শেষ হয়ে এল।
গোধূলির কপালে আঁকা লাল টিপ, সে রঙে সমস্ত রঙিন। এক আকাশ মুখে যুবতীর মতো কোমল লাজুকতা। কাকে যেন খুঁজছে।
একখণ্ড মেঘ ধীরে ধীরে সে-টিপ ছুঁলো, বলল ‘তোমার হৃদয়?’
হাওয়ায় পাঁকা ধানের শনশন, সিঁদুরে নদীর চঞ্চলতায় পাড়ের ছলাৎ বলল, ‘আছি’।
ভাঙা জোছনার ঘর
সর্ষেফুলের খুব কাছে মুখ নিয়ে যেতেই ফুলের উপর বসা মৌমাছিটি উড়ে গেল। বিশাল হলদে ভরা সর্ষে ক্ষেতের মাঝখানে মেয়েটি একা দাঁড়িয়ে। মৌমাছিটি উড়ে যেতেই সে অদ্ভুত সুন্দর হেসে ওঠে। কিছু সর্ষেফুল আলগোছে কোচড়ে রাখে। আর কিছু হাতে নিয়ে হাঁটতে শুরু করে মেঠো আলপথ বেয়ে। নীলাভ আকাশে তখন আবছা ছেড়া ছেড়া মেঘ জলছবির মতো আঁকা। রোদের নরম আলো আদিগন্ত আলো দেয় গাছ, পাখি, ফুলের উপরে।
মাঠের একপাশে যে কোদাল দিয়ে আল কাটছিল, ডেকে ওঠে। ওই পূণি! কনে গিইলি?
মেয়েটি হাসে। উত্তর দেয়, ফুল তুলতে। সর্ষে ফুল।
বাটা করবি?
হ্যাঁ। খাবে তুমি? তোমার জন্য পাঠিয়ে দেব।
ওই কডা ফুল, বাটলি একটু খানি হই যাবেনি। আমারে আর দিতি হবে নানে। কোদাল পাশে রেখে কোমরে বাঁধা গামছা দিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে উত্তর দেয় লোকটি।
না না অনেক আছে, এই দেখো। মেয়েটি লোকটির দিকে এগিয়ে জামার কোচরে রাখা ফুল দেখায়।
আচ্ছা বেশি হলি পরে পাঠায় দিস। তা ইস্কুলি যাবিনে আজ?
মাথা নিচু করে ঘাড় নাড়ে মেয়েটি। না, রান্না করে রাখতে হবে। বাবা দুপুরে খেতে আসবে।
তোর বাপটাও হয়েছে তেমন! দেখা হলি বলবানি। তোরে ইস্কুলি না যেতি দিয়ে রান্না করি রাখতি বলছে!
মেয়েটি ভয় পায়। না না কিছু বলো না, বলেই সে দৌড়োতে শুরু করে আপন ভাঙা ঘরের দিকে। তবু জীবন কোথায় যায়?
দুপুর গড়ায়। পূণি না খেয়ে বসে থাকে। বাবার উপর তার রাগ হয় না। সে কষ্ট পায়। তার গরিব বাবা আগে এমন ছিল না। খুব ভালো ছিল মানুষটা। তার মাও। অনেকে বলে সে তার মায়ের মতোই। আর হাসিটাও। সেই যে মা’টা মরে গেল, তারপর বাবা বদলে যায়। টলমলে পায়ে বাড়ি ফেরে খেটে খাওয়া মানুষটা বুঝতে পারে না জীবন বহমান নদী।
দুপুরে পূণির বাবা আর বাড়ি ফেরে না। মেয়েটির খিদে পায়, তবু না খেয়ে থাকে। সে ছাড়া তার বাবার তো আর কেউ নেই। সারাদিন রোদে ভ্যান চালাতে তার কত কষ্ট হয়। একটু যত্ন করে খেতে দিলে বাবার কষ্ট চলে যাবে।
একটা ছোট্ট বাটিতে সর্ষে ফুল বাটা নিয়ে বেরিয়ে পরে সে। দুটো বাড়ি পার করেই শ্যাম কাকাদের বাড়ি। একটা নারকেল গাছ পেরিয়ে সে ওদের বাড়ির উঠানে এসে দাঁড়ায়। ইটের তৈরি বাড়িতে টালির ছাউনি। সামনে বাসের কঞ্চি দিয়ে ঘেরা বারান্দায় বসে পুরোনো একটা শাড়ি সেলাই করছিল ওই বাড়ির কাকি। পূণি সামনে এসে দাঁড়াতেই সে বলে কি রে পূণি, আয় বোস।
সেলাই করছ কাকি? কাকা কই?
ভ্যান নিয়ে বেরোয়ছে তো। রাতের আগে তো ফিরবে না।
এটা রাখো আজ যখন ফুল তুলেছিলাম তখন কাকা খেতে চেয়েছিল, কাকা বাড়ি এলে খেতে দিও। সে বাটিটা তার কাকির হাতে দেয়।
তোর কাকাও সেরকম। হাসে বউটি। তা তুই দুপুরে খেয়ছিস তো মা?
হ্যাঁ, খেয়েছি। পূণি ঘাড় নাড়িয়ে উত্তর দেয়।
কই দেখি মুখখান? কেমন শুকনো দেখাচ্ছে! সত্যি করে বলতো?
মেয়েটি কিছু বলতে পারে না। চুপ করে যায়।
বুঝেছি। আয় খাবি।
বাবা দুপুরে বাড়ি আসবে বলেছিল। আসেনি। বাবাও তো না খেয়ে আছে।
তোর আর অত ভাবতে হবে না, আয় এদিকে। কাছে ডেকে নিয়ে সে নিজের হাতে পূণিকে খাইয়ে দেয়। কাকিরা গরিব তবু সুখী মানুষ। খুব যত্নও করে পূণিকে।
ধীরে ধীরে বিকেল গড়াতে শুরু করে। ঘর ফেরা পাখিদের ডাক কানে এলে মেয়েটি তার বাবার কথা ভাবে। সে দুপুরে নিশ্চয় কিছু খায়নি।
২
বটতলার নীচে ভ্যানের মাচার উপর মন খারাপ করে বসে আছে নগেন। শ্যামের ভ্যান কাছেই রাখা ছিল। পাশের দোকান থেকে চা খেয়ে এসে সেও নিজের ভ্যানের উপর বসে। নগেনকে চুপ করে থাকতে দেখে বলে, ওরাম মন খারাপ করি বসি থাকলি তো চলবে নানে। টোটো পেয়ি লোকি তোর আমার ভ্যেনি না উঠতি চেলি তুই কি করবি! আর আমিই বা কি করতি পারি! যাদের পয়সা ছেলো, তারা টোটো কিনি নেছে। এবার তুই আমি বসি থাকি! দু চারডে লোক তো আমাদেরও জুটি যায় নাকি?
অতি কি আর চলে! চলে না।
চালালি এখনও চলে! আমার চলছে নাহ? কষ্ট হচ্চে তাও চালায় নিতি হচ্চে। তোর তো তাও দুজন, মেইয়ে আর তুই। আর আমার কতা ভাব দিকি। চারডে পেট চালাতি হয় একার পয়সায়! তুই তো মদ খ্যেইয়ে আর জুয়ো খেলিই সব শেষ করি দিলি! বলিলাম ওদের সাথে মিশিস নে। কানে নিলি নে। তোর কি দরকার ছেলো বলদিকি অত বাড়ানির। এবার বোজ!
বউডা চোকির সামনি মরি গেলো! বুকডা ফাটি যেত সে সময়। ওই সময়ডা ঘনারা আসি ডেকে না যেতো। আমার দুডো ভালো কতা শুনাতো। ভাবিলাম ভালো লোক। আমার দুক্ক ওরা বোজে। জুয়োর নিশা ধরায় দেলে! ম্যালা পয়সা ওড়ে ওখানে। ভাবিলাম ঘনার মতন আমিও পয়সা করি ফেলতি পারলিও সুখ হবেনে। আমার তো আর ফিরি আসার উপায় নাই। অনেক ধারদেন করি ফেলিচি অদের কাছে!
আর যাসনে ওদিকি, আমি বলি শোন। তোর বউ মরিচে আজ ম্যেলাদিন। তুই ভুলতি না পারলি কিডা কি করবে! আমি কিছু টাকা জমায় ফেলিচি। আর কিচু জমায় নিতি পারলি একটা টোটো কিনি ফ্যালব। তুইও তাই কর। তর মেয়েডা তো বড় হচ্চে। জুয়ো-ফুয়ো ছাড়! ওতি তুই নিজিও ডুবদিছিস, মেয়েডারেও কষ্ট দিচ্ছিস। অমন চাঁদপনা মেয়েডা, আর লিকাপড়াও তেমনি! আর আমার ছেলেডারে পিটোয় পিটোয় ইসকুলি পাঠাতি পারলাম নে!
তুই ঠিকই বলিছিস। জুয়ো আর মদ আমারে খাইয়ে ফেলাইছে। আর বেরোয় আসতি না পারলি হবে না নে। যত ভাবি আজ ঠিক জিতবানে, জিততি আর পারিনে। সারাদিনের সব রোজগার ওদের দে ঘরে ফিরতি হয়। মেয়েডা কাঁদে। বড় কষ্ট হয় সেই সময়ডা। তুই ঠিকই বলিছিস!
তোর মনে নাই নগেন, আমরা ওপারের লোক? জ্বালায় পরি এদিকি চলি আসতি হইলো। যখন এইলাম তখন তো কিছুই ছেলো না আমাদের। শুন্যির থে শুরু করতে হইলো।
আমাদের দুডা জীবন, বুজলি শ্যাম। ছোটর থে যে মাটিতে বড় হলাম, যত মানুষ চেনলাম, যত মাঠ বিল দ্যখলাম সব ভুলে যাতি হলো। এহানে এসে দেখি সব উলটা! কত মানুষ দেখলাম চিনলাম, আরও কত চিনতি বাকি!
তোর মেয়েডারে দেখলি আমার কষ্ট হয়। তুই ঠিক হই যা নগেন।
নগেন কিছু বলে না, তার ভাঙা চোয়ালের মুখে আরো চিন্তার ভাঁজ পড়ে।
চল ওই দিক দে এডডা পাক মেরে আসি। দেকি কি হয়।
না তুই যা। আমি বসি থাকি।
শ্যাম লুঙ্গি গুটিয়ে ভ্যানের সিটে বসে, হর্ন বাজাতে বাজাতে দূরে চলে যায়।
প্রতিদিনের মত সন্ধ্যা নেমে আসে। নগেন তখনও বসে থাকে বটতলার নীচে। হাইস্কুল মোড়ের বটতলা। কত তরুণ-যুবক ভিড় করে ধুলোমাখা চোখে স্বপ্ন নিয়ে। হৈহুল্লোড় শুরু হয়। প্রতিদিনের পাওয়া না পাওয়ার অবসাদ সরে যায় ওদের ভেতর থেকে। চেনা পৃথিবীর আরও ভেতরে আর একটা ছোট্ট জগৎ তৈরি হয় ক্ষনিকের। ভোলাদার চায়ের দোকান থেকে চা আসতে শুরু করে। কেউ স্বর-পাউরুটি। তাই নিয়েও মজা। ঘেন্না ধরানোর জন্য বলে ওঠে, জানিস পাউরুটির উপর ওটা কি লাগানো? জানিস! জানিস!
আরও আরও জমে ওঠে আড্ডা তর্ক। চাকর-বেকার ভুলে ডুবে যায় ধোঁয়ার ছলনায়।
হঠাৎ কে যেন বলে ওঠে, টাকাই সব! টাকা না থাকলে কেউ চিনবে না। কথাটা কানে যায় অদূরে বসা নগেনের। তাই তো টাকাই সব! সোজা ঘিলুতে আঘাত। মস্তিস্ক সজাগ হয়ে ওঠে। টাকা! টাকা! অমনি ছুট! সোজা ঢুকে যায় অন্ধগলির গোপন ডেরায়। সে ঘরে ঘুকতেই গন্ধ আসে নাকে। মনের ভেতরের সাপ কিলবিলিয়ে ওঠে। রি রি করে ওঠে খাবলানো কলজে। বুকের ভেতরে জমতে থাকা বিষ যেন তাকেই পোড়াতে থাকে, যতক্ষন না অমৃত সুধা ঢেলে নেবে গলার ভেতরে। জ্বালা জুড়িয়ে যাবে।
নগেন আবার জুয়ায় মাতে। বাকি সব ভুলে যায়।
বাড়ি যেতে অনেক রাত হয় নগেনের। চিৎকার, গান আরও কতকিছু করতে করতে সে নিজের উঠানে এসে পৌঁছায়। পকেটের টাকা শেষ। সারাদিনের গায়ে খাটা রোজগার ওরা ভাগ করে নিয়েছে।
মেয়েটা ঘুমিয়ে পড়েছে এতক্ষনে। প্রায় নির্দিষ্ট জায়গায় ভ্যানটা কোনোরকমে রেখে টলমলে পায়ে নগেন এগিয়ে যায় দরজার দিকে। হোঁচট খেতে গিয়েও সামলে নেয় নিজেকে। জড়ানো গলায় মেয়েকে ডাকে। আরও একবার ডাক দিতে গিয়ে বেশি জড়িয়ে যায় গলা। পূণি দরজা খোলে। এক হাতে ঘুম চোখ মুছতে মুছতে মেয়েটি দেখতে পায় ঝাপসা বাবাকে। নগেন ধীর গতিতে ভাঙা ঘরের ভেতর অন্য এক ভাঙা ঘরে ঢুকে সোজা বিছানায় গিয়ে পড়ে।
পূণি ভাত বাড়ে। আর এক বাটিতে তরকারি। বাবাকে ডাকতে গিয়ে দেখে সে ঘুমিয়ে পড়েছে।
৩
আজ পূণির দাদু আসবে। বহুদিন বৃষ্টির পর রোদ উঠলে যেমন আনন্দ হয় তেমন আনন্দ আজ পূণির মনে। সে কতকিছু নিয়ে আসে তার জন্য, নাড়ু মুড়কি, পিঠে, পছন্দের মাছ আরও কত কি। সারাদিন গল্প করে দাদুর সাথে। এভাবেই দিন কেটে যায়। সন্ধেয় দাদু রূপকথার গল্প শোনায়। রাতে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। দাদু কত কষ্টে টাকা জমিয়ে এসব নিয়ে আসে পূণি কিছুটা হলেও বোঝে, তাই সে রাগের ভঙ্গিতে বলে, এত কিছু নিয়ে আসো কেন দাদু, এত কি আমি খেতে পারি?
তখন দাদু ঝাপসা চোখে হাসে, মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে, মন ভরে খা রে মা। তুই ছাড়া এ বুড়োর আর কে আছে বল?
নগেন দুপুরে বাড়ি এলে বৃদ্ধ দূরে দূরেই থাকে। জামাই আগে ভালো ছিল। এখন তেমন নেই। নগেন দুপুরে তৃপ্তি করে মাছভাত খায়। বুড়ো এলে নিজেই রাঁধে, হাতও ভালো।
বিকাল হলে নগেন ভ্যান নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। দাওয়ায় বসে থাকে বৃদ্ধ আর পূণি। পূণি মনে মনে কষ্ট পায়, বাবা যদি একটু দাদুর সাথে কথা বলতো কত ভালো হতো। হয় না। ভাঙা মনের সম্পর্ক জোড়া লাগা কঠিন।
সন্ধ্যা নেমে এলে দাদু আর পূণি গল্পে বসে। দাদুর সব গল্পই পূণির শোনা হয়ে গেছে। তাও বার বার শুনতে ইচ্ছা হয়। বুড়ো মানুষটাও খুব আনন্দ পায় তাতে। সে তার মেয়েকে দেখতে পায় পূণির মধ্যে। মনে পড়ে তার মেয়েটা এই বয়েসে এমনিই দেখতে ছিল। একই হাসি একই চোখ। কথা বলার ভঙ্গি। বড় প্রাণ খোলা ছিল তার মেয়েটা। পূণিও তেমন। বৃদ্ধ জানে মেয়েটা এখানে ভালো নেই। কেউ যত্ন নেয় না তার। এই বয়সে ঘরের সব করে। তাও মুখে হাসি। ইচ্ছা করে ওকে নিজের কাছে নিয়ে রাখার, উপায় নেই। এখানে এসেও থাকা যায় না। তাই মাঝে মাঝে এসে মা মরা মেয়েটার যদি একটু যত্ন নেওয়া যায়। বুড়ো মরলে কি হবে মেয়েটার কে জানে, সে ভয় পায়। জামাইটা যদি শুধরে যেত! এই তো সেই জামাই, তাদেরই চোখের মণি। কত গর্ব ছিল নিজেদের মধ্যে। গরিব হোক, মানুষ বড় ভাল। কপাল! নিজের মেয়েটা গেল, জামাইটা থেকেও নেই। আর এই মেয়েটা? দাওয়ায় বসে পূণির থেকে মুখ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে চাঁদের দিকে তাকায় বৃদ্ধ। শখ করে নাতনির নাম রেখেছিল পূর্ণিমা। চাঁদের মত ঘর আলো করে মেয়ে হয়েছিল। সেই নাম মুখে মুখে পূণি হয়ে গেল। তবুও স্কুলে, খাতায় কলমে ওর নাম তো পূর্ণিমা। তার নিজের দেওয়া নাম। বৃদ্ধ আজও ভাবে নামটা ভালোই হয়েছিল। তবে ওর কপালে যদি একটু সুখ হয় বুড়ো মরেও শান্তি পাবে।
জানিস তো মা, তোর বাবা তোর মা কে বিয়ে করে এই বাড়িতেই নিয়ে উঠেছিল। তখনও এমন ছিল ঘরগুলো, তবে নতুন। ওদেশ থেকে এসে একা নিজের হাতেই এসব করেছিল। খুব খাটতো লোকটা।
পূণি শুনতে থাকে দাদুর কথা। সে দেখতে পায় দাদুর মুখে মৃদু হাসি আর চোখে চাপা দুঃখ।
দাদু, তুমি এখানে থেকে যাও না?
সে না বলে, থাকা যায় না এভাবে। সে তো তেমন কেও না। নাতনির মাথায় হাত বোলায়, তুই যদি একটু বোঝাস মা দেখিস ঠিক হয়ে যাবে। তোর মুখের দিকে তাকিয়ে যদি ও ঠিক হয়, আমি খুব সুখী হবো রে মা।
পূণি হাসে, সে ভাবে বাবা ঠিক হয়ে যাবে, দাদুর আরও কাছে এসে বসে পূণি। মন ভরে ওঠে, কোথাও যেন একটা আলো দেখা গেছে। ছোটমেয়েটি সে আলোর হদিস জানে না। তবুও আশা জাগে।
সন্ধে পার করে রাত্রি নেমে আসে। কিছুই না, শুধু আলো নিভে যাওয়া। আর সব বদলে যেতে থাকে। লুকিয়ে থাকা শেয়াল বেরিয়ে পড়ে জঙ্গল থেকে শিকারের খোঁজে। একটা শিয়াল ডেকে ওঠে, বাকিরা গুপ্ত উপস্থিতি জানায়। সে ভাষা অন্যেরা বোঝে না। তারাই বোঝে যারা মাংস শিকারে বেরিয়েছে।
লেম্পপোস্টের আলো পেরিয়ে আর একটু অন্ধকারের দিকে একা ভ্যানের উপর বসে আছে নগেন। গুপ্ত হাত এসে কাঁধে হাত রাখে, দাদা ডাকছে। বুক কেঁপে ওঠে নগেনের। এবার? বুকের কাছে হাত রাখে, যেখানে হৃদয় আর বুকপকেটে কিছু গায়ে খাটা টাকা। আগের অনেক ধার! যেতে হবে।
আরও স্যাতসেতিয়ে ওঠে সব শিকারির ভেজা ভেজা জিভ। ঘনা নগেনের দিকে তাকিয়ে হাসে। আগের টাকাগুলো যে শোধ দিতে হবে নগেন। জুয়ার টাকা মেরে দেওয়া আমি একদম পছন্দ করি না। হয় পকেটে যা আছে রেখে যাও, দেখ এইভাবে কতদিনে শোধ হয়, নয়তো তাসের বোর্ডেও বসতে পারো। দেখো কপালে থাকলে আজ লেগেও যেতে পারে। একবারে সব শোধ! সঙ্গে অনেক টাকা ঘরে নিয়ে যেতে পারো। জুয়ায় সবসময় কপাল সমান যায় না। সিদ্ধান্ত নাও। গলায় আর একটু ঝাঁঝালো জল ঢেলে নেয় ভদ্রমুখোসভাষী ঘনা। তা জ্বলতে জ্বলতে নেমে যায় পেটে, ঘিলু শানিয়ে ওঠে। রসিয়ে ওঠে মন। আহঃ আর একটু জমিয়ে খতম করা যাবে!
ঘনাকে ঘিরে আছে তার স্বজন-বন্ধু। নগেন বেরতে পারবে না। সে শেষ চেষ্টায় মাতে। আরও ধ্বংস হয়ে যায়। এবার শেষ নোটটুকুও বাজিতে লাগায়।
অবশেষে রক্ষা পায় না নগেন। দারুন লাগছে ধ্বংস হতে। সেও তরল ঢালে গলায়, আরও আরও। ঘনাই এগিয়ে দেয়। খাও নগেন, খেয়ে মাথা ঠান্ডা করো।
তবে এবার? টাকা কিন্তু আজ শোধ করতেই হবে। অনেকদিন হলো, আর মেনে নেওয়া যায় না।
কিন্তু সে তো ডুবে আছে। সারাদিনের সব রোজগার শেষ! আর কি দিতে পারে?
ততক্ষনে নগেনের চারপাশ রঙিন হয়ে উঠেছে। ভালোই ঝিম লেগেছে। একটা বিড়ি ধরায়, নেশা চড়ে যায় মাথায়। আবার বড় একটা চুমুক! তারপর শক্ত হয়ে বসে। বলে, আজই সব শোধ দে দেব যা!
ঘনা হাসে, বাকিরাও মজা পায়। রঙ্গমঞ্চ জমে উঠেছে। কি করে শোধ করবে? আর আছে টাকা!
নগেন পকেট হাতরায়, চারিদিকে ঝাপসা দৃষ্টিতে কিছু খুঁজতে থাকে।
নেই তো! সব হেরে গেছ তুমি, নগেন! না তোমার দ্বারা কিচ্ছুটি হবে না। বাকিরা টিটকারি দিয়ে আসর মাতিয়ে দেয়।
এবার ঘনা নগেনের কানের কাছে মুখ নিয়ে আসে, যেন খুব গোপন কথা বলবে, ভ্যানটা তো এখনো আছে তোর, মনে নেই? বলেই আবার নিজের জায়গায় সরে যায়। আবার জোর গলায় বলে, লাগাও বাজি! জিতলে সব শোধ তোমার!
জিতলে সব শোধ? আর হেরে গেলে!
আহঃ এই জন্যই তোমার দ্বারা কিচ্ছুটি হয় না। প্রথমেই হেরে যাওয়ার কথা ভাবছো! এই দেখ সবাই, নগেন হেরে যাওয়ার কথা বলছে! সবাই একসাথে হেসে ওঠে। ঘনা আবার বলে, জিততে তোমাকে হবেই নগেন!
সে অবুঝ হয়ে যায় যেন, কি যেন সম্মোহন, কেমন একটা নরম বিষ তার শরীরে মৃদু ভাবে রক্তে মিশে যাচ্ছে। নিস্তেজ নগেন ভ্যানটা এগিয়ে দেয়।
ঋণ শোধ হয় না। রাতে নিঃস্ব মানুষটাকে ওরা একা ফেলে রেখে যায় পথের ধুলার ধারে। তবে ঘনার জুয়াঘরের কাছে নয়, বেশ খানিকটা দূরে। যাতে কেউ দোষ দিতে না পারে। যাওয়ার আগে অবশ্য ঘনা প্রশ্নটা করেছিল, কি রে নগেন যেতে পারবি বাড়ি? তোর তো ভ্যানটাও আর নেই। সকালে এসব ভুলে যাস না যেন! অবশ্য ভুললেও সে ওষুধ আছে। বাকিরা খুব হেসেছিল সেই সময়। নগেনের হাঁটার ক্ষমতা ছিল না। ছিল না টলমলে পায়ে উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতাও। পৃথিবীর সমস্ত দৃশ্য তখন ঘুরছে। মুখ দিয়ে কথা বেরচ্ছে না, ঠোঁট দিয়ে গড়াচ্ছে গরম লালা।
ঘনারা চলে যায় দল বেঁধে। সঙ্গের এক সাগরেদ নগেনের ভ্যান টানে। সব খেলা শেষ করে দূরে অন্ধকারে ওরা ছোট হতে হতে মিলিয়ে যায়। নগেন পরে থাকে একা পথের ধারে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া শিশুর মতো।
৪
কাল সারারাত অনেক খুঁজেও পাওয়া যায় নি। সকালে পাওয়া গেল। ভেবেছিল পুলিশে খবর দেবে, তার আগে খবর পেতেই ছুটে যায় পূণি আর ওর বুড়ো দাদু। রাস্তার ধারে পরে থাকতে দেখে অনেকে ভেবেছিল মরে গেছে। পরে বোঝা যায় ঘুমোচ্ছে। কপাল! নিজের মানুষ, ফেলে দেওয়া যায় না। কত জ্বালাবে! কয়েকজনকে জোগাড় করে কোনোরকমে তুলে নগেনকে নিয়ে বাড়ি ফেরে তারা। তখনও তেমন হুস আসেনি। আর একটু ঘুমলেই ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু ভ্যান! তা বোধ হয় চুরি গেছে! ভিড় থেকে মতামত আসে। ফিটিং হয়ে পড়েছিল, কেউ সুযোগ বুঝেই ঝেপে দিয়েছে। আর একজন বলে ওঠে, এবার পুলিশকে জানাতেই হবে। তবে মানুষটা আগে সুস্থ হোক। ওর কাছে আগে সব শুনে বিকালের দিকে কিছু একটা ব্যবস্থা করা যাবে।
দুপুরের পর সুস্থ হয়ে ওঠে নগেন। মেয়েটা কিছু জিজ্ঞাসা না করেই বাবাকে স্নানে পাঠায়। খেতে বসতে বলে।
নগেন মাথা নিচু করে খেতে বসে। মনের মধ্যে একটা ভয় কাজ করেছে, যদি জিজ্ঞাসা করে ভ্যান কোথায়, কী বলবে! মাথা আরও নিচু হয়ে আসে। দূরে তার শ্বশুর উঠানে বসে রোদ পোহাচ্ছে আরও দূরে একটা গাছের দিকে তাকিয়ে। নগেনের পেটে খিদের আগুন জ্বলছে, মনেও। ভ্যানটা ফেরাতেই হবে। তাড়াতাড়ি খেয়ে সে উঠে পড়ে। ঘরের ভেতর থেকে একটা চাদর নিয়ে গায়ে জড়িয়ে হাঁটা দেয় ঘনাদার বাড়ির দিকে।
ঘনাদাকে পাওয়া গেল না। সে দুপুরে খাওয়াদাওয়া করে ঘুমোচ্ছে। অনেকবার ডাকায় কে যেন বিরক্তির সুরে উত্তর দিয়ে নগেনকে ফিরিয়ে দিয়েছে। বাড়ির চাকর হতে পারে। দূর থেকে একবার বাড়িটা দেখে নেয় নগেন। জব্বর বাড়ি হাকিয়েছে ঘনাদা। হবে না! অনেক রকম ব্যবসা চারিদিকে তার। ছোট মাঝারি অনেকগুলো ব্যবসা। ইনকামের কোনও সুযোগ সে ছাড়ে না। বিন্দু বিন্দু দিয়ে সমুদ্র গড়ছে সে, তা টাকা হোক বা রক্তের।
নগেন ফিরে যায়। তবুও সে আর একবার আসবে। আজই, সূর্য আর একটু ঢলে গেলে। ততক্ষণ কোথায় যাবে সে? রাস্তায় ঘুরবে? স্ট্যান্ডে, যেখানে ভ্যান নিয়ে দাঁড়ায় ওখানে শ্যাম থাকতে পারে, দেখলে হাজার প্রশ্নের উত্তর তাকে দিতে হবে। সে কোনও প্রশ্নের উত্তর দিতে চায় না।
মাকড়সার জালে যে জড়ায় তাকে দোষ দেওয়া বৃথা। শুধু কেন গিয়েছিলি ওই পথে, এই প্রশ্ন তাকে তাড়া করে। যত বেশি ছটফট করবে তত জড়াবে। নগেনও ছটফট করতে থাকে, মনের ভেতরটা জ্বলে ওঠে। কী মনে হয় আবার ছুটে যায় ঘনার বাড়ি। চিৎকার করে। ঘনা বাইরে বেরিয়ে আসে দামি লুঙ্গি আর সাদা জামা গায়ে। মুখে চমৎকার হাসি।
কি হয়েছে নগেন, এমন চিৎকার করছো যে?
আমার ভ্যান আমারে ফেরত দিই দেন! ভালো কতা বলি দিলাম।
তোমার ভ্যান? তা কি আর তোমার আছে? কাল রাতের কথা ভুলেছ দেখতে পারছি।
ওসব রাতির কতা-ফতা বাদ দেন! ভ্যানডা কই রাখছেন বলি দেন নে যাই। রাতি মদ গিলাইয়ি আমার ভ্যানডা হাত করি নেছেন আপনি!
ঘনার রেগে যাওয়ার কথা, কিন্তু সে রাগে না। মৃদু হাসে, নগেন তুমি শুধুই চিৎকার করে যাচ্ছ। আমার বাড়িতে এসে একা একা বলছো তোমার ভ্যান আমি নিয়ে নিয়েছি। কিন্তু দশ জন এখনই এসে বলবে কাল রাতে তুমি আমার কাছে নগদ কিছু টাকার বিনিময়ে তোমার ভ্যান বিক্রি করে দিয়েছ। দেখতে চাও নগেন? শেষ কথাটা বলার সময় ঘনার মুখ হঠাৎ নৃশংস হয়ে গেল। রক্তাভ চোখ সোজা নগেনের চোখের দিকে। সে দু-পা এগিয়ে গেল নগেনের কাছে। যেন বিশাল এক অন্ধকার এক্ষুনি গিলে খাবে তাকে।
নগেন সমস্ত শক্তি হারিয়ে ফেলে, অসহায় ভাবে ভেঙে পড়ে সেই ঘনার কাছেই। কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকে, আমার ভ্যানডা ফিরায় দেন বাবু। না হোলি আমি আর আমার মেয়েডা না খেতি পেয়ি মরি যাব। আমি ভুল করিছি বাবু।
ঘনাদা বাবু হয়ে উঠলো হঠাৎ। এইভাবেই হয় আজকাল।
কেন বৃথা মাথা গরম করো নগেন? সবাই তো মাথা গরম করতে জানে না। তোমার জন্য খারাপ লাগছে। রাতে আমার ওই ঘরে এসো, দেখি তোমার জন্য কি করতে পারি।
ভয়ে নগেনের চোখ যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চায়। সে প্রায় আর্তনাদ করে বলে, না না বাবু ওই ঘরে আমি আর যাবো না। ও ঘর আমার সব্বনাশ করেছে!
আসতে তোমাকে হবেই নগেন। এখন যাও, রাতে দেখা হবে।
নগেন চলে যায়। কতদূর সে যেতে পারে? যাওয়ার জায়গা নেই। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে থাকে একা। হৃদয়ের ভেতর রক্ত জমা হয়, মনের ভেতর জমতে থাকে বিষ । আবার যেতে হবে? একা আনমনে হাঁটতে হাঁটতে নগেনের সেই সব দিন মনে করে যায়। তার ছোটবেলার দিন, বড় হয়ে ওঠার দিন। হঠাৎ চোখের সামনে যেন সেই আগুনটা দেখতে পায় আবার। পুড়ে যাচ্ছে মানুষের গ্রাম। প্রাণ ভয়ে যে যার মতো দৌড়োচ্ছে। ছিটকে যাচ্ছে সবাই। নগেন তারকাটা পাড় হলো নতুন জীবনের আশায়। তারপর কত মেহনত, নতুন করে সব গড়া। সব ভুলে কত পরিশ্রম করতো সে। আনন্দও হতো। সারাদিনের খাটনির পর অল্প কিছু যা রোজগার হত তাতেই তো সে ঘর বেঁধেছিল। মেয়েটা হলো। কিন্তু সুখ সইলো না। কী ভাবে যে সে পাঁকে ডুবে গেল টের পেল না নিজেও। জীবনের সুখের ভার অন্যের হাতে দিতে হয় খুব সাবধানে। সে মূর্খ মানুষ, ঠকে গেছে। এখন ঘুরপাক খাচ্ছে অন্যের লেজের দোলায়। ভ্যানটাই ছিল শেষ সম্বল। বড় ভুল করে ফেলেছে। সৎ পরিশ্রমের ওপর আর কিছু হতে পারে না। সে শ্রমিক মানুষ, এখনও তার জীবন থেকে ঘামের গন্ধ বেরোয়।
নগেনের মাথাটা ঘুরতে থাকে। যাবে যাবে, আজ সে যাবেই শেষ বারের মতো। দেখবে ঘনা কি চায় তার কাছে। আর কত যন্ত্রনা দিতে পারে একটা মানুষ! ওটা উদ্ধার করতে পারলেই মুক্তি। আর ওপথ মারাবে না সে কোনদিন।
৫
ঘনাদের আড্ডা জমে গেছে। জমে গেছে বাকি সবকিছু। তবে আজকের আসল শিকার এখনও আসেনি। চাপা অপেক্ষায় সবাই। এলেই খেলা জমে যাবে।
নগেন আসে কিছুক্ষন পরে, চোরের মত ভয়ে ভয়ে। পুতুলের মতো অন্যের হাতের সুতোর টানে । তবে ওরা তো পুতুল নিয়ে খেলে না। পুতুল নিয়ে খেলা করে শিশুরা, ওরা মানুষ নিয়ে খেলে।
নগেন আসতেই সবার নজর সেদিকে পরে। ঘনাদা একটু আগে রসিয়ে রসিয়ে বলেছে আজ নগেনকে নিয়ে কেমন মজা হবে। সবাই আনন্দ পেয়েছে খুব। এবার ফাইনাল খেলা। মনের ভেতর চড়া উত্তেজনা।
নগেন ঘনার শিকার এবং দলের পান্ডা। সেই প্রথমে খুব যত্ন করে ডেকে নেয়। এসো নগেন, বসো। এমন সংকোচ করো না। তুমি আমাদেরই একজন। বিকালে একটু রেগে গিয়েছিলাম তোমার ওপর। দাদা কি ভাইয়ের উপর রাগতে পারে না? সেই দাদাই কিন্তু ভাইকে ভালোবাসবে। তোমাকে আমি কত ভালোবাসি তা কি তুমি জানো? জানো না। ওদেশ থেকে যখন এদেশে চোরা পথে শেকড়হীন হয়ে এলে সেইদিন থেকেই তোমার উপর আমার নজর। খুব পরিশ্রমী মানুষ তুমি, দেখলেই বোঝা যায়। ভেবেই রেখেছিলাম কী ভাবে তোমাকে… যাই হোক কপাল, বুঝলে নগেন কপাল বলে একটা ব্যাপার কিন্তু আছে। দাদাকে ভুল বুঝো না। তাহলে কিন্তু তোমার এই দাদা খুব কষ্ট পাবে।
নগেন শব্দের চাল ধরতে পারে না। মন অবশ হয়ে যায়। ভাবে সব ঠিক হয়ে যাবে। এবেলায় ভ্যানটা চাইলেই পাওয়া যাবে। নগেন বলতে যায়, আশেপাশের এতগুলো লোকের দিকে তাকিয়ে বলতে পারে না। এরাই একদিন আপন ছিল। আজ তেমন আপন মনে হচ্ছে না। নগেনের কান্না পাচ্ছে, কাঁদতে পারছে না। রাগ হচ্ছে, চিৎকার করতে পারছে না।
কিছু বলতে চাও নগেন? ঘনার কণ্ঠে আশ্বাসের সুর। আর অমৃত সুধার বোতল নগেনের দিকে এগোনো।
নগেন বোতলটা প্রায় ছিনিয়ে নেয়, এক চুমুকে গিলে নেয় ততটা মদ যতটায় জ্বলে যেতে পারে বুক অথবা মনের জ্বালা।
এবার চারিদিক থেকে উৎসাহ আসে, এই তো পুরুষের মতো দম দেখিয়েছে সে।
নগেন হাসে, ঘনাও। আর হাসে বাকি সবাই। নগেন ঘনার দিকে তাকায়, সে অল্প চুমুক দিল। কিছুক্ষন চোখ বুঝে এবার তার দৃষ্টিও নগেনের দিকে। শোনো নগেন, আমি একটা কথা মনে মনে ঠিক করে রেখেছি তা তোমাকে বলি। নগেনেরও দৃষ্টিতে হঠাৎ আশঙ্কার ছবি ফুটে ওঠে অথবা আশার।
বলুন বাবু। হাত জড়ো করে উত্তর দেয় নগেন।
তোমাকে আমি আর জুয়ো খেলতে দেব না। এ জিনিস তোমার জন্য না। তোমার অনেক ক্ষতি হয়েছে এর ফলে। তবে আমি দাদা হয়ে আর তোমার ক্ষতি হতে দিতে পারি না।
নগেন তো এমনটাই চেয়েছিল, মানুষটা সত্যিই ভাল। সেই ভুল বুঝেছে। প্রায় নত হয়ে আসে নগেনের মন আর মাথা। বাবু আপনারে আমি ভুল বুঝেলাম। ঘনার পায়ের কাছে চলে আসে নগেন। মাথায় তার দারুন ঝিম।
ভ্যানটা তো খুইয়ে ফেলেছ। মুশকিল হয়ে গেছে এটাই। তবে কোনও একটা উপায় নিশ্চই আছে।
ভ্যানডা ফিরায় দেন বাবু। না হোলি কি করি খাবানে! আমার প্যাটে লাথ মারবেন বাবু?
ভ্যানটা তুমি ফেরত পাবে না নগেন, ওটা এখন আমার হয়েছে। আরও অনেক টাকা তোমার কাছে আমার পাওনা হয়েছে ভুলে যেও না। ঘনা নগেনের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসে। সে হাসির বিষ নগেন টের পায়। তবুও সে ঘনার পা আকড়ে ধরে। তৎক্ষণাৎ ঘনা এক লাথিতে ছিটকে ফেলে দেয় নগেনকে।
ভেতরটা হু করে ওঠে তার। কষ্ট করে উঠে আবার জায়গায় বসে। এখানেই সে আশ্রয় নিয়েছিল!
ঘনা বলে, তবে ওটা তুমি আমার কাছ থেকে ভাড়া নিয়ে ব্যবহার করতে পারো। প্রতিদিনের ভাড়া আমাকে দেবে, আর তোমার যা থাকবে তার থেকে কিছু টাকা করে দিয়ে আমার কাছে যা ঋণ আছে শোধ করবে।
প্রস্তাব শুনে নগেন চুপ থাকতে পারে না। তার মাথার বিষ জ্বলে ওঠে, অনেক দিনের যন্ত্রণা যেন একবারে আগুন হয়ে বেরিয়ে আসতে চায়। শোরেরবাচ্চা! তুই আমার ভ্যান আমারে ভাড়ায় দিতি চাস! নগেন উঠে দাঁড়ায়, এক লাফে ঘনার বুকের উপর পা রাখে। তারপর দুহাত দিয়ে টিপে ধরে তার গলা। তবে বেশিক্ষন না। কে যেন পেছন থেকে সজোরে আঘাত হানে তার মাথায়। মাটিতে পড়ে যায় নগেন। বাকিরা হিংস্রতার মাতে। কিছুক্ষন সহ্য করার পর নগেনের চারিদিক অন্ধকার হয়ে যায়।
কেউ কেউ খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল তারপর, মরে যাবে মনে হচ্ছে মালটা! রাগের মাথায় বেশি মারা হয়ে গেছে, তাই বলে দাদার গায়ে হাত! থুঃ!
ঘনা ঠান্ডা মাথায় বাকিটুকু সামলে নেয়। এখানে সবাই দোষী। সবাই মেরেছে। তাই কেউ বাইরে মুখ খুলবে না।
মাঝরাতে গাড়ি আর দলবল নিয়ে নিভৃতে অনেক দূরে ফেলে দেয় নগেনকে। তারপর তারা ফিরে যায়।
শেষ রাতে একবার জ্ঞান ফেরে নগেনের। সমস্ত শরীরে অসহ্য ব্যথা অনুভব করে সে। একবার উঠতে গিয়ে মাথা ঘুরে মাটিতে পড়ে আবার। মুখটা মাটির খুব কাছে, কুয়াশা ভেজা মাটির গন্ধ পায়। একই রকম, সেই ছোটবেলা, তার গ্রামের মাটির গন্ধ। নগেন বুক ভরে একবার গন্ধটা নেয়, তারপর চোখ বোজে।
দিনপার হয়। আলো কমে এলে ঘনা আর শেয়ালেরা রাত শিকারে বেরোয়, নতুন মাংস খোঁজে।
নগেনকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। কেও বলতে পারেনি সে কোথায়। হাওয়া সরে গেলে এসব ভুলে গেছে সবাই। তবে ভাঙা ঘরের জানালায় বসে একটা মেয়ে ভেজা চোখে চাঁদ দেখেছিল অনেকদিন।
নদী মাটির মানুষ
সবুজ গাছপালায় ঘেরা গ্রাম। সেখানে একটা নদী আছে। আকাশে নীলের মতো টলটলে স্বচ্ছ তার জল। ধীরগতিতে স্রোত যতদূর মন চলে, ততদূর চোখে দেখা যায় না, সে এমন বিশাল। তবু শান্ত। এ গ্রামের মানুষগুলির মতো।
তারা নদীকে খুব যত্নে রাখে। বলে নদী মায়ের মতো। সে এই গ্রামকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে তার শাড়ির আঁচল দিয়ে।
এখানে মানুষ ফুলগাছ দিয়েই তাদের বাড়ির চারপাশ ঘেরে। উঠানে ফলের গাছ লাগায়। পাখিরা সে ফল খেতে তাদের উঠানে আসে।
এখানে সবাই কৃষক। জমিতে সোনার ফসল ফলে আর তারা মাটি ভালোবাসে। তাই মাটিও ওদেরকে ভালোবেসেছে।
গ্রামের এমনই এক উঠানে দুটি ছোট্ট মেয়ে মাটির পুতুল খেলা করছিল। ওরা দুই বোন। খুশি আর হাসি। মাটির কাছে মাটির পুতুল নিয়ে খেলা। পুতুল বানানোর মাটি খুশি মাঠের জমি থেকে নিয়ে আসে। এঁটেল মাটিতে পুতুল ভালো হয়, সে জানে।
বোনের সঙ্গে পুতুল বানাতে বানাতে আনমনে সে দিকে তাকিয়েই বলে ওঠে, বোন, আজ নদী দেখতে যাবি?
দিদির কথা শুনেই বোনের মুখে হাসি ফোটে। সে তো কোনোদিন নদী দেখেনি। শুনেছে নদীর কথা, নৌকার কথা, মাঝির কথা। এইসব শুনলেই তার ভেতরটা আনন্দে ভরে ওঠে। মা প্রায়ই নদীতে স্নান করতে যায়। দিদিও মায়ের সঙ্গে গেছে অনেকবার। কিন্তু তাকে কখনও কেউ নিয়ে যায়নি।
আমাকে তুই নিয়ে যাবি দিদি? আনন্দে প্রায় নাচতে শুরু করে পাঁচ বছরের হাসি।
হ্যাঁ নিয়ে যাব, কিন্তু আগে বল মাকে বলবি না?
না না বলব না। এখনই নিয়ে যাবি?
মা তো ঠাম্মা বাড়ি গেছে, তাই এখন গেলে মা জানতে পারবে না। ফিরে এসে মাকে বললে কিন্তু আর কোথাও নিয়ে যাব না। মনে থাকবে তো?
হ্যাঁ, থাকবে।
খুশির জীবনের সব ভালোবাসা তার বোন। তাই সে সব সময় তাকে আগলে রাখে। নিজের হাতেই চুল বেঁধে দেয়, খাইয়ে দেয়। ঘুমের আগে গল্প শোনায়। বোন ওর নয়নের মণি। বড় আদরের। মা আর সে যখন নদীতে যায়, বোনও যেতে চায়। কিন্তু সে এখনও ছোট। আর একটু দুরন্ত। তাই তার মা তাকে যেতে দেয় না। খুশি জানে সে নদী দেখতে চায়। তাই এই বিকালে দুই বোনের মাটির পুতুল খেলার মাঝে খুশি তার বোনকে কথাটা বলে ফেলে। সে জানত নদী দেখতে যাওয়ার কথায় ছোট্ট বোনটি কত খুশি হবে। এই খুশিতে বড়দিদির সত্যিকারের আনন্দ।
হাসি নিজেই মাটির পুতুলগুলি যত্নে তুলে রাখে এক কোণে। কাল সেগুলি রোদে শুকোতে দেবে। খুশি ওর হাত ধুইয়ে দেয়। তারপর দিদির হাত ধরে ছোটমেয়েটি হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে যায় নদী দেখবে বলে।
নদী কতদূর সে জানে না। কিন্তু সে জানে দিদি আজ তাকে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কত দেরি হবে? তর সইতে চায় না হাসির। তাই কখনও সে তার মতো করে বড় বড় পা ফেলে, কখনও এক লাফে পার হতে যায় মেঠো রাস্তার ছোট গর্ত। দিদি স্নেহের স্বরে শাসন করে। মাঝে মাঝে সে দিদির দিকে তাকায় আর হেসে ওঠে। মনে মনে খুব আনন্দ পায়, সে আজ নদী দেখতে যাচ্ছে।
আর কতদূর দিদি? আঙুলটা একবার টেনে সে প্রশ্ন করে।
এই তো চলে এসেছি। আর একটু। হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে তোর?
না রে দিদি। আচ্ছা নদীতে কি অনেক জল থাকে?
হ্যাঁ, অনেক অনেক জল।
আর কী আছে রে দিদি?
নদীর পাশে কত গাছ, নতুন নতুন গাছ, গাছে রঙিন পাখি থাকে। ওরা নদীর পাশ দিয়ে উড়ে বেড়ায়। গাছে বাসা বাঁধে।
কী কী পাখি থাকে দিদি?
অনেক রকমের পাখি। বাঁশপাতি, ফিঙে, মাছরাঙা। তুই মাছরাঙা পাখি দেখেছিস?
মেয়েটি ঘাড় নাড়িয়ে না বলে। মাছরাঙা পাখি কি মাছের মতো দেখতে হয় দিদি?
ওরা তো পাখি। জলের উপর দিয়ে উড়ে উড়ে বেড়ায় আর জল থেকে মাছ ধরে। কী সুন্দর রঙিন পাখি। তোকে আজ চিনিয়ে দেব।
আর? আর কী আছে?
নৌকো আছে। মাছ ধরার নৌকো। খেয়াপারের নৌকো। অনেক রকমের নৌকো।
যে রাস্তা দিয়ে ওরা যাচ্ছিল তারপাশেই নতুনবউয়ের বাড়ি। সে বাড়ির উঠানে বসে কুলোয় ধান ঝাড়ছিল। দুই বোনকে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে দেখে ডাক দেয়, এই যে কোথায় যাচ্ছ তোমরা?
হাসি দৌড়ে বউটার কাছে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে। বলে, জানো, দিদি আজ আমাকে নদী দেখাতে নিয়ে যাচ্ছে।
বউটি হাসে। তার মাথায় ঘোমটা। পরনে লালরঙের শাড়ি। কপালে মোটা সিঁদুর।
নতুনবউ, তুমিও চলো না আমাদের সাথে নদী দেখতে?
আমার তো অনেক কাজ পড়ে আছে হাসি, আমি অন্য একদিন তোমাদের সাথে যাব। নতুনবউ হেসে উত্তর দেয়। তারপর কুলোর ধান পাশে রাখা বেতের ধামায় ঢালে। হাসি নতুনবউয়ের চুড়ির শব্দ শুনতে পায়।
তোমরা মিষ্টি খাবে? হাসি আর খুশি উত্তর দেওয়ার আগেই সে উঠে ঘরে চলে যায়, একটা বাটিতে দুটো মিষ্টি এনে দু’জনের হাতে দেয়।
মিষ্টি দেখে দুই বোন খুব খুশি। ওদের খাওয়ার আনন্দে নতুনবউয়ের মন ভরে ওঠে। সে জানে মিষ্টি খেতে হাসি খুশি দু’জনেই খুব ভালোবাসে। প্রায় যখনই ওরা আসে নতুনবউ মিষ্টি খাওয়ায়। দুই বোন আনন্দ করে খায়। তারাও নতুনবউকে এই কিছুদিনেই খুব আপন করে নিয়েছে।
তুমি চলো না নতুনবউ, দেখবে নদীর কত জল। কত পাখি ওড়ে সেখানে। দিদি আমাকে সব বলেছে তো। আমরা ওখানে গিয়ে খেলা করব।
নতুনবউ কুলো মাটিতে রাখে। হাসির মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, আজ তোমরা যাও। আমাকে অন্য কোনোদিন নিয়ে যেও।
ওরা আবার হাঁটতে শুরু করে। রাস্তার দু’পাশের ছোটছোট গাছে ফুটে আছে কত কত ফুল। কোথাও সন্ধ্যামালতী, দোপাটি। কোনো গাছে এখনও ফুটে আছে ভোরে ফুটে ওঠা টগর।
আর একটু হেঁটে পথ থেকে মাঠের ওপর নামে তারা। দূরে বিশাল এক কৃষ্ণচূড়া, ফুলে ফুলে লাল হয়ে আছে। মিঠে রোদের আলোয় তা আরও সুন্দর দেখায়। সবুজ নরম ঘাসের ওপর দিয়ে ওরা কৃষ্ণচূড়ার কোলে এসে দাঁড়াতেই খুশি আঙুল তুলে দেখায়।
ওই দেখ বোন।
হাসি আর একটু এগিয়ে যায়। এই তো তার ছোট্ট জীবনে প্রথম নদীকে দেখা। আনন্দে হাসি দিদিকে জরিয়ে ধরে। তার চোখ বিশাল নদীর জল দেখে অবাক হয়ে যায়। কী বিশাল আঁচল যেন মায়ের মতোই আদরের। হাসি যতদূর দেখতে পায় শুধু জল আর জল। জলের অল্প ঢেউ পাড়ে এসে লাগে। ছলাৎ ছলাৎ মিষ্টি শব্দে মন ভরে যায়।
অনেক দূরে নৌকায় জাল ফেলে মাঝিরা মাছ ধরছে। হাসি ওদিকে আঙুল দিয়ে দেখায়, দিদি ওটা কী?
ওটাই তো নৌকা।
নৌকা? অত ছোট কেন?
অনেক দূরে রয়েছে তো তাই অমন দেখাচ্ছে। আরও কত বড় বড় নৌকা আছে। কী সুন্দর দেখতে সেগুলো। কত মানুষ তাতে করে কত দূরে চলে যায়, আবার ফিরে আসে।
ঘাসের ওপর কৃষ্ণচূড়ার ফুল ছড়ানো। হাসি আনন্দে হাততালি দেয় আর নাচতে থাকে। যদিও হাসিকে জড়িয়ে ধরে। পৃথিবী, কী আনন্দের পৃথিবী!
অনেক দূরের আকাশে সারিসারি সাদা পাখি উড়ে যাচ্ছে। কোথায় যাচ্ছে তারা? ঘরে ফিরছে? হাসি দেখতে পায় নদীর ওপর দিয়ে তারা উড়ে চলে যাচ্ছে। বড় আদরের নদী।
দিদি আমি নদীতে নামব?
না না বোন! অনেক জল। তুই যখন বড় হবে তখন তোকে সাঁতার শিখিয়ে দেব। যত ইচ্ছা নদীতে খেলা করবে তখন।
হাসির মন খারাপ হয়। খুশি হাসির হাত ধরে। ছোট বোনটিকে নিয়ে চলে পাড়ের দিকে। যেখানে এই বিশাল ভূমি নদীর সাথে মিশেছে। তারই কোনো সমতলে। হাসি পাড়ের কাছে দাঁড়ায়ে। জল এসে শিশুর পা ছোঁয়। এই প্রথম নদীকে ছুঁতে পায় হাসি।
তারপর ওরা কৃষ্ণচূড়া গাছের নীচে ঝড়ে পড়া ফুল কুড়িয়ে হাতের মুঠোয় নিয়ে শূন্যে ছুড়ে দেয়। বৃষ্টির মতো সে ফুল তাদের ওপর ঝ’রে পড়ে।
কৃষ্ণচূড়ার ডালে পাখি আসে আবার উড়ে যায় নিজেদের কাজে। দিদি হাসিকে চিনিয়ে দেয় সেসব পাখিদের নাম। হাসি পাখিদের গান শুনতে পায়।
বৃদ্ধ কৃষ্ণচূড়া যেখানে নদীর দিকে ঝুঁকে পড়েছে ওরা সেদিকে দুই বোন পাশাপাশি বসে বয়ে চলা দেখে অনেকক্ষণ। কতকিছু বয়ে চলে সেখানে, নৌকা, মাঝি, এমনকী সময়।
দূরের দিকে সূর্য আরও কিছু ঝুঁকে ওদেরকে দিনের শেষের আলো দিয়ে যায়।
হাসি বলে, আমাদের একটা নদী আছে, কী আনন্দ বল দিদি?
খুশি ছোট্ট বোনটাকে জড়িয়ে বুকের কাছে নিয়ে আদর করে।
গত নভেম্বর থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত সন্মাত্রানন্দের অসামান্য উপন্যাস 'মেঘবতী'-র বারোটি অধ্যায় পড়ুন
পূর্ববর্তী সংখ্যা
এখন বাড়িতে বসেই সংগ্রহ করতে পারবেন আমাদের প্রকাশিত বইগুলি। ভিজিট করুন আমাদের অনলাইন সপ, আর কিনুন আমাদের বই। নিচের BUY NOW বোতামে ক্লিক/ট্যাপ করলে পৌঁছে যাবেন আমাদের সপ পেজে।