সাপ্তাহিক

১৭ আশ্বিন ১৪২৭

ছবি: ভি এস গায়তুন্ডি

মলয় গোস্বামী

নৌকো

মেঘের কিছু নৌকো নিয়েছি

    সঙ্গত কিছু সূত্রে

সেই নৌকোতে চড়তে লাগবে

     জীবনের যত খুচরো ।

যে-জীবন শুধু ঝুমঝুম করে

      বাজনার মতো কায়দায়

চড়বে নৌকো? গগনবিহারী

       তোমার সামনে ময়দান

খোলাই রয়েছে, সেখানেই হাঁটো

   হেঁটে হেঁটে দ্যাখো পথিকের

কষ্ট কতটা, হেঁটে পার হওয়া

   পাথরের মতো প্রতিকূল

 

অবশেষে বোঝো— জীবনই নৌকো

বয় সে সকালে বিকালে

যত ঢেউ আসে ফণার মতন 

    জীবনকে বাঁধে শেকলে

তবু দেখি সে তো বাজে ঝমঝম

হঠাৎ ঘাড়টা ঘুরিয়ে 

দেখার মতনই দেখতে পেয়েছি

ঢেউ ভেঙে দ্যায় হুলিগান।

 

নৌকো এনেছি, মেঘের নৌকো

মাঝে বুকে রাখি উঠিয়ে

দুশ্চিন্তার মেঘ তুলে রাখি

    মাদুরের মতো গুটিয়ে।

 

বিপ্লব ঘোষ

কবিতার জন্য নয়

কবিতা লিখবার জন্য নয়

এত কষ্ট পাচ্ছি প্রতিক্ষণ 

এত কান্না শরীর মন জুড়ে 

দুঃখ ভুলবার অবলম্বন।

 

কবিতা লিখতে যে পারিনি

পারবো না যে কোনোদিনি 

আমার চেয়ে বেশি কে জানে!

 

আমার সমস্ত রক্তবমি নিয়ে 

জুড়োতে আসি সাদা পৃষ্ঠার কাছে।

 

আমি যতবার যাওয়া দেখি

নিজের মৃত্যুর চিতা থেকে

ফিরিয়ে আনে এই অক্ষর, শব্দ

আমার বেঁচে থাকার ওষুধ।

 

এই কি মানবজন্ম

এত কষ্ট পাচ্ছি দিনরাত

এইসব লিখে কী হবে

তবে কি লেখার জন্য বেঁচে আছি!

 

মৌসুমী রায়

বিরহসংকেত

তোমার ভোরে এখনও শিউলির গন্ধ

আলতো শিশির টুপটাপ ঘাসফুল

ক্রমশ নির্জন হতে হতে স্নানঘরে 

একলা আয়নায় বিবর্ণ সময়ের 

জলছাপ আঁকে…

 

সকালের মিঠে রোদ খোলাচুলে

বিন্দু বিন্দু রামধনু রং ছড়িয়ে 

ভেসে যাও তুমি, যৌথ দুপুরের 

খিড়কি দরজা বিপন্ন কড়ানাড়া 

অসমাপ্ত সংকেতে…

 

মধ্যরাতে তোমার বিষণ্ণ জানলায়

সেতারে বাগেশ্রী সুর তোলে

গভীর ব্যথার মত বয়ে যায়

আমার বিছানায় তখন সপ্তমী চাঁদ 

শরীরজুড়ে কি ভীষন খরা…

 

 

রাখী মাহাতো

উদ্বর্তন

নতুন রঙের উৎকোচ ভুল ভাঙায়

বল্মীক শিকড়ের বসন্ত – ধ্যান, 

শীত – শেষের বিষন্ন ধোঁয়াশায়—

গণতান্ত্রিক অনশন….

পাখিদের ঠোঁটে পরোক্ষ – প্রলাপ—

রোমে রোমে শিরায় শিরায়

পাগলা বৃষ্টির কনা।

বিবর্ণ – মুলুকের বিহ্বল বিরহে  

জেগে উঠে ভুঁই ফোড় কুঁড়ি। 

থমথমে মাটি! নতুন পরিভাষায় –

ডালে ডালে রঙিন আল্পনা 

নতুন সংশ্লেষ – যাপনে 

পাতা – কুঁড়ির নরম আদর মাখে।

চিরহরিতের সলজ্জ স্বীকার – 

সহজিয়া সুরে শরীর – সংস্কৃতি 

প্রাক্ – প্রসবে জাগায় শৌচ – শৃঙ্গার… 

 

বঙ্কিম লেট

ইচ্ছেধারী

ভূয়োদর্শী যারা তারা জানে অলৌকিক নয়

ইচ্ছেধারী নাগ ও নাগিন জগৎ সংসারে

অবশ্যই আছে। তারা ছদ্মবেশে  রয়

সাপ হয়ে কাটে, আর সাধু সেজে ঝাড়ে     

 

আর তুমি, সক্রেটিস, শব কোলে বিষের জ্বালায়

তড়পাও, তঞ্ছিট করো। জনগণ কম যান না

কামিনীকাঞ্চন লোভে পানপাত্রে গরল জোগায়

 

এসো চক্রপাণি, মত্ত নাচো ফণায় দিয়ে পা!     

ছবি: এম এফ হুসেন

উৎসবের উপহার

নির্মল হালদার

আমাকে কিছু দিতে হবে না বললে কি হয়? দিতে তো হবেই। সবাইকে দেব আর তোকে দেব না একি হয়? এই তো আমি পেয়ে গেছি শিউলি ফুল। অপরাজিতা। কাশের বন। এই তো আমার উৎসব। উপহার। আমি তো নিয়েছি প্রকৃতির কাছে। সারাবছর নিয়ে যাই। ফুটিফাটা মাঠ থেকে শ্রাবণের ভেজা মাটি। বসন্তের পলাশ থেকে হেমন্তের ধান কাটা জমি। আগুন পোহানো শীত আমি নিয়েই থাকি। আর তুই আমার কাছ থেকে কিছুই নিবি না?

আমি জানি, তোর অনেক কিছু আছে। কত কত ভালোবাসার রত্ন। আমি ছুঁতেই পারি না। তারপরও তোকে দেবার মত সাহস আমার থাকা উচিত ছিল না। তবুও দিতে চাই। তোর ইচ্ছে মত কিছু নিতে পারিস। কিন্তু তুই কিছুই বলছিস না। এই নীরবতাকে ভয় করে আমার। সারাজীবন ভয় ভয় করেই কেটে গেল। আরও ভয় করব? কেন ভয় করব? কখনোই চুরি করিনি ধুলোবালি। লুকিয়ে দেখতে চাইনি পাখির মিলন। নবীন পাতা যখন নবীনের কাছে যায় তখন  আমি কী উঁকিঝুঁকি মারি? আতার কাঁচা রঙ পাকা রঙের দিকে গেলে আমি লক্ষ্য করি না। আমার লক্ষ্য, প্রজাপতি রঙ ছড়াচ্ছে কোথায়। তুইও তো রঙ ছড়ানো রাস্তায় ছুটছিস। তোকে ধরা যাচ্ছে না। আজ তোকে বলতেই হবে, কী পছন্দ তোর? তুই যদি বলিস, আমাকে করতে হবে একটাই কাজ, ধুলোর সঙ্গে মেশাতে হবে বালি, আমি করতেই পারি। তুই যদি বলিস, তোর লাগবে একটা বড় দরজা, আমি দিতেই পারি। কিন্তু তুই কিছুই বলছিস না। কেউ কিছু চাইলে, মনে হয় আমার তো কিছুই দেবার নেই। সবকিছুই তো আছে। তারপরই মনে হয়, যে আমার কাছে চাইছে, তার মন অনেক বড় বলেই চাইছে। তখনই আমি অস্থির হয়ে উঠি—আমিতো চিরকালের ভিখিরি। আমি কী দিতে পারি? দিতে পারিও। ভিক্ষে করেই সব কিছু দিতে পারি।

তোর বাইক ছুটছে। পিছনে ছুটছে আমার মন। দুপাশে ঘরবাড়ি গাছপালা মাঠ ঘাট। পুকুর। গাই গরু ছাগল ভেড়া। কোথাও কোথাও গাছ তলায় শুয়ে থাকা বাগাল। এবং বাগালের লাঠির পাশে শুয়ে থাকা এক টুকরো ছায়া। বাইক দেখছে না। বাইক তার আপন গতিতে ছুটছে সামনের দিকে। কে আছে? আমি বাইকের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ি। ব্রেক কষে। একটিও কথা বলে না। আমার যেটুকু বলবার বলে, চলে যাব তাল তলে।

তুই তো কিছুই বললি না কি চাইছিস— আমার যা দেবার তোকে বলছি এইবার—তোকে একটা নদী দেব। উৎসবের উপহার এর চেয়ে ভাল হয় কি?

রোগা-পাতলা একটা নদী। রঙিন একটা নদী।

তুই মাথায় বাঁধবি।

ছবি: ভি এস গায়তুন্ডি

পূর্ববর্তী সংখ্যা

এখন বাড়িতে বসেই সংগ্রহ করতে পারবেন আমাদের প্রকাশিত বইগুলি। ভিজিট করুন আমাদের অনলাইন সপ, আর কিনুন আমাদের বই। নিচের BUY NOW বোতামে ক্লিক/ট্যাপ করলে পৌঁছে যাবেন আমাদের সপ পেজে।