সাপ্তাহিক

১৭ শ্রাবণ ১৪২৭

কবিতা

রাহুল পুরকায়স্থ

মুহূর্ত

চঞ্চল হাতের মুদ্রা ঘোরতর রাত্রি ডেকে আনে,

এই সেই বৈতরণী, বি টি রোড ভেদ করে

                                  চলেছে উজানে,

স্রোতে ভাসে গ্রন্থ নিমব্রহ্ম সরস্বতী,

‘কাঙাল কাঙাল’ রবে দক্ষিণে একটি কাক ডাকে

 

এখনই কবিতা হবে, আর

নক্ষত্রসংকটে ফের নিজেকে খোঁজেন 

                       কবি নিত্য মালাকার

অর্ঘ্য মণ্ডল

সদাপ্রসন্ন মিথ‍্যে

তোমার নিকটে এসে উধাও হয়েছে

আলো ভর্তি একটি বার্তা

 

একটি গলার দড়ি

জীবন-যুদ্ধের মধ‍্যে গান হয়ে গেছে, তুমি

কোন সাগরের মধ‍্যে জেগে ওঠা গ্রাম

 

কী কথা অমৃতমধ‍্যে সহমরণের প্রস্তাব

ডানা মেলে চোখবন্ধ উড়ে গেছে তোমার নিকটে

 

২

 

অনেক অশ্রু দুয়ারে জমে জমে 

শৃঙ্খলিত ভোজালি হয়ে আছে 

অনেক আশা গুটিয়ে রাখা লাটাই 

তাকিয়ে আছে আজকে সুতো ছেড়ে 

 

অনেক উঁচুই উড়ছে ঘুড়ি লাল 

পায়ের কাছে শ্যামলঘন হাঁস 

রেগে আগুন নখদন্তবন

গর্জে উঠে শাসায় চতুর্পাশ 

 

কিন্তু এখন লুকোচ্ছ না আর 

ফোঁসফোঁসানির মাঝখানে সংসার 

অনেক কিছুই দেখতে পাওয়ার পর 

বুঝেছিলাম এটাই হল ঘর

 

সৌরভ দত্ত

তুমি বুদ্ধ, তথাগত

(উৎসর্গ: বুদ্ধদেব বসু)

কালি কলমের ঠোঁটে লিবিডো-আতুর জলরেখা

অনুপম তিথিডোর  ঘর জুড়ে সব্যসাচী কবি;

কবিতার সন্ধিমুখ রক্তমাংস দেহের ঝরোকা

আঁধারের গায়ে গায়ে আলোডানা এঁকে যায় ছবি।

 

দময়ন্তী শিখা জ্বলে মরচেরা গেয়ে ওঠে গান

নাগরিক বিপন্নতা,কঙ্কা এসে হাত ধরে শেষে 

অনূদিত বোদলেয়্যার  প্রবাহিত মায়াবি পুরাণ

কালের পুত্তলি  জাগে  রাতভোর বৃষ্টি এসে মেশে।

 

নতুন পাতায় নামে কালসন্ধ্যা অমিতার প্রেমে

দেশান্তরে মন-কথা চেতনার গূঢ় পারমিতা;

লাল মেঘে লেখা  আছে মঞ্জুভাষ অমেয় কবিতা 

একদিন প্রতিদিন লিখনের খাতা যায় থেমে।

 

কবিতাভবন জানে, জানে তার প্রতিটি দেওয়াল ;

তথাগত ধরেছেন কবিতার নির্ণায়ক কাল।

 

 

পৌষালী চক্রবর্তী

সঙ্কেত

বৃক্ষরাজির সামনে নতমুখ শব্দব্রহ্ম

গাছেদের মত ব্যবধান বজায় রাখছে 

দুটি মানুষের দূরত্ব তবু মাঝে মাঝে অপরিমেয়

 

ও বৃক্ষকুল, বিভূতি বাবুর মতো তুমিও জানো  

ওরা মনে মনে প্রণয়ের কথাই বলছে।

পল্লব গোস্বামী

আয় আয় চৈ চৈ...

এমন বর্ষা-বাতাসে শুধু ঝরে যেতে ইচ্ছে করে। ঝরে যেতে ইচ্ছে করে, নীলচে মেঘের মাসে তুমিও যেমন অঝোর। টুপ টাপ ঝরে যায় বিষাদকণারা। হাজা-মজা ডোবাটির নতুন সবুজ জলে উছলে ওঠে ছেলেমানুষের ঢেউগুলি। দূর থেকে এক মেয়েমানুষ ডাকেন। তাঁর কণ্ঠে যেন তাল পাতার বাঁশি মোড়া।

আমার বুক থেকে, সমস্ত মন ও মায়াস্বেদ থেকে বেরিয়ে যায় পাতিহাঁসের শিশুগুলি। গুগলি-শামুক হাতে আমি দাঁড়িয়ে থাকি। লোভ দেখাই। ওরা আর ফেরে না তবু। ফিরে ফিরে আসে শুধু পরিযায়ী শ্রমিকের দিন। আগুন বিছানো রাস্তায় আমি হাঁটি, আমার সাথে সাথে আরও কয়েকহাজার। এত ভিড়!  এত মৃত্যু –  কেউ তো নিত্য শোভার কথা বলুক। বলতে পারে, এমন দিনে; দুই বান্ধবীগাছ – ঝিম ও বৃষ্টির কথাও বলেনা। মা আমার দুঃখ ছেঁকে আমের ফিরনি বানান। ভাঙা হাট থেকে রঙিন মাছ নিয়ে ফেরেন বাবা।

অথচ, আমার মুখের আয়ুরেখায়  শুধু তোমার মুখ। শ্রম ও শোণিত মেখে পিটপিটি মাছগুলি খেলে আর খেলে। ডুবে যায় কাগজের নৌকা। ভেঙে পড়ে  কালভার্ট। একটি সিঁদুরে মেঘ শুধু ডেকে চলে। স্নেহের জাজিমে বসে, আমি শুনি তাঁর গান –

“আয় চৈই চৈই চৈ..ই, আয় আয় আ….য়”।

 

সবর্ণা চট্টোপাধ্যায়

ভাসান

এলোচুল মেঘ এল, পিঠ জুড়ে নেমে এল জল

আমাকে বিছিয়ে দিলে, টুকরো টুকরো হল নদী

ক্ষতদের সাড়া নেই, নেই বাকি শরীরের বল

মন যে অসাড় কেন, বুঝতে পারত শোক যদি?

 

শ্বাসে আর বিষ শ্বাসে পাটাতন কেঁপে কেঁপে ওঠে

ঘৃণাও যে ভালোবাসা ফুলদান কালসিটে ভরা

উড়ে যায় লালমাটি এলোমেলো ভাসানের স্রোতে

বরফ জমেছে মেঘে শরীরে এসেছে নেমে খরা


ভেসে যদি যেতে হয়, পথ কই কতদূর যাওয়া?

পথ নেই পথ নেই, ভিজে বালি থই থই জল

চোরাবালি চোরাস্রোত, মাঝে কার শুধুই না পাওয়া?

নোনাজলে ডুবে আছে জ্যোৎস্নায় ঢাকা এক স্থল।


ধূসর পায়রা দুটো, ঝাপটায় শিশিরের দাগ

তোমার হাতের কাছে আমারো হাতের এক ছাপ

ফেনা এসে ধুয়ে দেয়, মুছে যায় বালির আঁচড়

মৃত্যু কি পারবে কাল মুছে দিতে অলিখিত পাপ?


জলের নীচেতে ভাসা আধভেজা দেবতার মুখ

কে পারে এমন ভাবে ছেড়ে দিতে আঁকড়ানো সুখ?

 

গল্প

চৌকাঠ

অমিত মাহাত

এ তো মেয়ে নয়, পুরো পদ্মখরিস যেন। যার শরীরে তখনও লেগে রয়েছে সদ্য স্নানের জলের দাগ। আমার খোঁড়া পায়ের শব্দ পেয়ে সে হিসহিসিয়ে উঠল ঘরের ভেতর। এই ঘর ক’খানা আমার হতে পারত। কিন্তু সে আর হল না। সব ঠিকঠাক থাকলে কিংবা আমার আজকের এই দশা না হলে পারতপক্ষে শ্বশুরবাড়ি হত’ই। কিন্তু কথায় আছে মানুষের স্বভাব দোষ! এ শালা পাল্টাবার নয় কিছুতে। আর এ কোনও মামুলী ইলেকশন নয় যে ঝান্ডা পাল্টে ডান্ডা হাতে পাল্টে ফেললাম দেওয়ালের রঙ। এ হল স্বভাব। তাই কাঠি করবার মেয়ের অভাব হল না। ভাংচি দেবার সেই আইবুড়ো পিসিমণিরও অভাব হল না। মাঝখানে পড়ে কাঠি হলাম আমি। শুধু কাঠি না। আমার চেহারা-খানাই হয়ে দাঁড়াল লিকলিকে দেশলাই কাঠি। তাই দেশলাই বাড়ির দেওয়ালে এখন হররোজ ধাক্কা দেওয়ায় আমার স্বভাব হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘরে ঢোকার অনুমতি আর দিল কে!

যদিও অনুমতির আমি তোয়াক্কা করি না। অগত্যা অন্যদিনের মতো আজকেও ঢুকে পড়লাম, বাড়ির চৌহদ্দির  ভেতরে। আর তখনই ফোঁস করে উঠল আমার লীলা সুন্দরী।

—এই একদম না। না বললাম তো। আবার সাধ করে জুতো খুলছ কেন?

—খুলব না?

—না।

—তবে জুতো পায়েই ঢুকি, কী বলো।

—ফের পা বাড়ানো—

আমি তখন বললাম, -পায়ের উপর ভর করেই তো শরীরটা দাঁড়িয়ে। আর তুমি সেই পায়ের দোষই দেখলে লীলা! আমাকে কেন দেখো না?

—কারন তুমি হলে অনুভবের জীব। মৃদুস্বরে মিষ্টি গলায় বলল লীলা। তারপরই পাড়াকে শোনানোর মতো চেল্লানো গলায় চিৎকার করে উঠল লীলা- ‘তোমাকে চিনতে বাকি নেই আমার। এইসব নাটক অন্য কোথাও দেখিও।’

লীলার আইবুড়ো পিসিমণির  গলা ভেসে আসছিল ভেতর থেকে। আমার মনে হল  কথাগুলো পাড়াকে নয়, ওর  পিসিমণির কানে পৌঁছে দিচ্ছিল  লীলা। ভাবের প্রকাশ ঠিক এইরকম, দ্যাখো পিসিমণি- এ বাড়ির মেয়ে লীলা কিন্তু আর কোনও চক্করে নয়।  এই ছেলেটিই যত নষ্টের মূলে।

আমি কথার উত্তরে শুধু বললাম, -নাটক আবার কোথায় দেখালাম। তুমি তো প্রেক্ষাগৃহের দরজা আগলে। আর আমি তোমার দরজার বাইরের মানুষ। যার সাথে ভিখিরি আর কুকুরে তফাৎ নেই।

লীলাসুন্দরীকে আমার কেমন যেন মনে হল। খানিক আগে  বিব্রত দেখাচ্ছিল । এখন পুরো উল্টো। চোখের কোনা চিকচিক করে উঠল ওর।  বেশিক্ষণ আর সে আমার চোখের দিকে তাকাতে পারল না। দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিল দেওয়ালের দিকে। তারপর বলল, -এবার তুমি আস তো। মানে মানে বিদেয় হও। ভরদুপুরে এ পাড়ায় জ্বালিয়ে মারার একটাই লোক আমার দু চোখের বিষ। উফ তোমাকে সহ্য করাও যায় না।

—কিন্তু একদিন তো সহ্য করতে। আজ খোঁড়া বলে ঘেন্না করছ আমায়?

লীলার গলার স্বর নেমে এল এবার। -এ বাড়ির চৌকাঠ আর মাড়িও না তুমি।

—আর মাড়ালে?

—একটি পা তো গেছে। এবার দ্বিতীয় পাও আস্ত থাকবে না।

—পা না থাক। তুমি থাকবে তো? লীলা…? যদি বলো হ্যাঁ। আমার এই দ্বিতীয় পা হাসতে হাসতে বাড়িয়ে দেব  ট্রাকের চাকার তলার দিকে।

লীলা অস্ফুটে শুধু বলল – না।

আমি বললাম, তবে তুমি থাকো তোমার পিসিমণির মতো।  তিরিক্ষে মেজাজের অধিকারিনী হয়ে।

—ফের? পিসিমণির তুলনা দেবে না আমার সাথে। লীলা সুন্দরীর রাগ হয় এতে ।  রাগ দেখায়। সেটা কপট কি না জানি না। ফের আমার চোখের দিকে তাকায়। তাকিয়ে থাকে। দৃষ্টি নামিয়ে একসময় বলে, ফের পিসিমা কেন? আমাদের তো বিয়ে হয়েছে।

—হ্যাঁ। হয়েছে তো। কিন্ত তুমি সংসার করলে কই?

আমার এ কথার জবাব না দিয়ে লীলা সুন্দরী ঘরের ভেতর ঢুকে যায়। ওর ফণামুখ নামিয়ে রাখলেও ভেতরের হিসহিসানি তখনও চলছিল। এখন দেখার —কতক্ষণ ধরে সেটা চলে।

এই যে এ মেয়েকে এত বিরক্ত করি। তবু কেন সহ্য করে? আমার যখন তখন বদ খেয়াল মাথায় ওঠে। যখন তখন ফোন করে বসি এই মেয়েকে। তখন হয়ত রাত দুটো। আমার ঘুম নেই। রাত নেই। দিন নেই। দুপুর নেই। সাঁঝ নেই। শুধু লীলাসুন্দরী আছে। ফোন ধরলে ভালো। না ধরলে ঘরে গিয়ে চড়াও। যেমন টা আজ হয়েছি। কিন্তু লীলা কেন কোনও অভিযোগ করে না কারও কাছে। করে না বলেই আমার জিদ চেপে যায়।

“তুমি হলে অনুভবের জীব” তবে কি লীলাও ভাবছে? নইলে এখনও আমাকে সহ্য করে যায় কীভাবে! বুকের ক’নম্বর কুঠুরিতে অনুভব নামক বস্তুটি থাকে। সে কুঠুরির ভেতর যেতে কোন পথ নিতে হবে আমায়। সেখানেও কি একখানা চৌকাঠ রয়েছে? যা মাড়িয়ে এগোতে গেলে ধমক দিয়ে উঠবে আমার লীলা-সুন্দরী।

কতক্ষণ সময় গেল কে জানে। এখন আর হিসহিস শব্দটা নেই। বরং বিকট পাখার ঘর্ঘর শব্দ ঢেউ তুলছিল এ বাড়ির দরজার পরদায়। অর্থাৎ দরজা খোলায় আছে।  আমি এক দুই তিন চার করে সে ঢেউ গুনছি। গুনে চলেছি। কিন্তু কেন গুনছি? হোয়াই?

দুপুরের চড়া রোদের তেজ এখন বিকেলের কুমড়ো ফুলের মতো মিইয়ে পড়েছে। মিইয়ে পড়েছি আমিও।   কিন্তু আমার খিদে পাচ্ছে কেন? মানুষের কেন খিদে পায়? খিদে পেলে আমার চোখ বুজে আসে। আমার ভীষণ ঘুম পায় তখন। খুব ক্লান্ত লাগে। হাত পা অবশ লাগে। ঘুমোলে লীলাসুন্দরী আমাকে আদর করে। ও তখন সোহাগী হয়ে ওঠে। সোহাগে সোহাগে জাগিয়ে তোলে আমার ভেতরের সাপটিকে।

 

—এত ঘুম আসে কীভাবে?

লীলাসুন্দরী আমার ঘুমন্ত কাঁধে ঝাঁকুনি দেয়। আর আমার তখন উঠতে মন চাই না। শুয়ে থাকতে ভালো লাগে।

—তাই, তোমার  খুব খিদে যে! চেয়ে দেখো কত কত খাবার।

—হুম । গন্ধ পাচ্ছি।

—গন্ধে পেট ভরবে না । এবার তাকাও।  আমাকে দেখতে ইচ্ছে করে না?

—করে তো।

—তবে? দেখ না কেন?

—কিন্তু খুব অন্ধকার যে !

—হ্যাঁ। আমার ঘরের ভেতর আরও বেশি মিশকালো আঁধার।

—হুম। তাই হয়তো আমি… দরজার বাইরে তোমার। দরজার বাইরের লোক।

—না। বাইরের না। ভেতরের। এসো ভেতরে এসো।

একটু দাঁড়াও। আগে আলো জ্বালাই। এইবার আমার হাত ধরো। এসো এগিয়ে এসো।

লীলা-সুন্দরীর ঘরের ভেতরের আলোটা  মিটমিট করে দেখছিল আমার খোঁড়া পা’টিকে।  আমিও তাকিয়ে দেখছিলাম সে আলো। আলো খানিক লজ্জা পায় এতে।  তারপর জানালা টপকে সে আলো এখন মাঠের দিকে…। ক্রমে মাঠ ছাড়িয়ে কালো পিচ রাস্তায়  উঠে যেন অপেক্ষা করতে লাগল আমার দ্বিতীয় পায়ের জন্য।

অঙ্কন: কৃষ্টিশ্রী

এখন বাড়িতে বসেই সংগ্রহ করতে পারবেন আমাদের প্রকাশিত বইগুলি। ভিজিট করুন আমাদের অনলাইন সপ, আর কিনুন আমাদের বই। নিচের BUY NOW বোতামে ক্লিক/ট্যাপ করলে পৌঁছে যাবেন আমাদের সপ পেজে।