সাপ্তাহিক কবিতা আশ্রম, ১৮ পৌষ ১৪২৭
সাপ্তাহিক
১৮ পৌষ ১৪২৭
Painting: Anselm Keifer
তন্ময় সরকার
অসাম্য
যতই রোদের ওম মেখে নাও গায়ে,
যেমন করেই নাও না সকাল গুছিয়ে
উঠোনে যে মাটি কিরণ পায়নি কখনো-
অভিমানে ঠিক কোণায় থাকবে দাঁড়িয়ে।
যে আখরে লেখো চারপাশে দেখা জমি-
যে ভূষণে তোলো পরম ক্লান্তি সাজিয়ে-
যে পথে তাকাও বারেবারে ফিরে ফিরে,
একফালি ছায়া যাবেই সেসব ছাপিয়ে।
ছায়া ছায়া মাটি একটু তাপের আশায়
বেঁচে বেঁচে থাকে – সেসব তুমিও জানো।
আরও জানো এই রোদ্দুর খুব মাপা
কৃপণের মতো চলেছে খরচ বাঁচিয়ে ।
আসলে এগুলো সমস্যা নয় কোনো
সমস্যা শুধু এ কথাটা জেনে ফেলা ।
উঠোনে যতই সাম্য ফলাতে চাও
রোদ্দুর যাবে কিছুটা না কিছু এড়িয়ে ।
রানা নাগ
ধ্যান
যে চোখ দিয়ে দেখি, সে আমি নই
যে কান দিয়ে শুনি, সে আমি নই,
যে জিহ্বায় স্বাদ নেই, সে আমি নই,
এই শরীর কিংবা চিত্ত? এসবও আমি নই।
যা আমি দেখি তা আমি নই
যা আমি শুনি সেও আমি নই
যে গন্ধ আসে সে আমি নই
স্বাদ অথবা স্পর্শ তাও তো আমি নই।
আমি দৃষ্টি নই, শব্দ নই, গন্ধ নই
বিচার কিংবা স্বাদ অথবা মন-কিছুই নই,
নই আমি এই পৃথিবী কিংবা ঐ আকাশ
জল অথবা বাতাস এসব কিছুই আমি নই।
চেতনাও নই আমি
বস্তুর বন্ধনে তেমনই নাই জানি।
জন্ম মৃত্যু ছুঁয়ে যেতে পারে না আমায়!
হাসি সদা এটা জেনেই
জন্মাইনি তাই মরব না কখনোই।
জন্ম আমাকে জীবন দেয়নি
মৃত্যু আমার জীবন নেবে না
জন্ম মৃত্যুত্যে আমার জীবন
নির্ভর কিংবা নির্বল কখনই নয়।
শীলা বিশ্বাস
উপশম
অক্ষনাভি ঘিরে ঘুরপাক খাওয়া
আলোভুক হৃদয়খানিজুড়ে
আজরখপুরের বালিকার হাওয়ায় ওড়া ইন্ডিগো ঘাগরা
টুপ ছন্দের সনেটে নাচে শ্রাবণের মায়াহরিণ মেঘ
বিরহীর নীল দিগন্তে লিপিবদ্ধ হয় অবগাহন পদাবলী
উটের গ্রীবার উপশম হতে চেয়েছে যে সাহারা
তাকে তুমি শীতলতা দিও জল দিও প্রখর রোদে
লুকিয়ে রাখা ক্ষতগুলো পাহাড় ফুঁড়ে গাছ হতে চায়
তাকে আজীবন তৃষ্ণার্ত রেখেছিলে ভ্রান্ত ছলাকলায়
পরিক্রমণ সেরে তরুণ নাবিক ফিরে এল ঘরে
খোলসে খোলসে ঝরিয়ে ফেলেছে তাপ ও তাড়স
দাউ নেভা জল দাও আরও জল চাই আনন্দ সেচনে
খুলে যাক প্রেমের অনন্ত সড়ক পারিজাত বাগানের
পৌষালী চক্রবর্তী
বর্ষাদুপুর
দরজায় মুখোমুখি দাঁড়ালে সারিকদম্ব
রোদ ও বৃষ্টিতে ঝরে থাকে বিছানার মত
জলের উপরে ভাসে কোনো
কদম যেন রাধিকার ডুব
ও মেঘ,তুমি দুপুরে গড়িয়ে এসো
এমন বিষাদে আসে এলোমেলো বেলা
রোদছিটে লাগা গ্রিল আলপনা
এঁকে যায় গহীন ছাদের গায়ে।
দূরে দূরে ঘন্টা বেজেই যায়
ছুটি বিহীন ইস্কুলে
দিদিমা আমার রোজ ইস্কুলে যান বিনুনীটি বেঁধে
স্মৃতিজিৎ
জীবনের বিপ্রতীপ ব্ল্যাকহোল
এখন কথোপকথনের মাঝখানে কেবলই ধোঁয়া উঠছে…
কারও মুখে ধৈর্যের অভিজ্ঞান নেই
আগ্রহ বা অনুরাগের উৎরাই নেই
প্রত্যেকের দৃষ্টি এখন নিজের হাতের তালুতে নিবদ্ধ
প্রেম এখন পাহাড়ি মেঘের মত বুড়িছোঁয়া খেলা –
আলিঙ্গনের গায়ে উষ্ণতার আখর নেই
মৌসুমী হাওয়ায় বৃষ্টির অঙ্গীকার নেই
কারও বুকের নিঃশ্বাস আর
বিশ্বাস পারছে না কোনোভাবেই
যে যার আশার লেজে বেঁধে নিচ্ছে হতাশার নীল রুমাল
সহজ হতে গিয়ে অর্জন করছি উপেক্ষা
জটিল হতে চেয়ে হারাচ্ছি বুকের সরণ
আমাদের সব পথ ঢুকে যাচ্ছে
জীবনের বিপ্রতীপ ব্ল্যাকহোল …
Painting: Anselm Keifer
“হৃদয়ের গান শিখে তো...”
পর্ব-৫
ফাল্গুনী ভট্টাচার্য
“ও আমি সব দিতে পারি
তুমি যদি চাও,
শুধু এনে দাও
ছেলেবেলাকার সেই
আদুরে নরম বিকেলগুলো।
আবার মাখতে চাই
যদি পাই
পরমপ্রিয় সেই গ্রামের ধুলো।”
গাঁয়ের পাশ দিয়ে মেটে রাস্তা চলে গেছে। পুবে সর্পলেহনা, কংকালীতলা আর পশ্চিমে কোপাই ছুঁয়ে ন’ডাঙ্গাল, দামোদরপুর কশবা-কেশবপুর মালা-দেবগ্রামের দিকে। ওই পথ দিয়ে নিত্য ইস্কুল যাতায়াত। গরমকালে শুখার সময় ধুলো হাঁটু অব্দি ওঠে। চটি থাকলে সে ধুলো মাথায় ওঠে। বর্ষায় পথের এঁটেল কাদায় চলা দায়। দু’একটা ঘরে সাইকেল আছে। তারা এই সময় সাইকেল ঝেড়েমুছে তুলে রাখে ঢেঁকিশালে। বর্ষা চলে গেলেও অনেকদিন রাস্তার কাদা না শুকোলে খালডোব সমান না হলে চালানো দায়। একদিন ইস্কুল যাবার পথে তুমি দেখলে ধারে ইঁট আর মোরাম পড়ছে। হাবল কাকা বললে,- ‘রাস্তা পাকা হচে। ইঁট পাতবে তা বাদে মোরাম ছিটিং দিবে। মাইনেকড়ি নাই। দু’ কেজি করে গম না হলি চাল দিবে।’ জেঠুরা বলল, “একে বলে ‘কাজের বিনিময়ে খাদ্য’। সরকারি প্রকল্প বুঝলে হে।” ছ’ সাত দিন কত নারীপুরুষ খাটল। রাস্তাজুড়ে ইঁট পাতল। চেলি মোরাম মানে কাঁকুড়ে লাল মাটি ছড়ানো হল। ধূসর ধূলোমাটির রাস্তাটা লালমাটির পথ হয়ে উঠল। লোহার বেড়ি লাগানো গোরুর গাড়ির চাকায় ওই পথের উপর চুঁউউন ইঙইঙ রঅঁঅঁন ইঙইঙ ধ্বনি ওঠে। চাষীরা সার বয়, ধান তোলে। মাহিন্দার মাথায় টপ্পর চাপিয়ে স্টেশন
থেকে লোকজন নিয়ে আসে।
এই সময় খুশিতে তোমার মনও নেচে উঠল- যাক আর পায়ে কাদা লাগবে না। জেঠার সাইকেল নিয়ে হাফ থেকে ফুল প্যাডেল শিখেছ। এবার গড়গড় করে চাকা গড়াবে। আরো কত স্বপ্ন দেখলে তুমি। মনে মনে এখন তুমি অরণ্যদেব হয়ে তোমার তুফানের উপর চেপে ছুটে চলেছ এক দুঃসাহসিক অভিযানে। আগে, আরো আগে। একেবারে সামনের দিকে। এবার জেঠার কাছে সাইকেল চাইলে আর কাদা লাগার অজুহাত দেখাতে পারবে না। ব্যাস, এক দমে লাইব্রেরি। বই নেওয়া-দেওয়ার কত সুবিধা হবে। বলো না কী আনতে হবে? বোঁ করে চলে যাবো কোপাই বাজার। এখন আর হাত কাঁপে না। গোরুর গাড়ির পাশ কাটিয়ে সোঁ করে চালাতে পারো। ছুটির দিন গুলোয় এখন সেজমা ভাতের টিফিনকোটো দিয়ে আসতে বললেই তুমি সাইকেল নিয়ে চলে যাও কোপাই। ডাউন সাহেবগঞ্জ লোকালে গার্ডের কাছে তুলে দিতে হবে। সেজমার বড় ছেলে বোলপুরে রেলে কাজ করে। ট্রেন থেকে নামিয়ে নেবে ওই ভাত। দুটো মাত্র স্টেশন- প্রান্তিক তারপর বোলপুর। ভাত গরমই থাকবে। এক হাতে চারবাটির টিফিনকোটো দুলিয়ে এক হাতে হ্যান্ডেল ধরে তুমি বেশ চালিয়ে চলে যেতে পারো। পথে বন্ধু হারাধন বা মনোরঞ্জনের সঙ্গে দেখা হলে গল্প জুড়ে দিলে ট্রেন ফেল হবে। কথা বলতে বলতেই চালাবে। আলবাঁধা গ্রামে ঢোকার আগে কুলবুনি। বুনোকুলের বন। পাশে জয়সাগর। ওখানেই প্রথম ঘণ্টা বাজে। ক্যানেল অফিস পেরিয়ে যাবার পর দ্বিতীয় ঘণ্টা। তার মানে আমোদপুর ছেড়ে দিয়েছে। জোরে চালাও ফাল্গুনী, আরো জোরে। কালুরায়পুরের ধারে কালো ধোঁয়া ট্রেন ঢুকছে। গার্ডবাবু জানেন তোমাকে। ভাতের টিফিনকোটো এগিয়ে দিলে তিনি তুলে নেন। রেলের কাজ মানে বুকিং অফিসের ক্লার্ক। সপ্তাহে ছাপান্ন ঘন্টার রেস্টে দেবুদাদা গ্রামে আসে। বাড়ির দরজায় হাঁক দেয় ‘এই ফাগুন, ফাগুন!’ তুমি ছুটে যাও। দেবুদা তোমার হাতে দেয় চারটে ডায়মন্ড কমিকস। অরণ্যদেবের বই। ছবিতে গল্প। অরণ্যদেব ডায়ানা কিট হেলোয়েজদের কাহিনি। দুপুরবেলায় তুমি গোগ্রাসে গিলে নাও। আর দাদা তখন ঘুমিয়ে নেয়। নাইটে ডিউটি করতে হবে না!। অরণ্যদেব আর ডায়ানা সোনালি সৈকতে গেছে মধুচন্দ্রিমা যাপনে। সেখানে বাঘ সিংহ মাছ খায়। খুলি গুহার ভেতর বহু পুরোনো লাইব্রেরি। আর ঘন অরণ্যে গাছের ওপরে বাড়ি। দড়ি-বাঁধা ঝুড়ি দিয়ে উপর নিচে ওঠানামা করা যায়। তুমি মনে মনে ভাবো ঐ গভীর জঙ্গলের রাস্তাগুলো কেমন গাঢ় সবুজ! দূরের কালচে সবুজে নীলে মেশামেশি। রাতের আকাশ কত কালো। শুধু অরণ্যদেবের মুখে একটি কাঠিন্যের জ্যোতি। অন্যায় করেছ তো এক ঘুষিতে গালে খুলির চিহ্ন দেগে দেবে, বাব্বা। দেশে, সমাজে, ঘরে, ঘরের অন্ধকারে কত অন্যায় । গালে হাত দিয়ে ছোট্ট জানলার পাশে বসে দূরে তাকিয়ে থাকো তুমি। কী জন্য? কার জন্য ফাল্গুনী? অরণ্যদেবের পদধ্বনি কি শুনতে পাও?
ইস্কুলের বাইরে পুকুরের ধারে অনেক তেঁতুল গাছ। গাঁ বাইরে ইস্কুল। বিরাট মাঠ গাঁয়ের গরু বাছুর চলে যায় মাঝ বরাবর। প্রাচীর নেই। পুবদিকে সার দিয়ে ছ খানা রুম ছাত্রদের হোস্টেল। অমরদা ওখানে রান্না করে। কাঠ কিংবা কয়লা দিয়ে। উঁচু উনুনে বড় একটা হাঁড়িতে ভাত ফুটছে। আলুর তরকারি আর পাতলা জলের মতো ডাল। আদিবাসী ও তফসিলি জাতি-ভুক্ত ছেলেরা থাকে। সরকার থেকে যা গ্রান্ট আসে তাই দিয়ে কষ্টে সৃষ্টে চলে। কানন মাল, কলম হাঁসদা, বাবুলাল হাঁসদা, হৃদয় বাগদী তোমাদের ক্লাসমেট। ওখানে থাকে। টিফিনের সময় ওরা বাড়ি থেকে এনে রাখা মুড়ি খায়। একদিন খুব খিদে পেয়েছে শুনে কানন তোমাকে ডেকে নিয়ে গেল। এক থালা মুড়ি আর এক তাল গুড় দিয়ে বলল-“ খা ভটচায।’ তোমার কান্না পেয়ে গেল। তুমি চোখ ধুতে টিউবওয়েলের কাছে চলে গেলে।
‘লে তোর আবার কী হল ভটচায?’
‘কই কিছু না তো!’
‘চোখ চকচকাছে। আমাকে বোলতে তোর লজ্জা কী, বোল কেনে?’
তুমি অনেক কষ্টে থেমে থেমে বললে-“আমাদের আউশ ধান এখনো পাকেনি। ভাতের চাল নেই। খুব কষ্ট। এই ক’দিন আটার রুটি খাচ্ছি।”
হৃদয় বললে, ‘কাল একটু সকাল সকাল আসবি ফাল্গুন।’
আমি মাথা নাড়লাম।
সেদিন বুধবার। সকালে ফুল তুলে তাড়াতাড়ি চান করে পুজো সেরে খেতে বসলে। আজ মা তোমাকে তিনটে রুটি দিয়েছে। বইয়ের থলে নিয়ে ইস্কুলের পথ ধরেছ। ‘নটা বাজে এত সকাল সকাল ?’ বাবা জিজ্ঞেস করল। তুমি মুখ বুজে রইলে। পথের মাঝে হেলে বেঁকে থাকা খেজুর গাছ। তার নিচে এক বোঝা ঘাস কেটে ক্লান্ত বুদ্ধিকাকা বসে জিরোচ্ছে। ভালো নাম বুদ্ধদেব কাকা। ‘ভাইপো ইস্কুল চললে না কি হে?’ তুমি মাথা নাড়লে। উত্তর দিকে খয়েরগড়ে গ্রামের তালগাছওলা পুকুর দেখা যায়। ক্যানেলধারের পাকুড়গাছের মাথায় বকের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে ব্রহ্মদত্যিতলা ঘোষপাড়া বাণীদিদিমণিদের কামরাঙাতলা ছুঁয়ে বেসিক ইস্কুল পেরিয়ে, গেলে একেবারে হস্টেলে- হৃদয়ের রুমে। ছেলেরা ভাত খেয়ে হাত ধুচ্ছে, থালা গেলাস মাজছে। এবার ইস্কুলে যাবে। দশটা দশে প্রেয়ার। কানা উঁচু এলুমিনিয়ামের থালায় চুর চুর গরম ভাত আর আলু পোস্ত আর আধখানা ডিমের ঝোল এনে হৃদয় বললে-‘লে
ভটচায, পেট ভরে খা।’ তুমি বললে,- “তোর ভাগের ভাত আমাকে খাওয়াবি?”
হৃদয় হেসে বললে-‘না না কাল অমরদাকে বললাম। একটু বেশি চাল লিয়েচে রে।’
উবু হয়ে বসে তুমি ভাত খেলে। সাদা ভাতের মধ্যে আলুপোস্ত মাখলে কেমন একটা স্বর্গীয় একটা গন্ধ ওঠে। আর পাশে যদি হৃদয় বাগদীর মতো একজন বন্ধু বসে থাকে তবে খুব ভরসা পাওয়া যায়। হস্টেলের ছোট্ট রুমটা দিগন্তবিস্তৃত ফসলের মাঠ হয়ে ওঠে।
Painting: Anselm Keifer
গত নভেম্বর থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত সন্মাত্রানন্দের অসামান্য উপন্যাস 'মেঘবতী'-র বারোটি অধ্যায় পড়ুন
পূর্ববর্তী সংখ্যা
পড়তে পারেন:
এখন বাড়িতে বসেই সংগ্রহ করতে পারবেন আমাদের প্রকাশিত বইগুলি। ভিজিট করুন আমাদের অনলাইন সপ, আর কিনুন আমাদের বই। নিচের BUY NOW বোতামে ক্লিক/ট্যাপ করলে পৌঁছে যাবেন আমাদের সপ পেজে।