সাপ্তাহিক

২২ কার্তিক ১৪২৭

PAINTINGS: S H RAJA

রণদেব দাশগুপ্ত

মুদ্রাদোষ

একদা তোমার প্রিয় নাম,

আজ এই ছায়াশীতে 

আবার আকাশে ভাসালাম।

 

ফোঁটা ফোঁটা রোদ এল 

ভুলে যাওয়া নিকোনো উঠোনে,

পুরোনো হাসিটি এল—ভিজে যাওয়া মনে।

 

কাকজ্যোৎস্না নিভে গেলে 

চেনা ছোঁয়া ভিড় করে আসে—

ছেঁড়া ছেঁড়া জলজ বাতাসে।

 

এ সবই অতীব চেনা 

মাঝবয়সের পদাবলী;

রাজপথ জেগে আছে—

মুছে গেছে মধুবংশী গলি॥

 

 

গাফফার মাহমুদ

আদমসুরাত পিতা, শুকতারা মা

সৌরমন্ডলের সুদৃশ্য জ্যোতিস্ক তারা

ছায়াপথ এঁকে যায় সুদূরের পথ

দূর নক্ষত্রে রাখি চোখ ক্রমশঃ অকাতরে

টিপটিপে আলো ছড়ায় ওই শুকতারা।

 

নীল আসমান পথ দেখায় আদমসুরাত

কার্পাস তুলো পুচ্ছ-পুচ্ছ মেঘের কিনার

 

কতো দিন, পিতা-মাতা হীন কতোটা বছর! 

 

ওই যে ওই মিটিমিটি তারা দিচ্ছে পাহারা

ওই তারাটাই বুজি হারানো মায়ের চোখ

কেবল দৃষ্টি রাখেন শোকগ্রস্ত সন্তান পানে।

 

শাদা শাদা মেঘের জায়নামাজ বিছানো ওই

তারকা শোভিত আদমসুরাত পিতা

প্রার্থনায় মগ্ন থেকে কতো করছেন দোয়া

রাতের নিস্তব্ধতা বাড়ে ; ঘুমহীন এই যে আমি

 

চুপিচুপি বলছি কথা, ওই তারাটাই বুজি মা

আদমসুরাত প্রিয় পিতা এখনও দেখান পথ!

 

অর্পণ চক্রবর্তী

ফাইণ্ডিংস

দু’জন বোবা কথা বলতে পারে না নিজেদের মধ্যে

দু’জন কালাও তা পারে না কখনও

দু’জন অন্ধ সবসময় সেসব বিষয়েই কথা বলে

যা তারা কোনদিন দেখেনি।

দু’জন খোঁড়া কখনও পঙ্গুত্ব নিয়ে কথা বলে না

নিজেদের মধ্যে,

সচেতন ভাবে বিষয়টা এড়িয়ে গিয়ে তারা

গিরিলঙ্ঘনের ছবি দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

এসবই হয় এক অলিখিত চুক্তি মেনে—

মৈত্রী সাম্য আর পারস্পরিক অধীনতার চুক্তি।

 

অথচ প্রতিবন্ধী নয় এমন দু’জন যখনই কথা বলে

তারা দু’জনেই ভাবে অন্যজন অন্ধ বোবা কালা পঙ্গু

দু’জনেই দু’জনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিবন্ধী ভেবে

কথা বলে যায় অনর্গল,

আর তাদের পারস্পরিক করুণার মধ্যে

অপ্রতিরোধ্য এক অবজ্ঞা ছায়া ফেলে

খুনোখুনির হাত থেকে  বাঁচিয়ে রাখে তাদের।

 

দু’জন অত্যন্ত জ্ঞানী মানুষ,

দু’জন অতি ভালোমানুষ,

দু’জন অতীব সুখী মানুষ,

দু’জন চোর, দু’জন ডাকাত, দু’জন সেলিব্রেটি,

দু’জন নিরীহ কবি, দু’জন নেতা

এবম্বিধ জোড়াজোড়াদের  কথা আড়াল থেকে শুনে

আমার অন্তত তাই মনে হয়েছে।

 

শুধু দু’জন দুখী মানুষকে কখনও আমি

কথা বলতে দেখিনি।

বস্তুত তারা একে ওপরকে দেখলেই

কিভাবে যেন চিনে নেয়

আর মুখোমুখি বসা তো দূরের কথা

একে অন্যের ধারেকাছেও ঘেঁষে না।

এমনকি রাষ্ট্রও তাদের এবিষয়ে সাহায্য করে না।

ট্রেনে বাসে কর্মক্ষেত্রে শিক্ষায়তনে

কোথাও এদের জন্য কোনও সংরক্ষণ নেই।

ফলে দুখী মানুষেরা একা একা ছড়িয়ে পড়তে থাকে 

বাইপাসে গলিতে দিকচক্রবালে; মাঠের দুপ্রান্তে

গোলপোস্টের নিচে নিমগ্ন গোলকিপারের মতো।

 

তথ্যের যাবতীয়  অপ্রতুলতা সত্ত্বেও

আপাতত এইটুকু পর্যবেক্ষণ 

মানবসভ্যতার ইতিহাসে বিধৃত হয়ে থাকুক

সাধারণ বিবৃতির মতো।

 

ঋতশ্রী মান্না

দহন

গতরাত্রির দাহচিহ্ন কাঠকুটোর গায়…

নিঃশব্দে বাতাসের সাথে উড়ে আসে 

লঘু পা নিভৃতচারী ছাই,

এখানেও,এই অস্থায়ী আবাসে।

 

এদিনও,পাহাড়ের গা ঘেঁষে 

নিরাসক্ত সন্ধে নেমে আসে। আর,

এই নিস্পৃহ অন্ধকার, শৈত্য

জড়িয়ে হেঁটে যেতে যেতে

শুধু একটি কাঠকুটো-জীবনের সাধ হয়।

   মাত্র একটিবার।

একটিমাত্র জীবন, কাঠকুটোর।

    বড় সাধ হয়…

 

এই অস্থায়ী কাঠামো,

একটি ক্ষণস্থায়ী দহন 

কিম্বা, একটি স্থায়ী দাহচিহ্ন থেকে

                      ঠিক কতদূর…

 

 

অর্ঘ্য দে

উন্মাদ কিশোর

মাদলের মাতাল ছন্দে 
চাঁদ থেকে লাফিয়ে পড়া 
শান্ত আলোয় পথ হারিয়েছিল 
কোনও এক উন্মাদ কিশোর। 

যাবতীয় কান্না হা-হুতাশের বিপরীতে 
সুর ছড়িয়ে পেরিয়ে যাচ্ছে মধ্যযামিনী
কাঁপছে ঘাসবন, দিগন্তের পর্দা…
                            সম্মোহিত আলপথ 
প্রতিপদের চাঁদের মতো মানসীর 
থাকা না-থাকা তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল তাকে 
আমার ভিতর চড়ে বেড়ায় আজও  
উন্মাদ সেই কিশোর – নির্মোহ বিচরণ। 

 

 

PAINTINGS: S H RAJA

বুদ্ধদেবচরিত

ফাল্গুনী ভট্টাচার্য

কাল হঠাৎ স্বপ্ন দেখলাম বুদ্ধদেবকে। আমাদের স্কুলবেলার বন্ধু। আমাদের ছাত্রজীবনে ক্লাস নাইনের বুদ্ধদেব মাল বেশ ক’বছর নাইনেই বসত। তাঁকে নাকি টেন-এ টেনেটুনেও ওঠানো যায় নি। আমার ছোটকাকা পাশ করল। আর তার পরের বছর দাদা স্কুল ফাইন্যাল দিল। তার পরের বছর দিদি উঠে গেল টেন-এ। বুদ্ধদেব এবারও পারল না এবং শেষ কালে আমার সঙ্গ নিল। আমার তখনও গোঁফের রেখা ভালো করে ওঠেনি কিন্তু আমাদের বুদ্ধদেব চড়চড় করে দাড়ি কামায়, সকাল বেলায় চার কাঠা জমি চাষ দেয়। একটোকা মুড়ি আর আধসের গুড় মেরে এই চোত বোশেখ মাসে স্কুলে আসত। শুনতাম তার নাকি বিয়েরও কথাবার্তা চলছে। হা ডু ডু খেলায় শখ তার বেশী আর খেলতও ভালো। একবার কাকে নাকি মাথার উপর তুলে আছড়ে ফেলেছিল। আমি ওকে খুব ভয় আর সমীহ করতাম। এই যে বছরের পর বছর লেগে থাকাটাকে আমি সম্মান করতাম। যতই হোক বয়সে অনেকটা বড়। বুদ্ধদেব কোনোদিনই ক্লাসের পড়াটা করত না। আশির দশক। তখনও বিদ্যুৎ আসেনি। আমাদের এলাকায় ১৯৮৪ সালে বিদ্যুৎ আসে। শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর বছর। হ্যারিকেনের আলোর চারদিকে আমরা ভাইবোন গোল হয়ে বসে সন্ধেবেলা পড়তাম। সেবার ইতিহাসের ভজহরিবাবু একধার থেকে সবাইকে পড়া ধরতে লাগলেন। মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ। স্যার বুদ্ধদেবের দিকেই ট্রিগার টিপলেন- “অ্যাই মিস্টার মাল, তুই বল। বুদ্ধদেব আগের দিন কোন গাঁয়ে যেন হাডুডু খেলতে গিয়েছিল। পড়া তার হয়নি, বাঁচার জন্য সে বলল,- ‘হয় নাই স্যার।’ স্যার জিজ্ঞাসা করেন-“কেন? হয় নি কেন?” সে বলে- “স্যার বইটা একটু ছিঁড়ে গেইছিল। তা রবিবারে মা বললে- একটু ময়দার আঁটা লাগিং দে। আঁটাট লাগিং যেই না রোদে দিয়েচি একট কোয়ো (কাক) এসে ছোঁ মেরে ওই পাতাট লিয়ে চলে গেল। তাই স্যার পড়া হয় নাই।” ভজহরিবাবু বললেন- বটে, তা বেশ ইতিহাস

ভালই লিখতে পারবি। গোটা ক্লাস এবার হেসে উঠল। ভূগোল পরীক্ষার পর হল থেকে বেরিয়ে এসে বুদ্ধদেব বলল,- ‘হা রে ভটচায, কেমন দিলি?’ আমি বললাম, ‘ওই হল একরকম। তোমার?’ বুদ্ধদেব বলল-‘ফাটিন দিয়েচি’। মানে দারুণ লিখেছে আর কি! টেস্ট পরীক্ষার রেজাল্টে দেখা গেল বুদ্ধদেব সব কটা বিষয়েই সাড়ে নয় দশ পেয়েছে। তার মানে এবারও ? সোমবার ফার্স্ট পিরিয়ড ভূগোল স্যারের। সবাইকে খাতা দেখানো হবে। এক এক করে বুদ্ধদেবের পালা এলো। স্যার খাতাটা দিয়ে বললেন ‘তিনের দাগের ঙ টা লিখেছিস। হুম পড় কী লিখেছিলি?’ ছোটনাগপুরের মালভূমিকে খনিজ-ভাণ্ডার কেন বলা হয়? বিশদ আলোচনা করো। বুদ্ধদেব রিডিং পড়ে-‘এখানে অ্যাঁম এখানে অ্যাঁম লোহা ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি খনিজ পদার্থ পাওয়া যায়, তাই ছোটনাগপুরের মালভূমিকে খনিজ-ভাণ্ডার বলে।’ স্যার বললেন, “তুই যেমন লোহা ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি লিখেছিস আমিও তোকে বারোর মধ্যে এক ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি মার্কস দিলাম বুঝলি?” বুদ্ধদেব চীৎকার করে বলল-“স্যার বিশ্বাস করুন আমার পেটে আসছিল কিন্তু মনে পড়ছিল না আর কী কী পাওয়া যায়!” স্যার ততোধিক চিৎকার করে বললেন “আমারো মনে পড়ছিল না তোকে আর কত কত নম্বর দেওয়া যায়। হতচ্ছাড়া।” ইংরেজির বিবেকসুন্দরবাবু এসে খাতা দেখালেন সবাইকে। বুদ্ধদেব একশোয় সাড়ে নয় পেয়েছে। বিবেকসুন্দরবাবু বললেন মিস্টার মাল তোমার ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ সব কটাই দেখবার মতো। It was raining cats and dogs- আহা কী লিখেছ! ‘বৃষ্টির মধ্যিখানে বেড়াল কুকুরেরা দৌড়াদৌড়ি করিতেছে? In 1941 he breathed his last -১৯৪১ সাল থেকে তিনি একটানা নিঃশ্বাস নিচ্ছিলেন শেষে। বাহ! কী বুদ্ধি!! বুদ্ধদেব মুখ কাঁচুমাচু করে বলল-“স্যার স্যার সব কিছুরই কি ইংরেজী হয়? না, বাংলা করা যায়? আমি স্যার চেষ্টা করেছি। আপনি বলুন তো স্যার “ওই পাড়াতে কলা ফলেছে আর ফেটেছে তুলো, এই পাড়াতে খাচ্ছি বসে কটাম করে মুলো”- এরট্রানশেলেশন কী হবে? এরপর বিবেকসুন্দরবাবু বিবেকহীন হয়ে ছড়ি দিয়ে মারতে শুরু করলেন আর বলে চললেন,- “তুই তুই ফাজলামি করছিস আমার সঙ্গে? পিঠে তুই কুলো বাঁধ, কুলো বাঁধ। মেরে তোকে তক্তা করে দেব।” ফেরার সময় নুনলঙ্কাগুঁড়ো দিয়ে মেখে মিঠে আম খাচ্চি দু’জনে। বুদ্ধদেব বলল-“ বুইলি ভটচায, এক্সাম তো ফাটিন দিই কিন্তু রেজাল্ট টো খারাপ হং যায়। বুঁইলি!!”

কাল হঠাৎ স্বপ্ন দেখলাম- বুদ্ধদেব চাষবাসে মন দিয়েছে। ছেলেপুলে নাতি নাতনি নিয়ে বেশ সুখী মানুষ। আমাকে হাত নেড়ে বলছে- ভটচায এখানে তু যদি একট ইস্কুল করিস আমি জায়গা দোবো। চার বিঘে। করবি? আমি বলি রিটায়ার করার পর ভাবব। বুদ্ধদেব উদাসীনভাবে বলে- “কিন্তু সেই ইস্কুলে কুনো এক্সাম থাকবে না।” আমি ওকে সান্ত্বনা দিয়ে যেন অস্ফুটে বলে উঠি- “বেশ থাকবে না।”

PAINTINGS: S H RAJA

কবিতা আশ্রম মুদ্রিত সংখ্যা থেকে

গত নভেম্বর থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত সন্মাত্রানন্দের অসামান্য উপন্যাস 'মেঘবতী'-র বারোটি অধ্যায় পড়ুন

পূর্ববর্তী সংখ্যা

এখন বাড়িতে বসেই সংগ্রহ করতে পারবেন আমাদের প্রকাশিত বইগুলি। ভিজিট করুন আমাদের অনলাইন সপ, আর কিনুন আমাদের বই। নিচের BUY NOW বোতামে ক্লিক/ট্যাপ করলে পৌঁছে যাবেন আমাদের সপ পেজে।