সাপ্তাহিক কবিতা আশ্রম, ২৪ আশ্বিন ১৪২৭
সাপ্তাহিক
২৪ আশ্বিন ১৪২৭
PAINTINGS: WILLEM DE KOONING
দুর্গা দত্ত
উড়ো খৈ
আমাদের কথা সব শেষ হয়ে গেছে!
সবকথা আমাদের যা যা ছিল
ঘাসপাতাধুলোয় ছড়ানো
সবই কি শেষ হয়ে গেছে ভ্রান্ত রোদে?
তাই কি কখনও হয়?
কথাদেরও জন্মান্তর থাকে।
তোমার আমার তার সন্ততির মুখ থেকে
ঝরে পড়ছে আশ্বিনের রোদ,
দুলে উঠছে ধানশিষ কাশঝোপ আদিগন্ত হাওয়া
তুমি আমি ফিরে আসছি কথা হয়ে
শারদ আকাশে
সন্ততির ঠোঁটে জিভে স্বরে ও ব্যঞ্জনে
কথাজাতকের নানা পল্লবের ঢেউয়ে—
শোনো বা না-ই শোনো,
সেও তো একরকম ন হন্যতে
আমাদেরই ঘাসপাতাধূলাময় দিন…
মঞ্জরী গোস্বামী
বাসাবদল
এবার নির্বাসন
কাঁটাতার ঘেরা কোনও আগাছার ঝোপে
আমার আকাশ নেই
পায়ে পায়ে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে
চলে যাব দ্বিধাহীন জাহান্নমে
হাত পা মাথা ছেঁটে এককোষী আমি
আকাশ বাতাস জল মাটি ছেড়ে মৌনতা খাব
রক্তবীজের মতো বিন্দুতে তবু
মিছিলের অগণিত তেজিয়াল হাত
এবার নতুন দাবি ঘুরপথ ছেড়ে
বিষুবরেখার মতো জেদী হোক শব্দের চোখ
শেখা হোক লেখা হোক শানিত ছুরিতে
ঘৃণার ছদ্মনামে প্রেমের দুরূহতম শ্লোক
পৌষালী চক্রবর্তী
এপিটাফ
আমরা দুজনে বহুকাল পাশপাশি হাঁটছি।
আমার চোখে চোখ রেখেছেন
নাতিদীর্ঘ নিজস্ব ঈশ্বর।
আমার কর্ণমূলে তাঁর মন্ত্রোচ্চারণ
তাঁর অভয়মুদ্রায় আমার অতলান্ত ঝাঁপ।
আমি বহুকাল মুখ ফিরিয়ে রেখেছি
সমস্ত সজীবের থেকে
আমার দৃষ্টি নেই কোন আলোকসম্পাতে
চন্দ্রোদয়ে আমাদের গভীর অসুখ
সূর্যাস্ত পথে আমাদের নিষিদ্ধ আনাগোনা।
প্রেমের কবিতাকে তাচ্ছিল্য করতে
আমি ফিরিয়ে দিয়েছি যে মেঘলা কিশোরকে
তার ফেলে যাওয়া শুকনো নাগচম্পায়
বহুকাল বিঁধে আছে আমার কলম।
PAINTINGS: WILLEM DE KOONING
রবীন বসু
চিরহরিৎ চন্দনভূমি
আজকাল প্রায়ই
আমি একটা চন্দনবৃক্ষের কাছে যাই।
সরু ছোট সবুজ পাতায় ঘেরা বাদামি সোজা গাছ
বাকলে লেখা আছে হয়তো বীরাপ্পান-ইতিহাস
সুবাস যা-কিছু সব কাণ্ডের গভীরে নিহিত
ব্যাকুল-আগ্রহ নিয়ে আমি উৎসের অভিমুখে হাঁটি।
একদিন হঠাৎ, বোধহয় দুপুর, রোদ কম,
মেঘলা ছিল
হয়তো বৃষ্টিও হচ্ছিল; দেখি, চন্দনবৃক্ষের সবুজ
আর বৃষ্টি-ধূসরতার মাঝে দাঁড়িয়ে তিনি ভিজছেন,
আমাদের পাঁজরভাঙা আহত কবি জীবনানন্দ।
তুমুল ভিজছে তাঁর প্রিয় নারীরা…
আকাশলীনা, বনলতা, সুরঞ্জনা, সুচেতনা!
কিছুক্ষণ পর দেখি বৃষ্টি নেই, কবি নেই, প্রিয়
নারীরাও নেই… শুধু তাদের সিক্ত বসনগুলো
পরম যত্নে ঢেকে নিল কবির সব কবিতাকে।
দূরে, কবি তখন নতমুখে হেঁটে গেলেন
চিরহরিৎ চন্দনভূমির দিকে…
বৈকালিক কফিশপ
আশ্চর্য চিৎকার দিয়ে রৌদ্র সরে গেল;
সব ক্রোধ জড়ো হয় মধ্যাহ্ন দুপুরে
উত্তাপ-চিহ্নিত এই দহনবেলা
খাঁ-খাঁ শূন্যতা নিয়ে দূরবর্তী মাইলফলক।
অবরুদ্ধ দিন গতির স্পিডোমিটার দ্যাখে
আর ভাঙাসময় কারুকার্যময় বিলাসিতার
মখমলি গালিচায় পা রাখে; সুমসৃণ
এই আত্মসমীক্ষার দিনলিপি লেখা হাত
আশ্রয়হীন আবর্তে ঘোরে প্রাচীন গুহায়।
মধ্যযুগীয় ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে আসা
না-পড়া ইতিহাসলিপি আর ওই
সরে যাওয়া রৌদ্র তখন মুখোমুখি বসবে
কোনও নির্জন বৈকালিক কফিশপে!
আর একটা গান বেজে উঠবে, নির্লিপ্ত ব্যান্ডের
বহুভাষিক গান…
অনিকেশ দাশগুপ্ত
দুপুর
নিভৃতচারী দুপুরগুলোয় কয়লাঘরের বাতাস
ফুরিয়ে আসে
পান- চিবুনো- লাল ঠোঁটের পাখির বেশে
গাছের দুঃখ চিনতে চিনতে
হলুদ সূর্যের আভায় খোলা হয় একান্ত খেলাঘর
মেঝের ওপর কত মাপের ফাটল,কত
দেশের অবাক মানচিত্র
লাল পিঁপড়ের দল এঁকেবেঁকে জাহাজপথ
তৈরি করেছে সেখানে
বিকেল আলোয় বাগানের একপাশে
মলিন দেয়ালে
পাখির দিন হারানোর গল্প কখনও-বা
জেগে ওঠে ঘরের মায়ায়।
সুরক্ষা
কাগজের বিমানগুলো জাদু প্রসবিত
বেড়ালটির কাছে দুলতে দুলতে নামে
তার অন্তিম টুকরো
ছোট ছোট অনেক থাবার অনুভূতি
এই বিমানের বৃদ্ধ পাইলটের কাছে
বীজাণুশূন্য একটা অবতরণ চায়
রৌদ্রের চারকোনা আলোয়
কোঁকড়ানো পিঠ
দরজার ওপার থেকে
একটা বন্দুক তাক করা
হাতের পেছন পেছন বেরিয়ে আসে
সুজিত রেজ
চিঠি
তুমি কেন চিঠি লেখো না অচিরা , অকাতরে
রিলকে পড়ে ভাল লাগার কী কী কারণ—
র্যাঁবো কেন রাত্রি লেখে নীল চাদরে ?
তিমির তারার আলোকমালায় শুদ্ধিকরণ।
তুমি কেন চিঠি লেখো না সোহিনী, পোস্টকার্ড
গানের সুরে ফোসকা জ্বলন গণিতশলায় ;
নীরব ছুটির তিরে সন্তপ্ত কিয়ের্কেগার্ড
নির্বাসনে যাবে, দেখো, ঠিক জৈন গুহায়।
তুমি কেন চিঠি লেখো না দুর্গা , কে জানে
হলুদ রঙের পরুল ফুলের গল্পকথন ;
বাবলা গাছের কাঁটা জড়িয়ে সংসার-টানে
সর্বজয়ার চোখের জলে গঙ্গাদূষণ।
PAINTINGS: WILLEM DE KOONING
পূর্ববর্তী সংখ্যা
এখন বাড়িতে বসেই সংগ্রহ করতে পারবেন আমাদের প্রকাশিত বইগুলি। ভিজিট করুন আমাদের অনলাইন সপ, আর কিনুন আমাদের বই। নিচের BUY NOW বোতামে ক্লিক/ট্যাপ করলে পৌঁছে যাবেন আমাদের সপ পেজে।