সাপ্তাহিক কবিতা আশ্রম, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৭
সাপ্তাহিক
২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৭
Painting: Marc Chagall
নির্মল হালদার
কবিতা
মাথায় কাঠের বোঝা দুহাতে নামাও।
দু’হাতে দশটা আঙ্গুল দশ মহাশক্তি।
আমাকে না দেখালে, কী করে জানব,
ভালোবাসা যে কোমলে কঠিনে গড়া
পাহাড়ের পথ।
২
ফল ফেটে পড়তেই
ফলের বীজ ঘুঙুরে ঘুঙুরে।
ঘুঙুর বাজে।
কার পায়ে বাজে?
পা দেখাও গো, পা দেখাও
শ্রীরাধার চরণ হলে
পায়ের পাতায় আঁকব
পাহাড়ি লতা পাতা।
পাহাড়ের গর্ভগৃহে জ্বলে একটি পিদিম।
তপন পাত্র
জাগো জনতা
ওই সোনা
আমি চিবোব না ।
ওই অস্ত্র আমার লাজ ঢাকার বস্ত্র হবে না কোনওদিন ।
আমি বাদ-বহাল-কানালী ঘুরে ফিরে
আবাল্য দেখে আসছি — কাচথোড় ধান
আমার আট বছরের মেয়েটির মতো ।
মায়ের মেদুর স্তনে যে দুধ জমে
সেই দুধ দেখে আসছি ধান ফুলের ভিতরে ভিতরে,
গম গাছের শিষে ।
ধান আমার মা,
গম আমার মা,
আমার মতো কোটি কোটি সন্তানের
মুখে মাই গুঁজে দিয়ে এরাই তো বাঁচিয়ে রাখে
অন্নপ্রাশন থেকে শেষ নিঃশ্বাস …
হলুদ গুঁজার ফুল, সরিষার ডাল,
নীলচে তিসির বন,
লাহেড়ের ঝোপ,
নোনচে ছোলা বাড়ি
আমাকে লালন করে।
আমাকে লালন করে
“চাষিভাই” নয়
কৃষক পিতা, কৃষাণী জননী ,
এদের মাথার ঘাম পায়ে পড়েই
ফুটে ওঠে ধানফুল,
ডালফুল আমাদের ভাত ফুল সব।
এসো
আজ আমরাও দু’টি গরুর মাঝে মাঝে ঘুরি ,
লাঙ্গলের পাশে প্রশিক্ষিত কলমটি নামাই ।
কাস্তে নিয়ে কামারশালায় যাই,
হাপরের ওঠা-নামা গুনি ।
আজ বড়ো দুর্দিন ।
সব ভুলে আজ ছুটে এসো
আমাদের পালক পিতা,
পালক মাতার পাশটিতে সগর্বে দাঁড়াই,
হাতে হাত রেখে হাঁটি।
এরাই তো হাতুড়ি, শাবল,
কোদাল, গাঁইতি, বাঁশের ঝুড়ি ;
সাড়ে তিন হাত মাটি ।
অর্পণ চক্রবর্তী
ফিঙেজন্ম
দূরে যাও, ঠিক ততটাই দূরে যাতে দেখতে পাই,
এনজেপি থেকে যেমন দেখা যায় কাঞ্চনজঙ্ঘা।
ইচ্ছে করলেই যেন ডাকতে পারি দূর থেকেও
টেলিগ্রাফের তার যেভাবে মনে রাখে ফিঙেজন্ম।
যাও! ততটাই দূরে, যেন ইচ্ছে হলেও
অন্ধেরা স্পর্শ করতে না পারে কখনও।
২ .
তোমার সঙ্গে আজ সারাদিন
জড়িয়ে আছি তুচ্ছে তুচ্ছে;
একটি ছোট একটি বৃহৎ,
তুচ্ছ মানে গাছের শিকড়
জল টেনে নেয় মাটির থেকে
মাটির থেকে তুচ্ছ কী আর!
ধুলো বালি, ঘাসের কুচি
খড়ের কুটোর মতই তোমার
চুলের গুচ্ছে জড়িয়ে গেছি
আজ সারাদিন।
আজ সারাদিন তোমার সঙ্গে
পথ হেঁটেছি…
রাস্তা যেমন
পাহাড়ি নদীর পাশে ভীষণ
তুচ্ছ দেখায়,
তেমনি তোমার সঙ্গে আমি;
ছায়ার মতো; দীনাতিদীন,
বিলম্বিত…।
প্রবল হাওয়ায় রোদ উড়ে যায়
তবুও তোমার রৌদ্রাহত
কপাল জুড়ে ঘামের ফোঁটা
কি সাংঘাতিক মূল্য পেল!
আমার আঙুল তুচ্ছ এত
ধরব যে, সে সাধ্য আছে?
আমি বাদাম-খোসার মতই
ঘরের কোণে উড়ছি সাথে
ছেঁড়া কাগজ, একটি পাপোশ
ছাইয়ের দানি।
আমি তো ছাই পদ্য লিখি
কি জঘন্য! তুমি কি আদৌ
আমায় চেনো!
তুমি তো আজ ব্যস্ততম
দিন কাটালে।
ধুলোবালির সঙ্গে যত
কীটপতঙ্গ
ঘরের থেকে বাইরে এনে
পথের উপর ছড়িয়ে দিলে…
সঙ্গে কিছু চাঁদের কণাও
লুক্কায়িত ; বোবায় ধরা,
শুকিয়ে যাওয়া ফুলের মতো
তুচ্ছ বলে;
তাদের থেকে মুখ ফেরালে।
এবং তারাও তোমার থেকে…
দিনের বেলায় ল্যাম্পোস্টের
আলোর মতো অনর্থকে
জড়িয়ে ছিলাম আজ সারাদিন
ফিঙেজন্ম চিনব বলে ।
অনঞ্জন
নিরাশ্রয়
আমি-তুমি তুমি-আমি করতে করতে একদিন
তুমি, তুমি হয়ে গেলে আর আমি, আমি;
আলোর ভাগ বুঝে নিতে নিতে ভুলে যাই-
সব শোক সব জীর্ণতার ভাগ হয় না,
তাই, এক পশলা সবুজ নদী কল্পনা করে
যখন একসঙ্গে ভাগস্নানে নেমেছিলাম,
খেয়াল করিনি কখন শেওলারা আষ্টেপৃষ্ঠে;
আজ হামাগুড়ি দিয়ে পাড়ে পৌঁছোনোর
ব্যর্থ চেষ্টা করতে করতে গভীর কান্না পায়,
রাত এখানে প্রবল, এখন নিশিযাপন,
দুর্দান্ত রোমশ এই রাত নিরাশ্রয় করে,
গর্ভপাতের মতো।
তুমি ঝুলে থাকো তোমার স্থানে, আমি আমার,
সবাই যে যার মতো, এই ঝুলন্ত স্বর্গে
কোনও মাটি নেই, যোগাযোগের এই বিপ্লবে
যোগাযোগহীন স্বর্গ।
Painting: Marc Chagall
মৌসুমী রায়
ব্রাত্য
তোমাদের শব্দের মিছিলে
আমি আর কেউ নই,
দূরাগত তারাদের আলো
নিভে গেছে বহুকাল আগে।
থেমেছে সময়ের কোচম্যান, অশ্বের খুড়
ধুলোপথে গুঁড়ো গুঁড়ো বিচ্ছিন্ন বর্ণমালা।
শীতের কুয়াশা শুধু ঝাপসা অবয়ব,
বিবর্ণ পথের বাঁকে জমে থাকা গল্পেরা
বরফিলা চিলমন জুড়ে পটচিত্র আঁকে।
উইন্ডচাইমে বাজে টুংটাং পাতাঝরা
গান বিষাদরাগিণী ঝরে তিলককামোদে।
মুছে যাওয়া শব্দেরা, দুর্বোধ্য ছলছাপ ।
পিছিয়ে পড়ে অর্থহীন প্রলাপ জীবন,
উল্টোরথের রশি ধরে, মহাপ্রস্হান পথে।
Painting: Marc Chagall
“হৃদয়ের গান শিখে তো...”
পর্ব-২
ফাল্গুনী ভট্টাচার্য
পুবে পথ পশ্চিমে পথ পাশে গাছের ছায়া গো
বট পাকুরের ছায়া
কালিসায়ের বাড়িপুকুর পদ্মফোটা বিশের পুকুর
(আহা) বুকজুড়ানো মায়া গো
বুকজুড়ানো মায়া।
বোসো একটুক্ষণ
ঘোমটা ঢাকা এই গাঁ ডাকে তোমার পথের বাঁকে বাঁকে
তবুও উদাস মন?
আরে আরে কোথা যাও? শোনোই না হে, শুনে যাও?
কি শুনব কি শুনব!
যা শুনাবো তাই শুনবে।
কি শুনব ব্যাঙের মাথা!
ঘোমটা ঢাকা লজ্জাবতী মায়ের মতন যত্নবতী
এই গাঁ-টির কথা।
কিছু কথা বুকের মাঝে জলেস্থলে কথা
কিছু কথা ধরে আছে ‘বঙ্গলিপি’ খাতা।
“আলবাঁধা দমদমা দেবানন্দপুর
নিকটে কলহপুর ও শ্রীনিধিপুর
শ্রীনিধিপুরের দেবী পশ্চিমবাহিনী
বিজয়া দশমী রাতে তাঁর আগমনী।
কঙ্কালী-মন্দির কাছে, মাত্র চারি ক্রোশ
রাঢ়-কাঞ্চিদেশে তাঁর মহিমা-নির্ঘোষ
নিরালা শ্যামল-শান্ত গাঁ রতনপুর
পুজোয় পাব্বনে ওঠে নানা বাদ্য সুর।
উত্তরে কালীর থান রাজরাজেশ্বরী নাম
কার্তিকের অমারাতে আরাধনা তাঁর।
চতুর্শিবলিঙ্গ হেথা পুরে সর্ব মনস্কাম।
বিল্ব আম্র নানা বৃক্ষ আশ্রয় ছায়ার।
জনশ্রুতি আছে বটে নানা কিংবদন্তী রটে
পঞ্চ মুণ্ড বেদীমধ্যে আছে।
জাগ্রত মনসা জাগে গ্রামে ঢাক ঢোল বাজে
পুকুর সমান জলে-মাছে।
বারোশ তিরিশ সনে এই আম্র-উপবনে
গোপনে হইত ছিন্নমস্তা উপাসনা।
সেবক কেদারনাথ গৃহ-শান্তি কামনায়
ভীষণা দেবীর কাছে রাখেন বাসনা-
‘মাগো তুমি দয়া করো এই রূপ সংহর
সদা থেকো শান্তিময়ী হ’য়ে।
যথবিধি পুজা হবে যাগ যজ্ঞ বলি লবে
শ্যামা থেকো ভক্তের নিলয়ে’।
প্রসন্না দক্ষিণাকালী দীর্ঘকচা মুণ্ডমালী
ভক্তের যতেক ভয় নাশে।
বৃহৎ নাকুড় গাছে নানবিধ পক্ষী নাচে
তার তলে মাতা ষষ্ঠী হাসে।
আর কয়েক পা ছাড়ি পূর্বমুখে দুর্গাবাড়ি।
আদিকাল হতে সিংহবাহিনী বালিকা
গ্রামের দক্ষিণে যাও খুশিলে-পুকুর পাও
গ্রামের ঈশানকোণে পাষাণকালিকা।
লোক কম গাছ বেশি, গাছে গাছে ঠেসাঠেসি
বামুন বায়েন দুই জাতির নিবাস
জীবপত্রী হরিতকি বিভীতক আমলকী
শতবর্ষ পুরাতনী অশোক -বিলাস।”
ওঠো রে ফাল্গুনী। ভোর হচ্ছে। পাখিরা ডাকছে, কলবল করে উঠছে হাঁসমুরগির ছানা। গোয়ালে ওয়াম্বা ওয়াম্মা শব্দ। কে ডাকে! বলদ দু’টো না বকনাটা? তোমার কত কাজ। বালতিতে গোবর জল আর নতা নিয়ে কালী-শিব-দুর্গাতলায় মারুলি দিতে হবে, ওর ফাঁকে দেখে আসতে হবে খড়ের পালুইয়ে যে সবেদাগুলো গুঁজে রেখেছিলে তা পেকে উঠছে কি না। একটু পরে আর পাক দিয়ে দেখে আসতে হবে কোনো খড়ের গাদায় পলছাতু ফুটেছে কি না। এগুলো তোমাকে দম লাগানো চড়কির মতো করে ফেলতে হবে। মা উঠেছে উনুনে চা হচ্ছে। বাবা গরু ছাগল বার করেছে গোয়াল থেকে। রেডিও এখনো টূঁউউউউউউউউঁঊঁ করছে। খানিক পরেই ‘বন্দেমাতরম’ হবে। নিমগাছে আর কুমড়ো মাচায় ছাতার শালিক পায়রা ঘুঘুগুলো জড়ো হয়েছে। মা ভাঙা চাল ছড়াবে আর উড়ে এসে উঠোনে কিচমিচ ঘুউঘুউ কট্টররর করে ডাকবে। বাসি গোবর মেখে মা গোয়ালের দেয়ালে আর বাগানের ঘাসে গুনে গুনে তিরিশটা ঘুঁটে দেবে। তোমরা ভাইবোন মিলে তারপর চা মুড়ি খাবে। তোমার দাদু বলতেন- ‘নিত্যসেবায় দোষ নেই, চা মুড়ি খেয়েই পুজো করবে হে’।
ক্লাস এইটের পড়া। আজ লালমোহনবাবু ইংরেজি ট্রানশলেশন ধরবেন না? সুদ কষার অংক না পারলে মুকুল স্যার তো নিলডাউন করিয়ে রাখবেন। আজ টিফিনের পর ইন্টার-ক্লাশ ফুটবল আছে। নাইন বনাম টেন। দেখতেই হবে। বাবুলাল হাঁসদা, কলম মারডি, শিবলাল টুডু রবিন রায় নীলকণ্ঠ সাহা দাদারা যা খেলবে না! ইস্কুলে যাবার আগে তোমাকে পিতলের নকশা-কাঁটা সাঁজি নিয়ে সারা গাঁ ঘুরে ফুল তুলতে হবে। বেলপাতা তুলসী দুব্বো, সাদা টগর, মল্লিকা, গন্ধরাজ, বেগুনী কাঞ্চন, সাদা কাঞ্চন, ঝুমকো জবা, পাতি লাল জবা, পঞ্চমুখী জবা। খামার বাড়ির পিছনে
তামা রঙের কলকে ফুটছে। হলুদ সাদা ও আছে। তুলতে হবে। কটা রেখে দিতে হবে ভাই বোন একটু পরে এসে ওই ফুলের বোঁটা খসিয়ে চুষে নেবে, পাত লা মধু আহা, সাবধানে খেতে হয় লাল পিপড়ে বা কালো ছোটো পোকা গলায় চলে যায় ঠোঁটে কামড়ে ধরে। ছোট্ট ভাইবোনদের শিখিয়ে দিতে হবেই। তুমি বড় না? তোমার কত দায়িত্ব। ধুতুরা নীলকণ্ঠ ফুল শিবের প্রিয় ফুল। আর বেলপাতায় চক্র বা কাঁটা ও ফুটো থাকলে হবে না। দাদু-ঠাকুমার ইচ্ছেতেই বাবা কাকারা ক্লাস সেভেনের শেষদিকে জ্যৈষ্ঠ মাসে তোমার ও তোমার ভাই কপিল বড়কাকার একমাত্র ছেলে বুড়োর একসঙ্গে পৈতে দিলেন। তারপর তোমাকে হাতে ধরে নিত্যসেবা শেখালেন। নিত্যকর্ম পদ্ধতি পড়ালেন। ‘পুরোহিত দর্পণ’ থেকে একে একে শেখালেন আচমন, ভূতশুদ্ধি, আসনশুদ্ধি, মুদ্রা অঙ্গন্যাস। আবাহনী মৎস্য নানা মুদ্রা। দেবদেবীদের ধ্যান, প্রণাম মন্ত্র। প্রতিদিন বলতে বলতে মুখস্থ হল। তার অনেকপর
মানেটা বুঝতে পারলে। বুঝতে পারলে ‘জবাকুসুমসঙ্কাশ’ মানে কি! অনুভব করতে পারলে ‘সুকেশী মুক্তকেশীচ দীর্ঘংকেশী মহাকচা’ মানে মা কালীর চুল কেমন কালো কেমন লম্বা। প্র্রথম প্রথম তোমার ভয় করতো। কালীর থানে ছাউনি নেই। কার্ত্তিক মাসে পুজোর সময় দিন তিনেকের জন্য টিন ত্রিপল চাপিয়ে গাছের ডালপালা দিয়ে সাজানো হয়। তারপর আবার খুলে নেওয়া হয়। স্নান করে পাটের কাপড় প’রে পুজোর আসনে বসে তোমার গা ছমছম করতো। গলাটা শুকিয়ে আসতো। চারদিকে গাছপালা পিছনেও ঝোপঝাড়। দিনের বেলাতেও আলোছায়ার
লুকোচুরি। শ্যাওড়া নীলকণ্ঠ লতার ঝোপ। হুঁ হুঁ তুমি তো দেখেছো কালীপুজোর বলিদানের পর খর্পরে রক্ত আর কাঁচা মাংস নিয়ে ওই ঝোপের দিকে ফেলা হয়, ওইখানেই থাকে মহাকালিকার সঙ্গিনী ডাকিনী-যোগিনী হাকিনী-শাকিনীরা। বুকের কাছে ছ্যাঁৎ করল তো? ঘেমে উঠলে? না না, এখন তুমি মায়ের আশ্রয়ে আছো। ডানদিকে বিরাজ করছে চারটি শিব লিঙ্গ। মহাকাল ভৈরব তিনি।তিনি আশুতোষ। প্রাণ ভরে ডেকে নাও। উত্তরে হাঁ হাঁ খাঁ খাঁ বিশাল মাঠ। যতদূর চোখ যায় মাঠ মাঠ আর মাঠ। ওই দু’মাইল দূরে কদম গড়ের সাঁকো, তারপরে আবার জঙ্গল। মাঝে মাঝে শেয়াল ডাকে। ওই জঙ্গলে নাকি চোর ডাকাতের আস্তানা। মা কতদিন না বলেছে তোমাকে, ওখানে নাকি অনেক আগে কার গলাকাটা দেহ পাওয়া গেছিল। বাঁদিকেও দূরে একটা ফণিমনসার বনজঙ্গল। দিনের বেলায় শোনা যায় কচি ছেলের কান্নার শব্দ। পরে শুনেছ তো রাঙাপিসির কাছে, আঁতুরে-মরা ছেলেমেয়েকে দাহ না করে ওই ফণিমনসা বাবলাগাছের ঝোপঝাড়ে ঘেরা পরিত্যক্ত জায়গায় গর্ত করে পুঁতে দেওয়া হয়। তার সঙ্গে আঁতুরের বর্জ্য কাঁথাকানিও। সেখানে মাটির উঁচু ঢিবি ক’রে তার ওপরে ‘ঠেকন’ হিসেবে পুঁতে দেওয়া হয় কোদাল থেকে খুলে নেওয়া বাঁটটি। এও এই মহাজীবনের এক অঙ্গ। বড় হলে সব বুঝতে পারবে। কাঁপছ কেন? ভয় লাগে তোমার? আর ঠিক তক্ষুনি কে যেন পাশের রাস্তা থেকে চেঁচিয়ে উঠল-
ডর কাঁহা কা ডর ? ডর কো কর না পর।
যঁহা হ্যায় বোঁহা ঠেহর
তাকত লাগাকে ধর বেটা প্রেম ভাব সে ধর।
ভক্তি ভাওসে ধর।
দম লাগাকে দম
বোলো বোম ভোলে বোম।।
চিমটা বাবা না? হ্যাঁ ঠিক চিমটা বাবা। কাছে এসে একটা ছেঁড়া লাল কাপড়ের টুকরো দিয়ে বলল- ‘ কষকে বাঁধ লে বেটা পৈতেকা সঙ্গ। ডরতা কাঁহে রে? কালী কো পুকার, শিবজী কো পুকার।’ তারপর তুমি গোগ্রাসে ভাত আলুসানা, বেসনের বড়ার ঝোল খেয়ে স্কুলের পথ ধরলে। সেই বড়ো মায়াময় লালধুলোর পথ দিয়ে- ক্যানেলের জলে পা ধুয়ে, ব্রহ্মদত্যিতলা পেরিয়ে – আলবাঁধার ঘোষপাড়া, বাণীদিদিমণিদের পাঁচিলের গায়ে বড় কামরাঙা গাছটির ছায়া গায়ে একটু মেখে, বাবাজীর আখড়ার ধার দিয়ে বেসিক স্কুল-মোড়লদের দুর্গাবাড়ি ছুঁয়ে, রাখহরি মাষ্টারের বাড়িটিকে বাঁদিকে
রেখে, পুকুরের ঢালু পাড় দিয়ে হুস করে নেমেই এসে গেলে বড় স্কুলে। মানে হাইস্কুলে। প্রেয়ার লাইন হচ্ছে। সার দিয়ে ছেলেমেয়েরা দাঁড়িয়েছে। সংস্কৃতের পণ্ডিত আনন্দগোপাল আচার্য শেখাচ্ছেন-‘প্রণমামিশিবমশিবকল্পতরুম’। ফাল্গুনী, তোমার তো এই স্তোত্র ঠোঁটস্থ, কিছুক্ষণ আগেই তুমি আটটি শ্লোক উচ্চারণ করে এলে শিবঘরে।
Painting: Marc Chagall
গত নভেম্বর থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত সন্মাত্রানন্দের অসামান্য উপন্যাস 'মেঘবতী'-র বারোটি অধ্যায় পড়ুন
পূর্ববর্তী সংখ্যা
পড়তে পারেন:
এখন বাড়িতে বসেই সংগ্রহ করতে পারবেন আমাদের প্রকাশিত বইগুলি। ভিজিট করুন আমাদের অনলাইন সপ, আর কিনুন আমাদের বই। নিচের BUY NOW বোতামে ক্লিক/ট্যাপ করলে পৌঁছে যাবেন আমাদের সপ পেজে।