সাপ্তাহিক কবিতা আশ্রম, ২৭ ভাদ্র ১৪২৭
সাপ্তাহিক
২৭ ভাদ্র ১৪২৭
Paintings: Francis Newton Souza
শ্যাম রায়
অনুভব
সবার কাছেই মৃত্যুদিন আছে
শ্মশানে কেবল সংখ্যা!
অনাদরের বাড়ি
সমগ্র জীবনের বদলে খণ্ডজীবনে চলতে চলতে
বাড়ির পিছনের ডোবাও বুজে যায়
অনঞ্জন চট্টোপাধ্যায়
প্রথম স্পর্শ
মনে আছে, শেষবিকেলে হয়েছিল প্রয়োজন অচেনা স্পর্শের,
স্পর্শ-শেষে খুলে গেল অনাঘ্রাত অনুভূতি বিরহী শঙ্খের
ভেজা ওষ্ঠে চুম্বনকালে; গাঢ়নীল গোলকধাঁধা, আলোর প্রাচীর-
একে একে চূর্ণ হল, সমর্পণে সাঙ্গ হল মগ্নতা নদীর;
অসীমের ফুৎকারধ্বনি সমস্ত মিথ্যেগুলোকে মুহূর্তে ছারখার
করে কোল পেতে দিল, আদি-পুলকে শ্রাবণঘন শ্রাবণ-বিস্তার;
বিন্দু বিন্দু বৃষ্টি লেগে আকাশময় লজ্জা ঘিরে কত না আকুল,
কত না কোজাগরী, চিরঞ্জীবী বক্ষ মাঝে একুল-ওকুল;
চেতনার পরিধিকে বিপন্ন করে খুলে দিল সেই প্রথমতমা
সমস্ত গুল্মলতার হুলুধ্বনিতে প্রজাপতির জন্ম দেখে চন্দ্রমা!
মহম্মদ সামিম
মুকুট
নুনভাতে টিকে আছি আজও
পায়ের নীচে হাজার বছরের ভ্রমণ
অভ্যাসবশে, জ্বরতপ্ত শরীরের কাছে
আত্মনিবেদন রাখি, চির বিচ্ছেদের পর।
ঠিক তখন বিষণ্ণ হাতের শিরা কেটে
ব্যর্থ কবি, রাঙিয়ে তোলে কবিতা-খাতা,
পৃথিবী তখন আমার গ্রাম, আমার পাণ্ডুলিপি
এই সবকিছু নিয়ে ভেসে যায় অচেনা সুদূর
মাথা থেকে নামিয়ে রাখি কাঁটাতারের মুকুট।
Paintings: Francis Newton Souza
মুস্তাক মুর্শেদ
আতাফল
অভিমান এক বহুমূল্য নীল পাথরের নাম
আমি জহুরী নই। রত্ন চিনি না।
অতঃপর সেই নারী দূরে সরে গেল
আমি তার আনাড়ি প্রেমিক,
তার পায়ে চলার পথে ফনিমনসার কাঁটার মতো
নিজেকে বিছিয়ে দিলাম
কবির কথায় বেদনা নাকি আতাফলের মতো
আগে কখনও চেখে দেখিনি সে স্বাদ
এখন সেই ফল আমি দু’বেলা তারিয়ে তারিয়ে খাই…
রাখী মাহাতো
রাতের আয়না
ন্যাড়া গাছের শুকনো ডালের ছায়া ধরে
দোল খায় রাত-রমণী;
কালনাগিনীর ফণায়
তাঁর অন্ধ রাত—
অপেক্ষার প্রহর গোনে
মণির খোঁজে।
মহাজাগতিক রশ্মি বিকারে
ভ্রূ-ভাঁজে নিয়তি আটকায়
তবু তার হঠাৎ উল্কাপতন—
শুকনো ডালের দাঁড়িপাল্লায়
চাঁদ-পাখির ওজন মাপে….
Paintings: Francis Newton Souza
আদরি
নির্মল হালদার
গাঁয়ের লোক স্কুল যেতে মানা করছে। তার দিদি জামাইদাও বলল, আদরি ইস্কুল আর না যাস—ক্যানে…
—ইস্কুল নাই যাব ক্যানে? ই বছরেইত হামার উচ্চমাধ্যমিক। আর মাত্র কটা মাস। দিদি, হামি নিস্তারিণী কলেজে ভর্তি হবোই।
—কলেজ কলেজ করিস না লো—আঘনেই তর বিয়া।
আদরি এবার কাঁদবে না কাঁদতে কাঁদতে দিদি জামাইদা কে গাল দেবে? সে জানে তার গার্জেন বলতে, দিদি জামাইদা। তারা না থাকলে অকূলে পড়তো আদরি ও আদরির বোন মনিকা। মা মারা গেল আগেই। তিন দিনের জ্বরে। তার ছয় মাসের মধ্যেই বাপ মারা গেল। একটা ভাই ছিল। জন্ম থেকেই কানে শুনতে পেত না। তাদের গ্রামের কাছেই রেললাইন। লাইন পার হচ্ছিল, মাল গাড়ির হর্নের আওয়াজ শুনতে পায়নি। কাটা পড়ল। আদরিদের তখন যা অবস্থা গাছের পাতাও কেঁদেছে। তবে দিদি জামাই দাদা ছিল বলে, দুটো বোন বেঁচে গেছে খুব। আদরির জামাই দা শুধু লেখাপড়া করতে বলেনি টিউশন মাস্টার করে দিয়েছে দু বোনের জন্য। যেন পড়াশোনা করতে পারে ঠিকঠাক। সেই জামাইদা হঠাৎ কেন যে এত জলদি বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে, আদরির মাথায় ঢুকছেনা।
—কিরে আদরি তর বিয়ার খবর পেলম যে। তুঁইত লুকায় বুলছিস। কাল বাঁধের ঘাটে দেখা হতেও বললি নাই। লে নাই যাব তর বিয়াতে।
—আগে হোক সভেই জানতে পারবি।
আদরি চলে যায় নুন-মসলার দোকান দিকে। দিদি বলল, লঙ্কা লিয়ে যাতে। তার ঝাল লাগছে এখনই। বিয়াতে তার মন নাই। তাকে পাশের গ্রামের কলেজে পড়া প্রভাস প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিল। সে অগ্রাহ্য করেছে। কারণ, তার লেখাপড়া শেষ হয়নি। দিদি জামাইদাই বা কি বলবে। তাদেরও মান সম্মান আছে বৈকি। আদরি শুনেওছে ছেলেটা পড়াশোনা করেছে এইট অব্দি। বয়সটাও নাকি ৩০ এর মতো। যে বন্ধু তাকে শুনিয়ে গেল বিয়ের কথা, সেও কী জানে ছেলের বয়স ছেলের লেখাপড়া? আদরি প্রায় মাথা নিচু করে অন্ধকারে হাঁটতে হাঁটতে ঘরের দিকে। সে কিছু না খেয়েই শুয়ে পড়ল। তার দিদি তার বোন বারবার জানতে চাইছিল, আদরির কী শরীর খারাপ?
আদরি তাদের ইস্কুলে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের কাছে বড় আদরের। সেই প্রথম স্কুলের মেয়েদের বুঝিয়েছিল, মেয়েদের প্যাড পরা কেন দরকার। গ্রামের মেয়েদের অশিক্ষার কথা আদরি জানে বলেই, জোর দিয়ে বলতে পেরেছিল। তার আগে তাকে শিখিয়ে পড়িয়ে নিয়েছিল ইতিহাসের দিদিমণি ইভাদি। ইভাদি আদরির বিয়ের কথা শুনলেই, রাগ করবেন নিশ্চয়ই। সে কি করবে বুঝে উঠতে পারে না।
সকালবেলায় সাইকেল নিয়ে আদরি চলে যায় ১০ কিলোমিটার দূরের শহরে। যেখানে ইভাদি থাকেন। আদরির মা-বাবা নেই বলে সে কী দিদি জামাইদার কাছে গলার কাঁটা? বিয়ে দিলেই, সে উদ্ধার পাবে? বিয়ে হলেই কী মেয়েরা উদ্ধার পায়? এখনো সন্ধের দিকে বাঁধ গেলে ছেলেদের কাছ থেকে কত রকমের ডাক। এবং কুডাক। স্কুলের এক বন্ধুও বলেছিল, তাকে মোবাইলে দেখাবে নগ্ন ছবি। আদরি সমস্তই উপেক্ষা করেছে। অগ্রাহ্য করেছে। শুধুমাত্র ইভাদির শিক্ষায়। পঠন-পাঠনের।
ইভাদি আদরির বিয়ের কথা শুনে প্রথমে হেসে নেন একচোট। তারপর তাকে চা-মুড়ি খাইয়ে বলে, অস্থির হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। মনের অশান্তি দূর করে দে…
পাকা কথা তো হয়ে গেছে। দিদি জামাইদা কি বলবে তাকে? তার বুক দুরু দুরু। ইভাদি বুঝতে পেরে বলেন, তোকে কিছুই ভাবতে হবে না। তোর জন্যে আমি আমাদের বহরমপুরের কাছে এক ইস্কুলে চলে যাব। সঙ্গে নিয়ে যাব তোকে। আমার কাছ থেকেই তুই লেখাপড়া শিখবি। ঠিক আছে?
আদরির মন মানেনা। দিদি জামাইদা কী তাকে ছাড়বে? সেও কি গ্রামের মাটি ছেড়েছুঁড়ে যেতে পারবে অন্য কোথাও? মনের টানাপোড়েন সাইকেলটাকেও টেনে নিয়ে যেতে পারছে না আদরির গাঁয়ের দিকে।
দু’চোখ ভিজে উঠছে তার।
Paintings: Francis Newton Souza
পূর্ববর্তী সংখ্যা
এখন বাড়িতে বসেই সংগ্রহ করতে পারবেন আমাদের প্রকাশিত বইগুলি। ভিজিট করুন আমাদের অনলাইন সপ, আর কিনুন আমাদের বই। নিচের BUY NOW বোতামে ক্লিক/ট্যাপ করলে পৌঁছে যাবেন আমাদের সপ পেজে।