সাপ্তাহিক

৪ পৌষ ১৪২৭

Painting: Adrian Ghenie

সুবীর সরকার

মায়া

অহংকারের উল্টোপিঠে পাঠ কিংবা পতনের 

মতো শুয়ে থাকে আমাদের সাদা পৃষ্ঠার দিনগুলি

তখন স্বপ্নে ভরা নদীর বাঁক চলে আসতেই পারে

না শোনা গানগুলি উৎসর্গ করি মরা ইঁদুরদের

সরষেখেতে রেডিও বাজলে আগলে রাখি পূর্ণ

                                          চাঁদের মায়া

 

রুমা তপাদার

জড়িয়ে চিত্রিত

প্রচ্ছদের অন্ধকারে চাপা পড়ে আছে সমস্ত লেখারা

লেখাই তো পৃথিবীর তিনভাগ 

যতখানি তাকে টেনে ধরা হয় শুধু হাত ভিজে যায়

সে-জল তখনও অশ্রু থাকে না 

বালির ভেতরে জল অশ্রু হয়ে ওঠে 

তাকে ভেঙে গড়ে বুকে শুঁকে নিয়ে

      রেখে দিতে হয় যত্নে

লোহিত কণিকা গন্ধ আসে চিরায়ত

সেভাবে চেনে না কেউ তার রং কতখানি গাঢ় 

না চিনুক, তবু লাল হয়ে 

চিত্রিত জড়িয়ে তুমি একবার বিশ্বাসে ফেরো…

মলয় বন্দ্যোপাধ্যায়

পরমহংস

বেশ উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছিলাম

কে যেন একটা দেখিয়ে দিলো আকাশ

যেদিকেই উড়ে যাই শুধু জল 

তারপর পঞ্চবটি জোছনায় একটা মাস্তুল,

ডানায় লিখে দিলো প্রেম  

 

 

আরশাদ সিদ্দিকী

লাসিকা

করাত কলে

কাঠ চেরাই হলে

তোমার চোখ ভিজে যায়

পাহাড় কাটা হলে

বুক ভেঙে যায় তোমার

চারপাশ বিরান লাগে

নদী পথ হারালে

তুমি উপোস দাও

নিয়ম করে দিনক্ষণ গুণে

পাখিরা রোজ

তোমার আঙিনায় আসে

বেপরোয়া ঝড়ের মতো!

কেবল আমার বেলায়

তুমি হয়ে ওঠো ক্রূর ডাকিনী

টুকরো করে কাটো হৃৎপিণ্ড

ভুলেই যাও তুমি

আমার ভেতরে একটা গাছ আছে

পাহাড়ের সন্তানেরা

নদী ও পাখি

পালা করে খেলা করতে আসে

সব ভুলে তুমি হিসেব কষে

আমার শেষ রক্তবিন্দু শুষে নাও

নীলাদ্রি দেব

জিহাদ

অপ্রতিরোধ্য অন্ধকার ঠেলে উঠে আসছে 

              অজস্র চিৎকার, মুঠো মুঠো হাত 

আলেয়ার পিছু পিছু শাসকের ছায়া 

তবু চেয়ারের নীচে বেড়াল লুকিয়ে থাকে 

ফ্রিজের শীতে আঁতকে ওঠে ইঁদুর 

আর শীতঘুমের শেষে তোষকের ভাঁজে 

               খোলস রেখে পালায় গৃহপ্রধান 

কৃষক, তুমি শস্যের বদলে ঘুম চাওনি বলেই

                            আবহাওয়া পরিবর্তন 

এখন সমস্ত জিহাদের আগে 

                      বরফ পড়বে চকে, চৌমাথায় 

                      বরফ কুড়িয়ে নেবে কৃষকের ছেলে

 

 

Painting: Adrian Ghenie

“হৃদয়ের গান শিখে তো...”

পর্ব-৩

ফাল্গুনী ভট্টাচার্য

চিমটা বাবা তার আসল নাম নয়। পরে দাদুর কাছে তুমি জেনেছ ওর নাম চন্দ্রভূষণ সিং। বিহারের দুমকার কাছে কোথাও ঘর ছিল। পরে শিবভক্ত হয়ে বেরিয়ে পড়ে পথে পথে। আধখানা লাল কাপড় হাঁটুর নিচ অব্দি। গায়ে আধখানা জড়ানো, কখনো সেটাই গলায় জড়িয়ে নেয়। বাঁদিকের কাঁধে একটা পেটমোটা পুঁটুলি, তাতে থাকে হরেকরকম জিনিস, কোটোবাটা। হাতে একটি মাঝারি মাপের চিমটা, পেছনে ঝোলে কয়েকটি লোহার বালা, মুখটি ছুঁচলো। একবার নাকি একটা ডাকাতের গলায় ওই চিমটা ঢুকিয়ে তার দফারফা করেছিল। কখনো দেওঘর, কখনো তারাপীঠ, কখনো কামাখ্যা থেকে ঘুরে এসে দাদুর কাছে আসে। মা ঠাকুমারা খুব ভক্তি করে। প্রথম প্রথম তুমি, তোমার ভাইবোনেরা খুব ভয় পেতে। ওই রকম বেশবাস, মুখে বড় কাঁচাপাকা দাড়ি, কপালে শৈব তিলক। বেলতলায়

আস্তানা গেড়ে দু’দিন থাকে। নিজেই চাল আলু বা পেঁপে সেদ্ধ ক’রে একবেলা খায়। রাতে মাত্র দু’টি বাতাসা আর জল। আর কিছু না। ওই বেলতলায় ব’সে ব’সে একবার তোমাকে চিমটা বাবা শুনিয়েছিল ‘বিশ্বনাথাষ্টকম’ একটু হিন্দিভাষার টানে-

“গঙ্গাতরঙ্গরমণীয়জটাকলাপম

গৌরীনিরন্তরবিভূষিতবামভাগম

নারায়ণপ্রিয়মনঙ্গমদাপহারম

বারাণসী পুরঃপতে ভজ বিশ্বনাথম…”

কেবল বলতো, ‘ডর কাঁহে রে? মন লগাকে পঢ়াই করবি। ভজন পুজন করবি।’ বলেই পুঁটলি থেকে খান চারেক বাতাসা বের ক’রে তোমার হাতে দিয়েছিল। কালীতলার চারদিকে গাছ আর গাছ। আম শিরিষ বেল নিম পাকুড় নাকুড় কয়েদবেল হরিতকী কেলকদম আঁশফল অশোক বট কৃষ্ণচূড়া লঙ্কাশিরা কলকে গুলঞ্চ নীলকণ্ঠ। একটি বট গাছকে জড়িয়ে ছাতার মতো শাখা-পাতা ছড়িয়েছে জুঁইলতা। বাড়িপুকুরের পাড়ে তিনটে বাঁশঝাড়। কালিসায়েরের পশ্চিমপাড়ে সার দিয়ে গোটা পঁচিশেক তেঁতুল গাছ। দুটো জামগাছ। তার পরে সার দিয়ে তালগাছ। বৃষ্টির পর এইখানে একটা মধুর গন্ধের মদিরতা। ফুলের সঙ্গে সোঁদামাটি আর শুকনো পাতার উপরে বৃষ্টি প’ড়ে এই রকম গন্ধ হয়। শিরিষের গন্ধটি মায়াময়। শিরিষের ফল পেকে ঝুনো হয়ে রোদে ঝলমল করে, বাতাসে নড়লে ঝুনঝুন শব্দ হয়। আর পাকা বাঁশের ফুটোয় বাতাস লেগে শিস ওঠে, দুটো বাঁশের ঘষটানিতে ক্যাঁওওও-ওঁওঁওয়া আওয়াজ ওঠে। নির্জন দুপুরে বা রাতে মনে হয় কেউ কাঁদছে। গা শিরশির করে।

১৩৮৫ বঙ্গাব্দ, ইংরেজি ১৯৭৮ সাল। বঙ্গের জেলায় জেলায় ভয়ঙ্কর বন্যা হয়েছিল সেবার। আলবাঁধা বেসিক স্কুলে তখন ক্লাস থ্রিতে পড়ছ। সেই সময় কমলাকান্ত ঘোষ মহাশয় হেডমাস্টার। ছিলেন রাখহরি ঘোষ, বাদল চন্দ্র ঘোষ, সাধন চট্টোপাধ্যায়, সুনীলকুমার ঘোষ, অন্ন দিদিমণি। ক’দিনের টানা বর্ষণে সব নদীর জল ফুঁসতে লাগে। এদিকে কোপাইনদীর জল ঢুকে গেছে সর্পলেহনা বারোকাহিনায়। গ্রামছোঁয়া তন্বী কাঁদরও সর্বগ্রাসী নদী হয়ে উঠে কলহরপুর দেবানন্দপুরকে গ্রাস করতে চাইছিল। দমদমা বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। তোমাদের গ্রাম রতনপুর একটু উঁচু। তবুও ক্যানেল উপচানো জল ঢুকেছিল মজুমদারের গাবায়। জলাজমি ভাসিয়ে ঘোষপকুর ভাসছিল। দুর্যোগে মা তোমাদের কাউকে স্কুলেও পাঠায়নি। দিন তিনেক পরে স্কুলে গিয়ে দেখলে অনেক লোকজন গরু বাছুর ছাগল নিয়ে স্কুলে উঠে এসেছে। আলবাঁধার মালপাড়া ডুবেছিল। তোমার বন্ধু তপন মাল বলেছিল, ‘জানিস ভটাচায আমাদের চারদিন উনুন জ্বলে নাই। ক্ষুদ মুড়ি খ্যে আছি’। ওর মুখেই শুনলে- হেলিকপ্টার থেকে কিছু পাঁঊরুটি আর দুধের প্যাকেট ফেলেছিল তাও নিয়ে কাড়াকাড়ি। হেডমাস্টার জানালেন স্কুল হবে না এখন। একটা বারান্দায় উনুন করে বড় বড় হান্ডায় রান্না হচ্ছে। রাখহরি মাস্টার একটা বড় খুন্তি নিয়ে হান্ডায় খিঁচুড়ি ঘাঁটছেন। বাড়ি বাড়ি ঘুরে চাল ডাল আলু কুমড়ো সিধে নেওয়া হয়েছে। যে যেমন পেরেছে দিয়েছে। রান্না করে এই বন্যাপীড়িত মানুষদের খাওয়ানো হবে। বাড়ি বাড়ি ভাদ্র মাসের অভাব। তোমাদের বারো কাঠা জমির আউশ ধান পচে নষ্ট হয়ে গেছিল, এক মাস একবেলা আটার রুটি খেয়ে কাটাতে হয়েছিল, মনে আছে না! পরের দু’বছর ভালো ধান হয় নি। তোমার বাবার মাত্র ন’বিঘে জমি। তার মধ্যে চার বিঘে একেবারে ডাঙ্গায়, সেচের জল ভালোমতো পায় না। একবার মাত্র চাষ হয়। তাতেও ছ-সাত মাসের খোরাকির চাল হয় না। তাও জোর করে পার্টির লোকেরা কৃষাণদের কী-সব বুঝিয়ে বর্গা করিয়ে দিল। জমি নাকি মালিকের নয়, যে চাষ করে তার। জমি হাল গোরু তোমাদের, তবু এই সময়ে ভাগের ধানও কমে গেল। অভাব আরো আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরল তোমাদের। অভাব দারিদ্র্য থাকা সত্ত্বেও কাগজে-কলমে তুমি ব্রাহ্মণ, কোনো সরকারি সুযোগ-সুবিধা তোমার জন্য নয়। তোমাকে পিছিয়ে পড়া বা দলিত বলা যাবে না। তোমাকে তোমার পথ নিজে করে নিতে হবে। ১৯৮৩ সালে বিদ্যুতের খুঁটি পড়তে লাগল। আলবাঁধা স্কুলের পথে বিশাল ট্রান্সফরমার বসল। সারাক্ষণ গোঁ গোঁ আওয়াজ। দেখেশুনে তোমাদের ভয় লাগত। ১৯৮৪ সালে পুজোর মুখে মুখে তোমাদের গ্রামে খুঁটি পোঁতা হচ্ছে। অক্টোবরের শেষদিন। দুপুরে রেডিও মর্মান্তিক খরব দিল- প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী দেহরক্ষীর গুলিতে নিহত। সংবাদপাঠক দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠ কেঁপে উঠল। তোমার দাদু বিষণ্ণ হয়ে দীর্ঘক্ষণ বৈঠকখানায় বসে থাকলেন, ধীরে ধীরে বললেন- “ভাই, কী সব হয়ে যাচ্ছে! এ যে ফুলের ওপর বজ্রাঘাত! ফুলের ওপর বজ্রাঘাত!” তারপর সন্ধেবেলা ধীরে ধীরে লন্ঠনের মৃদু আলোয় গীতার একাদশ অধ্যায় পাঠ করতে থাকলেন, মনে আছে তোমার ফাল্গুনী? আর ক’দিন দাদু কেবল গুনগুন করছিলেন,-

“শেষের দিনে সে জন বিনে

বলি পর কি আপন হবে রে!”

Painting: Adrian Ghenie

কবিতা আশ্রম মুদ্রিত সংখ্যা থেকে

গত নভেম্বর থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত সন্মাত্রানন্দের অসামান্য উপন্যাস 'মেঘবতী'-র বারোটি অধ্যায় পড়ুন

পূর্ববর্তী সংখ্যা

এখন বাড়িতে বসেই সংগ্রহ করতে পারবেন আমাদের প্রকাশিত বইগুলি। ভিজিট করুন আমাদের অনলাইন সপ, আর কিনুন আমাদের বই। নিচের BUY NOW বোতামে ক্লিক/ট্যাপ করলে পৌঁছে যাবেন আমাদের সপ পেজে।