সাপ্তাহিক কবিতা আশ্রম, ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৭
সাপ্তাহিক
৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৭
Painting: Wassily Kandinsky
প্রদীপ চক্রবর্তী
ছোটবকুলপুরের যাত্রী
সরাইখানার সাইরেনে
লোহা গলানো হয়
সরাইখানা
পরাজাগতিক ছবির মতো কাঁপছে…
ছোট জানলা
তোমার ক্যানভাস
রুপালি মাছের তৎপর জালে
মনছায় দুপুর,
সমস্ত দেহাংশ দুপুরের
কুন্ঠিত আস্তিনে
এখনও কিছু তাস
বৃষ্টি ফুটে ওঠা
দূরের জানলা চায় না
বৃষ্টিকে লেখার জন্য
বৃষ্টিকে স্টাডি করেছি বারবার
যেমন দেখে নিই
পুরোনো মাছের ঘাই কাঁপে জলে
ছোটবেলার রোদেতে দেওয়া লেবুর আচার
বৃষ্টির নীচে জল,
বহুদূর বনান্তর
ঝরাপাতা নামে এক গ্রাম আছে
রঙের মধ্যে বুকের ওড়িয়া নকশা
এক আধটা বন্ধ দরজা
ঘুঘুর সর্বস্ব কেড়ে নিয়েছিল
দুপুরের হলুদ
আমার কাজ হবে তাদের অনুসরণ করা…
সুনীল সোনা
মুখটি তোমার
ঠিক যেন জানালায়
তোমার মুখটি
অনেক দিনের পরিচয়
সব দ্বিধা কাটিয়ে উঠেছি
কোথাও ছিল না কোনো অবিশ্বাস
স্বপ্ন ভর্তি দুই চোখ
গোলের আকৃতি ধরে
একটু একটু করে এগুচ্ছে, আর
গোটা দরজার পাশে
গড়িয়ে পড়ছে অভিমানী জল
জল থেকে প্রশ্ন চিহ্ন পর্যন্ত ঝুলে আছে
আমাদের কৃতজ্ঞতা
আমরা শিকড়ে মুখ রেখে
ঘুমটায় ঢেকে রাখি
ফসলের বর্ণমালা
এতদিনে বুঝতে পারছি
অরণ্যের উল্লাস, আর
কান্নার ঝনঝন
আমাদের পরিচিত মুখ
সমর সুর
প্রার্থনা
আমার মৃত্যুর পর ঘোড়াটাকে ছেড়ে দিও কোনো এক
গভীর অরণ্যে।
খুঁজে নেবে গতজন্মের রাজ-অলঙ্কার ক্রোধ প্রভুভক্তি।
আমার মৃত্যুর পর পা থেকে মাটির নর্তকীর ঘুঙুর
খুলে নিও।
আর যদি পারো
তার চুলের খোপায় গুজে দিও স্বর্ণচাঁপা
একান্ত না পেলে ভাঁটফুল, গভীর অরণ্য থেকে
ভেসে আসে হ্রেষাধ্বনি।
আমার মৃত্যুর পর সম্রাট নিরোকে চিঠি লিখো
যেন তার ভায়োলিন এনে পুনরায় আরেকবার
বাজিয়ে শোনায় আমার শব যাত্রার পথে।
পুর্নজন্ম বলে যদি কিছু সন্ধান পাই
তবে সম্রাট নিরোর জন্য
সবচেয়ে সুন্দর তারাটি নিয়ে এসে উপহার দেবো।
আলোময় বিশ্বাস
অথচ হিমরাতে
ঘোড়াটি কুয়াশার আড়ালে ছিল
তার নড়ন আর অকারণের হ্রেষা ছিল
হাওড় পাড়ের নিখাদ শীত-পোড়ানোর গান।
প্রেতাত্মার দুঃখলীন গল্প নিয়ে
অচেনা কণ্ঠস্বরে গান গায় রাত, সে গানের সুর
বেরিয়ে আসে
কলাবাদুড়ের ওম থেকে।
সকালবেলা পাখপাখালির কাকলি শুনে, জল নাচে
প্রসারিত দ্যুতির সাথে নাচে স্থিরচিত্র চরাচর।
অথচ হিমরাতে কালো রক্তক্ষরণের বিষণ্ণতায় ডুবে
থাকে একটি ঘোড়া, সঙ্গীবিহীন।
Painting: Wassily Kandinsky
প্রিয়াঙ্কা চৌধুরী
জন্ম-মৃত্যুদিন
মাঝেমাঝে মুহূর্তেরা বাষ্প হয়ে যায়
বাদামী চায়ের মত বৃষ্টি হয়ে ঝরে
এক চুমুক, দুই চুমুক সমুদ্র মন্থন
নিবিড় দৃষ্টির কাছে আত্মসমর্পণ
করেও করোনি তুমি। ধোঁয়ার মতন
মিলিয়ে গিয়েছ, কথা থেমেছে যখন।
তুমি তো নতুন কথা লিখে রাখো ঝিনুকের কোলে
স্পর্শ বুলিয়ে লেখো
যেটুকু জলের দাগ হাওয়া হয়ে যায়
সে হাওয়া কুয়াশা হয়ে তাকে আগলায়
নিভৃতেই বাস করে কলমে কাগজে
বৃষ্টি হয়ে ঝরো যদি সেও সাথে ভেজে
দু’বেলা ফুটিয়ে খায় শব্দের ঋণ
রোজই তার জন্মদিন, কিংবা মৃত্যুদিন…
সুপ্রভাত দত্ত
কৃষি কবিতা
অর্ধেক ভাত খাওয়া কথাকে দিয়েই
মাঠে মাঠে লেখাগুলি রোপণ করবে?
যেখানে শব্দের ছায়া ছুঁয়ে বোঝা যায়
অর্থের বাড়িতে আজ ছাউনি ভেঙেছে !
লাঙ্গল মনের গায়ে ছন্দের বিচার
তাদের সাহসে মাঠ হৈ হৈ একাকার।
সুজিত রেজ
আত্মক্ষরণ
ফুটতে ফুটতে চাল সাদা হয়ে যায়
তার অশ্রুভার কেউ ধারণ করে না
জলের ব্যথা-যন্ত্রণা সবই ঢেউয়ে মিশে থাকে
বেলাভূমি তার কোনও খবর রাখে না
জলের মতো স্পষ্ট এ চরাচরে কিছু নেই
জলের আতস কাচে অতসী দেখা যায় না
সব পালাবদলের সাক্ষী ওই বুড়ো বটগাছ
কোনদিন কোনও কূট মন্তব্য করে না
Painting: Wassily Kandinsky
এই আমি আমার আংশিক
নির্মল হালদার
অভিযোগ।
আমার লেখালেখি নিয়ে। কবিতা নিয়ে। আমি ছন্দ জানি না। আঙ্গিক জানি না।
অভিযোগ।
আমাদের এক সমসাময়িক বন্ধু অথবা সতীর্থ একটি বাণিজ্যিক পত্রিকায় অনুযোগের সুরে লিখেছিলেন, আমি তো শঙ্খবাবুর ঘনিষ্ঠ। তাহলে কেন ছন্দটা শিখে নিতে পারিনি। আঙ্গিকটা বুঝে নিতে পারিনি। শঙ্খবাবুকে একথা বলতেই তিনি জানালেন, তুমি যা লিখছ সেটাই আঙ্গিক। সতীর্থকে শঙ্খবাবুর বক্তব্য জানাইনি আর।
সে কথা থাক, আপাতত বলতে চাইছি, বলতে চাই, আমি কোনও কিছুর চর্চা করিনি। কেবলমাত্র যা দেখি চারপাশে, যা উপলব্ধি করি, যা আমার অনুভবে ধরা পড়ে, তাই আমি বলার চেষ্টা করি। লেখার চেষ্টা করি। সেই লেখাকে কেউ বলতেই পারেন কবিতা নয়। গদ্য নয়। আমি সমর্থন করব তাদের। কেননা, আমার লেখাতে প্রাণের শব্দটুকু থাকে। ছন্দ ও আঙ্গিকের কোনও শব্দ থাকে না। কবিতা পাঠক যিনি, তিনি তো বলবেনই, আমার লেখাগুলি কবিতা নয় গদ্য নয়। তাদের স্বাধীনতা আছে, বলবার স্বাধীনতা আছে, বলবেন হাজার বার।
এবার আমি দু একটি কথা নিবেদন করি, যা আমার কাছে ধরা পড়ে খুব তীব্র ভাবে—দুপুরবেলা আমার খাওয়া হয়ে গেছে। আমি ভুলে গেছি, পায়রাদের চাল বা মুড়ি দিতে। হঠাৎ শুনি, ছাদ থেকে পায়রাদের ডাক। আমার মনে পড়ে যায়, ওদের খাবার দিইনি। এই যে ঘটনা, আমার ভেতরের হাহাকার আমি আমার মতো করে লিখি। কে কবিতা বলল, কে বলল না আমার কী যায় আসে। আমি শুধু আমার অপরাধবোধ আমার যন্ত্রণা প্রকাশ করে হালকা হলাম। একইরকম ভাবে, সকালবেলায় কুকুরদের কাছে বিস্কুট না দিলে, আমি শূন্যতা অনুভব করি। সকালবেলায় পায়রাদেরও দিয়ে থাকি। একদিন না দিলে বা ভুলে গেলে, সারাদিন অশান্তি। পুরুলিয়ার বাইরে চলে গেলে, মন পড়ে থাকে পায়রা ও কুকুরের জন্য। পকেটে মাত্র দুটো টাকা, ললিপপ কিনব পালকের জন্য। দাঁড়িয়ে আছি দোকানে। এক শিশু এসে হাত পাতে আমারই কাছে। আমি দুটো টাকা দিয়ে দিই। বাড়ি তো কাছেই। দুটো টাকা নিয়ে আবার ললিপপের জন্য যাই। পালকের আবদার মেটাতে হবে।
আমার কবিতা এইসব। ছন্দ নেই আঙ্গিক নেই। ভারী ভারী শব্দ নেই। আমার যেটুকু বলার, বলে ফেলছি লেখাতে। আমার যন্ত্রণাকে কোনও সহৃদয় পাঠক যদি ছুঁতে পারেন, আমি তবে সার্থক। না, সার্থক শব্দটা বলব না। বলতে পারি, আমি কোনও একজনের কাছে পৌঁছোতে পেরেছি। গিমিক সর্বস্ব লেখালেখি করিনি। সবাইকে চমকে দেব, এরকম লেখাতে আমার বিশ্বাস নেই। আমি যে চেয়ে থাকি, ঢেঁকির ওঠানামার দিকে। কামারশালার হাপরের দিকে। আমি চেয়ে চেয়ে থাকি, মাছধরা জালের দিকে। কিভাবে মাথার ওপর ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে জাল ফেলছে একজন। ধান রুইছে যে রমণী সে জানে, ধানের একটা চারা থেকে আরেকটা চারার দূরত্ব কতটুকু হবে। আমি জীবনকে জানার চেষ্টা করি। অবিরাম। জীবনকে খোঁজার প্রাণপণ প্রয়াস, আমার ভেতরে। সর্বদা। তারই ছিটেফোঁটা হয়তো বা, কাগজে-কলমে।
নিজেকে কবি বলিনি কখনও। কবি হতে গেলে অনেক সাধনা লাগে। কবিতা লেখার জন্য ধ্যান চাই।
আমার কোনোটাই নেই। আমি শুধু একজন কবিতাকর্মী। এ প্রসঙ্গে আরও দু’একটি কথা বলতে চাই, একজন কবিতা কর্মীকে সাংস্কৃতিক কর্মী হতে হয়। জীবনের চারপাশে সমাজের ভেতরে ভেতরে কত কাদা। কত নোংরা। পিছলে পড়ে যাবার ভয়। কত খালডোবা । যেকোনো মুহূর্তে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। যিনি সাংস্কৃতিক কর্মী তিনি তো নজর রাখবেন। তিনি তো, এই সমাজের অংশ—তিনি তো বলবেন, আমার এ ঘর ধুতে হবে, মুছতে হবে মোরে। কবিতা লিখছি বলে, কোনোদিকেই লক্ষ্য করব না, কেবলমাত্র নিজের খ্যাতির দিকে লক্ষ্য রাখব, এতে সমাজের ক্ষতি। কবি তো প্রথমে একজন মানুষ। এই সমাজের মানুষ। তারপরে, সে তবলা বাদক না ফুটবল প্লেয়ার না অভিনেতা পরে বিচার হবে। প্রথমে মানুষ হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো মানুষের কাজ।
মাটি কাটার কাজে বয়সের কারণে, যেদিন মজুর আসতে পারছে না দৈনিক কাজে, খোঁজখবর করব না? স্কুলে পড়তে পড়তে যে বালক চায়ের দোকানে কাজ নিয়েছে, তাকে কি আর স্কুলে ভর্তি করা যাবে না? এই যে জীবন এখানে কি ৭ মাত্রার ছন্দ লাগবে? এই যে জীবন, এখানে কি তৎসম শব্দ দরকার পড়ে? ভালোবাসা লাগে না? সহমর্মিতা লাগেনা?
জীবন বয়ে চলে।
স্রোতের সঙ্গে ছেঁড়া কাপড়, ভাঙ্গা ডাল, কাঠের টুকরো, পাথর, শ্যাওলা, হাড় ভেসে আসে। কত স্মৃতি, নদীর জলে ভাসতে ভাসতে কোথায় যে যায়, জানি না জানি না জানি না। আমার মনের নির্জনতা আমাকে কোনো উত্তর দেয়নি। কেবল প্রশ্ন প্রশ্ন প্রশ্ন, যে যুবকের সঙ্গে যুবতীর মিলন হল না, তাদের বিরহ আমি যে লিখতে পারিনি। লিখতে পারব না। যে যুবক মাথা কুটেও নিজের জন্য সম্মানযোগ্য একটা চাকরি জোটাতে পারেনি, তার কাছে আমার লেখালেখি কতটুকু? আর অন্যদিকে আঙ্গিক আঙ্গিক। ছন্দ ছন্দ। কে কবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, হাততালি পাচ্ছে, লক্ষ্য করছি। কিছুই কিছু নয়।
ছাই উড়ছে। অধিক সত্যের চেয়েও সত্য—ছাই উড়ছে। পড়ে থাকা ছাইয়ের মধ্যে কবিতা লিখব কি? আমার পূর্বপুরুষের ছাই, পড়ে আছে—কী কবিতা লিখব? তারা আমার কাছে কৈফিয়ৎ চাইবে, কী করেছি এতকাল? শুধু শব্দ শব্দ খেলায় কার জন্য কতটুকু জোগাড় করেছি দু’মুঠো ভাত? আমার কাছে উত্তর নেই।
আকাশ মাটি নিজেকে সাজায় নিজেদের মতো করে। কে কি বলল, কার কেমন লাগছে শোনার জন্য অপেক্ষা করে না। আমি নিজেও আকাশ ও মাটির সন্তান। তাদের কাছ থেকে এটুকুই পেয়েছি, আমি আমার মতো করে সেজে উঠব। যদি নিজেই পরি কাঁটার মুকুট, মানাবে বৈকি।
Painting: Wassily Kandinsky
গত নভেম্বর থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত সন্মাত্রানন্দের অসামান্য উপন্যাস 'মেঘবতী'-র বারোটি অধ্যায় পড়ুন
পূর্ববর্তী সংখ্যা
এখন বাড়িতে বসেই সংগ্রহ করতে পারবেন আমাদের প্রকাশিত বইগুলি। ভিজিট করুন আমাদের অনলাইন সপ, আর কিনুন আমাদের বই। নিচের BUY NOW বোতামে ক্লিক/ট্যাপ করলে পৌঁছে যাবেন আমাদের সপ পেজে।