সাপ্তাহিক কবিতা আশ্রম, ৬ ভাদ্র ১৪২৭
সাপ্তাহিক
৬ ভাদ্র ১৪২৭
কবিতা
নির্মল হালদার
আলোবাসা
ভোর এক কাব্য।
গাছের পাতার মতো
অজস্র চোখ চেয়ে থাকে আমাদের দিকে।
আমাদের কুশলের দিকে।
শিশির কুড়িয়ে আমরা যেন পাই,
আমাদের আজন্ম লালিত হৃদয়।
সংবেদী মন যেন পাখির ডানায় লিখে যায়,
আলোবাসা।
আলোবাসাও এক কবিতা।
আকাশের অক্ষরে অক্ষরে।
বিজ্ঞাপন
নির্মল হালদার
কাঁড়-বাঁশ
গরুর পেটের তলায় শুয়ে শুয়ে
ঘাসের মর্মবেদনা শুনতে পাই।
সে বৃক্ষ হতে পারেনি,
সব সময় পায়ের তলায়।
পাখিদের পা থেকে নরম স্পর্শ,
হাতির পায়ের তলায় পড়ে
হাঁসফাঁস করে।
বাঘের নিঃশ্বাসও এত ভারি, নুয়ে পড়ে সবাই
সাপ শুয়ে থাকলে, নিঃশ্বাসে বিষ।
আমার শরীরে ফুটিয়েছি ঘাস।
২
আমি কী আর অরণ্য হতে পারি?
আমি অরণ্যের এক অংশ।
শিকড়—শিঙা বাজিয়ে যাই।
পাহাড় হেলান দেয় আকাশের গায়ে।
আমিও পিঠ লাগাই দুখিয়ার পিঠে।
দুদিকের দুটি পাহাড় চেয়ে থাকে
অনিমেষ।
৩
ঘরে ফেরার আগে
শিশির-জল চেটে গেছে নক্ষত্রের দল।
সকালবেলা ফড়িং এসে খুঁজে পায় না
এক বিন্দু শিশির
পাতায় পাতায় লটকে থাকা জলের কাছে
উড়ে গেল ফড়িং
সূর্য উঠল গাছের ললাটে।
৪
পায়ে ধুলো না লাগলে মনে হয়,
আমি কোথাও নেই।
গায়ে লতা পাতা না লাগলে মনে হয়,
আমি কোথাও নেই।
পাখি না ডাকলে মনে হয়,
হারিয়ে গেছে আমার স্বর।
সাড়া চাই জন্তু-জানোয়ারের
মেঘের সাড়া পাবো।
চোখের কোনায় জমবে সকল সমুদ্র।
৫
আমার ঘুম পাহারা দিতেই,
ওরা মাথার উপরে জেগে থাকে।
ওরা আমার কে?
প্যাঁচাও জেগে থাকে
আমি যেন ঘুমোতে ঘুমোতে
পাহাড় কে লাথি না-মারি।
৬
বেলা পড়লেই, গা ঝাড়বে শুয়োর
শুয়োরের গা থেকে শুয়োর ছানার মতো
একে একে নামবে আঁধার
আমরাও জ্বালাব আগুন।
চোখেও আলো জ্বলবে।
বল্লমের মুখে গাঁথা থাকবে চাঁদ
যেন পালিয়ে না যায়। শিশুরা যেন
ঘুমের আগে চাঁদের চুমা পায়।
আপদে-বিপদে ঝিঁঝিপোকা তো আছেই।
বিশেষ গদ্য
২২ শে শ্রাবণ
নির্মল হালদার
আমাদের কাঁসাই নদী নানা দিকে এঁকেবেঁকে চলে গেছে। কোথাও খুব চওড়া। কোথাও বেশ সরু। কোথাও বা পড়ে গেছে চড়া। চড়া মানেই বালি ও মাটিতে ভরা। ঘাস ও আগাছা জন্মায়। সেইখানে জলের স্রোত ক্ষীন হয়ে গেছে। কোনো সংস্কার নেই। হয়তো বা ভবিষ্যতে বন্ধ হয়ে যাবে কাঁসাইয়ের ধারা। তখন অনেক গ্রাম চাষাবাদ থেকে বঞ্চিত হবে। পানীয় জল থেকে বঞ্চিত হবে। দিনের পর দিন গ্রামের মানুষ কাঁসাইয়ের জল থেকে যে উপকার পায়, ভবিষ্যতে না পেলে হাহাকার। এখনো যে পুরুলিয়ার মানুষ জলের অভাবেই আছে। এখনো যে সরকার বা প্রশাসন কথিত উন্নতির নামে অবনতি চলছে। ধারাবাহিক। আজ এসেছি মুটরুডি গ্রামে। পাশ দিয়ে বয়ে গেছে কাঁসাই। এই শ্রাবণেও বৃষ্টি খুব না হলেও খানিক হয়েছে। জলও আছে নদীতে। গ্রামের কচিকাঁচারা স্নান করে। পাড় থেকে উলফা দেয়।কেউ কেউ জলকেলি করে। সাইকেল নিয়ে কোনো লোক নদী পার হয়ে চলে যায় ওপারে। তার আগে সে পরনের পোশাক খুলে সাইকেলের পিছনে বেঁধে নিয়েছে। দু’পাড়েই ধান জমি। এই সবে রোয়া হয়েছে। কোনো কোনো জমি রয়ে গেছে অফলা। কোনো জমিতে পড়ে আছে চারাগাছ। হয়তো কাল সকালে রুইবে। আমার ছোটবেলায় ধান রোয়ার গান শুনেছি। এখন সেই দিন গুলির কথা বললে, মনে হবে অলীক। ছাদ পেটার গানও শুনেছি। সে সমস্ত গান কারুর কাছেই ধরা নেই। কাগজে কলমে নেই। শ্রম জীবনের গানের ধারা লুপ্ত হয়ে গেল। যদি রবীন্দ্রনাথের কাছে কোনো ভাবে পৌঁছোতো ধান রোয়ার গান, ছাদ পেটার গান তিনি অবশ্যই সংগ্রহ করতেন। তাঁর কাছে ঝুমুর ভাদু টুসু করম বাঁদনা কিছুই পৌঁছে দিতে পারিনি। পুরুলিয়া রবীন্দ্রনাথ থেকেও বঞ্চিত হয়েছে। পাশের জেলা বাঁকুড়াতেও তিনি এসেছেন। বিশেষ করে মনে পড়ছে আজ ২২ শে শ্রাবণ। মনে পড়ছে তাঁর গান :
আকাশ হতে আকাশে কার ছুটোছুটি,
বনে বনে মেঘের ছায়ায় লুটোপুটি—
অথবা
আকাশ তলে দলে দলে
মেঘ যে ডেকে যায়
আয় আয় আয় ।।
নদীর ধারে বারে বারে
মেঘ যে ঠেকে যায়—
আয় আয় আয়।
আজ আমিও নদীর ধারে আছি। আমার এলোমেলো ভাবনার সঙ্গে চলে এসেছেন রবীন্দ্রনাথ। সেও কী ২২ শে শ্রাবণ বলেই? ওই যে মাথায় ঝুড়ি নিয়ে পার হয়ে যায় মহিলারা, ভিজেও যাচ্ছে সব। কিন্তু যেতেই হবে ওপারে। গ্রামে ফেরার ঘরে ফেরার আর কোনো রাস্তা নেই। শহরে গেছলো সবজি বিক্রি করতে। এক মহিলার মাথা থেকে পড়ে গেল ঝুড়ি। ভাসছেও জলে। ধরতেও হবে। নইলে, কাল সকালে কিসে নিয়ে আসবে কাঁচা সবজি! এই অসহায়তা দেখলে রবীন্দ্রনাথ কী লিখতেন? নাকি এই বিষয়টি এড়িয়ে যেতেন? এ সমস্ত প্রশ্ন অবান্তর। আজ বরং আমাদের কাঁসাইকে আমি রবীন্দ্রনাথের দিকে এগিয়ে দিলাম।
নির্মল হালদারের ছবিগুলো তুলেছেন সন্দীপ কুমার
পূর্ববর্তী সংখ্যা
পড়তে পারেন:
এখন বাড়িতে বসেই সংগ্রহ করতে পারবেন আমাদের প্রকাশিত বইগুলি। ভিজিট করুন আমাদের অনলাইন সপ, আর কিনুন আমাদের বই। নিচের BUY NOW বোতামে ক্লিক/ট্যাপ করলে পৌঁছে যাবেন আমাদের সপ পেজে।