সাপ্তাহিক কবিতা আশ্রম, ৮ কার্তিক ১৪২৭
শারদীয়া সাপ্তাহিক
৮ কার্তিক ১৪২৭
ছবি সংগৃহীত
দেবদাস আচার্য
যায়
মুহূর্তগুলি
বয়ে যাচ্ছে
স্বভাবে ছন্দে
ধরে রাখতে পারি না
সুখ যায়
দুঃখ যায়
ভালোবাসা যায়
ফুল ফোটে
ঝরে যায়
নিরবধিকাল
জীবন
এ জীবন
স্বপ্নের মতো
ঘাত-প্রতিঘাতময়
কয়েকটি ঢেউ
সাঁতার
একটা ছবি দেখার পর
একটা গান শোনার পর
একটা কবিতা পড়ার পর
যেরকম
অনির্বচনীয়
বিজয় দে
সঙ্গীতচন্দ্র
উপাধি রবীন্দ্রনাথ। অন্য কিছু নেই।
উপাধি না থাকলেও
কোনও অসুবিধা নেই
ইনি একজন ছাপ-মারা জাত ভিখিরি।
আর ভিখিরি যিনি হবেন
তিনি তো পৃথিবীর শেষ ভিখিরিই হবেন
“আমি শুধু আমার খিদেকেই অনুসরণ করি”
ভালোবাসা গীতবিতান; ভালোবাসা আন্তর্জাতিক;
ভালোবাসা
এক নম্বর পোস্ট-অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে
আমি এই দেশের জল,
এই দেশের হাওয়া চাই
আমি এই দেশের একটা গানের ইস্কুল চাইছি।
আর এই চাওয়ার ভেতরে আমি;
আমার ভাঙাচোরা ভিখিরির গান
রৌদ্র সাথেই ছিল; একদিন শ্রাবণের
বিশদ পূজাসংখ্যার ভেতরে
ঢুকে দেখি
আমার সর্বস্ব আমার সর্বনাশ
সেখানে লুটোপুটি খাচ্ছে
মনে হয় আমি যেন কোনওদিন বেঁচে থাকিনি।
মনে হয়
আমি যেন কোনওদিন মরেও যাইনি
সব গাছই একদিন বোবা ভিখিরি।
ডালপালা মেলতে মেলতে
একদিন সব গাছ একে একে
অবাক সঙ্গীতচন্দ্র
পাখি কোনওদিন সরলরেখা হবে না
“এখানে কে কে বেঁচে থাকতে চায়, হাত তোলো”
ভিড়ের উদ্দেশে শুধু একটাই প্রশ্ন।
উত্তরে সব হাত উঠে এলো
শুধু একজন বাদ
ভিড় একটু হালকা হতেই
লোকটিকে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম
“তুমি হাত ওঠালে না কেন,
তোমার কি বেঁচে-থাকার
কোনও ইচ্ছে নেই?”
সে খানিকটা কাতর হয়ে বলল
“আমার ঘরে যে কোনও
সরলরেখা নেই।
বাঁচতে গেলে জীবনে অন্তত
একটি সরলরেখা দরকার”
আশ্চর্য, এরকম উত্তরও হয়!
ভুলে যাচ্ছিলাম।
বাড়ি ফিরতেই লোকটির কথা মনে পড়ল।
তাহলে
আমার ঘরে কি সরলরেখা আছে?
আমি ঘরের দরোজা জানালা আলমারি
লেখার টেবিল
রঙিন পর্দার দিকে তাকালাম।
কোনও উত্তর নেই।
কিন্তু আমি কি ওদের সত্যি সত্যি প্রশ্নটা করেছি?
আমার বেড়াল-ভাগ্য খুব ভালো।
প্রশ্ন না করতেই সে লেজ গুটিয়ে
মিট্মিট্ করে উত্তর দিল
“তোমার ঘরে যত পাহাড় জঙ্গল
নদী ঢেউ বৃক্ষ বাতাস
যত প্রেম যত মায়া ও ঘৃণা
যা তুমি কলমের খোঁচায় তুলে এনেছো,
একদিন সবকিছু
সরলরেখা হয়ে যাবে কিনা জানি না
তবে কবিতা-সাক্ষী;
পাখি কোনওদিন সরলরেখা হবে না”
এম এফ হুসেন
নির্মল হালদার
ঝিরিঝিরি আলো অন্ধকার
এক
হালটা একধারে পড়ে আছে
ঘরের বুড়ির মতো।
কেউ দেখে না বললেই, স্পষ্ট শোনাবে।
শরাবনের পরে
হালটাকে জল দেখায় না কেউ।
সবাই ভুলে গেছে, লাঙ্গল ছিল বলেই
সীতা উঠে এসেছে।
দুই
গাছের গায়ে আয়না টাঙ্গানো
কে মুখ দেখছে? কে মুখ দেখে?
রাস্তায় পথচারী, সাইকেল, বাইক
ধুলোর ওড়াওড়ি
শব্দেরা কি ধরা পড়ছে আয়নায়?
একটাই চেয়ার, শূন্য।
উড়ছে, সাবানের ফেনা।
মাসুদুল হক
পরিবেশবিদ্যা
পরিবেশ বিষয়ক সেমিনার চলতে চলতে
আমি ঢুকে পড়ি জঙ্গলে
সবুজ পাতায় ঝুলে থাকা ফুল
তুলে আনতে গেলেই
লাল পাপড়ি ঢানা মেলে ত্রিমাত্রিক নীলে
একটা মথ আর ফুলের মধ্যে পার্থক্য জানা নেই
তবুও রোদ গলিয়ে ঝরা পাতার কণ্ঠ শুনি
অন্ধকারে ভেসে বেড়ানো মার্বেল কুড়াতে গেলেই
প্রাণিবিদ্যায় পড়া বাঘের ভয় তাড়িয়ে বেড়ায়
অথচ জঙ্গল ঢুকে পড়েছে পাঠ্যপুস্তকে
পাতা উল্টালেই বোঝা যায় পশুপাখির চলাচল!
শীতল দুপুর
মশাল জ্বেলে আজ রাতে এসেছি বড়গ্রামে
খাড়ির খুব কাছাকাছি এসে মনে হল
কবির চেয়ে নিঃসঙ্গ অন্ধকার
চাবুকের মতো বল্লরী বেয়ে
নেমে গেছে ধীরে…
এখানে শুধু মানুষ নয়
শত বর্ষের অরণ্য ঝুপঝাপ
পাতার আওয়াজে জেগে আছে
দিনের সূর্যের পাশে দাঁড়িয়ে
আমরা যদিও ভেবে এসেছি অরণ্যগ্রাস শেষে
মাটি আছে আমাদের দখলে
রিমঝিম জ্যোৎস্নাবৃষ্টিতে
ভিজতে ভিজতে হঠাৎ এই জনপদে
শুনতে পাই বনপলাশের কান্না…
জ্যোৎস্নাধারার স্রোতের টানে
ভেসে যাচ্ছে দুঃখপাতার সংসার…
হঠাৎ বেরিয়ে পড়ে মনের হরিণ
অন্ধকারে জ্যোৎস্নাভেজা এই অরণ্যে
খসে পড়ছে আমাদের অহঙ্কারী মুখ…
জ্যোৎস্নাপ্লাবিত হরিণী শিং
অরণ্যের মাঝে থেকেও এক খণ্ড জঙ্গল
এ রকম ভেবে দেখা হয়নি কখনও
শুধু মৃগনাভি তৃষ্ণায় অরণ্যে আমাদের পদার্পণ!
কখনও অখণ্ডে নেই মনোযোগ
শুধু কর্পোরেট বাজারের চাপে
ধাপে ধাপে
সত্তায় গড়ে নিয়েছি এক চতুর বণিকের মুখোশ
এখন দীর্ঘ দিনের সবটাই ধ্বংস করে
দেহজাহাজ টেনে
জেগে উঠতে চাই একটা শীতল দুপুর নিয়ে!
বর্ণজিৎ বর্মন
সর্বনাম
বেপাড়ার সমস্ত অন্ধ গলিগুলি যদি
জ্যোৎস্না হতো
হাত ঘড়ি টেবিলে খুলে রেখে আমি
গলিগুলিতে অনায়াসে পদচারণ
করতাম,
একপাল ঘোড়া থাকলেও
শুধু সাদাটির ডাক পড়ে,
আমি তো শুক্লপক্ষের পাঠক
অমাবস্যাকে শিউলি ভেবে
হয়ে উঠি সর্বনাম
যামিনী রায়
সুদীপ্ত বিশ্বাস
ফিরে এসো
কতদিন হল চলে গেছ, ফিরে এস
একাকী বাউল দেখ হারিয়েছে পথ
বাঁকা পথ এলোমেলো
কত গ্রাম কত শহরের শেষে,
ঘুমিয়ে পড়েছে ওই পথের ওপাশে।
আলতো আদরে তাকে দেখাও নিশান
আবার উঠুক জেগে, বাজুক সে গান।
কতদিন হল চলে গেছ, ফিরে এস
অকূল পাথারে ছোট ডিঙিটার মত।
অজানা ঘূর্ণি আর চোরাবালি স্রোত
দুপাশে গুমরে কাঁদে বিষাদের নদী
এখনো বাঁচতে পারি হাত ধরো যদি
কতদিন হল চলে গেছ, ফিরে এস
গভীর আঁধারে জ্বলা তারাটির মতো।
নিঝুম রাতটি দেখ শিশির ঝরিয়ে
ফুঁপিয়ে উঠছে কেঁদে প্রতিটি পাতায়,
যেভাবে আঁধার রাত আলোতে হারায়
আলো হয়ে ফিরে এস, এই অবেলায়।
মহম্মদ সামিম
নবজন্ম
দাঁড়াতে পারি না তোমার আত্মম্ভরিতার আগে
তোমার নাম রোজ বহন করে সংবাদপত্র
কাব্যের বিজ্ঞাপন এখন তোমার অহংকার
আত্মতুষ্টির উপত্যকা হয়েছে তোমার চিবুক
তুমি তাকে অনাবৃত আনন্দ ভেবে বসো
তাই সঙ্কীর্ণ পদচারণার মহিমাকীর্তন করো
অথচ সমস্ত যাত্রাপথ জুড়ে ছিল জোনাকফুল
যারা ছিল তোমার অন্ধকার দিনের আশ্রয়
এখন তুমি মুকুটসর্বস্ব অক্ষরযোজক সম্রাট
অনায়াস উপেক্ষা করতে পারো মাটির সামীপ্য
পথের প্রান্তরে জেগে থাকা বনানীসমাজ
বিদীর্ণ আজ, তোমার রূপসম্ভাষণের শৌর্যে
দাঁড়াতে পারি না তোমার চোখের সামনে
যে চোখ এখন শোভিত হয় মেঘেদের বারান্দায়।
অমিত সাহা
ধুলোর মোহনা ছেড়ে
ধুলোর মোহনা ছেড়ে
পুনর্জীবনের লোভে ফিরে আসে যে আপেল
রাস্তায় নিউটনকে দেখে
ছুরির আদর খেতে চায়…
চাঁদশূন্য আকাশকে পেয়ে
তারারা গিলেছে মহাকাশ…
নিশ্চিত সিদ্ধান্ত আঁকা আছে সপ্তর্ষিমণ্ডলে!
আকাশবিচ্ছিন্ন ঘুড়ি গাছের শাখায় দেখে
সূত্রস্থ আপেল
মহাশূন্য বরাবর কোনও এক বিমূর্ত জাদুতে
উঠে আসতে চায়
পোকালাগা শাখাটির কাছে।
নিউটনের চোখের কোণে
সাদামাটা জল নেমে আসে…
যামিনী রায়
লন্ঠনের আলো
ফাল্গুনী ভট্টাচার্য
‘-খেলতে যাবে না?’ বায়েনপাড়ার সুকুমার আর সুনীল ডাকতে এলো।
‘-এই তো চা খেয়েই যাব, একটু দাঁড়া।’
দুপুর মরে এসেছে। শাওন মাস। সকাল থেকেই বৃষ্টি হচ্ছে। আমাদের মাটির উঠোনে থকথকে কাদা। পা টিপে টিপে মা রান্নাঘরে যাওয়া আসা করছে। আসলে ঘর নয় ওটা, চালা। ‘অনুরোধের আসর’-এর শেষ গানটা চলছে- মুকেশের কন্ঠে-‘ওগো আবার নতুন করে ভুলে যাওয়া নাম ধরে ডেকো না, হারানো স্বপন চোখে এঁকো না’। খড় জ্বেলে চা করছে মা। টিনের হাঁড়িতে চা হচ্ছে। চা মুড়ি খেয়ে বের হব। রতনপুর গ্রামে খেলার মাঠ নেই। সব উঁচুনিচু জমি। তাই পাশের গ্রাম শ্রীনিধিপুরে আমরা ফুটবল খেলতে যাই। লাল চা আর মুড়ি গোগ্রাসে গিলে দে ছুট। গ্রামের বাইরে জমিদারদের বিশাল আমবাগান। গাছের ফাঁকে ফাঁকে বল নিয়ে খেলার একটা মজাও আছে। বৃষ্টিতে মাঠের ঘাস সবুজ আর মাটি একটু নরম, বল নিয়ে কসরৎ করতে বেশ লাগে। পিছলে পড়লে লাগে না, হাত পা ছ’ড়ে যায় না। সন্ধে হয়ে আসে। অন্ধকার ঘন হলে আর বল দেখা যায় না। খেলা থামে। শক্তিপদ বলে, ‘-কাল এ মাসের চাঁদা লিয়ে আসিস সবাই।’ আমরা ঘাড় নাড়ি। দলের নেতার কথা অমান্য করার সাধ্য নেই কারও। মাত্র আট আনা চাঁদা।
শ্রীনিধিপুরের ছেলেগুলো খুব ভালো খেলে। আমাদের মাঝে মাঝে বল পাশ দেওয়া, কাটানো আর ব্যাক-ভলি শিখিয়ে দেয়। সুনীল সেন্টার ফরোয়ার্ড খেলে। নাইন-টেনের ছেলেগুলো মাঝে মাঝে আমগাছের আড়ালে গিয়ে বিড়ি টানে আর ফুকফুক করে ধোঁয়া ছাড়ে। নান্টুদা ক্লাস নাইনে চার বছর ধরে জাঁকিয়ে বসে আছে- নট নড়নচড়ন। মোটা গোঁফ। ব্যাকে খেলে। বিষ্টু মোড়লের দোকান থেকে সিগারেট আনিয়ে রজনীকান্তের স্টাইলে টান দেয়, নিজে কেনে না, ছোট কাউকে বলে, ‘এয়াই শোন, বাকি দশ নয়ার লজেন খাস বুইলি?’
‘-এই ফাল্গুন লিবি নাকি এক টান?’ আমি লজ্জায় মরি। ক্লাস সেভেন।
নান্টু বলে, ‘-জোর করব না। তু আবার বামুন। আমার এঁটো খাবি না!’
‘-মিছে কথা বলছ কেন দাদা। তোমার থালা থেকে কতবার মুড়ি তুলে খেয়েছি। খাইনি? তা বলে বিড়ি? না না না।’ আমি ককিয়ে উঠি। চারপাশ থেকে ভিজে ডাল কাঠির ধোঁয়া ওঠে। উনুন জ্বলে উঠছে গ্রামের পাড়ায় পাড়ায়। গোয়ালের গরু-মোষগুলো মশায় অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে বলে ধোঁয়া দিচ্ছে অনেকে। নটকোনা দোকান টিমটিমে আলোয় হাসছে। বুক পর্যন্ত কাদা মাটি মেখে আমরা ফিরে আসছি। বায়েনপাড়ায় ধেনো মদ খেয়ে কেউ কেউ গালিগালাজ করছে। ওরই মাঝে সজনীকাকা সানাই নিয়ে রেওয়াজ শুরু করেছে। সজনীকাকা মদ খায় না। সবুজ সুতোর বিড়ি টানে। নিজের হাতের পাকানো বিড়ি। ছোট্ট কুলোয় বিড়ির পাতা আর মশলা থাকে। কাঁচি দিয়ে কেটে মশলা ভরে পাকিয়ে নিয়ে সবুজ সুতো দিয়ে বেঁধে নেয়। ভিজে স্যাঁতসেতে সন্ধেবেলা সজনীকাকার মাটির দাওয়ায় কেরোসিন লম্ফ জ্বলছে, কালি-পড়া কাঁচের গায়ের অন্ধকার সারা দাওয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। দূর থেকে মুখ দেখতে পাই না, শুধু সানাইয়ের মুখটা চকচক করছে। একটা চেনা গানের কলি বাজাচ্ছে- ‘এবার আমার উমা এলে আর উমা পাঠাব না’ এবার পুজোয় কোন দূর শহরে যেন যাবে। এগারো টাকা বায়না পেয়েছে। উঠোনে পা দিতেই মা ঝাঁঝিয়ে ওঠে।
‘-এলে সব রাজকাজ্জ করে? সারা গায়ে কাদা মাটি মেখে এলে? এবার জামা প্যান্ট কাচো, কাল রোদ না উঠলে আর
শুকোবে?’
‘দাদার পুরনো জামা আছে না? ওটা পরব।’ বলেই একছুটে পুকুরের ঘাটে। হাতমুখ ধুয়ে গুটি গুটি বই নিয়ে ভাইবোনদের কাছে বসে পড়ি। একটাই লন্ঠন জ্বলে। কেরোসিনের খরচ বাঁচাতে এই ব্যবস্থা। ওই লন্ঠন নাকি দিদিমা মেলায় কিনে দিয়েছিল। কুড়ি বছর আগেকার কথা। মাত্র দু’বার কাচ ভেঙেছে। মা খুব সাবধানী। মাঝখানে লন্ঠন জ্বলে আর আমরা তাকে ঘিরে চারদিকে বৃত্তাকারে বসে থাকি। কেউ গুন গুন করে পড়ছে, কেউ অঙ্ক করছে, কেউ আঁকছে আরশোলার পৌষ্টিকতন্ত্র। আর বাবাও যোগ দিয়েছে সেই পরিধির মধ্যে। এক ঘর দু ঘর ক’রে বড় মাছ ধরার জাল বোনে বাবা। আমি ভাবি, ওটা কি আর লন্ঠন থাকে তখন! রূপকথার গল্প বলা আমার দিদিমা হয়ে ওঠে। ধবধবে ফরসা। আলো আলো। খুশি খুশি। যেন বলে ওঠে – “মন দিয়ে নেকাপড়া করো নাতি। বড় হ’তে হবে। মায়ের দুঃখ ঘোচাতে হবে। আমার মেয়ের নেকনে কত কষ্ট!” মায়ের মেজাজ চ’ড়ে আছে। চালায় ডাল কাঠি ভিজে গেছে। বার বার উনুনের আগুন নিভে যাচ্ছে। হাঁড়িতে ভাতে-ভাত হচ্ছে। খেলা দাদু আড়ায় ধ’রে পোয়া দুয়েক চুনোমাছ দিয়ে গেছে। তারই ঝাল হবে। খেলে এসে খিদেটা জাঁকিয়ে উঠেছে।
এই গ্রামে সাড়ে সাতটা কিংবা বড়জোর আটটার মধ্যেই খাওয়াদাওয়া চুকে যায়। তারপর সব আলো নিভতে থাকে। ঘুম নেমে আসে শান্ত গ্রামে। লম্ফ আর লন্ঠনের আলোয় আমরা খেতে বসেছি। গরম গরম ভাত মুসুর ডাল সেদ্ধ আর চুনো মাছের ঝাল। বরুণ মজুমদারের কন্ঠে বিচিত্র সংবাদ, আর দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠে স্থানীয় সংবাদ হয়ে গেছে। ছায়ছবির গান শুরু হয়, ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’ সিনেমায় হেমন্তের কণ্ঠে সেই আকুলতা ভরা গান-‘পথের ক্লান্তি ভুলে স্নেহ ভরা কোলে তব মাগো বলো কবে শীতল হব কতদূর আর কতদূর…”। দিদিমাই সেবার উঠোনের ঘাস ও আগাছা পরিষ্কার করতে করতে দেখিয়েছিল। সেই পাথরকুচি গাছটা। প্রখর গ্রীষ্মের তাপেও মরেনি। উঠোন আলো করে একছড়া রক্ত লাল ফুল ফুটিয়েছিল।
-“দেখো নাতি কী কঠিন লড়াই করে বেঁচে থাকে এই গাছ। ফুল ফোটায়।”
আমি অবাক হয়ে দেখি। দিদিমা বলে চলে নিজের মনে, ‘এমনি করে বাঁচতে হবে। তাপ ভাপ লাগবে ঝড় ঝাপট লাগবে। কিন্তু মনে মনে প্রিতিজ্ঞা রাখতে হবে পারব আমি পারব।” আর তখনই গান বেজে ওঠে, আরতি মুখোপাধ্যায় আর প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দ্বৈতকণ্ঠে ‘হীরেমানিক’ সিনেমার গান- “এই ছোট্ট ছোট্ট পায়ে চলতে চলতে ঠিক পৌঁছে যাব”। বাবা রেডিও চালিয়ে দিয়ে কখন ঘুমিয়ে গেছে। আমরাও। মা এসে বন্ধ করে দিয়েছে হয়তো। বর্ষাবিজড়িত রাতের অন্ধকার আরও চেপে ধরে আমাদের বাড়িটাকে। দিদিমার লন্ঠনটার শিখা একটু কমিয়ে দিয়ে সারারাত জ্বালা থাকে। যেন দিদিমাই তার ধবধবে রঙ, ফরসা থানকাপড় আর হাসি হাসি খুশি খুশি আলো আলো মুখ নিয়ে জেগে থাকে, বাড়িটাকে পাহারা দেয়।
গত নভেম্বর থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত সন্মাত্রানন্দের অসামান্য উপন্যাস 'মেঘবতী'-র বারোটি অধ্যায় পড়ুন
পূর্ববর্তী সংখ্যা
এখন বাড়িতে বসেই সংগ্রহ করতে পারবেন আমাদের প্রকাশিত বইগুলি। ভিজিট করুন আমাদের অনলাইন সপ, আর কিনুন আমাদের বই। নিচের BUY NOW বোতামে ক্লিক/ট্যাপ করলে পৌঁছে যাবেন আমাদের সপ পেজে।