আবহমান বাংলা ভাষা

দৈনিক

১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

মঞ্জরী গোস্বামী

বেসামাল

 

নিজেকে ছুড়ে দিই বারবার 

নেবে কি নেবে না

মহাসাগরীয় পাত ফুঁসে ওঠে

উপকূল রেখা ধরে বন্দরে বন্দরে

চকিতে অশুচি নৈবেদ্য ডালা

অমন হাত-পা ছোঁড়া পূজায় লাগে না

ঠাকুর দালানে গিয়ে দেখে এসো

অসুরের বুক থেকে

কোথাও একফোঁটা রক্ত পড়ে না

রুবেল মণ্ডল

ঋতু

 

—মানুষ কখনও ঋতু হয়?

 

—ঋতু হলে মানুষ

ছয় রকমের ফুল ফোটে শরীরজুড়ে,

পরিযায়ী পাখি বাসা বাঁধে এসে।

ছয় রকমের গন্ধ তৈরি হয় গায়ে-গতরে…

 

—আচ্ছা, মানুষ কখনও ঋতু হয়?

মানুষ ঋতু হলে মাটি হয় কে?—

যার কাছে এসে মাথা নোয়ায় ছ’জন…

 

—মানুষ যদি ঋতু হয়,

তাহলে মাটি বলতে সোঁদা মন।

কোদাল দিয়ে খুঁড়লেই বেরিয়ে আসে—

শিকড়ের শুশ্রূষা ক্ষমতা।

 

জাবেদ ভূঁইয়া

মেয়েটি মৃত ভাঙা ডানার পালক

 

এখানে বসেছি হাট বাজার থেকে দূরে— আমার আত্মীয়

নেই আজ, ঘুড়ি বানানো ভুলে গেছি বাজারী বইয়ে! 

 

যে মেয়েটি কথা বলত সেই মেয়েটি আজ উঠে গেছে

                              দূরে চাঁদের পাহাড়ে।

 

সেই পাহাড়েও থাকেনি মেয়েটি, তার থেকে

                       আরও দূরে অরণ্যে

সেই মেয়েটি বাস করে একা একা অক্ষরহীন পাহাড়ে!

অরণ্যের সুরে শব্দে মেয়েটি কথা বলছে!

 

কেনাবেচার শব্দ অক্ষরে এর কোনও অর্থ দাঁড়াচ্ছে না!

 

ভাঙা ডানার পালক উড়ছে বাগিচা বাজারে—

চৈত্রের হাওয়া থেকে উড়ে এসেছে বৈশাখে! 

মৃত কথাগুলো গলে যায়! এভাবেই মিশে যায় মেঘে!

 

মৃত কথার কফিনে— নিজের ভিতরে! 

 

দেবশ্রী রায়

সরীসৃপ

 

ঘুমোলেই তো সুড়ঙ্গ খুঁড়ে খুঁড়ে

গনগনে কান্না ঢেলে দেবে শরীরে

নয়তো দগদগে মৃত্যু। 

তার চেয়ে জেগে থেকে 

আষ্টেপৃষ্ঠে জীবন বাঁচি   

নিদ্রাহীন, অপেক্ষাহীন।

ঘুমপাড়ানি গান গেয়ে  

অনর্থক আর শক্তি অপচয় কোরো না

রূপকথার গল্প থেকে তুলে আনা জাদুকাঠি

কার্যকারিতা হারিয়েছে অনেক আগেই    

শীতকালীন ভয় কাটিয়ে উঠেছি

ক্লান্তির সঙ্গে করে নিয়েছি 

আপোসহীন বোঝাপাড়াটুকু।

 

আর সরীসৃপ হব না কোনও দিন।

 

উদিত শর্মা

থমথমে কথা

 

এখানে ঝরনা ক্রমাগত কেঁদে চলেছে

তার শ্বেত অশ্রুধারায় রাত্রির স্তূপ জমে উঠছে

পাহাড়ে পাহাড়ে।

প্রোথিত দীর্ঘশ্বাসে গাছেরা বহুকাল ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল –

আমি এসব থমথমে কথা বলতে চাই না,

শুধু মরণাপন্ন বেহালা জানে সে-সব মৃত্যু কাহিনি।  

আর ওই অনন্ত বৃষ্টিধারা জেগে উঠছে

প্রার্থনার মতো।

মনে হয় নক্ষত্রের সুগন্ধ মাখতে মাখতে

আমাদেরও ফুরিয়ে আসছে দিন।

 

নির্মল হালদারের বিশেষ রচনা

নির্মল হালদার

পুরুলিয়ায় আজ রহিন

শম্ভু জল দিতে আসবে না। আজ রহিন। শম্ভুর গ্রাম ১০ কিলোমিটার দূরে। প্রতিদিন শহরে জল দিতে আসে। দু-টিন জলের দাম ৬ টাকা। আমাকেও দিয়ে যায় জল। সকালবেলা শম্ভুকে দেখতে পেলেই আমার স্বস্তি। জল ছাড়া যে এক মুহূর্ত চলে না। শম্ভুর দুই ছেলে থাকলেও সে আসে রুটিরুজির জন্য। হাতে কাঁচা টাকা না থাকলে সংসার অচল। ছেলেরা এখনও কোনও কাজে যুক্ত হতে পারেনি। তো  শম্ভুর সঙ্গে কথা হচ্ছিল—সে আসতেও পারে, না আসতেও পারে। কারণটা এই, রহিন। ১৩ জ্যৈষ্ঠ প্রতি বছরের মতো এবারও রহিনের দিন। বীজ বপনের দিন। স্থানীয় ভাষায় বীজপুননা। এইদিন পরিবারের কোনও সদস্য সকালে স্নানের পর নতুন কাপড় পরে এবং কোনও কিছু না খেয়ে বীজ ফেলতে যাবে। মাটিতে দেবে কাঁচা দুধ ও আতপ চাল। ঘরে এসে তুলসীতলায় প্রদীপ জ্বালানো। ধূপ জ্বালানো। একটা সময় এই দিনটিতে মহিলারা গান করত। বীজ বপনের গান। শস্যের গান। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে গেছে। যে পরিবারে কোনও বৃদ্ধা থেকে থাকেন, তিনি দু-এক পংক্তি গান করার চেষ্টা করেন। ১৩ জ্যৈষ্ঠ বৃষ্টি হবেই। ভারতীয় বিশ্বাসে কৃষিদেবতা বলরাম। তিনি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা। তিনি হলধর। তাঁর মায়ের নাম রোহিণী। লোকবিশ্বাস এই, ১৩ জ্যৈষ্ঠ রোহিণী নক্ষত্র পৃথিবীর কাছাকাছি আসে। এবং রোহিণী নক্ষত্রে বীজ ছড়ালে দেবতা বৃষ্টি দেবেনই। লোকজীবনের বিশ্বাস তাই ১৩ জ্যৈষ্ঠ দিনটি শুভ দিন। কৃষিকাজ নিয়ে যারা সারা বছর কাটায়, তারা এই দিনটিকে বিশেষ দিন বলেই চিহ্নিত করেছে। এখানে আরেকটি তথ্য জানাই, এই রহিনের দিন আষাড়ি ফল নামে একটি ফল পাওয়া যায়। এই দিন এই ফলটি খেতেই হবে। বিশেষ করে যারা চাষাবাদে থাকে, তারা ফলটিকে দাঁতে কাটবেই। এখানেও প্রচলিত বিশ্বাস—এই ফলটি খেলে সাপে কাটলেও বা বিষাক্ত কোনও পোকা কাটলেও বিষ ঢালতে পারবে না। আষাড়ি ফল ছাড়াও এই ফলটিকে বলা হয় রহিন ফল। শম্ভুর কাছে আরও জানতে চাইলাম, গান শোনাতে পারবি

যদি যাই তোদের গ্রামে? সে হাসতে হাসতে বলে, ধুর উ সমস্ত আজকাল হয় নাই। শুধু বিচ ফেলা। আর পূজা করি আমরা।

ভারতীয় সমাজে আমাদের এই দক্ষিণবঙ্গের পুরুলিয়াতে চাষীরা এখনও লোকবিশ্বাসে বাঁচে। পুরুলিয়াতে  বছরে একবার ধান। যা হেমন্তে ঘরে আসে। যার সূচনা পর্ব ১৩ জ্যৈষ্ঠ। ১৩ সংখ্যাটি বিজোড় সংখ্যা। ভারতীয় সমাজে সবসময় বিজোড় সংখ্যাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। যেমন ৭, ৫, ৩, ১১, ২১। বিজোড় সংখ্যাই শুভ সংখ্যা। আমরাও ১৩ জ্যৈষ্ঠকে নিয়ে কৃষিকাজে সফল হয়ে উঠব এই আশায় আমার ভূমিকে আমি প্রণাম করি।

ফটো: 'পুরুলিয়ার কথা ও কাহিনী' ফেসবুক পাতা থেকে সংগৃহীত

কবিতা আশ্রম আয়োজিত কবিতা পাঠ

অফুরন্ত বাংলা কবিতা

সুবোধ সরকারের কবিতা

বিগত দিনগুলি