আবহমান বাংলা ভাষা

দৈনিক

১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ছবি: প্রাচেতস সাহা

তমাল বন্দ্যোপাধ্যায়

বৃন্দাবনী সারঙ

 

জোনাকিআলোর কাছে ফুঁপিয়ে ওঠার মেঘ নামে।

কুয়াশাশিশিরে মাখা আদিগন্ত অপেক্ষাপ্রহরা।

দীপগুলো নিভে গেলে কীরকম ঋষিপ্রস্তুতি-

 

আমাকে জানিও শুধু… ও শীতের ডাকহরকরা…

 

মৃদুল হক

ভিটের মায়া

 

পাখিরা বাসা বানায়, ভিটে গড়ে খড়কুটো জমিয়ে জমিয়ে।

আমি রোজ আমার জানলা দিয়ে তাদের দেখি। 

একজন একা পাখি এভাবে ঘর বানায় দু’জন থাকবে বলে,

                                           একার যত্নে!

 

অথচ মানুষ দ্যাখো একা কিছুই বানাতে পারে না, 

সব কিছুতেই তার মানুষ দরকার।

 

ঝড়ের আগে পাখি বাসা পালটায়, সঙ্গীকে নিয়ে আবারও

আশ্রয়ে বেরিয়ে পড়ে, এমনকি ঝড়ের শেষে    

পুরোনো বাসায় ফিরেও আসে না…

অথচ মানুষ দ্যাখো মৃত্যুর আগে পর্যন্ত

               বাসা ছাড়তে পারে না,

আঁকড়ে থাকে, তছনছ হয়ে যাওয়া আসবাব দেখে,

                                    রক্তাক্ত হয়..

 

মানুষ আসলে পাখির মতো ভেঙে পড়ার আগে

পতন দেখতে পায় না!

 

 

ছবি: চন্দন মিশ্র

জাহানারা পারভীন

অপরাধ

 

এক চিলতে  বারান্দার দোতলা বাড়ি 

বাড়িতে আসা-যাওয়া দখিন  হাওয়ার

আর আসত চড়ুই।

ছানাপোনা সহ  চড়ুই মা  শিকার  করতেন 

                          কখনো কখনো।

 

বন্ধ দরজা, জানালা, ঘুলঘুলি

পাখিদের  ছুটোছুটি, আর্তচিৎকার

এখনো মনে আছে মায়ের  নিষ্ঠুরতা।

 

শিশু সন্তানের পাতে মা তুলে  দিতেন  পাখি-মাতার  মাংস

যার  সন্তানেরা তার  জন্য অপেক্ষমান  নিকটবর্তী গাছে

 

বাড়ির  গ্রিলে বসা চড়ুইয়ের কাছে তাই

      ক্ষমা চাই আমার মায়ের অপরাধের।

 

 

সুমন বন্দ্যোপাধ্যায়

ত্রাণ শিবির

 

এইসব ফেলে আসা স্মৃতির দিকে 

 লন্ঠন ভেঙে ফেলে অবাধ্য বালক 

 

তবুও সমস্ত উৎকন্ঠার ভেতর

 যারা রাত জেগে বসেছিল

                    দীর্ঘ শিমুলের নিচে 

জলশূন্য কুয়ো তার দীর্ঘশ্বাস ছুঁয়ে 

নত হতে হতে ঢেকে দিয়েছিল 

মরা পাখিদের ঘুম ও রমণ 

 

ফসলহীন মাঠ, চৈত্রপবন 

 কিছুতেই চেনেনি কখনো 

 

তোমার ঘাস ও জল

 ত্রাণ হয়ে জেগে আছে আর্ত-শিবিরে। 

কবি নির্মল হালদারের চোখে করোনা-র দিনগুলি

নির্মল হালদার

পৃথিবী গ্রহের পুরুলিয়া

পর্ব-৩১

 

ও মাসি ও মাসি কাকে খুঁজছো? এত ভোরেই চলে এসেছো, কি ব্যাপার? মাসি কোনো জবাব না দিয়ে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে। আগে হলে দেখতাম, মাসি আস্তাকুঁড়ের ছাই থেকে কয়লা বাছছে। এখন আস্তাকুঁড় একদম ফাঁকা। হোটেলগুলি বন্ধ হয়ে গেছে। মিষ্টির দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। উনুনেও আগুন নেই। আপোড়া কয়লা গুলি বেছেবুছে মাসি  বিক্রি করে গরিবের দুয়ারে। দু পয়সা  পায়। আর পেয়ে থাকে দোকানিদের কাছেও। ঘর থেকে ভোরবেলায় বাজার ঢুকে, সব দোকানের সামনের জায়গাটুকু ঝাঁট দিয়ে দেয়। বেলা হলে দোকানে দোকানে দাঁড়ানো। মাসিকে যে যেমন পারে পয়সা দেয়। সবজিওয়ালারাও আলুটা মুলোটা মাসির হাতে ধরিয়ে বলে, কাল ভালো করে ঝাড়ু দিবে মাসি। মাসি মনে মনে বলে, দিতেই হবেক। রাস্তাও তো আমাকে দেয়। ঘরে ঢুকলেই, আঁচল ধরবে নাতি। চকো এনেছো? এনেছো? চকলেটেরও দাম লাগে। মাসিকেও রোজগার করতে হয়। ব্যাটা তো রিক্সা টেনে যা পায় মদের পিছনে ঢালে। ব্যাটার তিন তিনটা ব্যাটা-বিটি। তাদের জন্য দুধ লাগে। জামা কাপড় লাগে। জ্বর জ্বালা হলে, ডাক্তার লাগে। মাসিকে কাজ করতেই হয়। মাসি এক পথচারীকে জিজ্ঞেস করে, হ্যাঁ গো বাবু, কবকে খুলবেক সোভ? পথচারী মাসীর মুখের দিকে তাকিয়ে চলতেই থাকেন। কোন উত্তর না দিয়ে । শুধু তো হোটেল বন্ধ নয় বাকি দোকানগুলিও বন্ধ। যাদের দুয়ারগুলি ঝাড়ু দিয়ে দিলে, দু’চারটে পয়সা। এখন তাকে মাগনা কে দিবেক। আর এই বুড়া বয়সে ভিখ মাগতেও নাই পারবেক। ব্যাটার বউ তো মাড়ু ঘর থেকে ভাত রুটি নিয়ে আসতো। তাতেও খানিকটা সুরাহা। কিন্তু এখন মাড়ু ঘরের দুয়ার বন্ধ হয়ে গেছে। কেউ কারোর ঘরেও যাচ্ছে না। মাসি ভেবে কূলকিনারা না পেয়ে বন্ধ দোকানের নিচে বসে পড়ে। দু তিনটা কুকুর এসে মাসির পায়ের কাছে। কুকুরগুলি মাসির চেনা। মাসি যখন আস্তাকুঁড় থেকে কয়লা বাছে তখন কুকুরগুলিও নিজেদের খাদ্য খোঁজে। মাসি তাদের দেখে বলে, তদের কপালে কিছু নাইরে নাই। আমারও ফাটা কপাল। জোড়াও লাগবে নাই এই জনমে। আমার কাছে যে এসে বসলি তোরা, কি খেতে দিব? কারোর ঘরকে গেলে মারবেক। ভুল করেও ঢুকে পড়িস না। কেউ হয়ত তোদের গায়ে ঢেলে দিবেক গরম মাড় । শুনছি, আমাদের বস্তিতে পুলিশ থাকবেক। বাইরের কেউ যেন ঢুকে না পড়ে। ছেলা গুলান বাঁশ বেঁধেও দিয়েছে। লতুন কাউকে দেখলেই, কত যে প্রশ্ন। তিন কুড়ি পার হয়ে গেছি, আগে কখনোই শুনি নাই এমন রোগের কথা। যাকে ধরতেই পাচ্ছে নাই। পুলিশে এত চোর ধরে আর রোগটাকে ধরতে লারছে? ইদকে আমরা মরছি। দু চোখ খুললেই, ছটা খিদা। আমাদের ধরছে। রেহাই নাই রে বাপ। রেহাই নাই। মাসি কুকুরদের উদ্দেশ্যেই বলে, চল্ ওই পাড়াতে  যদি পাঁশ কুঁড় থেকে কিছু পাই। কুকুরগুলি মাসির মুখের দিকে চেয়ে থাকে। মাসি উঠে পড়ে।

রোদ উঠছে আস্তে আস্তে। খিদে উঠছে আস্তে আস্তে।

 

৭ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭

 

ফটো: ফেসবুক থেকে সংগৃহীত

কবিতা আশ্রম আয়োজিত কবিতা পাঠ

অফুরন্ত বাংলা কবিতা

সুবোধ সরকারের কবিতা

বিগত দিনগুলি