দৈনিক কবিতা আশ্রম, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
আবহমান বাংলা ভাষা
দৈনিক
১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
Number-48,1948 by Jackson Pollock
গৌতম গুহ রায়
চিয়ার্স
এই কাঁধ থেকে, বুকের ছাতির একটা দিক
থেকেও কিছুটা মাংস কেটে নাও
টুকরো টুকরো করে তা গেঁথে নাও আয়রন স্টিকে,
লাল উনানের তাপে মালার মতো ঝুলিয়ে দিও
সেই খণ্ড খণ্ড মাংস।
আমার কাঁধ ও বুকের জমাট ঘাম আগুনের
তাপে বাষ্প হবে প্রথমে
ভেতরের জমাট চর্বি টপ টপ করে গলে পড়বে,
বনভোজনের লালাভ স্মৃতি নিয়ে আপনারা
পরিচর্যা করবেন ক্ষুধার, আগুন ঘিরে
আদিম মানুষের মতো
চামড়ার কৌপিন পড়ে ঘুড়ে ঘুড়ে নাচছেন।
তিলে তিলে জমানো আমার দেহের চর্বি
ফোটা ফোটা করে আগুনের গায়ে এসে
উসকে দেবে আগুনের ভেতর,
কাঠ ও কয়লার মধ্যের তাপ।
মৃত, আদিম কোনো গাছের
ভেজা বল্কল ছুঁয়ে কেউ হয়তো
পাখিদের উড়িয়ে দিয়েছিল, দাবানলের আগে।
আগুনের তেঁতে ওঠা ক্রূঢ় সন্ধ্যায়,
এই মাংসের পোড়া গন্ধে
আপনাদের মতো আমিও বলছি, ‘চিয়ার্স’
মিজান খান
কাচপুকুরের জলে
ভিজবে বলে পা ভেজালে জলে
জলের ভিতর তাকিয়ে আছ অনুক্ষণ কোন ছলে?
না না ছোঁয়নি তো পা জলের গা’কে
দূর থেকে পা দেখে।
নামলে জলে জড়িয়ে নিবে,
ভিজিয়ে দেবার ছলে।
পদ্মভরা কাচপুকুরে ভাসছে লাজুক চোখ
চোখের ভিতর টলটলে এক কান্নাভরা সুখ,
হোক না লাজুক, জড়াবে তোমায়
চিতিয়ে আসে বুক।
সন্দীপন দাস
মোহ
কয়েকটা মানুষ জটলা করছে এ রাতে আগুনের সাথে
আগুনের খুব অভিমান…
অভিমান অদূরে পড়ে থাকা রক্তাক্ত সন্ধেমণি ফুল,
ছেঁড়া বর্ণপরিচয়ের পাতা, ভিনদেশী অন্ধকারেরও…
ঈশ্বর মাটির হয় বুঝি?
পরিযায়ী চোখও কখনো কখনো ভাষা…
কয়েকটা মানুষ জটলা করছে শূন্যতার সাথে
চোখে অশান্ত স্বপ্ন বুনে
স্বপ্নের খুব অভিমান…
অভিমান কাছে পড়ে থাকা মাটির ঈশ্বর,
পরিযায়ী চোখের জলেরও…
আলো কখনো কখনো বিজয় অভিলাষী হয় বুঝি?
মুস্তাক মুর্শেদ
জুঁই ফুলের মতো ভাত
হা অন্ন, হা অন্ন বুভুক্ষা আমার পাকস্থলী মুচড়ে দেয়,
হাভাতের মতো নতজানু পাথর হয়ে চেয়ে থাকি। গরম ধোঁয়া ওঠা ভাতের দৃশ্যকল্পে আমি অন্ধ হয়ে যাই।
দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য আমি এসে পড়ি নাম না জানা নদীর পাড়ে যেখানে শুয়ে রয়েছে আমারই মতো কিছু অন্ধ-মানুষ, যাদের শরীরে বইছে চিংড়ি মাছের রক্ত। আমার খিদের আগুনে তারা দাউদাউ পুড়ে যায়।
দীর্ঘ দু’মাস সাত দিন ক্ষুধা তাড়িত আমি খ্যাপার মতো খুঁজে ফিরি সেই পরশ পাথর যা ছুঁয়ে দিলে
ফুলস্ক্যাপ কাগজে কালির আঁচড়ে সাজানো কবিতার অক্ষরগুলো হয়ে উঠবে অতি যত্নে বেড়ে দেওয়া আমার মায়ের পরম মমতা মাখানো জুঁই ফুলের মতো ভাত।
নতুন প্রজন্মের বিশিষ্ট প্রকাশক অপু দে-র নিয়মিত কলাম
অপুর সংসার
পর্ব-১
"প্রিয় ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য"
১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯। গোর্কি সদনে সুভাষ মুখোপাধ্যায় জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে চলছে অনুষ্ঠান ও তাঁর ওপর একটি প্রদর্শনী। আজ ছিল এই অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় দিন। আজ অপর্ণা সেনের উপস্থিত থাকার কথা ছিল। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার জন্যে তিনি আসতে পারেননি। একটি লেখা লিখে পাঠিয়েছিলেন আমাদের দফতরে। আর সেই লেখাটি পাঠ করলেন শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়।
সম্পূর্ণ লেখাটি এখানে দিলাম।
“সুভাষ মুখোপাধ্যায় আর গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রথম চিনেছি বাবা-মা’র বন্ধু হিসেবে। ওঁরা ছিলেন আমাদের সুভাষকাকা আর গীতামাসি। এই ডাকের মধ্যে কোনও যৌক্তিকতা ছিল না। কেন যে ওঁদের কাকা-কাকিমা কিম্বা মাসি-মেসো না ডেকে কাকা আর মাসি ডাকতাম, সেটা আজকের আমার কাছে অবোধ্য। তবু ভাল যে, ডাকটা ‘মামা-মাসি’ কিম্বা ‘কাকা-পিসি’ ছিল না! তাহলে সম্পর্কটা অহেতুক জটিল হয়ে উঠত!
ওঁদের মেয়ের নাম ছিল পুপে, সে ছিল আমাদের বন্ধু। মানে আমার আর আমার পরের বোন রত্না’র। পুপের পরে আরও বোন ছিল, তবে তারা তখন নেহাতই ছোট। ছোটবেলায় জানতাম না, পরে বড় হয়ে জেনেছি পুপে আর ওর বোনেরা সকলেই adopted। জেনে গীতামাসি আর সুভাষকাকা’র প্রতি শ্রদ্ধা বেড়ে গিয়েছিল বহুগুণ।
আরও একজন সদস্য ছিল ওঁদের বাড়িতে—আপাদমস্তক লোমে ঢাকা একটি ভুটিয়া কুকুর। কোনদিকটা তার মাথা আর কোনদিকটা যে তার ল্যাজ, বোঝার জো ছিল না! নাম ‘এলোমেলো’। এলোমেলো’র মতো সার্থকনামা জীব আমি আজ পর্যন্ত আর দুটি দেখিনি। একমাত্র গীতামাসি আর সুভাষকাকা’র মতো সুরসিক দম্পতির পক্ষেই ওই নামকরণ সম্ভব ছিল।
বড় সরল আর ভাল মানুষ ছিলেন ওঁরা। গল্প শুনেছি, এক রাতে চোর এসে নাকি ওঁদের সর্বস্ব চুরি করে নিয়ে যায়। পরদিন সকালে দেখা গেল সুভাষকাকা আর গীতা মাসি খাটের ওপরে বসে আছেন। সে ঘরে ওই খাট ছাড়া আর সবকিছু খোয়া গেছে। মহা খুশি দুজনে, তোষকের নীচে পরের দিনের বাজার-খরচের টাকা রাখা ছিল, সেটা নিতে পারেনি চোর!
সে সময়ে সুভাষকাকা’র সঙ্গেই দেখা হত বেশি, যদিও গীতামাসি’র লেখা ‘ববির বন্ধু’ পড়ে তাঁর বিরাট ফ্যান হয়ে গিয়েছি ততদিনে । আমাদের পাম অ্যাভেনিউ-এর বাড়ির বারান্দায় তখন প্রায় রোজই আড্ডা বসত বিদগ্ধজনেদের। সুভাষ মুখোপাধ্যায়, আশিস বর্মণ, শান্তি চৌধুরী, মৃণাল সেন, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়… এঁদের ছিল সেই আসরে নিত্য আনাগোনা। সুভাষকাকা অত্যন্ত মৃদুভাষী। শান্তি চৌধুরীর গমগমে কণ্ঠস্বরের পাশে তাঁর গলা প্রায় শোনাই যায় না। গুনগুন করে কথা বলেন নিচুস্বরে। যেদিন একলা আসেন, বাবা’র সঙ্গে গল্প করেন অনেকক্ষণ ধরে। সেরকমই এক সন্ধ্যায় ডাক পড়ল আমার। সবে বারো পেরিয়েছি তখন, এবং অপরাধের মধ্যে ওই বয়সেই ‘রেকারিং ডেসিম্যাল’ নাম দিয়ে একটি অত্যন্ত জ্ঞানগর্ভ বাংলা গদ্য-কবিতা লিখে ফেলেছি। ওই বয়েসে কবিতা লেখার একটা ব্যর্থ চেষ্টা অন্তত না করলে আর কিসের বাঙালি? বাবা বললেন, “সুভাষকে শোনা তোর কবিতাটা।” তখনও পর্যন্ত সুভাষকাকা’র কোনও কবিতা আমি পড়িনি, পড়লে কিছুতেই রাজি হতাম না! তাই প্রথমে মিনমিন করে কিছুটা আপত্তি করলেও, শেষ পর্যন্ত বাধ্য মেয়ের মতো পড়ে শোনালাম কবিতাটা। চুপ করে শুনলেন সুভাষকাকা। তারপর চুপ করেই রইলেন আরও খানিকক্ষণ। দেখলাম ওঁর ঠোঁটে চাপা হাসি, যেন হাসি চাপবার চেষ্টা করছেন। শেষটায় বাবাকে বললেন, “আপনার মেয়ের কবিতায় যেটা রয়েছে তা আজকাল খুব কম কবিতাতেই পাওয়া যায়। সেটা হল সার। তবে…” এবার আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “…তুমি গদ্য-কবিতা লিখছ কেন এইটুকু বয়েসে? প্রথমে ছন্দ মিলিয়ে লেখার চেষ্টা করো না!”
প্রচণ্ড রাগ হল! পরদিন বাবাকে বললাম, “কেন তুমি কাল কবিতা শোনাতে বললে আমাকে? আর কক্ষনো যার-তার সামনে কবিতা পড়তে বলবে না বলে দিলাম!”
বাবা অবাক হয়ে বললেন, “যার-তার মানে? তুই জানিস সুভাষ কত বড় মাপের কবি? আয় তোকে ওর কবিতা পড়ে শোনাই…”
সেই শুরু।
“প্রিয় ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য
ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা
চোখে আর স্বপ্নের নেই নীল মদ্য,
কাঠফাটা রোদ সেঁকে চামড়া…”
নেশা লেগে গেল! এমন গভীর মানবিক কথা, এমন প্রখর রাজনৈতিক বক্তব্য এইরকম ছন্দোবদ্ধ ভাবে বলা যায়! এবার বুঝতে পারি কেন উনি আমাকে বলেছিলেন ছন্দ মিলিয়ে লেখার চেষ্টা করতে! বারো বছরের আমি সুভাষকাকাকে ছাড়িয়ে আবিষ্কার করি কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে। কন্ঠস্থ হয়ে যায় কবিতাগুলো …
“চিমনির মুখে শোনো সাইরেন শঙ্খ,
গান গায় হাতুড়ি ও কাস্তে
তিল তিল মরণেও জীবন অসংখ্য
জীবনকে চায় ভালবাসতে।”
কী বলিষ্ঠ তাঁর রাজনীতি! কী গভীর তাঁর মানবিকতা!
তারপর ‘লাল টুকটুকে দিন’-এর সেই যুগান্তকারী লাইনগুলো, যা আচ্ছন্ন করে ফেলত আমাদের ?
“তুমিই আমার মিছিলের সেই মুখ
দিগন্ত থেকে দিগন্ত যাকে খুঁজে বেলা গেল
ফিরে দেখি সেই আগন্তুক
ঘর আলো করে বসে আছে পিলসুজেই…”
অভাবনীয় চিত্রকল্প! যতটা রোম্যান্টিক, ততটাই বৈপ্লবিক! যত বয়েস বাড়ে, ততই ধীরে ধীরে আমার বড় হয়ে ওঠা’র একটা অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে ওঠে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা। কলেজের সিঁড়িতে, কফি হাউসের আড্ডায় ফিরে ফিরে আসে পঙক্তিগুলো, রক্তে জোয়ার আনে…
“সারাদিন গেল, কেন দিলে নাকো দেখা
ফুৎকারে দিকপৃথিবী আঁধার করে?
বুঝি সেই রাগে ঝঞ্ঝায় একা একা
এখনো বজ্র আকাশকে ছেঁড়ে খোঁড়ে…
দিগন্তে কারা আমাদের সাড়া পেয়ে
সাতটি রঙের ঘোড়ায় চাপায় জিন
তুমি আলো, আমি আঁধারের আল বেয়ে
আনতে চলেছি লাল টুকটুকে দিন।”
“ফুল ফুটুক না ফুটুক, আজ বসন্ত…” কী দৃপ্ত, কী প্রত্যয়ী কণ্ঠস্বর এই কবির! ‘পদাতিক’-এর কবি। ‘কাল মধুমাস’-এর কবি। ‘যত দূরেই যাই’-এর কবি। আরও কত, কত অসামান্য কবিতার …
চিরকালের মতো হৃদয়ে মুদ্রিত হয়ে যায় তাঁর রচিত পঙক্তিগুলো। এই যে এতক্ষণ লিখছি, সবটাই তো মন থেকে লিখলাম, একবারও তো একটা বইয়ের পাতা উল্টে দেখলাম না। কিছু ভুল রয়ে গেল হয়তো বা, কিন্তু সেই ভুলগুলোও তো তাঁর সৃষ্টির প্রতি আমার অনুরাগেরই অংশ!
এত দৃপ্ত, এমনকী সময় বিশেষে উদ্ধত তাঁর কণ্ঠ, অথচ রোজকার জীবনে এত বিনয়ী, মানবজাতির প্রতি এমন সরল বিশ্বাসে প্রাণিত মানুষ বড় একটা দেখিনি। মানবদরদী এই মানুষটি স্বভাবতই বামপন্থায় বিশ্বাসী ছিলেন চিরকাল, কিন্তু বামপন্থী দেশগুলোর আভ্যন্তরীণ অবস্থার কথা যত জানতে পারছিলেন, ততই হতাশায় ভরে উঠছিল তাঁর মন। মনে মুখে এক ছিলেন বলে সেকথা লুকোননি কখনও, যে কারণে সমসাময়িকদের কাছ থেকে আক্রমণও এসেছে তাঁর প্রতি। উৎপল দত্ত একবার Wordsworth সম্পর্কে লেখা Browning-এর বিখ্যাত কবিতা থেকে উদ্ধৃত ক’রে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে লিখেছিলেন, “Just for a handful of silver he left us, just for a ribband to stick in his coat…”
অথচ সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে যাঁরা চিনতেন, তাঁরা সকলেই জানতেন যে তাঁর মধ্যে সততার কোনও অভাব ছিল না। মন থেকেই বিশ্বাস হারাতে শুরু করেছিলেন। বামপন্থার প্রতি না হোক, বামপন্থী দেশগুলোর প্রতি। মনে আছে ১৯৮৯-এ রাশিয়া থেকে ঘুরে আসার পর হতাশায় ভরে গিয়েছিল আমার মনও। যা দেখেছিলাম, যা বুঝেছিলাম, তার বিবরণ দিয়ে একটা লেখা লিখেছিলাম The Telegraph কাগজে। লেখাটা পড়ে সুভাষকাকা ফোন করেছিলেন আমাকে—
“কতদিন ছিলে তুমি ওখানে রিনা?”
বললাম, “দশদিন। মস্কো ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে জুরি হয়ে গিয়েছিলাম তো …”
“যা লিখেছ, একদম ঠিক লিখেছ, কিন্তু এত তাড়াতাড়ি বুঝলে কী করে বলো তো? আমার তো কতদিন লেগেছিল বুঝে উঠতে!”
মনে মনে বলেছিলাম, তা তো লাগবেই। তুমি যে বড় সরল মানুষ সুভাষকাকা! মানুষকে খারাপ ভাবতে পারো না কিছুতেই।
আজ কূটনীতিতে ভরা এই দুনিয়ায়, মনেপ্রাণে খাঁটি সেই মানুষটির জন্মশতবার্ষিকীতে তাঁকে আমার অন্তরের শ্রদ্ধা জানাই।”