দৈনিক কবিতা আশ্রম, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
আবহমান বাংলা ভাষা
দৈনিক
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
Blue Nude by Henri Matisse
দীপঙ্কর মুখোপাধ্যায়
প্রপঞ্চক
কৈশোর থেকেই দেখে এসেছি
প্রেমিকাদের আঠালো নখ
কেউ আকর্ষণ করত কেশগুচ্ছ,
তো কেউ খুবলে নিত অক্ষিগোলক
অনেকেই আবার ছিনিয়ে নিয়েছিল
মার্কশিট, বা একমাত্র পাশবালিশ
ছুটির দিনে ছোঁয়াছুঁয়ি খেলার সময় তাই
ভীষণ ভয় করত
আর বিকেলের কমলা আলোয় কানামাছি
খেলা তো ছিল হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডার
কৈশোর থেকেই জেনেছি নুড়ি ও ঝিনুক
কীভাবে ক্ষয়ে যায় জলকণাদের পদাঘাতে
বিভিন্ন উষ্ণতার বাতাস কিভাবে উড়িয়ে
নিয়ে যায় নাসারন্ধ্র ও ঠোঁটের ডারমিস
আপাদমস্তক আশা নিয়ে যত বার
নদীর কাছে ছুটে গেছি
ততবারই নিজের ছায়াকে টুকরো
হতে দেখেছি ঢেউয়ের দোলায়
রবীন বসু
সাদা ফুল জুঁই
কারা যেন বলে গেল চল যাই ভিন কোনো গ্রহে
আমার জানালার পাশে জুঁই ফুটেছিল যখন
অন্ধকার দাঁড়িয়ে ছিল বাগানের কোণে আগ্রহে
ঘরের মধ্যে জ্বলছিল স্বপ্নের নক্ষত্র তখন।
কে ডাক দিল? কে বুকের গভীরে ঢুকে কুরে খায়
তোলপাড় স্মৃতি মনখারাপের গৃহবন্দী দিনে
পুরনো দেরাজ খুলে কাকে যে মনে করিয়ে দ্যায়
আকুলকে হাতড়ে আমি খুঁজে মরি আভ্যন্তরীণে।
যে মুখ উঁকি দিল তালডাঙার মেলার ওপারে
সবুজ ঘাসের আলে দৌড় আর দৌড় বেলাশেষ
ঘামে ভয়ে গরম শ্বাসে বয়ঃসন্ধির চিৎকারে
সে প্রেম রয়ে গ্যাছে আজও অবিকল অবশেষ।
আমার ঘরের পাশে হেসে ওঠে সাদা ফুল জুঁই
জানিনা কোথায় আছিস কোন গ্রহে আজ তুই!
সোহাগ সিদ্দিকী
মাতাল নীলাভ ভুল
( প্রিয় হুমায়ুন ফরীদি স্মরণে )
তোমারই মতো মাতাল প্রেমিক হতে
আমিও যে রোজ অবহেলা করি পান
ছোঁয়াই অদৃশ্য ওষ্ঠে অভুল অঙ্গুরি
বিষ নয়, উঠে আসে নীলাভ ভুলের ঘ্রান।
বিদায় হে বন্ধু, দেখা হবে প্রণয়ের তোরে,
নির্ভুল নক্ষত্রে অঙ্গুরি অনাবশ্যক ভোরে।।
রজতকান্তি সিংহচৌধুরী
খোঁজ
এ তো বহুদিন জানা কথা
তুমি ঠিক দুনিয়ার নয়
বুঝি সম্প্রতি জেনেছ তা?
তাই লাগছে ভীষণ ভয়!
হায়, হুরি হয়ে উড়ে যাবে
ফের- দৌসের সন্ধানে
তবে ভাঙা বাসা খুঁজে পাবে
বেঁচে থাকবার কোনো মানে?
শুধু ছড়ানো পালক পড়ে
নীল পাপড়িরা এলোমেলো
মন তবু আশমান খোঁড়ে
বুঝি ভালোবাসা বুকে এল?
নতুন প্রজন্মের বিশিষ্ট প্রকাশক অপু দে-র নিয়মিত কলাম
অপুর সংসার
পর্ব-২
প্রফুল্ল রায়
সত্তরের গোড়ার দিক। ৩৬ বছরের এক লেখকের বাড়ি গিয়েছিলেন ১৭ বছরের এক তরুণ প্রকাশক।
“আমরা নতুন প্রকাশনা করেছি, আপনার বই প্রকাশ করতে চাই” এই ছিল প্রকাশকের প্রথম উক্তি।
লেখকের সন্দিহান চোখে সেই প্রকাশকের বর্ণনা শুনেছিলাম অনেক পরে।
“রোগা পাতলা হাফপ্যান্ট পরা একটা ছেলে আমাদের বেহালার বাড়িতে কড়া নেড়েছিল।”
—কী চাই?
—আপনার একটা বই প্রকাশ করতে চাই।
—আমি তো অগ্রিম না নিয়ে বই দি না।
—কত টাকা অগ্রিম আনব?
—২০০০টাকা।
—আচ্ছা কবে নিয়ে আসব? (সেই সময় ২০০০টাকা অনেক)
সেই লেখক কয়েক দিন পরে সকালে আসতে বলেছিলেন। প্রকাশক গিয়েছিলেন সেই নির্দিষ্ট সময়ে। কিন্তু কোনো এক কাজে লেখক বেরিয়ে গিয়েছিলেন। ফিরতে বেশ সময় নিয়েছিলেন। সেই দীর্ঘ সময়ের অপেক্ষার মধ্যে প্রকাশক পেয়েছিলেন মাতৃসম বৌদিকে। যিনি এক অপরিচিত অনামী এক তরুণকে দুপুরে অন্ন জুগিয়েছিলেন (আজ তিনি নেই)। সেই লেখক যখন ফিরলেন একটু বিরক্ত হয়েই বলেছিলেন, কে এসেছে? শুনেছি জেঠিমার কাছে, “তোর জেঠুকে খুব বকেছিলাম। আসতে বলো, তার পরে ভুলে যাও, সেই সকাল থেকে এসে বসে আছে কিছু না খেয়ে আর কতক্ষণ অপেক্ষা করবে?”

প্রকাশক তার পরে সেই ২০০০ টাকা লেখকের হাতে তুলে দেন। এতে সেই লেখকের সন্দেহ আরো গভীর হয়। এইটুকু বাচ্চা এত টাকা…নিশ্চয়ই চুরি করেছে। কিছু না বলে শুধু বলেছিলেন, নাম ঠিকানা লিখে দিয়ে যাও। আর বলেছিলেন ওইদিন বিকেলে উনি আসবেন।
এসেছিলেন উনি। গলির মাথা থেকে নিয়ে এসেছেন সেই খুদে প্রকাশক। নিয়ে এসেছিলেন তাঁর বাবার কাছে। লেখককে বলেছিলেন, এই আমার তৃতীয় সন্তান, নতুন প্রকাশনা করেছে, আপনারও একটা বই করতে চায়।
আরো অনেক কথার পরে মুঠোয় রাখা সেই ২০০০ টাকা সেই খুদে প্রকাশকের বাবার হাতে দিয়ে যান, আর বলেন— খুদেকে বলে দেন কবে যেতে হবে।
প্রফুল্ল রায়। বাবার দাদা থেকে এখন আমার প্রফুল্ল জেঠু। এই দীর্ঘ ৪৬ বছরের লেখক-প্রকাশকের সম্পর্ক কখন পারিবারিক হয়ে গেছে…