আবহমান বাংলা ভাষা

দৈনিক

২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

The Olive Trees by Vincent Van Gogh

সন্মাত্রানন্দ

ভোরবেলা

নরম সজনে ফুলে পুকুরের পাড়ের ভেজা মাটি শাদা হয়ে আছে। গোরুর দুধ দুইবার সময় গাভীর বাঁটে যে ফেনা ওঠে, তার থেকেও নরম বুঝি এই ভোরবেলার আকাশ। মাথার কাছে আলোর ওড়নাখানা খুলে রেখে রাত্রি মুখ ধুতে গেছে, সেই স্বচ্ছ আলোর ওড়না নেবুপাতার মতো নরম আকাশের বুকে এখন ছড়ানো। স্নান সেরে ভেজা কাপড়ে নদী থেকে ঘরের দিকে ফিরে আসছে যে মেয়েটি, তার কপালের ধুয়ে আসা সিঁদুরের মতো মেটে রং আজ সূর্যের। এই গ্রাম, এ পৃথিবীর উপর আরেকটা দিন আসছে নীলাভ ডিম ভেঙে বেরিয়ে আসা চড়ুইশাবকের প্রথম ডাকাডাকির মধ্য দিয়ে। এই ব্যথামধুর পৃথিবী, এই জলরঙে ধোওয়া ছবি, এই শিরীষমৃদুল অনুরাগ, এই বারবার ফিরে আসা জননীজঠরে – নারী আর তার প্রিয় পুরুষের নিবিড় গভীর ভালোবাসাবাসির তন্ময় মুহূর্তের ভিতর, শালিখের ঠোঁটে সযত্নে ধরে থাকা খড়কুটোর মতো প্রাণটুকু ধরে রাখা, বেঁচে থাকা নিজস্ব নদীর রূপে একবার লগ্ন হবার আন্তরিক অভীপ্সায় — এই শুধু ফজরের আজানের আদিম আয়াৎ।

আইরিন সুলতানা

দ্বিতীয়বারের মতো মারা গেলাম আমি

(উৎসর্গ: মানব সভ্যতার আগ্রাসনে মৃতপ্রায় সবুজরাজিকে)

 

আমি প্রথমবার মারা গিয়েছিলাম শ্বাসকষ্টে

আমার শ্বাসযন্ত্র ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু হয়ে উঠছিল;

বিষাক্ত সীসার উপস্থিতি টের পেতাম

               সেকেন্ডে সেকেন্ডে, নিঃশ্বাসে।

হৃদযন্ত্রের রক্তিম আভা ঢাকা পড়েছিল

                      কার্বনের পুরু প্রলেপে

আমার ত্বকের স্বর্ণ রঙ পুড়িয়ে দিয়েছিল

                           গনগনে রোদ,

ভয়াবহ বিপর্যয়ে মৃত্যু ক্রমাগত

                  গ্রাস করেছিল আমাকে।

আমার শ্বাসটান বেড়ে যেত 

যখন দ্বীপ রক্ষকেরা যন্ত্রদানব হাঁকিয়ে পিষে দিত 

একেকটা সবুজ শরীর।

আমার চৌদ্দ পুরুষের ভূখণ্ড কেঁপে কেঁপে উঠত

                           দানবের চলাচলে।

সবুজের আর্তনাদে বাতাসে উঠেছিল হাহাকার ঘূর্ণি, 

আমার নিঃশ্বাস পড়েছিল চাপা নিঃষ্প্রাণ

                   সবুজের মৃত শেকড়ের তলে।

শাখা থেকে শেষ পাতাটাও ছিঁড়ে ফেলা হলে

মাত্র দু’দিন বেঁচে ছিলাম আমি,

পাতাটার শুকনো খড়খড়ে হয়ে যাওয়া অব্দি।

নগর পরিচর্যাকররা ওটাকে সরিয়ে ফেলেছিল দ্রুত,

ঠিক যেমন করে ওরা আমার মৃতদেহের উপর

                         ধূলোমাটি বর্ষণ করতে 

হয়ে উঠেছিল ব্যতিব্যস্ত।

আমি খুশিই হয়েছিলাম ওদের ধুলো ওড়ানো শেষকৃত্যে।

আমার সম্মানে দু’ফোটা অশ্রু যদি পড়ে ধূলোর বিছানায় 

তবে সেখানে জন্মাবে মখমলি সবুজ,

মৃত্যুর পর আমি নিঃশ্বাস নেবো সবুজের তলদেশে

সোঁদা শেকড়ের নির্যাসে। 

সিক্ত জমিন চুঁইয়ে পরিশোধিত আলো

                      এসে পড়বে আমার শরীরে,

আমি দ্বিতীয় জীবন লাভ করব আমার প্রথম মৃত্যুর পর।

আমার ধারণা সঠিক হয়নি এতটুকু…

এ দ্বীপের শ্রাদ্ধানুষ্ঠান বড় বর্ণাঢ্য।

ওরা আমার মৃত আবাসকে ঢেকে দিল দামি মর্মরে।

পিচ্ছিল মর্মর ফুঁড়ে দেয় সে সাধ্য হয় না মাটির সবুজের,

কী দুর্যোগ! 

আমি হাঁসফাঁস করতে থাকি…

দু’দিন পর আমার পুনর্মৃত্যু ঘটে। 

পারমিতা ভট্টাচার্য

প্রমিথিউস

ঝড়ের পরে সবে
কমলা রোদ্দুর―
হিসেবনিকেশ খাতায়
কে খায় লাভের গুড়!

ইটপাথরের মাথায়
হেলতে থাকে ছাদ,
কাস্তে নিয়ে রাতে
সংকেতময় চাঁদ

বিকেল জমে থাকে
অথৈ জলের মাঠ,
গাছের লাশ এখন
মূল্যবিহীন কাঠ

চাতক কাতর হয়
জন্ম মুহূর্তেই,
ভোগীর জীবন ঘোরে
কুয়োর জগতেই

এ দেয় ওকে দোষ
অন্ধ ভিখারির―
এই শহরে সবাই
বাদশা আলমগীর!

জ্যোৎস্না বনের রাতে
কাঠশিকারির চলা,
অরণ্যদেব নেই―
বিপন্ন গাছপালা

শুঁড়ের ভিতর ফাটে
অসহ্য যন্ত্রণা,
হবু মায়ের খিদেয়
লুসিফারের হানা !

ফুঁসতে থাকা ক্ষেতে
জমছে ধানের তুষ,
নিভতে বসা আগুন আবার
জ্বালাও প্রমিথিউস !

শেলী নাজ

প্রতিশোধ

তোমার বুটের তলে পৃথিবীর দমবন্ধ গ্রীবা

নিঃশ্বাস আটকে যাচ্ছে, ছটফট করছে অরণ্য

জলে স্থলে অন্তরীক্ষে দর্পভরা কুচকাওয়াজে

স্তব্ধ পাখোয়াজ, মাঠে মৃত তৃণ, শস্যের দাক্ষিণ্য

ভুলে আজ তোমার বন্দুক তাক করা বনদেবীর মস্তকে

রাত্রির পশম ঢাকা কুমারীপ্রকৃতির স্তনে,

                     ছুটছে ফিনকি দিয়ে রক্ত আর দুধ

তাতে তৃপ্ত হচ্ছে তোমাদের জঠর ও তৃষ্ণা,

                     কুসুমমঞ্জরী পায়ে দলে চলে গেছ

ধর্ষিতা অরণ্যযোনি ধুয়ে দিয়ে গেছে রাতভর বৃষ্টি

 

তোমার রাক্ষুসে ক্ষুধা, জন্মাবধি খেয়েই চলেছ

বিল, ঝিল, গ্রাম, পক্ষিণীর মাংস, নদীর পাঁজর

ঢেউ মুছে গেছে, জেগে আছে জলে ঘর্ঘর ইঞ্জিন

পানকৌড়ির বুক ভেদ করে চলে গেছে তোমাদের গুলি

নিজেরই খুলি ভরে পান কর রক্তমাখা জল, তোমার কুঠার

চিরে ফেলেছে পুষ্পসম্ভবা গাছ আর বসন্তের মন,

কারখানার বর্জ্যে, তেলে ও গরমে মরে যাচ্ছে মাছ

                                     তুমি লোভী, খুনি

তোমাদের লুণ্ঠনের নিচে তবু দুয়েকটি জোনাকি

জ্বেলে রেখেছে লণ্ঠন

 

তোমার বুটের তলে নিঃশ্বাস আটকে থাকা প্রতিটি মুহূর্ত

মনে আছে হরিণীর, নিসর্গ রেখেছে মনে তার ফুসফুসে

                                         আগুন লাগানো

বুটের তলায় পিষ্ট হতে হতে প্রতিশোধ স্পৃহায় জেগেছে

                                         সবুজাভ বনভূমি

ছড়িয়েছে পৃথিবীর প্রতিপ্রান্তে জীবানুপুষ্পের রেণু, বেণুবনে

ক্ষমতার চূড়োয় বসেও আজ শ্বাস বন্ধ হয়ে মরে যাচ্ছ তুমি!

 

জাকির জাফরান

আশ্চর্য তফাৎ

স্বপ্ন দিয়ে

দুঃখ দিয়ে

সম্পর্কের স্থবিরতা দিয়ে 

আজ মিথ্যে মিথ্যে ভাত রান্না করি।

দেয়ালে জন্মেছে বটগাছ

তাকে বলি, আমি বেশ ভাল আছি, 

তোমার অনেক দীর্ঘশ্বাসও

অক্সিজেন দিয়ে

আমাকে বাঁচিয়ে রাখে।

পিঁপড়ের পিঠে চড়ে সুখ আসে

তাকেও বলি, এই বেশ আছি আমি,

শ্যাওলা জন্মেছে দেখ পিঠে।

ফুল দিয়ে

অবিশ্বাস দিয়ে

সন্দেহের সমূহ সম্ভাবনা দিয়ে

আজ মিথ্যে মিথ্যে বাগান বানাই আমি।

ফুলকে বলি—

সুখ ও দুখের অন্ত্যমিল নিয়ে

ঘুমিয়ে পড় বাবুরা,

কারণ আমি তো জানি

বাগান ও অরণ্যের আছে আশ্চর্য তফাৎ।

কনক মণ্ডল

হাসনুহেনা

শুভঙ্কর কাল একটি হাসনুহেনা গাছ 

নিজে হাতে পুঁতে গেছে আমার বাড়িতে। 

গাছটির উদ্ভবে হাত উপচেয় জল দিল।

 

আমি প্রতিদিন জল দিই সন্ধ্যা-সাঁঝে। 

 

জল দিতে হাসনুহেনা চুঁইচুঁই ক’রে 

অদ্ভুত রকম ভঙ্গি দেখাতে লাগল। 

গাছটির নউয়ে থাকা পাতাগুলো সব 

যুবতী নারীর মতো আশ্চর্য সতেজ। 

 

এবার বন্ধন পালা, অঙ্গীকৃত সেবা,

ভাড়াবাড়ির উঠোন কুম্ভাণ্ডের মতো।

প্রতিদিন চলতি-বলতি গাছটি বেড়ে চলে 

আমাকে অনেক প্রশ্ন করে ছন্দবদ্ধ। 

 

নীচ আমি বলি ― ‘তুমি কোন মানবীর?’ 

হাসনুহেনা বলে― ‘প্রেমানন্দ পৃথিবীর!’

বঙ্কিম লেট

হেমলোক

তুমি তো কিনছ না, মানে তুমি বেঁচে গেলে 

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মরা দেখাই তোমার কাজ—

এই ভেবে এতকাল ডাবের ছিদ্রে ঢুকিয়েছ স্ট্র, 

 

আর ভুলে গেলে তুমিও ইঁদুর একটা 

তোমার জন্যেই হয়তো কেউ কিনল এক ফাইল

ঘরে খাবে, আর মাঠে গিয়ে মরবে

 

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মজা, মরা দেখছি অহর্নিশ 

শহরময় ঘুরছে, দ্যাখো, অবনী ঘোষের ইঁদুর মারা বিষ    

অমিত সাহা

লজ্জা

সিমেন্টের দেয়ালের মাঝে

                    মৃত বালিদের মুখে আলো  

আলেয়া নয়…আলেয়া নয়…  

                    নদীটির অশ্রু চমকালো!  

Water Lilies by Claude Monet

রাহুলদেব বিশ্বাস

নতুন পৃথিবী

[প্রেক্ষাপট: প্রকৃতির উপর মানুষের মনোপলির কুপ্রভাবে, ২০২০ খ্রিস্টাব্দে  মিউটেশনের ফলে পৃথিবীতে আবির্ভাব হয় এক মারাত্মক ভাইরাস। ১৫ বছরের চেষ্টাতেও ভাইরাসের কোনো ভ্যাকসিন তৈরি করা যায়নি।  শেষ দিকে মানুষ এক প্রকার হাল ছেড়েই দিয়েছে, তার সাথে সমুদ্রজলের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে মহাদেশগুলির ৩০% অংশ মহাসাগরে বিলীন হয়ে গেছে, ৯০% মানুষই মারা গেছে —  সমগ্র পৃথিবীতে লোকসংখ্যা মাত্র ৭৫ কোটি ৩৩৬ জন,  তারা সমগ্র পৃথিবী জুড়ে প্রায় ৪৪ লাখ ৫৬ হাজার ৯ টি গ্রামে বসবাস করে।  পৃথিবীতে কোনো শহরের অস্তিত্ব নেই,  সকলে গ্রাম বসবাস করে। আর এখন ২০৩৫ খ্রিস্টাব্দ।] 

নিশ্চিন্দিপুরের বাড়িতে  ব্যালকনিতে বসে অনিরুদ্ধ ঈপ্সিতার চুল বেঁধে দিচ্ছে, আজ বাবা-মেয়ে পৃথিবী ঘুরতে বের হবে, তারই প্রস্তুতি চলছে। ঈপ্সিতার আবদার ওর দশ বছরের জন্মদিনে তাকে সমস্ত পৃথিবী ঘুরিয়ে দেখাতে হবে। ২০৩৫ খ্রিস্টাব্দে সেটা যে কতটা কঠিন কাজ তা ছোট্ট মেয়ে ঈপ্সিতাও জানে। আসলে শুধু কঠিনই না, আইনবিরুদ্ধও বটে। এখন গ্রাম ছেড়ে পাশের গ্রামে যাওয়ার নিয়মই নেই কারো,  পৃথিবী তো স্বপ্ন। এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামের মানুষের সাথে ভিডিও কলের মাধ্যমে কথা হয়, তবে ভিডিও কলিংয়ের ব্যবস্থা অনেকটাই উন্নত হয়েছে আগের থেকে।  এখন শুধু কথা শোনা ও দেখা নয়, ভিডিও কলিং-এ আপনি অপর দিকের গন্ধ ও স্পর্শও পাবেন।  অনিরুদ্ধরই একটি সংস্থা ভিডিও কলিংয়ের নতুন প্রযুক্তিটা এনেছে। 

পিকাচুতে অনিরুদ্ধ আর ঈপ্সিতা বসে আছে।  অনিরুদ্ধ চালকের আসনে।  পিকাচু আসলে একটি প্রাইভেট প্লেন—২০৩৫-এ অবশ্য প্রাইভেট প্লেন ছাড়া আর কোনো প্লেনের অস্তিত্বই নেই। প্রাইভেট প্লেনও আছে হাতে গোনা কয়েকটি।   তবে হ্যাঁ, প্রত্যেকটি গ্রামের একটি অ্যাম্বুলেন্স প্লেন আছে, গ্রামের কারো কোনো রোগ হলে চালকবিহীন  স্বয়ংক্রিয় উড়ন্ত অ্যাম্বুলেন্সগুলি দেড় মিনিটে পৌঁছে যায় বকখালির ভাসমান হসপিটালে; যা তৈরি করা হয়েছে সমুদ্রের উপরে,  পুরানো প্লাস্টিককে কাজে লাগিয়ে।

পিকাচু খুবই অত্যাধুনিক নেক্সট জেনারেশনের প্লেন।  চলে গাছের প্রযুক্তিতে — আলো আর কার্বনডাই অক্সাইডে—পৃথিবীতে এই মুহূর্তে যার কোনো অভাব নেই। পিকাচুর আর একটা ধর্ম —কোনো রাডারে তো তাকে ধরাই যায় না, বিশেষ একটি স্যুইচ টিপে দিলেই খালি চোখেও পিকাচুকে দেখা যায় না।  

—বাবা কী ভাবছ, চলো তাড়াতাড়ি, আমাদের অনেক জায়গা যেতে হবে তো! 

—হ্যাঁ রে মা—

বলে অনিরুদ্ধ পিকাচুকে নির্দেশ দিল যাত্রা শুরু করতে। এটাও পিকাচুর একটি বৈশিষ্ট্য, পিকাচুর যান্ত্রিক ব্রেইন অনিরুদ্ধর ব্রেইন ফ্রিকোয়েন্সিতে  সেট করা আছে, অনিরুদ্ধর ব্রেইন যেভাবে তাকে নির্দেশ দেবে সেইভাবে পিকাচু চলবে। 

ঈপ্সিতা ছলছল চোখে বলল, বাবা, প্রথমে সেই ভাইরাসের দেশে চলো।  

ঈপ্সিতা চিনের কথা বলছে।  আসলে ওর মায়ের কথা মনে হলেই মনটা খুব খারাপ হয়ে যায় আর ভাইরাসের দেশের কথা মনে পড়ে। ভাইরাসের সংক্রমণে ওর মা যখন মারা যায়, তখন ওর সবে তিন। পিকাচু খুব কম স্পিডেই যাচ্ছে,  নীচে  এক-একটা গ্রাম দেখা যাচ্ছে আর  অনিরুদ্ধ গ্রামগুলি নিয়ে নানা কথা বলছে মেয়েকে। 

বাবা, ওই যে লম্বা দেওয়ালের মতো ওটা কী ? 

—ওটা পৃথিবীর সবথেকে বড় পর্বতমালা হিমালয়। এক সময় এর মাথায় সাদা বরফ জমত আর নীচে ছিল সবুজ জঙ্গল।  

—আমি তো ভেবেছিলাম এটা বুঝি একটা মরুভূমি — ঈপ্সিতা একটু সন্দিগ্ধভাবে বলল।

 অনিরুদ্ধ মনে মনে একটু হাসল।  মুখে বলল, না মা, এক সময় এই  হিমালয় একটা মরুভূমির মতো দেশকে সুজলা সুফলা করেছিল। মানুষ সব শেষ করে ছাড়ল। গাছ কাটল, নদী ভরাট করল, জঙ্গল ছিন্নভিন্ন করল। মাটির নীচের লোভ তুলে তাকে বিষের মতো চারিদিকে ছড়িয়ে দিল। সব শেষ হয়ে গেল। 

ঈপ্সিতা আর কিছু বলল না। সে জানে অনিরুদ্ধের পুরনো কথাগুলি মনে এলে কেমন যেন হয়ে যায় ও — নিজেকে সামলাতে পারে না। আর এখন বেশি বাড়াবাড়ি হলে বিপদ হতে পারে, কারণ অনিরুদ্ধর ব্রেইন ফ্রিকোয়েন্সি এলোমেলো হলে পিকাচু নিশ্চিত অ্যাক্সিডেন্ট করবে।

ঈপ্সি, এই হল তোর ভাইরাসের দেশ। 

ঈপ্সিতার কেমন যেন বিশ্বাস হয় না! — বাবা এ তো খুব সুন্দর দেশ,  আমাদের গ্রামের মতো। 

—হ্যাঁ সুন্দরই তো। সব দেশই সুন্দর ছিল। শুধু মানুষগুলি লোভী ছিল। এতটাই লোভী যে নিজের ভবিষ্যৎ, নিজের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, নিজের ডি এন এ-র কথাও ভাবেনি।

—বাবা, এত সুন্দর দেশ, ভাইরাসের দেশ কী করে হল?  

—পৃথিবীর সাত মহাদেশেই এক সময় মানুষ বনে জঙ্গলে থাকত আর-সব পশুপাখির সাথে। সমস্ত পৃথিবীতে লক্ষ লক্ষ বাস্তুতন্ত্র গড়ে উঠেছিল। মহাদেশগুলির  একে অপরের সঙ্গে এতটাই ভূপ্রাকৃতিক বাধা ছিল যে বাস্তুতন্ত্রগুলি একে অপরের সাথে মিশতে পারেনি। তাই প্রত্যেকেই ছিল তার নিজের মতো। মানুষ একদিন জঙ্গল ছাড়ল। শহর গড়ল। তারপর জঙ্গলকে কাটতে কাটতে চারিদিকে এক বিরাট শহর—একটাই বাধাহীন উন্মুক্ত মহাদেশ।   জঙ্গলের নিরীহ পশু পাখিগুলো এতদিন যেসব মারাত্মক ভাইরাস ব্যাক্টেরিয়াকে মানুষের থেকে দূরে রেখেছিল, তারা ছড়িয়ে পড়ল শহরে। বাধাহীন,  প্রকৃতির বর্মহীন শহরগুলিতে মারাত্মক ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে সময় নিল না একটুও। 

এখন পিকাচু ইউরোপ মহাদেশের উপর, ঈপ্সিতা! সমুদ্রের উপরে যে ছোট ছোট গ্রাম দেখতে পারছিস, এগুলি এক সময় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সব দেশ ছিল। এরা এক সময় সমস্ত পৃথিবীকে শাসন করেছে, পৃথিবীর উপর সবচেয়ে বেশি অত্যাচার করেছে এরা। এখন পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট আর গরিব দেশ—পূর্বপুরুষের পাপের বোঝায় সব ডুবে গেছে। এখন ইউরোপের এইসব গ্রামগুলিকে বাঁচিয়ে রাখতে আমাদের অন্য গ্রামগুলিকে প্রতি বছর ভর্তুকি দিতে হয়। 

—বাবা, আমেরিকা দেখব কখন? 

পিকাচু সংকেত বুঝল, এখন পিকাচু ঠিক নিউ ইয়র্কের উপর। চারিদিকে শ্মশানের নিস্তব্ধতা।

—বাবা এ কোন দেশ! এটা খুব ভয়ংকর জায়গা।  এখানে তো কোনো গ্রাম নেই, কিচ্ছু নেই। আমার ভয় করছে,  এখান থেকে চলো। 

পিকাচু মুহূর্তে মহাসাগরের উপরে! নীচে নীল জলরাশিতে নীল তিমিরা মুখ উঁচু করে যেন ঈপ্সিতাকে ডাকছে।

অনিরুদ্ধ মহাসাগরে ঢুকেই বুঝেছিল কিছু একটা গোলমাল হতে চলেছে,  কিছুক্ষণ যেতেই ব্যাপারটি বোঝা গেল। পিকাচুর দুই নম্বর বিপদসংকেত লাল আলোটি বিপ বিপ করা শুরু করেছে।  এর মানে হল অদৃশ্য ইল্ট্রোম্যাগনেটিক জাল পিকাচুকে ঘিরে ধরেছে। এটা রক্ষণশীল গোষ্ঠীর কারসাজি। আসলে পৃথিবীর গ্রামগুলিতে এখন দুটি গোষ্ঠীর নিয়ম চলে। এক—নব্য পৃথিবী গোষ্ঠী। অনিরুদ্ধদের মতো যারা পরিবেশপন্থী,এটা তাদের গোষ্ঠী। আর দুই নম্বরটি হল— রক্ষণশীল গোষ্ঠী,  যারা পুরনো পৃথিবীকে ফিরিয়ে আনতে চায়। ৪১ লাখ ৫০ হাজার ২ টি গ্রামে চলে নব্য পৃথিবী গোষ্ঠীর নিয়ম, আর ৩ লাখ ৬ হাজার ৭ টি গ্রাম রক্ষণশীলদের দখলে।

পিকাচুর অত্যাধুনিক কম্পিউটার ব্রেইন কয়েক সেকেন্ডে ৯৯ লক্ষ ২৩২ রকম সম্ভাবনাকে বিশ্লেষণ করে দেখল মাত্র ১৬ রকম ভাবে এই মুহূর্তে বাঁচা সম্ভব। পিকাচুর ডিসপ্লেতে ১৬ রকম রণকৌশলের ফুটপ্রিন্ট ভেসে উঠল। অনিরুদ্ধ ১১তম উপায়টি বেছে নিল। সঙ্গে সঙ্গে পিকাচু অনিরুদ্ধর ব্রেইন ফ্রিকোয়েন্সি থেকে সংযোগ ছিন্ন করে  পিকাচুর নিজস্ব যান্ত্রিক ফ্রিকোয়েন্সিতে চলে এল। পিকাচু এতক্ষণ অনেকটা উচ্চতায় উড়ছিল, এখন সেটা নীচের দিকে নামতে শুরু করল আর তার সাথে তার আকার পরিবর্তন হতে থাকল। পিকাচু যখন মহাসাগরে ডুব দিল তখন সে অত্যাধুনিক যান্ত্রিক ডলফিন, তার ফ্রিকোয়েন্সিও একেবারে ডলফিনের সাথে মিলে গেল। পিকাচু বন্ধনহীন, লাগামছাড়া ডলফিন, তার আশেপাশে হাজার হাজার হাজার ডলফিন তাকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে একটা ভাইরাস ইলেকট্রোম্যাগনেটিক জাল বেয়ে রক্ষণশীল গোষ্ঠীর সার্ভারকে ডাউন করে দিল। রক্ষণশীল গোষ্ঠীর সব ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়ে গেল কয়েক সেকেন্ডে।

পিকাচু এখন ভারতবর্ষের গ্রামগুলির উপর দিয়ে উড়ছে একটু ধীর গতিতেই।

—বাবা, সমুদ্রের মধ্যে ওই দ্বীপ মতো গ্রামগুলি কোন দেশ? 

—ওখানে এক সময় ভারতের গুজরাট রাজ্যটি ছিল। প্রথমে ভাইরাসের সংক্রমণে গুজরাটের বড় বড় শহরগুলি জনশূন্য হয়, তারপর রাজ্যটির ৯০% নিচু অঞ্চল আরব সাগরে ডুবে যায়, এখন উঁচু জায়গাগুলিতে ২১৬ টি গ্রাম আছে। গ্রামগুলি খুবই গরিব, কৃষিকাজ তেমন হয় না, অন্য গ্রাম থেকে বেশির ভাগ খাবার আমদানি করতে হয়।

পিকাচু একে একে ভারতের অন্য রাজ্যগুলির উপর দিয়ে উড়ে গেল। ঈপ্সিতাও অনিরুদ্ধর কাছ থেকে অনেক গল্প শুনল।  কীভাবে রাজ্যগুলি ধীরে ধীরে জনশূন্য হয়ে পড়ল, রাষ্ট্রব্যবস্থা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। সমস্ত পৃথিবী জুড়ে স্বশাসিত গ্রামগুলি গড়ে উঠল।  বেশির ভাগ গ্রামই নব্য পৃথিবী গোষ্ঠীর দর্শন মেনে নিল, যে দর্শন অনুসারে মানুষ বাস্তুতন্ত্রের কেন্দ্রে নয়, শীর্ষেও নয়-—মানুষ একটা অংশ মাত্র। নব্য পৃথিবী গোষ্ঠীর গ্রামগুলিতে গড়ে ১০০ থেকে ১৫০ মানুষ বসবাস করে। গ্রামগুলিতে সাধারণ কিছু নিয়ম আছে,  যেমন একটির বেশি সন্তান নেওয়া যায় না,  একটির বেশি বাড়ি করা যায় না,  কোনো প্রাকৃতিক সম্পদকে ব্যবহার করতে হলে তার রিসাইকেলের দায়িত্ব নিতে হয় ব্যক্তি বা সংস্থাকে,  প্রতিটি গ্রামে ৯০% বাফার জোন থাকে যা প্রকৃতির জন্য ছেড়ে রাখতে হয়। বাফার জোনে কৃষি, শিল্প বা ঘরবাড়ি তৈরি করার নিয়ম নেই। এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে জিনিসপত্র, খাদ্যশস্য সরবরাহ করে রোবট।  অনিরুদ্ধরা 10G ইন্টারনেট কানেকশন নিয়ে এসেছে বছর দুই হল—ফলে ঘরে বসে পড়াশুনা, অফিসিয়াল কাজ করতে কোনো অসুবিধা হয় না। আর এখন একশো শতাংশ শক্তির উৎস আলো  আর বাতাস।  

—বাবা, তুমি বলেছিলে সমুদ্রের কাছাকাছি নিচু দেশগুলি বাঁচাতে গাছেদের সবুজ প্রাচীর দিয়েছিলে তোমরা । 

অনিরুদ্ধ একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়ে। তারপর ধীরে ধীরে বলে, আমরা হেরে গিয়েছি মা! আমরা গাছেদের প্রাচীর দেওয়া শুরু করেছিলাম, কিন্তু বেশিরভাগ মানুষকে আমরা আমাদের কথা বোঝাতে পারিনি। সকলে 14TH days fever-এ আক্রান্ত ছিল।  প্রতি ১৪ দিন পর তারা নিজেদেরকে নতুন নতুন কাজে ব্যস্ত রাখত। কোনো দীর্ঘস্থায়ী কঠিন কাজ করার মতো মানসিক ধৈর্য কারো ছিল না। আসলে মানুষ লুকানো এক ডিপ্রেসনের জালে বন্দি ছিল। তারা যেহেতু গভীরভাবে ভেবে কিছু করত না, তাই কোনো কাজ কিছুদিন করার পর খেই হারিয়ে অন্য কাজে ঢুকে পড়ত—আজ রক্তদান, কাল অনাথদের খাওয়ানো, পরশুদিন বন্যাত্রাণ, তারপর দিন কোনো কিছুর প্রতিবাদে রাজপথে মোমবাতি নিয়ে।  ফলে সবুজ প্রাচীর The Green Wall-এর মতো কঠিন ও দীর্ঘকালীন কাজে তারা আসবে কেন ? দোষ আমাদেরও ছিল, আমরা গুটিকয়েক যারা ছিলাম তারা নেতৃত্ব দিতে পারিনি। মানুষকে বোঝাতে পারিনি। আর সকলে একসাথে হেরে গিয়েছি। 

পিকাচুর অস্থিরতা দেখেই ঈপ্সিতা বুঝতে পারে বাবার মনকে অন্য দিকে নেওয়া জরুরি। না হলে এখনই বড় বিপদ হয়ে যাবে। 

—বাবা, আমি তোমার বাংলা দেখব। 

মুহূর্তে পিকাচু দুই বাংলার ঠিক মাঝখানে ভাসতে লাগল। বাবা আর মেয়ের চোখ নীচের অসীম জলরাশিতে আটকে গেল— কোথায় বাংলা? যেদিকে চোখ যায় শুধু জল আর জল…

নতুন প্রজন্মের বিশিষ্ট প্রকাশক অপু দে-র নিয়মিত কলাম

অপুর সংসার

পর্ব-৩

বসু পরিবার

দময়ন্তী বসু সিং। বুদ্ধদেব বসুর ছোটমেয়ে। বিকল্প নাম দিয়ে নতুন এক প্রকাশনার সৃষ্টি করলেন। প্রকাশ করলেন ভিন্ন স্বাদের একগুচ্ছ বই। 

সময়টা ১৯৭০। আশাপূর্ণা দেবীর বাড়ি হয়ে বাবা যেতেন নাকতলায় বুদ্ধদেব বসুর বাড়ি। সেখানেই বাবার সাথে আলাপ রুমিদির। দেখতে দেখতে দীর্ঘ ৪৮ বছর হয়ে গেল। রুমিদিকে বাবা দিদি বলে ডাকতেন, আমিও কেন যে দিদি বলতাম জানি না।

রুমিদির কথা এলেই বুদ্ধদেব বসুর কথা, প্রতিভা বসুর কথা ও আরো একজনের কথা এসে পড়ে— তিনি হলেন কার্তিকদা।

কার্তিকদার কথায় আগে আসি। বসু পরিবারের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক ওঁর ছিল না কিন্তু এই বসু পরিবারই ছিল তাঁর নিজের পরিবার। ১৪ বছর বয়স থেকে এই পরিবারের একজন সদস্য হয়ে ছিলেন। প্রতিভা বসুকে মা বলে ডাকতেন, দময়ন্তীদিকে ছোড়দি বলে। দে’জ পাবলিশিংয়ের দীর্ঘদিনের একজন একনিষ্ঠ কর্মী ছিলেন। শুধু বুদ্ধদেব বসু নয়, বহু লেখকের অনেক অজানা কথা শুনেছি কার্তিকদার কাছে। যেদিন প্রতিভা বসু মারা যান রুমিদি বলেছিলেন, “কার্তিক মায়ের মুখাগ্নি করবে”। কার্তিকদা মায়ের (প্রতিভা বসু) মুখাগ্নি করেছিলেন, সমস্ত নিয়ম পালন করেছিলেন। কার্তিকদাও চলে গেছেন ৭-৮ বছর হয়ে গেল। দু চাকায় দুনিয়া ঘোরেননি কিন্তু দু চাকায় সারা কলকাতা ঘুরতে দেখেছি। নাকতলা থেকে সাইকেলে করে আসতেন কলেজ স্ট্রিট। নেশা বলতে ছিল সারাদিনে দেড় প্যাকেট বিড়ি।

বাবা ও দময়ন্তীদির কাছে বুদ্ধদেব বসু প্রতিভা বসুর কথা শুনেছি। বুদ্ধদেব বসুর নতুন উপন্যাস ‘রুকমি’ দে’জ-এ ছাপার কাজ হচ্ছে। তখন হ্যান্ড কম্পোজ হত। লম্বা গ্যালি প্রুফ হত তখন। বাবার কাছে শোনা এই বইয়ের কোন‌ও একটা ফর্মা ৭ বার প্রুফ হয়েছিল। ৫ নং প্রুফের সময় বাবা নিজে নিয়ে গিয়েছিলেন। ওই প্রুফে তেমন কোনও ভুল ছিল না। একটা মাত্র শব্দ ছিল যাতে লাল দাগ ছিল। শব্দটা ব্লাউজ। এই শব্দে জ-এর নীচে একটা ডট হবে। কেন হবে সেই নিয়ে বাবার ক্লাস নিয়েছিলেন। ৬ নং প্রুফে কম্পোজিটার পাশে ফুলস্টপ বসিয়ে দিয়েছিল। তাই ৭ নং-এর বেলায় নতুন ফন্ট তৈরি করে বইটি ছাপা হয়।

এরকম কত সুখস্মৃতি জড়িয়ে আছে আমাদের।

৩০ নভেম্বর রুমিদির আয়োজনে যেতেই হত বুদ্ধদেব বসুর বাড়িতে। বুদ্ধদেব বসুর শতবর্ষ কীভাবে নিজে একা হাতে সামলেছিলেন, দেখেছিলাম। বইমেলায় বিকেলে বিকল্পের স্টলে যেতাম। রুমিদি বাড়ি থেকে বানিয়ে আনতেন নানা রকমের তেলেভাজা।

ভাবব কী করে যে তুমি নেই! স্মৃতি সততই সুখের।

বিগত দিনগুলি