দৈনিক কবিতা আশ্রম, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
আবহমান বাংলা ভাষা
দৈনিক
২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
Guernica (1937) by Pablo Picasso
অভিমন্যু মাহাত
বান্দা
জনম তো এভাবেই জন্মান্তেরর দিকে গড়ায়
একটি আয়ু জাগায় আরেকটি বিষাক্ত আয়ুকে
আমরা কেবল দৃশ্যান্তর দেখি, শুনি প্রতিধ্বনি—
গোপনে অদৃশ্য চুম্বন থাকে, অতি অতি সংক্ষিপ্ত
বান্দার পলাশতলা হোক বা আরণ্যক উঠোন
ফুল ফোটার শব্দ যেন পোয়াতি রূপে ভাবিকাল।
লাল সাইকেল পেরোয় ভানসিং পুজোর পাহাড়
ঢেলাকাঁটা বিঁধে গেলে ফেরারী গল্প কুঁকড়ে যায়
রাঢ় মৃত্তিকার প্রস্তাবে, দুপুরে প্রকৃত হনন
তোমার ছায়ায় লেপ্টে আছে নির্ঘাৎ ছলাকলা!
নিত্যানন্দ দত্ত
স্নেহগাছের ছায়া
দু’খানি শীর্ণ হাত আর শীর্ণতর দু’গাছা চুড়ির কুন্ঠিত মায়া
কতকাল ছড়িয়েছ প্রশস্ত উঠোনে
খিড়কি পুকুরের সবুজাভ জলে
মন্থর হাঁসের মতো ভেসে থাকতো তোমার স্পর্শদাগ
নধর পুঁইলতাটিকে এমন ছুঁয়েছ
যেন মৃত সন্তান ফিরেছে আবার
অপূরিত আদরের দাবি নিয়ে
এই তো সেদিনও দুমুঠো ভাত বেড়ে দিতে
লাল মেঝেয় আসন বিছিয়ে…
সোনামুগ ডালের রোদ্দুরে ঝকমক করত
সে-সব সামান্য আয়োজন
প্রাচীরের গায়ে মহানিমগাছ হয়ে খিদের সংসারে
সারাটা দুপুর স্নেহফুল ঝরাতে নিরন্তর…
আজ যদি মায়ার শিকড় ছিঁড়ে সম্পূর্ণ উড়ে যাও
কার ছায়ায় দুদণ্ড জিরোবো বলো…
মতিন রায়হান
আমি এক দ্রাবিড় পুরুষ
আমি এক দুঃসাহসী দেশপুত্র, দ্রাবিড় পুরুষ
এ দেশ আমার
কোমল মাটির ঘ্রাণ লেগে আছে নাকের ডগায়
ঘাসের গোপন প্রেম যদি পাই জেগে উঠি
মৃত লখিন্দর
বেহুলার ঠোঁট বেয়ে হাসির ঝিলিক তুলে উড়ে যাই
আসমুদ্রহিমাচল ঠিকানা আমার
আদি অধিবাস এখানেই, আদিম শ্যামল জাতি
পিতৃ-পুরুষেরা সব এখানেই করেছে নোঙর
কতকাল কেটে গেছে কবেকার কথা কেবা জানে
বুড়োবট নদীঘাট পায়েচলাপথ দেখেছে ওসব
রাজকুমারীর সেই রূপকথাকাল-এখানে কেটেছে কত
শত শত জীবনের কাল, পুরাতত্ত্বে রয়েছে প্রমাণ
শ্যামল সবুজ গ্রাম শ্যামানদী ঘাসফুল হিরণ্যসময়
কেটে গেছে দুরন্ত কৈশোর কালের শিশুর-এখানেই
এই মাটি ছুঁয়ে ছুঁয়ে দুধের শৈশব। কার সে নির্দেশে হই
উলঙ্গ উদ্বাস্তু আজ, কোন কালো ফতোয়ায়?
কোন কালোষাঁড় ধুলোধ্বনি তুলে উড়ে যায় চেতন-আকাশ?
আমি এক দ্রাবিড় পুরুষ
দ্রাবিড়ের বীর্য বয়ে যাই শোণিতে-শিরায়
দ্রাবিড়ার প্রিয় ঠোঁট স্তুতি গায় আমার সেবায়
আমি নাকি সেবাদাস দারুণ পুরুষ
আঙুলে মুঠোয় নাচে পৃথিবীর রোদ
আমি নাকি পৃথিবীর আদিবাসী চাষা
অলিগলি চাষবাস সব জানাশোনা
দ্রাবিড় রমণী খুশি, খুশির তুফান তার
এই বঙ্গ সমতটে গেয়ে যায় যুগ যুগ জীবনের গান।
জয়দেব বাউরী
আলোর দোতারা
পরিস্থিতি বুঝে নিয়ে, দিন যদি চলে যায় পথ করে করে,
ক্রমশ থিতিয়ে এসে, স্থির যদি হতে চায় নিস্তরঙ্গ জল ;
প্রকৃতির পছন্দ না? এমন নিপাট কোনো ধারণা-ফসল?
তাই ওই খরা এল! চেতনা হারালো ক্ষেত দু’বছর ধরে!
পাড়াটি উজাড় করে পুব খাটতে চলে সব ঘর-দোর ফেলে।
তুমি কী করবে এবার? গাঁয়ে ঘরে কাজ নেই।খাল বিল মৃত।
দু’বেলা পেটের ভাত জোটাবে কীভাবে ? তাই ভেবে কেউ-ই তো
কিনারা পেল না। খেটে খেতে সক্ষম শরীর, সাজে দলে দলে
ছায়া ফেলে, রোদ ফেলে, পোষ্য ফেলে ফেলে। তাই, তুমিও দিদির
ঘর, ছেড়ে যাচ্ছ বাকী মায়াটুকু। অনিশ্চিত অন্ধকার ঘিরে
ধরে ফের, শূন্য করে তুলে দিল; এত শূন্য, বাতাসেও তির-
তির কাঁপো! তোমার যে পুব নেই। পশ্চিমও তো নেই!কোন তীরে
উঠে, কোন অলৌকিক হাওয়ায় দাঁড়াবে গিয়ে! কীসে দেবে ভর!
দক্ষিণ বিমূঢ করে। শুধু প্রশ্ন উড়ে যায়। স্তব্ধ চরাচর ।
নতুন প্রজন্মের বিশিষ্ট প্রকাশক অপু দে-র নিয়মিত কলাম
অপুর সংসার
পর্ব-৪
ঋতুদা
গলির শেষ মাথায় বাঁকের মুখে গোল মতন বাড়ি। সেই বাড়ির সামনে সাতসকালেই কয়েকশো লোকের জমায়েত। সকালেই খবরটা খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। আমি যখন বাড়িটার সামনে পৌঁছই তখনও বাইরে এত লোক জমায়েত হয়নি। অনিন্দ্য (চট্টোপাধ্যায়) দা বাড়ির সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে। আমাকে দেখতে পেয়ে ঘরে ডেকে নেন।
“অপু, ওপরের ঘরে গিয়ে দেখে এসো।” ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠছি। প্রথম এই বাড়িতে আসি ২০০৭ সালে। তারপরে কতবার এসেছি। সেই মুহূর্ত সেই দিনগুলোর কথা খুব মনে পড়ছে। ঘরে ঢুকতেই ভীষণ ঠান্ডা লাগলো। একটা সাধারণ মাপের শোয়ার ঘরে দুটো এসি চলছে। বেশিক্ষণ থাকতে পারিনি। ঠান্ডা লাগছিল বলে, না কি যে নিথর শরীরটা বিছানায় শুয়ে আছে তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকতে পারছিলাম না বলে? আমি জানি না কেন ওই ঘর থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এলাম।
ঋতুপর্ণ ঘোষ। গায়ে কালো টি-শার্ট। মাথায় কোঁকড়ানো ঝাঁকড়া চুল। দে’জ পাবলিশিং-এর কাউন্টারে দাঁড়িয়ে বই নেওয়ার অপেক্ষায়। আমি তখন ক্লাস এইট, নয়তো নাইন। সময় ১৯৯১/৯২। আমার ঋতুপর্ণকে প্রথম দেখা। দে’জ-এর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আরও আগে থেকে। আমার কাকু (সুভাষ দে)র সঙ্গেই ছিল যোগাযোগ। যত দিন গেছে সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে। কাউন্টারের বাইরে থেকে ‘বাবুদা, (কাকুকে এই নামেই সকলে চেনে) বই খুঁজতে ভেতরে যাচ্ছি’ বলে ঢুকে পড়তেন। কখনও টুলের ওপর উঠে, কখনও কাঠের সিঁড়ি বইয়ের তাকে লাগিয়ে নিজের পছন্দের বইগুলো সব একজায়গায় জড়ো করে রাখতেন। সেই সময়ে সম্বোধন ‘আপনি’ থেকে কখন যে পাল্টে ‘তুমি’ হয়ে গিয়েছিল জানি না।
আবদার কিংবা দাবি দু’তরফেই গড়ে উঠেছিল। যে-কোনও সময় ফোন করে জিজ্ঞাসা করতেন “অপু, এই বইগুলো কি আছে?” ২০/২৫টা বইয়ের নাম শুনিয়ে দিতেন। কখনও তাঁর একনিষ্ঠ সেবক বিশুকে পাঠাতেন, নয়তো কখনও বলতেন, “অপু, বইগুলো আমার বাড়িতে পাঠিয়ে দে”।
২
মনে পড়ে এক রবিবার সকালে ফোন করে বলেছিলেন, “অপু, আজ তোর দোকান খোলা?”
“রবিবার তো ছুটি থাকে, আপনি কি আসবেন?”
উত্তরে বলেছিলেন, “কিছু বই নিতে হবে, তুই দোকান খোল, আমি আসছি।”
তিনি তাঁর সেই পুরনো পদ্ধতিতে বই বাছাই করা শুরু করে দিলেন। দীর্ঘ সময় নিয়ে পুরো দোকানটাই ঘেঁটে ফেললেন।
বাছাই পর্ব শেষ হতেই আর এক বিস্ময়কর আবদার, “তোর বই সংগ্রহ দেখাবি চল”। সেই প্রথম আমার বাড়িতে আপনি এসেছিলেন। কাঠের আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে ছিলেন বইগুলোর দিকে। আপনার চোখে তখন বই দেখার নেশা, কণ্ঠে ছিল উচ্ছ্বাসের প্রকাশ, “সব বইগুলো নামিয়ে দে”। অত বই কী করে নামাব, কোথায় রাখব, আমি বুঝে উঠতে পারছিলাম না। হয়তো মনের অনুচ্চারিত কথা আপনি বুঝতে পেরেছিলেন, তাই “সব” শব্দটা বাদ দিয়ে বলেছিলেন, “কলকাতা বিষয়ে আর স্মৃতিকথার যা বই আছে বের করে নিয়ে আয়।”
মেঝেতেই বসে পড়েছিলেন আর আমিও “সব” না বের করে ৪০-৪৫ খানা বই বের করে দিয়েছিলাম। তার মধ্যে থেকে আপনি ৩৪-৩৫টা মতন বই বাছাই করেছিলেন, আর বলেছিলেন, “এগুলো ফটোকপি করে দিস।”
এই ব্যাপারে আমি খুব নিষ্ঠুর। পুরনো বইগুলো ফটোকপি করতে গিয়ে যদি নষ্ট হয়ে যায় সেই ভয়ে করিনি। ২-৩ খানা করার পরে আর করিনি। আর আপনি বলেছেন বারবার, “ওই বইগুলো দিলি না তো!”
আমি অন্যায় করেছি।
ঋতুদার পুরনো বইয়ের প্রতি ভীষণ আগ্রহ ছিল। এক জায়গা থেকে কয়েকশো দুষ্প্রাপ্য বই ঋতুদাকে সংগ্রহ করে দিয়েছিলাম। ঋতুদা শুধু পুরনো বই নয়, যে-কোনও পছন্দের বিষয় পড়ে ফেলতেন। বাড়িতে সিনেমার লাইব্রেরিটিও ছিল অদ্ভুত। একই সিনেমার বেশ কয়েকটি কপি রাখতেন। সেগুলো সাজাতেন পরিচালক- অভিনেতা-অভিনেত্রী মূলত এই তিন বিষয় ধরে। বলতেন, “আজ সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা দেখতে ইচ্ছে করছে, তখন হয়তো ‘অপুর সংসার’ দেখছি। দু’দিন পরে মনে হল সৌমিত্রের অভিনয় দেখব, তখন আবার সৌমিত্রের তাক থেকে ‘অপুর সংসার’ ছবিটা বের করি।”
আপনি ছিলেন বড্ড খামখেয়ালি।

৩
আপনি একদিন উত্তেজিত হয়ে ফোন করে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুই ‘মায়ামৃদঙ্গ’ পড়েছিস?”
“হ্যাঁ।”
“কেমন লেগেছে তোর?” “সিরাজ জেঠুর যে লেখাগুলো পড়েছি তার মধ্যে এই লেখাটি আমার ভীষণ ভাল লাগে”
“তুই আমায় আজই বইটা পাঠিয়ে দে।”
দিন দুই পরে ফোন “অপু, তোর সিরাজ জেঠুকে বলে দিস এই লেখাটা আমি সিনেমা করব।”
তখনই ফোন করে জানিয়ে দিই। যেতে বলেন ঋতুদাকে নিয়ে। শেষ পর্যন্ত ঋতুদাকে নিয়ে সিরাজ জেঠুর বাড়ি যাওয়া হয়নি। সিরাজ জেঠু মারা গেলেন। টিভি-তে রাজাদা (রাজা সেন) এক সাক্ষাৎকারে জানালেন কর্নেল ও মায়ামৃদঙ্গ সিনেমা করবেন। ঋতুদার আবার ফোন, “অপু, রাজা নাকি এটা সিনেমা বানাবে? ওকে বল কর্নেল করতে। এটা তুই রাজার থেকে এনে আমায় দে। আমি জানি না তুই কীভাবে আনবি। ওঁর ছেলে অভিজিৎ সিরাজকে বলে আমায় এনে দে।”
বেশ কিছুদিন পর অমিতাভদা (সিরাজ জেঠুর আর এক ছেলে) জানালেন, “ঋতুদাকে বলে দিও রাজাদা ছবিটা করবে না”। ফেরত পাওয়ায় ভীষণ খুশি হলেন। মাস পাঁচ-ছয়ের মধ্যে ঋতুদা চলে গেলেন। ঋতুদার ইচ্ছে পূরণ হল না, আমাদের আশা পূরণ হল না।
কবে থেকে বলে আসছি, “ঋতুদা, এবার ‘ফার্স্ট পার্সন’ প্রথম খণ্ড প্রকাশ করি।”
“হ্যাঁ, তুই করবি। আর একটু লেখাটা হোক।”
কিছুতেই আর বইয়ের কাজটা এগোয় না। একদিন হঠাৎ বাড়িতে ডেকে নিয়ে, “অপু, তুই আমার সব বই করিস। আমার যা লেখা আছে সবটাই তোকে দিয়ে দেব। তুই চিত্রনাট্যগুলোও করিস।” বলেছিলাম, “যা লিখেছেন সবটাই আমাকে দিয়ে দিন, আমি ধীরে ধীরে করে ফেলি।” “নীলাকে ওই কারণেই ডেকেছি। তুই চিনিস তো নীলাকে (বন্দ্যোপাধ্যায়)?”
“হ্যাঁ চিনি।”
“ও-ই আমার লেখাগুলো সাজিয়ে দেবে একে একে।”
নীলা ‘ফার্স্ট পার্সন’ খুব যত্ন করে সম্পাদনার কাজ করেছিল। খারাপ লাগে, কষ্ট হয়, আপনার হাতে তুলে দিতে পারলাম না বলে। ঋতুদা, নীলা ‘ফার্স্ট পার্সন’-এর পরে আর একটি কাজ করছে, আপনার অগ্রন্থিত লেখাগুলোর সংকলন। খুব শীঘ্রই আমরা তা প্রকাশ করতে চলেছি। এর পরে আপনার চিত্রনাট্যগুলো প্রকাশ করব।

৪
দীর্ঘ কুড়ি বছর। সেই ১৯৯৩ সাল থেকে ২০১৩, এইরকম কত টুকরো টুকরো স্মৃতিসমষ্টি।
নীলা একবার বলেছিল আপনাকে সত্যজিতের নায়িকাদের কথা। আড়াইখানা সিনেমা করে সত্যজিতের নায়িকা থেকে গেলেন মাধবী। আপনি বুঝিয়েছিলেন সেই আড়াইখানা ছবিতে মাধবীদির অবদান। সেই নিয়ে কত কথা আপনার সঙ্গে। চিত্রাঙ্গদার জন্যে আপনার অভিনয় শিক্ষা, আপনার অভিনয় ভাবনা নিয়ে কথোপকথনে দীর্ঘ সময় কেটে গিয়েছিল।
সাতসকালে আমাদের অনুষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দেখে ফোন করেছিলেন। তখন বইমেলা চলছিল মিলন মেলায়। তিন রকমের নাটকের বইয়ের প্রকাশ অনুষ্ঠান ছিল। “নাটক : প্রাচীন, প্রবীণ ও নবীন” বক্তা তালিকা দেখে অনুষ্ঠানে আসার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। এই অনুষ্ঠানে বক্তা ছিলেন শঙ্খ ঘোষ, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়, কৌশিক সেন ও সুমন মুখোপাধ্যায়। বই তিনটি ছিল শিশিরকুমার দাস অনূদিত গ্রীক নাটক, বুদ্ধদেব বসুর নাটক সমগ্র, মনোজ মিত্র ও ময়ূরী মিত্র সম্পাদিত সুন্দর নাট্যসম্ভার।
আসার আগে ফোনে অদ্ভুত একটা কথা বলেছিলেন, “তোর অনুষ্ঠানে আমায় পেছনের গেট দিয়ে ঢুকিয়ে দিস। তোর শঙ্খ জেঠু, অলোক জেঠুকে দেখতে যত না লোকে ভিড় করবে, আমায় দেখতে লোকের ভিড় উপচে পড়বে।”
আমরা এখনও সভ্য হইনি, ঋতুদা। তাই তো মৃত্যুর পরেও নোটবুক পেন্সিল নিয়ে ছুটে যাই প্রিয়জনের কাছে (সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মারা যাওয়ার পরে কেওড়াতলা মহাশ্মশানে নবনীতা দেব সেনকে প্রশ্ন করেন একজন— “আপনার কেমন অনুভূতি?”)। আপনি যখন ঠান্ডা ঘরে বিছানায় শুয়ে, বাইরে তখন কয়েক হাজার মানুষ। তাঁদের চোখেমুখে আপনার মৃত্যুর কারণে কোনও শোক নেই। তাঁদের চোখ খুঁজে বেড়াচ্ছে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের, যাঁরা আপনার কাছে আসছেন। যখন প্রসেনজিৎ, জিৎ গাড়ি থেকে নামলেন বাইরে তখন কয়েকশো লোকের একত্রিত সিটি। এক সময় প্রসেনজিৎ ঘরের বাইরে বেরিয়ে অনুরোধ করেন এমন আচরণ না করার জন্যে। সিটির আওয়াজে মনে হয় না বুম্বাদার কথা তাঁদের কানে পৌঁছেছে। আমরা এই সমাজের সভ্য মানুষ, ঋতুদা। তুমি এই মানুষদের চিরকাল ক্ষমা করে এসেছ।
আপনার পরিচালিত জীবনস্মৃতি-তে টেলিগ্রাম হাতে পোস্টমাস্টার সাইকেল চালিয়ে খোয়াইয়ের ধার দিয়ে ছুটে চলেছিল নোবেল পুরস্কারের খবর পৌঁছতে। আর সেই দিন, একনাগাড়ে টিপ টিপ করে বৃষ্টি হয়ে চলেছে। সমস্ত মিডিয়াতে টিভির পর্দায় আপনাকে দেখাচ্ছে, আর বলছে, আপনি নেই। মৃত্যুর বেশ কয়েক বছর পরেও মানতে পারি না আপনি নেই।
ঋতুদা, ভাবতে ভাল লাগে আপনার মতো মানুষকে চিনি, জানি। কষ্ট হয় যখন কাউকে বলি আপনাকে চিনতাম-জানতাম। অতীত ক্রিয়াপদ আপনার পাশে মানতে পারি না।