দৈনিক কবিতা আশ্রম, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
আবহমান বাংলা ভাষা
দৈনিক
২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
আলোকচিত্র: বন্যা লোহার
বন্যা লোহার
নৈবেদ্য
অভিমানী পা-গুলি স্থির ।
অবসন্ন পথসমূহ প্রশস্ত হতে হতে
তপ্তকাঞ্চন বর্ণ হতে হতে
চলে গেছে বিলম্বিত সন্ধ্যার দিকে
আমি ক্রমশ উন্মাদ ,
তীব্র ঈশারা না বুঝে
ঘাস ফুলে ফুলে ছড়িয়ে দিয়েছি
দীর্ঘ প্রলাপের দলিল
চপল আকাশ অবনত চোখে ঢাকা ।
নেবে না? তুমি নেবে না
আমার বিমুঢ় বসে থাকা …
উমা মণ্ডল
শূন্য থেকে মহাশূন্যে
হাতে ধরে রাখা ভাদ্র মাসের সংক্রান্তি…
অকস্মাৎ উঠে বসেআগুনের ইচ্ছাগুলি ।
তাপ লাগে রোমকূপে; জ্বলে যায় উৎসগুলি।
পোড়া মাটি জল নেই; ফিরে যায় বৌদ্ধ ভিক্ষুকের দল ।
চোখ থেকে জল পড়ে চণ্ডালিকার;
অশুভ মেঘে ছেয়ে আকাশের গর্ভনীড়।
পড়ে আছে শ্মশানের আঁচ, আজ রান্না হয়নি।
মর্গ থেকে তুলে আনা মৃতদেহ অপেক্ষায় ।
বাসি মুখ, সেই জলহীন চোখ শূন্য খোঁজে।
অন্তরীক্ষের দেবতা হেসে ওঠে; তবু গঙ্গা পিন্ড চায় …
রবিকর আর কত তাপ দেবে… শুষ্ক খালবিল কেঁদে যায়।
কেঁদে যায় চণ্ডালিকা।
গৃহস্থের অভিশাপ লেগেছে,
এখন সারি সারি মৃতদেহ বুকে বসে আছে মাতা।
আহ্নিক গতিতে থমকে আছে দিনকাল। রুদ্র তাপ।
ধ্যান ভাঙে ঋষিকবি। শান্তি লিখে দেয় …
চন্ডালিকার তখন তৃতীয় নয়ন; ঘণ্টা বেজে ওঠে।
মাধুকরী শেষ হল এইবার ।
ভেসে যায় গঙ্গাবক্ষে এয়োতির লাল পলা
শূন্য থেকে মহাশূন্যে…
তমোঘ্ন মুখোপাধ্যায়
শস্ত্র
সুযোগ দাও, কতল করি মূর্খ জিজীবিষা।
আলোর ছুরি অতীত কাটে এমন প্রতিশোধে,
ছিটকে দিয়ে রক্ত দেহ লুকায় অমানিশা।
শস্ত্র হাতে শরীর যাবে কোথায় কতদূর?
রিপুর খুঁটে বন্দি থেকে মরচে জমে বোধে।
সঞ্চালিকা, হে ঈশ্বরী, গভীরে দাও সুর।
আমার বীজে জন্মাবে যে, ব্রহ্ম তার স্বর।
স্তব্ধতাকে পূজ্য করি কথার প্রতিরোধে।
অন্ধ জানে চোখের মায়া আত্মনির্ভর;
অন্ধতা সে শান্ত করে বিকল্প প্রবোধে।
অন্তিমে যে আয়ুধ ছুঁড়ে ধ্বংস হবে প্রাণ,
তার আগুনে দহন করি বিলাস, অভিমান।
আলোকচিত্র: বন্যা লোহার
মেহবুব গায়েন
বিকেল ক্যাকটাস
মাহমুদ ওঠো
ক্যাকটাস দোতালায় সমরকন্দ পাখি এসেছে,
ঝর্নার ভ্রমন জলে তখন গ্রহনের সূর্য হারায় অন্ধকার,
বাঁশের ধার দেওয়া শরীর ঘোলা আলো মাখে তরুণ
তখনও আমাকে আড়াল
গোলাপ রঙে মালা গেঁথে লোহিত ঘরনায় পরাও সুরমা,
সে সমস্ত গজল ভেঙে তুলে আনে অনুবাদ প্রেম……
তড়িৎ রায়চৌধুরী
সিদ্ধান্ত
তবে এই সিদ্ধান্ত হয়ে যাক
মানুষের জন্য মানুষ আর কাঁদবে না কখনো
যে যার নিজস্ব কান্না পলিথিন প্যাকে
পুরে অপেক্ষা করবে—
আর সিটি বাজলেই পৌঁছে দেবে জঞ্জালের গাড়িতে
রিসাইক্লিং ফ্যাক্টরিতে তৈরী হবে কাব্য-সঙ্গীত-ভাস্কর্য
বাই প্রোডাক্টে আসবে মানি, পাউন্ড, ডলার।
বিটু দাস
যেমন-তেমন
তুমিও নেহাত হাসতে পারো, খোলা মাথায় ছক্কা রোদ
সুখী দেশে সবাই রাজা, নদীর মুঠোয় সমুদ্র তট।
খাঁচাগুলো আদর প্রেমী, পাখি তবু আকাশ চায়,
যন্ত্র আজ তুমি-আমি, বৃষ্টি নাচে সামান্যতায়।
যখন সহজ রাস্তা ভুলে পথিক হারায় চমক আলো
তার মুখেতে দরদ ভরা, তার হাতেতে সোহাগ জ্বালো
সময়গুলো তো রাখাল ঠাকুর, দু’পাশেতে তুমি-আমি
শব্দ গুলো যেমন-তেমন, সুরগুলো তো কেউ ভোলেনি!
সারাজাত সৌম
যাদু
আমাকে গোপন করো—
জানি, এটা সহজ
তোমার সৌন্দর্যের মতো
এক লহমায়—
যেন একটি খুন!
আমাকে যাদু দেখাও—
এই আমার চোখ
এই আমার তুমি—
চোরও সে
মস্ত এক যাদুকর!
কোথায় তোমার লুকানো হাত—
আমাকে ছুঁতে দাও।
এই শেষবারের মতো
যদি আমি মারা যাই—
আমাকে যাদুই ভেবো।
নতুন প্রজন্মের বিশিষ্ট প্রকাশক অপু দে-র নিয়মিত কলাম
অপুর সংসার
পর্ব-৫
নীরেন জেঠু
ছ’ফুট লম্বা ছিপছিপে। পরনে সাদা ধুতি পাঞ্জাবি। দীর্ঘকায় এই মানুষটিকে ২০০০ সালে ডিসেম্বর মাসে পরলোকে পাঠানো হয়েছিল, প্রকাশকের তরফ থেকে! কত বছর আগের সেই ঘটনা, এখনও উজ্জ্বল সেই স্মৃতি। ৬ ডিসেম্বর মসজিদ না মন্দির, সেই বীভৎস বিভেদ ভুলে গিয়ে ঐক্যের বন্ধনে বাঁধতে আশ্রয় নেওয়া হয়েছিল কবিতার কাছে। রবীন্দ্রসদন চত্বরে শুরু হয়েছিল তিনদিন ব্যাপী কবিতা উৎসব। কবিতা পাঠ, কবিতা নিয়ে আলোচনা, নতুন কবিতার বইয়ের প্রকাশ। এই সবের মাঝে একটি বইয়ের অস্থায়ী বিপণি থাকত, যার দায়িত্বে থাকতাম আমি। খুব সম্ভব ২০০০ সালে প্রকাশিত হয় নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ‘কবিতা সমগ্র’ চতুর্থ খণ্ড। মঞ্চে তখন কবিতা উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। আর কিছুক্ষণ পরেই শুরু হবে নতুন কবিতা বইয়ের প্রকাশ অনুষ্ঠান। নীরেন জেঠুরও ‘কবিতা সমগ্র’ চতুর্থ খণ্ড ওই মঞ্চেই প্রকাশিত হল। উদ্বোধনের আগে যতদূর মনে পড়ে ২০ কপি বই বাদল জেঠু স্টলে দিয়ে গিয়েছিলেন। এক কপি বিক্রিও করে ফেলেছিলাম। অনুষ্ঠানের পরে নীরেন জেঠু স্টলে এসেছিলেন। নিজের সদ্য প্রকাশিত বইটি হাতে নিয়ে দেখছিলেন। হঠাৎ পিঠের ওপর হাতটা রেখে বললেন, “বাবা অপু, দেখেছ ওরা না আমায় মেরে ফেলেছে।” খুব চমকে উঠেছিলাম কথাটা শুনে।

“কী হয়েছে?”
“এই দেখো।”
দেখলাম, একটা মজার কাণ্ড ঘটেছে। লেখক পরিচিতিতে তাঁর ছবির নীচে ভুলক্রমে সুকুমার সেনের পরিচিতি ছাপা হয়েছে। তাই ওখানে জন্ম মৃত্যু দুই-ই ছিল।
খুব দৌড়ঝাঁপ করে বাদল জেঠু বিক্রি-হওয়া এক কপি বইয়ের মালিককে খুঁজে বের করেছিলেন। আর গুনে গুনে ২০ কপি বই ফেরত নিয়ে গিয়েছিলেন।
নীরেন জেঠুর সঙ্গে দে’জ-এর সম্পর্ক ৭০ দশকের মাঝামাঝি। নাট্য সমালোচক প্রবোধবন্ধু অধিকারী আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন বাবার সঙ্গে। মনে হয় “পাগলা ঘণ্টি” দে’জ পাবলিশিং-এ নীরেন জেঠুর প্রথম বই। তারপরে “কবিতার কী কেন”, “শ্রেষ্ঠ কবিতা”, একের পর এক বইয়ের প্রকাশ। যখন ছোট ছিলাম পয়লা বৈশাখে বাবার গায়ে গায়ে ঘেঁষে ঘেঁষে থাকতাম। অনেক লেখক কবি আসতেন। নীরেন জেঠুকে ঠিক চিনতাম না। চিনতাম অন্যভাবে অন্যরকম স্টাইলে সিগারেট খেতেন বলে। বাবাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, “ওই মুঠো করে যিনি সিগারেট খান উনি কে?” চিনেছিলাম তারপরে, তিনি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। আমি যখন প্রকাশনায় এলাম তখন বাবার নীরেনদা আমার জেঠু হয়ে গেলেন। আর জেঠুর কাছে একটা অধিকার, একটা দাবির সম্পর্ক তৈরি হল। গোয়েন্দা ভাদুড়ি খণ্ডে খণ্ডে প্রকাশের পরে লিখতে শুরু করেছিলেন স্মৃতিকথা-র দ্বিতীয় পর্ব। অখণ্ড সংস্করণ প্রকাশের সময় শুনেছিলাম তাঁর তৃতীয় পর্বের লেখার বিষয়ের কথাগুলো। লেখা হয়ে উঠল না। কথাগুলো রয়ে গেল।