আবহমান বাংলা ভাষা

দৈনিক

২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

আলোকচিত্র: বন্যা লোহার

সমরেশ মুখোপাধ্যায়

আমরা হাঁটছি

কত দিন ধরে আমরা হেঁটে চলেছি

 

আমাদের ঘাম দিয়ে

রক্ত দিয়ে

       মাংস দিয়ে বানানো

 

এই মায়া কাননে

                   সুরক্ষিত দূত সভায়

নীরব হয়ে রয়েছে সকলে

যারা চিৎকার করছে

তারা কেউ নয়

অসহায় ভীতু হেই করলেই

গর্তে লুকিয়ে পড়া

কিছু সমস্যা…

 

যারা বহু দিন ধরে

শুধু চিৎকারই করে যাচ্ছে

৫৬ ইঞ্চি ফুঁড়ে উদ্ধত গর্ব ফুঁড়ে

আত্মনির্ভরশীল ভারতবর্ষ ফুঁড়ে

বারংবার যা মিলিয়ে যাচ্ছে

                                  আকাশে…

 

আর আমরা হাঁটছি

 

ট্রেকারে ট্রাকটারে

ঢালাই মেশিনের গর্তে

কখনও ডাম্পারের ধাক্কায়

কখনও মালগাড়ির

কু ঝিক ঝিক শব্দে

 

আমরা ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছি রোজ….

 

আমাদের রুটি

আহা আমাদের ফেলে যাওয়া

স্বপ্নের পৃথিবী

পড়ে থাকল দূর দেশের প্রতীক্ষায়…

 

আর আমাদের অনেক কষ্টে জোগাড়

করা পোশাক, খুব সস্তায় কেনা

চপ্পল

 

পড়ে থাকলো…

শতাব্দীর পর শতাব্দী আমরা

এইভাবে ফের হাঁটব বলে…

 

দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকল গাছ

মাইলের পর মাইল

আমাদেরই শোকে পাথর হয়ে যাওয়া

                                          রাস্তা…

বছরের পর বছর

আমাদেরই ভোট পেয়ে জিতে যাওয়া

চুনাও…

 

আর আমাদের অভিশাপে

 

রক্ত হয়ে যাওয়া নদী

 

ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছে

তোমাদের বিলাস তরীর দিকে…

 

কুমারেশ তেওয়ারী

আলোর মড়াই

সুন্দর গাছের ডালে ফুটে থাকে ফুলের বাহার

সাজি ভরে ফুল তুলি, নিবেদন বেদিতে সাজাই

সারাদিন লগ্ন থাকি মগ্ন ধ্যানে সপ্ততলে যাই

দেখি কোথা পাল্কি চলে, পাল্কি বয় ছয়টা কাহার

পাল্কির ভেতরে বাস, গুণাত্মক পরকীয় মন

মিলন সে কার সঙ্গে, দেহভরা চন্দ্রকলা নড়ে

গৃহবন্দি বাস্তুসাপ নিজ বিষ ধর্ম মেনে মরে

নচিকেতা খুঁজে পায় পরমের অরূপ রতন

কখনও কখনও ঘটে ফুলতত্ত্বে বজ্রকীট বাস

দেবতা অস্থির হয়, শ্বাস বেয়ে বিষ প্রাণায়াম

ভাঙা রাস মঞ্চ ঘিরে পড়ে থাকে নীল ঘনশ্যাম 

ভুল মেঘে ঢেকে যায় হৃদব্রহ্ম চেতন আকাশ

সুন্দর গাছের কাছে আরবার তড়িঘড়ি যাই

অবিকল দেখি সেই পূর্বাপর আলোর মড়াই

শেলী সেনগুপ্তা

অন্ধকার পান

এই সন্ধ্যায়,

চলো চুমুকে পান করি

ঘোর অন্ধকার

বোন চায়নার গ্লাসে,

তুমি নিতে পারো সোডা ও আইসকিউব

আমার ‘র’ পছন্দ,

এভাবেই কেটে যাক 

চোখের গাম্ভীর্যে নির্ঘুম রাত,

 

চলো

ফিরিয়ে আনি বেঁচে থাকার ঘর পালানো ইচ্ছেকে,

আধশোয়া চাঁদটাকেও

টেনে নাও বাহুতে,

তুমি তো আছো 

আমার ওলান ছুঁয়ে 

চাঁদেরও ঠাঁই হবে পৃথিবীসম বিশাল বক্ষে,

বিমূর্ত খোলস বদলানো মানুষ জানে না

সম্পর্কে সাবেক বলে কিছু নেই,

গ্লাসঠোকা সান্ধ্য-আসর শেষে

ফিরিয়ে আনবো ঝকঝকে দিন,

চলো

অন্ধকার পান করি গ্লাসে

আমার পছন্দ ‘র’…

 

সপ্তর্ষি বণিক

সম্পর্ক

শরীরের সমস্ত বাঁধনগুলো হালকা হয়ে যাচ্ছে

গায়ে জড়িয়ে নিচ্ছি বাঘছাল

 

সদ্য মৃত দাঁড়কাক ও মৃত সম্পর্ক 

পরিবেশ চিনিয়ে দিচ্ছে

 

জারজ হচ্ছে সম্পর্ক

ভালোবাসগুলো ক্রমশ হাতি ও মাহুত

 

তোমার আমার সম্পর্কের স্রোত চিনে নিচ্ছে

 

একাকী নদী বয়ে চলছে

পূর্ণাঙ্গ স্রোতের অপেক্ষায়…

 

নতুন প্রজন্মের বিশিষ্ট প্রকাশক অপু দে-র নিয়মিত কলাম

অপুর সংসার

পর্ব-৬

নবনীতা দেব সেন

“মোস্তাক, দেখো কেমন ভুলভাল মেসেজ আসছে!”

“কেন, কী মেসেজ এল?”

একাধিক মেসেজ আর তাদের একটাই জিজ্ঞাসা— “নবনীতা দেব সেন কি মারা গেছেন?” এই এক জ্বালার সোশ্যাল মিডিয়া হয়েছে, মাঝে মাঝেই এত ভুল খবর রটিয়ে দেওয়া হয়! আর আমাকে এমন অপ্রীতিকর প্রশ্নের মুখোমুখি পড়তে হয় যখন-তখন।

৭ নভেম্বর ২০১৮। হোয়াটসঅ্যাপে  শ্রাবস্তীদির ছবিটা ফুটে উঠেছে। ধরতেই শ্রাবস্তীদির কণ্ঠে, “মা একটু কথা বলবে, ধরো।”

“অপু, আমি আমেরিকায়। ডাক্তার দেখাতে এসেছি। আজ ডাক্তার বলল আমার বড় অসুখ হয়েছে। তুই কোথায়?”

“আমি তো এখন ঢাকায় আছি। কিন্তু আপনি আবার কী বাঁধালেন?”

“ডাক্তার বলল এটা নাকি থার্ড স্টেজ, আমার ক্যানসার হয়েছে, আমি কিন্তু কিছু বুঝতে পারছি না কী হয়েছে।”

“আপনার কিছুই হয়নি, দেখছেন তো অজয় জেঠুকে (অজয় গুপ্ত), কর্কট-এর সঙ্গে সহবাস করে লিখে ফেললেন একটা আস্ত বই ‘কর্কটসহবাস’।”

“আমি কলকাতায় ফিরলে তুই এই বইটা আর একবার আমায় এনে দিস। আমার বইটা কে যেন নিয়ে গেছে। আমি শরীর নিয়ে অত ভাবছি না। আমার বইগুলো সব করে ফেলবি তো আমি চলে যাওয়ার আগে?”

“আপনি ফিরে আসুন আগে।” এর বেশি আর কিছু বলতে পারিনি।

আপনি সকলের দিদি। স্বপন জেঠুর (মজুমদার) সঙ্গে বাবা প্রথম আপনার ‘ভালো-বাসা’য় গিয়েছিলেন। বাবার কাছে শুনেছি আপনার মায়ের কথা। আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন কার্তিকদা, সেই কার্তিকদা যিনি নাকতলায় বুদ্ধদেব বসুর বাড়ি থেকে সাইকেল চালিয়ে বইপাড়ায় আসতেন। বাবা ছাড়া এই কার্তিকদাই আমাকে নিয়ে যেতেন লেখকদের বাড়ি। বাবার দিদি ডাকার সুবাদে আপনি হয়ে গেলেন আমার পিসি। যত দিন যায় পিসি ডাকের মধ্যে জোর বাড়তে থাকে। সেই জোরে মাথা রাখতে পেরেছি আপনার কোলে। কখনো দু’হাতে টেনে নিয়ে আদর করে দিয়েছেন গালে কপালে। অসুস্থ অবস্থায় বলেছেন, “অপু, তুই রোজ আসিস, তোকে দেখলে আমি ভাল হই।”

নবনীতা দেবসেন

একদিন মিতু (স্বপন জেঠুর ছেলে) ফোন করে জানাল সন্ধেবেলায়, “অপু, বাবার সেরিব্রাল হয়েছে, শান্তিনিকেতন থেকে দুর্গাপুর নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তুমি যাবে আমার সঙ্গে?”

আমি তখন আপনার বাড়িতে ছিলাম। খবরটা শুনে আপনিও ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলেন, আবার ভাবনাও হচ্ছিল আমি রাতে কী খাব, কোথায় খাব? বউমাকে বলে আবার রান্না করালেন, খাইয়ে ছাড়লেন। আর প্রায় সারারাত ফোনে খবর নিয়েছেন। পরের দিন সকালে খবর নিয়েছেন। আপনার স্নেহের স্পর্শ ‘ভালো-বাসা’ বাড়িতে অনেকেই পেয়েছে।

আপনি খুব সুন্দরী। সাজুগুজু করতেও আপনি ভীষণ ভালবাসেন। কেউ একজন আপনার ছবি তুলেছিল। আপনি তাকে খুব ধমকেছিলেন। বলেছিলেন,  এই অগোছালো ভাবে কেউ ছবি তোলে? তুমি বসো আমি আসছি।

শাড়ি পরে কপালে বড় লাল টিপটা লাগিয়ে এসে বারান্দার সামনের চেয়ারে বসলেন আর ছবি তুললেন।

আপনি ছবি তুলতে ভালোবাসেন। সাজতে ভালোবাসেন। আর উপহার পেলে দেখেছি আপনার মধ্যে শিশুদের মতো উচ্ছ্বাস। একগাল হাসি, আর গালটা টিপে বলতেন, “কী সুন্দর হয়েছে উপহারটা!”

আমি তখন দিল্লিতে অমিতাভ কাকুর (অমিতাভ রায়) বাড়িতে থাকি। দিল্লি থেকে আপনাকে ফোন করেছিলাম। বলেছিলাম, ‘বাংলা লাইভ’-এ আপনার লেখা ‘নবনীতার নোটবই’ ধারাবাহিকের সব ক’টি লেখা অমিতাভ কাকু সংগ্রহ করে রেখেছেন, আমি এটা বই করব।

 “ওই লেখাগুলো পেয়েছিস!” আপনার গলায় উচ্ছ্বাস।–“সব ক’টা লেখা পেয়েছিস! আমার কাছে একটাও লেখা নেই রে!” তারপরে অনেক্ষণ কথা বলেছিলেন অমিতাভ কাকুর সঙ্গে, বইটি উৎসর্গ করেছিলেন আমার পাঠকদের উদ্দেশে। বইটি একটা নোটবইয়ের আকারে করেছিলাম। কভার ও বইয়ের মাঝে স্পঞ্জ ও বইয়ের চার কোণে ডায়েরির মতো গোল্ডেন ক্লিপ লাগিয়েছিলাম। একটা ডায়েরির আকার দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। আপনি বইটা হাতে নিয়ে বলেছিলেন, “অসাধারণ হয়েছে।”

আপনার চোখেমুখে ছিল সারল্যের খুশি।

আপনি ৮০ বছরে পড়বেন। আমরাও (অন্তরাদি, নন্দনাদি, শ্রাবস্তীদি ও আমি) ব্যান্ড বাজাতে শুরু করলাম। আপনাকে নিয়ে একটা অনুষ্ঠান হবে,  বুকিংও হয়ে গেল রবীন্দ্রসদন, কিন্তু কী হবে? দিনরাত শুধু পরিকল্পনা হতে লাগল। আপনাকে নিয়ে রংগনদা-কে দিয়ে একটা গান লেখানো হল। গান তো এল কিন্তু সুর? গাইবেই বা কে? ‘দোহার’-কে বলা হল। কালিকাদা ছিল আপনার ছাত্র। কালিকাদা’র স্ত্রী ঋতচেতাদি-কে বলতেই রাজি হয়ে গেলেন। দু’দিনে সেই গান তৈরি হয়ে গেল। শঙ্খ জ্যেঠুর হাতে আপনার রচনাবলীর প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয়েছিল। আপনার সহপাঠী বুদ্ধদেব গুহ আপনাকে গান শুনিয়েছিলেন। শমীক বন্দ্যোপাধ্যায় ও অনিতা অগ্নিহোত্রী আপনার দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন।

৮০ পেরিয়ে ৮১-তে পড়লেন। আপনার শরীরে তখন কর্কটের বাস। আবার আমাদের ভালবাসার জোরে বা দাবিতে কর্কটকে উপেক্ষা করে, আপনাকে ঘিরে আমাদের আনন্দ উৎসবে আপনিও যোগ দিলেন। নানান মুহূর্তের ছবির একটা কোলাজ…আপনার পুরনো অনেক আনন্দের মুহূর্ত  ফিরে এসেছিল স্মৃতিতে।

আপনি শুয়ে আছেন  আপনার খাটে। নাকে অক্সিজেনের নল, চোখ বন্ধ, ‘ভালোবাসা’র বারান্দা’ পঞ্চম খণ্ডে উৎসর্গের পাতায়, ভূমিকার পাতায় কী থাকবে শুয়ে শুয়ে বললেন। উৎসর্গ করলেন শঙ্খ ঘোষ ও প্রতিমা ঘোষকে। তিয়াস আপনার বলা দু’লাইন ভূমিকা কপি করল। শঙ্খ ঘোষের লেখা সেই বিখ্যাত কবিতার ‘…আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’ চারটে লাইন শোনালেন, যা ভূমিকার পাতায় থাকবে। যাদবপুর ইউনিভার্সিটির চার নম্বর গেটের পাশে একটা হলে আপনার কোন‌ও অনুষ্ঠানে বছর চারেক আগে শঙ্খ জ্যেঠু এসেছিলেন, আর আপনি বলেছিলেন, “তিনি সব অনুষ্ঠানে আসেন, কিন্তু কিছু বলেন না। তিনি হলেন আমার ‘বোবা কবি’।”

৭ নভেম্বর ২০১৯। ঠিক একবছর পরে সেই ঢাকা শহর থেকে এবারে আমি হোয়াটসঅ্যাপে অন্তরাদি-কে ফোন করি, আপনার চির নিরুদ্দেশ যাত্রার খবরটা পাই। সোশ্যাল মিডিয়া এবারে কেন মিথ্যে হল না জানি না!

বিগত দিনগুলি