দৈনিক কবিতা আশ্রম, ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
আবহমান বাংলা ভাষা
দৈনিক
২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
আলোকচিত্র: বন্যা লোহার
সৌমাল্য গরাই
সন্তান
কোথাও ছিলে না তুমি, তবু দ্রুত দেখি
কীভাবে কখন এসে যাও
অন্ধকারে স্মরণ করেছি, আলোর সম্মুখে
নত হই, বের হও, এভাবে আহ্বান করি ধীরে
লৌকিকতা খসে পড়ে, আমাদের অলৌকিক রমণের ঘর
যেন শুক্র শুক্র অণু দিয়ে আঁকা হল মঙ্গলের ঘট
শিশ্ন নয়, মনে হল যোনির ভেতর
সমস্ত শীৎকার অতিক্রম করে খেলা করতে
এসেছেন পরম ঈশ্বর
তৃষা
একটি কবিতা
সমস্ত সংকট গোপনীয়
তবু হৃদয় তোমার প্রতি
ভাবি
শস্যবিহীন কোনো ঢালের চেহারা
ফুটে ওঠে শ্রম, বাৎসরিক
তেমন কখনও
যদি জিজ্ঞেস করো
বর্ণালী ঘোষ
ধার
ছুরিটা দারুণ কাটছে
মসৃণ তুলতুলে ছোঁয়ায়
যেকোনও জিনিস—
যা আমার দু’হাত পারেনি কখনও…
দিব্যি মাপমতো করে নেওয়া যায়
যে কোনও দায় ওর ভরসায়…
বাড়ছে আশা বাড়িয়ে চলেছি বোঝা
যত ভারী-ই হোক
হোক এলোমেলো
সাজিয়ে নেবে ঠিক
ওর কাছে সবকিছুরই উপায় আছে…
অন্য সব বাহারি ছুরি এখন খুউব যত্নে
ঝকঝকে সৌখিন দেয়াল আলমারিটায়…
একদিন চোখে পড়ল
আমার হাত চালানো ছুরিটার
আলো কিছুটা কম …
খুবই শক্তপোক্ত— ভাঙেনি কণামাত্র চেহারার
কমেছে শুধু এক চিলতে চাকচিক্য যেন তার…
এই প্রথম অনুভব করলাম
বিশেষ শুভ যোগে পাওয়া
এই সামান্য ছুরি—
আবার আর পাব না কোথাও …
কম অর্থ ব্যয়ে হলেও
ওটাই সবচেয়ে দামী ছিল সাজানো দোকানে
এমন জিনিস পাওয়া যায়না …
ভোঁতা হয়ে গেছে আমারই অসংযত ব্যবহারে…
নকসা কাটা চড়া দামের ছুরিগুলো তো
নির্দিষ্ট মূল্যে পাওয়া যেত …
তাছাড়া এমন কাজের ওরা কেউই নয়
মানুষ সহজে কিছু পেলে মূল্যায়নে
অযথাই দেরি করে ফেলে…
ফেরাবার উপায় সময়ের দুরন্ত নদী বেয়ে
অনেকটা দূরে চলে যায়…
পড়ে থাকে অতি অবহেলায়
কদর না বোঝার পরিণতির জীর্ণ দায়…
তেমনই চেহারা আছে
কিঞ্চিৎ হয়তো-বা কমেছে বাহার…
সাড়া দেয়না শুধু তীক্ষ্ম ইশারায় এখন আর
খুঁজে পাই না বহু চেষ্টাতেও তার
ভালোবাসার সেই অপূর্ব ধার…
কবির হোসেন
ফটোকপির দোকানদার
ভাল্লুকের হাত থেকে কাউকে রক্ষা করার সাহস নেই আমার, না আছে পাহাড় চূড়ায় উঠে মেঘের চাক থেকে মধু সংগ্রহ করার। আমি তো বৃষ্টির অপেক্ষায় পাদদেশে ঘর তুলেছি, আর কাজ করি ফটোকপির দোকানে। প্রতিদিন ফটোকপি করি আমার প্রতিটিদিন। একেকটি দিন আসলে একেকটি পাতা। যদিও একটি পাতাই ফটোকপি করি প্রতিদিন। আর অপেক্ষা করি বৃষ্টির।
যেদিন বৃষ্টি হয়, কেবল সেদিনের পাতাটি ভিজে যায়।
নতুন প্রজন্মের বিশিষ্ট প্রকাশক অপু দে-র নিয়মিত কলাম
অপুর সংসার
পর্ব-৮
স্বপন মজুমদার
সেই কবে স্কুল ছেড়েছি। স্কুল, কলেজ জীবনের পূর্ণ সময়কে অতিক্রম করে ফেলেছে কর্মজীবন। ছোট থেকেই বাবার ল্যাংবোট হয়ে ঘুরতাম। হাতেখড়িও বাবার কাছে। কিন্তু বই সম্পর্কে তেমন গভীরতা আমার তখনও হয়নি।
বসার ঘরে দেওয়াল জুড়ে কাঠের তাক, আর সেই তাক বইয়ে ঠাসা। বইগুলো সব কালো কাপড়ে বাঁধাই (বোর্ড নয়)। বইয়ের গায়ে সাদায় সংক্ষেপে লেখা। আমি ওই বইগুলো একটু একটু বের করতাম, উল্টেপাল্টে দেখতাম আর রেখে দিতাম সেই জায়গায়। ভয় হত যদি বকা খাই। শুধু এই বইগুলো দেখার জন্যেই যেতাম স্বপন (মজুমদার) জেঠুর বাড়ি। তিনি বই চিনতে শেখান এবং পুরনো পত্রিকা সম্পর্কে আগ্রহ তৈরি করেন আমার মধ্যে। আর এই আগ্রহ ক্রমশ গভীর হয় তাঁর সঙ্গে কথা বলতে বলতে।
আমাদের প্রকাশনার শুরুর আগে থেকেই তিনি যুক্ত আমাদের সঙ্গে। বাবাকে বলতে শুনেছি ‘স্বপনদার কাছে আমার শেখা, আমার হাতেখড়ি।’
আমাদের প্রকাশনার শ্রেষ্ঠ কবিতা-র সিরিজের অনেকটাই তাঁর আগ্রহে, প্রবন্ধের প্রায় ৭০ শতাংশ তাঁর তত্ত্বাবধানে। আমার হাতেখড়ি না হলেও কর্মজীবনের প্রথম শিক্ষক স্বপন জেঠু। আর এই শিখতে গিয়ে বকুনিও কম খাইনি।
স্বপন জেঠুর বাড়িতেই প্রথম প্রিন্টিংয়ের একটা বিদেশি স্কেল দেখেছিলাম। যেখান থেকে জানতে পেরেছিলাম ‘এম’, ‘পাইকা’, ‘স্মল পাইকা’ এগুলো কী। হাতেকলমে দেখিয়েছিলেন কতরকম ভাবে ভাঁজ করলে কতরকম সাইজের বই তৈরি হয়। ডুপ্লেক্স বোর্ডের উল্টো পিঠে ছাপালে কভারটাই অন্যরকম হয়ে যায়।
তাঁর ঘরে কাঠের তাকে বইগুলোর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতাম। ছুঁয়ে দেখতাম সেই বইগুলো। কতটা যত্ন সেই বইগুলোর প্রতি, বইগুলোর সঙ্গে যেন তাঁর আত্মীয়তার সম্পর্ক। একদিন জেঠু বললেন, “এই তাকগুলোয় যত বই দেখছ, তার ৬০ শতাংশেরও বেশি তোমার ঠাকুরদার কাছ থেকে কেনা। আমরা যখন ইউনিভার্সিটিতে পড়ি তখন অবনীবাবুর ‘কথাশিল্প’ দোকানের পাশে একটা চায়ের দোকান ছিল, ওখানে আড্ডা দিতাম। আর তোমার ঠাকুরদা ভগবানবাবু বসতেন পান দোকানের পাশের ছোট্ট গুমটির মতো দোকানটায়। দে বুক স্টল। তোমার ঠাকুরদা, আমরা যাঁরা বই কিনতে যেতাম, আমাদের বাবু বলে সম্বোধন করতেন। বলতেন “বাবু, আপনারা তো ইউনিভার্সিটিতে প্রাইজের জন্যে বই কেনেন। আমার থেকে নিতে পারেন। আপনি বই নিয়ে যান, পড়ে দেখবেন, যদি ভাল না লাগে তবে ফেরত দিয়ে যাবেন। আর আপনারা ডিসকাউন্টও পাবেন।”…অপু, এমন লোভনীয় অফার আমি আমার ছাত্রজীবনে পাইনি। যত না বই কিনেছি পড়েছি তার বেশি।”

এই ষাট শতাংশ বইয়ে আমার ঠাকুরদার ছোঁয়া লেগে আছে, তাই হয়তো অমোঘ টান সেই বইগুলোর প্রতি।
দে’জ পাবলিশিং প্রকাশিত আবু সয়ীদ আয়ুব-এর ‘আধুনিকতা ও রবীন্দ্রনাথ’ প্রথম অকাদেমি পুরস্কারে সম্মানিত হয়। এই বইটি আমাদের প্রকাশনা থেকে প্রকাশের উদ্যোগ স্বপন জেঠুই নিয়েছিলেন। একদিন ডেকে বললেন, “অপু, ক্ষিতীশ রায় অনূদিত গান্ধীজির আত্মকথা প্রকাশ করতে হবে।”
আমি অনুগত ছাত্রের ভূমিকায়।
কী করতে হবে আমাকে? বইটার বাঁধাই একটু অন্যরকম করতে হবে।
কেমন হবে সেই বাঁধাই? খাদির দোকান থেকে খাদি কাপড়ের থান কেনা হল। তাতে ছাপা হল গেরুয়া সাদা ও সবুজে ‘আত্মকথা অথবা সত্যের সন্ধানে’। কাপড়ের বোর্ড বাঁধাইয়ের ওপর হ্যান্ডমেড পেপারের জ্যাকেট।
বাবা স্বপনদা ডাকেন। আমি সেই সম্পর্কের জেরে জেঠু ডাকি। ভাবতে ভাল লাগে প্রত্যক্ষ না হলেও পরোক্ষে আমার বাবার মাস্টারমশাই, আমারও মাস্টারমশাই।
তাঁর কথা শুনতে শুনতে, কাজ দেখতে দেখতে শিখেছি বইকে ভালবাসতে। শিখেছি বইকে ভালবেসে গড়ে তুলতে।