সাপ্তাহিক

২১ ফেব্রুয়ারি ২০২১

ছবি : সংগৃহীত

মুহম্মদ নূরুল হুদা

ভাষার শহীদ

মায়ের ভাষার মান রাখতে 

জীবন দিল যারা 

বাংলাদেশের স্বাধীনতার 

প্রথম শহীদ তারা।।

 

হৃদয় তাদের এই দেশেরই 

ঢেউখেলানো নদী 

হাজার পালের নৌকা বুকে 

বইছে নিরবধি, 

ধানের শিষের স্বপ্নে তারা 

পলল বুকে হারা। 

 

ফুল-ফসলে বাড়ছে তারা 

অবাক ফাগুনে 

হাসছে তারা লাল-সবুজে 

দীপ্ত আগুনে 

সেই হাসিতে স্বাধীনতার 

বুক যে পাগল-পারা।

 

সোনার দেশের সোনার শিশু 

তাদের কথা বলে 

তাদের আলোকশিখা হতে 

সমুখ-পথে চলে, 

ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুকে 

বোনে শস্য-চারা।।

 

স্বাধীন জাতি স্বাধীন মাটি

স্বাধীন সোনার দেশ 

ভাষাসেনার শব্দপ্রদীপ 

জ্বলছে অনিঃশেষ।

 

নির্মল হালদার

ভাষা দিবসে

কাঠবিড়ালির দিকে চেয়ে আছি

কিছুই বলে না।

কাঠবিড়ালিও চেয়ে আছে আমার দিকে

কিছুই বলি না।

 

দুজনের নীরবতার মাঝে

মাটিতে পড়ল একটি পেয়ারা

দুজনেই দৌড়ে যাই

নিজস্ব ভাষার কাছে

 

নিজের আলোয়।

 

আহমেদ শিপলু

রক্তাক্ত বায়ান্ন বর্ণমালা

(সকল ভাষা শহিদের স্মরণে) 

 

ব এর বুকে লেগেছিল ঘাতক বুলেট! 

প এর পায়ে ঝরেছিল রক্ত! 

ম এর মাথা থেঁতলে গিয়েছিল রাবার বুলেটে! 

ক মাথা উঁচু করে বলেছিল মানি না এই কারফিউ!

শ্লোগানরত ফ ফুঁসেউঠেছিল ক্রোধে! 

চ তখন চিৎকার করে বলেছিল : মাতৃভাষা বাংলা চাই! 

 

স্বরবর্ণরা সারিবদ্ধভাবে তখন মিছিলের অগ্রভাগে।

পিছু হটছে মোনায়েম খানের সশস্ত্র চ্যালা। 

ব্যঞ্জনেরা উদ্দীপ্ত শ্লোগানে শ্লোগানে। 

তারা গলা ছেড়ে গাইছে ‘মোদের গরব মোদের আশা,

                              আমরি বাঙলা ভাষা…’

গুলি ছুড়ছে দিগ্বিদিক আইয়ুব খানের পুলিশ! 

কেড়ে নিচ্ছে তাজা প্রাণ জিন্নাহর জাতিতত্ত্ব! 

 

সন্তান হারানো বিসর্গের চোখে বেদনার্ত অশ্রুজল!

রক্তাক্ত শ্লোগানরত স্বরবর্ণ, 

ঘাতক বুলেটে শহিদ—ব্যঞ্জনের সহযোদ্ধাগণ! 

তখনো সাহসী চন্দ্রবিন্দু এগিয়ে চলেছে একা! 

 

বায়ান্নর ফাল্গুন দুপুর, রক্তাক্ত রাজপথ। 

রক্তে রঞ্জিত বায়ান্ন বর্ণমালা! 

পরস্পর আলিঙ্গনে উঠলো ক্রন্দনরোল—

‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি,

                      আমি কি ভুলিতে পারি…’

 

অর্ঘ্য দত্ত

ভাষা

ভাষাতাত্ত্বিক করুক না গবেষণা

লুঠেরা আসুক বিজাতীয় ভাষা নিয়ে

বিজ্ঞাপনের ভাষা হোক চতুরালি

বাংলা ভাষাকে আগলাবো বুক দিয়ে

 

ভাষা কি প্রেমিকা? ভাষা কি মায়ের মতো?

ওদের‌ও মৃত্যু, বিচ্ছেদ সয়ে যায়

আজীবন শুধু ভাষাই সঙ্গে থাকে

ভাষাহীন জাতি ব্যর্থ ও অসহায়

 

বিদেশীয় বুলি, অন্য জাতির ভাষা

অতিথির মতো, পড়োশির মতো ভালো

হাটে ঘাটে মাঠে বিষাদে ও উল্লাসে

গর্বে জ্বলুক মাতৃভাষার আলো

 

ভাষার রয়েছে পৃথক ধর্ম, তাকে

রক্তে পেয়েছি, নেই কোনো ভেদাভেদ

বাংলায় পড়ি বাইবেল, ত্রিপিটক

বাংলায় লিখি কোরান অথবা বেদ

 

বাংলা আমার মা-র ভাষা; পরিচয়

ওর চোখে আর এক ফোঁটা জল নয়

 

ওর চোখে আর এক ফোঁটা জল নয়।।

 

ছবি : সংগৃহীত

জাকির জাফরান

জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়

দুর্যোগে দুরন্ত জেগে উঠি নিরুদ্ধ বাতাসে, ভাবি-

গুলিবিদ্ধ রফিকের মাথা, মায়াবী মগজ থেকে 

ছিটকে বেরিয়ে পড়া কীর্তিনাশা দুইটি অক্ষর 

দাজ্জালের ট্যাঙ্ক উষ্টা মেরে ছুটে চলে রাজপথে। 

এক অশ্রুবিন্দুর দ্রাঘিমা ধরে হেঁটে গেলে দেখি-

বরকত দুটি দুর্জয় অক্ষরে লিখে গেছে নাম

যে-নামে ধুন্দুল ফুটে থাকে রোজ মায়ের পাঁজরে

যে-নামে করবী গুঁজে দেয়া যায় বোনের খোঁপায়। 

এই মহাজনপদে… আর্তনাদে… এই আর্তরবে…

বকুল ফুলের মতো বর্ণমালা… মুখে নিয়ে তুমি… 

দুরন্ত… একশো চুয়াল্লিশ ধারা ভেঙে… উঁচা বুক… 

জেগেছ বিদ্রোহে… দেখি যুক্তাক্ষর হয়ে দুটি লাশ 

পড়ে আছে পাশাপাশি… তারা কি সালাম ও জব্বার!! 

উত্তাল যমজ ফুসফুস!! প্রতিটি স্পন্দনে জপে… 

মায়ের চোখের অক্ষর দিয়ে লেখা সেই রুদ্রনাম…

 

 

নিশীথ ষড়ংগী

বাংলাভাষা

এই যে আবেগ লিখি, ভাল

বাসা, অভিমান, রাগ এই যে

বন্ধু শব্দে গলা জড়িয়ে ধরি

শত্রুতাবশত ঢেরদিন

কথাও বলিনি

এসবই বাংলাভাষার রেণু, ফাগ…

প্রথম দেখার দিনে কেঁপে ওঠা বুকে আর রোমাঞ্চ

জড়িয়ে

রুমাল উড়িয়ে দেওয়া বিদায়ের দিনে

বিষাদ ও দুঃখের কাছে ফিরে ফিরে যেতে

বার বার তুমি, তুমি; অশ্রু মুছি

তোমার অমোঘ শাখা নামিয়ে নামিয়ে,

অনেক

রক্ত দিয়ে, অনেক চোখের

জলে এই ফিরে পাওয়া

তবু বাঁধ ভাঙে ওরা, ঢেকে

দেয় অন্ধপাঁচিলে

তবু স্রোত

বন্ধ করে, দস্যুতা বাড়ায়

তাইতো তোমার কাছে প্রতি

দিন কুশলসংবাদ নিতে

যাওয়া…

 

তাই আয়ু দিই রোজ, সারিয়ে

সারিয়ে তুলি ক্ষত

আগলে

আগলে রাখি, পিঠে, তীর

বিঁধে যাওয়া এক সৈনিকের মতো…

 

কামরুল বাহার আরিফ

সূর্য আমার একুশ নামে

সেই তো ছিল তোমার কথা জাজ্বল্যমান আজও

বিশ্ব কেমন বাসল ভাল,

              কাঁদল আরও শোকে মুহ্যমানও 

তোমার কথা, আমার কথা, সবার কথা, 

কাঠবেড়ালি-টিয়ের কথা, ঘাস ফড়িং আর 

জোনাক পাখি— আলোর কথা

আমার ব্যথা, তোমার ব্যথা, সবার ব্যথা, 

রাজপথ আর নদীর ব্যথা, শূন্য বুকে বৈচালী দ্বীপ—

নিঃসঙ্গ বনের ব্যথা  

এতো কথার এতো ব্যথার জমাট বেঁধে 

বাঘের পিঠে মঞ্চ করে উড়িয়ে ছিলাম

হাওয়ার স্রোতে, ঝড়ের বেগে, তরঙ্গিনী নদীর স্রোতে।

গীতাঞ্জলীর বর্ণগুলো বন্দি থেকে 

রেরিয়ে এসে জোর কদমে এগিয়ে ছিল বাউল পায়ে!

বলো, এমনতরো প্রকৃতিরে কে পেরেছে বশ মানাতে, 

এমন কোনো হাজতখানা থাকতে পারে— কে রুধিবে?

তাই, তোমার ব্যথা, আমার ব্যথা—

তোমার কথা আমার কথা এক হয়ে যায়

নদীর জলে, বাতাস বাঁশির সুরের মায়ায়, 

ভরসার ঐ মায়ের আঁচল, শক্তি হাওয়ায়

তখন কোকিল যদি ডাক দিয়ে যায়, 

কে বাধা দেয়? কোন সাহসে!

 

এখন কার আছে আজ সাহস বলো,

                 বন্দি করে— আমার বর্ণমালা?

যখন একুশ আমার ভূবন জুড়ে

                 বুক উঁচিয়ে ভালবাসার ডালা?

 

আজ ঠাঁয় দাঁড়িয়ে মিনার তুমি, মিনার তো নও, 

তুমি আমার পূর্ব পুরুষ স্বপ্নে দেখা আলোর ভূবন

সেই ভূবনে আমি আমার স্রোতের ধারায়,

                        আসি ফিরে বারে বারে, 

শোককে কঠিন শক্ত করে,

          একুশ নামের জ্বলজ্বলে এক সূর্য ধরে।

 

রজতকান্তি সিংহচৌধুরী

ভাষা আমার বাসা

(‘মানুষের অস্তিত্বের আবাসন ভাষা’—

                         মার্টিন হাইডেগার)

 

ভাষা 

আমায় 

শাসায়

ঘরকুনো 

স্বভাবের 

জন্য।

বলে,

হয়ে যাও

বন্য—

বুনো। 

 

 

ভাষা

আমার

আশা,

আমার

বাসা,

ভাষা 

আমায় 

ভাসায়,

দুনিয়াকে 

ভালবাসায়।

ঝর্না রহমান

শহীদ মিনার

আজ কি ফুটেছে কৃষ্ণচূড়া 

আজ কি ফুটেছে রক্তপলাশ

আজ কি স্বদেশ তোমার শরীরে 

স্বর্ণ আভায় ঝলসে উঠেছে

বর্ণমালার ছাপচিত্রের পরম পোশাকে দেহের কাব্য 

আমি যা বুনছি-আঁকছি-লিখছি

ইতিহাস-নারী আমারই ঋদ্ধ হার্দ্য আঙুলে 

দুহাতে ধরেছি জ্বলজ্বলে লাল হৃদয়পাত্র 

পৃথিবীর যত লালফুল আর তীব্র আগুনে জ্বলে-ওঠা রং  

এখানেই আছে ঘোর টকটকে হৃদয়রশ্মি গুঁড়ো কুঙ্কুম 

আমারই আঙুলে আঁকছ তোমার     

কপালে এখন সূর্যতিলক

আমার দুবাহু ভাষার মিনার মুদ্রাভাষ্য গড়ে সুস্থির 

আমার সকল দেহ সম্ভার এখন বৃক্ষ কৃষ্ণচূড়া 

আমার ভেতর স্লোগান জাগছে বুক ফুঁড়ে ওঠে রাষ্ট্রভাষা

থোকা থোকা ফোটে আমার শরীরে-বর্ণমালার পরম্পরা 

আজ কি আমার শরীর শুনছে শ্রেষ্ঠ মন্ত্র নান্দীপাঠের-

জাগছে আমার শরীরে আজকে

                        ফেব্রুয়ারির শহীদ মিনার।

 

কুমারেশ তেওয়ারী

ভাষার কপালে কত ঘাম

ভাষারই ভেতরে থাকে আমাদের প্রাণের ভ্রমর 

পরাধর্মী কোলে তার মাথা রেখে যখনই ঘুমোই

শরীরের থেকে তাপ নেমে যায় বড় ধীর পায়ে

শরীরী পিঞ্জরে জাগে, জেগে ওঠে প্রেমের ডহর

 

ভাষা তো প্রবলা এত গিলে নেই কাঁটাতার বেড়া

এপারে চোখের জল, ওইপারে মৃত্যুর মিছিল

বুলেট চেটেছে প্রাণ তবু কত মুষ্টিযুদ্ধ হাত

একদিন বেঁধেছিল ভাষাগাছে প্রতিজ্ঞার ঢিল

 

তবু কি হয়েছে মুক্ত ভাষাকে ঘিরেছে অবহেলা

ঠোঁটের নিগড়ে এসে কেঁদে যায় বৈখরিয় ভাষ

সাইনবোর্ডের বুকে জেগে থাকা বিদেশী অক্ষর 

ভুল সম্মোহনে ফেলে করে চলে অবাধের চাষ

 

কষ্ট পায়? কষ্ট পাও, মৃত্যুহীন বরকত, সালাম?

মৃত্যুর ওপারে জাগো জেগে ওঠো ব্যথার সিনানে?

স্মরণের দিন এলে আমাদের অতলান্ত ভানে

বাগবিভূতিতে রাখি বছরের সেয়ানা প্রণাম

অনিরুদ্ধ আলম

রক্তে পলাশ ফুটেছিল

একুশ এসেছিল ফাগুন উচ্ছ্বাসে –

রক্তে আগুনের পলাশ-অঞ্জলি

ফুটিয়ে বরকত-সালাম ফেরে নাই!

তাই তো বাংলায় আমরা কথা বলি। 

 

২

একুশ মানে– অধীর-প্রাণে শেখা  

শিকড়ে-রাখা নদীর উচ্ছ্বাস 

কি ক’রে ভুলি– রফিক-জব্বার

রক্তে এঁকেছিল পলাশ একরাশ! 

 

৩

ফাগুন মাসের অষ্টম বার 

পলাশ ফুটেছে কী চমৎকার! 

পলাশ তো নয়, ও তো শহিদের 

রক্তে-নিকানো প্রাণের বাহার। 

 

৪

একুশ এসেছিল। একুশ আসবেই 

পলাশ চেতনায় ফুটেছে। ভয় নেই। 

গীতল বাংলায় নিতল এ-হৃদয় 

‘মাথা নত-না করা’ শ্লোগানে জাগবেই!  

 

৫

(কৃতজ্ঞতা স্বীকারে প্রাণের কবি আল মাহমুদ)

একুশের অক্তে 

রাজপথ চিত্রল পলাশের রক্তে। 

কৃষ্ণচূড়ারা আজও ভাইয়ের রঙিন বসন 

শোকে-প্রতিবাদে প’রে থাকে অনুক্ষণ! 

 

৬

একুশ মানে এটুকু অন্তত–  

অধিকারের দাবিতে অবিরত 

ভয়ের কাছে মাথা হবে না নত! 

 

সুজন পণ্ডা

হাল

সেই কবে কাঁধে তুলে নিয়েছি হাল

সেই কবে নেমেছি মাঠে

কেউ ছড়িয়েছি বীজ

কেউ পুঁতেছি মাতৃভাষা

তারপর কেটে গেছে কত ঋতু

কত ক্ষরা 

আর কত বন্যার জল

বয়ে চলে গেছে

 

পলি জমেছে খেতে

কালি জমে বন্ধ হয়েছে কলম

 

সেই কবে হাল তুলেছিলাম কাঁধে

আজ দেখি সেই হাল 

দেশ হয়ে মাথায় চড়াও হয়েছে

 

মনজুর রহমান

একুশ মানে, স্বোপার্জিত মাতৃভূমির নাম

একুশ মানে পলাশ ফোটা

রুদ্র ফাগুন দিন

একুশ আমার রক্তে নাচা

ভাষা শহীদের ঋণ

 

একুশ মানে শিমুলে পলাশে

মোড়ানো রৌদ্রহেম

একুশ আমার রক্তে ভেজা

বর্ণমালার প্রেম

 

একুশ মানে দুধের নহর

প্রথম মাতৃবক্ষ’র

একুশ আমার প্রথম বলা

অজেয় সব অক্ষর

 

একুশ মানে রক্তশিশিরে

আলোকের আশ্বাস

একুশ আমার দুর্বিনীত

চেতনায় বিশ্বাস

 

একুশ মানে মানবমিনারে

রক্তশুদ্ধ প্রাণ

একুশ মানে তো বাংলাদেশ-

স্বোপার্জিত নাম!

 

অমিত দে

ভাটিয়ালিপুর

শ্যাওলা রং মেটে দেহে

উচ্চারিত হয়েছিল মাগধীর সুর

প্রাকৃত ধ্বনি—হাজার বছরের গান,

একদিন বিলাপ লিখেছে শাপলা-শালুক

বর্ণমালায় বিলীন দৃঢ় মুঠি

ভেতরে সেদিন স্রোত—মায়ের দাবির

 

চৈত্রসংক্রান্তি জানে মিলনমেলা জানে

একই পদবির ভার ভেসেছে দুই জলধারায়, 

ছায়াচরাচরে ছিটমহলের অভিমান

বাঁকা পথে সব ভালবাসা পাড়া

 

সেই দেহে এখন রঙিন জামা

পারাপারে বিস্মৃত অক্ষরস্বাদ,

উদ্বাস্তু কলোনীর প্রাচীন গাছ

সঞ্চয়ে রেখেছে বীজের সংরাগ

 

যে এখনও খোঁজে

ধানশিষের দুধ… অজানা ভাটিয়ালিপুর

তার হাতের রেখায় জেগে থাক

                          জাতির অঙ্কুর

রুমা তপাদার

ভাষা আঁকড়ে থাকি

আসল উদ্দেশ্য ছিল বিষাক্ত ছোবল চুষে নেব…. 

দাঁতে দাঁত চিপে, তাই বাজিকর বেশ! 

প্রস্থান বিলাসী কুঞ্জ জানতো 

           লীলা-লাস্যে সেরা রাত্রি জানত

                               সমস্ত রাগেরা জানত  

আরাধিকারা অমর। 

তাই বর্ণমালা খুলে চোখে আলতা-সাজ মাখি

অক্ষরপাগল আমি এই পরিচয়ে রাজপথে

একা জড়োসড়ো ভাষা আঁকড়ে থাকি।

 

মুস্তাক মুর্শেদ

কোল আঁচল

তোমাকে হারিয়ে হন্যে হয়ে খুঁজে চলি

সেই নদীর কিনার জুড়ে যার প্রতিটি

জলকণায় খেলা করে অনন্ত বিষাদেরা 

ঢেউয়ের গর্জন কানে তালা ধরিয়ে দেয়

ঢুকে পড়ি এক পাখিরালয়ের গভীরে

হরেক কলতানের মূর্ছনা পেরিয়ে 

রাত শেষের রক্তিম আকাশ পিছনে ফেলে

ক্লান্ত আমি ফিরে পাই তোমার কোল আঁচল…

ছবি : সংগৃহীত

মহান ভাষা আন্দোলনে বিজয়লক্ষ্মী নারীরা

নাহিদা আশরাফী

‘সাম্যের গান গাই-

আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই!

বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর

অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’

 

যে কোনও বিপ্লবে পুরুষের পাশাপাশি নারীরা সমানভাবে অংশ নিলেও বরাবরই তাদের অবদান হয়ে থাকে উপেক্ষিত, অবহেলিত। মিছিলে মিটিং-এ, গণ জমায়েতে, অত্যাচারিত হয়েও বিভিন্ন সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে নেবার প্রয়োজনে নারীরাই তহবিল গঠন, পোস্টার তৈরি, চাঁদা সংগ্রহ করেছেন এমন উদাহরণ রয়েছে অনেক। বাঙালি জাতি ও বাংলা ভাষার ইতিহাসে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন এক অনন্য অবিস্মরণীয় ঘটনা। সেখানেও নারীর অবদান কতটা তার গুটিকয়েক উদাহরণ আজ তুলে ধরতে চাই। 

প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণে গায়ের অলংকার খুলে দিয়েছেন তৎকালীন অনেক অগ্নীময়ীরাই। আমাদের শহীদ মিনারের নকশায় ছিলেন চট্টগ্রামেরই এক সৃজনশীল নারী নভেরা। শিল্পী হামিদুর রহমানের সাথে যুক্ত হয়ে যিনি নিরলস কাজ করে গেছেন। প্রায় প্রতিটি জেলায় সাধারণ নারীরা, স্কুলের কিশোরী মেয়েটি, বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণী যে দুর্নিবার প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল তা রীতিমতো বিস্ময়ের দাবী রাখে। ঢাকার কামরুন্নেসা স্কুলের গলিতে অনুষ্ঠিত সভায় বক্তব্য রাখেন বেগম সুফিয়া কামাল, সানজীদা খাতুন সহ আরও অনেকে নারীরা। টাঙ্গাইলে সমাবেশ এর আয়োজন হয়। এখানেও সম্মুখ সারিতে ছিলেন নারী নাজমা বেগম, নুরুন্নাহার শেলী প্রমুখ। যশোরের হামিদা রহমান, খুলনার সাজেদা আলী, চট্টগ্রামের উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্রী প্রতিভা মুৎসুদ্দি, শেলী দস্তিদার, প্রণতি দস্তিদার, মীরা, নারায়নগঞ্জের মতিয়া চৌধুরী কতশত নাম যে উঠে আসবে তা বলে শেষ করা যাবে না। 

১৯৪৭ এর পহেলা সেপ্টেম্বর অধ্যাপক আবুল কাসেমের নেতৃত্বে ‘তমুদ্দিন মজলিস’ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন গঠিত হয় যার মাধ্যমেই মূলত বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মর্যাদাদেবার দাবী উত্থাপিত হয়৷ এই সংগঠনে অনেক গণ্যমান্য নারীগণের যাতায়াত ছিল। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য ও বায়ান্নর সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম সদস্য আনোয়ারা খাতুন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে পুলিশের গুলিতে ছাত্র হত্যা নির্যাতনের বিরুদ্ধে অইদিনই অনুষ্ঠিত বিধান পরিষদে দেয়া বক্তব্যে বলেন, “মিঃ স্পিকার ঘটনা দেখে মনে হয় আহূত আমরা পূর্ণ স্বাধীনতা পাইনি। তার প্রমান এই পুলিশি জুলুম। এ অত্যাচার থেকে মেয়েরা পর্যন্ত রেহাই পায় নাই।… যে জাতি মাতৃজাতির সম্মান দিতে জানে না সে জাতির ধ্বংস অনিবার্য। এ অত্যাচারের বর্ণনা দেয়া সম্ভব না… আমি তাদের দু’জনার নাম দিচ্ছি—যারা আহত হয়েছে—একজন হল ঢাকা হাইকোর্ট-এর জাস্টিস ইব্রাহিম সাহেবের মেয়ে মিস সুফিয়া ইব্রাহিম, আর একজন মিস রওশন আরা।…”

এছাড়া নাদেরা বেগম, লিলি খান, হামিদা খাতুন, নূরজাহান খুরশিদ প্রমুখ সাহসিনীর নাম না বললেই নয়। 

তবে একুশ ফেব্রুয়ারিতে ১৪৪ ধারা ভেঙে যে নারীরা ইতিহাসের গৌরবান্বিত হয়ে রয়েছেন তারা হলেন সামসুন নাহার, সাফিয়া খাতুন,আহাসান নাদেরা চৌধুরী, রওশন আরা বাচ্চু, সারা তৈবুর, কাজী আমিনা সহ আরো বেশ কিছু উজ্জ্বল মুখ। ‘১৯৫২ সালের ৩১ জানুয়ারি সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ’ কর্তৃক আয়োজিত প্রথম সম্মেলনে নেতৃত্বে ছিলেন মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। এ সম্মেলনে ঢাকার ইডেন কলেজের ছাত্রী মাহবুবা খাতুনের সেই উচ্চকিত কণ্ঠ যে জাগরণ তুলেছিল তা তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের উর্দু ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবীর ভিতকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। ‘বাংলাকে রাষ্টভাষা করার দাবী স্বীকার করিয়ে নেয়ার জন্য আবশ্যক হলে মেয়েরা রক্তবিন্দু পর্যন্ত বিসর্জন দেবে।’

সত্যিই তো। এভাবেই তো নিজেকে সর্বস্বান্ত করে বাংলা ভাষাকে টিকিয়ে রাখার আন্দোলনে বাংলা মায়ের দুঃসাহসী মেয়েরা নেমেছিল মাঠে। প্রতিজন নারী যেন এক একজন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। নারায়ণগঞ্জ বিক্ষোভ সমাবেশে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করেন মর্গান বালিকা স্কুলের প্রধান শিক্ষয়িত্রী মমতাজ বেগম। শুরু হয় পুলিশ জনতা সংঘর্ষ। এতে আরো গ্রেফতার হন ইলা বকসী ও স্কুল ছাত্রী রেনু। মমতাজ বেগমকে শর্ত সাপেক্ষে ছাড়তে চাইলে তিনি সে শর্ত প্রত্যাখ্যান করেন। এর মধ্যেই এসব কারণে তার স্বামী তাকে ছেড়ে চলে যান এবং তিনি সংসার হারান। 

এরকম হাজারো আত্মত্যাগ, বিসর্জন আর লাখো নারীর সংগ্রামের ফসল আমাদের বাংলা ভাষা। ভাষাবিজয়লক্ষ্মী নারীরা আজও কেন প্রদীপের নিচে অন্ধকারে রয়েছেন, কেন আজও তারা উপেক্ষিত, কেন তাদের বীরত্ব গাথা লিখবার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়নি সে দাবীতে একজন নারী হিসেবেই প্রশ্ন রেখে গেলাম। শুরু করেছিলাম নজরুলের সেই বিখ্যাত ‘নারী’ কবিতার অংশবিশেষ দিয়ে আর শেষ করলাম রবীন্দ্রনাথের চিত্রাঙ্গদা দিয়ে কারণ ভাষার জন্যে যুদ্ধ করেছিলাম বলেই না এমন সম্পদশালী দু’জন কবি পেলাম।

‘দেবী নহি, নহি আমি সামান্য রমণী। পূজা করি রাখিবে মাথায়, সেও আমি নই; অবহেলা করি পুষিয়া রাখিবে পিছে, সেও আমি নহি। যদি পার্শ্বে রাখ মোরে সংকটের পথে, দুরহ চিন্তার 

যদি অংশ দাও, যদি অনুমতি করো কঠিন ব্রতের তব সহায় হইতে,

যদি সুখে দুঃখে মোরে করো সহচরী, আমার পাইবে তবে পরিচয়।’

 

 

“হৃদয়ের গান শিখে তো...”

পর্ব-১২

ফাল্গুনী ভট্টাচার্য

একেবারে অজ পাড়াগ্রামের ছেলে শহরে পড়তে গেলে একটু কেমন আড়ষ্ট হয়ে থাকতে হয়। অনেকেই গ্রাম থেকেই আসে। তবে যাদের গায়ে একটু নাগরিক হাওয়া লেগেছে, তারা তোমাদের চালচলন বেশবাস নিয়ে হাসি মস্করা করত বৈকি! বেশি হাসি ঠাট্টা করতো মুখের ভাষা নিয়ে। তাদের চোখের কোণে ঝিলিক দিত এক ধরণের ভাষা–রিরংসা। সে-সময় তোমার আশেপাশের গাঁ শুধু নয়, নানুর বাহিরি পাঁচশোয়া পাঁরুই সিঙ্গি ঘি-দহ বাহান্ন-গাঁ দেরপুর বাতাসপুর লাগোয়া গাঁ থেকেও ছেলেমেয়েরা পড়তে আসতো। আশির দশকের মাঝামাঝি। দু’একটা সম্পন্ন ঘরে কাঠের ঢাকনা দেওয়া বড় সাদাকালো টেলিভিশন এসেছে। জমি রুইবার মইয়ের মতো অ্যান্টেনা লাগিয়েও ঝিলঝিলে ছবি। রামায়ণ মহাভারত চন্দ্রকান্তা কি প্রেমকাহানি হচ্ছে। দূরদর্শনে হেমন্ত মানবেন্দ্র শ্যামল কখনো প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লাইভ অনুষ্ঠান হচ্ছে। ছন্দা সেন দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় তরুণ চক্রবর্তীর স্পষ্ট উচ্চারণে সংবাদ পাঠ তোমাকে মুগ্ধ করে দিচ্ছে। আবার গাঁয়ের জগাইকাকা নবনীকাকা মিঠে মেঠো সুরে যখন গান ধরে- তখনও তুমি রোমাঞ্চিত হও-

“সঞ্ঝে বেলায় কুঞ্জে এঁসে

কিষনো জখুন ডাঁড়াইন (দাঁড়ায়) হেঁসে

পিরিতির সুর তোলে পুড়াবাঁশি

রাক্কোরোনা (রাগ কোরো না) অ রাদিকে (রাধিকে)

চেঁয়ে দেকো আমার দিঁকে

একবার দেকি তুমার মদুর (মধুর) হাঁসি।”

 

তোমাদের কারো কারো মাথায় সর্ষের তেল চকচক করছে, কারো ঝুলফি থেকে গড়িয়ে পড়ছে। কারো জামার নীচের বোতাম ছেঁড়া, কেউ সেফটিপিন এঁটেছে। পায়জামা শার্ট আর পায়ে কমদামী চপ্পল। মেয়েরাও বেশিরভাগ জনতা-শাড়ি অথবা ববি প্রিণ্ট। মুখের ভাষায় কিছু কিছু উচ্চারণ শুনে বন্ধুবান্ধবীরা হাসাহসি করে। একদিন এক বান্ধবী ফস করে বলে ফেলল, ‘আমি ল্যায় গণ্ডগোল ভালোবসি না।’ শহরের বন্ধুরা ‘ল্যায়’ মানে জানে না। ল্যায় মানে ঝগড়া। দুঃখ করে তুমি তোমার বাংলার স্যারকে বললে। স্যার বললেন, মুখের ভাষার মতো মিষ্টি কিছু আছে রে? বাংলা ভাষাই তো বলছিস। কিন্তু এই যে নানা জায়গার নানা রূপ- একেই বলে উপাভাষা। তারাশঙ্কর এই ভাষাতেই লিখে বিখ্যাত হয়ে গেলেন। পড় ‘গণদেবতা’, ‘পঞ্চগ্রাম’, ‘হাসুলীবাঁকের উপকথা’। স্যার বললেন, “মানুষকে তার সবটা নিয়ে দেখতে হয়। তার মুখের ভাষা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হয়। সেখানেই লুকিয়ে থাকে লোকজ ইতিহাস সংস্কৃতির শেকড়।” ব্যাস, তারপর থেকে তোমার কাজই হয়ে গেল গ্রামে গ্রামে ঘুরে বয়স্ক মানুষদের কথা শোনা। দেখলে একেকটা আঞ্চলিক বা ঔপভাষিক শব্দের মধ্যে লুকিয়ে আছে সমাজ-ইতিহাসের অজানা অধ্যায়। যেমন,-‘কোদালের বাঁট’। অধিকাংশ বাড়ির মা-মাসিরা দুষ্টু সন্তানের উপর রেগে গিয়ে ছদ্ম মরণ-কামনায় বলে উঠতেন-‘কোদালের বাঁট’। গ্রামীণ চাষীবাসী ঘরে কোদাল ফাবড়া অতি প্রয়োজনীয় জিনিস। মাটি কোপাতে, জমির আল ঠিক করতে, আলু কচু বা আখের জমির ভিলি করতে কোদালের তুলনা নেই। কোদাল-ফাবড়ার বাঁট সাধারণত বাবলা নিম শ্যাওড়া বা তেঁতুলের ডাল দিয়ে তৈরি হয়। সেই বাঁট আবার লোকবিশ্বাস আর সংস্কারের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।

আঁতুরে-মরা ছেলেমেয়েকে দাহ না করে গাঁয়ের বাইরে শ্যাওড়া ফণিমনসা বাবলা গাছের ঝোপঝাড়ে ঘেরা পরিত্যক্ত জায়গায় গর্ত করে পুঁতে দেওয়া হয়। তার সঙ্গে আঁতুরের বর্জ্য কাঁথাকানিও। সেখানে মাটির উঁচু ঢিবি ক’রে তার ওপরে ‘ঠেকন’ হিসেবে পুঁতে দেওয়া হয় কোদাল থেকে খুলে নেওয়া বাঁটটি। এমনিতে কোনও সন্তানের ওপর মা রাগ ক’রে তার মরণ কামনা করতে পারে না! শুধু রেগে গিয়েই এমন বলে থাকেঃ- ‘কোদালের বাঁট’ অর্থাৎ ‘যা, তুই মরে যা, তোকে গাবায় (নদী বা পুকুরের গর্ভে) পুঁতে কোদালের বাঁট গেদে (পুঁতে) দেব।’ গ্রামের বাইরে আঁশশ্যাওড়া আঁশফল ফণিমনসা নীলকন্ঠলতায় ঘেরা জঙ্গল। সন্ধেবেলা ঐ সব ঝোপঝাড়ে যাওয়া বারণ। এমনকি নির্জন দুপুরেও তোমাদের যেতে ভয় লাগত। ওখানে নাকি শিশুর ওঁয়াও ওঁয়াও কান্না শোনা যায়। ডাংগুলি বা ঝেল্লু খেলবার সময় যদি কেউ ভুল ক’রেও ওদিক ছাঁটে, তবে তাকে ভর সন্ধেবেলাতেও তিন ডুব দিয়ে ঘরে ঢুকতে হবে।

 

এইসব কথ্যভাষার মধ্যে লেগে থাকে অনেকখানি মায়ামমতা আর মাটির সোঁদা-গন্ধ। এইসব শব্দগুলির মধ্যে সমাজের নানা প্রসঙ্গও জড়িয়ে থাকে। বীরভুম জেলার মুরারই সন্নিহিত অঞ্চলে একটি শব্দ প্রচলিত আছে। এখনও কোনো কোনো মুরুব্বির মুখে শোনা যায়। সেটি হল ‘বুঁদি’। পাহাড়ের দিকে কেঊ কেঊ বলে থাকে ‘বুন্দি’, যার অর্থ হল পাকিয়ে পাকিয়ে বেঁধে তৈরি খড়ের কাঠামো। বুঁদি অবশ্য অন্য কিছু, আগে যখন গ্রামে দেশলাই-এর চল ছিল না- তখন চাষীরা হাত-চারেক দীর্ঘ খড়ের মোটা দড়ি পাকিয়ে আগুন করে মাঠে নিয়ে যেত সেই আগুনের সাহায্যে তারা থেলো হুঁকো বা বিড়ি ধরাত। বর্ষার সময় এই দড়িটিকে লাঠিতে বেঁধে মাথালির নিচে রেখে দিত-বৃষ্টিতেও যা নিভত না। আর একটি বিষয় শুনে বড় ভালো লাগে যে, একটি বিশাল মাঠ, তার চারদিকের গ্রাম থেকে কি হিন্দু কি মুসলমান বহু চাষীভাই এসে চাষ করছে, আর যখন নেশা চাগিয়ে উঠছে তারা ওই একটি উৎস থেকে আগুন নিচ্ছে। কী বলা যায় একে? আগুনের সখ্যই বলতে হয়। এখন এই কৌশলটি কোনো কোনো পানবিড়ির দোকানে দেখতে পাওয়া যায়- একটি পাকানো পাটের দড়ি পুড়ে চলেছে, আর তা থেকে অনেকে আগুন নিচ্ছে। আবার বর্ষাকালে যখন পাঁচ-ছ দিন ধরে লাগাতার ভারী বর্ষণ হয় তখন চারদিকে জলে মগ্ন। মানুষ, গরু, মোষ, ছাগল, ভেঁড়ার দুর্গতির সীমা নেই। সেই সময়ের নাম ‘কাঁড়ান’ তারাশঙ্করের ‘গণদেবতা’তে এই শব্দটির উল্লেখ আছে। এখনো বহু লোক বলে। মুরারই-এর দিকে একেই বলে ‘গাজল’। গ্রামের অনেক পাড়ায় বৌ-ঝিরা আজও কোন্দল করে, ঝগড়া করে, তাকে বলে ‘ল্যায়’। খুব সম্ভবত লড়াই বা ন্যায় (যুদ্ধ) থেকে এসে থাকবে কথাটা। কোন্দলে তো অকথা- কুকথা মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায়-সে প্রসঙ্গ তুললে তারাই বলে –‘ব্যাতের কথা বেরিং গেচে গো’। ছেলেবেলায় বুঝতে পারনি, পরে জেনেছ- এই ‘ব্যাত’ সংস্কৃত ‘বক্ত্র’ থেকে এসেছে। তোমরা যারা কোপাই রেল-স্টেশনের লাগোয়া গ্রাম ন’ডাঙ্গাল বাবুইয়ে হরিরামপুর আলবাঁধা দমদমা দেবানন্দপুর নিমগড়িয়া ডুমুরিয়া খয়েরগড়ে খাঁ-য়েরপাড়া রতনপুর শ্রীনিধিপুর সর্পলেহনা কলহরপুর গ্রামের ধুলোকাদায় মানুষ হয়েছ, তারা এক বিশেষ বাচন-ভঙ্গিমার সঙ্গে পরিচিত। এই ভাষাভঙ্গির মধ্যে একাক্ষর বা একধ্বনির (মনো-সিলেবিক) শব্দই বেশি। উচ্চারণ-সংক্ষিপ্তি আর উচ্চারণে অক্ষমতা বা আলস্য এর অন্যতম কারণ। যেমন- অ আ ই ও উ এ ক খ গ চ ত থ দ ধ ন ম। একটি ধ্বনিতেই একটি শব্দ লুকিয়ে থাকে, যেমন-

ক দিন র (কয়েকদিন থাক)।

খ দ কর (খাওয়া দাওয়া কর)।

অ তাই? (আচ্ছা তাই?)। শ শ নোক (শত শত লোক)।

উ কি কথা! আ থাম দিকিনি।

চ বেড়িং আসি। (চল বেড়িয়ে আসি)

স স, টিকতে হলে স (সহ্য কর সহ্য কর, থাকতে হলে সহ্য কর)।

দু বোলটিন/বালটিন জল ব (বয়ে আন)।

শুনে আমি থ (স্তম্ভিত)। গন্ধে ম ম ( গন্ধে মদির)।

বেটার গা ধ (ধুয়ে দে)।

হ চ চ (হ্যাঁ চল চল)।

ই আমার বুন গ (এ আমার বোন গো)।

জমিতে নঙ্কা বেগুনের প (চারা) দোবো।

চাল ট ভালো করে ছ (ছাইয়ে দে)।

আগে হ পরে ক (আগে কিছু হও পরে উপদেশাদি দাও)।

ত ট লিয়ে আয় দিকিনি খান কতক রুটি গড়ি (তাওয়া টা )

ল গাঁয়ের ল বউ এয়েচে (নবগ্রামের ন বউ)।

র ঠ করে কাজ হয় না বুঁইলি? (রয়ে/থেমে বসে)।

এইসব কথার মধ্যে লেগে থাকে অনেকখানি মায়ামমতা আর মাটির সোঁদা-গন্ধ। তুমি বার বার ভাবো, কালের নিয়মে কত কিছুর পরিবর্তন হবে সেটি সত্য, কিন্তু একটি ভাষা-জননীর দেহে সম্পৃক্ত মায়াময় শব্দরাজি হারিয়ে গেলে সামাজিক ইতিহাসের ক্ষতি হয়ে যাবে। কারণ ভাষা শুধু ভাষা মাত্র নয়, এর মধ্যে লুকিয়ে থাকে আমাদের পারিবারিক-সামাজিক- লৌকিক জীবনের বাস্তব যাপনচিত্র। একটি শব্দের মাধ্যমে সহজেই ঢুকে পড়া যায় সমাজ-জীবনের অন্দর-মহলে। আজও নবান্ন উৎসবে বা চৈত্র মাসের চড়ক পুজোয় মাঝে মাঝে গ্রামে গেলে দেখতে পাও জগাই কাকা তার মাটির উঠোনে নবনীকাকাকে সঙ্গে নিয়ে গান ধরে। একেবারে আকাঁড়া মাটির গান, সে গানের ভাষায় লাগে নি কোনও নাগরিক আবিলতা।

“সঞ্ঝে বেলায় কুঞ্জে এঁসে

কিষনো জখুন ডাঁড়াইন (দাঁড়ায়) হেঁসে

পিরিতির সুর তোলে পুড়াবাঁশি

রাক্কোরোনা (রাগ কোরো না) অ রাদিকে (রাধিকে)

চেঁয়ে দেকো আমার দিঁকে

একবার দেকি তুমার মদুর (মধুর) হাঁসি।”

অনার্সের ক্লাসে ছাত্রছাত্রীদের চণ্ডীদাস জ্ঞানদাসের যে পদ পড়িয়ে আসো, তার সঙ্গে এই লোকগান যেন মিলে যায় একতানে। এটিই তো জাতির ভাষিক-পরম্পরা। এইতো গর্ব করার মতো সম্পদ। মাটির উঠোনে গাওয়া ওই গান বার বার তোমার কানে কানে বলে- দেখো ফাল্গুনী, ভাষা-জননীর এই আঁচলে কোনও ভাষা–রিরংসা, ভাষা-অবদমন বা ভাষা-সন্ত্রাস নেই গো!

ছবি : সংগৃহীত

পূর্ববর্তী সংখ্যা

এখন বাড়িতে বসেই সংগ্রহ করতে পারবেন আমাদের প্রকাশিত বইগুলি। ভিজিট করুন আমাদের অনলাইন সপ, আর কিনুন আমাদের বই। নিচের BUY NOW বোতামে ক্লিক/ট্যাপ করলে পৌঁছে যাবেন আমাদের সপ পেজে।