সাপ্তাহিক

২৪ মাঘ ১৪২৭

Painting:Robert Rauschenberg

কুমারেশ তেওয়ারী

দেখা

ধরো তুমি হেঁটে যাচ্ছ মাঠের উপর, সঙ্গে বন্ধু

তুমি দেখলে অয়ী লাবণ্যময়ী ফুল! 

বড় বড় পাপড়িতে নান্দনিক

বন্ধু দেখল ফুল, ফুলের ভেতরে বজ্রকীট 

চেটে চেটে খেয়ে যাচ্ছে জমানো যেটুকু আলো 

 

বন্ধু দেখল গাছ, অনন্তের ছায়া নিয়ে প্রসারিত বাহু

তুমি দেখলে গাছের ভেতরে নদী

নদীর জলে স্রোতের গুণ 

জ্যোৎস্না নামের মেয়ে নৌকা চালিয়ে চলে যাচ্ছে দূরে 

 

দুজনের চোখেই ক্যামেরা

একই ক্ষমতাসম্পন্ন লেন্স

তবু বন্ধু দেখল মেঘে মেঘে ঘষা লেগে বিদ্যুৎ চমকালো

দিগন্ত দিলখুশ

তুমি দেখলে চকমকি পাথর ঠুকে

                আগুন ধরালো প্রমিথিউস

 

 

ইমামুল মোত্তাকিন

ক্ষীয়মান আলো

অথবা ক্ষীয়মান আলোর নহরে

খুঁজে ফিরে দু’টি সাদা ভাত

কিছু ডালের কণা আর মাছের কাঁটা

তোমরাই শুধু থাকবে শাদা বাড়িতে

আর খাবে দুধভাত! 

সুজন পণ্ডা

কবিতা

নদীর বাঁধানো পাড়ে দাঁড়িয়ে

আমি স্রোত ছুঁতে চেয়েছি      

কোথায় কোন খানে এক

অজানা হিমবাহ পাঠিয়েছে বার্তা কিছু

পাঠিয়েছে ভারী দুঃখ 

পাঠিয়েছে রুপোরং কান্না 

 

আমি সোহাগ করে কুড়িয়ে এনেছি 

কিছু মসৃণ পাথর খণ্ড 

কয়েক মুঠো বালি 

 

পাথর দুঃখের চেয়ে ভারী 

বালি কান্নার চেয়েও রুপোলি

 

দীপায়ন পাঠক

যুদ্ধ

আর চোখ খুলব না ঠিক করেছি 

 

রাষ্ট্র যেমন চায় 

অন্ধ হয়ে থাকব কিছুদিন 

 

পকেট ফাঁকা হলেও

হাসি রাখব মুখে 

চায়ের দোকানে বসে 

খবরের কাগজ পড়ব  

 

ধরে নেব আমাদের কোনও কষ্ট নেই 

তেলের দামও প্রয়োজনেই বাড়ে 

 

সরকার যেমন বলে 

আরও কিছুদিন তোতাপাখি হব 

 

গ্যালারিতে বসে হাজার মানুষের সাথে

চিৎকার করে বলব 

 

এ যুদ্ধ আমাদের জন্য 

 

 

নীলাদ্রি দেব

ডায়েরি-এক

হারিয়ে যাচ্ছে 

হারিয়ে যাচ্ছে আলো 

তবু আলোর পেছনে ব্যর্থ ছুটে চলা 

ছায়ার পেছনে ছায়াপথ থাকে! 

জীবনের শেষ শুরু অদ্ভূত আশ্রয়ের মতো 

কিন্তু সুতা পেঁচিয়ে গিট 

সমাধান সমাধান বলে হোর্ডিং, ফ্লেক্স 

স্নেহপদার্থ গলে গলে যায় 

অসম্ভব কথার পাশে তীব্র শিস দিয়ে যায় 

                               রাত জাগা পাখি 

অন্ধকার গাঢ় হয় 

প্রশ্ন!

প্রশ্ন গড়িয়ে যায় কাচের দেওয়াল দিয়ে

 

 

Painting:Robert Rauschenberg

“হৃদয়ের গান শিখে তো...”

পর্ব-১০

ফাল্গুনী ভট্টাচার্য

এই ভাবে দিন চলে যায়। রাত নেমে আসে। রাত শেষে ভোর হয়। সব ভোর কি সমান আলোময়? মাঝে মাঝে থাকেও বুঝি অন্ধকার। আবার কখনো রাতের চাঁদের আলো দিনের মতো উজ্জ্বল। গাছের পাকা বেল বা পেঁপে ঠিক নজরে পড়ে। দেখা যায় মোহনচূড়া পাখি। এই গাঁয়ের পাখি ওই গাঁয়ের আকাশের দিকে উড়ে চলে। দূর গ্রামের পাখি উড়ে আসে এই গ্রামের দিকে। আর অনেক কষ্টক্লেশের দিন- রাত্তির পেরিয়ে এইভাবে একদিন হুস করে টেন-এ উঠে গেলে তুমি। থুতনির কাছে জমে উঠেছে একগুছি দাড়ি। গলার স্বর আর একটু মোটা হয়ে উঠছে। রবীন্দ্রজয়ন্তীতে ‘দুঃসময়’ কবিতা গড়গড় করে বললে আর বাংলার স্যার খুশি হয়ে বললেন—‘ওরে বিহঙ্গ ওরে বিহঙ্গ মোর, এখনি অন্ধ বন্ধ কোরো না পাখা’। মদনকাকু একটা দুধবালা আইসক্রিম দিয়ে বলল,-‘খাও বাপ পয়সা লাগবে না’।

তুমি বললে ‘এমনি এমনি?’ মদন কাকু হেসে বলল-‘না,না, এমনি এমনি কেন হবে! বড় হয়ে শোধ করে দিও।’

ক্লাস টেন। সামনেই মাধ্যমিক। তোমাদের স্পেশাল কেয়ার করে মাস্টারমশাইরা এক্সট্রা ক্লাস নিলেন বেশ কদিন। হেড স্যার স্কুলের অফিস ঘরে থাকতে লাগলেন। একদিন দেখলে কলতলায় তিনি প্রেশার কুকার মাজছেন। ডেকে বললেন-‘শোন, তুই তোর বাবার সঙ্গে স্কুলের সরস্বতী পুজোটা কর।’ রাজি হয়ে গেলে। ক’দিন বেশ কবার ‘যা কুন্দেন্দুতুষারহার ধবলা। যা শুভ্রবস্ত্রাবৃতা…’ পড়ে পড়ে মুখস্থ করে নিলে।

শুধু পুজো নয়, টেনের ছেলেরা নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘প্যালারাম নিরুদ্দেশ’ নাটক করছে। তুমি করবে প্যালারাম চরিত্র। পুজো অঞ্জলি প্রসাদ বিতরণ। মাইক লাগানো হয়েছে চারটে চোঙ চারদিকে টাঙিয়ে গান বাজানো হচ্চে এল পি রেকর্ডে। দু’চারটে রবীন্দ্রসঙ্গীত। তারপর কিশোরকুমারের ‘চোখের জলের হয় না কোনও রঙ’, মহঃ রফির ‘ওই দূর দিগন্ত পারে’, লতা মঙ্গেশকরের ‘আকাশ প্রদীপ জ্বলে’ বাজতে লাগল। মুকুল মাঝে মাঝে হুঙ্কার ছাড়ছে- ‘আজ সন্ধ্যা সাত ঘটিকায় আমাদের নাটক ‘প্যালারাম নিরুদ্দেশ’। আপনারা দলে দলে এসে আমাদের নাটক দেখুন ও আনন্দ লাভ করুন।’ মাঠে নরম রোদে বসে খিঁচুড়ি বাঁধাকপির তরকারি আর বিলিতি বেগুনের চাটনি। হোস্টেলের অমরদা আর তার দুজন সঙ্গী রান্না করেছে। বড় বড় বালতি নিয়ে পরিবেশন করল নাইনের ছেলেমেয়েরা। শেষ পাতে বোঁদে। তারপর “আসছে বছর আবার হবে” ধুয়ো তুলল হাজার খানেক কণ্ঠ। ঝরনা সরমা মায়া বাসন্তী অসীমা অরুন্ধতী মায়ারা শাড়ি পরেছে, কেমন বড় লাগছে। নাঃ চন্দ্রকলা নেই। ও তো শ্বশুর ঘরে। দীননাথ স্যার অমিয় স্যারের তদারকিতে ব্যাকসিন ড্রপসিন লাগানো মঞ্চ রেডি। সামিয়ানা দেওয়া হয়েছে সামনে। মুকুল আবার ঘোষণা করে- আর কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হবে আমাদের নাটক ‘প্যালারাম নিরুদ্দেশ’। সন্ধেবেলায় নাটক কাজকম্ম গুছিয়ে গাঁয়ের সবাই নাটক দেখতে আসবে। নাটক জমে গেছে। সবাই খুশি। দিনের তরকারি চাটনি গরম করে নিয়েছে অমরদা। আর করেছে গরম ভাত নতুন ওঠা আলুর পোস্ত। হোস্টেলের ছেলেদের সঙ্গে বসে তোমরা খেলে। তারপর হলঘরে শতরঞ্জ পেতে সাইড আর ড্রপসিনগুলো ঢাকা নিয়ে শুয়ে পড়লে।

ভোরবেলা কাঁপুনি দিয়ে ঘুম ভেঙে গেল। ওই পাতলা কাপড়ের পর্দায় শীত কাটে! দু’চারজন বন্ধ ঘরেই বিড়ি টানছে। স্যাররা কেউ নেই বলে সব সম্রাট শাহজাহান হয়ে গেছে। বৈকুন্ঠ মান্নার গান ধরল-“পৌষের কাছাকাছি রোদ মাখা সেই দিন ফিরে আসবে কি কখনো?’ মুকুল গাইতে লাগল-‘ জাগো, নতুন প্রভাত জাগো, সময় হল” এ গানে সে গানে ভোরের আলো ফুটল।

জুনের প্রথমে মাধ্যমিক পরীক্ষা। সেন্টার হল বোলপুর হাই স্কুল। সকাল দশটা থেকে পরীক্ষা। ভোরবেলার একটাই ট্রেন- রামপুরহাট প্যাসেঞ্জার। ওটাতেই যেতে হবে, তারপর পরীক্ষা দিয়ে বিকেলের ট্রেনে ফিরতে হবে। সারাদিন ভাত জুটবে না। ভাত জুটবে না? যে খায় চিনি তাকে যোগায় চিন্তামণি। বোলপুর স্টেশনের পুবদিকে দেবুদাদার রেল কোয়ার্টার। ওখানে দেবুদাদার ভাই সন্তোষদা থাকে আর রেডিও টিভি মেকানিক্সের ট্রেনিং নেয়। সন্তোষদা বলল -‘ফাগুন তুই ভোরবেলা ট্রেন ধরে চলে আসবি, একটু পড়ে নিবি। তারপর আমি তো সেদ্ধ ভাত খাই, তোর জন্যও দুটো রেঁধে দেব।’ তুমি হাতে আকাশ পেয়ে গেল। বাথরুমে চান করেই দেখলে সব রেডি। স্টোভ জ্বালিয়ে ভাত, ডিম-আলু সেদ্ধ আর ঘি। পরীক্ষার সময় ওই ক’টা দিন সন্তোষদা মায়ের মতো রান্না করে খাইয়েছে। এখনো তোমার মনে পড়ে মাঝে মাঝে।

বোলপুর হাই স্কুলের সামনে পিল পিল করছে ছেলে। কে কার খবর রাখে? যারা অবস্থাপন্ন তাদের বাবা মা অথবা কাকা টিফিন কিম্বা একটা ডাব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। খাতা জমা দিয়ে তুমি ফিরে চললে স্টেশনের দিকে তাড়াতাড়ি। দানাপুর প্যাসেঞ্জার ধরে বাড়ি ফিরতে হবে। ট্রেনে চেপে তোমার আবার পেট ডাকতে শুরু করল। পেট কথা শোনে না, বাধা মানে না। কেবল ডাকে। কেন এত ডাকে? পেট ডাকে বলেই তো এতো আয়োজন। এত চাষবাস, কাজকম্ম, প্রতিযোগিতা। পেটের জন্যই কতদিন হয়ে গেল গ্রাম ছেড়ে এই শহরে আছো। কিভাবে বসন্ত এসে চলে গেল, বর্ষা এলো। কত গাছের পাতা ঝরে আবার নতুন পাতা এলো। তোমার দেখা হল না। শুধু মাথা নিচু করে হালের বলদের মতো বোঝা বয়ে চলেছ ফাল্গুনী। বর্ষা শেষের এক সন্ধেবেলা সাহেবগঞ্জে নেমে সন্তোষ দা দরজার কাছে ডেকে বলল,- ‘ফাগুন ফাগুন, রেজাল্ট বেরিয়েছে, ফার্স্ট ডিভিশন।’ মা খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠলেন। বাবা চুপ করে ভাবতে লাগলেন। তুমি কি বোঝোনি সেই নীরবতার মাঝে কত কিছু ছিল? চিন্তা আর অন্ধকারে একটা রাস্তা খোঁজার আপ্রাণ প্রয়াস ছিল। এরপর? এরপর? ভেবে রেখেছ আর্টস নেবে। মা-কে বললে, ‘কাল কোপাইয়ে শিবনাথদার কাছে যাব। ইলেভেনের বই হাফদামে দেবে বলেছে। নিয়ে আসব।’ আর রামকৃষ্ণ সেবা বিভাগে অ্যাপ্লাই করব বৃত্তির জন্য। তিন মাস অন্তর ষাট টাকা করে দেবে। হয়ে যাবে মা । আর ক’টা ছেলেকে টিউশন পড়াবো। মা বলল, ‘হ্যাঁ, হতেই হবে। চলতে জানলেই পথ। চলতেই হবে।’ আজ একান্নতে পা দিয়েও এখনো ভাবছ। আর অস্ফুটে মা-কে বলছ-, ‘চলা তো থামাইনি মা। চলছি।’ মাঝে মাঝে হাঁপিয়ে উঠলে তোমার দিদিমা যেন কানের কাছে মুখ এনে বলে- “এমনি করে বাঁচতে হবে। তাপ ভাপ লাগবে ঝড় ঝাপট লাগবে। কিন্তু মনে মনে প্রতিজ্ঞা রাখতে হবে পারব, আমি পারব।”

Painting:Robert Rauschenberg

কবিতা আশ্রম মুদ্রিত সংখ্যা থেকে

গত নভেম্বর থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত সন্মাত্রানন্দের অসামান্য উপন্যাস 'মেঘবতী'-র বারোটি অধ্যায় পড়ুন

পূর্ববর্তী সংখ্যা

এখন বাড়িতে বসেই সংগ্রহ করতে পারবেন আমাদের প্রকাশিত বইগুলি। ভিজিট করুন আমাদের অনলাইন সপ, আর কিনুন আমাদের বই। নিচের BUY NOW বোতামে ক্লিক/ট্যাপ করলে পৌঁছে যাবেন আমাদের সপ পেজে।