সাপ্তাহিক

১৪ চৈত্র ১৪২৭

ডাক

বিভাস রায়চৌধুরী

১

একে তো বসন্ত, তার ওপর ২১ মার্চ বিশ্ব কবিতা দিবস। পালা রে…পালা রে মন! কবিতা আশ্রম-এর কয়েকজন পালালাম এক পাহাড়তলিতে। সেখানে পলাশ জঙ্গল। পলাশ আমাদের পাঠাল মহুয়ার কাছে। মহুয়া বলল, “ওই যে কুসুম গাছ।” কুসুম চুপচাপ দেখাল বনপথের দু’পাশে লক্ষ-কোটি বছরের স্তব্ধ পাথর…আর নাম-না-জানা তরু-লতা। এখানে পাখির গান। এখানে মৌমাছির মধুপান। এখানে ভালবাসা যৌথ খামারের সুঘ্রাণ দেয় মানুষকে।  আমরা অরণ্যের কাছে জানলাম, যার যেটুকু আছে তাই নিয়েই নিজেকে ফুটে থাকতে হয়। এই পৃথিবী এক মহা অরণ্য। কবিতা ও পৃথিবীর মধ্যে সম্পর্ক-সেতু হল অশ্রু। অশ্রুই মানুষের শালফুল। বনপথ সেই কান্নায় পাগল হয়ে আছে…

এরপর পলাশ গাছে আবির। 

কুসুম গাছে কবিতা দিবস। 

‘নির্মল হালদার’-গাছে নাচ। 

 বন্ধু-বন্ধু মহুয়া পান…

নেশা গাঢ় হলে হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের চিৎকার করে ডাকলাম, “বন্ধু, তু মি কো থা য় ? ? ?”

পাহাড়তলি ফেরত পাঠাচ্ছে কথা…আর আমরা হারিয়ে যাচ্ছি মায়াবী অতলে…

মায়া…মায়া…

২

কে ডাকে? এমন ডাকে?

রক্তের ভেতর থেকে উঠে আসে মধুজলধারা

 

পাথর এখানে দেখি আয়ুর অধিক ঝম্পে

             পাথর হয়েই থাকে

 

লক্ষ বছরের আলোড়ন

জলের জিহ্বা চিহ্ন 

এইসব ঘুরে ফিরে দেখি…

 

সন্তানেরা শালফুল কুড়োতে কুড়োতে

 চোখের বাইরে চলে যায় 

 

‘তোমার কবিতা ওরা?’

—পৃথিবী আমাকে ডাকে গাঢ় ইশারায়!

নির্মল হালদার

পলাশ উদযাপন

যে রঙ‌ই দাও রক্তকে দেবে না

রক্তই প্রকৃত বসন্ত আমার—

উথাল পাথাল

 

সূর্য-গ্রহ-তারা ডুবে ডুবে মরে

 

পলাশ পল্লবে গান

পারমিতা ভট্টাচার্য

দু এক ফোঁটা শিশির জমে

পাখির ঠোঁটে,

পলাশ, পলাশ!

আমরা তখন মাঠের বুকে

ছৌ নৃত্যের পরশ মেখে

আত্মহারা;

এমন রাতে আধেক চাঁদের

জোয়ার এলে,

গানের তালে চুপ মহুয়ার

ভাসছে সুবাস!

সকাল হলে,

গাছের পাতায় আবিরগুঁড়ো…

রোদ ঝিমঝিম শালের বনে

সবুজ আলোয়,

বসন্ত উৎসব!

পলাশ পলাশ পল্লবে গান

স্বপ্ন কবিতার…

পান করে তাই দুচোখ ভরে

নৃত্যে মাতাল চিরসবুজ

নির্মল হালদার!

ত্রিপুরারী

ভাস্কর সুতার

পাহাড়ে উলঙ্গ অথচ উচ্ছ্বাস 

এখানে ঝড়ে বেদানার লাল, আলোপ্রকৃতি –

কুসুমের পাতা বিভাসিত চোখ দুটো

রেখে যেতে হবে মায়া 

প্রকৃতি এক নারী

সে প্রস্তাব গ্রহণ করাই হয়নি

 

এরপরও যেতে হয়,

স্পষ্ট পালকের গ্রহ ব্রহ্মাণ্ডের দিকে 

সেদিন ভোরে দেখেছিলাম

এই দেহ ছাপা অক্ষর মাত্র,

স্পষ্ট আলিঙ্গন চুম্বনের দিকে ঝুঁকে আছে আত্মা 

 

ও বন্ধু তোমার জন্যই

এই চারদিন প্রকৃত পলাশের রং

প্রকৃত প্রেমিকার কাছে

পাখিও উলঙ্গ মহাশূন্যের দিকে

জড়িয়ে ধরেছিল আর সন্ন্যাসী বুঝেছিল

জীবন অক্লান্ত পলাশ!

 

গন্ধকে উপেক্ষা করো! প্রিয় বন্ধু ত্রিপুরারী

 

প্রত্নদুহিতা

বন্যা লোহার

বাতাসে রটে গেল কার অঙ্গ সুবাস

আগুন আগুন পলাশে 

কে রেখেছে পা?

 

যক্ষিনীর ঘুম থেকে 

উঠে আসা লক্ষীমন্ত মেয়ে

এই বনপথে ভ্রষ্ট হতে এসো না। 

 

আমাদের চোখে মুখে নাগরিক লোভ 

তোমাকে ছুঁয়ে দেব এত বড় হাত!

 

তোমাকে পাহারা দিক 

প্রাচীন বাঘের মাথা 

তোমাকে পাহারা দিক 

পাথরের পিতামহ দাঁত।

 

জীবন সহজ হয় পলাশের গুণে

কুমারেশ তেওয়ারী

১

বিভাসদা যখন লাল আবিরে পলাশ গাছের বাকলে লিখে দিচ্ছেন “কবিতা”, তখন, হ্যাঁ হ্যাঁ বিশ্বাস করুন, আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম কাছের ওই পাহাড়ের চোখ দুটি কী এক জাদু-বাস্তবতায় চোখের গোলক ছেড়ে উড়তে উড়তে এসে থমকে দাঁড়িয়ে রইল বিভাসদার আঙুলের একেবারে কাছে! আমার কান যেন পরিষ্কার শুনতে পেল পাহাড়ের স্বর— “চোখ দুটো পাঠালাম বিভাস, একটু দেখতে চাই, মানুষ কীভাবে কবিতা লেখে।” ততক্ষণে তো এক ব্যাগ নির্মল আনন্দ নিয়ে চলে এসেছেন নির্মলদা। পুরুলিয়ার বিরাট শিশু।  ঠিকই শুনছেন ‘শিশু’। আজ্ঞে হ্যাঁ, আমার সাহস আছে নির্মলদাকে শিশু বলার। যার হৃদয়ের অন্তস্তলে সহস্র শিশুর বাস তাকে তো গলা ফুলিয়ে শিশুই বলব। আপনি কি দেখেননি নির্মলদা চোখ মেলে তাকালেই তাঁর চোখের পুকুর থেকে ভিজে গায়ের শিশুরা বেরিয়ে এসে ফসলের গান গাইতে থাকে। নির্মলদা কথা বললেই তাঁর স্বরের ভেতর থেকে ডানাওয়ালা শিশুরা বের হয়ে এসে কবিতা বলে মাটি আর মানুষের। 

অর্ণব মানে আমাদের বাবলে যেন একাই কবির সুমন অথবা পিট সিগার। গিটার নামক নামক বাদ্যযন্ত্রটি থাকলেই হল, ব্যস। তার উদাত্ত কণ্ঠে “বকুল ফুল বকুল ফুল, সোনা দিয়া হাত কেন বান্ধাইলে” বাতাসে ছড়িয়ে পড়তেই সেই বিরাট শিশুর কী নির্মল নাচ! এ নাচ নির্মলদার। বড় পবিত্র। আমি-আপনি নকল করে নাচতে গেলেই দুষ্টু পোকারা রোমকূপ থেকে বেরিয়ে এসে বলবে, ভুল ভুল, সব ভুল। আর অমিত, ও একটা কঙ্গো কিনেছে নতুন। সারাক্ষণ বাজিয়ে গেল তাল ঠিক রেখে। অথচ ও তো কোথাও ওই যন্ত্রটি বাজানো শেখেনি। আসলে অমিত স্বীকার করুক আর না-ই করুক, ও কিন্তু মোটেই বাজাচ্ছিল না। ওর আঙুলকে নিমিত্ত করে বাজিয়ে দিচ্ছিল রাঙা পলাশ, ধূসর পাহাড় আর রসভারে নত মহুয়া গাছের হাত। সুতরাং নির্মলদার নাচ, বাবলের গান আর অমিতের বাজানোর সারল্যকে ঘিরে গোল হয়ে বসে থাকা আমরা মানে জয়দেব বঙ্কিম কনক বাবু পারমিতাদি বন্যা টিঙ্কুদি মৃত্তিকা ভাস্কর মুস্তাক যেন গুটিকয় গুটিপোকা, গুটি ফাটিয়ে বের হয়ে এসে প্রজাপতি! যেন মনে হয় উড়ে চলে যাই ওই পাহাড়ে, ওখানে পাথরের চাঁইয়ের ওপর বসে কোরাস ধরি—আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে। 

 কবিতা আশ্রমের গুটিকয় আশ্রমিক এবারের পলাশ পরবের জন্য নির্বাচিত করেছিলাম পুরুলিয়ার একটি পাহাড়তলি। পাহাড় দিয়ে ঘেরা এই বনতল প্রকৃতির এক বিস্ময়। পলাশ গাছেরা তাদের আগুনে-শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে। পলাশ জঙ্গল দেখতে দেখতে একটা প্রশ্ন বিদ্যুৎ চমকের মতো ধাক্কা মেরেছিল মাথায়—আচ্ছা, প্রমিথিউস কি স্বর্গ থেকে আগুন চুরি করে এনে মর্ত্যে ছড়িয়ে দেবার আগে রেখেছিল পলাশ গাছের ডালে? নইলে এত আগুন কোত্থেকে পেল পলাশ? 

 মাঝে মাঝে কত মহুয়ার গাছ। টুপটুপ ঝরে পড়ছিল মহুয়া দল জঙ্গলের শুকনো বিছানায়। দু-একটা হয়তো আমাদের মাথাতেও এসে পড়েছিল আর আমার মনে পড়ে যাচ্ছিল শিশুবেলায় শোনা সেই লৌকিক ছড়াটির কথা—টুপটুপানি টুপানি মাথায় কেন মে‘লি?/এ্যাংকুকুর ব্যাং খে’তে রে’তে কেন এলি? মনে হচ্ছিল জোরে চেঁচিয়ে বলি, হে মহুয়া, আমরা কতিপয় লোক তোমাদের প্রেম পাব, এই ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে এখানে এসেছি। ভিক্ষা দাও, দাও প্রেম “মুষ্টিভিক্ষা দাও”। 

“আঃ কী মিষ্টি খেতে”, কনকের কথায় ঘোর ভেঙে যেই মুখে দিয়েছি কুড়িয়ে নেওয়া মহুয়া, এক অপূর্ব অনুভূতি আমাকে যেন রাখালছেলে করে দিয়ে গেল! দেখি অন্যেরাও মুখের ভেতরে মউল রসের আনন্দকে রসিয়ে রসিয়ে ধরে রাখতে রাখতে পুরুল্যার সহজসরল লোক। 

যে-কোন‌ও মানুষের আয়ুষ্কালে হয়তো দুটো দিন খুব বেশি কিছু নয়। তবে আমি নিশ্চিত আমরা আমাদের রান্নাঘরে “সারিসারি নুন মশলার পাত্রে” দুদিনের সঞ্চয় করা রসদকে রেখে দেব আজীবন। জীবন যখন বিস্বাদ মনে হবে, সেই রসদের থেকে একটু তুলে নিয়ে মিশিয়ে দেব মনখারাপে আর বলব, ও মহুয়া, আমাদের যোগ্য করে তোলো, যেন  প্রকৃত মানুষ হয়ে তোমার কাছে যেতে পারি বারবার।

 

২

পলাশের বুকে লাল আবির ছুঁইয়ে ছুঁইয়ে 

কবিতা লিখছে বিভাস

তার চোখ দেখি চোখের কোনায় কি জল?

টলমল টলমল

আমি এই জলের নাম দিই ভালবাসা 

ডেকে বলি, বিভাস তোমার চোখে

এত ভালবাসা কেন?

বিভাস হেসে বলে, নির্মল নির্মল

পুরুল্যার নির্মল এলেই বাতাস

ভালবাসা বমি করতে করতে কী যে 

পাগল হয়ে ওঠে

আর আমরাও আবির হয়ে ছড়িয়ে পড়ি

গাছের বাকলে বাকলে

পাতাদের রান্নাঘরে উঁকি মেরে দেখি

বেড়ে রাখা পাত ভুলে কবিতা লিখছে কবিতা আশ্রম

 

আবহমান মালকোষ

মুস্তাক মুর্শেদ

গাড়ির জানলার কাচের বাইরে 

কঙ্কালসার হাভাতে আকুলতা 

আমাকে এখন স্পর্শ করছে না

 

কবিতা-ক্যাম্পে বসন্ত দেখব বলে,

শাল মহুয়ার মাঝে 

বিভাস বিলাবল শুনব বলে-

এই যে উন্মুখ বসে আছি-

 

 

তাই তো চাইলেই ছোঁয়া যায় এমন দূরত্বে

ভেসে ওঠা আবহমান মালকোষ

আমাকে ছুঁতেও পারে না…

 

 

২১ শে মার্চ

বঙ্কিম লেট

১

বালিশের তলে তরবারি রেখে

ঘুমোতে যাই রোজ। আজ ঘুমোলাম

পলাশকুসুম রেখে, আর স্বপ্নে তাকেই দেখলাম

যাকে দেখার জন্যে মরিয়া ছিলাম এতদিন

২

শুকনো পাতারা পিয়ানো। পাখি পাহাড়ের রাস্তা

দাপিয়ে দাপিয়ে মহুয়া কুড়োয় একঝাঁক শিশু

এখানে পথের পাশে ম্যানহোল নেই, খিদে আছে

৩

আমি সর্বদা পকেটে হাত ভরে থাকি

মানুষের যেমন স্বভাব !

সেলফি তোলার সময়ও পকেটে হাত

গাছ অনন্তকাল বাড়িয়ে থাকে হাত

পলাশ রঙের চাঁদ

কনক মণ্ডল

এই পথে কোনও পাপ নেই
আছে আছে ভালবাসা মহুয়া বাতাস। 
ওই পাহাড়ের তলে কাটিয়ে দিতাম
উন্মাদ জীবন বাঁশি। 
 
একটা পলাশ রঙের চাঁদ দিয়ে গড়তে পারি
পাহাড়ের গ্রাম-পথ-বনভূমি-নদী। 
দু’দিনের জন্য দেখা সখী
দু’দিনের জন্য আমাদের ভালবাসা। 
এসো এসো ছুঁয়ে দেখি পরস্পর মনোভূমি। 
 
সই তোমার সম্মতি আছে কি বা নেই
এ কথা বোঝার আগে চলো ঘুরে আসি
চিরন্তন পাহাড়ের ঢালে।

পুরুলিয়া-চাঁদ

অমিত সাহা

মাথার ওপর পলাশ রঙের পুরুলিয়া-চাঁদ

ফুসফুস জুড়ে শালফুলের গন্ধ

পায়ের কাছে একটু দূরে ছৌ-নাচ

ময়ূরের সাজে যে ছেলেটি তাকে ভুলতে পারছি না

কার্তিক সাজা মানুষটি কতক্ষণ

                 তার পিঠের ওপর চেপে!

বিশেষ শিশুর মতো চুপচাপ সহ্য করে

খুশি করার প্রচেষ্টা কান্না হয়ে যায়…

 

ওগো পুরুলিয়া-চাঁদ!

ওই ময়ূরের কথা কেবল তুমি ভাবো… 

কেবল তুমিই ভালবাসো

শিল্পীর ভেতরে বসে থাকা করুণ শ্রমিককে চিরকাল…

গত নভেম্বর থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত সন্মাত্রানন্দের অসামান্য উপন্যাস 'মেঘবতী'-র বারোটি অধ্যায় পড়ুন

পূর্ববর্তী সংখ্যা

এখন বাড়িতে বসেই সংগ্রহ করতে পারবেন আমাদের প্রকাশিত বইগুলি। ভিজিট করুন আমাদের অনলাইন সপ, আর কিনুন আমাদের বই। নিচের BUY NOW বোতামে ক্লিক/ট্যাপ করলে পৌঁছে যাবেন আমাদের সপ পেজে।