সাপ্তাহিক

১৫ ফাল্গুন ১৪২৭

Painting:Michael Post

তমাল বন্দ্যোপাধ্যায়

৮ ফাল্গুনের লেখা

দুঃখী সে-মেয়ের নাম বারবার কেন যে বলেছ!

তার যে ফুঁপিয়ে-ওঠা, ফেলে যাওয়া গানের খাতায়

কত শহীদের নাম লেখা ছিল, তাকে তো পড়োনি!

পড়োনি স্মৃতির রেখা শীত-শেষে কেমন কাঁদায়…

 

জানো, আজও তার মুখ ছুঁয়ে ছুঁয়ে জেগে উঠি ভোরে,

মলিন কান্নার সুরে ভুলে যাই বসন্ত-পিপাসা…

অপেক্ষার অনিবার্য দুঃখী বর্ণমালার আড়ালে

বারবার তাকে লিখি— শিমুলের প্রিয় বাংলাভাষা।

 

রূপময় ভট্টাচার্য

কর্মফল

জানলা বন্ধ হয়, ভেসে আসে দূরাগত স্বর
দুপুরবেলার ব্যথা বুকে চেপে রেখেছে শহর
তার তো ফসল নেই, হরিয়ালি ছেড়ে গেছে কবে
অনন্ত মাঠের ঘুমে, একদিন ঠিক দেখা হবে

দেখা হবে, মেঠোপথ, পলাশফুলের স্নেহমায়া
ঘরণী রান্না বেড়ে, বসে আছে উপবাসছায়া
ইতিহাস এক থাকতো? শাঁখাপলা খুব নিরুপায়,
বুদ্ধের বদলে যদি যশোধরা বাড়ি ছেড়ে যায় ?

অনেক বেলার দিকে, পায়ে মেখে শহরের ঘাম
সন্ন্যাসী বাড়ি ফেরে, মুখে তার গৌতমীনাম-
খাঁ খাঁ এক কুঁড়েঘর, হাওয়া শুধু যাতায়াত করে
নিখোঁজ সংবাদ রোজ পড়া হয় স্থানীয় খবরে

এমন গল্প নিয়ে, মরে যাওয়া হাজার বছর-
পুনর্জন্মে গৃহী, পাপভোগে একলা শহর
তারই সাধনপথে, গৌতমী ছেড়ে গেছে কবে-
অনন্ত নির্বাণ শেষে, একদিন ঠিক দেখা হবে

 

 

পৌষালী চক্রবর্তী

হিজড়া-মঙ্গল

তারা সব উরুক্কু বেলুন

তারা সব তালবাদ্য, ঢোল

খতিয়ান নম্বর শূন্য

উহাদের বৃন্দগান: ‘সবার ভালো হোক’!

 

দুই

 

নিস্তনী রেলদেহ; অযোনিসম্ভূত

মায়ের সন্ন্যাস ওই, কাটা পড়ে যায়

দুগ্ধঘ্রাণ উথলায় পড়শি আঙিনায়।

 

 

তিন

 

রন্ধন পটিয়সী পাড়া

মাঈ বাপে ফেলে গেছে কবে

ভস্মের অধিক ভস্ম

ফিনিক্স মন যতদূর নিয়ে যেতে পারে।

 

 

চার

 

বৃহন্নলার দেহে নামগান অষ্টোত্তর শত

বেপাড়ায় গুপ্তচরবৃত্তি

তৃণাদপি এই জন্ম; বারুদ ঘ্রাণের ক্ষত।

 

উজ্জ্বল গরাই

যাকর ঘুগি তাকর মাছ

হামিঅ খাস জঙ্গলমহলের লোক বঠি আইজ্ঞা…

 

মাওবাদীকেও দেখেছি 

আর সাথে পলাশ ফুইটতেও দেখেছি

 

উফা’ন মারা কাঁসাই নদীর পাশে

ভাষার কুটুস হাতে মিছিল হাঁটেছি কইলকাত্তা তক্ক

টুসুর গানে গানে ক্যামন দঢ় পতিবাদ ।

আইগনাল্লে সৈঁল্লা ফুল ফাবড়াইঁ বউটা সেদিন

জিতকার জিতকার করে উইছ্লে উঠেছিল্য

                 পরবের মতন ।

 

বউটাকে একটাও লাল পাইড় দিয়া

কাপড় কিনে দিতে পারিনাইঁখ্য কনঅদিন, 

ফুকলনে মু দিয়ে চুল্হায় ফুঁক দিঁতে দিঁতে

বউটার চৈখের জল 

মাড়ের ভাপে ধুঁয়ার মতন উড়ে যাইথ্য।

 

না ব হামার দুখের গল্প শুনাই

তুমাদের বেত তিতা কইরব নাই…

 

ধরনের দিনে মাটি কাইটতে যাঁয়ে 

বঝা সমেত পৈড়ে হঁয়ে পেটের ছিলাটা যেদিন গেল

সেদিনও ই দুখের কথা শুইনবার কেউ ছিল নাই বাপ

 

বাসি কথা ত আরঅ তিতা।

 

যে দেড়মাস বউটা কাজে যাইত্যে পারে নাই 

জবকাঁড়ে তার জৈন্যে খাপরাকুচি!

 

হামি জঙ্গলমহলের ভাষাসেনানী আইজ্ঞা।

 

বাপটা চিরকাল গাইল দিঁয়েছে…

ইয়াল্লে ঝাড়খন্ডে গেলে

নকি পেটের জৈন্যে ভাইবতে হৈথ্য নাই ।

 

বউটা কিন্তু কভু মু ফুলাই নাই ,

তার হাতের বালা দুটা ঝনঝন কৈরে

কানের কাছে বাইজে উইঠথ্য শলাবতের গানের মতন –

“যাকর ঘুগি তাকর মাছ মিছাই ভাব সাতপাঁচ

ঋজফূর্তি কর মনেক সুখে

মনরে বেঁহুশ হইল্যে ঘ্যারে লিবেক দুখে”

 

 

সৌরভ লায়েক

অধিকার

শুধু কি তাই! শুধু ভালবাসো বলে

এ যাবৎ সর্বস্বের অধিকারি 

                                 তুমি ?

 

সুনিপুণ হাতে পুয়ালের আঁটি বেঁধে

            ঘর হয়ে গেলে

                     সেখানে ক’দিন

                          থেকেছে ঘরামী ?

 

Painting:Michael Post

“হৃদয়ের গান শিখে তো...”

পর্ব-১৩

ফাল্গুনী ভট্টাচার্য

হায়ার সেকেন্ডারিতে হাইসেকেন্ড ডিভিশনে পেয়ে বোলপুর কলেজের পাঠ তোমার চুকে গেল। কাকাদের পিসিদের সাহায্য নিয়ে এই সময় দিদির বিয়ে হল। আরও কিছু ঝড়ঝাপটা এসে গেল তোমাদের জীবনে। পরীক্ষার রেজাল্ট বের হয়েও টেনশন কাটল না। এরপর? কাকারা পরামর্শ দিল- ‘আর সাধারণ পড়াশোনার করে লাভ নেই। এরপর চাকরির চেষ্টা করাই বুদ্ধিমানের কাজ। ক্লার্কশিপ এগজামগুলো দে।’ এই সময় তোমাদের পরিচিতি অনেক দাদা বোলপুরে ‘চিত্রা’ সিনেমাতলার কাছে কমলদার টাইপ অ্যান্ড শর্টহ্যাণ্ড স্কুলে ক্লার্কশিপ পরীক্ষার জন্য টাইপ অ্যান্ড শর্ট হ্যাণ্ড শেখে। তোমাদের গ্রাম ও পড়শি গ্রামের দুই দাদা দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন আর এনটিপিসিতে চাকরি পেয়েছে। যদি কিছু হয় এই আশা নিয়ে ভরতি হয়ে গেলে। মাসে কুড়ি টাকা মাইনে। দোতলায় বেশ কিছু টাইপ রাইটার- গোদরেজ আর রেমিংটন কোম্পানির। বেশ ক’দিন কোন আঙুলে কোন লেটারে চাপ দিতে হয় জেনে নিলে। তারপর A quick brown fox jumps over the lazy dog করে চারমাসেই স্পীড উঠল ৩৫-৪০ অর্থাৎ মিনিটে পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশটি শব্দ টাইপ করার দক্ষতা।

কটকট খটখট খটখট চ্যাঁ কটকট খটখট খটখট চ্যাঁ শব্দমুখর টাইপ-স্কুলে তোমার একদম মন টেকে না, বসন্তের মায়াবী দুপুর।

দূরে কোথাও পিন্টু ভট্টাচার্যের গান বাজছে-

“এক তাজমহল গড়ো

হৃদয়ে তোমার আমি হারিয়ে গেলে।

না থাক যমুনা কাছাকাছি ক্ষতি নেই

দুটি চোখে যমুনাকে ধরো।”

হারিয়ে যাবে যে এমন গভীর দরদভরা কারো হৃদয় কোথায়? কে আর চোখে শান্তশীতল যমুনাকে ধরবে? নীচ দিয়ে রিক্সা স্কুটার মানুষ চলছে। আর চলেছে কত ফুটফুটে মেয়েরা। গার্লস স্কুলের কলেজের । কী ফরসা তাদের গাল! হাত-পায়ের চামড়া কত চকচকে। মুখে চোখে বেশ সপ্রতিভ ভাব। কিন্তু চন্দ্রকলার মতো সেই সারল্য সেই মায়াবী চাউনি তুমি খুঁজে পাও না। রোগা-পাতলা গড়নের একটা মেয়ে হাঁটছে। ঢ্যাঙ্গা মতো একটা ছেলে- ঘাড় পর্যন্ত চুলওয়ালা একটা ছেলে তার সঙ্গে হাসতে হাসতে, কথা বলতে বলতে হাঁটছে। চোখ চলে যাচ্ছে ওই দিকে।পাশেই সিনেমা হলে সুধা চন্দ্রণের জীবন নিয়ে ‘নাচে ময়ূরী’ সিনেমা লেগেছে। ট্যাক্স ফ্রি। এক টাকা করে টিকিট। টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে একদিন দেখেই ফেললে। আর কী ভীষণ জীবনীশক্তি নিয়ে ঘরে ফিরলে। মনে মনে বললে, পারতেই হবে পারতেই হবে। একটা চাকরি পেতেই হবে। একটা একটা করে আবেদন করছ আর ডাকবাক্সে ফেলছ। এমনি করেই একদিন কল লেটার পেয়ে ট্রেনে চেপে পলতা স্টেশনে নেমে ব্যারাকপুরে এয়ারফোর্সে পরীক্ষা দিতে গেলে। মাধ্যমিকে ফার্স্ট ডিভিশনে থাকলেই দেওয়া যায়। দুটি সেকশন টেকনিক্যাল আর নন-টেকনিক্যাল। প্রথমে ইনিশিয়াল স্ক্রিনিং টেস্ট, জেনারেল অ্যাপ্টিচুড, ম্যাথামেটিক্স, টেস্ট অব রিজনিং সব কটাতেই উতরে গেলে। আঠারো’শ মত প্রার্থী ছিল, কমতে কমতে একান্নতে গিয়ে ঠেকল। হাতে পেয়ে গেলে তিনটে ফাইল আর বেশ কিছু ফরম। কাল এসব পূরণ করে নিয়ে আসতে হবে মেডিক্যাল আর ফাইন্যাল পরীক্ষার জন্য। তারপর হাতে হাতে জয়েনিং। হাতে যেন স্বর্গ এসে যাচ্ছে। কিন্তু ক্লান্তও হয়ে পড়েছ। বেশ ধকল গেছে আজ। খিদেও পেয়েছে। ওরা টিফিন দিয়েছিল পাউরুটি কলা আর একটা ঠাণ্ডা সেদ্ধ ডিম। ভাত জোটেনি সারাদিন। ভাবছ, কী করা যায়! সন্ধ্যে লাগব লাগব। মনে পড়ল তোমার কাকা ফুলিয়া শিক্ষানিকেতনে মাষ্টারি করে। চলে গেলে বেশ হয়। পলতা থেকে টিকিট কেটে শান্তিপুর লোকালে চেপে পড়লে। স্টেশনে নেমে খোঁজ নিয়ে কাকার স্কুলে গেলে। নাইট গার্ড এসে বাসাবাড়ি দেখিয়ে দিল। এসব করতেই রাত সাড়ে ন’টা হয়ে গেল। কাকা খাতা দেখছিলেন। তোমাকে দেখে খুশি হয়ে বললেন, – ‘একি তুই? আয়, হাত মুখ ধুয়ে বোস।’ রাত বাড়ছে। কাকার স্টোভে ভাত ফুটছে। ডিম আর আলুর ঝোল একটু আমের আচার দিয়েই ভাত পেটে অনায়াসে চলে গেল। তারপর সব ফর্ম পূরণ করে রাখলে, পাশপোর্ট ফটো সাঁটালে। কাল সকালেই বের হতে হবে। ফুলিয়াতে আমাদের ‘এ বঙ্গের অলঙ্কার’ কবি কৃত্তিবাসের ভিটে আর রামায়ণ সংগ্রহশালা আছে। তাঁতের শাড়ির জন্যও ফুলিয়া-শান্তিপুর বিখ্যাত। কত তাঁতশিল্পী এখানে বাস করেন। তাঁদের হাতের আঙুলের যাদুতে শাড়ির জমিনে ফুটে ওঠে কত নকশা, কলকা, বুটি। ভোরবেলা উঠে কাকার সঙ্গে এক চক্কর দিয়ে এলে। তারপর চান করে সেদ্ধভাত খেয়ে কাকা স্কুলে গেল আর তুমি ট্রেন ধরলে।

প্রথমেই সারা শরীরের পরীক্ষা। ইনার খুলে একদম নগ্ন হয়ে দাঁড়াতে হল। হাত পা হাঁটু কোমরের গড়ন দেখল। ছাতি ফুলিয়ে দেখাতে হল। দৃষ্টিশক্তির পরখ করল দূরে থাকা লেটার ওয়ার্ড পড়িয়ে। সবকিছু খুঁটিয়ে দেখার পর সারা মাঠে ছোটা। ভাগ্যিস ফুটবলটা খেলতে, কাজে লেগে গেল। আজ কেক কলা ডিম। শেষে ফলাফল ঘোষণা। হিন্দি এবং ইংরেজি মিশিয়ে অফিসার বললেন, ‘আপ সভি কো লেটার বাই পোষ্ট মিলে গা। আব ঘর চলা যাইয়ে, চিন্তা মত কিজিয়ে। হ্যাভ এ গুড ডে।’ মাস দেড়েক পর চিঠি এল। তবে জয়েনিং করার নয়, একটি রিগ্রেট লেটার। তুমি নাকি সর্বভারতীয় র‍্যাঙ্কিং-এ পৌঁছাতে পারনি। তাই বেটার লাক নেক্সট টাইম। কান-দুটো গরম আর লাল হয়ে উঠলো। মা তোমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, ঈশ্বরের হয়তো অন্য ইচ্ছা। ভালোই হবে চেষ্টা করে যা।

গরম পড়ে গেছে হঠাৎ। বসন্তের এই দুপুর বেলা হলকা বইছে। আর কটকট খটখট খটখট চ্যাঁ ঘটাম ঘটাম শব্দে মুখর কমলদার টাইপ স্কুলের দোতলায়। টেবিলে পড়ে আছে দুটো সাপ্তাহিক কাগজ। একটি বোলপুর থেকে প্রকাশিত ‘পল্লীশ্রী’ অন্যটি ‘সাপ্তাহিক চন্ডীদাস’ দুবরাজপুর থেকে প্রকাশিত। ছোট ছোট ফিচার আর স্থানীয় খবর পাঠাতে শুরু করে দিলে। ছাপাও হতে থাকল। বিশেষ সংখ্যায় গল্প প্রবন্ধ কবিতা। তোমার মামা সিদ্ধেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের বীরভূম বিষয়ক লেখা, তোমাদের বোলপুর কলেজের স্যার মনুজেশ মিত্রের লেখা, শিউড়ি বিদ্যাসাগর কলেজের স্যার কবিরুল ইসলামের লেখাও থাকে সেই সব সংখ্যায়। ডাকেই পাঠাও, খামের পয়সা না থাকলে ইনল্যান্ড অথবা পোস্টকার্ডে। সেই সব লেখা খুব পোক্ত নয়। কিন্তু ওই আঁকিবুকির মধ্যেই একটা কেমন প্রশান্তি কেমন একটা প্রকাশবেদনা অনুভব করো। কত মন খারাপ, কত না বলা কথা, কত অভিমানের রঙ ফুটে উঠতে থাকে। রবিঠাকুরের গানের কথাই যেন তোমার মনের কথা হয়ে ওঠে-

“আমার কিছু কথা আছে ভোরের বেলায় তারার কাছে

সেই কথাটি তোমার কানে চুপি চুপি লও”

Painting:Michael Post

কবিতা আশ্রম মুদ্রিত সংখ্যা থেকে

গত নভেম্বর থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত সন্মাত্রানন্দের অসামান্য উপন্যাস 'মেঘবতী'-র বারোটি অধ্যায় পড়ুন

পূর্ববর্তী সংখ্যা

এখন বাড়িতে বসেই সংগ্রহ করতে পারবেন আমাদের প্রকাশিত বইগুলি। ভিজিট করুন আমাদের অনলাইন সপ, আর কিনুন আমাদের বই। নিচের BUY NOW বোতামে ক্লিক/ট্যাপ করলে পৌঁছে যাবেন আমাদের সপ পেজে।