সাপ্তাহিক

২২ ফাল্গুন ১৪২৭

Painting:M.F Hussain

নাহিদা আশরাফী

আসুন প্রতিযোগিতা হোক

আসুন, প্রতিযোগিতা হোক

কে কত দ্রুত ভুলতে পারি

রূপা হারানোর শোক।

রূপা! কে সে?

কি তার পরিচয়?

ওহ, নারী বুঝি?

তবে সবাই মানুষ কেন কয়?

নারী মানেই তো ভোগ্যপণ্য  

মাংস পিণ্ড দলা। 

নারী মানেই তো খুবলে খাওয়ার

নিপুণ শিল্পকলা। 

নারী মানেই তো ক্ষুধার আহার

কামুক চোখের তীরে।

নারী মানেই তো কৃতদাসী এক

পুরুষবাদের ভিড়ে।

অতএব, ভুলছ কেন? 

জন্মেই তুমি ভীষণ রকম ঋণী। 

মাথা ও ঘাড় হোক না তোমার

মটকাবেন তো তিনি।

রূপা… কে সে?

পরিচয় কি জানা?

দরজায় যার রোজ হানা দেয়

মৃত্যুর পরোয়ানা।

ভাঙছ, ফেলছ, মারছ যাদের 

তোমরা জীবনভর

জানলে না হায়! তারাই তোমার

স্বপ্নের কারিগর। 

 

তাই আসুন এবার সত্য খুঁজতে নামি

কত রূপাদের আত্মত্যাগে

রূপারাও হবে দামী।

 

(গত ৩০-০৮-১৭ তারিখে চলন্ত

বাসে ধর্ষিতা রূপার জন্যে শোকগাথা)

 

পারমিতা ভট্টাচার্য

কবিতা

সময় এমন ছিল, পেখমের রাত,

মেঘ ভাঙছে আর সাদা সাবান ফেনায়, 

পিছলে আসছে শিহরণ…!

ভরন্ত বর্ষায় চাঁদ ভেসে যাচ্ছে দেখে,

আমরা হুটোপুটি করে

তুলে নিচ্ছি অলৌকিক তাপ,

ময়ূর হয়েছি এত অবলীলাভরে,

রঙের ছটায় অন্ধ হয়ে যায় দৃষ্টি…

অসময় এলে বুঝি,

শ্যামল রাতেও কত হিসেব নিকেশ,

তুলে রাখা বিয়োগ ও ভাগফল জড়ো হয়ে

চোখের চাদরে ভিন রং…

হারতে হারতেও জিভ কামড়ে ধরে অনুশোচনা!

গোলা রঙে কই আর চিনতে পারছি না নিজেকে…

কাঁদছি…

আর তুমি কান্নার সুতোগুলো যত্নে গুটিয়ে নিচ্ছ!

এমন মানসচরিত লিখব কীকরে,

যখন মেঘ ছেয়ে যাচ্ছে বৃষ্টি থামতে না থামতেই…

 

বন্যা লোহার

বোঝাপড়া

যেখানে যত জল দেখি 

মনে হয় পৃথিবীর চোখ 

 

তাকে কীভাবে বোঝাব 

বিভাজন রেখা? 

 

স্নানার্থীর মগ্ন চটি 

যতদূর ভেসে গেল; একা- 

 

তারও দূরে গিয়ে রাখি 

 

হারানোর শোক।

 

স্বপ্না বন্দ্যোপাধ্যায়

আমি শুনছি শুধু শুনছি কানে মোহনের বাঁশি শুনছি

১

রাতের ঘাড় ডিঙিয়ে আলো সবে ভাসছে

জানলার বাসা থেকে মেলছে পাখিসব ডানা

উত্তরের আগেই প্রশ্ন লিখে দিচ্ছে প্রথম ভোরের 

মাখা মাখা কুয়াশার জেটি সটান মাস্তুল 

ছাদে রাঙাপিসি এখনও দাঁড়িয়ে খই ছেটাচ্ছে 

পূর্বজন্মে ফেলে আসা প্রেমিক গলিতে

 

২

পুজোর থালা হাতে মিথ্যে বলতে নেই

মেনে এসেছি এতকাল

ঘন্টাধ্বনি হলে কথা বলতে নেই শংখধ্বনি হলে

সমুদ্রকে মনে করে গম্ভীর হতে হয় অথবা রাতের 

গাছে হাত বুলিয়ে ফুল ছিঁড়ে নিতে নেই

এসব মানতে মানতে গতকাল

প্রদীপ ধূপ ও ধুনোর মাঝে

আগুন চড়িয়ে সুগন্ধে নিজেকে পোড়ালাম

নীরব চাওয়ার পাটা শীতল চন্দন হল

 

৩

বেজে ওঠার আগে খেলতে নেমেছি 

চু কিতকিত জলকে সই ইলাটিং বিলাটিং

জল নামতে নামতে পায়ের গোছ বেরিয়েছে

হাঁটুর উর্ধ্বমুখ বেসনের আতপ

মন সঁপে দেওয়ার নিয়ম রীতি না জেনে 

নিঃশ্বাসভর শুষেছি আলিঙ্গন 

ঠোঁটের তুরুপ সাজাতে এ যমুনা তোলপাড় 

দূরগাছে সে বসে হলুদ তেল গামছা পিতলের ঘড়া

মৎস্যমুখ করো হে মৎস্যমুখ করো কন্যে

আড়বাঁশি নদীর শিকড়ে বাজলো বলে

ধুন ভেবে পা মেলাই আর রক্ত ফোটাতে ফোটাতে

রাজা আমার প্রিয় আমার তুঁহু মম পরাগপলাশ

 

 

৪ 

ঈর্ষার কাছে প্রেমের বসত এ কথা জানো না?

না জানলে ছায়াকে উত্তর বা দক্ষিণে টাল খাওয়াবার 

আগে চিবুক নামাও চুল ঠিক করো চোখের তারকাঠি

ঠিক ঠিক মাপে বসিয়ে গুছিয়ে তোলো যতেক লাইল্যাক

বেশরম পর্দা ওড়ে গহনের ফাঁকে আঙুল ডোবায়

নাগরি উল্টে মধুপর্ক ছলকে পতঙ্গ বসে

ডানায় পদ্মছাপ ফনা তুলে আছে

 

রুবাইয়া জুঁই

বাবা ট্রাফিক

পৃথিবীর সব বাবারাই একদিন 

ছাতিম গাছ হয়ে যায়। মায়াবী সুগন্ধ ছড়ায়।

 

আর তারপর ধীরে ধীরে ছাতিম গাছ উচ্ছেদ করে

পিচ ঢালাইয়ের রাস্তা বানানো হয় তাদের বুকের উপর।

 

পিচ রাস্তার মোড়েই এরপর বাবারা

             ট্রাফিকের কাজ করেন।

 

রাখী সরদার

যেহেতু প্রেম আছে

যেহেতু কবিতা,

যেহেতু প্রেম,

যেহেতু তুমি আছো

বহুজন্মের ইচ্ছার মর্মরে…

আমি কিছুতেই মেলাতে পারি না

কবিদের বিষণ্ণ প্রেমিকারা

কেন ফিরে যায় ধূলোপথ 

নালন্দার বাতাসে!

 

যে তুমি আমার ভীষণ কান্না,

প্রাণের প্ররোচনায় বুকের

দ্রিমিক দ্রিমিক…

 

কিছুতেই মেলাতে পারি না

যার জন্য ফুটেছিল ফুল, সেই

তুমি কোন খেয়ালে বারবার

এঁকে ফেলো বিগত জন্মের ক্রোধ!

                   

রুমা তপাদার

প্রচ্ছন্ন ফসল

ভীষণ স্তব্ধতা নাম রেখেছে আমার, ধর্মগ্রন্থ। 

আগামীর ইতিহাস থেকে

অতীত পর্যন্ত ঘেঁটে এসেছি একদম একা আমি

ধৈর্য এসে শান্ত হয়ে বসে আমার গতির মুখে

ক্রমশ অমোঘ টানে যায় আরও ভাঙনের কাছাকাছি

সজীব প্রেমের ঊর্ধ্বে গিয়ে 

ঘুমন্ত আমাকে দে’খে নির্বাক দৃষ্টিতে এসে

মহাশূন্য থেকে একমুঠো মেঘ এনে জ্ঞান ফেরায় 

আমি কিছুতেই নড়ে উঠি না তবুও 

চোখ খুলে জেদে শুয়ে থাকি

ভারতবর্ষের মাটির বিছানার ইতিহাস মুছে 

ফসল প্রচ্ছন্ন করব বলে…

 

 

রিনি গঙ্গোপাধ্যায়

প্রবাদ

কবিতার সত্যকে ছুঁতে চেয়ে

সেই অসম্পূর্ণ বালক

ছুঁয়ে ফেলেছিল

নৈঃশব্দ।

 

২

আমি বিশ্বাস রাখিনি প্রবাদে

তোমার চোখে সাজিয়ে দিয়েছি অপেক্ষা

তুমি ছিঁড়ে ফেলেছ তা

পুরোনো টেলিফোনবুথের মতো অপ্রয়োজনীয়

নিঃস্তব্ধ ভেবে।

সাফিয়া খন্দকার রেখা

খুন

কথাগুলো যেন কথা নয়

অগ্নিগিরির লাভা,

মাংশপেশীতে ধরায় আগুন

নীলিমার নীলে থাবা।

 

কানের দুলে আগুনের ফুল

মিথ্যা প্রেমের প্রলাপ

অন্তপুরে করো বন্দিনী

খোঁপায় পড়িয়ে গোলাপ ।

 

আয়তন দাও জ্যামিতির মাপে

অন্তরে জ্বলে ধূপ

বেদনার গান মর্মরে বাজে

চুপ কথা নিশ্চুপ। 

 

জীবনরোধী অস্থি মজ্জায়

আবেগের শিলালিপি

কহে ইতিহাস রমণী তুমি

ইহাই ভাগ্য লিপি।

 

দেবতা হাসে হাসে ঈশ্বর

করোটিতে বাজে ধুন

প্রেম দাও নাই তবু প্রেম চাও

নিজেতে নিজেই খুন। 

 

জীবন সে তো কাঁচের চুড়ি

ফিঙে পাখির নাচন

প্রেমের মশাল জ্বালো অন্তরে

তবে হবে তার বাঁচন। 

 

(০৫.১১.১৪ তারিখ স্বামীর হাতে খুন মিরপুরের

আইরিন আখতারকে উৎসর্গকৃত কবিতা)

 

 

মৌসুমী রায়

শূণ্যবাগান

…এরপর ধুলো মেশে গানের সুরে

ক্যানেস্তারা বেজে ওঠে কবিতার ঢালে

শব্দের বাগানে মরশুমী ঝুম চাষ চলে

আদুল কামীন বুকের কুঁড়ি ছিঁড়ে ছিঁড়ে

ঝুড়ি ভরে, চাষাবাদে ঘর ভরে ওঠে

কুলি বস্তিতে ধামসা মাদল বাজে

এমন মহুয়া উৎসব আসেনি কখনো আগে

গভীর রাতের চাঁচড়ে জ্বলে যায়

ফর্মার পর ফর্মা পান্ডুলিপি

ছাইগাদায় নাভিকুণ্ড অবশেষ

অন্তিম দস্তাবেজ কেটে খায়

অলৌকিক মেঠো ইঁদুর

খাঁ খাঁ মাঠে ভাঙা নিব একা

তারপর

শুধুই শূন্যতা…

 

Painting:Collected

“হৃদয়ের গান শিখে তো...”

পর্ব-১৪

ফাল্গুনী ভট্টাচার্য

মাঝে মাঝে জীবনে এমন পর্ব আসে যখন আর দিনরাত চলতে চায় না। দিন যদি বা খেলেধূলে পেরোয়, রাত কিছুতেই পেরোতে চায় না। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলে যাচ্ছে তোমাদের জীবন। ভাতের ওপর একটা তরকারিও ঠিকমতো জোটে না। মাঝে মাঝে আট আনার পোস্ত বেঁটে দেয় মা। ডাল নেই বলে মাড়েভাতে নুন মেখে দেয়। ছোট্ট ভাই বোন বেশ গবাগব গিলে দেয়। হঠাৎ বাবার জালে কুচো চিংড়ি বা ময়ে পুঁটি পড়লে সেদিন তোমাদের ভোজ ভোজ ব্যাপার। ঈশ্বরকে তুমি কত ভাবেই না দেখেছ ফাল্গুনী। শুধু অনুভবে ওই শিবমন্দিরে কালীতলায় বটবৃক্ষমূলে বা কংকালীতলায় নয়। কত মানুষমানুষীর মধ্যে ঈশ্বর এসে ভর করেছে। তাদের সাক্ষাৎ পেয়ে তুমি আশ্চর্য হয়ে গেছ। ফাগুনের প্রথম দিকে গাঁয়ের খেলারামদাদুর বউ তোমাদের বাড়ি আচমকা এসে এক টোকা পেঁয়াজ-কলি দিয়ে যায়। ধনাকাকা কাঁধে করে একটা আধপাকা কুমড়ো নামিয়ে বলে, ‘লেন গো মশাই নঙ্কার হয়েছে, আপনারাও খান।’বাবাও এইসব মানুষদের ছেলেমেয়েকে হাতেখড়ি দিয়েছেন। ক্লাস ফাইভ সিক্স সেভেন এইটের অঙ্ক ইংরেজি পড়িয়েছেন কতদিন ধরে। কেউ একটাকা, কেঊ দু’টাকা দক্ষিণা দিয়েছে। কেঊ আবার পারেও না দিতে। এদের সঙ্গে তোমরা একটা ভালোবাসায় জড়িয়ে গেছ ।

সেদিনের কথা মনে পড়ে। বিকেলে মা বসে বসে ভাবছে। কী ভাবছে? এতগুলো পেট ভরতে ভাতের ওপর কী তরকারি হবে! মা-বাবার অসহায়তা তুমি বেশ বুঝতে পারো। বাবা পুকুর পারে ইতস্তত পায়চারি করছে। পুকুরে এখন জল কমে এসেছে। মাছ নেই বললেই চলে। দু’একটা চ্যাং মাগুর কই থাকতে পারে। কিন্তু জাল ফেলে ধরা মুশকিল। ঢেঁকিভাঙা চালের ভাত ফুটছে হাঁড়িতে। একটু লালচে। মোটা। আলু ফেলে দিয়ে মা বসে বসে ভাবছে। হঠাৎ দেখলে তোমার বাবা পলুই নিয়ে অন্ধকারে পুকুরের গাবায় গিয়ে ঝুপ ঝুপ করে দু’বার পলুই চাপলে। তারপর যেন চাঁদের মাটিতে পা দিয়েছে এমন আনন্দে বাবার চোখমুখ চকচক করে ওঠে। তার হাতে চেপে ধরে রাখা একটি প্রকাণ্ড মাগুর মাছ। এক কেজি ওজন হবে। হঠাৎ বাবা ‘উফ’ করে ওঠে। তর্জনী আর বুড়ো আঙুলের মাঝের অংশে কাঁটা দিয়ে ফুঁড়ে দিয়েছে মাছটা। একটু রক্ত বের হয়েছে আর জ্বলছে। মা লম্ফ নিয়ে তাড়াতাড়ি বাবার আঙুলে জল ঢালে। চুন লাগিয়ে দেয়। তারপর অনেক রাতে, তোমাদের সব পড়া-লেখা-আঁকা হয়ে গেলে, বাংলাদেশ বেতারের গানের আসর শেষ হয়ে গেলে, মা থালায় থালায় ভাত বাড়ে। কানা উঁচু এলুমিনিয়ামের থালা সব। গরম ভাত, লঙ্কারাঙানো আলুমাখা আর মাগুর মাছের ঝোল। মশলাপাতিও বেশি দেয় না মা, পাবে কোথায়? ওই একটু ধনে-জিরে-লঙ্কা বাঁটা দিয়েই কী অপরূপ তার স্বাদ আনে। মা তো, হাতের গুণেই এসব হয় বোধ হয়। মাটির দাওয়ায় বসে ভাইবোনেরা কেমন তৃপ্তি করে ভাত খেলে। তোমাদের ভিটের দক্ষিণ দিকের নিমগাছের পাতা ঝরে যাচ্ছে, আর দু’একটা কচি কচি নিমপাতা বের হচ্ছে। নতুন পাতায় পাতায় জানান দিচ্ছে আছি। থাকব। বাঁচছি। ডালপালার ভেতর থেকে উঁকি মারছে নবমীর চাঁদ। তার আবছায়ায় কেউ যেন দাঁড়িয়ে দৈব-আশিসের ঝরনায় ভরিয়ে দিচ্ছে তোমাদের মাটির উঠোন। সে কি ঈশ্বর ? বুড়িমা! দিদিমা! মনে মনে বলে ওঠো- ‘সঙ্গে থেকো, পাশে থেকো।’

আরও কয়েকটা পরীক্ষা দিলে। সিউড়ি জেলা স্কুলে পিএসসি ক্লার্কশিপ পরীক্ষাতেও বসলে। কিন্তু তাল কেটে যাচ্ছে। একটা পেপার ভালো হচ্ছে তো অন্য পেপারটা একটু ঝুলে যাচ্ছে। একদিন হঠাৎ দৈনিকে একটি ছোট্ট বিজ্ঞাপন চোখে পড়ল তোমার। চন্দননগরের প্রবর্তক সঙ্ঘ তাদের কালচারাল কলেজের এক বছরের প্রশিক্ষণে ছাত্র নিচ্ছে। থাকা খাওয়া হাত-খরচ সব তাদের। চিঠি পাঠিয়ে দিলে। একটি ইনল্যান্ড লেটার মারফত ওরা খুব তাড়াতাড়িই ডাকল। ১৯৮৭ সালের এপ্রিল মাস। সাইড ব্যাগে কিছু জামা কাপড়, গামছা, কাগজ পেন, খান চারেক পোস্টকার্ড নিয়ে ভোরের বিশ্বভারতী ফাস্ট প্যাসেঞ্জার ধরলে। মা গাঁয়ের কালীতলা অবধি এলো, বলল, ‘সাবধানে থাকিস। চিঠি দিস।’ তুমি একটা ভালোলাগা নিয়েই গ্রাম ছাড়লে। ভাবলে, যাক মায়ের এত বড় সংসার থেকে অন্তত একটা পেট কমল। তোমরা জন্য রোজ একমুঠ করে চাল লাগে, সেই খরচটা তো কমবে। নটা পনের নাগাদ ব্যান্ডেলে এলে। আবার ট্রেন পাল্টাতে হবে। বিশ্বভারতী ফাস্ট প্যাসেঞ্জার চন্দননগরে থামে না। মেন লাইন ধরে পৌঁছে গেলে। রিক্সা করে বোড়াই চন্ডীতলায় প্রবর্তক সঙ্ঘে এলে। বিপ্লবী মতিলাল রায়ের এই সঙ্ঘ সম্পর্কে তুমি কিছুইও জানতে না । পরে সব জানলে। টালির চাল দেওয়া একটা একটা ঘরে তোমার বয়সী কয়েককজন ইতিমধ্যে এসে গেছে। বিবেকানন্দ কৃষ্ণপদ শ্রীনিবাস। পরিচয় হল এই কালচারাল কলেজের অধ্যক্ষ সুধাংশুশেখর ভট্টাচার্যের সঙ্গে। তিনি তোমাদের ঘরের কাছে এসে হেঁকে বললেন-“সবাই চান করে নাও খাওয়ার জন্য অন্নপূর্ণা মন্দিরে যেতে হবে।”

আশ্রমের পূর্বদিকে দুটি পশ্চিমমুখী মন্দির। একদিকে সঙ্ঘগুরু মতিলাল রায় অন্যদিকে সঙ্ঘজননীর মূর্তি। একদিকে গ্রন্থাগার। অফিস লাগোয়া দোতলা বাড়িতে আশ্রমের দাদামণি দিদিমণিদের আলাদা আলাদা থাকার ঘর। তোমাদের ছাত্রাবাস লাগোয়া একটি ঘরে অধ্যক্ষের ঘর। পাশে যামিনী দাদা শশীদাদার ঘর। শশীদাদা ভোর বেলা থেকে আশ্রমের ফুল তোলা মন্দির ধোয়া, পুজো আরতির কাজকম্ম করে থাকেন। সকালের টিফিন খাবার আনার জন্য উড়িষ্যার এক ছেলে আছে। গেটে তার ডিউটি। ওর নাম গিরিধারী। প্রেসে কাজ করে নিমাইদা, আরতি দিদি। অন্নপূর্ণা মন্দিরে বেশ কিছু গৃহাশ্রমত্যাগিনী মাসী রান্নাবান্নার কাজ করে।

‘প্রবর্তক কলেজ অব কালচার’ আসলে এই সঙ্ঘ পরিচালিত ভারতীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি শিক্ষার একটি প্রতিষ্ঠান। বিপ্লবী শ্রীঅরবিন্দ ঘোষও মতিলাল রায়ের সান্নিধ্যে এসেছিলেন এবং এঁরা সবাই একটা সময় ফ্রম বম মেকিং টু ম্যান মেকিং-এর ব্রত নিয়েছিলেন। মতিলাল রায়ের অন্নপূর্ণা মন্দিরের একটি গোপনঘরে শ্রীঅরবিন্দ ঘোষ কিছুদিন লুকিয়েছিলেন তারপর নৌকাযোগে চন্দননগর থেকে চলে গিয়েছিলেন পণ্ডিচেরী। এ সব ইতিহাস তোমার জানা ছিল না। এই কলেজে কিছু ছাত্রকে রেখে সেই ম্যানমেকিং এর শিক্ষা দেওয়া হয়। ভারতীয় পুরাণ উপনিষদ গ্রন্থাদি পড়ান হয়। সংস্কৃত পাঠ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে অনেক ছাত্র সাগ্রহে আশ্রম পরিচালনায় অংশ নেয়। সঙ্ঘের সীমানা ছুঁয়েই পুর্বে বয়ে চলেছে পারাবারবিহারিণী গঙ্গা। বিখ্যাত বোড়াইচণ্ডীতলার ঘাট। পাশেই শ্মশান। তোমরা চারজন মিলে তেল-গামছা নিয়ে গঙ্গাস্নানে গেলে। পাশেই চিতা জ্বলছে। হরিনাম গাইছে শ্মশানযাত্রীরা। মানুষের চামড়া-পোড়ার একটা কেমন গন্ধ আছে। ঘাটে তিন ডুব দিয়ে উঠে এলে। একটা শ্লোক উদ্গত হতে চাইছে, তুমি তো জান সেই শঙ্করাচার্যের স্তোত্রের শ্লোক- “তবতটনিকটে যস্য নিবাস/খলু বৈকুন্ঠে তস্য হি বাস…”

অন্নপূর্ণা মন্দিরে তোমরা কাঠের চওড়া পিঁড়ি পেতে বসলে। মাসীরা এসে স্নেহ-মধুর কণ্ঠে পরিচয় করল। তারপর আতপ চালের ভাত, পাতলা মুগের ডাল, নিমছেঁছকি পোনা মাছের ঝাল আর বিলিতি বেগুনের চাটনি দিয়ে ভাত দিল। অধ্যক্ষ মহাশয় শেখালেন অন্নগ্রহণের আগে কীভাবে আচমন আর ‘ওঁ ব্রহ্মর্পণম’ মন্ত্র বলতে হয়। ঈশ্বর যে মধুময় অন্ন যোগাচ্ছেন, তাঁকে কৃতজ্ঞতা জানাবে না? তুমি অস্ফুটে বলে ওঠো,- ‘জানাবো’। অনুভব করলে তোমার জন্য সমস্ত আকাশ বাতাস আকুল হয়ে বলল- ওঁ স্বস্তি।

Painting:Collected

কবিতা আশ্রম মুদ্রিত সংখ্যা থেকে

গত নভেম্বর থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত সন্মাত্রানন্দের অসামান্য উপন্যাস 'মেঘবতী'-র বারোটি অধ্যায় পড়ুন

পূর্ববর্তী সংখ্যা

এখন বাড়িতে বসেই সংগ্রহ করতে পারবেন আমাদের প্রকাশিত বইগুলি। ভিজিট করুন আমাদের অনলাইন সপ, আর কিনুন আমাদের বই। নিচের BUY NOW বোতামে ক্লিক/ট্যাপ করলে পৌঁছে যাবেন আমাদের সপ পেজে।