সাপ্তাহিক

২৯ ফাল্গুন ১৪২৭

Painting:Francis Picabia

নির্মল হালদার

কবিতা

পাখির সম্পর্কে আমি ডানাওয়ালা মানুষ

 

আমি উড়ে উড়ে সূর্যের আগুনে রাঁধি

আমার আত্মা

 

ভোজন করি পাখিদের সঙ্গে।

 

২

 

বাতাস ফুঁ দিয়েছে শাঁখে। মাটিতে পড়ল

এক শিশু। সে আর কেউ নয় আমি আমি আমি,

আমি নবজাতক। কেঁদে উঠতেই,

সবাই শুনতে পেল, শঙ্খ ধ্বনি। শুরু হল,

আকাশে আকাশে উলুধ্বনি

 

আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে।

 

সুজন পণ্ডা

নদী ও পাহাড়

এখানে শায়িত নদী

বহুদূর ব্যাপী। 

স্রোতে স্রোতে কেউ সাজিয়েছে ছই,

কেউ কি বিছিয়েছে জাল?

নদী জানে ইতিহাস,

সময়ের আঘাতে পলি জমেছে,

নদীর আপোষ থেকে জন্ম হয়েছে চর-এর।

 

এখানে দাঁড়িয়ে পাহাড়

ছুঁয়েছে আকাশ।

মেঘে মেঘে জড়িয়ে গেছে গাছ,

 কেউ কি ছড়িয়েছে কুয়াশার কণা?

পাহাড় জানে ইতিহাস,

সময়ের আঘাতে কড়া পড়েছে,

পাহাড়ের পায়ে তাই পাথর আর পাথর।

 

অনঞ্জন

সম্পর্ক

ঝরে পড়তে পড়তে পাহাড়ের দিকে মুখ তুলে

ঝরনা বলল-

আমি তো তোমার সঙ্গে ঘর বাঁধতে চেয়েছিলাম,

আশ্রয় চেয়েছিলাম তোমার বুকে,

বাঁধলে না আমায়? রাখলে না বুকে? জড়িয়ে?

নিষ্ঠুর, দুর্দান্ত তুমি!

পাহাড় বলে-

স্বৈরিনী তুই, চলিস তুই নিজের খেয়ালে, 

তোর সঙ্গে কি ঘর বাঁধা যায়?

তোকে আমি ভোগ করি, 

তোকে আমি ব্যবহার করি,

নিজেকে সাজিয়ে তুলি তোর স্বপ্ন দিয়ে

গাছ-গাছালি পাখ-পাখালিতে,

তোর ভালবাসা আমায় সমৃদ্ধ করে

তোর শরীরী মোহের কাছে আমি ঋণী

আমার সর্বাঙ্গে প্রতিধ্বনিত হয় তোর শব্দ।

 

আছাড়ি-পিছাড়ি স্বপ্ন নিয়ে

ঝরে পড়তে পড়তে পাহাড়ের দিকে মুখ তুলে

ঝরনা বিহ্বলে তাকায়…

 

অনিকেশ দাশগুপ্ত

শেষ দুপুরের আলো

ঝড় শেষের সেই ধূসর কানেস্তারা ওড়ে

ক্ষণে ক্ষণে খুচরো রুপালি চিৎকারে

দু’দণ্ড ছুটের দাঁত কামড়ায়;

 

হাওয়ার পাতায় শুভ্র মনুমেন্ট, একটানা আঙুল,

আইভরি জ্যোৎস্নার বেলা ঝিল্লির মতো কেঁপে

বিসদৃশ ছায়ায় ভরেছে যত নিরন্ন প্লাজার রাত –

যেন কাদার ঘুম টপকে যাবে অনেক ঈগল 

অনুজ্জ্বল রক্তের প্লবতায় ভেসে আছে শব্দের ডানা

 

মালা ঘোষ (মিত্র)

পরাগ পাপড়ি

বসন্ত বাতাসে ঘোর লাগা

অক্ষিতে কস্তুরীর গন্ধ, 

থামকে যায় দাঁড়ের ছলাৎছল শব্দ

অপেক্ষা করতে করতে ভেসে যায় আলো

আটকে পড়ে একফালি চাঁদ। 

নদীর তীরে দাঁড়িয়ে জরিপ করে

ডুবন্ত হবে কিনা মন, 

পলাশও তৃপ্ত হয়, 

সৌন্দর্যের পরাগ পাপড়িতে

কোকিলে কুহুস্বর রাধাচূড়ার শরীরে।। 

Painting:Francis Picabia

“হৃদয়ের গান শিখে তো...”

পর্ব-১৫

ফাল্গুনী ভট্টাচার্য

‘প্রবর্তক কলেজ অব কালচার’-এর ছাত্রদের একটি শৃঙ্খলার মধ্যে দিয়ে নানা শাস্ত্রগ্রন্থপাঠ, আদর্শ জীবনগঠনের নানা শিক্ষা দেওয়া হয়। পাশাপাশি হাতেকলমে শেখানো হয় নানা কাজ। ভোর চারটের সময় উঠে ব্রাহ্ম-মুহূর্তের মন্ত্র, তারপর প্রাতঃকৃত্য সেরে ছোলা বাদাম খেয়ে যোগাসন। তারপর বাগান পরিচর্যা। টিফিনের পর লাইব্রেরিতে পড়াশোনা পুরোনো ‘প্রবর্তক’ পত্রিকার পাতায় চোখ বোলানো। কোনওদিন দপ্তুরী এলে বই বাঁধাই-এর কাজ শেখা। স্নানের পর মন্দিরে গীতার এক-একটি অধ্যায় পাঠ। বেশ সময় চলে যাছে কুল কুল বেগে। দুপুরে খাবার পর একঘণ্টা বিশ্রাম। তারপর নানা কলেজ থেকে আমন্ত্রিত অধ্যাপক এসে দর্শন সংস্কৃতের ক্লাস নেন। চন্দননগর কলেজ, হুগলী মহসীন কলেজের অধ্যাপক তাঁরা। যামিনী দাদামনি, রেণুকণা দিদিমণিও কখনও সঙ্ঘের পুরনো দিনের কথা, এই প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন। এই নিয়ে বেশ কেটে যাচ্ছে তোমার জীবন। কিন্তু রাতে তক্তাপোষের উপর শুয়ে তোমার ঘুম আসে না। সামনেই একটি বিশাল স্বর্ণচাঁপার গাছ। একগাছ আলো করে ফুল ফুটেছে। অধ্যক্ষ মহাশয় বলছিলেন, বসন্তকাল থেকে শুরু করে সারা গ্রীষ্মকালই ফুল ফুটিয়ে চলে গাছটি। সেদিন রাতে রুটি আলুর দম আর সুজির পায়েস খেয়ে তাড়াতাড়িই শুয়ে পড়ল সবাই। একে একে আলো নিভে গেল। তুমিও আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়েছ। ঘুম আসে না। গাঁয়ের নানাকথা মনে পড়ছে । মা-বাবা-ভাই-বোনদের মুখ। রেলস্টেশন থেকে তোমাদের গ্রামে যাওয়ার ওই রাস্তাটাই তোমার মনে দ্রুতগতিতে চলতে লাগল। আর তার সঙ্গে সঙ্গে চলতে লাগল দু’পাশের মাঠ, গাছপালা, ওই বাঁকা খেজুরগাছটি, আলবাঁধা দমদমা পেরিয়ে এসে কুলবন, ক্যানেলের হলদে জল, মাঝে মাঝে সবুজ ঘাসের আস্তরণে ঢেকে যাওয়া গেরুয়া মাটি, আলু পেঁয়াজ তুলে নেবার পর কুমড়োর থানায় জল দেওয়া হচ্ছে। গমের শীষে সোনারং ধরেছে। প্রান্তিক থেকে কোপাই-এর দিকে আসার সময় রেললাইনের ধারে সার দিয়ে বেশ কয়েকটা শিমূল গাছ। পাতা ঝরে গেছে। ন্যাড়া শাখায় আগুন ছড়িয়েছে লাল টকটকে শিমূল ফুল। আর সেই ক্যানেলের ধারে বাঁদরলাঠি গাছ- যার পোষাকি নাম অমলতাস, গুচ্ছে গুচ্ছে ছড়িয়েছে হলদে আলো। আর ক’দিন পরেই শিবরাত্রি। তারপরে দোল।

মহসীন কলেজের দর্শনের অধ্যাপক চন্দ্রশেখর দেবনাথ চুঁচড়োয় থাকেন। উনি তোমাদের উপনিষদ ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দেন। ঈশোপনিষদ শেষ হয়ে কঠোপনিষদ প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় বল্লী এগিয়ে চলছে। নচিকেতার উপাখ্যান শুনে তোমরা মুগ্ধ উৎসুক এবং কৌতূহলী হয়ে উঠছ। জানতে চাইছ মৃত্যুর ওই পারে কী আছে? আত্মা কী ও কেমন! স্যারের কথায় আবার জীবনেই ফিরে আসো।

-“শোনো, তোমরাতো আশ্রমবাসী মানবক। কিন্তু মাঝে মাঝে গৃহাশ্রমেও যেতে হবে, বুঝলে?”

স্যারের কথায় তোমরা চারজনেই মাথা নাড়ো।

তিনি হেসে বলেন, ‘আমি দাদামণির সঙ্গে কথা বলেছি, এই রবিবার দুপুরে তোমরা আমার বাড়িতে অন্নগ্রহণ করবে, বুঝলে? তোমাদের বৌদির খুব ইচ্ছে নিজে হাতে রান্না করে তোমাদের খাওয়াবেন।’

বিবেকানন্দ কৃষ্ণপদ শ্রীনিবাস আর তুমি বাসে করে চুঁচড়োয় স্যারের বাড়ি গিয়ে হাজির হলে। মিষ্টি জল চা খেয়ে বেশ কিছুক্ষণ গল্প হল। দোতলায় বিরাট লাইব্রেরি। চারদিকে শুধু বই আর বই। সিঁড়ির দেয়ালে, তাকে তাকে, দরজার মাথার খোপেও। একটা ম্যাগাজিনে আত্মাতত্ত্ব নিয়ে স্যারের লেখা বের হয়েছে। তোমাদের পড়তে দিলেন। তোমরা একবার চোখ বুলিয়ে নিলে। সব কি বোঝা যায় সহজে? স্যার বললেন, ‘জানো তো ঈশোপনিষদের একটি শ্লোক দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর মানে রবীন্দ্রনাথের পিতার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল!’ তারপর তিনি সেই ঊনিশ শতকের কলকাতা, জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি, ‘তত্ত্ববোধিনী সভা’র কথা বলতে লাগলেন। ‘কী গো, এবার এসো। ছেলেগুলোর খিদে পায় নি?’ নীচ থেকে বৌদি ডাক দিলেন। স্যার তোমাদের নিয়ে এসে পড়লেন ডাইনিং হলে। বিবেকানন্দের খুব ইচ্ছা মাটিতে আসন পেড়ে একসাথে বসে খাবে। তাই-ই হল। একটা শতরঞ্জ আর দুটো আসন নিয়ে লাইন দিয়ে বসা হল। বৌদি আর রান্নার মাসী পরিবেশন করছেন। মাঝারি মাপের কাঁসার থালা বাটি। বেশ নরম তুলতুলে ভাত, বেগুন ভাজা-বেশ লম্বা চিরে ফালা করে কাটা, উচ্ছে ডাঁটা বেগুন কাঁচকলা দিয়ে তেঁতো তরকারি, মুগের ডাল, চারাপোনার সর্ষে ঝাল, বড় মাছের কালিয়া, পাকা কুল আর বিলিতি বেগুন দিয়ে চাটনি, শেষ পাতে দোকান থেকে আনা দই আর জলভরা।

-‘আর একটা জলভরা নেবে ফাল্গুনী?’

তুমি বলে ওঠো, ‘না না কত তরকারি, এতেই পেট ভরে গেছে। আর কিছু নেব না বৌদি।’

বৌদি হেসে বলেন, ‘জানো ফাল্গুনী, তোমার স্যার তোমার খুব নাম করেন। আর বলেন, ফাল্গুনীর ঘাড় অব্দি কোঁকড়াকোঁকড়া চুল।’

এই কথা শুনে তুমি লজ্জা পাও।

‘মাঝে মাঝে ঘরের জন্য মন কেমন করলে এখানে তোমরা চলে আসবে।’

তোমরা মাথা নাড়ো।

ঘড়ির মোড়ে এসে ফেরার বাস ধরলে। সর্ষেপাড়ায় নেমে চারজনে হাঁটতে শুরু করলে। বিকেল মরে আসছে। হঠাৎ মনে পড়ে গেল মায়ের মুখ। ভাই-বোনেদের মুখ। আজ কি সবাই ভাত পেয়েছে ঠিক মতো? ভাত যদিও বা ছিল সবাই কি তরকারি পেয়েছে? না কি মা পুকুরের জল মরে আসা গাবায় নেমে খুঁটে খুঁটে তুলে এনেছে ক্ষুন্নটে বা গিমে শাক? কিম্বা এক টাকার পোস্ত এনে বেঁটে দিয়েছে। তাই দিয়েই হয়তো অম্লানবদনে খেয়েছে তোমার আশুতোষ ভাইবোন? অথবা সারাদিন খাওয়া হয়নি মায়ের! বাবা এই সন্ধেবেলা গা ধুতে যাবার সময় জাল নিয়ে দু’চার খেপ মারবে। আর কী অবাক কাণ্ড ঘটবে। ঈষ্বরের অসীম করুণায় জালে উঠে আসবে ময়ে চিংড়ি বেলে? মা একটু লঙ্কা-সর্ষে বেঁটে তাই-ই অমৃতের মত রান্না করবে! তোমার ভিতরটা হু হু করে ওঠে। কতদিন মায়ের হাতের ওই রান্নাটা খাওনি তুমি। মৃত্যুর পর আত্মা কোথায় যায় তুমি এখনো বুঝতে পারনি। কিন্তু এই অতি-প্রাকৃত জীবনে তুমি দেখতে পাচ্ছ তোমার দেহ হেঁটে চলেছে প্রবর্তক সঙ্ঘের গেটের দিকে। আর তোমার আত্মাটি তোমাকে ছেড়ে হুস করে উড়ে যাচ্ছে অ-ইইইইইইইইই রতনপুরের দিকে। কু-উ-উ-উ-উ-উ ঝিক ঝিক রেলগাড়ি করে? নাকি পা-আ-আ-আ-আ-আ-আ-আ-আ-খা মেলে??

Painting:Francis Picabia

কবিতা আশ্রম মুদ্রিত সংখ্যা থেকে

গত নভেম্বর থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত সন্মাত্রানন্দের অসামান্য উপন্যাস 'মেঘবতী'-র বারোটি অধ্যায় পড়ুন

পূর্ববর্তী সংখ্যা

এখন বাড়িতে বসেই সংগ্রহ করতে পারবেন আমাদের প্রকাশিত বইগুলি। ভিজিট করুন আমাদের অনলাইন সপ, আর কিনুন আমাদের বই। নিচের BUY NOW বোতামে ক্লিক/ট্যাপ করলে পৌঁছে যাবেন আমাদের সপ পেজে।