শ্রেষ্ঠ নয় সমগ্রের খোঁজে

।। কবিতা আশ্রম পরিবারে সকলকে স্বাগত।।"কবিতা আশ্রম একটি গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকা। এই পত্রিকা থেকে তরুণদের কবিতা আর কবিতা-ভাবনা কোন পথে চলেছে তার এক রকমের চিহ্ন পাওয়া যায়।"--কবি জয় গোস্বামী ।। "তথাকথিত শিবিরের ধারণাকে ধ্বংস করে দিয়ে কবিতা আশ্রম এই সময়ের বাংলা কবিতার প্রচ্ছদ হয়ে উঠেছে। নানা মাত্রার , মার্গের , স্রোতের , ঘরানার এমন নিরভিমান উদযাপনের শরিক না হয়ে কেউ পারবেন না , এটা আমার বিশ্বাস ।"--সুমন গুণ ।। "কবিতা আশ্রম চমৎকার ম্যাগাজিন ।কখনও লিখিনি , এবার লিখতে পেরে ভালো লাগছে"--কবি মৃদুল দাশগুপ্ত।।"আমি কবিতা আশ্রম পত্রিকা পাই এবং আগ্রহ দিয়ে পড়ি । যে সকল কবিতা ও গদ্য প্রকাশিত হয় সে-সবই অত্যন্ত ভালো লেখা এবং সু-সম্পাদিত,যা আমার খুবই ভালো লাগে । এছাড়াও কবিতা আশ্রম পত্রিকাকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু তরুণ কবি ও গদ্যকার আগামীর জন্যে তৈরী হয়ে উঠছে । তরুণ কবি ও গদ্যকার-দের প্রশয় দেওয়ার ক্ষেত্রে কবিতা আশ্রম পত্রিকাটি খুবই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখেছে ।"--কবি দেবদাস আচার্য।।"প্রকৃত কবিতাকে জহুরির চোখে খুঁজে আনছে কবিতা আশ্রম। প্রচারের আড়ালে থাকা তরুণ কবি প্রতিভাকে পাঠকের সামনে নিয়ে আসার এই প্রয়াসকে কুর্নিশ জানাই ।"--কবি অঞ্জলি দাশ।।"দূরে গেলে কিছু জিনিস আবছা দেখায় । আরও দূরে গেলে কিছু জিনিস স্পস্ট হয়ে ওঠে । কবিতা আশ্রমকে আমি স্পস্ট দেখতে পাচ্ছি। যেভাবে আত্মত্যাগের মধ্যে দিয়ে মাথা তুলে কাগজটিকে ক্রমশ আইকনিক তুলছে সেটা একটা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে ।"--কবি সুবোধ সরকার।। “কবিতা আশ্রম প্রকৃত অর্থেই বাংলা কবিতার লাইট হাউস ।তরুণ কবিদের খোঁজে আমি তাই প্রতিটি সংখ্যা পড়ি”।–রাহুল পুরকায়স্থ ।।“অচেনা নতুন কবিদের দিকে এখন তাকিয়ে থাকি।‘কবিতা আশ্রম’ এই সব কবিকে সামনে নিয়ে আসছে।এ একটা প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এই জাতীয় উদ্যোগ বাংলা কবিতার ক্ষেত্রটিকে প্রসারিত করছে”।–কবি কালীকৃষ্ণ গুহ ।।“কবিতা আশ্রম আমার প্রিয় পত্রিকা । পড়ে এবং লিখে তৃপ্তি পাই। সারা বাংলার তরুণদের খুঁজে আনছে কবিতা আশ্রম”।–কবি সমর রায়চৌধুরী ।। "সব চেয়ে ভালবাসি নিজেকে কারণ সে লোকটার ভেতরে কবিতার আবাস । সেই নিজেকে দেখার জন্যে এক টুকরো আয়না খুঁজছিলাম বহুদিন । কোথাও পাইনি । কে জানতো একটি আশ্রমের ভেতর সেই টুকরোটুকু আমার জন্য অপেক্ষা করছে।"--দিশারী মুখোপাধ্যায় ।।

 

প্রবন্ধ

আগুনের গোলা আর নীলকণ্ঠ পাখি

উত্তম দত্ত

 

এক বসন্তের দুপুরে একজন কবিতা-পাগল বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে হাজির হয়েছিলাম যাদবপুরের কৃষ্ণচূড়া এপার্টমেন্টে। চার দশক আগেই জানতাম সুমিতাদি এখানেই থাকেন। অধ্যাপক সুমিতা চক্রবর্তী।  বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের আধুনিক কবিতা পড়াতেন। যেমন অসামান্য কণ্ঠস্বর তেমনি অলোকসামান্য বাচন-শৈলী। এ বঙ্গের এবং বহির্বঙ্গের সমস্ত কবির নাড়ি নক্ষত্রের খবর রাখেন এখনও।

 

ঘর ভর্তি বই আর বই। কথায় কথায় শঙ্খ ঘোষের কথা উঠল। আমার বন্ধুটির কাছে শঙ্খবাবু এক জীবন্ত ঈশ্বর।  তার হাবেভাবে সেটা অনুভব করে সুমিতাদি হঠাৎ কী এক দুর্বোধ্য কষ্টমাখা মুখ নিয়ে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর একটু নীচু স্বরে কিন্তু খুব স্পষ্ট উচ্চারণে যা বললেন তা আমাদের কল্পনা-সীমার বাইরে ছিল : ‘ শঙ্খবাবু খুব ভালো মানুষ।  কিন্তু আমার একটা আক্ষেপ রয়ে গেল,  জানো!  আমার এখনও মনে হয়, উনি চেষ্টা করলে জয়দেবকে বাঁচিয়ে রাখতে পারতেন। কবি জয়দেব বসুর কথা বলছি। সে তো শঙ্খবাবুর খুব প্রিয় ছাত্র ছিল। ইচ্ছে করলে হয়ত তার যাপনকে আরেকটু নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন।’

 

এই অপ্রত্যাশিত কথা আমাকে নির্বাক করে দেয়। মনে মনে ভাবছিলাম, শঙ্খবাবুকে যতদূর জানি তাঁর লেখার মধ্যে দিয়ে, তাতে মনে হয়, প্রিয় ছাত্রছাত্রী ও তরুণ কবিদের প্রতি তাঁর ভালোবাসা আলোকিত আকাশের মতো। সেই আকাশ কাউকে বেঁধে রাখে না, বরং মুক্তি দেয় নিঃসীম আলোর মধ্যে। তিমিরবরণ সিংহ, ভাস্কর চক্রবর্তী এবং আরও অনেকের মতোই জয়দেব বসুও তাঁর স্নেহ ও ভালোবাসার কাছে সেই মুক্ত উড়ানের মন্ত্রই শুনতে পেয়েছিলেন।

 

আজ কবি জয়দেব বসুর জন্মদিন। কদিন আগে কবি সেবন্তী ঘোষ ফোন করে শিলিগুড়িতে আয়োজিত প্রয়াত কবির স্মরণসভায় আহ্বান জানিয়েছিলেন। যেতে পারিনি ব্যক্তিগত ব্যস্ততায়। কিন্তু জয়দেব বসুকে নিয়ে এই মুহূর্তে কিছু লিখতে গিয়ে হঠাৎ সুমিতাদির ওই কথাটি মনে পড়ল।

 

রক্তকরবী নামে একটি কবিতা পড়ে জয়দেবের প্রতি তীব্র আকর্ষণ বোধ করেছিলাম একদিন। সেই কবিতায় জয়দেব লিখেছিলেন :

 

“পেরিয়ে গেছি মেঝেনদের দেশ

পেরিয়ে গেছি কুষ্ঠে খসা গ্রাম,

জানো কি তুমি অনেকে এখানেও

ফিসফিসিয়ে বলে তোমার নাম।”

 

রক্তকরবীর নন্দিনী এক আশ্চর্য ধ্রুবতারা। হতাশা আর ঘন তমসার মধ্যে এক অলৌকিক আলোর বার্তা, এক প্রাণদায়ী প্রেম ও সৌন্দর্যের নিশান নিয়ে আসে ঈশানীপাড়ার নন্দিনী। আজীবন বামপন্থী আদর্শে বিশ্বাসী (শুনেছি পার্টি তাঁকে ছাঁটাই করেছিল ‘দেশ’ পত্রিকায় কবিতা লেখার অপরাধে, কিন্তু তিনি নিজে কখনও বামপন্থী সংগ্রামী আদর্শ থেকে বিচ্যুত  হননি, অথবা সুবিধেবাদী কবি ও লেখকদের মতো রাতারাতি জামা পালটে অন্য দলে যোগদান করেননি) জয়দেব তাঁর চারপাশের মলিন ও অন্ধকার রন্ধ্রে রন্ধ্রে খুঁজে বেড়িয়েছেন নন্দিনীকে:

 

“পুরাণে বলে, লোককথায় বলে

আসবে তুমি কখনো কোনোদিন

মুছিয়ে দেবে গেরস্থালি চোখ

অনামিকায় ফোটাবে আশ্বিন।”

 

এসব কবিতা পড়লে এক অপার্থিব প্রসন্নতায় ভরে ওঠে মন প্রাণ আত্মার ঘরবাড়ি। সবচেয়ে চমকে গেছিলাম এই অংশটিতে পৌঁছে :

 

“মস্ত এক পাঁচিল পার হয়ে

পরের পর দরজা ঠেলে ঠেলে

খুঁজে পেলাম তোমাকে নন্দিনী

নিখোঁজ এই পাগলিদের সেলে।”

 

এই মুহূর্তে লিখছি আর ভাবছি, আমি সারা জীবন চেষ্টা করলেও এমন একটি কবিতা লিখতে পারব না। ভালোবাসার মানুষকেও কখনও কখনও ঈর্ষা করতে ইচ্ছে করে।  ভাই জয়দেব, আমি আপনাকে ভয়ংকর ঈর্ষা করছি। সমস্ত ঈর্ষার পরপার থেকে আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন। কিন্তু এই ভাবনা ও যন্ত্রণা থেকে আমি কিছুতেই মুক্ত হতে পারছি না।কেন আমি এভাবে, এত অনায়াসে, জীবনকে লিখতে পারি না শব্দে ও কথা-প্রতিমায়? আপনি তো আমার চাইতে বয়সে ছোটো ছিলেন!

 

আমার অনুজ কবি শ্রীজাত বড় চমৎকার ভাষায় লিখেছেন আপনার কথা :

 

“তোমার নামে রাস্তা না হয় না হোক।

রাস্তা তুমি দেখিয়ে গেছ নিজেই।

আজ যারা সেই দুঃসাহসের বাহক

তোমার নামে বৃষ্টিতে কাকভিজে।”

 

আর একটি স্তবক আরও সুন্দর :

 

“তোমার নামে ছুটি না দেয় না দিক

লেখা সবাই ঠিকই বুঝে নেবে।

বুকের নীচে পথ গিয়েছে বাঁ দিক…

সব মিছিলই মিশেছে জয়দেবে।”

 

মিছিলের কথায় মনে পড়ল তাঁর ‘ভ্রমণ কাহিনী’র উৎসর্গপত্রটির কথা : ” হে পার্টি, আমার ঈশ্বর, তোমার চর্যাগানে এখনও মীড়ের কাজ তেমনই কোমল। প্রায় ততদূর ভালো মানব-সমাজ তুমি এনে দিতে পারো। কে না জানে পৃথিবীর অসুখ এখন।”

 

এসব পড়লে বোঝা যায়, কী নিঃসীম ভালোবাসা আর স্বপ্ন নিয়ে তিনি রাজনীতির আগুন-ঝরা পথে স্বেচ্ছায় ঝাঁপ দিয়েছিলেন।

 

রুস্তম নামের একটি কবিতায় তিনি এঁকেছেন সেই অগ্নিময় পথের প্রতিকূলতার কথা :

 

“ইয়ে লাল পার্টিকা হারামিপন ভি হামার না পসন্দ। একবার ইন লোগোঁকো চান্স দে দিয়া তো সমঝ লো বরবাদি হি বরবাদি।… হামারি মহল্লে মে সাব, আপন তো ইয়ে লাল ঝান্ডেকা চুদুর বুদুর একদম তোড়ে দিয়েছি। সালা কমনিস দেখো ঔর মারো।”

 

কিন্তু একসময় তিনি দেখলেন, পার্টি ক্রমশ আদর্শভ্রষ্ট হচ্ছে। স্বার্থপর আর ধান্দাবাজ মাতব্বর মানুষে ছেয়ে যাচ্ছে দলীয় অফিস। কমরেডরা দিনকে রাত আর রাতকে দিন করছেন নিপুণ দক্ষতায়। সেই দুঃসময়ে জয়দেব লিখেছেন :

 

“বিপ্লবীরা ক্রমশ মন্ত্রী হবে আর মন্ত্রীরা মন্ত্রীই হতে চাইবে বারবার।” ( কবিতা ২০০৬— ১২)

 

‘দুঃসময়ের নোটবই’তে তিনি লিখেছেন পার্টির এই অবক্ষয়ের কথা :

 

“পার্টি তোমাকে প্রশ্ন করার অধিকার দিয়েছিল, আর, তুমি স্বেচ্ছায় পার্টিকে দিয়েছিলে প্রশ্নাতীত থাকার অধিকার।”

 

কিন্তু সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মতো যাঁরা দল ছেড়ে অন্য দলের সঙ্গে গোপনে বা প্রকাশ্যে আঁতাত করেন তিনি তাঁদেরও সমর্থন করেননি। কিছু মানুষ ভুল করতে পারে, কিন্তু পার্টির আদর্শ তো মিথ্যে ছিল না। স্বপ্নটা তো মিথ্যে ছিল না। স্বভাবতই জয়দেব আকণ্ঠ ঘৃণা ছুড়ে দিয়েছেন সেইসব স্বার্থান্বেষী দলত্যাগীদের প্রতি :

 

“রাজার সঙ্গে আঁতাত করেন যিনি

আমাদের সেই গুহকের প্রতি ঘেন্না।”

 

“রাজার পড়োশি হতে চান যিনি আজ

আমাদের সেই দালালের প্রতি ঘেন্না।”

(মুখুজ্জের প্রতি)

 

স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল তাঁর স্বাভাবিকভাবেই। ব্যক্তিগত ডায়েরিতে তিনি গভীর আক্ষেপের সুরে লিখেছেন :

 

“পশ্চিমবঙ্গে পার্টির নেতৃত্ব চলে গেছে কিছু ভীতু, অশিক্ষিত, হামবড়া মধ্যবিত্তের বাচ্চার হাতে।”

 

কিন্তু পার্টির দুর্নীতির বিরুদ্ধে মুখ খোলা যাবে না। লোকাল কমিটির দাদারা এক একজন স্বঘোষিত ঈশ্বর।  জয়দেব সখেদে লিখেছেন সেই তেতো অভিজ্ঞতার কথা :

 

“এল সি বলেছে একা কোনো কাজ নয়

হঠকারীরাই কেবল ওসব করে।

এল সি বলেছে আমাদের আগে মানো

রাজ্য কমিটি যা বলেছে সেটা পরে।”

 

তাহলে কি পার্টির কোনও অন্যায়ের প্রতিবাদ করা যাবে না? একজন শিক্ষিত সংবেদনশীল কবি ও অধ্যাপক কি একজন অর্ধশিক্ষিত ক্যাডারের মতো সবকিছু মেনে নেবেন মুখ বুজে,  বিনা প্রশ্নে, বিনা বিতর্কে? জয়দেব জানিয়েছেন সেই দুর্বিষহ অভিজ্ঞতার কথা:

 

“এল সি বলেছে আমাদের আগে বলো

একা একা কোনো প্রতিবাদ করা মানা;

জানিয়ে দেখেছি ফল যা হয়েছে তার,

শুধু আমি কেন, অন্যেরও সেটা জানা।”

 

এরপর কি তাহলে ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে বসে থাকতে হবে? পার্টি অফিসে বসে অলস বরাহের মতো হাই তুলতে হবে নির্বিকার :

 

“ঘরে বসে থাকি, বই পড়ি, টি ভি দেখি

এল সি-তে গেলে আলগোছে তুলি হাই;

যদি দেখি কোনো আক্রান্তের মুখ…

এল সি বলেছে….. বাপরে, এড়িয়ে যাই।”

 

(আমার লোকাল কমিটি)

 

জয়দেব সহিষ্ণু বরাহ অবতার হতে পারেননি।

 

কী ভয়ংকর মানসিক অস্থিরতা তাঁকে সেইসময় কুরে কুরে খেয়েছিল, তা বোঝা যায় সেই সময়ে লেখা তাঁর একের পর এক কবিতা ও দিনিলিপি থেকে:

 

” তোমাকে তাড়িয়ে দেবে? দিতে পারে। তুমি সেই লোক,

চোখ বুজে থাকে না যে, স্বজন বন্ধুর কাছে বিপজ্জনক। “

 

” লেনিন নিষিদ্ধ রক্তে? ক্লীবতারই কাছে আজ ঋণ?

অস্বীকার করো পার্থ, কথা দাও তুমিই লেনিন।”

 

(আমার ভগবদগীতা)

 

“আমাকে ঘিরে গজিয়ে উঠেছে অসাধারণ সব সমস্যা। অর্থাৎ ‘দেশ’ পত্রিকায় লিখব কিনা, পার্টিতে আর কদ্দিন আছি, কে আমার প্রোমোটার —শঙ্খবাবু না সুনীল গাঙ্গুলি? সোমবার আমায় এ মেয়ের সঙ্গে তো মঙ্গলবার ভিন্ন মেয়ের সঙ্গে!”

 

(নিজেকে দেখুন/ ভবিষ্যৎ)

 

‘মায়াকোভস্কির শেষ সাত দিন’ নামের একটি তীব্র ও শানিত কবিতায় জয়দেব অত্যন্ত দুঃসাহসিক ভাষায় উগরে দিয়েছেন পার্টির ঘুণধরা অবক্ষয়ের কথা :

 

“কে জানে কতদিন আমি বাস করছি বিছানাভর্তি ছারপোকার সঙ্গে, আর স্বপ্নে দেখছি হতাশাব্যঞ্জক, ভীতিকর কয়েকটা শব্দ। দেখেছি পার্টিলাইন শব্দটা কেটে দিয়ে লেখা হচ্ছে জমায়েত আর মহামিছিল। গঠনতন্ত্র কেটে দিয়ে প্যানেল এবং পাল্টা প্যানেল, যোগ্যতা কেটে দিয়ে সিনিয়রিটি, মতাদর্শ কেটে দিয়ে কালেকশন। আর বিপ্লব শব্দটা — কতদিন দেখি না — কতদিন?”

 

তরুণ কবিদের প্রতি তাঁর ছিল পর্যাপ্ত ভালোবাসা, সাগ্রহ মনোযোগ।  সেই মনোযোগ ও ভালোবাসা থেকেই কখনও কখনও তিনি সতর্ক করে দেওয়ার ভঙ্গিতে লিখেছেন:

 

“সারাক্ষণ এর পিছনে ওর পিছনে কাঠি না দিয়ে লেখো, ইডিয়ট, লেখো। শতাব্দী শেষ হয়ে আসছে, যদি পারো এই ফাঁকে আরো কয়েকটি কবিতা সংযোজন করে যাও মানুষের স্মৃতির পাতায়। কয়েকটি কবিতামাত্র।” (ডায়েরি  থেকে)

 

“কবিতা লেখার দুবছর পোস্টার সেঁটে নেওয়া ভালো/ কায়িক শ্রমের ফলে বিষয় মজবুত হয়…. এবং সমান ভালো / রান্না শেখা, জল তোলা, মানুষের কাছাকাছি থাকা…./

আমি অভিজ্ঞতা থেকে এই পরামর্শ দিয়ে যেতে পারি।/ মারকুটে কাব্য করো, বুদ্ধিমান রকবাজ কবিতা বানাও,/ পাঠকের পাকস্থলী সেরকম দুর্বল হলে মুখ বুজে সহ্য করো সব, / সহ্য করো উপেক্ষার শীতঝড়, নেতাদের উপদেশবাণী/ দাঁতে দাঁত চেপে থাকো, সহৃদয় বুদ্ধিমান হও, তবু / তরল কোরো না সেই কথামৃত, মার্ক্স পড়ো, সাংখ্যও পড়ো/ ঝান্ডা-কবিদের মতো সরিয়ে রেখো না পাশে হিমেনেথ।”

 

(জনগণতান্ত্রিক কবিতার ইস্তেহার: এক)

 

তরুণ কবিদের প্রতি তাঁর নিবিড় ভালোবাসার বড় চমৎকার প্রকাশ ঘটেছে একটি লেখায়:

 

“তরুণ কবিরা শুনি/ অনেকেই অতিবিপ্লবী

কেউ কেউ দাড়ি রাখে। কেউ যায়/ খালাসিটোলায় বাকিসব করে রব এখানে সেখানে। তবু তারা/ নিয়মিত জ্যান্ত কবিতা লিখে থাকে।… / এসো ঐ কবিদের ছুঁয়ে দেখি/ অনুভূতিদেশ।”

 

প্রজন্মের ব্যবধান ভেঙে তিনি তরুণ কবিদের উষ্মাকেও ভালোবেসে লিখেছেন:

 

“যখন আমায় নিঃশেষিত ভাবো

তখন আমি উড়াল দিই হাওয়ায়

যখন আমায় দ্বীপান্তরী ভাবো,

আমি তখন তোমার ঘরের দাওয়ায়।”

 

জয়দেব বসু একটি জ্বলন্ত আগুনের গোলা। তাকে দুহাতে বেশিক্ষণ ধরে রাখা কঠিন। কিন্তু এই জয়দেবই আবার এক নরম নীলকণ্ঠ পাখি। সেই পাখির পালক যখন  নির্জন মধ্যরাতে ঝরে পড়ে সুদূর আকাশ থেকে তখন আমাদের প্রাণ স্নিগ্ধ হয়ে ওঠে, আত্মায় শোনা যায় মধুমক্ষিকার গুঞ্জন। নরকে বসন্ত আসে সেই আশাবরী রাগে :

 

* ” খাওয়া হয়নি শালিধানের চিঁড়ে

খাওয়া হয়নি সোনামুগের ডাল,

দেখা হয়নি পুণ্যিপুকুর ব্রত

স্বপ্নে আমার বউ আসেনি কাল।” (বাসনা)

 

* “লেখা আমার মা,

আমায় ছেড়ে যেন তুমি কোথাও যেও না।

….লেখা আমার মা,

আঁচল দিয়ে আগলে রেখো, কোথাও যেও না।”

 

* “তুমি দেবী চৌধুরানি, আমি ব্রজেশ্বর

আমি তোমার আশকারাতে চন্ডাল বর্বর।”

 

* “তুমি আমার গোসলপানি, আমি কানের দুল

তুমি আমার বেগুন দিয়া ইলশা মাছের ঝুল।”

 

(২১ শে ফেব্রুয়ারি বা ১৯ শে মার্চ: তোমাকে)

 

কী চমৎকার ছন্দের হাত। কী গদ্য কী পদ্যছন্দে, কী অনায়াস সঞ্চরণ! ভাষা বিষয়ে নেই কোনও ট্যাবু, নেই শুচিবায়ুতা। এমন শক্তি ও ভালোবাসা,  এমন কাঠিন্য ও কোমলতা, এমন ঋজুতা ও নমনীয়তার অবিশ্বাস্য সমন্বয় সাম্প্রতিক বাংলা কবিতায় খুব বেশি দেখেছি কি?

 

প্রতিদিন কত কবিতা পড়ি আমরা। আলোচনাও করি যথাসাধ্য। কিন্তু এরকম একজন তাজা ও জ্যান্ত কবিকে নিয়ে যতটা আলোচনা ও আলোকপাত প্রয়োজন ছিল, তা হয়েছে কি?

 

যেখানেই থাকো, ভাই জয়দেব,  আমার আজ ও আগামীর সবটুকু ভালোবাসা তোমাকে দিলাম।

 

© উত্তম দত্ত

(বই কথা কও: ১)

 

কবি : জয়দেব বসু

জন্ম: ১২ মে ১৯৬২

চলে যাওয়া : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১২

অধ্যাপনা করতেন দমদম মতিঝিল কলেজে

পড়াশোনা করেছেন : শান্তিনিকেতন,  প্রেসিডেন্সি কলেজ ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে।  বিষয় : বাংলা ভাষা ও সাহিত্য

বাবা: পরিতোষ বসু ( নড়াইল/ সিঙ্গিয়া)

মা : বেলা বসু ( টাঙ্গাইল/ সাজাইনপুর)

স্ত্রী : কবি সেবন্তী ঘোষ

ছেলে : মৌর্য বসু (জুরা)

 

কয়েকটি বই :

মেঘদূত ( দীর্ঘ কবিতা)

ভবিষ্যৎ

জীর্ণপাতা ঝরার বেলায়

ভ্রমণকাহিনী

উত্তরযুগ

লুপ্ত নাশপাতির গন্ধ

সাইকোপ্যাথ

জয়দেব বসুর কবিতা

জয়দেব বসুর শ্রেষ্ঠ কবিতা

Pages ( 31 of 35 ): « Previous1 ... 2930 31 3233 ... 35Next »
Close Menu