শ্রেষ্ঠ নয় সমগ্রের খোঁজে

।। কবিতা আশ্রম পরিবারে সকলকে স্বাগত।।"কবিতা আশ্রম একটি গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকা। এই পত্রিকা থেকে তরুণদের কবিতা আর কবিতা-ভাবনা কোন পথে চলেছে তার এক রকমের চিহ্ন পাওয়া যায়।"--কবি জয় গোস্বামী ।। "তথাকথিত শিবিরের ধারণাকে ধ্বংস করে দিয়ে কবিতা আশ্রম এই সময়ের বাংলা কবিতার প্রচ্ছদ হয়ে উঠেছে। নানা মাত্রার , মার্গের , স্রোতের , ঘরানার এমন নিরভিমান উদযাপনের শরিক না হয়ে কেউ পারবেন না , এটা আমার বিশ্বাস ।"--সুমন গুণ ।। "কবিতা আশ্রম চমৎকার ম্যাগাজিন ।কখনও লিখিনি , এবার লিখতে পেরে ভালো লাগছে"--কবি মৃদুল দাশগুপ্ত।।"আমি কবিতা আশ্রম পত্রিকা পাই এবং আগ্রহ দিয়ে পড়ি । যে সকল কবিতা ও গদ্য প্রকাশিত হয় সে-সবই অত্যন্ত ভালো লেখা এবং সু-সম্পাদিত,যা আমার খুবই ভালো লাগে । এছাড়াও কবিতা আশ্রম পত্রিকাকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু তরুণ কবি ও গদ্যকার আগামীর জন্যে তৈরী হয়ে উঠছে । তরুণ কবি ও গদ্যকার-দের প্রশয় দেওয়ার ক্ষেত্রে কবিতা আশ্রম পত্রিকাটি খুবই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখেছে ।"--কবি দেবদাস আচার্য।।"প্রকৃত কবিতাকে জহুরির চোখে খুঁজে আনছে কবিতা আশ্রম। প্রচারের আড়ালে থাকা তরুণ কবি প্রতিভাকে পাঠকের সামনে নিয়ে আসার এই প্রয়াসকে কুর্নিশ জানাই ।"--কবি অঞ্জলি দাশ।।"দূরে গেলে কিছু জিনিস আবছা দেখায় । আরও দূরে গেলে কিছু জিনিস স্পস্ট হয়ে ওঠে । কবিতা আশ্রমকে আমি স্পস্ট দেখতে পাচ্ছি। যেভাবে আত্মত্যাগের মধ্যে দিয়ে মাথা তুলে কাগজটিকে ক্রমশ আইকনিক তুলছে সেটা একটা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে ।"--কবি সুবোধ সরকার।। “কবিতা আশ্রম প্রকৃত অর্থেই বাংলা কবিতার লাইট হাউস ।তরুণ কবিদের খোঁজে আমি তাই প্রতিটি সংখ্যা পড়ি”।–রাহুল পুরকায়স্থ ।।“অচেনা নতুন কবিদের দিকে এখন তাকিয়ে থাকি।‘কবিতা আশ্রম’ এই সব কবিকে সামনে নিয়ে আসছে।এ একটা প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এই জাতীয় উদ্যোগ বাংলা কবিতার ক্ষেত্রটিকে প্রসারিত করছে”।–কবি কালীকৃষ্ণ গুহ ।।“কবিতা আশ্রম আমার প্রিয় পত্রিকা । পড়ে এবং লিখে তৃপ্তি পাই। সারা বাংলার তরুণদের খুঁজে আনছে কবিতা আশ্রম”।–কবি সমর রায়চৌধুরী ।। "সব চেয়ে ভালবাসি নিজেকে কারণ সে লোকটার ভেতরে কবিতার আবাস । সেই নিজেকে দেখার জন্যে এক টুকরো আয়না খুঁজছিলাম বহুদিন । কোথাও পাইনি । কে জানতো একটি আশ্রমের ভেতর সেই টুকরোটুকু আমার জন্য অপেক্ষা করছে।"--দিশারী মুখোপাধ্যায় ।।

সবুজ ধারাবাহিক ৭ 

বুনো ঝোপঝাড়
গাছবন্ধু

টেপারি 

 
বৈজ্ঞানিক নাম:  Physalis minima 
ইংরেজি নাম: Cape gooseberry, Native gooseberry, Wild cape gooseberry, Pygmy groundcherry 
অন্যান্য বাংলা নাম: রসভরি, বনটেপারি, ট্যাঁপারি, ফুটকি, ফুটকা, ফসকা বেগুন    
 
আমাদের বিলেন মাঠের আলগুলো তখনও দু-মানুষ-স্বচ্ছল হাঁটাপথ, তখনও দু-আলের মাঝে মহাদেবের মতো চিৎ হয়ে শুয়ে-শুয়ে তারা-গোনা জলপথেরা ছিল স্বচ্ছ, তখনও গিলে খায়নি তাদের কোনও অজগর-পাইপ, তখনও ওই জলপথে ভাসিয়েছিস কত কাগুজে নৌকো অজানার উদ্দেশে, পালে তার নাম লেখা। মণ্ডলদের জমি পেরিয়ে দাসেদের জমি পেরিয়ে বালাদের জমি পেরিয়ে কোথায় যে চলে যেত নৌকোগুলো! তখনও বৈশাখের খড়খড়ে রোদে তোকে দেখেছি পাকাধানের ভিতর, যেন মালক্ষ্মী কানাধানের বোলগুচ্ছে হাত বুলিয়ে করলেন চক্ষুষ্মান! ধানকাটার মরশুমে কাস্তেরা সুর তোলে মধুর। মাঠের-পর-মাঠ ফাঁকা হয়ে আসে। সারাটা মাঠের ভিতর অজস্র ধানের জালি। যেন এ মাঠ নয়, অনন্ত আশ্রমপুর! তারই ভিতর মাথা ভর্তি ঝাকড়া ঘাস নিয়ে আলগুলো শুয়ে। শুয়ে শুকনো জলপথ। তার ভিতর ও বাইরে বুনো ঝোপঝাড়। আর সেই ঝাড়ের ভিতর হাঁটু-সমান বুনোগাছ থেকে টপাটপ কয়েকটি সবুজ ফল মুঠোয় নিয়ে বলতিস, “বলতো কী?” অপুষ্ট মেঘের মতো আমার চাউনি দেখে হেসে বলেছিলি, “এও চিনিসনে? এ তো ট্যাঁপারি!” দুধেধানের মতো বাতাসে হাসি উড়িয়ে আরও বলেছিলি, “ট্যাপা ট্যাপা ফল। তাই ট্যাঁপারি! তুই ট্যাপা আমি টেপি, হয়ে গেল ট্যাপাটেপি। হয়ে গেল ট্যাপারি!” “আমি টেপা?” রেগেছিলাম খুব। “হয়ে যাবি যখন এই এতটা হবি!” হাত দিয়ে বুঝি তুই আকাশকে বোঝাতে চাস। আমি আকাশ দেখি, দেখি ধান-শূন্য মাঠে ধুসর বাদামি নাড়ার ভিতর আল টপকে ঘরে ফেরা গোরুগাড়ি বোঝাই গোধূলি। এভাবে একদিন গোধূলি-রং ধুয়েমুছে আমাদের মাঠে ঘন রাত নামে আচমকা। আর কখনও বুঝি-বা ভোর হয়নি সেখানে। আর কখনও পা রাখিনি সেখানে। তোর আকাশ-ছোঁয়া হাতটা আকাশ-ই ছুঁয়ে ফেলল একদিন। ট্যাপাটেপি-র মাটির পুতুল ভেঙে চলে গেলি পুতুল নাচের দেশে। একদিন শুনলাম সেই আকাশ-ই বুকে নিয়ে গেছে তোকে! তোর ছোট্ট মেয়ে দুটো আকাশ ছুঁয়ে-ছুঁয়ে দেখে কি আজও ধানখেতের ভিতর? 
সব পালটে গেছে এখন—নদী-বাঁওড়-জমিজমা-নরনারী। গোপালনগর হরিপদ ইনস্টিটিউশনের মাঠে ক্রিকেট ম্যাচ, ছেলে খেলছে, আর আমি ঘুরে-ঘুরে দেখছি আশেপাশে। পাশে ইংরেজ আমলের ছাত্রাবাস। দেখি তার মাথাটা ভীম-পা দিয়ে চেপে ধরেছে দেয়ালে জন্মানো বিশাল এক নিমগাছ। তার শিকড়বাকড় দেয়ালে প্রাচীন লিপির মতো ছড়ানো। নিমের পাশে অশ্বত্থ। সেও চেপে ধরেছে বাহু। যেন মহাভারতের যুদ্ধ এখানেই। একতলা ঘরটার কড়িবরগা ভেঙে পড়েছে কোথাও-কোথাও। পৃথিবীর সভ্যতা এভাবেই বুঝি ভেঙে পড়ে। পাখিদের ঠোঁটে ঠোঁটে শুধু গান নয়, বিদ্রোহের বীজ ছড়িয়ে পড়ে এভাবেই। প্রকৃতির সঙ্গে পাঞ্জা? 
বাচ্চারা খেলছে। ওপাশের স্কুলটায় বিভূতিচরণ পড়েছিল একদিন। ছাত্রাবাস ছুঁয়ে আমতলা টপকে বাটকেমারির ওই চাষের মাঠে দাঁড়িয়েছিলেন একদিন। ছাত্রাবাসের পুরোনো শরীর ছুঁয়ে জেগে ওঠে আমার এ-জীবনের বিভূতি-অনুভব! এখানেই বিভূতি-অরণ্য। আর কী আশ্চর্য, তারই নীচে অজস্র বনটেপারি! লিচুর মতো অজস্র সবুজ ফল ঝুলে আছে গাছে গাছে। পাকলে বাদামি। হাওয়ায় হাওয়ায় খুলে যায় পাকা ফলগুলোর কাগুজে আবরণ। উড়ে যায় বীজ। ছড়ায় জীবন। প্রকৃতির কী অদ্ভুত খেলা! এটাই নাকি ‘বেলুন মেকানিজম’। সোলানেসি পরিবারভুক্ত বেগুনফুলের মতো ফুলগুলো একদিন ছুঁয়ে-ছুঁয়ে দেখেছিলি খুব, একদিন কোরসে জমিয়েছিলি অনেক কাঁচাফল, একদিন নুন মাখিয়ে মুখে পুরে বলেছিলি, “উফ্‌, খেয়ে দেখ, একেবারে বুনোটমেটো!” Physalis minima, Physalis philadelphica, Physalis peruviana, Physalis heterophylla—মেক্সিকো প্রদেশের এই ঝোপঝাড়গুলো সব-ই প্রায় একই রকম। কবে যে তারা এখানে এসে আপন হয়ে গেছে! ওদেশে স্যালাডের মতো করে কাঁচাফল খায়। আবার দেখা যায় বেদনানাশক হিসেবে গোটা গাছের ব্যবহার। এ যে এক একবর্ষজীবী ভেষজ উদ্ভিদ—গুণাগুণ ঢের। 
মাঠে বাচ্চাদের খেলা চলছে। ‘আউট আউট’ চিৎকার ভেসে আসে। কে আউট? আমি? তুই? আমি তো তাকিয়ে রসভরির দিকে। আমি তো তাকিয়ে পাশের পটলখেতের দিকে। বৃদ্ধ বোধহয় এই শেষ বিকেলে নাতনিকে নিয়ে মাচাপটল ভাঙতে এসেছেন। মেয়েটা আচমকা আমার দিকে ফিরতেই মনে হল তুই! তুই আকাশ ছুঁয়ে এসে পড়লি এতদিন পরে! ধুস, তাই হয় নাকি! এইসব বড়ই ক্লিশে মনে হওয়া। তার চেয়ে বরং ভাবি তোর নাম লেখা কাগুজে নৌকোর পেছন-পেছন এত বছর হেঁটে এসে খুঁজে পেয়েছি আজ রং রস ভরা এই রসভরির দেশ!
 
 

 

 

Pages ( 35 of 35 ): « Previous1 ... 3334 35
Close Menu