সাপ্তাহিক

১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮

দুর্গা দত্ত
ভূতচতুর্দশী

কিছুতেই খুঁজে পাই না
অন্ধ এই ঘর থেকে পা ফেলার নিকানো উঠোন

কিছুতেই খুঁজে পাই না
আঁজলায় ভরে নিয়ে অঞ্জলি দেবার মতো শুদ্ধ জল
আলতাপেড়ে আলো

খুঁজে পাই না কিছুতেই
কোথায় হারাল নদী, গ্রামদেবতার থান
ধানশিষে ফড়িঙের খুনসুটি, মল্লারের মেঘ

কিছুতেই খুঁজে পাই না
বাড়ি ফেরবার পথ, ডুবসাঁতার, স্নান…

ধুলো বালি মেখে নিয়ে মাঝরাতে বৃষ্টি নেমে এলো—
যে বৃষ্টির মুখে কোনও স্বপ্ন নেই শস্যজল নেই

মধ্যযাম লিখে রাখে
ঠিকুজির মৌলকোষে কালচক্রযান

ঐশী চক্রবর্তী
নক্ষত্রের মাস

এখন নক্ষত্র-আয়ুধ চলছে বিশীর্ণ মেধা জুড়ে
শীতের মতন পাতারা লুকিয়েছে মরুভূমি
এখন ঘুমের মাস
তিরতির উপনদী বয়ে চলে চুলে ও চন্দ্রে…

হাওয়া ওঠে, প্রলয় হতে যেন দেরি নেই আর
প্রতারিত বিকেলের পরে
একবারমাত্র ঝড়
নিঃসীম শূন্যতা দিয়ে যাবে তাকে

মেহগিনির চেয়ে সমুদ্রে-সমুদ্রে যার ছায়া পড়েছিল
উদাসী চোখ, ছেড়ে যাওয়ার ব্যথা জানে কী!

এখন নক্ষত্র-মাস
অবেলায় ঘুম পেলে ফিরে আসার রাস্তা জানা নেই…

প্রেমিকা

শামুকে জেগেছে বন্য উজাগর
অতিপ্রায়, বিরহাতুরা দ্বীপ ও প্রত্যূষ
ডুবে যাবে জলে, হায়!
ছলনা জানে না বনচারী…

ফিরেছে চিত্রাণীর বেশে, উন্মুখ ওষ্ঠ-প্রতারক!
শামুকের স্বপ্নকাল, এখানে অতিকায় ফিরে ফিরে আসে
জলোচ্ছ্বাস।
পানিফল ঝরে গেলে বৃক্ষের জাম-রঙা ত্বক
বোঝে না আঘাত ছলনার অন্যতম নাম

আশরীর ভাসমান
ঋতবিভা ও নিখুঁত চন্দ্র-হন্তারক…

সুজন পণ্ডা
বিষাদ হরকরা

আমার মাথার ওপর
ভারী হয়ে বসেছে রাতের আকাশ
একটি করে নক্ষত্র ফুটছে
আর যন্ত্রণার দাগ আঁকা হয়ে যাচ্ছে

আমার পায়ের ঠিক নীচে
ভারী হয়ে এসেছে পথ
প্রত্যেক বাঁক বদল করে
ব্যথায় জড়িয়ে আসছে গোড়ালি

আমি কখনও কালপুরুষ
কখনও বিষাদ হরকরা।

পথের দু ধারে অজস্র মুখ দেখি,
ক্ষয়াটে নক্ষত্রের মতো লাল
যন্ত্রণা কাতর
দ্বিধাগ্রস্ত
শুধু স্তিমিত আগুন সাক্ষী করে
বেঁচে থাকা মুখ,

মাথার ওপর আকাশ
পায়ের নীচে পথ
ভারী হতে হতে পিষে দিতে চায়
আমার স্থাপিত অস্তিত্ব

পথের দু ধারে অজস্র মুখ
রাতের আকাশের নীচে বারংবার
পথের বাঁক খুঁজেই চলে

পল্লব গোস্বামী
দাদু তোমার পাঠশালাতে

দাদু তোমার পাঠশালাতে, এখনও নক্ষত্ররা স্থির হয়ে পড়তে বসে। পদ্ম পাতায় ভাত মেখে খেয়ে তুমি আবার গোরুর গাড়ি। ধবধবে ধুতি, গায়ে ঘিয়া শাল – সারা আকাশ আবার তোমার। সুদূর নক্ষত্রগ্রাম থেকে স্বাতী, অশ্লেষারা ছুটে আসে। একমনে নামতা বলে অনুরাধা। অরুন্ধতীর চোখে চোখ রেখে, তুমি সাজাও এক তারার মেলা। মেলায় ময়ূর পালক, ফিরফিরিও ওড়ে। পড়ার ফাঁকে ফাঁকে কেউ কেউ পাখি হয়। আমরাও ছোটো ছোটো মেঘ হয়ে গিয়ে তোমার কোলের কাছে বসি। সারাদিন ধরে মুখস্থ করে চলি, এক অবিশ্রান্ত বর্ণমালা।

গল্প

উল্টোরথে
কুমারেশ তেওয়ারী

নদীর দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে ছিল মল্লিকা। থুড়ি নদী বলা বোধহয় ঠিক হবে না। গ্রামের লোক একে জোড় বলে। সরু একফালি রূপোলি দড়ি যেন কেউ কোনও এক স্থানের উৎসস্থল থেকে শুরু করে ফেলে ফেলে এগিয়ে গেছে কোথায় কে জানে! সারাবছর এই জোড়ে জল থাকে না বললেই চলে। এখন বর্ষার জল পেয়ে কিছুটা নদী নদী ভান ফুটিয়ে তুলেছে তার রোগা হাড়জিরজিরে শরীরে। যেন টিঙটিঙে এক নারী বিয়ের জল পেয়ে গায়েগতরে ওই একটু চিকনচাকন আর কি।

পিছন থেকে মনোময় এসে কাঁধে আলতো হাত রাখতেই মল্লিকা কিছুটা চমকে উঠল বুঝি। তবে সেই চমকে ওঠার ভাবটিকে আত্মগত রেখে ঘুরে তাকাল মনোময়ের দিকে। এতো স্বপ্নালু চোখ যে কোনও নারীর হতে পারে মল্লিকা তার জীবনে না এলে মনোময় বুঝি জানতেই পারত না। ওই চোখ লিওনার্দ পেলে কী করত? মনোময় মাঝে মাঝে ভাবে। তবে তাই বলে মোনালিসাকে সে কক্ষনও পছন্দ করেনি। তার ওই রহস্যমাখানো হাসি কেন যেন প্রথম থেকেই ভীষণ অপছন্দ মনোময়ের।
‘এত তন্ময় হয়ে কী দেখছ মলি?’ খুব আলতো করে প্রশ্ন করে মনোময়।
‘আচ্ছা মনো আমরা তো এর আগেও বহুবার এসেছি এখানে কিন্তু এত নিবিড়ভাবে দেখেছি আমাদের এই ছোটো নদীটির রূপ। জানো আজ এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ যেন আবিষ্কার করলাম এই নদীরও কত গোপন কথা আছে।’ বলতে বলতে মল্লিকা যেন থিরবিজুরি হয়ে দাঁড়িয়ে রইল নদীর দিকে মুখ রেখেই। 

প্রায় চার বছরের মেলামেশায়, মনোময় বেশ পরিচিত মল্লিকার এই চরিত্রটির সঙ্গে। ও জানে মাঝে মাঝে মলি কেমন যেন দার্শনিক হয়ে ওঠে। খুব তুচ্ছ জিনিসের মধ্যেও ও তখন বিশালের, মহতের সন্ধান পায়। সে নিজেও সংক্রামিত হয়ে পড়ে। যেন তন্বিষ্ঠ পাঠকের মতো সে পড়তে পারে মল্লিকার অন্তর্মহলের কথা। তখন তার নিজেরও মনে হয় একটা পিঁপড়েরও যেন কত কিছু বলার আছে। মানুষের কান সেই ফ্রিকোয়েন্সি নিতে পারে না বলেই মানুষ শুধু তাদের কামড়ের জ্বালার কথায় ভাবে। 

‘দেখো খুব ছোটো ছোটো ঢেউগুলো উঠেই আবার কেমন ভেঙে যাচ্ছে জলের ভেতর।’—মলির কথায় চিন্তার স্রোত ছিঁড়ে যায় মনোময়ের। তাকিয়ে দেখে সত্যিই তো হালকা বাতাসে কেমন একটার পর একটা একটা স্রোত জন্ম নিয়েই আবার তলিয়ে যাচ্ছে অতলে। মিশে যাচ্ছে জলের প্রতিটি কণার সঙ্গে। এ যেন টুকরো টুকরো ঘটনাপ্রবাহ হঠাৎ জন্ম নিয়েই আবার মিশে যাচ্ছে তার উৎসে।
‘আচ্ছা মনো, আমাদের সংসারও যেন এই ছোটো নদীটার মতোই। তাই না? কত ঢেউ কত ঢেউ। কখনও ছোটো ঢেউ আবার কখনও বড়ো ঢেউ। ছোটো ঢেউগুলো খুব একটা নাড়িয়ে দিতে পারে না আমাদের কিন্তু বড়ো ঢেউগুলো কেমন সব উথালপাথাল করে দেয়। তাই না?’ মল্লিকার সেই স্বভাবসুলভ দর্শনমাখানো প্রশ্ন।
কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল মনোময় কিন্তু তার আগেই হঠাৎ তার দৃষ্টি আটকে গেল অন্য এক ঘটনাপ্রবাহের দিকে। নদীটির পাড়ে একটু ঝোপঝাড় ঘেরা ঘাসজমিতে একটা গিরগিটি, চুপ করে তাকিয়ে আছে নদীর দিকেই। তার চোয়ালের উপর বসে আছে একটা মাছি। মনোময় অবাক হয়ে দেখছিল আঠালো জিভের গোলা বানিয়ে যখন কিনা অনায়াসে ধরে ফেলতে পারে গিরগিটিটা ওই স্পর্ধিত মাছিটিকে, বদলে সে মশগুল হয়ে দেখছে নদী। ভারি মজার তো! ভাবতে ভাবতেই মনোময় দেখে গিরগিটির মুখ থেকে একটা গোলা সাঁৎ করে ছিটকে গেল সামনের দিকে। পরক্ষণেই সে অবাক হয়ে দেখল একটা গঙ্গাফড়িং গিরগিটিটার মুখের কাছে দু-একবার ছটফট করে স্থির হয়ে গেল।
মল্লিকাও দেখেছিল এই দৃশ্যটা। ‘দেখলে তো যা তুমি দেখছ সেটাই কিন্তু চুড়ান্ত নয়। আমি নিশ্চিত তুমি ওই গঙ্গাফড়িংটিকে দেখতে পাওনি। তাই না মনো? যার মরার কথা সে না মরে মরলো আরেক। এটাই হয়তো জগতের নিয়মের তুমুল বিস্ময়।’ মল্লিকার প্রায় আত্মগত উচ্চারণ কি শুনতে পেল সেই মুহূর্তে আকাশে ভাসমান একটা চিল! সাৎ করে করে কিছুটা নেমেই কেন উড়ে চলে গেল অন্যদিকে অন্য কোনোখানে?
এই প্রথম মনোময়ের যেন ভাল লাগছিল না দর্শনতত্ত্ব। সে বরং ভাবছিল মৃত্যু বুঝি এভাবে অতর্কিতেই আসে। আচ্ছা মাছিটি এখন কোথায়? সেও কি দেখেছিল গিরগিটির গঙ্গাফড়িং সংহার। হয়তো কোথাও বসে সে এখন তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছে তার ভাগ্যকে।
‘আচ্ছা আমরা কি শুধু এই আবোলতাবোলই ভেবে যাব। নিজেদের কথা বলবো না কিছু?’—মলির প্রশ্নে ঘোর কাটে মনোময়ের। সত্যিই তো এসে পর থেকে শুধু দর্শন আর দর্শন। কত আর বয়স তাদের। তার তো এই সবে ছাব্বিশ আর মলি তার চেয়ে বছর দুয়েকের ছোটো। একই গ্রামের ছেলেমেয়ে তারা। তবে পাড়া আলাদা। সে ভটচার্য পাড়ার হলে, মলি মুখুজ্জে পাড়ার। একই কলেজে পড়তে পড়তে প্রেম। তাদের দুজনেরই বাড়ির লোক এবং অবশ্যই গ্রামের লোকেদের কাছে এই প্রেমের কথা আর গোপন নেই। গ্রামের লোক অবশ্য এ নিয়ে আর কৌতুহলও দেখায় না কেউ।

‘ও হ্যাঁ শোনো চাকরিটা বোধহয় হয়ে যাবে। রিটেনের রেজাল্ট বেরিয়েছে। ফার্স্ট লিস্টেই আছি। এখন ভাইভাতে ঠিকঠাক উৎরে গেলে—।’ পরিবেশ কে হালকা করতে বলে ওঠে মনোময়।
মনোময়ের কথা শেষ হবার আগেই তার হাত নিজের হাতে নিয়ে খেলা করতে থাকে মল্লিকা। একগুচ্ছ চুল তার কপাল বেয়ে গড়িয়ে নেমে আসে ঠোঁটের কাছে। সেই মুহূর্তে সূর্যাস্তের শেষ আলো যেন কী এক মোহন রাগে রাঙিয়ে দিতে থাকে সেই চুলের গুচ্ছটিকে।

২
দোতলার ঘরে জানালার কাছে বসে বাইরে বৃষ্টি দেখছিল মনোময়। এবারের বর্ষাকালটা যেন কেমন কেমন ঠেকছিল তার কাছে। প্রায়দিনই আকাশ কালো করে মেঘ অথচ বৃষ্টির দেখা নেই। অথবা হলেও খুব ঝিরিঝিরি। কে যেন মজা করে বলেছিল—আকাশ থেকে বডি স্প্রে ছড়াচ্ছে ভগবান। পারেও বটে। মানুষের মাথায় এসব রসিকতা আসেও বাবা। তবে আজ যেন সব বকেয়া বৃষ্টি মিটিয়ে দেবার ইচ্ছে নিয়ে আকাশে জড়ো হয়েছে মেঘেরা। কী বৃষ্টি কী বৃষ্টি! একেবারে সেই ছোটোবেলায় পড়া ‘ক্যাটস এণ্ড ডগ রেনিং’। তবে এত বৃষ্টির মাঝেও মন ভাল নেই তার। নদীর ধারে দেখা কালকের ওই গঙ্গাফড়িংটির অসহায় মৃত্যু যেন কোথাও কাঁটার মতো বিঁধে আছে। লোকে শুনলে হাসবে। পাগল বলবে তাকে। আর সে নিজেও কি এমন দৃশ্য এই প্রথম দেখল। না এমন তো বহুবার ঘটেছে তারই চোখের সামনে। এমনকি হঠাৎ স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে প্রায় তারই কোলে মরে যেতে দেখেছে তাদেরই পাড়ার নয়নদাকে। তখন তো এমন ঘটেনি।
অবশ্য মন খারাপের আরেকটা কারণ আছে তার। আজ সকালে সে বাগানে গেছিল গাছে জল দিতে। বাড়ির পিছনে তার এই বাগান প্রায় নিজের হাতে গড়া মনোময়ের। তার বাবার ছিল নিত্য পুজোর অভ্যাস। বাড়ির দেব-দেবিদের পুজো না করে জল খেতেন না তিনি। একবার পাশের বাড়ির বাগান থেকে ফুল আনতে গিয়ে প্রচুর কু-বাক্য শুনতে হয় তাকে। তারপরই জেদের বশে মনোময় এই গড়ে তোলে এই বাগান। বাগান বলতে মূলত প্রচুর ফুলের গাছ। দু-একটা আম গাছও আছে, যেগুলো অবশ্য আগের থেকেই ছিল। তা সকালবেলায় বাগানে এসেই হঠাৎ তার চোখে পড়ে আম গাছটির নিচে একটা পাখির বাচ্চা মরে পড়ে আছে।
‘আহা রে! কী করে পড়ে গেলি বাছা’ আত্মগত বলতে বলতে মনোময়ের দুচোখে চলকে ওঠে জল। মনে ভাবে, এই আমগাছটিতে বেশ কয়েকটি বাসা আছে পাখিদের। তেমনই কোনও বাসার থেকে—
ও ধীরে কাছে যায় যেখানে পাখির বাচ্চাটি পড়ে আছে।
‘আহা রে এখনও চোখ ফোটেনি বাছার!’ এত উঁচু থেকে পড়ে কেউ বাঁচে। ভেতরটা মুচড়ে উঠল মনোময়ের। হঠাৎ তার দৃষ্টি গেল আমগাছের ডালে বসে থাকা একটা পাখির দিকে। স্থির হয়ে বসে আছে। কেমন যেন মনমরা দুঃখী দুঃখী ভাব। মনোময় ভাবে—নিশ্চয় মা পাখিটা। যেন নতুন করে সে বুঝতে পারে জননীর ব্যথা। সন্তানের প্রতি অপত্য স্নেহ শুধু মানুষ মা নয় জগৎ-সংসারে প্রতিটি মায়ের মধ্যে সমানভাবে বিরাজমান। এসব ভাবতে ভাবতেই দ্বিতীয়বার চমকে ওঠে মনোময়। লাল পিঁপড়েদের একটা সারি এগিয়ে আসছে মৃত পাখির ছানাটির দিকে। মনোময় যেন শুনতে পেল হাজার হাজার দাঁতের উল্লাসের শব্দ।
‘ওহ!’—একটা বুক নিঙড়ানো হাহাকারের শব্দ বেরিয়ে এল মনোময়ের কণ্ঠনালী চিরে। সে তড়িঘড়ি তার হাতে থাকা মাটি কোড়ার খুরপি দিয়ে ওই আমগাছের তলাতেই একটা ছোট্ট গর্ত ক‘রে খুব কোমল, খুব স্নেহমাখা হাতে ওই মৃত পাখির ছানাটিকে তুলে নিয়ে গর্তে রেখে ভাল করে মাটি চাপা দিয়ে দেয়। তারপর ঘরে এসে চুপ করে বসে থাকে বাগানের দিকে মুখ করে থাকা জানালার কাছে পেতে রাকা তার চেয়ারে।
রান্নাঘর থেকে মা ডাকছিলেন—মনা, চান করে খেয়ে নে বাবা।
‘শরীরটা ভাল নেই মা। আজ চান করছি না। তুমি বরং চাট্টি খেতে দিয়ে দাও।’
সত্যি সত্যিই মনোময়ের শরীর যেন হঠাৎ করে খারাপ লাগছিল।
কখন যেন মা এসে পাশে দাঁড়িয়েছে।
‘কী রে শরীর ভাল নেই বলছিস’—বলতে বলতে মনোময়ের কপালে হাত ছোঁয়ালো মা।
‘তাই তো একটু গরম লাগছে গা। চান করার দরকার নেই। আর শোন আমি চারটে রুটি করে দিচ্ছি। ভাত খাসনে আজ।’
‘ও এমন কিছু না। ঠিক হবে যাবে’—মনোময় কিছু বলার চেষ্টা করছিল তার আগেই মা সটান রান্নাঘরের দিকে।
জানালা দিয়ে মনোময় আরেকবার তাকাল ওই গাছটার দিকে। না মা পাখিটা ওখানে নেই। শুধু ডালের নিচে পড়ে আছে একটা খড়কুটো। আমগাছে পাতা থেকে যেন একফোঁটা জল ঝরে পড়ল পাখির বাচ্চাটিকে পুঁতে রাখা মাটির উপর! সে কী আমগাছের কান্না!

৩
ঘরের দেয়ালে একটা টিকটিকিকে অন্য একটা টিকটিকির ঘাড় কামড়ে ধরে পিঠের উপর উঠে পড়া দেখছিল মল্লিকা। না এই দৃশ্য তার মনে জন্ম দিচ্ছিল না কোনও যৌন কামনার। আসলে সে কোনওদিনই পুরুষের মধ্যে শুধু শরীরই দেখেনি। দেখেনি যৌনতার হাতছানি। অথচ সে তো দেখছে চারপাশে ক্রমশ কেমন শরীর সর্বস্ব হয়ে উঠছে প্রেম। ওদেরই পাড়ার তার বন্ধু মালতিকে নিয়ে কত কথা চালাচালি হয়। তার চরিত্র ভাল নয়। কেউ কেউ বলে সে নাকি নিয়মিত হোটেলেও যায়। এ নিয়ে মল্লিকার কোনো মাথাব্যথা নেই। সে শুধু এরপর থেকে আর কোনো সম্পর্ক রাখেনি ওই মালতীর সঙ্গে।

এই যে মনোময়ের সঙ্গে তার এতদিনের পরিচয় তার মনে কখনো ভুল করেও খারাপ চিন্তা জেগে ওঠেনি। এসব দিয়ে তার যোগ্য সাঙাৎ যেন মনোময়। এই ভার্চুয়াল যুগে বাস করেও যেন সেই প্রাচীনপন্থী। তার কাছেও প্রেম শুধু দেহ সর্বস্ব নয়, দুটি মানব-মানবীর দুই হৃদয়ের অটুট বন্ধন গড়ে ওঠা। যার বন্ধন দড়িটি যেন স্বর্গের পারিজাতের রস মাখানো। যত জড়ায় তত মিঠে গন্ধে ওই দুই প্রেমিক-প্রেমিকার শরীর আরও শুদ্ধ হয়ে ওঠে।
‘দিদি খুব ভালো একটা খবর আছে।’
ভাইয়ের ডাকে ঘোর কাটে মল্লিকার। তার ভাই অঙ্কুর ততক্ষণে ঘরের ভেতর। ভাইয়ের মুখের দিকে তাকায় মল্লিকা। তার চেয়ে আট বছরের ছোটো তার ভাই যেন তার প্রাণের অধিক। হঠাৎ হৃদযন্ত্র বিশ্বাসঘাতকতা করায় তার বাবা অকালে চলে যাওয়ার পর এই ভাই যেন হয়ে উঠেছে তার নয়নের মণি। মা, ভাই আর সে আরও বেঁধে বেঁধে থেকেছে প্রতিদিন।
‘কীরে কীসের ভালো খবর?’—মল্লিকা কিছুটা কৌতুহলী।
‘মনোদা তার চাকরির অ্যাপোয়েন্টমেন্ট লেটার পেয়েছে’— খুব দ্রুত কথাগুলো বলেই দিদিকে জড়িয়ে ধরল অঙ্কুর।
কটা আনন্দের স্রোত যেন মল্লিকার শরীরের ষটচক্র ভেদ করে সহস্রার দিয়ে ছড়িয়ে পড়ল তার বিমূর্ত মনের অলিতেগলিতে। এই আনন্দকে কার সঙ্গে তুলনা করা যায় তা কিছুতেই ঠিক করতে পারছিল না মল্লিকা। হয়তো প্রসব যন্ত্রণা ভোগ করার পর এক নারী তার সদ্যোজাত সন্তারের মুখ দেখে যে স্বর্গীয় আনন্দ পায়, এ আনন্দ তেমনই। হয়তো কার্তিকের হিমমাখা ফসল খামারবাড়িতে তোলার পর কৃষকের মন জুড়ে যে আনন্দের ঢেউ, তেমনই আনন্দ আজ মল্লিকার মনে।
‘কী রে আনন্দে তো তোর নেচে ওঠা উচিত। তা না করে এমন চুপ করে গেলি যে।’
ভাইয়ের কথার কী উত্তর দেবে মল্লিকা। আসলে কিছু কিছু আনন্দ তো স্তব্ধ করে দেয় মানুষকে। একদম কবেকার সেই শেকড়ের ঘরে পৌঁছে দেয়। সেই ব্রহ্ম এঁটো না হওয়ার মতো আনন্দকেও যেন ব্যক্ত করা যায় না। মল্লিকা শুধু এটুকুই বলতে পারল, ‘আর একটু বড়ো হ ভাই তখন বুঝতে পারবি প্রকৃত আনন্দকে কখনও প্রকাশ করা যায় না। তা শুধু ছড়িয়ে পড়ে শরীরের আনাচেকানাচে।’
ততক্ষণে মা’ও সেখানে এসে গেছেন। মানে সেই দৃশ্যে। দৃশ্যই তো। এক একটা দিন এভাবেই দৃশ্য হয়ে যায়। মনের বাগানে বীজ হয়ে পোঁতা হয়ে যায়। ভবিষ্যতে গাছ হয়ে উঠে এসে ডালপালা মেলে।
‘জান মা মনোময়দা চাকরিতে জয়েন করতে চলেছে আর কদিনের মধ্যেই।’—ছেলের কথায় মায়ের ঠোঁট যেন একটু নড়ে উঠল। চোখের কোণা যেন একটু আর্দ্র হয়ে উঠল। কপালে হাত ঠেকিয়ে প্রণাম করলেন কাকে। হয়তো তার মৃত স্বামীকেই। আজ পাঁচবছর হল যিনি তাকে বৈধব্যের রঙে রাঙিয়ে দিয়ে চলে গেছেন দিগন্তের ওই পাড়ে। তারপর কী কষ্ট কী যন্ত্রণায় তিনি মানুষ করেছেন এই দুটি বাপহারানো ছেলে-মেয়েকে। মল্লিকা একবার তাকাল মায়ের দিকে একবার তাকাল ভাইয়ের দিকে। তারপর একটা কান্নাকে চুপের মধ্যে রেখে জানলা দিয়ে তাকিয়ে রইল সামনের আমগাছটির দিকে যার ডালপালা জুড়ে ফুটে উঠেছে অজস্র মুকুল। প্রতি মুকুলে সে যেন দেখতে পাচ্ছিল প্রতিটি আমের আফোটা মুখ। আলো দেখার অন্ত উন্মুখ।

৪
না মনোময়কে কোনও ফোন করেনি মল্লিকা। যেন কিছুটা সময় দিতে চেয়েছিল তাকে। সে তো তাকে নিজের শরীরের রোম চেনার মতো চেনে। জানে সবাই যখন একইরকম ভাবে মনো তখন ভাবে সম্পূর্ণ উলটোরকম। অনেক সময়ই তা উদ্ভট বলে মনে হলেও তার সেই ভাবনার একটা নিজস্ব দর্শন আছে। তাই সে চেয়েছিল মনোময় আগে নিজে আত্মস্থ করুক তার আনন্দকে। তারপর নাহয় অভিনন্দন জানাবে তাকে। ঠিক রাত ন’টায় ফোন এল মনোময়ের।
‘খবরটা শুনেছ নিশ্চয়। তবু একবার ফোনে অভিনন্দন জানালে না মলি।’—মনোময়ের গলায় যেন কিছুটা অভিমানের সুর। আর অভিমান তো স্বাভাবিক। তার সবচেয়ে কাছের মানুষের কাছ থেকে এই প্রত্যাশাটুকু না থাকলে তো জগৎ মিথ্যা, ভালবাসা মিথ্যা। মনোময়ের অভিমানের তারে যেন আঙুলের আলতো ছোঁয়া রেখে বলে উঠল মল্লিকা—‘না গো তা নয়। আসলে তোমার কাছ থেকে ফোন পাব বলে আমিই থাকতে চেয়েছিলাম অনন্ত অপেক্ষা নিয়ে। এই অপেক্ষা যে বড়ো সুখ দেয় মনো। চাইছিলাম এমন আনন্দ আরও আরও জারিত হয়ে মিশে যাক আমার শরীরের প্রতি শিরাতন্তুজালে’।
‘অ্যাই, এবার কি তুমি শুরু করবে নাকি তোমার দর্শন? শোনো এখন রাখছি, পরে দেখা হলে বাকিটুকু—’ বলতে বলতে ফোন কাটে মনোময়। তারপর আধো ঘুম আধো জাগরণে রাত কেটেছে মল্লিকার। না কোনও স্বপ্ন দেখেনি সে। দেখতে চাইও না সে কারণ স্বপ্ন তো মিঠে আর তেঁতো দিয়ে গড়া একটা ফল। এই প্রথম কামড়ে মিঠে তো পরক্ষণেই দ্বিতীয় কামড়ে তেঁতো। তারপর সারাদিন কেটে গেছে কত কথায় কত কত কাজে কখনও বা নীরবতায়।
ঠিক বিকেল পাঁচটায় মনোময়ের মায়ের ফোন।
‘হ্যালো মাসিমা বলুন কিছু বলছেন?’ মল্লিকা জানতে চাই।
‘হ্যাঁ মা শোনো মনা সেই ১ টায় বাড়ির থেকে বেরিয়েছে। এখনও বাড়ি ফেরেনি মা। বড়ো চিন্তা হচ্ছে। যা পাগলাটে ছেলে।’ মাসিমার কাঁপা কাঁপা গলায় যেন উদ্বেগ ঝরে পড়ে।
‘কোথায় যাচ্ছে কিছু বলে যায়নি মাসিমা?’
‘না মা জিজ্ঞেস করেছিলাম এই অবেলায় কোথায় যাচ্ছিস? তা বলল, একটু বাইরে যাচ্ছে এই এক্ষুণি ফিরে আসবে।’
একটা ক্ষীণ আশঙ্কা যেন পাকিয়ে উঠতে চাইছিল মল্লিকার মনে। মাসিমাকে বুঝতে না দিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলল, ‘ওর ফোনে কল করে দেখেননি কোথায় আছে।’
‘আরে ও তো ফোনই নিয়ে যায়নি। বাড়িতেই পড়ে আছে দেখলাম ওর ফোন।’
‘আচ্ছা আপনি চিন্তা করবেন না মাসিমা আমি দেখছি।’ কিছু আগে জন্ম নেওয়া আশঙ্কা আরও জাকিয়ে বসার আগে, ফোনে গলা কেঁপে যাবার আগে ফোন কেটে দিল মল্লিকা।
তারপর দ্রুত বাইরের পোশাক পড়ে এলানো চুল যা হোক একটু আঁচড়ে বাইরে বেরিয়ে এল মল্লিকা। আসার আগে রান্নাঘরে থাকা মা‘কে শুধু এটুকুই বলল, ‘মা আমি একটু বাইরে যাচ্ছি। চিন্তা কোরো না। ফিরে আসছি একটু পরেই।’
মল্লিকার ইনটুইশন যেন বলছিল কোথায় গেলে সে মনোময়ের দেখা পাবে। তাই এদিক ওদিক না গিয়ে সে এগিয়ে সেই গ্রাম্য জোড়ের দিকে। দূর থেকেই সে দেখতে পেল মনোময়কে। নদীর দিকে মুখ দাঁড়িয়ে আছে। যেন কিছুটা অস্থির। দ্রুত মনোময়ের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো মল্লিকা।
‘এ তোমার ভারী অন্যায় মনো। সেই একটায় বেরিয়েছ। বোধহয় খাবার খেয়েও আসোনি। জানো মাসিমা কত চিন্তা করছেন।’
আচমকা মল্লিকার কথা চমকে দিল মনোময়কে। তারপর কিছুটা ধাতস্থ হয়ে সে যেদিকে তাকিয়ে রইলো সেইদিক অনুসরণ করে মল্লিকা দেখল কয়েকদিন আগের দেখা সেই গিরগিটিটা। সেই একই ভঙ্গিতে, যেন এক প্রাগৈতিহাসিক ঘাতক রক্ত চাটবে বলে, তার শিকারের অপেক্ষায় পাথরের মতো স্থির।
‘মলি দেখছ সেদিনের সেই গিরগিটিটা। আবার একটা শিকার করবে বলে কেমন ঘাত মেরে আছে। আজ কিন্তু তা হতে দিচ্ছি না মলি। তুমি একটু দেখো না প্লিজ আশেপাশে কোথাও কোথাও কোনও গঙ্গাফড়িং আছে কিনা। থাকলে উড়িয়ে দিতে হবে।’
‘কিন্তু এই তো প্রকৃতির নিয়ম, খাদ্যশৃঙ্খলে হাত দেবার কোনো অধিকার আমাদের নেই। গঙ্গাফড়িং-এর যেমন নিজেকে বাঁচানোর অধিকার আছে তেমনই তো ওই গিরগিটিরও অধিকার আছে তার শিকার ধরার।’ কিছুটা বিষণ্ন গলায় বলে মল্লিকা।
না না এ হতে পারে না মলি। প্লিজ এভাবে ভেবো না। ওসব বইয়ের কথা, আসল কথা হল শুধুমাত্র দুর্বলরাই কেন সবলের শিকার হবে। দুর্বলদের কি বাঁচার কোনও অধিকার নেই। এই প্রকৃতি, এই জগৎ কি শুধু সবলদের? এই খাদ্যশৃঙ্খল আমি মানি না।’ অনেকটা আর্তনাদের স্বরে এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলল মনোময়।

মল্লিকার মুখে কোনও কথা সরছিল না আর। মনোময়ের হাতে খুব আলতো হাত রেখে সে তাকাল আকাশের দিকে। উল্টোরথে চেপে সূর্যফুল তখন চলে যাচ্ছিল পশ্চিমঘাট পেরিয়ে পরদিন পুবঘাটে স্তোত্র নিয়ে ফুটে উঠবে বলে।

পূর্ববর্তী সংখ্যা

৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮

১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮

২৫ বৈশাখ ১৪২৮

১৮ বৈশাখ ১৪২৮

১১ বৈশাখ ১৪২৮

১১ বৈশাখ ১৪২৮

৪ বৈশাখ ১৪২৮

২৮ চৈত্র ১৪২৭

১৪ চৈত্র ১৪২৭

৭ চৈত্র ১৪২৭

২৯ ফাল্গুন ১৪২৭

২২ ফাল্গুন ১৪২৭

১৫ ফাল্গুন ১৪২৭

২১ ফেব্রুয়ারি ২০২১

১ ফাল্গুন ১৪২৭

২৪ মাঘ ১৪২৭

১৭ মাঘ ১৪২৭

১০ মাঘ ১৪২৭

৩ মাঘ ১৪২৭

২৫ পৌষ ১৪২৭

১৮ পৌষ ১৪২৭

১১ পৌষ ১৪২৭

৪ পৌষ ১৪২৭

২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

২৯ কার্তিক ১৪২৭

২২ কার্তিক ১৪২৭

১৫ কার্তিক ১৪২৭

৮ কার্তিক ১৪২৭

১ কার্তিক ১৪২৭

২৪ আশ্বিন ১৪২৭

১৭ আশ্বিন ১৪২৭

১০ আশ্বিন ১৪২৭

৩ আশ্বিন ১৪২৭

২৭ ভাদ্র ১৪২৭

২০ ভাদ্র ১৪২৭

১৩ ভাদ্র ১৪২৭

৬ ভাদ্র ১৪২৭

৩০ শ্রাবণ ১৪২৭

২৪ শ্রাবণ ১৪২৭

১৭ শ্রাবণ ১৪২৭

পড়তে পারেন:

দৈনিক কবিতা আশ্রম

এখন বাড়িতে বসেই সংগ্রহ করতে পারবেন আমাদের প্রকাশিত বইগুলি। ভিজিট করুন আমাদের অনলাইন সপ, আর কিনুন আমাদের বই। নিচের BUY NOW বোতামে ক্লিক/ট্যাপ করলে পৌঁছে যাবেন আমাদের সপ পেজে।