সাপ্তাহিক কবিতা আশ্রম, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
সাপ্তাহিক
২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
Painting: Jean-Michel Basquiat
মলয় গোস্বামী
পাগল
আমাকে “পাগল” ব’লে ঈষৎ দক্ষিণ দিকে
কেউ যেন চলে গেল জোরে
মাটির রাস্তা, ক্ষেত, ক্রমবিধুরের নীল আলো
তারমধ্যে প্রিয়তম অন্বেষার ঘোরে
আমাকে “পাগল” বলে কেউ
আমি ভ্রূ কুঁচকে নিয়ে দক্ষিণে তাকাই
দক্ষিণে সবুজ গাছ, গাছেদের বাড়ি
সেইখানে সে – মানুষ পালিয়ে রয়েছে
আমি কি আর খুঁজে নিতে পারি !
আমাকে “পাগল” কেন বলে ? দূরের আকাশে
পাকা আমলকি ফল, সব রঙ ছেড়ে –
দিয়ে ভাসে
তবু খুঁজি কে আমায় — “পাগল” বলেই দ্রুত
পালিয়েছে সবকিছু ফেলে!
হঠাৎ সবুজ বন, ভাঁটু ফুল, তারমধ্যে ঢুকে দেখি
হাতে খাতা— নিয়ে হাসে
আমারই কবিতা-লেখা ছেলে…
রেদওয়ান খান
যুগলডুব, রূপালি জলের গান
নগর-ক্লেদে আকণ্ঠ ডুবে আছি, শুকিয়ে আছি দিবা-রাত্রি– শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষায়। এমনি করেই পার হয়ে যাই কালের পুলসিরাত–করিডোরহীন সংসার-কারাগার। ঘুপছি ঘরের ভেতরে, আরও কিছু সঘন অন্ধকার ছড়িয়ে পড়লে, অনুমান হয়, বাইরে সাত আসমান বিছিয়েছে মেঘ! তোমার রুদ্রকণ্ঠে একবার বর্ষার জন্য বিপুল আকুতি শুনব বলে সাঁতরে এসেছি মৃত বুড়িগঙ্গা। পার হয়েছি যাত্রাবাড়ির পুঁতিগন্ধময় কিলবিল কীটের বাজার। আর নবাবপুরে, থমকে থাকা রিকশার চেইন অথবা কিশোর গ্যাংয়ের ছুরির নীচে ঝলসে ওঠে আমার বর্ষামাত্রিক উদাস ডানা। মনে পড়ে, একদা বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে চোখ শাদা হয়ে এলে আমরা বুঝতাম, জীবনের গূঢ় রহস্যের নামই বর্ষা এবং একটানা তেরদিন বৃষ্টি!বৃষ্টিসোঁদা কাঁথার নিচ থেকে একবার বের হয়ে, পুরানবাড়ির জম্বি’র মা’র শ্যাওলা-পিছল উঠানে, বরইতলায় আছড়ে পড়া! এখানে, এখন সময় সংক্রমিত মহামারির নিঃসঙ্গ বেদনার ভারে নুয়ে পড়ছে আমার পাঁজরে, নিঃশ্বাসে। ঘৃণা, সন্দেহ, ছলনায় মোড়ানো অকরুণ কালের পাথরে মাথা কুটে আর কত আত্মহনন, বলো? আর কত কাল, আর কত কাল, বলো! আরেকবার বৃষ্টিতে ভিজি, চলো! এটাই আমার জীবিতকালের শেষ বর্ষা! টিনের চালে বৃষ্টির ঘুংঘুর আমাকে ডাকছে। আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ডাকাতিয়ার উত্তাল ঢল-মায়া। আমি শূন্যে ভাসছি। নদীর স্রোতে কান পেতে শুনছি আকাশের আশ্চর্য সঙ্গীত। তোমার সোনার কাঁকন বৃষ্টিতে ধুয়ে কী-রকম ধাঁধিয়ে দিচ্ছে সমবেত গ্রাম, নারী ও স্নিগ্ধ বালিকার চোখ! ইচ্ছে করে, শেষ বর্ষায়– তোমাকে নিয়ে যুগলডুবে মাতিয়ে তুলি বাড়ির পুকুর। সেখানে, কচুরি ফুলের তলে ডুব দিয়ে শুনেছিলাম আসমান-ঝ’রা লৌকিক গান! ওগো জলকন্যে, এবার ভিজে ওঠো। ইহলোকে আর কখনও নামবে না এমন রূপালি জলের গান!
অনিকেশ দাশগুপ্ত
প্রস্থান
ঘর থেকে ঘরের প্রস্থান লিখে রাখি
কুয়াশার জামিনে ফুটে ওঠা প্রথম আচমন
আর খুলে যাওয়া বাদামী সারির চিঠি ঠোঁটে করে –
আঁশের স্বপ্ন বুনে ভাসিয়ে দিয়েছিলাম
নক্ষত্রের চরে,
কনুই থেকে স্বেদবিন্দুগুলি
সূর্যের মণির ভেতর অব্দি চলকে
আমায় ঘুম পাড়িয়ে যেত;
ক্ষমার মতো ঝরে এ জন্মের বালিকা-প্রহরে
প্রজাপতির নিটোল খাঁজে পরিপূর্ণতার বেদী
যেন কোন্ বুনোফুলের সাদা আহত ঘ্রাণ
ছড়িয়ে যায় চরাচরময়
অবগাহন
সে খুব বাগান হয়ে আমাকে শিশু ভোলাত
ফার্ণের এলোমেলো রোঁয়া থেকে ভল্ল হয়ে উঠত
ডাকাত পড়লে
এভাবে রূপ ছিল তার উদভ্রান্ত,
বিষণ্ণ নাকছাবিটির দেশে
সবুজ চিকন সমাবেশে
হাত বুলিয়ে ঘুম নেমে আসত –
দুয়ারের চার পা হঠাৎ ফুলের দল হয়ে,
স্বপ্ন হ’ত,
বৃষ্টির শব্দে মনে হ’ত
বৃষ্টিই বুঝি পাখিদের ডাক হয়
গাছের যৌনতা হয়,
কে জানে রাক্ষসী-নখ পেত কি না স্বপ্নে;
ভাতের হাঁড়ির মতন উপুড় করা রাতে
কুলোর বাতাস ঝরে পড়লে
কাদা হয়ে খুঁজে যেতাম
বিশ্বস্ত সেই ডোবা যেখানে কিম্ভুত মাছেরা হয়,
রুপালি আলোর পেট হয়
সুমন বন্দ্যোপাধ্যায়
উপসংহার
আত্মসমর্পণের পাশে সাজিয়ে রেখো এ লেখা
ভ্রাম্যমাণ অনেক শ্মশান ও আগুন পেরিয়ে
দিগন্তের নিচে একা পড়ে থাকে জল
মরণোত্তর অসুখ-বিসুখের দিকে
হাওয়াতে উড়ে যায় নির্মোহ
ছেঁড়া ওষুধের পাতা
রক্তপাতের ভেতর নাম ধরে ডেকে দেখ
সমস্ত সন্দেহ পেরিয়ে কী তীব্র বেঁচে আছি
কবিতার শেষ দুটো লাইন লিখে যাব বলে।
সলিলসমাধি
পুরানো কুয়োর কাছে এসে
শর্তহীন খুলে ফেলেছ হাতের তাবিজ
এ দৃশ্যের কাছে ঝুঁকে পড়ে একটি সজনেগাছ
ছায়াহীন পাতা ভাসে জলে
নিজেকে দেখার শব্দ যতটা একা
নির্জনে তুমি তার শ্রোতা হবে বলে
খালি পায়ে হেঁটে গেছ সন্ধার কাছে
এ রূপকথায় আর কোন গল্প নেই
অনন্ত প্রসাধন শুধু ডুবে গেছে জলে।
Painting: Jean-Michel Basquiat
কবর বাড়ি
নির্মল হালদার
এখানে এসে দেখা যে হবেই ভাবতে পারেনি কিরাত। একটা কবরে বসে তার বন্ধু হরি বিড়ি টানছে।
—কিরে তুই এখানে?
—আমি তো এখানে রোজ আসি
—আমিও তো আসি। দেখতে পাই না তো।
—কি করে দেখবি, আমি তো মাঝেমধ্যে কবরের ভিতরে চলে যাই, যে শুয়ে আছে ভিতরে তার সঙ্গে দু-একটা কথা বলে আসি। বিড়িও দিয়ে আসি।
—কি আবোল তাবোল বকছিস?
—তোর কাছে আবোল-তাবোল মনে হতে পারে, ইয়ার্কি মনে হতে পারে, আমার কাছে নয়। যা সত্যি তাই বললাম।
—কবরের ভিতরে যাওয়া যায়?
—যায় রে যায়। যাব বললেই যাওয়া যায়। এজন্যে মায়া টান থাকতে হয়। এজন্যে কবরের দরজা জানতে হয়।
—তুই কি দরজা জানিস? আমাকে দেখাবি?
—না। সবাইকে দেখানো যাবে না।
যার কোনও টান ভালবাসা নেই, সে কি করে যেতে পারে! টান ভালবাসা থাকলে, দরজা আপনা আপনি খুলে যায়।
কিরাত বিচলিত বোধ করে। সে চিন্তা করে, এ কি সম্ভব নাকি হরি কল্পনাতে যায় কবরের ভিতরে? সে আর কোনও কথাই বলতে পারে না। সেও হরির কাছে একটা বিড়ি চেয়ে ধরিয়ে ফেলে। ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে হরির কাছে জানতে চায়—হ্যাঁরে কবরের ভিতরে যে শুয়ে আছে সে তো মৃত ব্যক্তি। তোর সঙ্গে বিড়ি খায়?
—খায় খায় বিড়ি দিয়েও আসতে হয়। ভেতরে তেষ্টা বেশি।
—জল তেষ্টা পায় না ওদের?
হরি বলে তাকে কোনওদিনই জলের কথা বলেনি। কোনওদিন খাবার খুঁজল না তার কাছে। কেবল
চারপাশের খবর শুনতে চায়। নতুন করে ভালবাসার কথা বলতে চায়। বলে, খুব ভালবাসতে ইচ্ছে করছে রে—না কোনও মেয়েকে নয়, শিশুকে।
হরি নাকি হাসতে হাসতে বলেছিল একদিন, আমি তোমাকে কবরের মাটি থেকে পুতুল বানিয়ে দেব। তুমি যত পারবে ভালবেসো।
মৃত ব্যক্তি হরির সঙ্গে উপরে উঠে আসতে চায়। দেখতে চায়, চারপাশ কেমন বদলে গেছে। এবং তাদের বাড়িটার কাছে গিয়ে উঁকি দিয়ে আসবে একবার। হরি মানা করে।
সন্ধের অন্ধকার পার হয়ে রাত্রির অন্ধকার আসছে। কবর বাড়ির অশথ গাছে ডেকে ওঠে রাতচরা
পাখি। কিরাত আকাশের দিকে মুখ তুলে হরিকে বলে, মেঘ আসছে রে——।
—আসুক না কি আর হবে
আমি কবরের ভিতরে চলে যাব।
একটুও ভিজব না। বৃষ্টিকে থোড়াই কেয়ার করি।
—তো ভাই কবরের দরজাটা
আমাকে দেখিয়ে দে না! আমি একটু ঘুরে আসব।
—না তা আমি পারব না।
—তুই যদি নিজে কোনওদিন দরজা খুঁজে পাস, সেদিন নিজেই যেতে পারবি। একা একাই যেতে পারবি। আমাকে তো কেউ দরজা দেখিয়ে দেয়নি। আমি তো নিজেই খুঁজে পেয়েছি। তুইও হয়তো পাবি। এজন্যে একটা মন লাগে। সেই মন এখন তোর নেই।
—কিন্তু কবে খুঁজে পাব দরজা?
—তা আমি কি করে বলব।
—আচ্ছা আচ্ছা… আচ্ছা। আজ আমার সামনেই কবরের ভিতরে যেতে পারবি? আমার সামনে আবার আসতে পারবি?
—না আমি কারোর সামনে থেকে যাই না। সব সময় একা গেছি। একা এসেছি।
এবার সন্দেহ হয় কিরাতের। হরি বোধহয় বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলছে। সে বসেছিল কবরের উপরে। উঠে পড়ল। ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল, অন্ধকারেই দুচোখ দিয়ে দেখতে লাগল, যদি কবরের দরজাটা দেখতে পায়। যে কবরের উপরে হরি বসে আছে, তার পিছন দিকে একটা গর্ত। কিরাতের মনে হল, এই বুঝি দরজার মুখ। সে গর্তের মধ্যে পা ঠুকে ঠুকে হরি কে জিজ্ঞেস করে, হ্যাঁরে এই কি দরজা শুরু?
হরি হেসে ওঠে জোর।
মেঘ ডাকতে শুরু করে। দু-এক ফোঁটা বৃষ্টি। বিদ্যুতের ঝলক। বিদ্যুতের আলোয় দেখা যায় অশথ তলায় দাঁড়িয়ে আছে এক যুবক। তার মাথায় ঝাঁকড়া চুল। পরনে জিন্স। খালি গা। সে একা একা হাসছে। নিঃশব্দ।
Painting: Jean-Michel Basquiat
গত নভেম্বর থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত সন্মাত্রানন্দের অসামান্য উপন্যাস 'মেঘবতী'-র বারোটি অধ্যায় পড়ুন
পূর্ববর্তী সংখ্যা
পড়তে পারেন:
এখন বাড়িতে বসেই সংগ্রহ করতে পারবেন আমাদের প্রকাশিত বইগুলি। ভিজিট করুন আমাদের অনলাইন সপ, আর কিনুন আমাদের বই। নিচের BUY NOW বোতামে ক্লিক/ট্যাপ করলে পৌঁছে যাবেন আমাদের সপ পেজে।