সাপ্তাহিক কবিতা আশ্রম, ১৯ আষাঢ় ১৪২৮
সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়
আলোয়ান
শীত নেই, তবু গায়ে একখানা
আলোয়ান চাপিয়ে সে আসে
এক পাশে চুপ করে বসে থাকে,
অন্যদের আলোচনা শোনে,
তর্কাতর্কি শেষ হলে বিনা বাক্য ব্যয়ে
উঠে চলে যায়
কেউ কেউ অপাঙ্গে তাকায়,
ভাবে ব্যাটা কোথাকার গেঁয়ো
কোনও কিছু মুখে তোলে না,
সুস্বাদু এত লেহ্য পেয়
টেবিলে সাজানো থাকে,
চেখেও তো দেখে অন্তত
মানুষে! কিংবা সে না-মানুষ,
মানুষের মতো দেখতে
কিন্তু তার মাথার ভেতরে
সুখের আকাঙ্ক্ষা নেই, ওঠাপড়া নেই
পাঁজরের দাঁড়ে, রক্তস্রোত থেমে গেছে,
যেন এক নিস্তরঙ্গ হ্রদ
শুধু নীল আকাশ আনত…
হয়তো সে ভয় পায়, ভাবে
আলোয়ান সরে গেলে সমূহ বিপদ,
যদি কেউ দেখে ফেলে ক্ষত
আড়ালে রাখাই ভাল, আলোয়ান,
উষ্ণ আলোয়ান
কবিতার মতো দেহ যত্নে ঢেকে রাখে।
অর্ঘ্য দে
স্বদেশী গানের পাতা
সাপের গায়ের মতো পথ ―
সাবধানে হাঁটি, মন্দিত নিশ্বাসে বিনয়ী মন্দিরা
খেউর শেষে বাঁশবাগানের কাদাজমিতে
অভাগীর জমা কান্নায়
ছায়া পড়েছে সমব্যথী সবুজের
স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি মাটির সেতার,
শুনতে… শুনতে….
তল খুঁজি, পাই না!
পাতার ভিতর ডেকে ওঠে বউ কথা কও
হয়তো মিলনের শেষ সম্ভাষণ,
আলো শিকার করে মিলিয়ে গেল
কদর্য তক্ষক নলঘাসের বুকে
পথের বাঁকে মুক্ত হাওয়ার তাড়নায়
গানের পাতা ওড়ে
আশ্রম
পুব থেকে পশ্চিমে আবহমান কল্লোলে
কিছু পাখি খসে পড়ে,
কিছু ফিরে এসে আলো জ্বালে বিষাদঅরণ্যে,
দূরে কোথাও শাঁখ বাজে….
যুযুধান একটা দিন শেষ হয়।
কুহকিত ঋতুর আবর্তনে
হারিয়ে গেছে ধ্রুবক
ধূম্র মেঘের দেয়াল; দরজা….
সেতারের জমজমা শুনতে শুনতে
অভিমান ভাঙে, শিউলি ফোটে সংসারে।
প্রদীপ প্রোজ্জ্বল
উপদ্রুতা
নিবিষ্ট চারিত্র্য একাধার দ্রোহ স্বল্পায়ু সংগ্রাম
মুদ্রিত সাম্যবাদ অসাম্য আর্দ্রস্বরে
উত্তাল টেউয়ের মত সুঠাম হয় নিঃসঙ্গ ইশ্বরে।
নমনীয় বিক্ষোভ নতমুখী নয়-
বিনম্র বৃত্তচ্যুত নক্ষত্রে
মধ্যরাত বিজয় উপদ্রুত গুঁজে বিক্ষুব্ধ ঢাল
অনুসুচনার অবরুদ্ধ নিয়ে।
শীতার্ত বুক সঞ্চিত বারুদে ঘুমোয়
বেদনার লাভা
প্রস্থান প্রত্যাখ্যান নয়
শতাব্দী হেটে যাবে মুগ্ধদীক্ষার শরীরে-
অস্বিকার শ্বাপদ প্রসন্ন স্নিগ্ধতা
ধুঁপের ব্যথিত ভূবন
নিভৃতে অর্পূণ পুরুষ ক্রোধে
করে সমর্পন রক্তের গহন;
গ্লানিমাখা কলুষিত নিদ্রাগুলো
জোৎস্নাহীন দুর্ভিক্ষ আজ
প্রতিচ্ছায়ে বসে বারবার
অভিমানের অভিধান- সংশয় পাথরের চূর্ণ বারুদ
শানিত অবক্ষয়ে না ফেরা যাত্রায়
তর্ককরে
বর্ণহীন শব্দ নিয়ে
পৃথিবীর উপদ্রুত তন্দ্রায় অনুক্ষণে!
সুদীপ্ত বিশ্বাস
স্বপ্ন কথা
সেই মেয়ে মাঝে মাঝে পাশে এসে বসে
মেলে দ্যায় তার চুল, হাসে মৃদু মৃদু
যখন ঘুমিয়ে আমি আধো আধো ঘুমে
স্পর্শ পেয়ে ধড়ফড় জেগে উঠি সুখে
রাতের আকাশে চাঁদ একা ভেসে যায়
সবাই গভীর ঘুমে, নিশুতি নিঝুম
শেষ রাতে চুপচাপ একা জেগে থাকি
তার স্পর্শ, তার গন্ধ জড়ানো শয্যাতে…
কালচিত্র
জীবনটা তো গেল প্রতীক্ষায়
অঢেল সময় নেই কারও, ঘণ্টা বাজে
কারা যেন ডাকে, আয় আয়…
পথের পাশে দাঁড়িয়ে আছি গাছ
সহস্র স্রোতের টানে আমায় ভাসিয়ে নিয়ে
তুমি কি নদী হবে না আজ?
নদী হও, হও নদী, বয়ে যাও
অজস্র ধারায়। দুকূল ভাসিয়ে নদী
আমাকে পাগল করে দাও।
ভেসে যাওয়া? সেটাও সার্থক।
শ্মশান যাত্রীরা চলে গেলে, পাখি ডাকে-
গৃহস্থের খোকা হোক।
রূপক চট্টোপাধ্যায়
যুবকটি
এমন করে সে প্রতিদিনের পথিক।
আমার সাথে দেখা হয় রোজ,
রঙমোড়া আলোয় তার যুবক সেগুন বয়সী
হাঁটা মনে থাকে।
সকাল বেলা,
বুনো শহরের সমস্ত অলিগলি দিয়ে
সে হারিয়ে যায়। দূর দূরবীনে!
পিছনে পড়ে থাকে
ঘিলু পোড়ানো রোদ, চন্দন মাখা বাক্যালাপ,
স্পীডে চলে যাওয়া শব বাহি পুষ্পক।
আবার সন্ধ্যা বেলা যখন
মোড়ের মাথায় টান টান সুভাষের উত্থিত
হাতে, বিকেলের কাক এসে বসে,
মাধবী লতা
যে আবেগ দোলে, চায়ের জল চাপায়
বিহারী গকুল।
শব্দবিন্যাসে ভুল করে পাড়ার পাগল,
লোকাল ট্রেন বোঝাই করে মানুষ আনে,বলে
বাঁকুড়া প্লাটফর্ম ফিরে পায় যুবতী শরীর!
তখন সেও ফিরে আসে! হয়তো আসে!
ও যুবকের ভগ্নাংশ শরীর থেকে আলাদা
হয়ে ছিটকে যায়, গাঢ় ক্লান্তির সুবর্ণরেখা!
পার্বতী রায়
নিবিড়
যাওয়া মানেই তো যাওয়া নয়
কিছু কুড়িয়ে রাখা
নির্ভুল সূত্রের ভেতর ভাসছে বাড়ি-ঘর
আজ সকাল থেকে
অনেক জলের ছবি দেখলাম
তুমি জানো, ঠোঁট কাছে এলেই
কান্না আরও নিবিড় হয়!
নির্দিষ্ট দিকে বাড়ি ফেরা নেই!
অজানা সেতু, জল বাড়ছে থৈ থৈ
নিভিয়ে রাখো আলো
মন্ত্রের ভেতর রোদ ঢুকে পড়েছে
ভীষণ অচেনা হয়ে যাচ্ছে নদীটি
রাজীব চৌধুরী
বোবা মানুষের বর্ণমালা
দিনের শেষে এমন শুকনো একটি মুখ
তুমি কি মৃত্যু, নাকি মৃত্যুর মতো অসুখ
বেঁচে আছো, অভুক্ত তৃষ্ণার্থ না-থাকার মতো
মরতে মরতেও থেকে যাচ্ছ চিরাচরিত
যেমন কথ্য ভাষা গুম মেরে থাকে
বুকের ভিতর স্পন্দনে জারিত হয়
পরাজিত মানুষের মুখে ফেনা তুলে বাঁচে
চিতা কাঠের দহন মশালের মতো
জ্বলে ওঠে একসময়
কবরে সম্পর্কের লতা
অশ্রুর মতো স্মৃতিকাতর
দাঁড় টানে,
শিরায় হারানো দেশের নদী আবহমান
কাল ধরে সভ্যতার ঘর্মাক্ত কণ্টকাকীর্ণ পথে
মাটির পরতে পরতে রক্ত শুষে নেয়
সূর্যকে সাক্ষী করে পথিক এবং
পথের যুগান্তরের
ইতিহাসে দিকনির্দেশ করে চলে
গাছ ও পাথর
ম্লান মুখে ফুল ফোটে
পোড়া চন্দন কাঠের ছেকা লেগে
ফুলকিতে জেগে ওঠে বোবা মানুষের বর্ণমালা
পল্লব গোস্বামী
গোসাপ খাওয়া জেলে
সেই গোসাপ খাওয়া জেলেটিকে ভাললাগে:
সারা গায়ে যার আঁশটে গন্ধ
ভোর হতেই কাঁধে তুলে নেয়—
ঘুগি
সিয়াড়া
ফাঁসজাল
সারাদিন গরু খোঁজা করে খুঁজে বেড়ায়—
মৃতপ্রায় সব ঝিল
পুকুর
ডোবা
খুঁজে খুঁজে ক্লান্ত হলে,
ভাঁট ফুলের ছায়ায় চুটি ধরায়
আর ভাবে
একশো আট নদী
সেই গোসাপ খাওয়া জেলেটিকে ভাললাগে:
যে কখনও আকাশ ভাবেনি
মাটি ভাবেনি
গাছও ভাবেনি
শুধু ভেবে এসেছে,
কখন কোন মাছের পেট কেটে
পাওয়া যাবে
শকুন্তলার
মোহর আংটি!
পূর্ববর্তী সংখ্যা
পড়তে পারেন:
এখন বাড়িতে বসেই সংগ্রহ করতে পারবেন আমাদের প্রকাশিত বইগুলি। ভিজিট করুন আমাদের অনলাইন সপ, আর কিনুন আমাদের বই। নিচের BUY NOW বোতামে ক্লিক/ট্যাপ করলে পৌঁছে যাবেন আমাদের সপ পেজে।