ছবি : ভ্যান গঘ

নির্মল হালদার

কবিতা

পুকুরে ঢিল পড়তেই,
সরে গেল জল
পানা ফুলে লাগল কাঁপন
পানকৌড়ি আমাকে দেখল
 
আমি কোথায় যাব?
 
পদ্মবনে মৌমাছি
পদ্মপাতা টলমল
সূর্যের সাত রং
পাখিদের ওড়াউড়ি
 
আমি কোথায় যাব?
 
কেউ ডাকছে না
রাস্তায় চলাচল
অর্জুন গাছে একটা তক্ষক
শুকনোপাতার ঝর ঝর
 
আমি কোথায় যাব?
 
এই তো আমার চরাচর।
 
২
সজনে শাক আজ একটু ভাজবে
পুঁটি মাছের টক করতেও ভুলবে না
কে আছো গো শুনছো?
 
শালপাতা নিয়ে আসব
ধোঁয়া ওঠা ভাতে বিউলির ভাল
ক’টা কাগজি লেবু পেড়ে দিও
 
আমাকে দেবার পরও যেন কিছু থাকে
হঠাৎ কুটুম এলে বেড়ে দিও ভাত
সংসারের পুণ্যি হবে
 
 
মনে রেখো কাক ও কুকুরকেও
গাছতলেও রাখবে এক পাত
পোকামাকড়ের আহার জুটবে
 
বাতাস আসবে একটু একটু করে।
 

অর্পিতা আচার্য

ভুল

১
পূর্ব জন্মের এক গান্ধর্ব বিবাহকথা মনে পড়ে


যে রক্ত ফুল ফুটেছিল আকাশের সাদা চাদরে
আর আহ্, সেই জোকারের ধ্বনি নীল পাখিদের
দেশ ও বিদেশে ডানা, এক লাজুক কবুল, 
সোনাটায় সেহনাই বেজেছিল অপার নৈঃশব্দে
সেই ভুল বিবাহের রাতে


সেই ভুল রাতের বিবাহে…


২


এত দ্রুত সরে গেল ছায়া তার
ছিল কি কখনও?
অঘোর সে রাতে তবে
ছিল বুঝি হ্যালুসিনেশন…


নদীর পারের এক বটের ঝুরির
প্রচ্ছন্ন শরীর তার, যাওয়া আসা
কতবার চলন বিলের পাশে সেই সব, হাই হ্যালো
বৃষ্টি মোছা ওয়াইপার
সারা সন্ধ্যা ভ্রমণের পর,
সাবধানে যেও, পৌঁছেছ বাড়িতে?


রাত, বৃষ্টিময়
রাতের প্রপাত, আর
বিস্মরণ ঘুম…


সে তবে আসলে ছিল হ্যালুসিনেশন!

প্রীতম সেনগুপ্ত

তেরো

সামনে একটা সাবান হাঁটছে, পিছনে পিছল রাস্তা 
চুলগুলো সব এলোমেলো হয়ে কাগজ উড়ল দিস্তা। 
পেন দিয়ে শুধু পিঠ চুলকোনো, ঘায়ের জন্য মলম–
ন্যাংটো মাছটা শুয়ে আছে পাশে, ভুট্টা সেঁকেছে গরম। 
আইসক্রিমটা ছিটকে পড়ল, কাদায় ভর্তি মুখ
পিছল কাদাটা চাটাতেই যেন লুকিয়েছে সব সুখ। 
দিন শেষে প্রতিদিনই নামে দুড়দাড় করে রাত
কোমল স্তনেতে চর্বচোষ্য পেরনো সাগর সাত। 
দিনগুলো সব আলোতে ভিজল, কিছুই হয় না তাতে
মন দিয়ে সব ইটগুলো গাঁথি, গড়িয়ে না পড়ে যাতে। 
মঞ্জুলা মাসি প্রতিদিন ডাকে যেতে যেতে ইস্কুলে 
দিদিমণি হোক, আমার সঙ্গে ভিজতে যায়নি ভুলে। 
তেরো বছরের হিংস্র কিশোর উঁকি মারে জানালায় 
হাত বাড়িয়ে সে আঙুল চালায় অতি আগ্নেয় লাভায়! 
 

কৌশিক চক্রবর্তী

প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান ছিল বনলতার চুলে

প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান ছিল বনলতার চুলে
আঁচড়ে দেবার আগে যারা জীবনানন্দের আঙুল খুঁজতো
তারা এখন খুনের দায়ে বন্দী আছে জেলে-
সন্তান হারানোর ব্যথা জানে যে মা
তার কোলে ঢলে পড়বার আগে মনে পড়ে বনলতার মুখ-
 
আমি ছেলেবেলা থেকে ফ্ল্যাটবাড়ির বাসিন্দা…
আইবলের মধ্যেখানে চোখ রাখলে
আমি প্রতিদিন দেখতে পেয়েছি বাড়ন্ত বটগাছ
 
ছায়াদের একত্র করে ডাস্টবিনে ফেলে এলে
ট্রামলাইনের অন্ধকারে হোঁচট খাই নি কখনো…
তবুও শুনেছি কলকাতার মাটি খুঁড়ে পাওয়া গেছিল বনলতার শোক
জীবনানন্দ হাসপাতালের বেডে মরণপণ লড়াই করছিলেন তখন-
 
প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান ছিল বনলতার চুলে
তাই আঁচড়ে দেবার আগে আমিও রাস্তায় খুঁজে দেখেছি জীবনানন্দের আঙুল
 

ছবি : ভ্যান গঘ

চন্দ্রাণী গোস্বামী

দায়

দিন-রাত, দিনের সঙ্গে ভীষণ বিবাদ করে
তার হরিণ-কাজল চোখ থেকে ইমেজারি 
নিয়ে বিকেল এঁকেছি। অজস্র বুঁদ বুঁদ আঁশু
জুড়ে সাজিয়েছি রশিদ খান
                    আওগে জব তুম সজনা…
 
বিকেল তখন শাড়ির আঁচল থেকে 
একটু একটু করে খুলছিল চাঁদকে, আড়াল
সরছিল — আঙ্গনা জুড়ে পায়েলের শব্দে
অভিসারের ডাক, আহা
                             মধুবন মে রাধিকা…
 
আমি হাত রেখেছিলাম চাঁদের উৎক্ষিপ্ত নেশায়…
 
এই সব দেখেও আজ 
নাগাড়ে যদি বারিষ না আসে
 
সে প্রগলভতা আমারই কেবল, বেআক্কেলে মৌসমের নয়?
 
 
 
 
 

অবশেষ দাস

ভালবাসার পদ্য

ওই মেয়েটা অন্যরকম শরত চোখে – মুখে
ইচ্ছেগুলো ঝকঝকে দিন, রোদের দিকে ঝুঁকে।
 
ওই মেয়েটার নাম জানি না, সব পাড়াতেই থাকে
বুকের ভেতর ময়ূরাক্ষী, রূপকথাকে রাখে।
 
কনক চাঁপার একটি কুঁড়ি মাটির কাছাকাছি
ওই মেয়েটার চোখের ভাষা হিজল ছায়ায় আছি।
 
ধানের শীষে বিকেল আসে, সন্ধ্যা পাশে পাশে
ওই মেয়েটা আঁচল পেতে বৃষ্টি হয়ে আসে।
 
নীল আকাশে চিলের ডানা, রাত্রি আসে গ্রামে
ওই মেয়েটার ভালবাসা গাঙ শালিকের নামে।
 
রাত বেড়ে যায় রাতের গায়ে শিশির নামে ধীরে
ওই মেয়েটার ঠিক চেনা যায়, হাজার তারার ভিড়ে।
 
সকাল এসে দরজা খোলে পাখির ডাকাডাকি
ওই মেয়েটা হাওয়ার নূপুর কোথায় তাকে রাখি।
 
আতপচালের আলপনাতে ওই মেয়েটার দেখি
সারাজীবন খুঁটে খুঁটে কবির লেখালেখি।  
 
ওই মেয়েটা অন্যরকম, তোমার আমার দেশে
কালিদাসের কাব্যকথায় আষাঢ় হয়ে মেশে।
 
ওই মেয়েটা নদীর জলে দুই পা রাখে ভয়ে
রোদ মাখানো স্বপ্নগুলো পা ফেলে সংশয়ে।
 
ওই মেয়েটা অন্যরকম কোথায় রে তার বাড়ি
ওই মেয়েটা স্বপ্নে বোনা জ্যোৎস্না রঙের শাড়ি।
 
শাড়ির গায়ে নকশা কাটা আকাশ ভরা তারা
একটা জীবন একটা নদী, ভালবাসার পাড়া।
 

অভিষেক সৎপথী

হলুদ রোদ রং ডাকি তোর নাম মরণ

মৃত্যু  ধীরে ধীরে ওজন হারিয়ে ফেলেছে
এবং জখম পাখিরা ফিরে পাচ্ছে তাদের আগুন।
 
চাকায় পিষ্ট হয়ে পিচে পড়ে আছে এক শাঁখ চিতি
 
রোদ রং যেখানে গভীর  ডাকি তার নাম দুপুর
সেখানেই কলা বউ স্নান,শালুক ডাঁটায় উন্মাদ ফড়িং
 
বিকেল নিদ্রামগ্ন হলে রোদের ছায়া শেষ হয়ে আসে
অথচ হলদে হয়ে যাওয়া বালতিটি 
জলের দ্রব্যগুণ এখনও বুঝে উঠতে পারেনি। 
 

“ঘরের কাছে আরশিনগর”

পর্ব-৩

কবি কুমুদকিঙ্কর

রামানুজ মুখোপাধ্যায়

নাম কাজি নুরুল ইসলাম। বাস বীরভূমের নানুরে। সে-গ্রাম চণ্ডীদাসের পদাবলির মাধুর্যস্নাত। তাঁদের আদি নিবাস ছিল অবিভক্ত বর্ধমান জেলার খাসপুরে। বাবা রশীদ ডাক্তার ছিলেন বহু মানুষের পরিচিত মুখ। যুবক নুরুল ইসলাম কবিতা লিখতেন। পল্লিকবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক ছিলেন তাঁর কবিজীবনের আদর্শ। কুমুদরঞ্জনের ছোঁয়ায় তিনি পরিবর্তন করে নিলেন নিজের নাম। নুরুল হয়ে উঠলেন কুমুদকিঙ্কর। সেই নামটিই শেষপর্যন্ত হয়ে উঠেছিল তাঁর পরিচয়।
 
মুসলমান যুবক নুরুল দীক্ষা নিয়েছিলেন সহজিয়া বৈষ্ণব ধর্মে। মুর্শিদাবাদের রাধার ঘাট আশ্রমের নিতাই ক্ষেপার কাছে। বীরভূমের সরিষা রাধাকুঞ্জ নিত্য আশ্রমের গোপাল দাস গোস্বামী ছিলেন তাঁর ভারতী গুরু। দীক্ষার পর তাঁর নাম হল রাধাময় দাস গোস্বামী। কাব্যগুরু কুমুদরঞ্জনের প্রেরণায় কুমুদকিঙ্কর আকর্ষিত হয়েছিলেন মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যের জীবনাদর্শে। চৈতন্য-অনুরাগী যবন হরিদাসকে তিনি জীবনের ধ্রুবতারা মনে করেছিলেন। কুমুদকিঙ্কর বীরভূমের কেঁদুলিতে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন হরিদাস আশ্রম। ১৯৬৭-৬৮ নাগাদ। আশ্রমে চৈতন্যপার্ষদ হরিদাসের মূর্তিপূজারও ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি। আশ্রমে সে-ধারা বহমান থেকেছে। ‘আন্তর্জাতিক চৈতন্যদর্শন প্রচার সমিতি’ গঠন করে তিনি সচেষ্ট হয়েছিলেন চৈতন্য জীবনকথাকে মানুষের পৌঁছে দিতে। যাঁরা দীর্ঘদিন কুমুদকিঙ্করের সান্নিধ্য পেয়েছিলেন, তাঁরা প্রায় সকলেই তাঁর উদার অসাম্প্রদায়িক মনের কথা স্মরণ করেছেন। কেঁদুলির সুগায়ক শান্তিকুমার রজক জানিয়েছিলেন: ‘নিজে বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত হলেও হিন্দু মুসলমান — দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে ছিল তাঁর অবাধ বিচরণ।’ পথচলতি চেনা মানুষের সঙ্গে দেখা হলে তিনি কপালে দু-হাত ঠেকিয়ে বলতেন ‘জয় ঠাকুর’। চারপাশের পাঁচটি গাঁয়ের দীনদুঃখি মানুষও তাঁকে জানতেন ‘জয় ঠাকুর’ নামেই।
 
কুমুদকিঙ্করের জীবনে পরিবর্তনের কেন্দ্রে আছেন আশ্রমমাতা আশালতা দেবী। আশালতা মুখোপাধ‍্যায় ছিলেন বীরভূমের কুণ্ডলা গ্রামের তারকনাথ মুখোপাধ্যায়ের কন‍্যা। বিয়ে হয়েছিল সিউড়ির ধ্বজাধারী চট্টরাজের সঙ্গে। আঠারো বছরেই বৈধব্য। এবং পিতৃবিয়োগ। কর্মসূত্রে তিনি ছিলেন দুবরাজপুরের কাছে পাঁচড়া স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সেবিকা। কুমুদকিঙ্করের সঙ্গে তাঁর যৌথজীবনের প্রথম পর্ব কেটেছিল সেখানকার কোয়ার্টারে। আশালতা দেবীর প্রথম কর্মক্ষেত্র ছিল খুচুটিপাড়া প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। সেখানে তাঁর আলাপ হয়েছিল নুরুলের সঙ্গে। এবং ভালোলাগার শুরু। ‘বাউল ফকির কথা’ গ্রন্থে সুধীর চক্রবর্তী লিখেছিলেন কুমুদকিঙ্করের জীবনালেখ্য।
 
 নুরুল ইসলামের জন্ম ১৯৩০-এর ২০ মে। আর ১৯৮৯-এর ২৫ আগস্ট কুমুদকিঙ্করের জীবনাবসান। মনে করি, দীক্ষার দিনটিই ছিল কুমুদকিঙ্করের প্রকৃত জন্মদিন। এক-অর্থে ওই দিনটি নুরুল ইসলামের মৃত্যুদিনও বটে। কিন্তু কবে-যে তিনি দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন তা এখনও জানতে পারিনি। আশালতা দেবীর তিরোধান ১৯৯৫-এ। তাঁদের একমাত্র পালিতপুত্র সত্যকাম। কুমুদকিঙ্কর-আশালতার যৌথজীবন শেষপর্যন্ত সুখের ছিল না। কেঁদুলিতে তাঁদের ঐতিহ্যবাহী স্থায়ী আখড়াটি এখনও সচল আছে ‘ঠাকুর হরিদাস আশ্রম ট্রাস্টি’-র তত্ত্বাবধানে। বীরভূমের জয়দেব-কেঁদুলি বিগত পঞ্চাশ বছরে যে-সাংস্কৃতিক ধারাস্রোতকে বহন করে চলেছে কুমুদকিঙ্করই তার ভগীরথ। ১৯৬৮-র ১৮ ডিসেম্বর কুমুদকিঙ্করের উৎসাহে গড়ে উঠেছিল ‘কবি জয়দেব স্মৃতি মন্দির ও অতিথিশালা নির্মাণ কমিটি’। কমিটির সভাপতি ছিলেন সিউড়ির তৎকালীন মহকুমাশাসক কিরণময় ভট্টাচার্য, সহ-সভাপতি ছিলেন ইলামবাজারের সমষ্টি উন্নয়ন আধিকারিক মহম্মদ মোস্তাফা। সম্পাদক কুমুদকিঙ্কর। কমিটির কার্যালয় হরিদাস আশ্রম। জয়দেবের মোহান্ত অস্থ্যলের অনিচ্ছায় এই কমিটির প্রস্তাবগুলি বিশেষ কার্যকর হয়নি। কিন্তু মোহান্ত হরিকান্ত শরণদেব ব্রজবাসীর দানের জমিতেই গড়ে উঠেছিল সরকারি বাউলমঞ্চ, এবং তার সংলগ্ন টিনের শেডটিও। ১৯৬৯-এ (১৩৭৬ বঙ্গাব্দের ১ আষাঢ়) ‘গীতগোবিন্দ দিবস’ পালনের প্রথম উদ্যোগটিও ছিল কুমুদকিঙ্করের। তাঁরই প্রচেষ্টায় অজয়ের কোলে নির্মিত হয়েছিল ‘পদ্মাবতী ঘাট’। জয়দেব-কেঁদুলি অঞ্চলের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ গবেষক অজিতকুমার দাস জানিয়েছিলেন, ‘১৩৬৯ বঙ্গাব্দের [১৯৬৩-এর ১৪ জানুয়ারি] জয়দেব-মেলায় সম্ভবত প্রথম সাহিত্য-সভার উদ্যোক্তা ছিলেন কবি কুমুদকিঙ্কর’। সিউড়ির বীরভূম সাহিত্য পরিষদ, দুবরাজপুরের নজরুল সাহিত্য সংসদ ও জয়দেবের সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষজনের উদ্যোগে মেলার দ্বিতীয় দিনে হরিদাস আশ্রমের এই সাহিত্য সভাটি এখনও ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চলেছে।
 
কুমুদকিঙ্করের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি দুবরাজপুর থেকে সাপ্তাহিক ‘চণ্ডীদাস’ সংবাদপত্রের প্রকাশ। নানুরের সঙ্গে-যে জন্মের টান, তাই কুমুদকিঙ্করের পত্রিকার নাম ‘চণ্ডীদাস’। আদিত্য মুখোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন: ‘দুবরাজপুরে একটি ডিলারের দোকানের বারান্দায় চৌকি পেতে বসতেন কুমুদদা। দেয়ালে প্লাস্টার নেই, মেঝেতেও বেরিয়ে থাকত খানা খন্দর। সেই হলো গিয়ে ‘চণ্ডীদাস’ পত্রিকার দপ্তর। . . . তিল্ তিল্ করে কুমুদদা তৈরি করেছেন “চণ্ডীদাস মুদ্রণ”।’ উত্তরপ্রজন্মের অনুরাগীরা রক্ষা করেছিলেন কুমুদকিঙ্করের রোপিত এই বৃক্ষটিকে। দুবরাজপুর পাওয়ার হাউস মোড়ের মুখে নিম গাছের ছায়ার আজও জেগে আছে চণ্ডীদাস প্রেস, কিন্তু নানা কারণে তার সে-সুদিন আর নেই।
 
কুমুদকিঙ্কর মূলত কবিই ছিলেন। গীতিকারকে কবি বলে স্বীকার করে নিতে আমাদের কুণ্ঠা অনেক। হাজার বছরের বাংলা কবির ধারাস্রোতে একটা দীর্ঘ সময় কবিরা মূলত পদকর্তা ছিলেন। কুমুদকিঙ্কর লিখেছিলেন গান ও কবিতা। বিশেষ করে লোকগান ও বাউল গান। ‘বর্ধমানের ডাক’, ‘উদ্বোধন’, ‘মন্দির’, ‘বীরভূমি’, ‘ব্রাহ্মণী’, ‘পল্লীশ্রী’ প্রভৃতি পত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশিত হত তাঁর লেখালিখি। কেঁদুলির সংস্কৃতিপ্রাণ মানুষ রণজিৎ মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় কুমুদকিঙ্করের নির্বাচিত তেতাল্লিশটি কবিতার সংকলন ‘হবে না রাতের জয়’ কেঁদুলির ঠাকুর হরিদাস আশ্রম ট্রাস্টির উদ্যোগে প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৬-এ। কবিভাষায় পুরোনো টান রয়ে গেলেও কবিতাগুলির মধ্যে কবি কুমুদকিঙ্করের সংবেদনশীল, সমাজসচেতন মনটিকে সহজেই চেনা যায়। আছে বাংলাদেশের ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, রাজ্যপ্রশাসনের নগ্ন অব্যবস্থা, জয়দেব-কেঁদুলির প্রকৃতি-পরিবেশের দুরবস্থার কথাও। প্রেমের কবিতা তো আছেই। পালিতপুত্র সত্যকামের পাশাপাশি কাব্যগুরু কুমুদরঞ্জনও আছেন একাধিক কবিতায়। আর আছেন চণ্ডীদাস। এই সংকলনে ঠাঁই পায়নি, কুমুদকিঙ্করের তেমন একটি কবিতার কথা বলি: ‘চলন্তিকায় হয় না আমার পদ্য লেখা দু’এক কলি/ দু’ অক্ষরে তৈরী হলো চণ্ডীদাসের পদাবলী।’ এ-কবিতার নাম ‘রামী’।
 
কুমুদকিঙ্কর বেঁচে থাকবেন তাঁর গানে। তাঁর অনুগামী অনুজ শান্তিকুমার রজক আটচল্লিশটি গানকে একসূত্রে গেঁথেছিলেন ‘দাস রাধাময়ের গান’ সংকলনে। কুমুদকিঙ্কর তাঁর প্রায় সব গানের ভণিতায় ‘রাধাময়’ নামটি রেখেছিলেন। জয়দেব অঞ্চল সেবা সমিতির উদ্যোগে এই সংকলনটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ২০০০ খ্রিস্টাব্দে। ২০২০-তে এ-বই পুনর্মুদ্রিত হয়েছে। বাউল-লোকগীতির পাশাপাশি সেখানে আছে সাক্ষরতার গান, এমনকী সাফদার হাসমির স্মরণে লেখা গানও। কত সহজ কথায় কুমুদকিঙ্কর লিখেছিলেন:
 
আমাদের ভাবনা বলো কি
বীরভূমের এই কেন্দুলিতে কুটির বেঁধেছি।
আহা কুটির বেঁধে হেসে কেঁদে
                      আবেশে বেশ রয়েছি।
 
আকাশবাণীতে জনপ্রিয় এই গানটি প্রথম পরিবেশন করেছিলেন শান্তিকুমার রজক। অল ইন্ডিয়া রেডিয়ো কুমুদকিঙ্করকে দিয়েছিল গীতিকারের স্বীকৃতি ও শংসাপত্র। তাঁর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দু-টি গানের স্বত্ব কিনে নিয়েছিল ভারত সরকারের তথ্য-সংস্কৃতি দপ্তর। একটি গানের প্রথম কলি: ‘লালনের জাত খুঁজে তোর কাজ কি . . .’। অন্য গানটিতে কুমুদকিঙ্কর লিখেছিলেন:
 
যারে বলে জল রে ভাই
     তারেই বলি পানি
              হুঁস হারিয়ে মানুষ কেনে করছে হানাহানি।
 
জয়দেব-মেলা নিয়ে লেখা তাঁর একাধিক গান একসময় মানুষের মন জয় করেছিল। আমরা ক-জন আর মনে রেখেছি, স্বীকৃতি দিয়েছি যে, বহুশ্রুত এ-গানের গীতিকারও সেই কুমুদকিঙ্করই:
 
ঝিঙেফুলি সাঁজেতে পেঁয়ে পথের মাঝেতে
     কাদা দিলি সাদা কাপড়ে
               তু কেনে কাদা দিলি সাদা কাপড়ে।
 
এখনও অনেক ক্ষেত্রেই গীতিকারের নাম থাকে না। গানের কথা বদলে দেওয়া হয়। আমরা সে-সব নীরবে মেনেও নিই। এর একটা বড়ো কারণ বোধহয় কুমুদকিঙ্করকে নিয়ে চর্চার অভাব। এই সুযোগে তাঁর আর-একটি গানের কথা জানিয়ে রাখি। এ-গানটিও গেয়েছেন বাংলার খ‍্যাত-অখ‍্যাত বহু বাউল শিল্পী। ইউটিউবে হাত ছোঁয়ালেই পাবেন এ-গানের হদিশ :
 
লাগর কুথা রইলে হ্যে
জল লেগেছে তুমার বাকুড়ি ক্ষেতে।
 
একটানা বিস্তৃত জমিকে রাঢ়বঙ্গে বলা হয় ‘বাকুড়ি’। মুকুন্দের ‘চণ্ডীমঙ্গল’-এ তো আছেই, তারাশঙ্কর ‘গণদেবতা’ উপন্যাসেও এই ‘বাকুড়ি’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। লাভপুরের ধনডাঙার কার্তিক দাস বাউল কুমুদকিঙ্করের গানটিকে গেয়ে মাধুর্যমণ্ডিত করেছেন। কিন্তু ভণিতা না-থাকায় বোঝার উপায় নেই এ-গান কুমুদকিঙ্করেরই সৃষ্টি। তাঁর গানগুলি সংকলিত করে কুমুদ-অনুরাগী শান্তিকুমার রজক-যে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ কতর্ব্য সাধন করেছেন, আগামী দিন নিশ্চয়ই তা স্মরণে রাখবে। এ-সংকলনের বাইরে আছে কুমুদকিঙ্করের আরও অনেক গান। যেমন ‘বাউল ফকির কথা’ বইয়ে সুধীর চক্রবর্তী এই গানটির সন্ধান দিয়েছিলেন:
 
দেশ ভরেছে বাবু বাউলে
তারা জামা জোড়া পরছে এখন 
ডোর কৌপীন খুলে ফেলে —
                                দ্যাখো বাবু বাউলে।
 
এ-গানের শেষটি আশ্চর্য সুন্দর। বাউলের প্রতি কুমুদকিঙ্করের প্রাণের টান সেখানে স্পষ্ট। লিখেছিলেন:
 
বটের বাউল কোথায় পাব
বট ভেঙেছে ঝড়ে
সাধনা নাই শখে সবাই 
বেতারে গান করে
রাধাময় কয় যা আছে তা
ক্যামনে রাখি আগুলে।
 
এখনও পর্যন্ত এ-গান কোনো বাউলকে গাইতে শুনিনি। অবশ্য নিজেদের দুরবস্থার কথা নিজমুখে তাঁরা কেমন করেই-বা গাইবেন! তাই কুমুদকিঙ্করের গানগুলির একটি পূর্ণাঙ্গ সংকলন প্রকাশিত হওয়া খুবই জরুরি।
 
[তথ্য সহায়তা পেয়েছি যাঁদের লেখা থেকে: সুধীর চক্রবর্তী, অজিতকুমার দাস, শান্তিকুমার রজক, রণজিৎ মুখোপাধ্যায়, আদিত্য মুখোপাধ্যায়, জয়িতা সরকার।]

ছবি : ভ্যান গঘ

পূর্ববর্তী সংখ্যা

পড়তে পারেন:

এখন বাড়িতে বসেই সংগ্রহ করতে পারবেন কবিতা আশ্রমের মুদ্রিত সংখ্যা এবং কবিতা আশ্রম প্রকাশনার বই। নীচের ছবির ওপর ক্লিক করলে পৌঁছে যাবেন আমাদের অনলাইন সপ পেজে। হোয়াটস অ্যাপের মাধ্যমেও অর্ডার করতে পারেন। যোগাযোগ: ৭৩৮৪১৭২৪০৪/ ৯৪৩৪৪৩১৩৬২