অঙ্কন: সঞ্চিতা দত্ত

নাসিম-এ-আলম

সংখ্যায় ভুল হয়

যাদু গণিতের পাশে মাটির পুতুল বসেছিল

মশারির ভিতর থেকে সেই দৃশ্য দেখি

দেখি অস্তিত্ব সংকট, একবেলা খেয়ে অন্যবেলা

তুমুল বৃষ্টি বাদল পিচ্ছিল পথঘাট

সাবধানে মোমবাতি জ্বেলে হেঁটে যাওয়া,

                     আর কত পথ?

 

নিশ্চুপ অনিশ্চয়তার কাল,

           তবু কিছুই বোঝে না রাত্রি

সে পোশাক খুলে আদিম স্নানের ভিতর

দেখে গাছে গাছে অবুঝ কোকিল,

            হেঁটে যায় কুষ্ঠরোগীর দল

যাত্রাপালা শেষ হলে ফিরে আসে দর্শক

দু’চোখে ঘুম, উপোসের খরা,

            ধানজমির আকাল চলছে।

 

ডাল-ভাতটুকুই উপাদেয় মনে হয়

                  অভাবের রান্নাঘরে

যদি বাজার বন্ধ থাকে

বাস ড্রাইভার, দোকান মালিক

               অরণ্যের পথ বেছে নেয়

ওদের স্ত্রী-কন্যারা শস্য সংগ্রহে ব্যস্ত

গোধূলির রক্তিম পথে

         ওদের সঙ্গী নতুন প্রজাতির হাঁস,

 

সংখ্যায় ভুল হয়, সোমবার ডাকঘরে ছুটি

কিছু ওষুধ, আনাজপত্র কেনা বাকি

টেলিফোন নেই জানি দুশ্চিন্তায় রয়েছ

            গোয়েন্দা গল্পের উদ্বেগে

কী হবে, কী হতে পারে, ভেবে

            বারান্দায় দাঁড়িয়েছি।

মণি নন্দী

কাগজ

কাগজ—ঠোঙা হও

তোমার মোড়কের গর্ভে

ধারণ কর আমায়

আমি রক্ত ছেনেছেনে

ছাড়পত্রে বেড়ে উঠি

জন্মের ঋণে প্রশ্ন তুলি

মা—কেন কাগজ…

 

যার বুক চিরে লিখে দিলে

আমার জন্মের সনদ?

সৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায়

জলছবি

ফাঁকা রেলস্টেশনে শীতের এলানো রোদ

যেন আমাদের বসে থাকা ভ্যাকেশন-ঋতু

ছমছমে সবুজ টিলা থেকে উড়ে আসে

পাখি, ঠোঁটে তার কাঠের বাংলোর চাবি

দূরের উইন্ডমিল এ সময় টাইম-মেশিন হয়ে যায়

ওয়েটিং রুমে কেউ নেই, টিউব-ওয়েলের পাশে

ঘোরাঘুরি করছে সুপ্রাচীন বাদামি কুকুর

ছোটনাগপুর থেকে যে ট্রেন এসেছিল একদিন

প্ল্যাটফর্মে তার ছায়া পড়ে

বন্য ফুলের উপত্যকা থেকে

               কেউ ছুঁড়ে দেয় চিঠি

দেখি, ট্রেনের জানলায় তুমি বসে আছ

হাত নেড়ে চলেছ বহুকাল

পাহাড়ি ঝর্ণার জলে স্নান করে

জলছবি হয়ে গেছে এই প্ল্যাটফর্ম

নির্জন বেঞ্চে পড়ে আছে কবেকার লাগেজ

বন্ধ লাগেজের ভেতরে বসে দেখতে পাই আমি –

জীবনদৃশ্যগুলো ট্রেনে চেপে

মহাকাল দর্শনে বেরিয়ে পড়েছে ……

পৌষালী চক্রবর্তী

আদমশুমারি

পতনের সহস্র কলা 

শাস্ত্র মতে গাছ

পরার্থে, পিতাটির অশুচি রক্ষিতা 

খেয়ে ফ্যালে 

সর্পলোভদুষ্ট এক আপেলের ব্যাধি

জন্ম দেয় পৃথিবীর আদিতম শোক

 

আহা! সে কুলটা মাগি 

বশ্য না কি বেচারা ওই পুরুষের মতো?

খলবল শব্দে যারা রাত্রি জল ভেঙে ভেঙে 

ভোরে আনে পাতার পোশাক  

জলের নৌকায় বসে নিজে ভুলে পরকে ভোলায়-

 

যেন তারা বৃক্ষজাতক

ইভ একা শুরু করে আদমশুমারি!

 

হিসাব রাখেনি বনে কোন পত্ঝর

হাড়ের বংশীধ্বনি 

প্যায়দা করেছে কোন বামন অবতার

 

স্মৃতি তো তন্ডুল মাত্র, বিস্মরণ ধরে রাখা তিলে

কিরা কাটছি ‘ইভ ইভ’

নিষাদীর খিদে নিয়ে নেমেছি রমণে।

অঙ্কন: সঞ্চিতা দত্ত

অবশেষ দাস

জলসাঘর

ভেব না, সংবিধান তোমার পায়ের নূপুর

 

স্পর্ধাকে চড় মেরে বলো,

      এই পথে বারবার হেঁটে যাবে,

                 ইতিহাস, মহাকাল

 

সন্তানসম্ভবা মেঘ 

সূর্যের চোখ দেখে ভয় পাবে কেন? 

তোমাদের স্নান থাক অনশনে 

গঙ্গাকে একবার স্নানে যেতে দাও।

 

পৃথিবীর ধুলোবালিছাইয়ের মিছিলে বসে

      বর্ষার উপনয়ন থামানো কি যাবে?

 

সুখ-দুঃখের মতো সংলগ্ন প্রতিবেশী জানে, 

সন্ধ্যা হওয়ার আগে গৃহস্থের চোখে মুখে

অবিভক্ত কাহিনি ঘরকন্নার দিকে হেঁটে যায় 

 

আকাশের এককোণে 

বুভুক্ষু শুকতারা তারাদের কেউ নয়,

                     তারা সেজে আছে।

ঠিক তোমাদেরই মতো নির্মম জলসাঘর।

 

ভেব না, মানুষের খিদে পেলে

সম্ভ্রম-মর্যাদা বুকে থেকে পথে নেমে যায়।

 

মানুষের মদির ইচ্ছার অগ্নাশয়ে

      স্পর্ধাকে লেলিয়ে দেওয়ার কাজে

                         গৌরব নেই।

 

বাঁশির ইচ্ছার কাছে

নূপুরের ইহকাল সমর্পণ আছে।

 

সংবিধানের ইহকাল জনগণ

পরকাল মানুষের…

অমিতাভ মীর

কুলুঙ্গির পাশে

চোখের সামনে ধুলো পড়া কুলুঙ্গিটা

ভগ্নহৃদয়ে কেমন অদ্ভূত তাকিয়ে আছে, 

ভেতরটা উঁকি দিয়ে দেখো-

ওখানে শরৎ, হেমন্ত, বসন্ত, গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীত

এই ছয় ঋতুর সালতামামি আছে।

 

আরও খুঁটিয়ে দেখ-

মচমচে প্রেম, খুনশুটি ভাজা, মাখন সোহাগ,

চোখ ভরা জল, হাঁড়ি ভরা মধু, মুখরা বচন,

কুমকুম অভিমান, কামরাঙা অনুরাগ;

ইলোরার ফ্রেস্কোর মতোই পরিপাটি পাবে।

 

একদিন কত জন পাশে ছিল, 

কত কিছু সাথে ছিল

শত কথা, হৃদি ব্যথা, হাসি-গান তা-ও ছিল;

কুলুঙ্গির পাশে এখন একাই আমি আছি

নেই আর কেউ কাছাকাছি। 

অদিতি

নির্ধারণ

জনশূন্য মস্তিষ্ক। 

লাল, হলুদ, সবুজ সিগন্যালে স্পষ্ট হয়

সরীসৃপের রঙের বিপর্যয়।

 

সময় সংক্ষিপ্ত; ফতোয়া জারি করছে চিরকুট।

হইহই রবে কিছু সম্মেলনী আলাপ। 

তারপর কিছু আর্তনাদ, প্রতিবাদ….

ধীরে ধীরে সবই টুকরো সংবাদ।

 

ছায়া খুঁড়ে তুলে আনতে হয় নিজের শবদেহ।

যেখানে পশমগুটি ছিল, প্রজাপতি ছিল,

                   রেশম সুতো ছিল…

সেখানে ভাঙা বিকেল হাতড়ে বেড়ায়

                            চরকার স্মৃতি।

 

লোকালয় ছেড়ে

          গোপন হয় মন কোনও মেঘে;

যে মেঘে বৃষ্টি হয়নি এযাবৎ….

যে মেঘে বৃষ্টির কেয়ামত।

তপন পাত্র

কহিব কাহার কাছে

জ্বলিছে টিকর টাঁড়

জ্বলিতেছে হিয়া,

বলো কবে আসিবে গো 

ও মৌসুম প্রিয়া।

যাবতীয় বীজ ধান 

পেটে মরে যায়,

বিরহী বিবাগী মন

করে হায় হায়।

আকাশে বাতাসে ভাসে

পাহাড়িয়া মেঘ,

আমার বুকেতে জাগে

ভাবের আবেগ।

এবার জুড়াও ভূমি

ঝর ঝর ঝরো –

আমাকে নিবিড় করে

সব উজাড় করো।

 

২

আষাঢ়ের পুঞ্জমেঘ,

কোথা চলে যাও?

না বলে উধাও যদি 

মোর মাথা খাও।

কোথা বিরহিনী প্রিয়া

কোথা প্রিয় সতী,

আগুন দ্বিগুণ হয় 

বাড়ে চিত্ত রতি‌।

দশার্ণ, অবন্তী, শিপ্রা

জম্বুবন বেশ

অলকায় গিয়ে দেখো

অশ্রুসিক্ত কেশ।

কোথা সেই পথশোভা

নদী গিরি বন,

সবকিছু থেকে আজ 

স্বেচ্ছা নির্বাসন।

 

৩

অঙ্কুরে ত্যজিছে বীজ

মেলিবে না পাতা,

অথির বিজুরি ঝলে

চক্ষু হয় রাতা।

এ হেন দুর্যোগ পথে 

ঝিঁঝি ও জোনাকি

কেহ নাই, স্তব্ধ রাত্রি;

আমি শুধু বাকি।

তোমার চরণ ধ্বনি

আমি কানে শুনি।

আমার বুকের ধ্বনি

তুমি নাও গনি,

আমার মতন হৈও 

আমি হই তুমি।

এ বড় বালাই বিধি 

অনিমিখে ঝুমি।

 

৪

যখন কহিলে কথা 

হাতে দিলে চাঁদ,

তখন ভাবিনি বুলি 

মরণের ফাঁদ।

আঁখির আড়ালে গেলে 

হিয়ার আড়ালে,

কোটি শর বিদ্ধ করে 

এ বুক মাড়ালে।

গগনে জলদ ঘন 

সঘন দামিনী,

ভাবি ওই এলো বুঝি 

আমার ভামিনী।

পুড়িছে উর্বর মাটি 

নষ্ট ক্ষাত্র চারা,

মৌসুম বিহনে পৃথ্বী

গতি রতি হারা।

 

৫

ও মোহিনী কি মোহিনী 

জানো গো কনক ধনি,

তুমি ছাড়া এ মৃত্তিকা 

মরিছে প্রহর গনি ।

শুনিয়া স্বাগত কথা 

ধ্বনিছে ‘ফটিক জল’,

পুলকিত তরুলতা 

হরিৎ বনাঞ্চল।

পিয়াসে হরিণী ক্ষান্ত,

তোমার চরণে চায় 

সতী ভুলে নিজ পতি

দিঘির যৌবন গায়।

জানিয়া সকল রীতি 

পরেছি মরমে ফাঁসি,

করেছি মধু পিরীতি

বরষ সরস বাঁশি।

 

৬

ভামিনী ভামিনী কান্তা

তুঁহু রূপলাবণি,

পুষ্প নব কিশলয়

ডাকে নিশি যামিনী।

শত শত মধুকর

উনমত ঊঢ়,

রঞ্জনা রসময়ী

ন স্বাগত রূঢ়।

ময়ূর ময়ূরী শত

নাচত কুঞ্জ,

বাতাসে সন্দেশ ভাসে

আসে মেঘপুঞ্জ ।

রতি রসে ভাবাবেশে

নাচে ভূমি রঙ্গে,

ঘন ঘন চুম্বন

ঝরতি প্রসঙ্গে।

অঙ্কন: সঞ্চিতা দত্ত

পূর্ববর্তী সংখ্যা

পড়তে পারেন:

এখন বাড়িতে বসেই সংগ্রহ করতে পারবেন কবিতা আশ্রমের মুদ্রিত সংখ্যা এবং কবিতা আশ্রম প্রকাশনার বই। নীচের ছবির ওপর ক্লিক করলে পৌঁছে যাবেন আমাদের অনলাইন সপ পেজে। হোয়াটস অ্যাপের মাধ্যমেও অর্ডার করতে পারেন। যোগাযোগ: ৭৩৮৪১৭২৪০৪/ ৯৪৩৪৪৩১৩৬২