ছবি : সুনীল দাস

রাহুল পুরকায়স্থ

গৌতম বসু যা বলতেন

আমি তো আমার দিকে হেঁটে আসছি

 

মাঝখানে ছায়া ও মৃত্তিকা,

গর্ভে ধারণ করেছ তাকে

 

এভাবেই পুনর্জন্ম

          আমাদের কবিতাকে ঘিরে রাখে!

 

শিবাশিস চট্টোপাধ্যায়

নিম্ফোম্যানিয়া

ভিড়ের কবিই হয়তো

হীরে-জহরত পরে তফাৎ চেনায়

কখনও ভেবো না ওরা সকলেই এক

ভেতরে ভেতরে কেউ নিম্ফোম্যানিয়াক

হতে পারে! ওই রোগে

শিশু প্রসবের দায় অন্য কারও ঘাড়ে

                      ঝেড়ে ফেলে

কবিতায় করে গর্ভপাত…

 

স্যাকভাঙা জলে থইথই

চিনতে না পেরে শুধু হাবুডুবু খায়

অদীক্ষিত পাঠকের হাতে হাতে বই

ঝুমা গঙ্গোপাধ্যায়

সর্বশ্রেষ্ঠ সন্ন্যাস

নিঃশব্দে কুড়িয়েছি ঘৃণা, অপমান
শব্দ আর বোধের মাঝে নিশ্চুপ হয়ে বসে থেকেছি,
মেনে নিয়েছি তোমার টানটান নীরবতা
সম্পর্ক স্বীকৃতি বা অস্বীকৃতির মাঝে
কত কী—রহস্যময় কথামৃত পাক খায়

আমার না করা ভুলগুলোকেও লুকিয়ে ফেলেছি
চুপচাপ
এই তো কেমন বানপ্রস্থ,
এগিয়ে চলেছি

পাপবোধহীন ভালবাসার কঙ্কাল জড়িয়ে

     এগিয়ে যেতে যেতে দেখেছি

মৃত সম্পর্কই ভালবাসার সর্বশ্রেষ্ঠ সন্ন্যাস!

রাজীব মৌলিক

গান

কান পেতে শুনি তোমার শুশ্রূষা।

গেয়ে উঠছ ফিতাকৃমির মতো।

আমার পাকস্থলী জুড়ে, হৃদপিণ্ড জুড়ে…

 

উপশম ইষৎ নীল রঙের আভা।

উবে গেছে উল্কাপিণ্ডের মতো

                ফুসফুসের হাওয়ায়।

 

এখন দাহ আর আমি সঙ্গমরত।

যে বধির তার কবরের পাশে শুনি;

রাখা আছে প্রেমিকজন্মের গান

 

গান গায় মুয়াজ্জিন।

আমার উপশমরা তাঁর শ্রোতা হয়ে ওঠে

ছবি : সুনীল দাস

নীপবীথি ‌ভৌমিক

অ্যালঝাইমার

জেগে থাকা একটা প্রাচীন বিরহ।

প্রতিদিন ক্ষয়ে যায় পাড়, 

প্রতিদিন জেগে ওঠে নতুন চরাচর…

 

ঘুম তো আশ্চর্য নদী !

সীমাহীন জলরাশি নিয়ে বয়ে যায়

    সাদা- সবুজ নুড়ি পাথরের টানে

 

বিরহ নতুন হয় আবার। বারবার বিষাদ

সুর সাধে সরোদে, 

      ঘুম ভাঙে প্রাচীন বিরহের

 

স্বরলিপিতে লেখা সুর কি সব জানে

      কার চোখে কখন ঘুম আসে ?

সুমন্ত মুখোপাধ্যায়

দহন

গাছকে খেয়েছে দুপুরের আলো

দিগন্ত রেখার শীর্ণ বনরাজীর

বুক ফাটে কান্নায়।

গোধূলির একচিলতে পঙ্গু মেঘেরা

নির্বাকে দাঁড়িয়ে থাকে।

ধার শোধের পালা শেষ হয়ে গেছে দুর্ভিক্ষে,

তবু ছায়াকে দেখে ভাবে ভালো আছি

ছায়া যে মায়াবিনী !

তিলে তিলে গ্রাস করে জীবনের আলো।

বৈদূর্য্য সরকার

মথুরা বিলের ধারে

এ সেই হারিয়ে যাওয়া যমুনা নামের রূপসী কন্যা

লোককথার নদীটি গতিরুদ্ধ হয়ে বিলে পরিণত,

ত্রিবেণী বন্ধন ছিঁড়ে হারিয়েছে বোন সরস্বতী 

মুছে গেছে পাঁচশো বছর ইতিহাসের প্রবাহ,

ঘরছাড়া রাধা দেখা করতে আসেনি তার সাথে

উদাসীন হাইরোড দিয়ে বয়ে গেছে কতকাল। 

নদী গতি হারিয়ে ফেললে কেউ গুরুত্ব দেয় না

শুধু চিহ্ন হয়ে রেখে যায় আমাদের ছোট নদী,

হাওয়াবদল হয়ে সময়ের টানে জীবন পাল্টেছে

চোখে বাহারি চশমা চুলে পাক বাজারের থলি 

অপরাধ ভঞ্জনের পালা হয়েছিল কতদূর ! 

গন্তব্য ভুললে মাঝপথে হারিয়ে যায় মানুষ 

তাকে ঘিরে ধরে কচুরিপানার মতো কিছু দায় । 

বারো পর্বের ধারবাহিক

“ঘরের কাছে আরশিনগর”

পর্ব-১

কেঁদুলির তারক দাস বাউল

রামানুজ মুখোপাধ্যায়

অজয়-তীরে জয়দেব-কেঁদুলির উত্তর-পূর্ব কোণে বড়ো চাতুরি গ্রামঘেঁষা মাঠপাড়ার বাগদি ঘরের একটি ছেলের ইচ্ছে হয়েছিল গান শেখার। কিন্তু সে আর হবে কেমন করে! ঘরে যে হা-অন্ন! হ্যাঁ, তারক ছিলেন দরিদ্র তপশীল পরিবারের সন্তান। বাবা কানাই বাগদি ছিলেন খেতমজুর, বাজাতে পারতেন একাধিক বাদ্যযন্ত্র। দাদু বাজাতেন পাখোয়াজ। গাঁ-ঘরের অন্ধকারে কে আর এ-সব বাজনার কদর করবেন। বাইরেও পরিচিতি ছিল না তেমন। মায়ের নাম আন্নাকালি বাগদি। চার ভাইবোনের মধ্যে তারক ছিলেন কনিষ্ঠ। ক্ষীণ হলেও তাঁর মাতৃকূলে গানের স্পর্শ ছিল। অল্প বয়েসে বাবার মৃত্যুর ফলে ঘরে তীব্র অন্নাভাব। এমনকী, কোনো-কোনো দিন অনাহার। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশুনো ক্লাস ফোর পর্যন্ত। আশেপাশে শ্রমিকের কাজ করতে-করতে এসে পড়েছিলেন তমালতলায় সুধীরবাবার আখড়ায়। সুধীর দাস বাউল তাঁকে বাদ্যযন্ত্র ও কণ্ঠসংগীতের তালিম দিয়েছিলেন। দুখের দিনে দিয়েছিলেন অন্নও। সামান্য দূরের গ্রাম থেকে যাতায়াত করে পাঁচটি বছর। তারপর ঠাঁই হয়েছিল তমালতলায়। উত্তরকালে তারক দীক্ষা নিয়েছিলেন পাগল রামদাসের কাছে। সাধক বাউল তো তিনি ছিলেন না। যাত্রা শুরু হয়েছিল হরিনাম-সংকীর্তনের দল গড়ে। পরে শুরু হল ছোটো-ছোটো গ্রামীণ আসরে গান গাওয়া। বাউলের সাধনতত্ত্বের ক্ষেত্রেও তারক যে ক্রমে-ক্রমে কতখানি সিদ্ধহস্ত হয়ে উঠেছিলেন, কথাকার অনুপম দত্তের ‘বাউলের অপরূপ কৃষ্ণকথা’ (২০১৯) পুস্তিকায় তার সাক্ষ্য রয়ে গিয়েছে। অনাদরে, অবহেলায় পড়ে থাকা এমনই কত রত্নধনের সাধনক্ষেত্র এই জয়দেব-কেঁদুলি।
 
কেঁদুলির মেলা মানেই আমাদের কাছে রাধাবিনোদ মন্দির, তমালতলা, অজয়ের ফেরিঘাট, ভরাঙ্গী-জনুবাজার গ্রামের দিকে রুখুসুখু ধানমাঠের মাঝে বোলপুরগামী বাসের পার্কিং জোন। ফেরিঘাট থেকে রাধাবিনোদ মন্দির কয়েক মিনিটের হাঁটা পথ। সামনে সরকারি বাউল মঞ্চ, জয়দেবের গ্রামীণ হাটশেড আর সংস্কৃতিচর্চা-কেন্দ্র ভক্তিভবন। পাশেই তারক দাস বাউলের প্রতিষ্ঠিত ‘বাউল কুটির সেবাশ্রম’। ২০১৭-র ১০ অক্টোবর তারক দাস বাউল ছাপান্নো বছর বয়সে গত হয়েছিলেন। আশ্রমপ্রাঙ্গণেই আছে তাঁর সমাধি। গানের সুবাদে অস্ট্রেলিয়া-জাপান-কোরিয়া-পোল্যান্ড ঘুরে আসা তারক গায়ক হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। গান, বাজনা এবং নাচ — এই তিনে মিলে তারক দাস বাউল ছিলেন একজন পরিপূর্ণ শিল্পী। তাঁর খমক, দোতারা আর একতারা বাদনের হাতটি ছিল অতুলনীয়। একটি সাধারণ দেশলাই বাক্সকে আঙুলের ঠেকায় তারক এমন আশ্চর্য সুন্দর বাজাতে পারতেন, সে-ধ্বনি বিস্মিত করত কত গুণীজনকে। তারক পুরোনো গান, বিশেষ করে মহাজন পদ গাইতে ভালোবাসতেন। বহু বিস্মৃত নীলকণ্ঠ-পদাবলি গেয়েছিলেন তিনি। ইউটিউবে তাঁর দশটি গানের একটি অ্যালবাম আছে, ২০০৭-এ জাপানে রেকর্ড করা হয়েছিল গানগুলি। মহাজনী পদে তাঁর দক্ষতার সাক্ষ্য সেখানে আছে। প্রশিক্ষক হিসেবেও তিনি সুনাম অর্জন করেছিলেন বাউল গানের একাধিক কর্মশালায়। তাঁর দুই পুত্র তপন (সাধু) আর তন্ময় (কাঙাল), শিষ্যদের মধ্যে সনাতন দাস, রাজা সিংহরা গানের জগতে পরিচিতি অর্জন করেছেন। পুত্ররা হয়তো তারকের বাদন-প্রতিভার উত্তরাধিকারকে কিছুটা হলেও রক্ষা করবেন। অনিয়ন্ত্রিত যাপন কেড়ে নিয়েছিল তাঁর আয়ু। তবু জীবিতকালে তারক দাস বাউল হয়ে উঠেছিলেন কেঁদুলির বহমান বাউল ধারার সার্থক উত্তরসূরী। নিষ্ঠা, একাগ্রতা আর অদম্য জেদের জোরেই তিনি নিজেকে এই উচ্চতায় নিয়ে যেতে পেরেছিলেন। বাল্যকালে টিনের কৌটোয় পলিথিন বেঁধে শুরু করেছিলেন গাবগুবি বাজানো। কৈশোরে অনেক কষ্টে তিরিশটি টাকার বিনিময়ে দাদা তাঁকে কিনে দিয়েছিলেন একটি দোতারা। এইখান থেকে যাত্রা শুরু করে তারক যে-উচ্চতায় নিজের বাদন-প্রতিভাকে নিয়ে যেতে পেরেছিলেন, সে-দিকে ফিরে তাকালে এই দুর্দিনেও মনে আশার সঞ্চার হয়। 
 
 

ছবি : সুনীল দাস

পূর্ববর্তী সংখ্যা

পড়তে পারেন:

এখন বাড়িতে বসেই সংগ্রহ করতে পারবেন কবিতা আশ্রমের মুদ্রিত সংখ্যা এবং কবিতা আশ্রম প্রকাশনার বই। নীচের ছবির ওপর ক্লিক করলে পৌঁছে যাবেন আমাদের অনলাইন সপ পেজে। হোয়াটস অ্যাপের মাধ্যমেও অর্ডার করতে পারেন। যোগাযোগ: ৭৩৮৪১৭২৪০৪/ ৯৪৩৪৪৩১৩৬২