বাংলা কবিতার বাতাসে চুপচাপ মিশে আছেন তৈমুর খান। চুপচাপ, কিন্তু নাছোড়। নাছোড়, কিন্তু দাবিহীন। আর দাবিহীন মানুষের ভালবাসার তুলনা হয় না কখনও। ঢাকঢোলওয়ালা মৃত কবিদের ভিড়ে তৈমুর একজন জীবিত, জাগ্রত কবি। প্রমাণ এই সাম্প্রতিক তিনটি কবিতা।
পারমিতা ভট্টাচার্য অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত, কিন্তু শক্তিশালী কবি। কবিতা প্রকাশে তাঁর অনীহাকে সম্মান করি। কারণ অনেক অপেক্ষার পর যখনই তাঁর কবিতা কোথাও প্রকাশিত হয়, পড়ে দেখি মননে নির্মাণে যথারীতি সেগুলি নিখুঁত কবিতা। পারমিতার এই সংখ্যার কবিতাগুলিও তাঁর অনুশীলন ও ধ্যানের গভীরতাকে তুলে ধরেছে। শিক্ষা গ্রহণ করি।
…বিভাস রায়চৌধুরী
কবিতা আশ্রম

তৈমুর খান
ছবি
ছবি তুলে নাও
বসন্তের কোলবালিশে স্বপ্ন শুয়ে আছে
বিছানার চাদরে বাগান, রঙিন ফুলেরা ফুটেছে
ছবি তুলে নাও
দুয়ার খোলাই আছে
মৃদুমন্দ বাতাসে পর্দার কানাকানি
এপাশ-ওপাশ করে গোলাপি ঠোঁট
হয়তো-বা জন্ম দেবে নতুন কাহিনি
ছবি তুলে নাও
আলো লটকে আছে দেয়ালে
অনুভূতিগুলি কিছুটা টিকটিকি
হ্যাঙ্গারে ঝুলে আছে বাসনা
ঘুম বুনছে একাকী নির্জনের পাখি!
ধর্ষক
কত রক্ত ঝরেছে রক্তবনে
ধর্ষণের মেঘ জমেছে শহরজুড়ে
নিজেকে পুরুষ বলতে লজ্জা হয়
ধর্ষণ যাপনের দিন কাটে
উৎসবে সকলেরই ভেঙে যায় ঘুম
রাস্তা চিনি না কোনওদিকে
রাজনৈতিক কোলাহলে আলোর আয়োজন
কিন্তু আলো নেই,শুধু শুধু মোমবাতি পোড়ে
আমাদের উজ্জ্বল সময়েরা আত্মহত্যা করে
আরেকটু ধীরে চলো, সামর্থ্য একেবারে নেই
নিজের দয়ায় বেঁচে আছি নিজে
নিজেকে পুরুষ ভাবি, ধর্ষক ভাবিনি
তবু আজ সব স্বাদ তেতো—বাজারের সমূহ চিনি!
আমাকে কেউ উড়তে দিচ্ছে না
এক-একটি অদৃশ্য ডানা বেরিয়ে আসে
আর তারা ওড়াতে থাকে আমাকে—
কোথায় যাব আমি?
এতগুলো হাত টেনে ধরছে!
সব হাতে লেগে আছে মায়া
আমাকে কেউ উড়তে দিচ্ছে না!
পাশ ফিরছি—স্ত্রীর মুখ
পাশ ফিরছি—সন্তানের মুখ
বিষাদ! বিষাদ! আমাকে বসাচ্ছে শুধু
আর কতক্ষণ বসানো যায়!
পুরনো ঢেঁকির কাছে আমার হা-অন্ন খুদ পড়ে আছে
কয়েকটা পাখি নেমেছে উঠোনে
ওরা সব মোহিনীর পাখি
আমার স্মৃতির দানা খুঁটে খুঁটে খায়…

পারমিতা ভট্টাচার্য
প্রলাপের রাত-ঘুম
১
ঘুমের তৃষ্ণাকে ডাকো
ঘুম নয়। সে প্রকৃত সুদূর কাহিনি,
ইতিহাসে স্তব্ধ হয়ে আছে।
ডজন ডজন পিল মরা সৈন্যের মতো
অস্ফুট মূর্ছায় ফোটে —
সহসা চমকে ওঠা তন্দ্রিকা বিধূনিত করে
অন্ধকার কেঁপে কেঁপে ওঠে!
২
আজ সব লিখে ফেলি,
হাড় খোলবার দিন আজ।
প্রথমে দু’হাত দিয়ে খুলে নিই হৃদয় ও মাথা,
তারপর হৃৎপিণ্ড ওপড়ালে সামান্যই ব্যথা…
যোনিপথে শেষ রক্ত এইবার স্থাণু হয়ে যাবে!
আঁচলে সন্তাপ মুছে আঙুলের হাড় ফেলে দেব।
আজ রাতে শেষের কবিতা!
৩
পৃথিবী জন্মের আগে
অন্য গ্রহে বাস করতাম,
ছদ্মবেশ ছিল অন্য প্রাণ!
সেখানে জ্বলন্ত বিশ্ব, আগুন স্বভাব
আমার নির্মাণ!
এখন দেখেছ—দুই চোখে ধোঁয়া, জিভের কামড়ে
কেমন বারুদ গন্ধ…
এ বয়সে ক্রেতা ডাকি।
শোনো
শূন্যতার মাঝে আমি আগুন বিক্রয় করে থাকি।
৪
হেরে যাওয়া আমার স্বভাব,
হারিয়ে যাওয়াও।
বেশিক্ষণ ঘোলা জলে দাঁড়াতে পারি না।
অর্ধেক মৎস্য ছিল, এখন পাখনা, আঁশ
সব ক্ষয়ে গেছে।
আধপচা মানবদেহটি,
তাকে
আগুন ছোঁওয়াও।
৫
বর্ষা এল। বর্ষা এল।
তোমার স্নানের জল রেডি।
এবার রমণী মেঘ দু’হাত বাড়িয়ে
চুল খুলে দাঁড়িয়েছে,
বিলম্বে ব্যর্থ হবে ধান।
সমকামী হাওয়া হয়ে বিদ্যুৎ প্রকাশ করো,
বিশুষ্ক মাটিতে আজ গান।
৬
রাতের মিথ্যের থেকে পাশ ফিরে শুই
ঘুম আসে, বাজ পড়ে, ঝোড়ো হাওয়া বয়
ঘুমের ভিতরই!
আস্তাবল থেকে আমি প্রাণভয়ে হ্রেষাধ্বনি করি…
সকালে গলার থেকে কাকাতুয়া ডাক বের হয়!
৭
আগুনের দাহ থেকে বেরিয়ে আসার
প্রবল অসুখ
সারিয়ে তুলেছি, আর
অনেক কষ্টে আমি পোড়া ছাই থেকে
উদ্ধার করেছি মুখ;
বাকি সব জ্বলে খাক হোক —
পিছনে হলুদ পথ সাপের মতোই গেছে বেঁকে!
ওইখানে বেদনা অসাড়,
আদিম শিকার ভেবে পাথর ছুড়েছে কত লোকে…
প্রকাশের পথে
