শরৎ সংখ্যা

ছবি: গনেশ পাইন

নির্মল হালদার

পানকৌড়ির ডুব

মুখের বিড়িটা ছুঁড়ে দিয়ে

হারু খুড়া বলে, কিসে কি আছে রে

আজ মরলে কাল দুদিন—

আমি তাই উপর দিকে চেয়ে আছি,

যদি নতুন তারার জন্ম দেখতে পাই।

 

আলো দেখতে পাই।

 

২

আমরা চার ভাই চারটে গাছ

তিনটে গাছ উড়ে গেলে, আমি একটা ভাই

খুদকুঁড়ো খুঁজতে খুঁজতে নিজেকে খুঁটে খাই।

 

নিজেকে ছিঁড়েখুঁড়েও খুঁজি

যদি দাদাদের দেখতে পাই, যদি হাত পেতে বলতে পারি,

দে আমাকে আদর দে।

সন্মাত্রানন্দ

চক্ষুদান

আমার এ দুটি চোখ

এই চোখে তোমাকে দেখেছি

দেখেছি দু:খের কতো মুখ

কতো সুখ সবুজ ঘাসের মতো হয়েছে হলুদ।

চোখ তবু সাদা রয়ে যায়

শেষে চোখ অস্পষ্ট ধূসর।

 

আগুনে পোড়াবো কেন?

দিয়ে যাব মৃত্যুর আগে

আমার এ চোখ দুটি

যদি কারও কোনো কাজে লাগে।

তখন আমার চোখে আরেক মানুষ

দেখে নেবে পৃথিবীর রূপ। 

 

চাঁদের বাটিতে ওথলানো জ্যোৎস্নার সর।

বেদন রোদন যতো, মানুষের শিশুদের মুখ

আকাশ অপরাজিতা, কলমিলতায় ঘেরা ঘর,

দ্বীপের ভিতরে কোনো স্তব্ধবাক সুনিবিড় বন,

প্রত্নমানবী তুমি, তুমিও তো তাতে ধরা দেবে…

 

এ তখন চোখ নয়, এ তখন আয়ত নয়ন।

 

রণবীর দত্ত

বাবু মল্লিকের বাড়িতে

অঙ্কুরিত গমবীজের রস বাবু মল্লিকের নিম ফরমাস
এখন গোটা সকালবেলা কেবলই ফলাহার তার
চৈত্রের দুপুরের শুকনো পাতার মাঝেও জেগে উঠে
নিমগ্ন হয়ে পুরোহিতের মতো বসে আছে দেখি গিয়ে
অনেক অনেক সফলতার পর মাসিমাকে দেখি
আমি বাবু আর বাবুর বউ সৌন্দর্যের চমক লাগিয়ে দিয়েছে
ওদের প্রেসক্রিপশন মতো ফলাহার ভোরের রৌদ্রের আকাশ
অনেক মারণব্যধির থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে
পৃথিবীর নরম আলোকে তারা পৌঁছে যাবেই এবং
আমাকেও সঙ্গে নেবে একান্তই আপন মানুষ ভেবেই
ঘ্রাণ আছে জেনেই মানুষেরা গড়ায় এবং চিরআয়ু হয়।

 

ফাল্গুনী ভট্টাচার্য

ভার্চুয়াল ক্লাসে জীবনানন্দ

করোনা-কালে নির্বাসন।
শিখছি সবাই দূরে থাকার বিধি-নিয়ম-রীতি।
ছুঁয়ো না ছুঁয়ো না ছুঁয়ো না ছি ছি
এখন কিন্তু সাংঘাতিক এ সব সম্প্রীতি…

মে-জুনের এই তপ্তদিনে শীত করছে,
কাঁপছি জ্বরে। কাঁপছে দেশ অজানা সন্ত্রাসে…
রাস্তা ফাঁকা। আড্ডা নেই।
পাশ দিয়ে কেউ পেরিয়ে গেলে ছোঁয়া লাগার ত্রাসে

নিজেরই চারধারে জড়াই বর্ম শত শত।
আপনি বাঁচলে বাপের নাম। বাপ তো কেবল কাশে!
কেউ হাসেনা। চাইছে শুধু পরিত্রাণ চাইছে উপশম।
লক্ষ্য সবার আত্মরক্ষাব্রত।

বিশুদ্ধ প্রাণবায়ুর জন্য করুণ হাহাকার
ভোররাত্রির শ্বাসকষ্টে প্রাণ ওষ্ঠাগত।
রাতের গাড়ি ভরে যাচ্ছে নাম না জানা লাশে।
তবুও হার মানবে না। লড়াই চালাচ্ছে ডাক্তার।

কলেজে পড়া রোগাটে জেদি উশ্রী নামের নদী
চাঁদ দেখেনি, গান শোনেনি কত না যুগ হল
জীবনানন্দ শুনবে বলে মোহনমায়াটানে
নটা ঊনষাটেই হাজির ভার্চুয়াল ক্লাসে…

রজতকান্তি সিংহচৌধুরী

তোমার নিকটে থাকা

তোমার নিকটে থাকা নিসর্গের সন্নিকটে থাকা

মানুষ-সমান পাটখেতের আড়ালে বুঝি ঢাকা

ভোলেনি কুলিক নদী সে-কৌলিক লোকাচার তন্ত্রের স্বভাবী

গহিন দশমী দ্বারে ছলাৎছল খোলে গূঢ় চাবি

তোমার নিকটে থাকা  বুঝি কবিতার সঙ্গে থাকা

পিচ্ছিল রোমাঞ্চঘন লতা তারা ফুল কাঁটা আঁকা 

লিরিলের ফেনা মেখে পদ্মকলি হয়েছ মসৃণ

কবিতার, প্রকৃতির কাছে তবু প্রাকৃতিক ঋণ

চুম্বনে হ্যালিটোসিস ছিল না তোমার রম্য গড়ে

আব্রহ্ম আস্বাদ শুধু পুরুষ্টু আবিষ্ট বিম্বাধরে

উড়ে গেলে রাজহংসী

            পাটের খেতের থেকে ধূসর উড়ালে 

ও পদবিক্ষেপে তবু এই বুকে আজও

                           গজগামিনী দাঁড়ালে!    

দুর্গা দত্ত

আড়বাঁশি : পঁয়ত্রিশ

তোমাকে ছুঁইনি আমি        

সেরকমভাবে কোনওদিন—

যেভাবে যেমন করে কেউ কেউ বলে:

হাতের উপরে হাত রাখা…

সেরকম ভাবে হাত থাক না-ই থাক, তবু 

তোমাকে ছুঁয়েই আমি হেঁটে যাই সন্ধেসকাল…

 

তোমার হাতের মুঠো 

অন্ধকারে কতবার খুলে খুলে 

খুঁজেছি প্রবাল!

তোমাকে বলিনি সেই 

নিশি জাগরণ পালাগান।

তোমার ছায়ায় নম্র শ্বাস ফেলে 

বাসা বেঁধে উড়ে গেছে পাখি—

জানতেও পারোনি সেই 

উত্তরকাণ্ডের লোকগাথা 

 

কখনও বলিনি তাই, ভুল করেও 

কখনও বলিনি সে কথা:

 

মাঝরাতে কখনওবা বৃষ্টির শব্দ ভেসে এলে

ঘুমের মধ্যেও কত অনায়াসে 

বিধাতার মতো এসে বুনে দিয়ে চলে যাও 

হাতের তালুর মাঝে

অন্তর্লীন জীবন রেখায়

 

মেঘবন্তী স্বপ্নবীজমালা…

গৌতম গুহ রায়

কাচের গোলক

শুকনো পাতা ও ভেজা মাটি সরিয়ে যখন      

কম্পাস উঠে আসে হাতে

তোমরা মনে করো ভূমধ্যসাগর ও তৈলকূপ,

একটা চকচকে বন্দরের বাতিঘর থেকে 

ছুড়ে দেওয়া কাঁচের গোলক, 

অনেকটা আমারই মাথার মতো

গোল, লুকিয়ে লুকিয়ে নিয়ে এলে,

ভাবলে যে আমাকেই লুকিয়ে রাখলে গোপন সিন্দুকে।

কিন্তু লবনের ছোঁয়ায় ততক্ষণে কাঁচ প্রাণ ফিরে পাচ্ছে

নেশাতুর তুমি দেখোনি। দুহাতে চেপে ধরো

ব্যক্তিগত কম্পাস, দিকভ্রান্ত আমি

তাই অন্ধকূপে পা রেখে তোমাকেই ডাকছি

‘হে বন্ধু, 

তেলকূপের কাছেই তোমাদের নৌকাডুবি হয়েছিল

ভূমধ্যসাগরে ভেসে গেছে কাচের গোলক” । 

ছবি: গনেশ পাইন

উৎসব

সুবীর সরকার

ঘোড়সওয়ারদের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই!
নদীমাতৃক এই দেশে পাড় ভাঙছে
                                নদীর।
পুরোন রাস্তার বাঁকে পালকি।
বিকেলের হাটে হাতপাখা কিনি।
আমাকে অনুসরণ করে ছাইরঙের পুতুল।
হাত তুললে দাড়িয়ে পরে এম্বুলেন্স
চারপাশে হিমঘর।
মর্গের সামনে সিগারেট খাই।
রুমালে চোখ মুছছেন আত্মীয় স্বজন।
গিটার বাজে।
চালিয়ে দেওয়া হয় গজল।
সবটাই রোমহর্ষক।
অনেক বছর পরে দেখা হচ্ছে তোমার সাথে
পাতলা হয়ে ওঠা ভুরু, কাজল হারানো
                                   চোখ!
পা থেকে খসে পড়ছে হিল।
শীতের স্টেশন থেকে ফিরি মুড়ি আর বাতাসার
                                      কাছে
মৃত্যু আসলে উৎসব, বরফের মতো
ঘোড়সওয়ারদের সাথে আমি মৃত্যুর সম্পর্ক
                                      খুঁজি!

রিমি দে

বরফ

এমনই কি এই পথ….

আগুনেরা ভেতরে ভেতরে এতই শীতল

ভয়ানক বরফের হাতল

পা থেকে খসে পড়ে নীরব নয়ন

মরণের গান থেকে ভেসে আসা ভাষায় 

প্রবল শৈত‍্যপ্রবাহের ছোঁয়া 

 

দ্বিতীয় স্তবকেও  প্রত‍্যাশা থাকে  

 

থাকেইতো….

 

যতটা আলো ভেবে অনন্তের কাছে যাওয়া

ততটাই রুদ্ধদ্বার  আরও আরও অন্ধকার 

 

বরফের ভেতর!

পারমিতা ভট্টাচার্য

হসপিটালের বাইরে

শেষ রাতে জোর বৃষ্টি, একটা শালিক দেখি
ভিজে উড়ে যায়…

শেষ রাত। অন্ধকার। স্ট্রিট লাইটের আলো    
চুপচুপে তার গায়ে;
বুঝে নিই,  ডানার জখম !
                                      বুঝি;
মৃত্যুভয় তুচ্ছ করা যে যে সম্ভাবনা
অমোঘ করেছে তার পাখার উড়াল ….

দ্যুলোক ঝলসে যায়, ঝোড়ো হুঙ্কারে
পাতা ওড়ে, ― কাঁপে ডাল… 

মনে পড়ে কত, কতবার 

দায়বদ্ধ পাখিগুলো, এভাবে আগলে সংসার !

কুমারেশ তেওয়ারী

ছুঁচসুতো

সেলাইয়ের পাঠ নিয়ে ব্যস্ত থাকি, আত্মমগ্ন হই

যেখানে যা ছেঁড়াফাটা, জাগতিক বিস্ফোরক ভ্রম

আনাড়ি আঙুলে রাখি নবিসের সেলাই প্রয়াস

আলোর পর্দার ফাটা অংশ দিয়ে জায়মান কালো

অন্ধকার, ঢুকে আসে ভাঙনের কাল স্রোত হয়ে

সেখানে সেলাই দিই তড়িঘড়ি, অমৃতজাতক

 

ছুঁচের ছিদ্রের পথে সুতো পরাবার কালে দেখি, 

ওইপারে অভিসার, বৃন্দাবন, বিনোদিনি রাই

গোপন হাঁড়িতে রাঁধে হিরণ্ময় ভাতের সুঘ্রাণ

 

বিত্রস্ত আলোকে ঠাট, বিভঙ্গের সামান্য বদল 

টেরিকাটা শ্যাম দেয় অনন্তের ফুঁয়ের নিদান

এখনও অপাপবিদ্ধ, থেকে থেকে তাহার বাঁশিটি

কঠিন আখরোটের হৃদভেজানো মর্মধ্বনি তোলে 

 

সুতোতে নিদান রেখে ছুঁচছিদ্রে সযত্নে পরাই

রাই অঙ্গ ছুঁয়ে সুতো শ্যামতনু কেমনে বেড়ায়!

মুস্তাক মুর্শেদ

উন্মার্গগামী

ছেলেটির শবদেহ কবরে শায়িত হওয়ার দিনে 

যে কান্নার রোল উঠবে তার চেয়েও মর্মভেদী

হাহাকার এখন কর্ণকুহরে ধাক্কা মারছে

 

আকাশফাটানো সমবেত ছিছিকার: 

‘ছেলেটা উচ্ছন্নে গেল

সর্বগ্রাসী সর্বনাশ তাকে ঘিরে ধরেছে’

 

অথচ ঘুটঘুটে আঁধারেও সে দিব্যি হেঁটে চলে

অন্ধ চোখের বন্ধ দরজা খুলে দেয় ময়ূরের নীল

হাত বাড়ালেই নাগাল পায় অযুত ঝর্ণার জল

টালমাটাল পায়ের পাথর সরিয়ে উঠে আসে গুহামুখ

 

কারণ তার বুকের পাঁজরে এখনও ঝাঁকে ঝাঁকে জোনাকি…

 

অন্ধকারের ভিতরে সত্যিই এত আলো থাকে!

ছবি: গনেশ পাইন

রুমা তপাদার

অজস্র ছায়ারা

সকালে উঠেই দেখি প্রথম নিজের ছায়া 

ঘোর জড়ানো চোখের মধ্যে 

ছায়া ঠিক এঁটে বসে থাকে 

জল-টল খেয়ে মুখোমুখি বসলে আড়চোখে দেখি 

ছায়াটিও বসেছে নিশ্চিন্ত।

জীবনের বেলা যত বাড়ে ছায়ারা ঘনিষ্ঠ হয়

কাছে আসে, লুটোপুটি খায়

চোখা চোখা শব্দ আঁকড়ে রেখেছি মোড়কে 

যোগনিদ্রায় জুড়িয়ে এসেছে দু’চোখ 

চোখের ছায়ারা এসে পড়েছে কপালে 

সমস্ত জড়তা জুড়ে তখন গভীর ছায়া বড় হয়, 

থোকা থোকা মায়াজাল ছিঁড়ে

শব্দেরা হড়হড় করে বার হয়ে আসে বেগে  

আকাশ ধ্বনিত হয় অজস্র ছায়ারা ডাকে…

‘মধুকৈটভ বিধ্বংসী বিধাতৃবরদে নমঃ

রূপং দেহি, জয়ং দেহি, যশো দেহি, দ্বিষো জহি।’

বদরুজ্জামান আলমগীর

কাসান্দ্রা

যার সাথে দেখা হবে কথা ছিল, সে থাকে

নদীঘোরে শামুকের পাশে।

 

তোমার ধুলা মেশে তারাদের সনে, জল খোলে

হাওয়া প্রতিমায়, রাখালিয়া লখিন্দর আগুনেদুধে

ফোটায় যাত্রাপথের রেখা, তুমি জানো-

ঢালুর সামনে কেমন মৃত আকুতির বাড়ি!

 

তুমি সুফিয়া, কাসান্দ্রা তুমি

দেখো অনাগত কাল, স্মৃতি পদাবলী;

একা বয়ে যাও  অ্যাপোলোর অভিশাপ ধ্বনি!

 

চোখে তোমার কাঁপে ডুমুর পাতা;

আমার আয়ুজুড়ে ছলাৎছল  ভাসো কালো নৌকা,

শস্যের উপর পা মেলে বসো,

মরণ ও পানকৌড়ির পাখা ঝাপটাও অশ্রুসজল হেসে

 

যার সাথে কথা ছিল- সে থাকে নদীঘোরে

শামুকের পাশে।।

শ্রীপর্ণা গঙ্গোপাধ্যায়

পর্যটন

আবিল বেদনা নদী বয়ে যায় শব্দহীন স্রোতে 

পার হয় কুসুম রঙের দিন, কুণ্ডলি পাকানো 

পথ, আহত যাপন।                          

হৃদপদ্মে অক্ষয় মোহময় কিছু পর্যটন।

পাললিক শিলা বুকে নিয়ে

 নদী যায় নিভৃত প্রবাসে,

একদিন জানলার পাশে 

জন্ম নক্ষত্রটি তাকে ডাকে।

নদীটি অদৃশ্য হয়।

বেদনা চলকে পড়ে পাত্রে অমৃতটুকু থাকে।

ফারুক ফয়সল

কবিতার জন্যে কবির অভিযাত্রা

রাজহাঁসের পালকের নরম উষ্ণতার নীচে যে মা পাতে সংসার,
তাকেও দিতে হয় ঢের নিবিষ্ট নিবিড় সময় সন্তান আকাঙ্ক্ষার।
কচি নরম তৃণ হতে পোয়াতী গোছা ধান, সবুজ শীষের ভিতর তরল দুধ
সোনা ছড়ানো শষ্য দানায় গোলা ভরতে কৃষকেরও পেরুতে হয় কষ্টকাল।

শিষ দিতে দিতে যে প্রেমিক কাঙ্ক্ষিত রমণীর খোঁপায় গোঁজে ফুল,
তাকেও তো পেরিয়ে আসতে হয় অনেক বসন্তের আকাঙ্ক্ষা সম্ভার।
কদম ফুল হাতে কলির কেষ্ট বেশে যুবক প্রহর গোণে বৃষ্টি ঝরা বর্ষার,
বরুণার জন্যে কাঙ্ক্ষিত ১০৮ টি নীলপদ্ম সংগ্রহে আজ লাগে আট বছর।

জোয়ার-ভাটারও তো লগ্ন আছে, অপেক্ষার পালা-চক্র আছে তার
চরাচর ভাসানো পূর্ণিমার আছে পনের কৃষ্ণ ও চৌদ্দ শুক্ল পক্ষ রাত
সফল মিলনস্পৃহ জোড়কে যেমন ধীর অপেক্ষায় রাখে শৃঙ্গার-শাসন
সাগর সঙ্গমাকাঙ্ক্ষায় বেগবতী নদীরও তো মোহনায় হয় স্বেচ্ছা সমর্পণ !

শরীর পাতন, নয় মন্ত্রসাধনে কবিরও তো আছে দীর্ঘ পথ পরিভ্রমণ
কাব্য লক্ষ্মীর কৃপাকল্পে আছে যজ্ঞ, আছে নিদ্রাহীন সহস্র নিশি যাপন।

 

স্বপ্না বন্দ্যোপাধ্যায়

দেবীগ্রাম

সে আমার ডিঙিমাত্র

এখন প্রবাদশহর যুবতীর চুমু 

ঘাটে ঘাটে থেমে চুমকি সরছে এক দুই তিন চার 

নিরঞ্জন হওয়ার আগেই প্রতিমা ভাসান হলো 

মাগো

থাবার নখ তালুর নরম খড় 

মাটি গলনশীল 

দেখো 

ঢেউয়ের লক্সগুছিতে মৃদু প্রেম উড়ছে 

ছকের দালানে নাবিকীয় আলো 

জাল খুলি? ডুবিয়ে দিই নর ও মাংস খাঁড়া?

ঘূর্ণিতে পিচ্ছিল ব্লেড 

ধারের ধাতু

আসন পেতেছি ডুবজলে শ্বাসের হুড়োহুড়ি

আলো 

আমাকে ধরো 

বুকের প্রজাপতি ডানা মেলার আগে 

হাল সামলাও পরমেশ্বর 

বন্যা লোহার

খাঁচা

বুকের ভিতর আকাশ আছে ।

 

হাঁ করে দেখতে দেখতে 

এক টুকরো গিলে ফেলেছি

 

এখন আকাশের নীচে

একা একা যেতে ভয় হয় 

 

প্রতিহিংসাপরায়ণ শূন্যতা

যদি একবার গিলে ফেলে  

রক্তমাংসের পৃথিবী

আমাকে বাঁচতে দেবে তো ?

তাপস কুমার রায়

ফুলডুঙড়ি

পাহাড়…
একটা কবিতার নাম।
নদী ঝর্ণা লাল কাঁকর
বারিকের দক্তা খাওয়া দাঁত
চায়ের লিকার চিনি
এসব সবই কবিতা হতে পারে।

আর
শালবন চাঁদ রাতে জোছনা মহল।
ফুলডুঙড়ির হাসি শুধু সিঁদ কাটে।

২
কাল ও আমায় পুরনো বিকেলে নিয়ে গেছিল
যেসব বিকেলে ন্যাড়া ছাদে গল্প হোতো
যেসব ছাদে যুবতীরা একা একা চুল শুকত।
ওর দাঁতের ফাঁকে জলতরঙ্গ আছে
কেউ কোনোদিন বলেনি ওকে।
ও কি কোনো কবির সাথে একলা হেঁটেছে?
জানে কি পুরনো বিকেলের নিরীহ আলোয়
কবিরা সঙ্গমকালে দূরের পাহাড়ে নিয়ে যায়
যেসব পাহাড়ে মেঘ নেমে আসে
সূর্য ঢাকা পড়ে যায় গুম্ফার প্রাচীন ঘণ্টায়।
ও কি কোনো শিল্পীর সাথে একলা হেঁটেছে?
ওর স্তন ছুঁয়ে খুঁজেছে যে সফেন সমুদ্র ঢেউ
ঠোঁট ফাঁক হলে, – সে ঠোঁটে চোখে কবির নাম?
কবি বা শিল্পী, – কোনোটাই নয়
হঠাৎই নিজেকে হো চি মিন মনে হল
আর ফুলডুঙড়ি আমার একফালি গর্ব
                       – ভিয়েতনাম।
এইযে সমুদ্র পেড়িয়ে এতদূর
ঘুমহীন রাতে বিছানায় ডুবে যেতে চাই
প্রগলভ পাহাড়ি নদী ঘুমেজাগরণে মিশে
ওর মুঠোয় ছোঁয়াই হাত নীল মেঘ খুঁজে খুঁজে।

 

ছবি: গনেশ পাইন

ভাস্কর সুতার

পাখি

বৃষ্টি ভেজা মানুষ কখনও পাখি হয় না
তথাগত, মানুষ এক জীবনে প্রিয় হয় না
মানুষ একাই দুঃখের নারী
যেন বটগাছ-
তথাগত,পাখি ভিজে গেলে মানুষের গান হয়ে ওঠে
আর মানুষ,
আর মানুষ ভিজে গেলে
একাই দুঃখের নারী

প্রত্যয়ী দত্ত

ভাত

নেশাতুর

ঘুমের মাঝে

ভাত হয়ে

নেমে আসুক

হলুদ ধানের কণা।

 

আবেশ মিঞা!

ঘুমিয়ে থাকো

 শতাব্দী জুড়ে।

স্বপ্নগুলো

গরম

ভাত হয়ে

ছড়িয়ে পড়ুক

 হাতের ওপর!

 

 

জেগে উঠো না

আবেশ মিঞা!

আবেশ মিঞা!

আবেশ মিঞা!!

অনিকেশ দাশগুপ্ত

নান্দনিক

যখনই পায়ে-পায়ে জড়ায় নিকষ সসার
কাকতালীয় ক্যাথলিক ঠায় দাঁড়িয়ে দেখে
              ওই যে তার রৌদ্রবাগান

গির্জার নতমুখ নিয়নে বিগত নগর এখন ঝাড়া হাত-পা
আশ্রমের মৃত মাছ শব্দের আঁশ ছাড়াতে -ছাড়াতে
চলে গেছে নীল পাহাড়ের এরিওলায়

কাঁটা গাছের যৌন অবদমনে হোঁচট খায় রাত্রিকালীন অটো
উদ্দীপ্ত মসলিন ও ফ্লাইওভারে জড়ানো গণিকার এহেন তামস

শ্বেত অশ্বেরা দোলাচলে নীচে নেমে আসে
ভাগাড়ের দোদুল্যমান জ্যোৎস্না ও পরিশ্রুত কাচে ভর ক’রে
পাঁচটি কড়ি সকালের মধু হরফে ডুবে থাক

নগর অভিমুখে বিস্রস্ত বিজ্ঞাপনের পাশে
ওড়ে আরও সতেজ কোনও নদী

 

সিদ্ধার্থ ঘোষ

ছায়া

আঙুলের মতো বাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে

আড়ালে ছায়া নিয়ে কারসাজি!

অন্ধকারে ছায়া গাঢ়, ছায়ারা মেলে

গোল উলের বলের মতো গড়িয়ে যায়…

টান দিয়োনা; খেই হারিয়ে ফাঁস!

ফাঁস গণিতে হাতে রইল উপহার জন্মপত্র

জন্মপত্রে অন্ধ-জীবন কারণ অলিখিত।

দিনের আলোয় –

প্রচ্ছায়াময় জন্মকারণ বাড়ে কমে, দিক পাল্টায়

তীব্র প্রচ্ছায়া ঘিরে উপচ্ছায়া, দাম্পত্য

সে পাশে থাকে…

প্রচ্ছায়ার সাথে নড়ে, বাঁকে, খেলে, খাই

কিন্তু মেশে না!

মৃত্যুর সম্ভবত কারণ সবার জানা –

জ্বালাতে লুকিয়ে জন্ম-রহস্য কাহিনী

সবাই সতর্ক সাবধানী; পা আগে চলে…

 

বিড়ালের মতো ছায়ারও কি তবে আগুনে ভয়?

অর্ঘ্য দত্ত

এয়ো

তোমাকে দেখিনি ভাল করে, কতকাল
লাবণ্য ঝরিয়ে ফেলে, কবে যেন খুঁটে
নিয়েছ পারদ বিষ, আয়না বিধবা আজ, অন্ধ উপোবাসী
 
কবন্ধ ললাটে তোর কাটাকুটি রেখা আর ধূসর ইঙ্গিত
ফুটে ওঠে গোধূলির মুখ-চোরা নক্ষত্র যেমন
চোখের তারায় জমে আলোহীন মেঘ-মালবিকা
 
একদিন মাধুকরী সেরে ফিরে  এসে
আমিও দাঁড়াই ফের, অপরাধী বৃক্ষ, নতশির
স্মৃতিভ্রষ্ট শিকড়ের কাছে…
 
একাদশী সমাপন করে তোমার সিঁদুর-মুখ 
যেন পূর্ণচন্দ্র এয়ো, ধীর পায়ে আমার শাখায় এসে বসে…

অবশেষ দাস

সোনালী হিজল ও ভরা আশ্বিন

একজন মানুষ খুঁজছি।
জীবনের ভেতর থেকে বুভুক্ষু লাউমাচাটা নামিয়ে দেবে।
 
খাঁচা ভাঙতে গিয়ে রক্তাক্ত হয়েছি, বারবার
খাঁচা ভেঙে দিতেই হবে।
 
বটগাছের গভীর ছায়ার মতো সোনাঝুরি নির্ভরতা 
বিশ্বাস, মুগ্ধতা,স্বপ্ন ও ভালবাসা
এক টুকরো শান্তিনিকেতন হাতে তুলে দেবে।
 
আশ্বিনের আকাশে শৈশবের স্বাধীনতার মতো এক ঝাঁক পাখি
শারদীয়া রোদ্দুরে অসীমের আনন্দ  খেলা করে।
 
আমাকেও হয়তো কেউ এইভাবে খুঁজছে।
 
 
ঘরকন্নার শব্দ শূন্য
গৃহস্থের কলসিতে ভাত-কাপড়ের দাবি নেই।
 
সদ্য বিধবার খালি হাতের মত নির্জন 
প্রেম শূন্য শব্দ শূন্য পৃথিবী একজন মানুষ দাও।
 
পোস্ট মাস্টারের নিঃসঙ্গ অক্ষরবৃত্তে রূপশালী ধানের মায়ার মত রতনের ভালবাসা ছিল।
 
সোনালী হিজল গাছের পাশ দিয়ে একটা নদী চলে গেছে।
আমি নতজানু হয়ে ওই নদীর কাছে বললাম, একজন মানুষ খুঁজছি।
 
নদী বলল, খুঁজে যাও। 
 
অনন্ত কাল ধরে খুঁজে যাও। তুমি-ই তাকে পাবে।
 
 

তমাল বন্দ্যোপাধ্যায়

মলিন ধারণাজন্ম

কে যেন জানিয়ে গেল, এই পথ তত স্থির নয়।
এখন সময় হল, অপেক্ষার শ্মশানপুটুলি—
নামাও হে বৃক্ষভার, খুলে দাও দূরবার্তাদেশ…
এসো হে পিঞ্জর! আজ রুক্ষ্মমাটি খুঁটে-খুঁটে তুলি।

কে যেন জানিয়ে যায়, অপেক্ষার মৃত্যুভরা দেশ
ডেকেছে চাঁদের গন্ধ, ধুলোমাটি, যা-কিছু প্রাচীন।
সমস্ত অপেক্ষা খুলে দুয়ারের যত নীরবতা,
এসো হে দূরত্ব! আজ আগামীর নিতয়িতে বাঁচি।

এসো যত অগ্রহার, এসো স্তব্ধ বনপথে একা
নামিয়ে শ্মশান-মায়া বাতাসের সন্নিকটে আসি।
দেখি, কে ধরেছে নাম, সঙ্গোপনে কে-বা ওই দূরে
অস্থির অরণ্যপথে অসময়ে বাজিয়েছে বাঁশি।

কে যেন চিনিয়ে দেবে অতিদূর সমাধিফলক…
তাহার অপেক্ষা নিয়ে বাঁশি, তোর কথা সত্যি হোক।

বঙ্কিম লেট

কমল

দয়াল, করুণা করো, মোহান্ধ প্রহর কাটে

যা যা শিখেছি এখন সব ভুলে যেতে চাই

তারপর সরোবরে যেভাবে কমল ফোটে

সেইভাবে একদিন ফুটে উঠতে চাই !

 

 

অমিত সাহা

বিশ্বাস-বঞ্চনা

সব যুক্তি তর্কনিষ্ঠ হলে ধুলোরা কোথায় যাবে?

যে বিশ্বাস গোধূলিনির্ভর সেখানে কোথায় সূর্য?

বিশ্বময় বিশ্বাস-বঞ্চনা…

তবু

অপেক্ষা সারিয়ে তোলে

            জেগে থাকার যন্ত্রণা,

ধুলোর বিশ্বাসমতে

            কান্না পেলে কাদা হয় পথ।

বিশ্বাস আর বঞ্চনা উভয়ে নদীর কাছে সৎ !

 

 

বিভাস রায়চৌধুরী

কবিতা জগৎ

‘না’ থেকে বেরিয়ে এসো 

 

‘না’ তোমাকে কিছুই দেবে না 

 

সাধনার নামে ডেকে নিয়ে 

সে খায় তরুণ, তীব্র কবির কলিজা রোজ… 

 

‘না’ এক রাক্ষস! 

 

‘কিন্তু’ও আশ্রয় নয় 

 

সে বলবে, না-কবিতা একদম বাজে… 

কিন্তু-কবিতাই হল পৃথিবীর মুখ…

 

প্রতি বাক্যে কিন্তু-ব্যবহার 

‘কিন্তু’র অসুখ!

সুন্দরের চোখ নষ্ট হয়ে যাবে… 

 

পালাচ্ছ তরুণ কবি? 

এদিকে এসো তো একবার! 

জলে-জলে, নদীতে-জঙ্গলে… 

ওই দেখো শ্রমজীবী মানুষের গায়ে 

তারাদের ধুলো হয়ে ‘হ্যাঁ’ জেগে আছে… 

 

তুমি ‘হ্যাঁ’-র কাছে থাকো…

ভালবাসাটির পায়ে ডিঙি বেঁধে চুপচাপ 

বসে থাকো কিছুক্ষণ শুধু…

জেনে যাবে পৃথিবী হ্যাঁ-কবি!

জেনে যাবে কবিতার নেই কোনও সীমা…

 

চাঁদ উঠবে একটু পরেই 

 

আজ পূর্ণিমা…

হ্যাঁ-পূর্ণিমা!

ছবি: গনেশ পাইন

বারো পর্বের ধারবাহিক

“ঘরের কাছে আরশিনগর”

পর্ব-১২

নীলকণ্ঠ-পদাবলি মনে পড়ে

রামানুজ মুখোপাধ্যায়

গ্রামের নাম ধবনি। চারপাশে ছিল ধবল গাছের বন। তারই মাঝে রাঢ় বঙ্গের একটি গ্রাম। সুকুমার সেন ‘বাংলার স্থাননাম’ বইটিতে জানিয়েছিলেন, ‘ধব গাছের ছোট বন’ থেকে এ-গ্রামের ‘ধবনি’ নামটি এসেছে। সেখানে যাওয়ার পথ ছিল দুর্গম। অথচ, দুর্গাপুর স্টেশন থেকে এর দূরত্ব পনেরো কিলোমিটারের মধ্যেই। জাতীয় সড়কে মুচিপাড়া থেকেও যাওয়া যাবে। পুবে লবনাপাড়া, উত্তরে কাঁটাবেড়িয়া গ্রামগুলিতে এখনও তেমন একুশ শতকের আলো ফোটেনি। ধবনির দক্ষিণ-পশ্চিমে তিরতির করে বয়ে চলেছে ক্ষীণতোয়া কুনুর। খনিশহর রানিগঞ্জ পর্যন্ত রেল লাইন বসেছিল উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে, গড়ে উঠেছিল দুর্গাপুর রেলওয়ে স্টেশন। জিটি রোড তো কত কালের প্রাচীন। এত দীর্ঘ সময় পরেও, ব্যক্তিগত উদ্যোগ ছাড়া এই ছায়া-সুনিবিড় গ্রামগুলিতে পৌঁছনোর সহজ কোনো উপায় নেই। এই ধবনি গ্রামেই ১৮৪২-এ (১২৪৮ বঙ্গাব্দের ৬ বৈশাখ) জন্মেছিলেন কৃষ্ণযাত্রার প্রাণপুরুষ নীলকণ্ঠ মুখোপাধ্যায়। ১৮৪২-এ তো বটেই, ১৮৬০-এ উনিশ বছর বয়সে যখন প্রথম নিজের গানের দল গড়েছিলেন নীলকণ্ঠ, তখনও এ-গ্রাম ছিল বীরভূম জেলার অন্তর্ভুক্ত। এখন গ্রামটি পশ্চিম বর্ধমানে।
 
নীলকণ্ঠের নিজের দলের গান প্রথম অনুষ্ঠিত হয়েছিল কাঁকসার নিকটবর্তী সোঁয়াই গ্রামে। পানাগড় শহর থেকে এর দূরত্ব সামান্য। সোঁয়াইয়ের অন্নদাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ছিলেন সম্পন্ন ভূস্বামী। তাঁদের বাড়িতেই ১২৬৭ বঙ্গাব্দের (১৮৬০ খ্রি.) অগ্রহায়ণে অন্নপূর্ণা পুজো উপলক্ষে বসেছিল নীলকণ্ঠের গানের আসর। সেই শুরু। তারপর প্রায় অর্ধ শতাব্দী জুড়ে তিনি গানে-গানে বহু মানুষের মন জয় করেছিলেন। সাহিত্যরত্ন হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন, উনিশ শতকের শেষ আর বিশ শতকের গোড়ায় অখণ্ড বাংলার এমন কোনো শহর নেই, এমন কোনো হিন্দু রাজা-মহারাজার নাটমন্দির নেই, এমন কোনো হিন্দুপ্রধান সম্পন্ন পল্লি ছিল না যেখানে কণ্ঠমশায়ের গান সমাদৃত হয়নি। এমনকী, কাশী-বৃন্দাবন-নবদ্বীপেও ছিল তাঁর গানের আশ্চর্য সমাদর।
 
নীলকণ্ঠ কোনো বিদ্যালয়ে পড়েননি। পাঠশালাতেও না। সামান্য বাংলা লিখতে-পড়তে শিখেছিলেন বাবার কাছে। কুলীন ব্রাহ্মণের ঘরে মা-ঠাকুমাদের মুখে-মুখে পৌরাণিক আখ্যান-মহাকাব্যের কথা শুনেছিলেন। বাড়িতে শাস্ত্রচর্চা ছিল। আর ছিল নীলকণ্ঠের মধুক্ষরা কণ্ঠসুধা। বাল্যকালে তিনি ধবনি গ্রামের ভূস্বামী ব্রজনাথ রায়কে নিয়মিত রামায়ণ পড়ে শোনাতেন। বড়োবেলায় কীর্তনের রাগ-তাল শিখেছিলেন নিত্যানন্দ বংশের রাধারমণ গোস্বামীর কাছে। পড়েছিলেন বৈষ্ণব শাস্ত্র। চণ্ডীদাস-বিদ্যাপতির পদ, চৈতন্য জীবনীকাব্য, গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনের আকরগ্রন্থগুলি। ছোটোবেলায় নীলকণ্ঠ গান শিখেছিলেন গোপালচন্দ্র রায়ের যাত্রার দলে। গোপালচন্দ্র ছিলেন ধবনির পাশের গ্রাম জামবনের মানুষ। সেখান থেকে একে-একে গঙ্গানারায়ণ রায়-গোবিন্দ অধিকারীর যাত্রার দলে গান গাওয়ার অভিজ্ঞতা। অবশেষে মাস ছয়েকের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় নিজের দল। ছোটো আসরে এমন দেখা যেত, ডাঙার মাঝখানে টাঙানো আছে একখানি চাঁদোয়া, চারদিকে খোলা মাঠে বসে আছেন শ্রোতারা, মাঝে কয়েকজনমাত্র গাইয়ে-বাজিয়েকে সঙ্গে নিয়ে গাইছেন কণ্ঠমশায়। প্রথম-প্রথম তিনি দূতী সাজতেন। শেষ দিকে কাঁধে একখানি নামাবলী রেখে গাইতেন নিজের গান। এই বিবরণ পড়লে রোমাঞ্চ হয়: ‘লোক তন্ময় হইয়া গান শুনিতেছে, তিনি তাহাদিগকে হাসাইতেছেন, কাঁদাইতেছেন, মাতাইতেছেন, লোকে উচ্চকণ্ঠে হরিধ্বনি তুলিয়া আনন্দ প্রকাশ করিতেছে। আসরে মৃদঙ্গ, মন্দিরা, ঢোল, তবলা বাঁয়া হারমোনিয়াম ও বেহালা আর সামান্য পোষাক পরিচ্ছদ মাত্র সম্বল।’ গোবিন্দ অধিকারীকেই গুরু বলে স্বীকার করেছিলেন নীলকণ্ঠ। বর্ধমানের মহারাজা মহতাপচাঁদের আনুকূল্য তাঁকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল। হেতমপুরের মহারাজা মহিমানিরঞ্জন চক্রবর্তী তাঁকে দিয়েছিলেন একশো বিঘে ভূসম্পত্তি। নীলকণ্ঠের ‘বাল্যকাহিনী’ বইটিতে আছে মহারাজা মহিমানিরঞ্জনের কথা। এ-বই কয়েক বছর আগেই নতুন করে ছাপা হয়েছে।
 
উনিশ শতকের বহু কৃতী মানুষ মুগ্ধ হয়েছিলেন নীলকণ্ঠের গানে। তারাশঙ্কর-বিভূতিভূষণের লেখায় যেমন তাঁর গানের কথা আছে, তেমনি রামকৃষ্ণ-কথামৃতেও আছে তাঁর উল্লেখ। ‘তিনি শান্তিনিকেতনের বার্ষিক মেলায় অনেকবার গান করিয়াছিলেন এবং রবীন্দ্রনাথ তাঁহার সে যাত্রা-গান শুনিয়াছিলেন’ — এ-কথা লিখেছিলেন আমাদের সাহিত্যের ইতিহাসকার সুকুমার সেন। অবশ্য ‘শারোদোৎসব’ নাটকে তিনি যে-নীলকণ্ঠের কৃষ্ণযাত্রার প্রভাব দেখতে চেয়েছিলেন, তা সংশয়ের অতীত নয়। শুধু কৃষ্ণকীর্তন-যাত্রাপালায় নয়, শাক্ত পদ রচনায় তাঁর কৃতিত্বও উজ্জ্বল। আছে গার্হস্থ্য-বিষয়ক কত গান। ১৯১২-র  (১৩১৯-এর ১৯ শ্রাবণ/ এ-নিয়ে বিতর্কের অবকাশ আছে) বর্ষায় তিনি প্রয়াত হয়েছিলেন। এত জনপ্রিয়তার পরেও জীবিতকালে তাঁর গানগুলি সংকলিত হয়নি। ১৯২৭-এ হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন: ‘কণ্ঠের গানের একটী ভাল সংস্করণ প্রকাশিত হইলে বাঙ্গালা সাহিত্যের সম্পদ বৃদ্ধি হইবে।’ পরবর্তীকালে তাঁর গানগুলিকে একসূত্রে গেঁথেছিলেন কৃষ্ণচন্দ্র গুপ্ত, মহেন্দ্র গুপ্ত, নন্দলাল শীল প্রমুখ। ড. গোপেশচন্দ্র দত্তের ‘কৃষ্ণযাত্রা ও নীলকণ্ঠ মুখোপাধ্যায়’ (১৯৭৫) বইটি তাঁকে নিয়ে প্রথম গবেষণামূলক কাজ। সে-বইয়ের মুখবন্ধ লিখেছিলেন সুকুমার সেন। সেখানে সংকলিত হয়েছিল নীলকণ্ঠের বেশ কিছু পদ। মধুসূদন মুখোপাধ্যায়-সম্পাদিত ‘সহজিয়া’ পত্রিকায় (ষষ্ঠ বার্ষিক সংকলন ২০১০) মুদ্রিত হয়েছিল নীলকণ্ঠের একশোটি গান। সংকলক শ্যামল বেরা। তাঁরই সম্পাদনায় (‘সহজিয়া’, দশম বার্ষিক সংকলন ২০১৪) প্রকাশিত হয়েছিল ‘মান’ নামে নীলকণ্ঠের একটি কৃষ্ণযাত্রার পালা। নীলকণ্ঠের আরও দু-তিনটি কৃষ্ণযাত্রার পালাও (যেমন- ‘চণ্ডালিনী উদ্ধার’, ‘মাথুর’) তিনি সম্পাদনা করেছেন, এখনও সে-গুলি পড়ার সুযোগ আমাদের হয়নি। ড. সুশীল ভট্টাচার্যও প্রকাশ করেছিলেন কণ্ঠগীতির সংকলন। ‘বীরভূম-বিবরণ’ গ্রন্থে হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ই প্রথম নীলকণ্ঠের জীবনকথা প্রকাশ করেছিলেন। নীলকণ্ঠ-পদাবলি নিয়ে যতদিন চর্চা হবে, ততদিনই হরেকৃষ্ণর লিখনের গুরুত্ব অক্ষুণ্ণ থাকবে। তার কারণ, সে-জীবনকথা লেখা হয়েছিল স্বয়ং নীলকণ্ঠের কাছে শুনে। অপূর্ণ অংশগুলি পূরণ করে নেওয়া হয়েছিল নীলকণ্ঠের প্রিয়তম পুত্র কমলাকান্ত মুখোপাধ্যায়ের সহায়তায়। হরেকৃষ্ণর লেখা ‘কৃষ্ণযাত্রা ও নীলকণ্ঠ’ প্রবন্ধটির কথাও এ-প্রসঙ্গে মনে আসে। ২০১৫-র রথযাত্রায় নীলকণ্ঠ মুখোপাধ্যায়ের অন্যতম উত্তরপুরুষ দেবদাস মুখোপাধ্যায়ের উদ্যোগে এবং ড. ফণী পালের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে ‘নীলকণ্ঠ মুখোপাধ্যায়ের জীবন কথা ও পদাবলী সংগ্রহ’ বইটি। নীলকণ্ঠের প্রায় সাড়ে চারশোরও বেশি গান সেখানে সংকলিত হয়েছে। এতকাল পরে দুর্লভ এই গানগুলি সংগ্রহ করার সংকট অনেক। মুখে-মুখে বদলে গিয়েছে কথা। বিকৃত হয়েছে কত গান। শোধনের তো উপায় নেই। বইয়ের গোড়ায় ‘নীলকণ্ঠের জীবন কথা ও সঙ্গীত সাধনা’ নামে একটি দীর্ঘ গদ্য যুক্ত করেছেন সম্পাদক ফণী পাল। ভূমিকায় ‘বীরভূম-বিবরণ’ বইটির নাম উল্লেখ করেছেন। এমন কথাও লিখেছেন: হরেকৃষ্ণর লেখায় ‘কাঙ্ক্ষিত সব তথ্যের সন্ধান পাওয়া যাবে না’। অথচ, সব চেয়ে বড়ো বিস্ময়ের কথা, সম্পাদক নিজে-যে ‘বীরভূম-বিবরণ’ পড়েছেন তার সাক্ষ্য কোত্থাও নেই। ফণী পালের লেখায় এমন অনেক বিচ্যুতি আছে যা ‘বীরভূম-বিবরণ’ বইটি পড়া থাকলে কোনোভাবেই ঘটত না। কেননা, ‘বীরভূম-বিবরণ’-এ সেই কথাগুলিই লেখা হয়েছিল যা নীলকণ্ঠ নিজে হেতমপুরের রাজকুমার মহিমানিরঞ্জন চক্রবর্তীকে শুনিয়েছিলেন। দুর্ভাগ্যের কথা, নীলকণ্ঠের উত্তরাধিকারীরা ফণী পালের এই লেখাকে অনুমোদন করেছেন শুধু নয়, প্রকাশও করেছেন।
 
আমাদের গ্রামে আশৈশব নীলকণ্ঠের গান শোনার সুযোগ ছিল। কার্তিক মাস জুড়ে তমসাচ্ছন্ন ঊষায় গ্রামের পথে-পথে টহল দিতেন দীনবন্ধু দাস বৈরাগ্য। তাঁর খোলা গলায়, কণ্ঠগীতির মাধুর্যে, জেগে উঠত নবীন সূর্যের আভা। দেখতাম, উদার গলায় ‘হরি দুখ দাও যে-জনারে’ গানটি গাইতে-গাইতে দৈনন্দিন কাজে চলেছেন তপন চট্টোপাধ্যায়। গ্রামের আসরে এ-গান গাইতেন আমাদের আরও একজন প্রিয় গায়ক আনন্দ দাস বাউল। সাইকেলের হ্যান্ডেলে একটি মলিন থলি ঝুলিয়ে অজয়ের ওপারের গ্রাম উদয়পুর থেকে আসতেন ব্রজ মাস্টার। ঘরের দাওয়ায় বসে গাইতেন ‘আমি যখন আমি নই মন আর মরণে ভয় কি আছে’। বিশ শতকের গোড়ায় হরেকৃষ্ণ লিখেছিলেন: ‘আজিও হেথায় প্রতি প্রভাতে পল্লীবৃদ্ধের মুখে প্রথম ভাষা দেয় এই গান, জননী তাহার শিশুর দোলার তালে তালে আবৃত্তি করেন এই গান। . . . এ গান নিরালা পথের পথিকের সঙ্গী, ভিখারীর জীবিকার অবলম্বন, দুঃখীর সান্ত্বনা, পল্লী বৈঠকের অনাবিল আমোদের উৎস।’ এখন ইউটিউবের দৌলতে আপনারা চাইলেই শুনতে পাবেন আনন্দ দাস বাউলের গলায় ‘হরি দুখ দাও যে-জনারে’ (এ-গান গৌরক্ষেপা-পবন দাস-মিমলু সেনও গেয়েছেন), বনমালী দাস বাউলের গাওয়া ‘হরি তোমার সর্বরূপ মাতৃরূপ সার’। স্বল্পশ্রুত বেশ কিছু কণ্ঠগীতি গেয়েছিলেন তারক দাস বাউল। এখনও নীলকণ্ঠ-পদাবলি গাইছেন কেঁদুলির বাউল লক্ষ্মণ দাস, কিংবদন্তিপ্রতিম গায়ক অনাথবন্ধু ঘোষ। চাইলে ইউটিউউবের সৌজন্যে সে-সবও শোনা যাবে। নীলকণ্ঠ-জীবনকথা নিয়ে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন দুর্গাপুরের কাছে আড়া গ্রামের সুপরিচিত গীতিকার অশোক চট্টরাজ, দেখা যাবে তা-ও। শরতের আকাশে মেঘের পানসি ভাসলে, শিউলি ফুটলে, আজও মনে পড়ে অজয়ের কূলে কাশের বনে কে যেন গাইছেন কণ্ঠমশায়ের এই আগমনী: ‘গা তোল, গা তোল উমা, রজনী প্রভাত হল’।
 
 
 
 
 
 

ছবি: গনেশ পাইন

পূর্ববর্তী সংখ্যা