সাপ্তাহিক কবিতা আশ্রম, ২৩ আশ্বিন ১৪২৮
শরৎ সংখ্যা
ছবি: গনেশ পাইন
নির্মল হালদার
পানকৌড়ির ডুব
মুখের বিড়িটা ছুঁড়ে দিয়ে
হারু খুড়া বলে, কিসে কি আছে রে
আজ মরলে কাল দুদিন—
আমি তাই উপর দিকে চেয়ে আছি,
যদি নতুন তারার জন্ম দেখতে পাই।
আলো দেখতে পাই।
২
আমরা চার ভাই চারটে গাছ
তিনটে গাছ উড়ে গেলে, আমি একটা ভাই
খুদকুঁড়ো খুঁজতে খুঁজতে নিজেকে খুঁটে খাই।
নিজেকে ছিঁড়েখুঁড়েও খুঁজি
যদি দাদাদের দেখতে পাই, যদি হাত পেতে বলতে পারি,
দে আমাকে আদর দে।
সন্মাত্রানন্দ
চক্ষুদান
আমার এ দুটি চোখ
এই চোখে তোমাকে দেখেছি
দেখেছি দু:খের কতো মুখ
কতো সুখ সবুজ ঘাসের মতো হয়েছে হলুদ।
চোখ তবু সাদা রয়ে যায়
শেষে চোখ অস্পষ্ট ধূসর।
আগুনে পোড়াবো কেন?
দিয়ে যাব মৃত্যুর আগে
আমার এ চোখ দুটি
যদি কারও কোনো কাজে লাগে।
তখন আমার চোখে আরেক মানুষ
দেখে নেবে পৃথিবীর রূপ।
চাঁদের বাটিতে ওথলানো জ্যোৎস্নার সর।
বেদন রোদন যতো, মানুষের শিশুদের মুখ
আকাশ অপরাজিতা, কলমিলতায় ঘেরা ঘর,
দ্বীপের ভিতরে কোনো স্তব্ধবাক সুনিবিড় বন,
প্রত্নমানবী তুমি, তুমিও তো তাতে ধরা দেবে…
এ তখন চোখ নয়, এ তখন আয়ত নয়ন।
রণবীর দত্ত
বাবু মল্লিকের বাড়িতে
অঙ্কুরিত গমবীজের রস বাবু মল্লিকের নিম ফরমাস
এখন গোটা সকালবেলা কেবলই ফলাহার তার
চৈত্রের দুপুরের শুকনো পাতার মাঝেও জেগে উঠে
নিমগ্ন হয়ে পুরোহিতের মতো বসে আছে দেখি গিয়ে
অনেক অনেক সফলতার পর মাসিমাকে দেখি
আমি বাবু আর বাবুর বউ সৌন্দর্যের চমক লাগিয়ে দিয়েছে
ওদের প্রেসক্রিপশন মতো ফলাহার ভোরের রৌদ্রের আকাশ
অনেক মারণব্যধির থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে
পৃথিবীর নরম আলোকে তারা পৌঁছে যাবেই এবং
আমাকেও সঙ্গে নেবে একান্তই আপন মানুষ ভেবেই
ঘ্রাণ আছে জেনেই মানুষেরা গড়ায় এবং চিরআয়ু হয়।
ফাল্গুনী ভট্টাচার্য
ভার্চুয়াল ক্লাসে জীবনানন্দ
করোনা-কালে নির্বাসন।
শিখছি সবাই দূরে থাকার বিধি-নিয়ম-রীতি।
ছুঁয়ো না ছুঁয়ো না ছুঁয়ো না ছি ছি
এখন কিন্তু সাংঘাতিক এ সব সম্প্রীতি…
মে-জুনের এই তপ্তদিনে শীত করছে,
কাঁপছি জ্বরে। কাঁপছে দেশ অজানা সন্ত্রাসে…
রাস্তা ফাঁকা। আড্ডা নেই।
পাশ দিয়ে কেউ পেরিয়ে গেলে ছোঁয়া লাগার ত্রাসে
নিজেরই চারধারে জড়াই বর্ম শত শত।
আপনি বাঁচলে বাপের নাম। বাপ তো কেবল কাশে!
কেউ হাসেনা। চাইছে শুধু পরিত্রাণ চাইছে উপশম।
লক্ষ্য সবার আত্মরক্ষাব্রত।
বিশুদ্ধ প্রাণবায়ুর জন্য করুণ হাহাকার
ভোররাত্রির শ্বাসকষ্টে প্রাণ ওষ্ঠাগত।
রাতের গাড়ি ভরে যাচ্ছে নাম না জানা লাশে।
তবুও হার মানবে না। লড়াই চালাচ্ছে ডাক্তার।
কলেজে পড়া রোগাটে জেদি উশ্রী নামের নদী
চাঁদ দেখেনি, গান শোনেনি কত না যুগ হল
জীবনানন্দ শুনবে বলে মোহনমায়াটানে
নটা ঊনষাটেই হাজির ভার্চুয়াল ক্লাসে…
রজতকান্তি সিংহচৌধুরী
তোমার নিকটে থাকা
তোমার নিকটে থাকা নিসর্গের সন্নিকটে থাকা
মানুষ-সমান পাটখেতের আড়ালে বুঝি ঢাকা
ভোলেনি কুলিক নদী সে-কৌলিক লোকাচার তন্ত্রের স্বভাবী
গহিন দশমী দ্বারে ছলাৎছল খোলে গূঢ় চাবি
তোমার নিকটে থাকা বুঝি কবিতার সঙ্গে থাকা
পিচ্ছিল রোমাঞ্চঘন লতা তারা ফুল কাঁটা আঁকা
লিরিলের ফেনা মেখে পদ্মকলি হয়েছ মসৃণ
কবিতার, প্রকৃতির কাছে তবু প্রাকৃতিক ঋণ
চুম্বনে হ্যালিটোসিস ছিল না তোমার রম্য গড়ে
আব্রহ্ম আস্বাদ শুধু পুরুষ্টু আবিষ্ট বিম্বাধরে
উড়ে গেলে রাজহংসী
পাটের খেতের থেকে ধূসর উড়ালে
ও পদবিক্ষেপে তবু এই বুকে আজও
গজগামিনী দাঁড়ালে!
দুর্গা দত্ত
আড়বাঁশি : পঁয়ত্রিশ
তোমাকে ছুঁইনি আমি
সেরকমভাবে কোনওদিন—
যেভাবে যেমন করে কেউ কেউ বলে:
হাতের উপরে হাত রাখা…
সেরকম ভাবে হাত থাক না-ই থাক, তবু
তোমাকে ছুঁয়েই আমি হেঁটে যাই সন্ধেসকাল…
তোমার হাতের মুঠো
অন্ধকারে কতবার খুলে খুলে
খুঁজেছি প্রবাল!
তোমাকে বলিনি সেই
নিশি জাগরণ পালাগান।
তোমার ছায়ায় নম্র শ্বাস ফেলে
বাসা বেঁধে উড়ে গেছে পাখি—
জানতেও পারোনি সেই
উত্তরকাণ্ডের লোকগাথা
কখনও বলিনি তাই, ভুল করেও
কখনও বলিনি সে কথা:
মাঝরাতে কখনওবা বৃষ্টির শব্দ ভেসে এলে
ঘুমের মধ্যেও কত অনায়াসে
বিধাতার মতো এসে বুনে দিয়ে চলে যাও
হাতের তালুর মাঝে
অন্তর্লীন জীবন রেখায়
মেঘবন্তী স্বপ্নবীজমালা…
গৌতম গুহ রায়
কাচের গোলক
শুকনো পাতা ও ভেজা মাটি সরিয়ে যখন
কম্পাস উঠে আসে হাতে
তোমরা মনে করো ভূমধ্যসাগর ও তৈলকূপ,
একটা চকচকে বন্দরের বাতিঘর থেকে
ছুড়ে দেওয়া কাঁচের গোলক,
অনেকটা আমারই মাথার মতো
গোল, লুকিয়ে লুকিয়ে নিয়ে এলে,
ভাবলে যে আমাকেই লুকিয়ে রাখলে গোপন সিন্দুকে।
কিন্তু লবনের ছোঁয়ায় ততক্ষণে কাঁচ প্রাণ ফিরে পাচ্ছে
নেশাতুর তুমি দেখোনি। দুহাতে চেপে ধরো
ব্যক্তিগত কম্পাস, দিকভ্রান্ত আমি
তাই অন্ধকূপে পা রেখে তোমাকেই ডাকছি
‘হে বন্ধু,
তেলকূপের কাছেই তোমাদের নৌকাডুবি হয়েছিল
ভূমধ্যসাগরে ভেসে গেছে কাচের গোলক” ।
ছবি: গনেশ পাইন
উৎসব
সুবীর সরকার
ঘোড়সওয়ারদের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই!
নদীমাতৃক এই দেশে পাড় ভাঙছে
নদীর।
পুরোন রাস্তার বাঁকে পালকি।
বিকেলের হাটে হাতপাখা কিনি।
আমাকে অনুসরণ করে ছাইরঙের পুতুল।
হাত তুললে দাড়িয়ে পরে এম্বুলেন্স
চারপাশে হিমঘর।
মর্গের সামনে সিগারেট খাই।
রুমালে চোখ মুছছেন আত্মীয় স্বজন।
গিটার বাজে।
চালিয়ে দেওয়া হয় গজল।
সবটাই রোমহর্ষক।
অনেক বছর পরে দেখা হচ্ছে তোমার সাথে
পাতলা হয়ে ওঠা ভুরু, কাজল হারানো
চোখ!
পা থেকে খসে পড়ছে হিল।
শীতের স্টেশন থেকে ফিরি মুড়ি আর বাতাসার
কাছে
মৃত্যু আসলে উৎসব, বরফের মতো
ঘোড়সওয়ারদের সাথে আমি মৃত্যুর সম্পর্ক
খুঁজি!
রিমি দে
বরফ
এমনই কি এই পথ….
আগুনেরা ভেতরে ভেতরে এতই শীতল
ভয়ানক বরফের হাতল
পা থেকে খসে পড়ে নীরব নয়ন
মরণের গান থেকে ভেসে আসা ভাষায়
প্রবল শৈত্যপ্রবাহের ছোঁয়া
দ্বিতীয় স্তবকেও প্রত্যাশা থাকে
থাকেইতো….
যতটা আলো ভেবে অনন্তের কাছে যাওয়া
ততটাই রুদ্ধদ্বার আরও আরও অন্ধকার
বরফের ভেতর!
পারমিতা ভট্টাচার্য
হসপিটালের বাইরে
শেষ রাতে জোর বৃষ্টি, একটা শালিক দেখি
ভিজে উড়ে যায়…
শেষ রাত। অন্ধকার। স্ট্রিট লাইটের আলো
চুপচুপে তার গায়ে;
বুঝে নিই, ডানার জখম !
বুঝি;
মৃত্যুভয় তুচ্ছ করা যে যে সম্ভাবনা
অমোঘ করেছে তার পাখার উড়াল ….
দ্যুলোক ঝলসে যায়, ঝোড়ো হুঙ্কারে
পাতা ওড়ে, ― কাঁপে ডাল…
মনে পড়ে কত, কতবার
দায়বদ্ধ পাখিগুলো, এভাবে আগলে সংসার !
কুমারেশ তেওয়ারী
ছুঁচসুতো
সেলাইয়ের পাঠ নিয়ে ব্যস্ত থাকি, আত্মমগ্ন হই
যেখানে যা ছেঁড়াফাটা, জাগতিক বিস্ফোরক ভ্রম
আনাড়ি আঙুলে রাখি নবিসের সেলাই প্রয়াস
আলোর পর্দার ফাটা অংশ দিয়ে জায়মান কালো
অন্ধকার, ঢুকে আসে ভাঙনের কাল স্রোত হয়ে
সেখানে সেলাই দিই তড়িঘড়ি, অমৃতজাতক
ছুঁচের ছিদ্রের পথে সুতো পরাবার কালে দেখি,
ওইপারে অভিসার, বৃন্দাবন, বিনোদিনি রাই
গোপন হাঁড়িতে রাঁধে হিরণ্ময় ভাতের সুঘ্রাণ
বিত্রস্ত আলোকে ঠাট, বিভঙ্গের সামান্য বদল
টেরিকাটা শ্যাম দেয় অনন্তের ফুঁয়ের নিদান
এখনও অপাপবিদ্ধ, থেকে থেকে তাহার বাঁশিটি
কঠিন আখরোটের হৃদভেজানো মর্মধ্বনি তোলে
সুতোতে নিদান রেখে ছুঁচছিদ্রে সযত্নে পরাই
রাই অঙ্গ ছুঁয়ে সুতো শ্যামতনু কেমনে বেড়ায়!
মুস্তাক মুর্শেদ
উন্মার্গগামী
ছেলেটির শবদেহ কবরে শায়িত হওয়ার দিনে
যে কান্নার রোল উঠবে তার চেয়েও মর্মভেদী
হাহাকার এখন কর্ণকুহরে ধাক্কা মারছে
আকাশফাটানো সমবেত ছিছিকার:
‘ছেলেটা উচ্ছন্নে গেল
সর্বগ্রাসী সর্বনাশ তাকে ঘিরে ধরেছে’
অথচ ঘুটঘুটে আঁধারেও সে দিব্যি হেঁটে চলে
অন্ধ চোখের বন্ধ দরজা খুলে দেয় ময়ূরের নীল
হাত বাড়ালেই নাগাল পায় অযুত ঝর্ণার জল
টালমাটাল পায়ের পাথর সরিয়ে উঠে আসে গুহামুখ
কারণ তার বুকের পাঁজরে এখনও ঝাঁকে ঝাঁকে জোনাকি…
অন্ধকারের ভিতরে সত্যিই এত আলো থাকে!
ছবি: গনেশ পাইন
রুমা তপাদার
অজস্র ছায়ারা
সকালে উঠেই দেখি প্রথম নিজের ছায়া
ঘোর জড়ানো চোখের মধ্যে
ছায়া ঠিক এঁটে বসে থাকে
জল-টল খেয়ে মুখোমুখি বসলে আড়চোখে দেখি
ছায়াটিও বসেছে নিশ্চিন্ত।
জীবনের বেলা যত বাড়ে ছায়ারা ঘনিষ্ঠ হয়
কাছে আসে, লুটোপুটি খায়
চোখা চোখা শব্দ আঁকড়ে রেখেছি মোড়কে
যোগনিদ্রায় জুড়িয়ে এসেছে দু’চোখ
চোখের ছায়ারা এসে পড়েছে কপালে
সমস্ত জড়তা জুড়ে তখন গভীর ছায়া বড় হয়,
থোকা থোকা মায়াজাল ছিঁড়ে
শব্দেরা হড়হড় করে বার হয়ে আসে বেগে
আকাশ ধ্বনিত হয় অজস্র ছায়ারা ডাকে…
‘মধুকৈটভ বিধ্বংসী বিধাতৃবরদে নমঃ
রূপং দেহি, জয়ং দেহি, যশো দেহি, দ্বিষো জহি।’
বদরুজ্জামান আলমগীর
কাসান্দ্রা
যার সাথে দেখা হবে কথা ছিল, সে থাকে
নদীঘোরে শামুকের পাশে।
তোমার ধুলা মেশে তারাদের সনে, জল খোলে
হাওয়া প্রতিমায়, রাখালিয়া লখিন্দর আগুনেদুধে
ফোটায় যাত্রাপথের রেখা, তুমি জানো-
ঢালুর সামনে কেমন মৃত আকুতির বাড়ি!
তুমি সুফিয়া, কাসান্দ্রা তুমি
দেখো অনাগত কাল, স্মৃতি পদাবলী;
একা বয়ে যাও অ্যাপোলোর অভিশাপ ধ্বনি!
চোখে তোমার কাঁপে ডুমুর পাতা;
আমার আয়ুজুড়ে ছলাৎছল ভাসো কালো নৌকা,
শস্যের উপর পা মেলে বসো,
মরণ ও পানকৌড়ির পাখা ঝাপটাও অশ্রুসজল হেসে
যার সাথে কথা ছিল- সে থাকে নদীঘোরে
শামুকের পাশে।।
শ্রীপর্ণা গঙ্গোপাধ্যায়
পর্যটন
আবিল বেদনা নদী বয়ে যায় শব্দহীন স্রোতে
পার হয় কুসুম রঙের দিন, কুণ্ডলি পাকানো
পথ, আহত যাপন।
হৃদপদ্মে অক্ষয় মোহময় কিছু পর্যটন।
পাললিক শিলা বুকে নিয়ে
নদী যায় নিভৃত প্রবাসে,
একদিন জানলার পাশে
জন্ম নক্ষত্রটি তাকে ডাকে।
নদীটি অদৃশ্য হয়।
বেদনা চলকে পড়ে পাত্রে অমৃতটুকু থাকে।
ফারুক ফয়সল
কবিতার জন্যে কবির অভিযাত্রা
রাজহাঁসের পালকের নরম উষ্ণতার নীচে যে মা পাতে সংসার,
তাকেও দিতে হয় ঢের নিবিষ্ট নিবিড় সময় সন্তান আকাঙ্ক্ষার।
কচি নরম তৃণ হতে পোয়াতী গোছা ধান, সবুজ শীষের ভিতর তরল দুধ
সোনা ছড়ানো শষ্য দানায় গোলা ভরতে কৃষকেরও পেরুতে হয় কষ্টকাল।
শিষ দিতে দিতে যে প্রেমিক কাঙ্ক্ষিত রমণীর খোঁপায় গোঁজে ফুল,
তাকেও তো পেরিয়ে আসতে হয় অনেক বসন্তের আকাঙ্ক্ষা সম্ভার।
কদম ফুল হাতে কলির কেষ্ট বেশে যুবক প্রহর গোণে বৃষ্টি ঝরা বর্ষার,
বরুণার জন্যে কাঙ্ক্ষিত ১০৮ টি নীলপদ্ম সংগ্রহে আজ লাগে আট বছর।
জোয়ার-ভাটারও তো লগ্ন আছে, অপেক্ষার পালা-চক্র আছে তার
চরাচর ভাসানো পূর্ণিমার আছে পনের কৃষ্ণ ও চৌদ্দ শুক্ল পক্ষ রাত
সফল মিলনস্পৃহ জোড়কে যেমন ধীর অপেক্ষায় রাখে শৃঙ্গার-শাসন
সাগর সঙ্গমাকাঙ্ক্ষায় বেগবতী নদীরও তো মোহনায় হয় স্বেচ্ছা সমর্পণ !
শরীর পাতন, নয় মন্ত্রসাধনে কবিরও তো আছে দীর্ঘ পথ পরিভ্রমণ
কাব্য লক্ষ্মীর কৃপাকল্পে আছে যজ্ঞ, আছে নিদ্রাহীন সহস্র নিশি যাপন।
স্বপ্না বন্দ্যোপাধ্যায়
দেবীগ্রাম
সে আমার ডিঙিমাত্র
এখন প্রবাদশহর যুবতীর চুমু
ঘাটে ঘাটে থেমে চুমকি সরছে এক দুই তিন চার
নিরঞ্জন হওয়ার আগেই প্রতিমা ভাসান হলো
মাগো
থাবার নখ তালুর নরম খড়
মাটি গলনশীল
দেখো
ঢেউয়ের লক্সগুছিতে মৃদু প্রেম উড়ছে
ছকের দালানে নাবিকীয় আলো
জাল খুলি? ডুবিয়ে দিই নর ও মাংস খাঁড়া?
ঘূর্ণিতে পিচ্ছিল ব্লেড
ধারের ধাতু
আসন পেতেছি ডুবজলে শ্বাসের হুড়োহুড়ি
আলো
আমাকে ধরো
বুকের প্রজাপতি ডানা মেলার আগে
হাল সামলাও পরমেশ্বর
বন্যা লোহার
খাঁচা
বুকের ভিতর আকাশ আছে ।
হাঁ করে দেখতে দেখতে
এক টুকরো গিলে ফেলেছি
এখন আকাশের নীচে
একা একা যেতে ভয় হয়
প্রতিহিংসাপরায়ণ শূন্যতা
যদি একবার গিলে ফেলে
রক্তমাংসের পৃথিবী
আমাকে বাঁচতে দেবে তো ?
তাপস কুমার রায়
ফুলডুঙড়ি
পাহাড়…
একটা কবিতার নাম।
নদী ঝর্ণা লাল কাঁকর
বারিকের দক্তা খাওয়া দাঁত
চায়ের লিকার চিনি
এসব সবই কবিতা হতে পারে।
আর
শালবন চাঁদ রাতে জোছনা মহল।
ফুলডুঙড়ির হাসি শুধু সিঁদ কাটে।
২
কাল ও আমায় পুরনো বিকেলে নিয়ে গেছিল
যেসব বিকেলে ন্যাড়া ছাদে গল্প হোতো
যেসব ছাদে যুবতীরা একা একা চুল শুকত।
ওর দাঁতের ফাঁকে জলতরঙ্গ আছে
কেউ কোনোদিন বলেনি ওকে।
ও কি কোনো কবির সাথে একলা হেঁটেছে?
জানে কি পুরনো বিকেলের নিরীহ আলোয়
কবিরা সঙ্গমকালে দূরের পাহাড়ে নিয়ে যায়
যেসব পাহাড়ে মেঘ নেমে আসে
সূর্য ঢাকা পড়ে যায় গুম্ফার প্রাচীন ঘণ্টায়।
ও কি কোনো শিল্পীর সাথে একলা হেঁটেছে?
ওর স্তন ছুঁয়ে খুঁজেছে যে সফেন সমুদ্র ঢেউ
ঠোঁট ফাঁক হলে, – সে ঠোঁটে চোখে কবির নাম?
কবি বা শিল্পী, – কোনোটাই নয়
হঠাৎই নিজেকে হো চি মিন মনে হল
আর ফুলডুঙড়ি আমার একফালি গর্ব
– ভিয়েতনাম।
এইযে সমুদ্র পেড়িয়ে এতদূর
ঘুমহীন রাতে বিছানায় ডুবে যেতে চাই
প্রগলভ পাহাড়ি নদী ঘুমেজাগরণে মিশে
ওর মুঠোয় ছোঁয়াই হাত নীল মেঘ খুঁজে খুঁজে।
ছবি: গনেশ পাইন
ভাস্কর সুতার
পাখি
বৃষ্টি ভেজা মানুষ কখনও পাখি হয় না
তথাগত, মানুষ এক জীবনে প্রিয় হয় না
মানুষ একাই দুঃখের নারী
যেন বটগাছ-
তথাগত,পাখি ভিজে গেলে মানুষের গান হয়ে ওঠে
আর মানুষ,
আর মানুষ ভিজে গেলে
একাই দুঃখের নারী
প্রত্যয়ী দত্ত
ভাত
নেশাতুর
ঘুমের মাঝে
ভাত হয়ে
নেমে আসুক
হলুদ ধানের কণা।
আবেশ মিঞা!
ঘুমিয়ে থাকো
শতাব্দী জুড়ে।
স্বপ্নগুলো
গরম
ভাত হয়ে
ছড়িয়ে পড়ুক
হাতের ওপর!
জেগে উঠো না
আবেশ মিঞা!
আবেশ মিঞা!
আবেশ মিঞা!!
অনিকেশ দাশগুপ্ত
নান্দনিক
যখনই পায়ে-পায়ে জড়ায় নিকষ সসার
কাকতালীয় ক্যাথলিক ঠায় দাঁড়িয়ে দেখে
ওই যে তার রৌদ্রবাগান
গির্জার নতমুখ নিয়নে বিগত নগর এখন ঝাড়া হাত-পা
আশ্রমের মৃত মাছ শব্দের আঁশ ছাড়াতে -ছাড়াতে
চলে গেছে নীল পাহাড়ের এরিওলায়
কাঁটা গাছের যৌন অবদমনে হোঁচট খায় রাত্রিকালীন অটো
উদ্দীপ্ত মসলিন ও ফ্লাইওভারে জড়ানো গণিকার এহেন তামস
শ্বেত অশ্বেরা দোলাচলে নীচে নেমে আসে
ভাগাড়ের দোদুল্যমান জ্যোৎস্না ও পরিশ্রুত কাচে ভর ক’রে
পাঁচটি কড়ি সকালের মধু হরফে ডুবে থাক
নগর অভিমুখে বিস্রস্ত বিজ্ঞাপনের পাশে
ওড়ে আরও সতেজ কোনও নদী
সিদ্ধার্থ ঘোষ
ছায়া
আঙুলের মতো বাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে
আড়ালে ছায়া নিয়ে কারসাজি!
অন্ধকারে ছায়া গাঢ়, ছায়ারা মেলে
গোল উলের বলের মতো গড়িয়ে যায়…
টান দিয়োনা; খেই হারিয়ে ফাঁস!
ফাঁস গণিতে হাতে রইল উপহার জন্মপত্র
জন্মপত্রে অন্ধ-জীবন কারণ অলিখিত।
দিনের আলোয় –
প্রচ্ছায়াময় জন্মকারণ বাড়ে কমে, দিক পাল্টায়
তীব্র প্রচ্ছায়া ঘিরে উপচ্ছায়া, দাম্পত্য
সে পাশে থাকে…
প্রচ্ছায়ার সাথে নড়ে, বাঁকে, খেলে, খাই
কিন্তু মেশে না!
মৃত্যুর সম্ভবত কারণ সবার জানা –
জ্বালাতে লুকিয়ে জন্ম-রহস্য কাহিনী
সবাই সতর্ক সাবধানী; পা আগে চলে…
বিড়ালের মতো ছায়ারও কি তবে আগুনে ভয়?
অর্ঘ্য দত্ত
এয়ো
অবশেষ দাস
সোনালী হিজল ও ভরা আশ্বিন
তমাল বন্দ্যোপাধ্যায়
মলিন ধারণাজন্ম
কে যেন জানিয়ে গেল, এই পথ তত স্থির নয়।
এখন সময় হল, অপেক্ষার শ্মশানপুটুলি—
নামাও হে বৃক্ষভার, খুলে দাও দূরবার্তাদেশ…
এসো হে পিঞ্জর! আজ রুক্ষ্মমাটি খুঁটে-খুঁটে তুলি।
কে যেন জানিয়ে যায়, অপেক্ষার মৃত্যুভরা দেশ
ডেকেছে চাঁদের গন্ধ, ধুলোমাটি, যা-কিছু প্রাচীন।
সমস্ত অপেক্ষা খুলে দুয়ারের যত নীরবতা,
এসো হে দূরত্ব! আজ আগামীর নিতয়িতে বাঁচি।
এসো যত অগ্রহার, এসো স্তব্ধ বনপথে একা
নামিয়ে শ্মশান-মায়া বাতাসের সন্নিকটে আসি।
দেখি, কে ধরেছে নাম, সঙ্গোপনে কে-বা ওই দূরে
অস্থির অরণ্যপথে অসময়ে বাজিয়েছে বাঁশি।
কে যেন চিনিয়ে দেবে অতিদূর সমাধিফলক…
তাহার অপেক্ষা নিয়ে বাঁশি, তোর কথা সত্যি হোক।
বঙ্কিম লেট
কমল
দয়াল, করুণা করো, মোহান্ধ প্রহর কাটে
যা যা শিখেছি এখন সব ভুলে যেতে চাই
তারপর সরোবরে যেভাবে কমল ফোটে
সেইভাবে একদিন ফুটে উঠতে চাই !
অমিত সাহা
বিশ্বাস-বঞ্চনা
সব যুক্তি তর্কনিষ্ঠ হলে ধুলোরা কোথায় যাবে?
যে বিশ্বাস গোধূলিনির্ভর সেখানে কোথায় সূর্য?
বিশ্বময় বিশ্বাস-বঞ্চনা…
তবু
অপেক্ষা সারিয়ে তোলে
জেগে থাকার যন্ত্রণা,
ধুলোর বিশ্বাসমতে
কান্না পেলে কাদা হয় পথ।
বিশ্বাস আর বঞ্চনা উভয়ে নদীর কাছে সৎ !
বিভাস রায়চৌধুরী
কবিতা জগৎ
‘না’ থেকে বেরিয়ে এসো
‘না’ তোমাকে কিছুই দেবে না
সাধনার নামে ডেকে নিয়ে
সে খায় তরুণ, তীব্র কবির কলিজা রোজ…
‘না’ এক রাক্ষস!
‘কিন্তু’ও আশ্রয় নয়
সে বলবে, না-কবিতা একদম বাজে…
কিন্তু-কবিতাই হল পৃথিবীর মুখ…
প্রতি বাক্যে কিন্তু-ব্যবহার
‘কিন্তু’র অসুখ!
সুন্দরের চোখ নষ্ট হয়ে যাবে…
পালাচ্ছ তরুণ কবি?
এদিকে এসো তো একবার!
জলে-জলে, নদীতে-জঙ্গলে…
ওই দেখো শ্রমজীবী মানুষের গায়ে
তারাদের ধুলো হয়ে ‘হ্যাঁ’ জেগে আছে…
তুমি ‘হ্যাঁ’-র কাছে থাকো…
ভালবাসাটির পায়ে ডিঙি বেঁধে চুপচাপ
বসে থাকো কিছুক্ষণ শুধু…
জেনে যাবে পৃথিবী হ্যাঁ-কবি!
জেনে যাবে কবিতার নেই কোনও সীমা…
চাঁদ উঠবে একটু পরেই
আজ পূর্ণিমা…
হ্যাঁ-পূর্ণিমা!
ছবি: গনেশ পাইন
“ঘরের কাছে আরশিনগর”
পর্ব-১২
নীলকণ্ঠ-পদাবলি মনে পড়ে
রামানুজ মুখোপাধ্যায়