সাপ্তাহিক কবিতা আশ্রম, ২৬ ভাদ্র ১৪২৮
বঙ্কিমকুমার বর্মন
ক্ষুধা
হে ক্ষুধা, তুমি আগুনের সখা
বোঝনাকো দুঃখী মানুষের দরদ
পেরিয়ে যাও মৃতের রেললাইন,
জলের তছনছ, বৃক্ষসুখ!
এই নাও দু’হাত পেতে —
কামড়ে খাও থালাভর্তি অ-সুখ।
শৌভিক পাল
দ্বীপান্তর
তোমাকে লিখিনি বহুদিন
তোমাকে না লেখা—
আমার দ্বীপান্তরের দিন।
সে-দ্বীপে অহরহ
সোনার পাথর খুঁজেছি
বদলে পেয়েছি নিঃসঙ্গ নুড়ি
অনর্থক বেড়েছে বুক-পকেটের বোঝা
তুমিও কি দাঁড়াবে এসে
যেখানে ভালোবাসার বিনিময়ে ভালোবাসাও
সুনিশ্চিত নয়! নাকি আমিই
সোনার পাথর খোঁজে
ডুবে যাব লৌকিক জলধিতে!
তোমাকে লিখতে বসি
দ্বীপান্তরে দীর্ঘ ক্লান্তির ভিতরে শুয়ে,
যত পরিমাপ করি ব্যবধান—
আমার সত্তার চারপাশে
তারা-জ্বলা সন্ধ্যা নেমে আসে।
সমদর্শী
আমি লিখছি
আমার সঙ্গে লিখছে সর্বজনীন রাতের আকাশ।
নিখিল আয়োজনে নেই নির্বিশেষ বিহার
অথচ দুঃখের বিনিময়ে শিশিরের স্তব্ধতা
আনন্দ ছড়ানো থাকে ভোরের বাগানে।
উৎসবমুখর দিনের আড়ালে
আরো একটু মানবিক হবার লোভ
ফল্গুধারার মতো বইছে।
অথচ সকলেই উৎসবে আছে জেনে
যেখানে যেটুকু সম্ভোগ আছে বাকি
সেখানেই ধ্বনিত করি উন্মাদ স্রোতস্বিনী।
প্রবাল জোয়ারে ভেসে যায়
বন্ধু-প্রিয়া-আত্মীয়স্বজন,
প্রশস্ত ঝরনার মতো অন্তহীন বেগে
ঝরে সাদা পাতা।
যা-কিছু পরাভব আর বিজয়ের উল্লাস
সবই ভালোবাসার কাছে সঞ্চিত,
সে-সবকিছু দোয়াতে ভরে বসে আছি
জল-বাতাসের মতো সমদর্শী হবে বলে।
অনিকেশ দাশগুপ্ত
বাঁক
নির্জন ব্যারিকেড পেরিয়ে ট্রেন জানলার দর্প চলে যায়
রসমগ্ন শ্লোক আর সানমাইকার ড্যাশবোর্ড থেকে
শ্রাবণ মুছে গেছে
কপর্দকহীন রাস্তা নিভে আসে
লাইনের ব্যগ্র লাল আলোয় খুলে ধরা
প্রথম বই,গলকম্বলের মধুর মাছি এই জোয়ারের দিনে
ঠাকুরদালানময়, ছিপছিপে বাইসাইকেল
যেভাবে হাঁটুজল পুকুরে
গতিবিধির সমস্ত রৌপ্য চমক উগড়ে দেয়
তোমায় জানাই চিঠির সবিনয় হেমন্ত আজ
দেবীর পেঁজা অরণ্য,দুধবাতি আর যেখান থেকে লক্ষণীয় নয়
কোনওকিছুই, ফাঁপানো গোল অন্ধকার ধ’রে
সেখানে একাকী প্রান্তপল্লীর কুয়াশামগ্ন হেডলাইট সরে যায়
কৃপাকণা
সুতো ও বাঙ্ময় টেবিলের এই নিপুণ আলাপ
কখনও কী শুরু হয়েছিল
নীল চিমনি থেকে খ’সে পড়া
সংগ্রামী চিঠিগুলি পড়তে -পড়তে
বিকেলের বৈঠকখানায় উড়েছিল তাৎক্ষণিক লিফলেট
প্রিয় মঞ্জিল, তোমার বাবুই-শিবির গোলাম-কেন্দ্রে
কেমন হাঁসফাঁস করে সারাটাবেলা
নৃত্যরত সন্ধ্যায় সবুজ বাতি জ্বালা ট্রাকে চোখ রেখে
ঠায় দাঁড়িয়ে আছি
মৃত সওদাগরেরা কী এই পথে ঠেলে দিয়েছিল
তাদের নক্ষত্র-ভেলা?
পাখসাটে ভরপুর সেসব দক্ষিণ জানলায়
সতত তেজী শতকের গাউন ওড়ে
নবনীতা সরকার
আপেক্ষিক
ভুলের নিস্তব্ধ বালুচর-
তেতে আছে দুশ্চরিত্র আঙুলেরা।
আঙুল ভুল করে, হ্যাঁ, আঙুলই ভুল করে
বার বার-
নির্লিপ্তের শরীরে মূঢ়তার রং দেখে
ভালবেসে ফেলে তোমার আবহমান ছল।
ঘাড় হিঁচড়ে নির্বীর্যতাকে
রান্নাঘরে টেনে এনে কেরোসিন ঢেলে রাখে
দাউ দাউ করে জ্বলে আস্ফালনের হোমকুণ্ড
তুমি ভাব তুলির টান
আমি দূর থেকে দেখি, আসলে ওটা
গড়িয়ে যাওয়া সময়।
“ঘরের কাছে আরশিনগর”
পর্ব-৭
রূপকথার রাজপুত্র শিবরতন মিত্র
রামানুজ মুখোপাধ্যায়
সিউড়ির মিত্র পরিবারকে ছাড়া বীরভূমের ইতিহাসচর্চার কথা ভাবাই যায় না। বিশ শতকের গোড়ায় শিবরতন মিত্রের (১৮৭২-১৯৩৯) প্রাচীন পুথি সংগ্রহের উদ্যোগ বহু বিদগ্ধ মানুষকে বিস্মিত করেছিল। জেলার ইতিহাস ও প্রাচীন সাহিত্যচর্চা শিবরতন মিত্রকে দিয়েছিল একধরনের পরিচিতি। বীরভূম জেলার মানুষ, জেলার বাইরের মানুষ, যেটকু তাঁকে মনে রেখেছেন তা ওই কারণে। শিবরতনের আরও এক মহৎ কীর্তি এখনও রয়ে গিয়েছে বিস্মৃতির অন্ধকারে। ষোলো খণ্ডে প্রকাশিত ‘বঙ্গীয়-সাহিত্য-সেবক’ গ্রন্থে সহস্রাধিক পরলোকগত সাহিত্যিকের জীবনকথা লিপিবদ্ধ করেছিলেন তিনি। বাংলা ভাষায় এটিই প্রথম জীবনচরিত-অভিধান। ১৩১১ থেকে ১৩১৮ বঙ্গাব্দের মধ্যে প্রকাশিত হয়েছিল এর খণ্ডগুলি। এই প্রয়াসকে স্বাগত জানিয়েছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ।
বীরভূমের খয়রাশোলের বড়রা গ্রামে ছিল শিবরতন মিত্রের পূর্বপুরুষদের আদি নিবাস। পিতা ঈশ্বরচন্দ্র মিত্র ছিলেন বীরভূম জেলা স্কুলের কৃতী ছাত্র এবং জেলা কালেক্টরির সেরেস্তাদার। উত্তর রাঢ়ের কায়স্থ ঘরের সন্তান তিনি। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে হারিয়েছিলেন মা নিত্যসখী দেবীকে। বাবা দ্বিতীয়বার বিয়ে করেছিলেন। সৎ-মায়ের কোলে বড়ো অনাদরে কেটেছিল তাঁর ছেলেবেলা। তাঁর শৈশবকে ঘিরে রেখেছিল বীরভূমের সীমান্তবর্তী গ্রামের সব চেনা গল্পেরা। একটু বড়ো হয়ে তিনি পড়তে এসেছিলেন সদর শহর সিউড়ির ইংরিজি স্কুলে। ১৮৯১-এ বীরভূম জেলা স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাশ করার পর গিয়ে পৌঁছেছিলেন শহর কলকাতায়। পড়েছিলেন ইংরিজি সাহিত্য। গল্প-কবিতা-প্রবন্ধের পাশাপাশি তিনি লিখেছিলেন পঞ্চাশটিরও বেশি জনপ্রিয় ছাত্রপাঠ্য বই। বিদ্যালয় স্তরে তো বটেই, এমনকী বিশ্ববিদ্যালয় স্তরেও তাঁর বই পাঠ্য ছিল। ‘Types of Easy Bengali Prose’ (১৯২২), ‘ভারতবর্ষের ইতিহাস’ (১৯২১) বইগুলির পরিচিতি ছিল কলকাতা থেকে ঢাকা পর্যন্ত বিস্তৃত। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক স্তরের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম পরীক্ষকও ছিলেন তিনি। প্রথম পড়ুয়াদের জন্যে শিবরতন ‘বর্ণমালা প্রথম ভাগ’ (১৯০৬), ‘হস্তলিপি লিখন-প্রণালী’ (১৯০৮) সংকলন করেছিলেন। হস্তলিপির বইটির প্রথম পাতায় ছাপা হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের কবিতার পাণ্ডুলিপি! অনুবাদেও তিনি সিদ্ধহস্ত ছিলেন। তাঁর বিখ্যাত ‘সুধা’-সিরিজের সংকলনগুলি মুদ্রিত হয়েছিল ঢাকার রিপন লাইব্রেরি থেকে। সে-সব গ্রন্থে সংকলিত হয়েছিল রামমোহন রায়, অক্ষয়কুমার দত্ত, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, প্যারীচাঁদ মিত্রের নির্বাচিত গদ্য। কলকাতা থেকে দূরে, সিউড়ির মতো একটি রক্ষণশীল শহরে এত কৃচ্ছ্রসাধনের মধ্যে থেকে শিবরতন মিত্রের এই সাফল্য ছিল সাধারণের কল্পনাতীত।
নিজের শৈশব যাঁর কাছে আনন্দময় ছিল না, আজীবন শিশুসাহিত্যই ছিল তাঁর সৃজনসুখের কেন্দ্রে। বাংলা সাহিত্যে শিবরতন মিত্র-যে ছিলেন রূপকথার রাজপুত্র, সে-কথা আজ আমরা প্রায় ভুলতেই বসেছি। কলকাতার আশুতোষ লাইব্রেরি থেকে প্রকাশিত হয়েছিল শিবরতন মিত্রের তিনটি রূপকথার সংকলন— ‘সাঁজের কথা’ (১৯১৯), ‘কল্পকথা’ (১৯৩০), আর ‘নিশির কথা’ (১৯৩৩)। এই শেষ বইটি পরিচিত ছিল ‘বাংলার রূপকথা’ নামে। এর ভূমিকায় তিনি জানিয়েছিলেন, রূপকথা নিয়ে দীর্ঘ আলচনার সাধ তাঁর ছিল, কিন্তু হয়ে ওঠেনি, পরবর্তী বইয়ে তা সম্পূর্ণ করবেন। পরের বইটির নাম ঠিক করেছিলেন ‘ঊষার কথা’। সে-বই আর প্রকাশিত হয়নি। সিউড়ির রাঢ় প্রকাশনের উদ্যোগে ‘সাঁজের কথা’ আর ‘কল্পকথা’ বই দু-টি এখন ছাপা আছে। এই সচিত্র নবীন মুদ্রণ ফিরিয়ে দিতে পারে বহু প্রবীণ মানুষের শৈশবস্মৃতি। ‘নিশির কথা’ পাঠের সুলভ সুযোগ এখন আর নেই। ১৩৩৫ বঙ্গাব্দের ‘শিশুসাথী’ পত্রিকার পাতায় এ-বইয়ের ‘শঙ্খকুমার’ গল্পটির হদিশ হয়তো পেয়ে যেতে পারেন কোনো পাঠক। ২০০৫-এর কলকাতা বইমেলায় মুদ্রিত হয়েছিল ‘রাখালের রাজশক্তি’ আর ‘দুষ্কৃতি অপনয়নের বিচিত্র উপায়’ নামে শিবরতনের দু-টি অগ্রন্থিত ছোটোদের গল্প। এর বাইরেও শিবরতন প্রকাশ করেছিলেন সাঁওতালি রূপকথার সংকলন। যেভাবে অনাদরে, অবহেলায় ছড়িয়ে আছে তাঁর সৃষ্টিসম্ভার, তাতে কোনো আন্তরিক অনুসন্ধানে এমন আরও লুপ্ত রত্ন পুনরুদ্ধার হতে পারে।
রূপকথার গল্প মানেই কি সেখানে থাকবে রাজপুত্র-রাজকন্যে, সোনার কাঠি-রুপোর কাঠি, পক্ষীরাজের ঘোড়া? দেবকন্যার বরে জেগে উঠল পাষাণ-হয়ে-থাকা কোটালপুত্র। দীর্ঘ বারো বছর অনাবৃষ্টির পর গ্রামের আকাশে বৃষ্টি নামল রাজপুত্রের আগমনে। এমন গল্প আজও মন ভালো করে দেয় আমাদের। ‘বসুমাতা’ গল্পে দেখি, রাজপুত্ররা শুধু বিদেশে বাণিজ্যে যাচ্ছে না, চাকরি করতে যাচ্ছে। সাত ভাই বৃদ্ধ বাপ-মাকে জানিয়েছে, এখানে তাদের সংসার খরচ চলছে না, বিদেশে চাকরি ও বাণিজ্য করে তারা অর্থ উপার্জন করবে। দেশে ফিরবে তার পর। শিবরতনের সংগৃহীত রূপকথার গল্পগুলির মধ্যে আছে চিরায়ত সব ছড়া। শিবরতনের গল্পবর্ণনা নির্ভর করে থাকে সংলাপের উপরে। গল্প বলার মধ্যে তিনি আত্মস্থ করে নিয়েছিলেন অঞ্চল-বিশেষের কথা বলার ধরনটিকেও। আঞ্চলিক ইতিহাসের সন্ধানে তিনি ঘুরেছিলেন বীরভূমের গ্রামে-গ্রামান্তরে, হয়তো সেই সূত্রেই এ-অঞ্চলে প্রচলিত রূপকথার গল্পগুলির প্রতি তৈরি হয়েছিল অতুল আগ্রহ।
শিবরতন মিত্রের নিজের লেখা গল্পগুলি ছিল ভিন্ন স্বাদের। তাঁর সংগৃহীত গল্পে যেমন লক্ষ করা যাবে প্রচলিত গদ্যের প্রাধান্য, তেমনি নিজের লেখা গল্পে ছিল সাধু গদ্য। প্রচলিত গল্পে নেই কোনো নীতিশিক্ষার আয়োজন, আছে কল্পনার অফুরন্ত বিস্তার। মানুষের মনের সুকুমার বৃত্তি আর সামাজিক মূল্যবোধের গুরুত্ব পেয়েছিল তাঁর গল্পে। তাঁর নিজের লেখা গল্পগুলি ছিল সাধারণ জনজীবনের অনেক কাছাকাছি।
‘সাঁজের কথা’ আর ‘নিশির কথা’ বই দু-টিতে শিবরতন সংগ্রহ করেছিলেন বীরভূমের প্রচলিত রূপকথার গল্পগুলিকে। অবিভক্ত বাংলাদেশে এ-বইগুলির জনপ্রিয়তা ছিল প্রশ্নাতীত। শিশুকিশোরদের হাতে-হাতে ঘুরত এ-বই। সরকারি স্কুল-কলেজে এবং গ্রন্থাগারে ঠাঁই পাওয়ার উপযুক্ত হিসেবেও স্বীকৃতি অর্জন করেছিল বইগুলি। ‘কল্পকথা’-ও তার ব্যতিক্রম ছিল না। শিবরতনের জীবনাবসানের পর, বিশ শতকের পাঁচের দশকে বিখ্যাত সব পত্রপত্রিকার পাতা আলোকিত করে থাকত এইসব বইয়ের বিজ্ঞাপন। প্রত্যেক মানুষই আজীবন খুঁজে ফেরেন তাঁর হারানো শৈশবকে। তারই মাঝে কেমন করে-যে শিবরতন মিত্রের মতো স্বনামধন্য রূপকথার রাজপুত্রেরা হারিয়ে যান অনাদরের অন্ধকারে, সেও এক ইতিহাস!
Painting:Jenny Saville
পূর্ববর্তী সংখ্যা
পড়তে পারেন:
এখন বাড়িতে বসেই সংগ্রহ করতে পারবেন কবিতা আশ্রমের মুদ্রিত সংখ্যা এবং কবিতা আশ্রম প্রকাশনার বই। নীচের ছবির ওপর ক্লিক করলে পৌঁছে যাবেন আমাদের অনলাইন সপ পেজে। হোয়াটস অ্যাপের মাধ্যমেও অর্ডার করতে পারেন। যোগাযোগ: ৭৩৮৪১৭২৪০৪/ ৯৪৩৪৪৩১৩৬২