সাপ্তাহিক কবিতা আশ্রম, ২ আশ্বিন ১৪২৮
Painting: S H Raja
নির্মল হালদার
পানকৌড়ির ডুব
শিল-নোড়ার শব্দ হলে
হলুদ মশলার গন্ধ পাই।
বঁটিতে সবজি কাটার শব্দ হলে
বঁটির ধার দেখতে পাই।
যে যার কাজ করতে করতে ঘরের রোশনাই।
ও বউ, হাতা খুন্তিও আমাদের আত্মীয়।
২
বাবার মলিন মুখের দিকে চেয়ে আছে মেয়ে।
আকাশ মন মরা
মাটিও ধূসর
হাওয়া নেই কোথাও
বাবার মলিন মুখের দিকে চেয়ে আছে মেয়ে
আবছা গাছপালা
পাখিদের আসা-যাওয়া নেই
আবছা রোদের আলো
বাবার মলিন মুখের দিকে চেয়ে আছে মেয়ে
ফুল ফলের রং ফিকে হয়ে আসছে
ধুলোবালির স্তব্ধতা
নদীও থেমে পড়ছে কোথাও
বাবার মলিন মুখের দিকে চেয়ে আছে মেয়ে
বাবা ও মেয়ে
মেয়ে ও বাবা
একা।
বটের ঝুরি নামছে।
সুজন পণ্ডা
অপেক্ষার সমুদ্র
এক সমুদ্র অপেক্ষা।
মহা শূন্যের এই অবসরে
সী-গালের স্বর শুনি মাঝে মাঝে।
হাওয়ায় লেগে আছে ডাক।
ঘরে ফেরার…
অখণ্ড উড়ান।
দিন গুলি রাত গুলি
নিরবধি অস্থির জীবিকা যাপন…
প্রিয়…
অপেক্ষায় অপেক্ষায়
নিবিড় হয়েছে রাত… চাঁদ মৃত।
নক্ষত্রের সংসার অভিমানে ম্লান।
প্রিয়…
আর অল্প কিছুক্ষণ,
এক সমুদ্র অপেক্ষা পেরিয়ে
ডালিম রঙের সূর্যোদয়।
পৌষালী চক্রবর্তী
বিস্ফোরণ
দ্বিধাদ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলি
সমস্ত রাত্রিজুড়ে খুঁড়ে আনি পূর্বজন্ম কথা
হঠাৎ কেতকীপুষ্প, পদ্মপাতে ছুঁয়ে আছে বিষহরি গাঁথা
নক্ষত্র জন্মের কাল
মহাকাশে ব্রহ্মঘোর; নিজস্ব গণিত পরিত্রাতা
সংকোচন-প্রসারণে পরিব্যাপ্ত সৃষ্টি স্থিতি লয়
দু একটি উল্কাপাতে কদাচিৎ খ্রিস্ট জন্ম নেয়?
সৌরভ লায়েক
দুগ্গা দিদিকে
শৈল্পিক পেয়ারা রেখে
আঁজির খেতে খেতে চল যাব
ধুধুল কাশের বন পেরিয়ে
রেলগাড়ি নয়, আরও কিছু বিস্ময় দেখার আশায়
এইতো শরৎ
তুলো মেঘ তুই
টুপটাপ ঝরে পড়া শিউলির সারল্য মাখা অপু
আম আঁটির ভেঁপু বাজিয়ে হারিয়ে যায় শালের সবুজে
তার অপেক্ষাকে উপেক্ষা করিস না
উদ্ধত আরণ্যক অনুভূতি যার বুকে
সে আজ এক বৃক্ষনাথের খোঁজ পেয়েছে
যদি সে চলে যায়, হয়তো ফিরবে না কোনওদিন
ঝরাপাতার স্তুপে কোনও এক বিরহ বিতান পেলে
বুঝে নিস সেই ছিল তার দুগ্গা দিদিকে লেখা শেষ চিঠি
“ঘরের কাছে আরশিনগর”
পর্ব-৮
সুরুল কুঠিবাড়ি ও রবীন্দ্রনাথ
রামানুজ মুখোপাধ্যায়
সুরুল-শ্রীনিকেতনকে ঘিরে রবীন্দ্রনাথের কর্মকাণ্ড সাহিত্যে ও সমাজ-ইতিহাসে বহু আলোচিত একটি অধ্যায়। কবির লেখালিখির ক্ষেত্রেও এই বাড়িটির গুরুত্ব অপরিসীম। সুরুল কুঠিবাড়ি রবীন্দ্রনাথের তৈরি নয়। তিনি যখন কিনেছিলেন তখন এই কুঠিবাড়িটি ছিল বীরভূমের রায়পুরের সিংহ পরিবারের সম্পত্তি। সুরুল থেকে রায়পুরের দূরত্ব সামান্যই। ১৯১২-র অক্টোবরে লন্ডনে অবস্থানকালে কবি রায়পুরের জমিদার কর্নেল নরেন্দ্রপ্রসন্ন সিংহের কাছে আট হাজার টাকার বিনিময়ে সুরুল গ্রামের পশ্চিম সীমায় অবস্থিত ছোটো কুঠিবাড়িটি কিনে নিয়েছিলেন। সেইসঙ্গে কেনা হয়েছিল কুঠিবাড়ি-সংলগ্ন কুড়ি বিঘা জমিও। হ্যান্ডনোটের বিনিময়ে কেনা হয়েছিল এই সম্পত্তি। বিদেশ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে ফেরা রথীন্দ্রনাথের কৃষি-গবেষোণাগার তৈরি হবে এখানে, প্রাথমিকভাবে তেমনই কথা ছিল। গড়ে উঠবে একটি বালিকা বিদ্যালয়, ভাবা হয়েছিল সে-কথাও। সুদূর আরবানা থেকে হেমলতা দেবীকে লেখা তারিখহীন চিঠিতে এইসব চিন্তাভাবনার কথা লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্র-ভবন আর্কাইভের Ms. 878 (i) ফাইলে চিঠিগুলি দেখা যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত জমিসহ কুঠিবাড়ি কেনায় খরচ হয়েছিল দশ হাজারেরও কিছু বেশি টাকা। ঋণ শোধ হতে সময় লেগেছিল প্রায় দু-বছর। অবশ্য গৃহপ্রবেশ হয়েছিল তার আগেই। ১৩২১ বঙ্গাব্দের ১ বৈশাখ থেকে এখানে বাস করতে শুরু করেছিলে রথীন্দ্রনাথ-প্রতিমা দেবী। গৃহপ্রবেশের দিন তাঁরা বসেছিলেন সুসজ্জিত বেদিতে, কবির উপস্থিতিতে বৈদিক মন্ত্র পাঠ করেছিলেন আচার্য ক্ষিতিমোহন সেন।
সুরুলের এই কুঠিবাড়িটি রায়পুরের সিংহ পরিবারের তৈরি করা নয়। কোনো গবেষক অনুমান করেছেন, ১৮৫৮ নাগাদ বোলপুরে রেলপথ তৈরির কাজে নিযুক্ত ইঞ্জিনিয়ারদের থাকার জন্যে এ-বাড়ি নির্মাণ করেছিল ইস্টার্ন রেলওয়ে। প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে সে-বাড়ি বিক্রি করে দিয়েছিল পূর্বরেল। কিনেছিলেন রায়পুরের ভূস্বামীরা। পাশাপাশি অন্য একটি মতও আছে। ইতিহাস অবশ্য বলে, সুরুল কুঠিবাড়িটি আরও পুরোনো। অষ্টাদশ শতকের শেষ দিকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কমার্সিয়াল রেসিডেন্ট জন চিপ (১৭৬৬-১৮২৮) এ-অঞ্চলে শুরু করেছিলেন বিপুল কর্মকাণ্ড। তাঁরই নির্মিত বাড়ি ছিল এটি। ব্যবহৃত হত বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে। নাম ছিল ‘ছোটো কুঠিবাড়ি’। বড়ো কুঠিবাড়িটি ছিল আরও পশ্চিমে। ছোটো কুঠিবাড়িটি গড়ে উঠেছিল চিনির কারখানার জন্যে। দীক্ষিত সিংহ তাঁর বইয়ে এ-প্রসঙ্গে আলোকপাত করেছেন। প্রয়োজনে দেখা যেতে পারে সত্যদাস চক্রবর্তীর ‘শ্রীনিকেতনের গোড়ার কথা’ এবং রঞ্জন গুপ্তের ‘রাঢ়ের সমাজ অর্থনীতি ও গণবিদ্রোহ’ বইগুলি।
রবীন্দ্রনাথ যখন এই কুঠিবাড়িটি কিনেছিলেন তখন এটি ছিল দোতলা। চারপাশ জঙ্গলে ঘেরা। বাসযোগ্য করে তোলার জন্যে বড়ো রকমের মেরামতির আয়োজন করতে হয়েছিল গৃহপ্রবেশের আগে। কবির বসবাসের জন্যে তিনতলার ছোটো ঘরটি তৈরি করা হয়েছিল এই সময়ে। রথীন্দ্রনাথ-প্রতিমা দেবী খুব বেশি দিন এ-বাড়িতে বাস করতে পারেননি। সংলগ্ন গ্রামগুলিতে ম্যালেরিয়ার উপদ্রব ছিল। নিভৃত যাপনের জন্যে কবি প্রত্যেকবারই বেছে নিতেন কুঠিবাড়ির তেতলার ঘরটিকে। শেষ জীবনে চিঠিতে হেমন্তবালা দেবীকে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন: ‘এই তেতলার ঘর একদিন আমিই তৈরি করিয়েছিলুম। এইখানেই লিখেছিলুম ফাল্গুনী, গানের উৎস খুলে গিয়েছিল। গোরুর গাড়িতে করে যাওয়া আসা করতুম এখান থেকে শান্তিনিকেতন।’ এ-ঘরে বসে তাঁর লেখালিখির তালিকাটির দিকে তাকালে আমাদের বিস্ময়ের সীমা থাকে না। জীবনীগ্রন্থগুলিতেও রয়েছে এ-সংক্রান্ত নানা গুরুত্বপূর্ণ খবরাখবর, আছে ‘বিশ্বভারতী নিউজ’-এর পাতায় আর কালিদাস নাগ-মৈত্রেয়ী দেবীর স্মৃতিকথাতেও। নানা চিঠিপত্রে কবি লিখেছেন সুরুলের নিসর্গ আর অবকাশ-যাপনের আনন্দের কথা।
১৯১৪-র ২৫ আগস্ট প্রথমবার বসবাসের জন্যে সুরুলের ছোটো কুঠিবাড়িতে এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ছিলেন টানা ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এই সময়ে প্রায় প্রত্যেক দিন বিকেলে গোরুর গাড়িতে চেপে যেতেন শান্তিনিকেতনের বেণুকুঞ্জে, দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে। লেখা হচ্ছিল ‘গীতালি’-র গানগুলি। সেই সব গানেরই সুর নিয়ে চর্চা হত দিনু ঠাকুরের সঙ্গে। অন্তত পঁয়ত্রিশখানি গান এই একমাসে লেখা হয়েছিল কুঠিবাড়িতে বসে। প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের ‘গীতবিতান: কালানুক্রমিক সূচি’ বইটিতে তো বটেই, রবীন্দ্র-ভবনের Ms. 229 নম্বর পাণ্ডুলিপিতেও গানগুলির হদিশ পাওয়া যাবে। এমনকী, যাতায়াতের পথে গোরুর গাড়িতে বসেও লেখা হয়েছিল দু-খানি গান। তালিকায় আছে ‘তোমার মোহন রূপে কে রয় ভুলে’, ‘শরৎ, তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি’, ‘যেতে যেতে একলা পথে’, ‘শেষ নাহি যে, শেষ কথা কে বলবে?’-এর মতো বহুশ্রুত রবীন্দ্রসংগীতগুলি। কয়েক মাস পরে, আবারও ১৯১৫-র ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ৭ মার্চ বাস করেছিলেন এখানে। সেবারেও লেখা হয়েছিল চোদ্দোখানি গান। সেগুলি সবই ‘ফাল্গুনী’ নাটকের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। তার মধ্যে ‘আকাশ আমার ভরল আলোয়’, ‘তোমায় নতুন করে পাব বলে’, ‘চোখের আলোয় দেখেছিলেম’ গানগুলি বহু পরিচিত। এই ছোটো কুঠিবাড়িতে বসে লেখা হয়েছিল ‘বলাকা’, ‘সেঁজুতি’, ‘সানাই’ কাব্যগ্রন্থের বেশ কিছু কবিতা। লেখা হয়েছিল ‘সে’। ১৯২২-র ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয়েছিল শ্রীনিকেতনের কৃষি বিভাগের কর্মকাণ্ড। গঠিত হয়েছিল ‘সুরুল সমিতি’। পরে এরই নাম হয়েছিল ‘শ্রীনিকেতন সমিতি’। কুঠিবাড়ি-সংলগ্ন জমিগুলিই ছিল এর প্রধান কর্মক্ষেত্র।
পুজোর আগে শরৎ এখানে বড়ো মনোরম ছিল। তেতলার জানালা থেকে দেখা যেত দিগন্তবিস্তৃত শস্যের শ্যামলিমা। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন: ‘সেখানে চারদিকে পরিস্ফুট ধানের ক্ষেত সবুজ রঙের সমুদ্র। পুরীর সমুদ্রের চেয়ে কম নয়।’ তেতলার ঘরের কাছে আকশের নীল। পূর্বদিক খোলা, আলো আসতে বাধা নেই কোনো। ‘মনে হচ্ছে যেন হিমালয়েরই কাছাকাছি আছি। নির্জনতা আমাকে তুলে রেখেছে উচ্চ আসনে।’ — এই ছিল তাঁর অনুভূতি। কবির কাছে সব চেয়ে বড়ো কথা ছিল, এখানে লোকজন এসে ঘাড়ের উপর পড়বে না। তেতলার ঘরটি থেকে অদূরের জনজীবনের শব্দগন্ধ উপলব্ধি করা যায়, কিন্তু তা গলায় ‘ফাঁস’ লাগায় না। বলেছিলেন: ‘শান্তিনিকেতিন ছেড়ে পালিয়ে এসেছি শ্রীনিকেতনের বাড়িতে। এই জায়গাটাতে শ্রীর চেয়ে শান্তিই বেশি।’ কষ্ট বলতে শুধু তেতলায় ওঠার সিঁড়িটুকু। সামনে একটা টিনের শেড আছে। কিন্তু শরতে তো তেমন রোদের তাপ থাকে না। উপরতলা বলে থাকে না তেমন মশার উৎপাত। মশা খুব বেশি হলে কবি মেখে নিতেন ‘লেমন গ্রাস ওয়েল’। এখানে বসে অনেক রাত পর্যন্ত স্বচ্ছ গভীর অন্ধকারে নক্ষত্রলোকের নীরব সভাকবির মতো কল্পলোকে বিরাজ করতে ভালোবাসতেন তিনি। প্রতিমা দেবীকে কবি জানিয়েছিলেন: ‘স্থির করেছি মাঝে মাঝে আকাশের সঙ্গে মিতালি করবার জন্য শ্রীনিকেতনের প্রাসাদশিখরে আশ্রয় নেব’। পরে অবশ্য কুঠিবাড়িতে গাঁথা হয়েছিল একটা পাকাপোক্ত সিঁড়ি। আসবাব, জলের ব্যবস্থা, বাথরুম তো ছিলই। আর সঙ্গে-সঙ্গে ছিলেন সর্বক্ষণের সহায়ক বনমালী।
শ্রীনিকেতন বাসস্ট্যান্ড থেকে দেখা যায়, সরকারি ডাকঘরের পাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সুরুল কুঠিবাড়ি। পাকা রাস্তার ধারেই। সামনে মাঘ মেলার মাঠ। ভিড়ের মধ্যে থেকেও যেন ভিড়ের মধ্যে নয়। খড়খড়ির জানলা আর হালকা হলুদের শান্ত মাধুর্যে তাকে দেখে মনে হয়, কোন সুদূরের ওপার থেকে সে আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে। আমরা ক-জনই-বা সে-ডাকে সাড়া দিতে পারি!
পূর্ববর্তী সংখ্যা
এখন বাড়িতে বসেই সংগ্রহ করতে পারবেন কবিতা আশ্রমের মুদ্রিত সংখ্যা এবং কবিতা আশ্রম প্রকাশনার বই। নীচের ছবির ওপর ক্লিক করলে পৌঁছে যাবেন আমাদের অনলাইন সপ পেজে। হোয়াটস অ্যাপের মাধ্যমেও অর্ডার করতে পারেন। যোগাযোগ: ৭৩৮৪১৭২৪০৪/ ৯৪৩৪৪৩১৩৬২