সাপ্তাহিক কবিতা আশ্রম, ৯ আশ্বিন ১৪২৮
Painting: Franz Kline
অনঞ্জন
স্মৃতিমেদুর
অপেরা
সুবীর সরকার
প্রীতম সেনগুপ্ত
বেঁচে থাকা
ভাবি হাসপাতালের ঘরটা কেমন করে রাজপথে হাঁটে!
নোনতা রক্তের স্বাদ নিতে নিতে হায়নার দল কখনও
প্রেমিকা হয়ে কামড় বসায়…
শুধু শুদ্ধ শ্বাসবায়ু ঈশ্বরের নামে পরবযাপনে অনন্তগামী। এইটুকু বেঁচে থাকা!
তিতাস বন্দ্যোপাধ্যায়
আয়ুকাল
নীলাদ্রি দেব
বিপ্লব
Painting: Franz Kline
“ঘরের কাছে আরশিনগর”
পর্ব-৯
বিস্মৃতপ্রায় পদকর্তা সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়
রামানুজ মুখোপাধ্যায়
ছোটোবেলায় আনন্দ দাস বাউলের সুরেলা কণ্ঠে শুনেছিলাম একটি গান: ‘মন, তুমি কি চিরজীবি, দিন কি তোমার এমনি যাবে।’ মানুষের দেহ যদি হয় ক্ষণজীবী, তাহলে মন কেমন করে চিরজীবী হবে? এ-গানের ভণিতাটি এইরকম: ‘দ্বিজ সতীশ ভণে, পাপ আগুনে, দগ্ধ হও মন দিবানিশি’। গানটির সহজ সুর আর পুরাণের বেশ কিছু উল্লেখ মনকে মুগ্ধ করেছিল। কে এই ‘সতীশ’? অনেক পরে পুরোনো ‘বীরভূমি’-র পাতায় মিলল তাঁর হদিশ। পদকর্তা সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় (১৮৭০-১৯১৫)। পৈতৃক নিবাস বীরভূমের সুরুল গ্রামে। বাবা রঘুনাথ মুখোপাধ্যায়। মা বরদাসুন্দরী দেবী। এই বরদাসুন্দরী দেবী ছিলেন বীরভূমেরই লাভপুরের নিকটবর্তী চৌহাট্টা গ্রামের দীনবন্ধু মজুমদারের একমাত্র কন্যা। বিশ শতকের প্রথমার্ধেও গ্রামটির নাম ছিল ‘চহটা’। দীনবন্ধু মজুমদার পেশায় পত্তনিদার ছিলেন। পরিবারটি ছিল অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল। বিয়ের পর রঘুনাথ মুখোপাধ্যায় শ্বশুরবাড়িতে বসবাস করতে শুরু করেছিলেন। তাঁদের সুরুলের নিবাসটি তো ছিলই। সতীশচন্দ্র ছিলেন তাঁদের প্রথম সন্তান। ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন মামারবাড়িতে। রঘুনাথ-বরদাসুন্দরীর আরও এক পুত্র তারেশচন্দ্র, এবং দুই কন্যা শরৎবালা ও সুশীলা। সতীশচন্দ্র বোলপুরের বাঁধগড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শ্রেণি (এখনকার হিসেবে নবম শ্রেণি) পর্যন্ত পড়াশনো করেছিলেন। কেউ-কেউ বলেছেন, হুগলি নর্মাল স্কুলেও তিনি পড়াশুনো করেছিলেন, কিন্তু এই তথ্যের ভিত্তি খুব মজবুত নয়। তাঁর ছোটো ভাই তারেশচন্দ্রের কাছে পাওয়া তথ্যে হুগলি স্কুলের কোনো উল্লেখ ছিল না। মুর্শিদাবাদের অভিরামপুরে একটি বাংলা স্কুলে হেড পণ্ডিতের কাজে সতীশচন্দ্র যোগ দিয়েছিলেন। এ-পেশায় তিনি নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেননি। অল্প কিছুকাল পরেই ফিরে এসেছিলেন বীরভূমের চৌহাট্টায়। চৌহাট্টার অদূরে ভালকুটি গ্রামের মহানন্দ চৌধুরির আট বছরের কন্যা গোবিন্দমোহিনীর সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল পনেরো-ষোলো বছরের সতীশচন্দ্রের। কালক্রমে তাঁরা দুই কন্যার জন্ম দিয়েছিলেন। তাঁদের জীবন ছিল অর্থনৈতিকভাবে অস্বচ্ছল।
সংসারে মন ছিল না সতীশচন্দ্রের। ছোটোবেলা থেকেই তাঁর আকর্ষণ ছিল সংগীতে। দিনে-রাতে গান শুনতেন গ্রামীণ আসরগুলিতে। প্রিয় ছিল নীলকণ্ঠ মুখোপাধ্যায়ের পালাগান। কণ্ঠ মশায়ের যাত্রার দলের সঙ্গে গ্রামে-গ্রামে ঘুরে বেড়াতেন সতীশচন্দ্র। কখনও কৃষ্ণযাত্রা শুনতে-শুনতেই তাঁর কেটে যেত মাসাধিক কাল। হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন: ‘তিনি প্রধানতঃ কণ্ঠের অনুসরণে পশ্চিমবঙ্গে প্রচলিত প্রসাদী ও বাউলের সুরে বহু সঙ্গীত রচনা করিয়াছিলেন।’ বাবা-মায়ের উৎসাহে সতীশচন্দ্র গান শিখেছিলেন বর্ধমানের মাখন মুখোপাধ্যায়ের কাছে। তিনি সুকণ্ঠের অধিকারী ছিলেন। গ্রামের চন্দ্রচূড় মন্দিরে, তারাপীঠে, কংকালীতলায়, লাভপুরের ফুল্লরা মায়ের মন্দিরে ঘুরে-ঘুরে বেড়াতেন। স্বরচিত পদ সেই সব স্থানে বসে মনের আনন্দে গাইতেন। মাত্র ছেচল্লিশ বয়সে তাঁর জীবনাবসান হয়েছিল। তাঁর মৃত্যু নিয়েও ভিন্নমত প্রচলিত আছে। কিন্তু সেক্ষেত্রে ভাই তারেশচন্দ্রের দেওয়া গ্রহণ করা যুক্তিযুক্ত মনে হয়: ‘কবি ১৩২২ সালে ১৩ই অগ্রহায়ণ রাত্রি প্রায় দুই প্রহরের সময় শয্যায় উপবেশন করিয়া ইষ্ট নাম জপ করিতে করিতে সজ্ঞানে পরপারে চলিয়া যান।’
জীবিতকালে তাঁর গানগুলি মুদ্রিত হয়নি, সংরক্ষিতও হয়নি সেভাবে। লোকমুখে প্রচলিত ও জনপ্রিয় হয়েছিল। ১৩৩১ বঙ্গাব্দে সুখ্যাত বাগ্মী ভাগবতরত্ন কুলদাপ্রসাদ মল্লিক-সম্পাদিত ‘বীরভূমি’ পত্রিকায় (ষষ্ঠ খণ্ড দ্বাদশ সংখ্যা, ১৯২৫) ‘সতীশচন্দ্রের গান’ শিরোনামে চারখনি গান ছাপা হয়েছিল। সঙ্গে ছিল পদকর্তার সামান্য পরিচিতি। সেখানে জানানো হয়েছিল: ‘বীরভূম অঞ্চলে তাঁহার গান, লোকের মুখে মুখে ও ভিখারী বৈরাগীদিগের দ্বারা বিশেষভাবে সুপ্রচলিত ও সমাদৃত হইয়াছে। . . . সতীশচন্দ্রের গান ভিখারী বৈরাগীর মুখে অনেকগুলি শুনিয়াছি। এই গানে এমন একটা আন্তরিকতা, স্বাভাবিকতা ও স্বচ্ছন্দতা আছে যে ঐগুলি সাধকসঙ্গীতের অন্তর্ভুক্ত হইবার উপযুক্ত।’ এই চারটি গান ছিল বর্ধমান জেলার শ্রীগ্রামের শশধর চট্টোপাধ্যায়ের সংগ্রহে। তার মধ্যে একটি হল বৈষ্ণব পদ ও তিনটি শাক্ত পদাবলি। ‘বীরভূমি’-র পরবর্তী একটি সংখ্যায় মুদ্রিত হয়েছিল আরও চারখানি গান। সংগ্রহ করে পাঠিয়েছিলেন সতীশচন্দ্রের ভাই তারেশচন্দ্র। তারেশচন্দ্রের কাছে পাওয়া তথ্যের উপর ভিত্তি করে ‘সতীশচন্দ্র ও তাঁহার গান’ শিরোনামে একটি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি লিখেছিলেন গৌরীহর মিত্র (১৯০১-৪৭)। অবশ্য তখন গৌরীহর কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজের বিএ ক্লাসের ছাত্র, সবে লিখতে শুরু করেছেন, বীরভূমের সুখ্যাত ইতিহাসকার হয়ে ওঠেননি। সতীশচন্দ্রের সংগীত সাধনা প্রসঙ্গে গৌরীহর লিখেছিলেন: ‘তিনি ন্যূনধিক পাঁচশত গান রচনা করিয়া গিয়াছেন; কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ তাঁহার অনেকগুলি গান এই অল্পকাল মধ্যেই দুষ্প্রাপ্য হইয়াছে। প্রায় তিন শতাধিক গান তাঁহার অনুজ তারেশচন্দ্র কর্তৃক সংগৃহীত হইয়াছে। . . . তাঁহার অপ্রকাশিত গানগুলি প্রকাশিত হইলে, আমরা সতীশচন্দ্রকে আরও ভালরূপে বুঝিতে ও চিনিতে পারিব।’ সতীশচন্দ্র জানিয়েছিলেন: ‘সংখ্যামাত্র তার সাড়ে চারিশত/ হল না ব্যাপৃত তাই কাঁদিছে হিয়া।’ ১৩৩২ বঙ্গাব্দে (সপ্তম বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা, ১৯২৫) ‘বীরভূমি’ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল আরও এগারোখানি গান। সিউড়ির নিকটবর্তী ইকরা গ্রামের সুরেন্দ্রনাথ দাসের সংগ্রহ থেকে গানগুলি পাওয়া গিয়েছিল। এই সুরেন্দ্রনাথ দাস সাঁই সম্প্রদায়ভুক্ত হয়ে স্বরূপ দাস নাম গ্রহণ করেছিলেন। জীবনাবসানের অল্পকালের মধ্যে সতীশচন্দ্রের গান মুখে-মুখে কত মানুষের মধ্যে প্রচারিত হয়েছিল, এই তথ্যগুলি থেকে তার একটা ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এরপরে অবশ্য ‘বীরভূমি’-তে সতীশচন্দ্রের আর কোনো গান মুদ্রিত হয়নি। কথিত আছে, তারেশচন্দ্র-সংগৃহীত সতীশচন্দ্রের তিন শতাধিক গানের পাণ্ডুলিপিটি দেওয়া হয়েছিল লাভপুরের সুখ্যাত ভূস্বামী ও সাহিত্যিক নির্মলশিব বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে, তাঁর কলিয়ারির অফিস থেকে পাণ্ডুলিপিটি হারিয়ে যায়।
১৯৫৩-য় গ্রামের যুবকদের চেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ‘চৌহাট্টা সাধক সতীশ স্মৃতি গ্রামীণ গ্রন্থাগার’। স্বেচ্ছায় জমি দিয়েছিলেন গ্রামের মানুষরাই। প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন গোঁসাইদাস চট্টোপাধ্যায়। এর প্রথম গ্রন্থাগারিক ছিলেন হেমেন্দ্রলাল মজুমদার। ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’-র একটি প্রতিবেদনে অবসরপ্রাপ্ত গ্রন্থাগারিক ও আঞ্চলিক ইতিহাস-চর্চাকারী সুনীল পাল লিখেছেন: ‘স্বাধীনতার পরে ১৯৫৭ সালে একেবারে প্রথম পর্যায়ে বীরভূম জেলার যে কয়েকটি লাইব্রেরি সরকারি স্বীকৃতি পায়, এটি সেগুলির অন্যতম।’ লাইব্রেরিটি এখন হাজার সাতেক বইয়ে সমৃদ্ধ। সেখানে সতীশচন্দ্রের আবক্ষ মূর্তিও স্থাপিত হয়েছে। বীরভূমচর্চায় পরিচিত নাম সিদ্ধেশ্বর মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন, মূর্তিটি স্থানীয় শিল্পী রসসিন্ধু কুণ্ডুর সৃষ্টি। সতীশচন্দ্রের কোনো রেখাচিত্র বা আলোকচিত্র কোথাও রক্ষিত হয়নি। লোকশ্রুতি ও কল্পনার মিশ্রণে গড়া হয়েছিল কবির এই আবক্ষ মূর্তিটি। সেখানেও ‘মন, তুমি কি চিরজীবি’ পদটি উদ্ধৃত হয়ে আছে। ১৯৫৯-য় চৌহাট্টায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল সতীশ স্মৃতি সম্মেলন। উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, সাহিত্যরত্ন হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়, কমলাকান্ত পাঠক, রামশম্ভু গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখ বিশিষ্টজন। ১৯৬২-তে সতীশ সাংস্কৃতিক পরিষদের উদ্যোগে কলকাতার মডার্ন বুক এজেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড থেকে প্রকাশিত হয়েছিল ‘বীরভূমের হারানো মাণিক সতীশচন্দ্রের পদ-সংগ্রহ’। এ-বইয়ে ছিল একশো বাষট্টিটি পদ। সম্পাদনা করেছিলেন কমলাকান্ত পাঠক। ভূমিকা লিখেছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। এই উদ্যোগের নেপথ্যে সতীশ সাংস্কৃতিক পরিষদের সম্পাদক সিরাজুল হক ও সভাপতি সুভাষচন্দ্র পাঠকের অবদানও ছিল স্মরণযোগ্য। বইটি এখন দুর্লভ। আছে চৌহাট্টা সাধক সতীশ স্মৃতি গ্রামীণ গ্রন্থাগারে, এবং দু-একজন সুধী পাঠকের ব্যক্তিগত সংগ্রহে। যথার্থই লিখেছেন গবেষক বাদল সাহা: ‘আমাদের অবহেলা আর অসাবধানতায় এটি প্রায় দুষ্প্রাপ্য। আবার কিছু কিছু পদ “প্রচলিত” নামে বা কোন কোন বাউলের নিজস্ব ভণিতায় শোনা যায়। এই অজ্ঞতা, এই ছলনা আমাদের কাছে চরম লজ্জার।’
কমলাকান্ত পাঠক (১৯০১-৭৯) জন্মেছিলেন লাভপুরের কাছে মোনাচিতুরা গ্রামে। লিখেছিলেন গল্প এবং কবিতা। ‘শনিবারের চিঠি’, ‘মাসিক বসুমতী’, ‘এডুকেশন গেজেট’ প্রভৃতি সুপরিচিত পত্রপত্রিকায় তাঁর লেখা প্রকাশিত হত। যতদিনে তিনি সতীশচন্দ্রের পদ সংগ্রহে সচেষ্ট হয়েছিলেন, ততদিনে সে-সব পদ অনেকখানিই হারিয়ে গিয়েছিল। সম্পাদক কমলাকান্ত সতীশচন্দ্রের পদগুলিকে ছয়টি পর্বে বিন্যস্ত করেছিলেন: শ্যামা, শ্যাম, শ্যাম-শ্যামা, প্রেম, নির্বেদ ও শরণাগতি। প্রেমের গানও তিনি লিখেছিলেন। এতদিন সতীশচন্দ্রের যে-সাধক মূর্তি আমরা পাঠকমনে এঁকেছি, এই পদটি সেখানে কৌতূহল সৃষ্টি করে: ‘চোখে চোখে সখী, হয়ে দেখাদেখি, মাখামাখি হয়ে গেছে মন,/ সাধাসাধি করে ফিরাতে না পেরে সঁপিয়াছি তারে প্রাণমন।’ তাঁর প্রেমের পদগুলি নিয়ে আমাদের আগ্রহ রইল, ভবিষ্যতে হয়তো এ-বিষয়ে আরও কিছু কথা বলা যাবে। সাধারণভাবে বলা যেতে পারে, সতীশচন্দ্র মূলত বৈষ্ণব পদাবলি শাক্ত পদাবলি ও ভক্তিগীতি লিখেছিলেন। বৈষ্ণব-শাক্তের কোনো বিরোধ তাঁর পদে নেই। কত সহজে তিনি লিখেছিলেন: ‘মনোচোরার মোহন চূড়া পাই না কেন হেরিবারে।/ হয়েছ হরি দিগম্বরী কেন হে পীতাম্বর ছেড়ে।।’ পুরোনো ‘বীরভূমি’-র পাতা থেকে এবার বেহাগ-ঝাঁপতালে বাঁধা সতীশচন্দ্রের সেই প্রার্থিত পদটি আপনাদের জন্যে রাখি:
মন, তুমি কি চিরজীবি, দিন কি তোমার এমনি যাবে।
দেহ পিঞ্জর করে ভঙ্গ, প্রাণ-বিহঙ্গ পলাইবে।
দশাননের দশা স্মরণ, ভেবে দেখ মন ত্রেতাকালে,
দেবেন্দ্র যার গাঁথিতেন হার, যম বাঁধা যার অশ্বশালে,
ব্রহ্মা যারে ছিলেন সদয়, অভয়া মা দিতেন অভয়,
করেছিল ত্রিলোক বিজয়, মরেছিল সবান্ধবে।
ভীমার্জ্জুন দুর্য্যোধন, শতপঞ্চ ভ্রাতা যার,
কোথা রৈল অভিমন্যু, মাতুল শ্রীগোবিন্দ যার,
কোথা বা সে রাজা কংস, কোথা বা সে যদুবংশ,
রবে না মন কোন অংশ, কালে ধ্বংস সবান্ধবে।
মাতা পিতা ভগ্নী ভ্রাতা, পুত্র মিত্র পরিবার,
সুখের দিনে সুখের ভাগী, সে দুর্দ্দিনে কেবা কার,
পড়বে যেদিন ঘোর বিপদে, ঘুরবে সেদিন ঘুর্ণীপাকে,
সেদিন তুমি বা কে, কেবা তোমার, কেবা কারে তরাইবে।
করলি না মন শেষের চিন্তা, বিষয় চিন্তা অবিরত,
মিছে, ধনের জন্য দেশ বিদেশে, ভ্রমিয়ে কাল হলো গত,
করিলি না মন সাধু সঙ্গ, কৃপাময়ের নাম প্রসঙ্গ,
সুখের স্বপ্ন হবে ভঙ্গ, চতুরঙ্গ পড়ে রবে।
দ্বিজ সতীশ ভণে, পাপ আগুনে, দগ্ধ হও মন দিবানিশি,
এমন হরিসাধন রত্নাকরে, ডুবলি না মন রইলি ভাসি,
পড়বে যেদিন কুশাসনে, কান্দবে জনের কুশাসনে,
সেদিন দীনবন্ধু বিনে, এ দীনের ভার আর কে লবে।
সতীশচন্দ্রের পদগুলি চিরজীবী হয়নি। রামপ্রসাদ সেন ও নীলকণ্ঠ মুখোপাধ্যায়ের প্রভাবকে আত্মস্থ করে নিজস্ব কোনো ধারা তৈরি করে নিতে না-পারাই হয়তো তার একটা বড়ো কারণ। চৌহাট্টায় সতীশচন্দ্রের বংশের আর কেউ এখন অবশিষ্ট নেই এখন। গ্রামের যে-চন্দ্রচূড় মন্দিরপ্রাঙ্গনে বসে পদ রচনা করতেন সতীশচন্দ্র, প্রভূত রূপ বদল হয়েছে তারও। আমাদের অতীত এত রোমাঞ্চে ভরা, ভাবলে বিস্ময় লাগে!
[১. ‘বীরভূমি’-র পুরোনো সংখ্যাগুলি, ২. হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের ‘বীরভূম-বিবরণ’ (তৃতীয় খণ্ড), ৩. সুনীল পালের ‘লাভপুর ও কীর্ণাহার: বিষয়ের বৃত্তে’ এবং ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯-এ ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’-র বীরভূম জেলার পাতায় প্রকাশিত প্রতিবেদন, ৪. বাদল সাহার ‘সংস্কৃতি ও সাহিত্য: প্রসঙ্গ বীরভূম’, ৫. গৌরগোপাল পালের ‘লাভপুর ও কীর্ণাহারের কথা’। ৬. সিদ্ধেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের ‘বীরভূম-দর্পণ’ (তৃতীয় পর্ব)। ছবি এবং বিশেষ কৃতজ্ঞতা: শ্রদ্ধেয় সুনীল পাল। উদ্ধৃতির বানান অপরিবর্তিত আছে।]