সাপ্তাহিক কবিতা আশ্রম, ১৩ কার্ত্তিক ১৪২৮
Painting: Pablo Picasso
নির্মল হালদার
পড়ার জন্য নয় মুছে ফেলার জন্য
—আপনার ফোন নাম্বারটা দেবেন?
—নদী পাহাড় জঙ্গল।
ঝর ঝর করে হেসে ফেলে মেঘবতী।
সে আবার বলে, দিন না ফোন নাম্বারটা।
আমি বলি, ওই তো আমার নাম্বার।
নদী পাহাড় জঙ্গল। তার আগে মাটি শব্দটা লাগিয়ে নিও। তাহলে অবশ্যই আমাকে পাবে।
মেঘবতী বলে—আমার সঙ্গে মজা করছেন? আপনি তো ফেসবুক করেন না। কথা কিভাবে বলব?
—কথা বলার তো দরকার নেই।
—আমার যে মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায়। তখন মনে হয়, কারোর সঙ্গে কথা বলি। ইচ্ছে তো হতেই পারে, আপনার সঙ্গে কথা বলতে।
—হ্যাঁ ইচ্ছে তো হতেই পারে।
তোমার ইচ্ছেকে সম্মান জানিয়ে বলছি—তুমি দেখো নদী পাহাড় জঙ্গল নাম্বারটা লাগিয়ে, আমাকে পাবেই।
—না পাব না। কখনওই পাব না।
নদী পাহাড় জঙ্গল কি নাম্বার হতে পারে?
আমি বললাম, হ্যাঁ গো নতুন শুরু হয়েছে। আমি প্রথম এই নাম্বারটা পেয়েছি।
মেঘবতী হাসতে হাসতে আমার নাকটা ধরে নাড়িয়ে দেয়।
আমি খানিক রোমাঞ্চিত হয়ে তাকে বলি, সম্পর্ক করতে হয় কিন্তু সম্পর্ক নিয়ে নাড়াচাড়া করতে নেই। তুমি যেখানে আছো দিব্যি আছো। আর বেশি দূর এগিয়ো না।
—নিকট ও দূরের কি আছে, শুধু কথা বলব। যদি মনে হয়, শক্তি চট্টোপাধ্যায় পড়তে আপনাকে পড়ে শোনাব। অথবা গীতবিতান থেকে একটা গান শোনাতে পারি। আমার গলায় সুর নেই। আমি গীতবিতানের গান কবিতাই মনে করি।
—আর আমার যদি শুনতে ইচ্ছে না করে? তখন? ফোনের শব্দে আমার যদি ঘুম না ভাঙে? তুমি তো রাগ করবে। তাই বলছি, কোনও ফোনাফুনি নয়। এই যে দেখা হল আমাদের, এই সাক্ষাৎটাই অক্ষয় হয়ে থাকুক।
এবার মেঘবতী ছদ্ম রাগ নিয়ে বলে—
আপনি আচ্ছা মানুষ তো! একটা মেয়ে আপনার কাছে বারবার ফোন নাম্বার চাইছে, আপনি দিতে চাইছেন না।
—দিলাম তো।
—নদী পাহাড় জঙ্গল নাম্বার হতে পারে না।
—১ থেকে ১০০ নাম্বার হতে পারে না।
—কী হতে পারে?
—শুধু ভালবাসা।
—নিঃসঙ্গতা নাম্বার হতে পারে না?
—পারে বৈকি।
—তবে আমার সব নাম্বার নিঃসঙ্গতা।
আমার মনে হয় মেঘবতীর নিসঙ্গতার কাছে কেউ নেই। কেবল মেঘবতীর কবিতা ও গান। মেঘবতীর আবেগ। মেঘবতীর অনুভব। উত্তেজনা।
কবিতা ও গান সব সময় নিঃসঙ্গ।
নিঃসঙ্গতার সঙ্গে নিঃসঙ্গতা।
মেঘবতী একা।
আমি একা নই।
নদী পাহাড় জঙ্গল ক্লিক করলেই
সহজেই পেয়ে যাই আমার জগৎ।
সীমাহীন প্রেমের আস্তানা।
মেঘবতীকে বললাম—মোবাইলটা ফেলে দাও। জলে।
দেখবে,
আলো হাওয়ার সমুদ্রে তুমি সাঁতরে বেড়াচ্ছো।
এসো—তোমার ললাটে চুম্বন আঁকি। এসো।
আমার কথা শেষ হতেই, মেঘবতী আমাকে জড়িয়ে ধরে।
একটা মহুল গাছ চেয়ে থাকে। নীরবে।
সুজন পণ্ডা
ছুঁয়ে ছুঁয়ে থাকো
ছুঁয়ে ছুঁয়ে থাকো,
নিবিড় ভাবে ছুঁয়ে ছুঁয়ে থাকো।
যেভাবে অপরাহ্ণ স্পর্শ করেছে
স্বচ্ছতোয়া নদীটির বুক।
রাত নেমে আসুক
আঁধার
আর হিম জড়িয়ে রাতচরা পাখিদের ডাক।
নেমে আসুক
সবাই সবাইকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে…
চুপ করে থাকো
নিস্তব্ধ নির্বাক চুপ চুপ করে থাকো।
যেভাবে অপরাহ্ণ নিশ্চুপে ঘুমায়
স্বচ্ছতোয়া নদীটির কোলে।
মৌরি ফুল অথবা জোনাকি,
প্রজাপতির পাখার মতো
শব্দহীন থাকো।
নিস্তব্ধ নির্বাক হাত আর বুক ছুঁয়ে ছুঁয়ে থাকো।
প্রীতম সেনগুপ্ত
মিলেজুলে
পাতালে ছড়িয়ে আছে চিতার ক্ষিপ্রতা
মর্ত্যে উঠে ভাবি খাদ্যের অভাব—
মেধা পাটেকরের সঙ্গে নর্মদার সখ্যতা
যাই হোক এসবের নেই কোনও জবাব।
হয়তো আমার কোলে দোল খায় যারা
ভবিতব্য মেনে খোঁজে মায়ের আঁচল,
গুঁড়িয়ে দিয়ে সব আমার হল সারা
কবিতার গন্ধে সেনা ট্রেঞ্চে নিশ্চল।
সুধাংশুরঞ্জন সাহা
কঠিন দিনকাল
শান্ত দিঘি, নদীর ধারে কেটেছে কত দিন!
তোমার কথা, আমার কথা ভাবেনি ঠিক কেউ।
তোমার পথে, আমার পথে নেই কোথাও সাঁকো।
পেরতে হবে আগুন নদী, জোচ্চোর ও ঠগ।
শহর বলো, গ্রাম বলো, ফুটছে রাগে কঠিন দিনকাল।
এগিয়ে এসে তোমার হাত আমার হাতে রাখো।
এবার ঠিক চুপকথার উড়ান শুরু হবে…
মানস চক্রবর্ত্তী
অন্য শ্রাবণ
সমস্ত মেঘলাদিন স্বরলিপি
হে মন খারাপ
হে নিশ্বাস
আজ সবকিছু মালকোষে রেখো।
ব্যানারে শুধু বিজ্ঞাপন
যেখানে অন্য মন, সেখানেই শ্রাবণ
জোয়ার, নক্ষত্রের নাকছাবি
রাতের আয়তন…
বিপ্লব ঘোষ
আসল নকল
একটি কবিতা লিখব বলে গেলাম নদী পাহাড় জঙ্গলে
ওরা যে নিজেরা কবিতা বুঝতে আমার জীবন গেল চলে ।
একটি গান গাইব বলে গেলাম ঝর্ণার কাছে
হেসে বলল, এমন কথা শুনলেই কানে বাজে ।
একটি ছবি আঁকব বলে গেলাম আকাশ মাঝে
কোথায় রামধনু রং, তবে কেমন করে সাজে !
একটি কবিতা লিখব বলে গেলাম ফুল বনে
দেখতে আমার বেলাই গেল ফুল ফোটে কেমনে !
ফিরে এলাম ঘরে শেষে বিফল জলে
যা লিখেছে আজও যারা শুধু নকলে ।
Painting: Pablo Picasso
“পথের ফসল”
অমৃতাভ দে
পর্ব-২
ঘুরে আসি নদিয়া জেলার বড়গাছি গ্রাম… এই গ্রামটির কথা অন্নদামঙ্গলে আছে। আমার বড়ো হয়ে ওঠা বড়ো আন্দুলিয়াতে। এই গ্রামটির উল্লেখও অন্নদামঙ্গল কাব্যে আছে।
‘ভবানন্দের জন্মবৃত্তান্ত’ অংশে ভারতচন্দ্র লিখেছেন—
“ধন্য ধন্য পরগণা বাগুয়ান নাম।
গাঙ্গিনীর পূর্ব্বকূলে আন্দুলিয়া গ্রাম।।
তাহার পশ্চিম পারে বড়গাছি গ্রাম।
যাহে অন্নদার দাস হরিহোড় নাম।।”
হরিহোড়ের রাজবাড়ী ছিল এখানে। এখন সেখানে শুধুই মাটির ঢিপি। কালেরগর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে ইতিহাস। পাশেই এই মন্দির।
দেখে নিলাম আখড়াবাড়ি। বড়গাছি গ্রামের এই জায়গা নিত্যানন্দ প্রভুর পদধূলিতে ধন্য। এখানে এসেছিলেন নিত্যানন্দ। নিত্যানন্দ প্রভুর বিবাহ হয়েছিল শালিগ্রামে। এইখান থেকেই তিনি গিয়েছিলেন শালিগ্রাম। বিহারীকৃষ্ণ দাস ছিলেন রাজা হরিহোড়ের পুত্র। বিবাহ যাত্রাকালে নিত্যানন্দ নবদ্বীপ থেকে শালিগ্রাম যাবার সময় তাঁর শিষ্য এই কৃষ্ণ দাসের বাটীতে ওঠেন। এখানেই নিত্যানন্দের অধিবাস কার্যাদি সম্পন্ন হয় এবং এখান থেকেই তিনি শালিগ্রামে বিবাহ যাত্রা করেন। নিত্যানন্দ মহাপ্রভু এখানে বহু লীলা করেন। এটি একটি উল্লেখযোগ্য নিত্যানন্দ লীলাক্ষেত্র। অসামান্য একটি পরিবেশ। নিত্য ভোগের আয়োজন হয়। নিত্যানন্দ মহাপ্রভুর শিষ্য ক্ষ্যাপা বাবা ও ক্ষেপিমা এই মূর্তি স্থাপন করেন জানা গেল। তাদের সমাধিও মন্দিরে স্থাপন করা আছে।
চলুন পার হই অন্নদামঙ্গলে উল্লিখিত ঈশ্বরী পাটুনীর সেই ঘাট… (নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগর করিমপুর রাজ্য সড়কের উপর হাঁটরা বলে একটি জায়গা আছে, সেই জায়গাটি একটু ছাড়িয়ে গিয়ে বাঁ হাতে হাঁটরা ঘাট বলে স্টপেজ আছে, এর অন্য নাম তেঘড়ি ঘাট, অর্থাৎ ঘাটের ওপারে তেঘড়ি গ্রাম)। তেঘড়ি গ্রামে আছে ঈশ্বরী পাটুনীর ভিটে। এখনো এই ঘাটের দায়িত্ব ঈশ্বরী পাটুনীর বংশধরদের।
‘অন্নদার ভবানন্দভবনে যাত্রা’ অংশে ভারতচন্দ্র লিখছেন—
“অন্নপূর্ণা উত্তরিলা গাঙ্গিনীর তীরে।
পার করো বলিয়া ডাকিলা পাটুনীরে।।
সেই ঘাটে খেয়া দেয় ঈশ্বরী পাটুনী
ত্বরায় আনিল নৌকা বামাস্বর শুনি।।”
এই ঘাট পার হওয়ার সময় রোমাঞ্চিত হচ্ছিলাম। শীতকালে নদীর উপর দিয়ে বাঁশের সাঁকো… বর্ষাকালে নৌকো করে পার হতে হয়… তেঘড়ি গ্রাম পেরিয়ে বড়গাছি।
অন্নদামঙ্গল কাব্যে উল্লিখিত নদিয়া বড়গাছি গ্রামের পাশেই মোটা বলে একটি গ্রাম আছে… এই গ্রামেই আছে মাথাভাঙ্গা বিল… ২১ বছর পর দেখা হল স্কুলের বন্ধু দেবাশীষের সঙ্গে… আমি আসব শুনে ও ছিল, খুব আনন্দ পেয়েছিল… কতদিন পর দেখা… অনেকটা সময় কাটালাম একসঙ্গে… ওর বাড়ির পাশেই এই বিল..
এভাবেই ফেলে-আসা জনপদে আজও ইতিহাস মাটিতে, শিকড়ে লগ্ন থাকে। গাছে গাছে পাতায় পাতায় বাতাসে বাতাসে গল্পেরা ঘুরে ঘুরে বেড়ায়। ঈশ্বরী পাটুনীর বংশধরেরা আজও খেয়া পারাপার করে। গ্রামের মানুষেরা আজও ভাবেন অন্নপূর্ণা তাদের সঙ্গে আছেন। নদীর দু’ধার সবুজ ফসলে ভরে ওঠে।ঘাটের উপরের বটগাছ তলায় শিবলিঙ্গে জল ঢালেন রমণীরা। প্রাচীন মানুষেরা তরুণ কবিকে দেখে জিজ্ঞাসা করে কত না কথা। জমে ওঠে গল্প। সূর্য ডুবে যায়। মনে হয় এই বুঝি দেবী অন্নপূর্ণা কুলবধূ হয়ে ঘাটে এসে দাঁড়াবেন…