সাপ্তাহিক কবিতা আশ্রম, ১৬ আশ্বিন ১৪২৮
Painting: Mark Rothko
সমর সুর
হাওয়া
বিদিশা সরকার
বকুলের আত্মজীবনী
মৌসুমী ভৌমিক
বাম্পার অফারে
ডেসিবল ভেঙে শব্দের আসার কোনও আগাম
খবর নেই
চাঁদের আলোরও ঘুঙুর বাজিয়ে
দ্বিগুণ হয়ে আসার নিয়ম নেই
সেসব ভেবেই বাম্পার অফারে
চাঁদের জমি কিনেছি
কিনেছি পঞ্জিকার চৌত্রিশটা পাতা
চাঁদলোক থেকে আলোচ্ছ্বাস ধরে এনে
পাতায় পাতায় বিছিয়ে রেখে
দেখে নেব সুখে থাকার হার্টবিট
ঠিক কতটা বাড়ল!
আগাম রাশিফল রক্তের কোণায় কোণায়
কাঁটা বিঁধিয়ে দিলে
ধ্যাত্তেরি, ফুঁ দিয়ে পঞ্জিকা বুলিয়ে
দেব হিমোগ্লোবিনে
বাগানের সব ফুলগাছগুলোও
শৃঙ্খলিত হয়ে সাথ দেবে বলেই তো
সমীকরণ মেলাতে এসেছি
আলোরেণু যে অর্ধমৃতকে সঞ্জীবনী সুধা দিতে পারে
গৌতম কুলসী
গাছজন্ম
মানুষ নিয়ম করে ঘুম থেকে ওঠে, কাজে যায়,
ফিরে এসে আবার ঘুমিয়ে পড়ে।
আমি নীল আকাশের দিকে চেয়ে বসে থাকি সারাক্ষণ-
মন খারাপ আরও বাড়লে চুপিচুপি গাছেদের কাছে যাই
কথা শুনি গল্প করি ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখি শিরা উপশিরা;
মাঝে মাঝে মনে হয় গাছ হয়ে জন্মালেই ভাল হত
শেকড় বাকড় ছড়িয়ে দিতাম মাটির অনেক গভীরে
আনন্দ যজ্ঞে শরীরে ফুটত ফুল, যোগাতাম অক্সিজেন…
একই রকম বাঁচতে বাঁচতে গাছেদের কি
মনখারাপ হয় না কখনও?
কোনও এক মরা সন্ধ্যায় তাদেরও কি
যেতে ইচ্ছে করে না সোমালিদির বাড়ি?
মানুষ নিয়ম করে ঘুম থেকে ওঠে, কাজে যায়,
ফিরে এসে আবার ঘুমিয়ে পড়ে।
কোনও গাছকে আত্মহত্যা করতে শুনিনি,
অভিযোগ করতে শুনিনি
ক্ষীণ সম্ভাবনা নিয়ে গাছেদের শুধু বাঁচতে দেখেছি
স্মার্ট ফোন না পেয়ে সিলিঙে ঝুলে পড়ে একরত্তি মেয়ে!
চাকরি না পেয়ে বাড়ি ফেরে না যুবক;
প্রেমিকা না পেয়ে তলিয়ে যায় কিশোর!
গাছেদেরও প্রাণ আছে তাদেরও ভালবাসতে ইচ্ছে করে
কোনও এক মরা সন্ধ্যায় তাদেরও
যেতে ইচ্ছে করে সোমালিদির বাড়ি।
কৌশিক চক্রবর্ত্তী
লতাগাছ
Painting: Mark Rothko
“ঘরের কাছে আরশিনগর”
পর্ব-১০
বীরভূমের পথে-পথে তাঁর পায়ের চিহ্ন আঁকা: সাহিত্যরত্ন হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়
রামানুজ মুখোপাধ্যায়
বীরভূমের কুড়মিঠা গ্রামের এক যুবক হাতে সামান্য পয়সা জোগাড় হলেই চলে যেতেন সিউড়ি। ঝড়-বাদলকে উপেক্ষা করে। পায়ে হেঁটে। ষোলো মাইল পথ। সেখানে গিয়ে শিবরতন মিত্রের রতন লাইব্রেরিতে বই পড়তেন। ছোট্টো মাটির ঘরে ছিল দুর্লভ সব পুথিপত্র আর সাড়ে তিনশো বইয়ের সম্ভার। থাকতেন চেনাপরিচিত এক উকিলবাবুর বাড়িতে। খেতেন তুলসী বৈষ্ণবীর হোটেলে। চার আনায় ভিতরঘরের মেঝেতে পিঁড়ি পেতে বসে ডাল-ভাত-তরকারি। সঙ্গে একটুকরো মাছও। আর তিন আনা দিলে বাইরের পরচালায় বসে খেতে হত। সব দিন চার আনা জুটত না। রাতে আধ সের রসগোল্লা। চা খাওয়ার অভ্যেস ছিল না। সারা দিনে এক প্যাকেট সিগারেট। পয়সা ফুরোলেই ফিরে আসতেন গ্রামে। বিশ শতকের গোড়ায় ‘কুড়মিঠা ছিল পাণ্ডব বর্জিত গ্রাম’। সপ্তাহান্তে ঘরদোরের নিত্যপ্রয়োজনে তাঁকে দুবরাজপুর যেতেই হত। স্মৃতিকথায় তিনি লিখেছেন: ‘দুবরাজপুরেই আমাদের পুলিশ থানা ছিল, সাবরেজিস্ট্রি অফিস, আর মুন্সেফি আদালত ছিল। দুবরাজপুরে কাপড়ের দোকান, নুন তেল মরিচ মসলার দোকান; তরিতরকারির বাজার ছিল। সপ্তাহে সোম ও শুক্রবার দুইদিন হাট বসিত, পূজাপার্বণে ক্রিয়াকর্মে দুবরাজপুর গেলেই ঘি ময়দা তেল মসলা কাপড় চোপড় ও তরিতরকারি কিনিতে মিলিত।’ বার্ষিক ছ-টাকা গ্রাহক চাঁদা দেওয়ার সাধ্য তাঁর ছিল না। তাই কুড়ি কিলোমিটার পথ হেঁটে দুবরাজপুরে গিয়ে প্রায় পড়ে আসতেন ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকার সংখ্যাগুলি। এইভাবেই যাত্রা শুরু হয়েছিল তাঁর। তিনি হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় (১৮৯০-১৯৭৭), বিশ শতকের বাংলার সারস্বত সাধনার, বিশেষত বৈষ্ণব সাহিত্যের খ্যাতকীর্তি পণ্ডিত।
প্রথাগত পড়াশুনো প্রাথমিকের গণ্ডী অতিক্রম করেনি। ছাত্রবৃত্তি পর্যন্ত। তাও পরীক্ষা দেওয়া হয়নি। হরেকৃষ্ণ জানিয়েছেন: ‘বিদ্যাশিক্ষার সুযোগ পাই নাই। গ্রাম্য পাঠশালে সামান্য কিছুদূর, — সেকালের মধ্যবাঙলা পর্যন্ত শিক্ষালাভ করিয়াছিলাম।’ পৌরহিত্যে তাঁর মাতামহ রামতনু ভট্টাচার্যের সুখ্যাতি ছিল। এ-পেশায় সুনাম ছিল তাঁর দাদা পঞ্চানন মুখোপাধ্যায়েরও। দাদার অকাল মৃত্যুর পর সে-পেশাতেও হরেকৃষ্ণ থাকতে পারেননি। পনেরো-ষোলো বছর বয়স থেকেই কবিতা লিখতেন। তাঁর প্রথম মুদ্রিত লেখাটিও একটি কবিতাই। পরে প্রকাশিত করেছিল ‘কমণ্ডলু’ (১৯১৮) নামে তিন ফর্মার একটি কবিতার বই। শেষজীবনে তিনি পেয়েছিলেন বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্মানিক ডি-লিট। একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি-র পরীক্ষক ছিলেন। সুকুমার সেন তাঁর আত্মকথায় লিখেছিলেন: ‘এ বিষয়ে হরেকৃষ্ণবাবু রবীন্দ্রনাথের জোড়া।’ ১৯২০-র গোড়ায় হেতমপুর কৃষ্ণচন্দ্র কলেজপ্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়কে ‘সাহিত্যরত্ন’ উপাধি দিয়েছিলেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। বলেছিলেন: ‘এই তো মূর্তিমান প্রেরণা’। একটিমাত্র ছাত্রপাঠ্য বই তিনি লিখেছিলেন —‘পদাবলী-পরিচয়’। সে-বইয়ের ভূমিকায় সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন: ‘যুবাবস্থায় কলেজে অধ্যয়নকালে যখন প্রথম পদাবলী সাহিত্যের অধ্যয়ন করি, তখন এইরূপ একখানি পথনির্দেশগ্রন্থ পাইলে কত না খুশী হইতাম।’
দুঃখ তো তাঁর কম ছিল না। তিন বছর বয়সে বাবাকে, আর আট বছর বয়সে মাকে হারিয়েছিলেন। পায়ে-পায়ে বিঁধত গ্রাম্য মানুষের বিদ্রুপ। অনটন। মুরুব্বিদের প্রতাপমত্ত হিংসা। কী না ছিল! ভাগ্যিস ছিলেন হেতমপুরের রাজকুমার মহিমানিরঞ্জন চক্রবর্তী। শুধু পৃষ্ঠপোষণা নয়, তিনি জানিয়েছিলেন: ‘এই যুবকের নির্জ্জন অনাড়ম্বর সাধনায় আমি অত্যন্ত আনন্দ লাভ করিয়াছি।‘ তাঁরই সূত্রে কলকাতার স্বনামধন্য বিদ্বানদের সান্নিধ্য পেয়েছিলেন হরেকৃষ্ণ। ‘বীরভূম-বিবরণ’ দ্বিতীয় খণ্ড প্রথমবার এক হাজার কপি ছাপা হয়েছিল। দশ কপিও বিক্রি হয়নি। ‘কবি জয়দেব ও শ্রীগীতগোবিন্দ’ বইটির তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশের জন্যে বীরভূমের শিক্ষিত মানুষদের কাছে, জয়দেব-কেঁদুলির মহান্তদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে ব্যর্থ হয়েছিলেন। বিক্রি করে দিতে হয়েছিল ব্যক্তিগত সংগ্রহের অমূল্য সব বইপত্র। গিয়েছিল কৃষ্ণচন্দ্র কলেজে। আজ পর্যন্ত কেউ কি জানেন কী গতি হল সেই সব বইপত্রের? বীরভূমের জনশ্রুতি তাঁকে ‘মামলাবাজ’ বানিয়েছে, বলেছে ‘দুর্বাসা’। আর তিনি জীবনকে দেখেছেন একগণ্ডূষ জলে প্রতিবিম্বিত হতে। ‘গণ্ডূষ জলমাত্রেণ শফরী ফরফরায়তে’ — শ্লোকটি হরেকৃষ্ণ প্রায়শই উচ্চারণ করতেন। তাঁর কাছে জীবন ছিল ওইটুকুই, তার বেশি নয়। তালুবন্দি একটুখানি জলে পুটি মাছের মতো, বেঁচে থাকার প্রাণচঞ্চল বাসনায় শুচিস্নিগ্ধ।
কী তাঁর অবদান? পায়ে হেঁটে, গোরুর গাড়িতে জেলার পথেপ্রান্তরে ঘুরে লিখেছিলেন তিন খণ্ডে ‘বীরভূম-বিবরণ’। চতুর্থ খণ্ডটি সমাপ্ত করতে পারেননি। ১৯৭৩-এ সুখ্যাত গবেষক অমিয়কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছিলেন: ‘আজ থেকে পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে, গ্রামীণ যানবাহন বলতে যখন গরুর গাড়ি ছাড়া আর কিছুই ছিল না, তখন এই জ্ঞানতপস্বী হয় গোযানে নয় এক মজুরের বাঁক থেকে ঝোলানো দুই ঝুড়িতে তাঁর জিনিসপত্র চাপিয়ে পায়ে হেঁটে বীরভূম ও সংলগ্ন জেলাগুলির দূরদূরান্তরে ঘুরে বেড়িয়েছেন অনাহারে অনিদ্রায়। শারীরিক ক্লেশ তুচ্ছ করে, সরেজমিনে (লাইব্রেরী থেকে নয়) দেশকে জানবার প্রেরণা যাঁদের কাছ থেকে পেয়েছি তাঁদের মধ্যে তাঁর স্থান শীর্ষে।’ দুঃখের কথা, জীবিতকালে এতখানি উদার স্বীকৃতি বীরভূমের কোনো উত্তরসাধক কি হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়কে দিতে পেরেছিলেন? পাইকোড় গ্রামের পুকুরঘাটে পা ধুতে গিয়ে দেখতে পেয়েছিলেন একাদশ শতকে খোদিত চেদিরাজ মল্লের শিলালিপি। এই আবিষ্কারের ঐতিহাসিক কৃতিত্বকে স্বাগত জানিয়েছিলেন রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। বৈষ্ণব পদাবলি সম্পাদনায় তাঁর কৃতিত্ব অবিসংবাদিত। জয়দেব, চণ্ডীদাস, জ্ঞানদাসের পদাবলি সম্পাদনা। তাঁর একক প্রচেষ্টায় সংকলিত ‘জ্ঞানদাসের পদাবলী’ বইটিতে ক্ষমতাবলে যুগ্মসম্পাদক হিসেবে নিজের নামটি ছাপিয়েছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের একসময়ের বিভাগীয় প্রধান, বীরভূমের মানুষ অধ্যাপক শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। হরেকৃষ্ণ সেখানেই থামেননি। নিরলস সাধনায় প্রস্তুত করেছিলেন ‘বৈষ্ণব পদাবলী’ নামে পূর্ণাঙ্গ একটি পদসংকলন। কীর্তন গানের চর্চায় তিনি ছিলেন তুলনারহিত। একসঙ্গে ‘চণ্ডীদাস-পদাবলী’ সম্পাদনার অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁকে বলেছিলেন ‘কীর্ত্তনরস-মূর্তি’। সুনীতিকুমার লিখেছিলেন: ‘… গৌড়ীয় বা বাঙ্গালা বৈষ্ণব পদ-সাহিত্যের একজন একপত্রী পণ্ডিত, গবেষক ও ব্যাখ্যাতা হইতেছেন পণ্ডিত শ্রীযুক্ত হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় সাহিত্যরত্ন।’ আর আমরা সেই হতভাগ্য বীরভূমবাসী, আজও জেনেছি, তিনি ‘বীরভূম-বিবরণ’-প্রণেতামাত্র। আমরা ক-জনই-বা সে-বই পড়ে দেখি। ভাগ্যিস দশ বছর আগে পুনর্মুদ্রণ করেছিল সিউড়ির ‘প্রকাশভূমি’! তার আগে পর্যন্ত এ-বই ছিল বীরভূমের কতিপয় শিক্ষিতজনের কুক্ষিগত যখের ধন! আজও মহিমানিরঞ্জনের পরিবর্তে সরাসরি হরেকৃষ্ণর নাম এ-বইয়ের লেখক হিসেবে উল্লেখ করতে গিয়েও আমাদের হাত কেঁপে যায়। তাঁর প্রতি আমাদের অবহেলার অন্ত নেই। সেই কারণেই হয়তো আজও লেখা হল না তাঁর প্রামাণ্য কোনো জীবনী!