Painting: Jiro Yoshihara

রবীন বসু

বাংলা কবিতার আঁচল ওড়ে

চড়ুই তার ডানায় বাঁধে একটুকরো রোদ

নিঃসঙ্গ বিকেল মনখারাপ করে খুব;

শুকনো পাতা মাড়িয়ে, ভাঙা বাড়ির ধ্বংসস্তূপ

ডিঙিয়ে কারা চলে যায় বাংলা কবিতার দিকে!

ফরফর ওড়ে বর্ণমালা ফড়িংডানা

অদ্ভুত আগ্রহ নিয়ে নতুন কবি

কবিতা পড়ে শোনায় তার সঙ্গিনীকে;

জ্বলে ওঠে আলো অপরূপ

হাজার বছর পার হয়ে হেঁটে আসে বনলতা সেন

নীড় খুঁজে পায় ক্লান্ত চড়ুই পাখি

বাংলা কবিতার আঁচল ওড়ে ‘অদ্ভুত আঁধার’ মুখে করে!

সুবীর সরকার

কার্তিক মাসের পৃথিবী

কার্তিক মাসের পৃথিবী। উঠে পড়ছি সংযোগসেতুর

উপর।

 নদীর পাড়ে তাঁতকল।

 ভাঁজ করা গামছাকে ইদানিং বেশ লম্বা

মনে হয়

 ঘুমের বিপরীতে জাগরণ।

 বালিশে হিম জমে। হাওয়া সাঁতরে পাখিরা

আসে।

সুরজিৎ পোদ্দার

ঐশ্বরিক সার্চলাইট

প্রতিটি শব্দের মাঝে তুমি সময় নাও, আমি অন্যমনস্ক হয়ে পড়ি। চঞ্চলমতি। শব্দগুলো বারবার টেনে আনে এই অন্ধকারে। 

 

সারা সন্ধে বৃষ্টির পর পথে পথে পড়ে আছে পাতা, ফুল, নর্দমার নোংরা। রাস্তার লাইট জ্বলেনি আজ। ভেজা গন্ধ আর নদীর চলার শব্দ। একটা সিগারেটের জন্য উদভ্রান্ত হয়ে চলেছে একজন। দূরে আবছায়ায় রেললাইনের পাশে, দুটো ছায়া ক্রমশ জড়িয়ে ধরেছে। কোনও শব্দ নেই। কোথাও কোনও শব্দ নেই। শব্দ না থাকলে একরাশ ভয়… তবু একটা সিগারেট এই মুহূর্তে, ঠিক এই মুহূর্তে দরকার। 

 

অতঃপর তুমি আবার তোমার সুবিধা মতো একটা শব্দ বেছে নিলে… চঞ্চলমতি অন্ধকারে…

 

তোমার কথার ভিতর বারবার ব্রিজের উপর এসে অপেক্ষা করে একটা পুলিশ ভ্যান। সার্চলাইট এসে পড়ে আমার মুখে, চোখ বন্ধ হয়ে আসে যেন ঐশ্বরিক আলোয়, নতজানু হয়ে আমি দেশের কথা ভাবি। সেই দেশ যেখান থেকে আমার দাদু পালিয়ে এসেছিল, ফিরে যেতে চেয়েছিল, সেই দেশ যাকে আমার বাবা গালাগালি দেয় সারাদিন, সেই দেশ যেখানে আমি যাইনি কোনওদিন। 

 

তুমি অস্থির হয়ে ওঠো, আমি স্থিরতার মন্ত্র জানি না। তোমার সমস্ত বেছে নেওয়া শব্দ চাঁদের মতো, তাদের পিছন দেখা যায় না। তবু সুন্দর। তবুও তো সুন্দর। আমার আম্মা সারাদিন পান খেত। কোনও কথা বলতে শুনিনি কোনওদিন। তবু সুন্দর। তবুও তো সুন্দর।

 

অতঃপর তুমি বলে ওঠো আবার। আম্মার পান খাওয়া লাল মুখের ভিতর থেকে আমি তোমার শব্দগুলো দেখতে পাই। মাঝে মাঝে পিক ফেলো অন্ধকারে। মাঝে মাঝে ভাবলেশহীন দেখো আমার চোখের ভিতর। মাঝে মাঝে আমি দেখতে পাই শুধু বেঁচে থাকবে বলে তুমি অন্ধকারে জঙ্গলের মধ্যে জঙ্গলের ভিতর জঙ্গলে লুকিয়ে পড়েছ।

 

একটা সার্চলাইট অনন্ত সময় ধরে খুঁজে চলেছে তোমায়। যেন ঐশ্বরিক এক শক্তি। তবু তাকে পঙ্গু করে দিয়ে আমার আম্মা, ব্যাঙ্কের কাগজে টিপছাপ দিতে জানা আম্মা, আলুর বাকল ভেজে অমৃত বানাতে জানত যে আম্মা, দিনের পর দিন ফ্যান খেয়ে কাটিয়েছে যে আম্মা, সে সমস্ত কাঁটাতারকে অস্বীকার করে চলেছে অন্য এক দেশে তবু কথা বলেনি কোনওদিন শুধু চোখের ভিতর ক্লান্ত চোখে তাকিয়েছে, ঠিক যেন এক ঐশ্বরিক সার্চলাইট।

 

বন্যা লোহার

ছাদ

ক্রান্তদর্শী ডানার মতাদর্শ হতে বিচ্যুত

দেবতার রুগ্ন প্রাঙ্গণ, 

পাখিদের সমাবেশ ভেঙে

আঁচার, বড়ি এবং জামাকাপড় শুকানোর

কৌশল শিখেছে যত্ন করে।

 

তাকে নাম দিয়েছি ছাদ 

 

অতঃপর, বায়ুবাহিত অশৌচ পালন করে 

আকাশের মুখাপেক্ষী হয়ে বাঁচুক।

মন্থরমন্ত্র

গমনে সক্ষম পা আদতে শকটগোত্রীয় 

সারাদিন ধুলো মেখে 

সে শুধু চলাচল বোঝে।

 

অহরহ যাতায়াতে কাহিল হয় পথ 

 

তুমি নিরাকার বরাভয়ে এসো

দ্রুতগামী জীবনের পাশে 

রেখে যাও বিশ্রামরত শামুকের শুশ্রূষা ।

 

Painting: Jiro Yoshihara

বারো পর্বের ধারবাহিক

“পথের ফসল”

অমৃতাভ দে

পর্ব-৩

নদীর পাড়ে মায়ার কোলে যাবে

স্নেহের পরশ নিবিড় করে পাবে

মাটির পথে খেজুর গাছের সারি 

বলবে তোমায়, ‘আপন হতে পারি’

 

আমার শহর মায়ার কোলেই থাকে 

সন্ধ্যাসকাল পরস্পরেই ডাকে

ওপার শীতের সুর এনে দেয় যেই

এপার তখন কুয়াশা মাখবেই।

 

নৌকো চলে দিব্যি ঢেউয়ের সাথে

চুপকথারা জেগেই থাকে রাতে

মায়ায়-ভরা শীতল মেঘের ঢেউ

এপার জুড়ে দেয় ছড়িয়ে কেউ।

 

মনখারাপের দুপুরগুলো স্মৃতির পাতায় রেখে/একলা কবি হারিয়ে যাওয়ার গল্প শুধু লেখে… শহর  ছাড়িয়ে দ্বিজেন্দ্র সেতু, তার উপর দাঁড়িয়ে জলাঙ্গী নদীকে দেখা… সেই নদীকে ভালবেসে তার উপরে ফুল ছড়িয়ে দিয়েছে কৃষ্ণচূড়া… ব্রিজ পেরিয়ে কাঁচা রাস্তা ধরে জলাঙ্গীকে আদর করে মায়ার কোলে পৌঁছে যাওয়া…মায়াকোল একটি গ্রামের নাম…নদীর তীরে দাঁড়িয়ে বুক ভরে নিঃশ্বাস নেওয়া… ‘ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া দেখে আসা’ দুটি গাছের ভালবাসা… খেজুর গাছকে ভালবেসে জড়িয়ে ধরেছে বটবৃক্ষ… প্রেমের সাক্ষী থেকেছে জলাঙ্গী নদী… পাল্টে যায় ঋতু… বদলে যায় জলাঙ্গী তীরের গ্রাম… শীত আসে গ্রামে… শিশিরে ভিজে যায় মাটি… খেজুর গাছ কবিতার মতোই শব্দ ছড়িয়ে রাখে মায়ার কোলে… কখনো কখনো রাস্তা নেমে যায় সবুজ মাঠের ভিতরে…ধুলোয় মিশে থাকে জীবনের গান…

 

এই মায়াকোলের রাজকুমার ঘোষের তৈরি খেজুরের গুড় প্রকৃত গুড়ের স্বাদ এনে দেয়…কোনও এক রবিবারে সাইকেল ভ্রমণে গিয়েছিলাম নদিয়া জেলার মায়াকোল… কৃষ্ণনগর শহরে জলাঙ্গী নদীর ওপারে মায়াময় মায়াকোলের পথের দুপাশে অনেক খেজুর গাছ… রাস্তা থেকে কিছুটা নেমে বেশ কিছু জায়গায় জ্বাল দেওয়া হয় খেজুরের রস… তৈরি হয় খেজুরের গুড়… সকালের শীতল বাতাস গায়ে নিয়ে চলে গিয়েছিলাম তাদের কাছে… রাজকুমার ঘোষ স্পেশাল গুড় তৈরি করছিলেন কৃষ্ণনগরের তাঁর পরিচিত এক মানুষের জন্য, কথাপ্রসঙ্গে উঠে এল ‘পিওর’ খেজুরের গুড়ের কথা… চিনি -মেশানো খেজুরের গুড় ছাড়া খেজুরের গুড় পাওয়া এখন বেশ শক্ত… কিন্তু রাজকুমারদা বললেন চাইলে সত্যিকারের খেজুরের গুড় তিনি তৈরি করে দিতে পারেন। স্বাভাবিকভাবেই আমাদের লোভ হল, আমাদের মানে আমাদের সাইকেল ভ্রমণের অন্যতম সাথী বাঁকা কাকা। কিছু আগেই আমরা আরেকজন খেজুরের গুড় বিক্রেতার কাছ থেকে খেজুরের রস খেয়েছি। রাজকুমারদের খেজুরের রস জ্বাল দেওয়া প্রায় সম্পূর্ণ তখন, তাই তাঁর কাছে দাঁড়িয়ে পড়া। সত্যিকারের পিওর গুড় চেয়ে খেলাম বেশ কিছুটা…অপূর্ব স্বাদ অপূর্ব গন্ধ। বললাম পরেরদিন আসছি কিন্তু স্পেশাল গুড় নিতে। বাঁকা কাকা বললেন আমি চলে আসব। বাঁকা কাকা গিয়েছিলেন তার কাছে এবং আমাকে পৌঁছে দিয়েছিলেন রাজকুমারদের হাতে তৈরি সত্যিকারের খেজুরের গুড়। স্বস্তিকার বড়মার তৈরি সরাপিঠেও চলে এল তার পরের দিন। অপূর্ব পিঠে আর অপূর্ব খেজুরের গুড় মনে করিয়ে দিল ছোটবেলার ‘পিওর’ খেজুরের গুড়ের কথা… ছোটোবেলায় গ্রামের বাড়িতে খেজুরের গুড় বিক্রি করতে আসত এক চাচা। বাড়ির ছোটোরা দৌড়ে যেতাম বাটি-চামচ হাতে। কয়েক ফোঁটা পেতেই কী আনন্দ! মনে পড়়ে গেল— 

 

শীতের বাতাস টোকা দেয় দরজায়

শিশির ডাকছে উঠে পড়ো ছেলেবেলা।

খেজুরের ভাঁড়ে টুপটুপ ঝরে রস

বাড়ির উঠোনে মেঘ-রোদ্দুর খেলা।

 

শীত-রোদ্দুর গায়ে মেখে নিয়ে ছুট—

টিনের বাক্সে নকসিকাঁথাটি রাখা।

জড়িয়ে নিলাম হিমেল হাওয়ার গানে

রঙিন ফুলের পরাগ রেণুতে মাখা।

 

সবকিছু এখনও শেষ হয়ে যায়নি… মায়াকোল গ্রাম থেকে কৃষ্ণনগর শহরে নদী পার হয়ে চলে আসেন কত না মানুষ। খেয়া-পারাপার চলে জলাঙ্গী নদীতে। বিনিসুতোর মালায় গাঁথা  এপার-ওপার। স্রোত ভেঙে ভেঙে নৌকো ভাসে। ভাসমান নৌকায় জমে ওঠে গল্প। কার গুড়  কত ভাল, কত দামে বিকোয় তা—জানতে বড়ো ইচ্ছে করে। খেজুর রসের ভাঁড় নিয়ে ওপার থেকে এপারে চলে আসে অনেকেই। কুয়াশার আস্তরণ একটু একটু করে সরে যায়, জেগে ওঠে পাড়ার দোকানবাজার। খেজুর রস পৌঁছে যায় গৃহস্থের ঘরে ঘরে, খেজুরের গুড় পৌঁছে যায় এপারের দোকানে দোকানে। শীত-কুয়াশার সকালে নদীপারের মায়াকোল পথের ফসল তুলে দেয় আমায়। নদীতীরের বটবৃক্ষ ঈশ্বর হয়ে ওঠে… নিকানো উঠোন, তুলসীতলা, শিশিরভেজা সবজির ক্ষেত প্রিয় কবির এক-একটা পঙক্তির মতোই… বিসর্জন ঘাটে নৌকো এসে লাগে… আমার শহরের ঘুম ভাঙে…

 

পূর্ববর্তী সংখ্যা