সাপ্তাহিক কবিতা আশ্রম, ২৭ কার্ত্তিক ১৪২৮
PAINTINGS: CAMILLE PISSARRO
নির্মল হালদার
পাহাড়তলীর মাঠ
বাঁশের জন্ম কোথায়? বাঁশির জন্ম?
কে দেখেছে জন্ম?
জন্ম চিহ্নে সুরের আসা-যাওয়া
ব্যথা বেদনার মতো সুরের আসা-যাওয়া।
২
শালুক ফুলে ভ্রমর এসেছে।
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে অশথ গাছ।
অশথ গাছেও ফল এসেছে।
ফলের স্বাদ হৃদয়ের মতো।
পাখিরা ঠুকরে গেলে ছিটকে পড়ে রক্ত।
৩
আকাশ থেকে দুধ দোয়ার শব্দ আসছে।
কে হে গোয়ালা?
মুখ দেখতে পাই না। কত দূরের মানুষ তুমি?
কাছে আসবে কবে?
কে হে গোয়ালা?
মুঠিও ভরে উঠছে দুধে দুধে
দুধের আলোয়।রুমা তপাদার
বাংলা ভাষার কাছে
জীবন সহজ ভেবে একসময় বিষ্ময়ে
লিখেছি কত কান্নাকাটি!
নিচু স্বরে লিখেছি তাকানো,
জড়িয়ে মড়িয়ে যাওয়া অনায়াসে
ঘনদেশ থেকে জল টেনে নিয়ে
বায়ু দিয়ে লিখেছি অক্ষর
এখন দূরত্বে আছি লেখা নেই, আসেই না
নিজেকে গুটিয়ে দেখি
একাকিত্ব ঘিরেছে চারপাশে
বাকি যারা ছিল কেউ নেই চলে গেছে…
বাংলা ভাষার কাছে, হাঁটু মুড়ে বসে
আজ সংশয়ে শুধিয়ে দেখি,
তার অভিধানে শূন্যতা শব্দের অর্থ কী লেখা রয়েছে?দুর্গা দত্ত
পালকের ধুলো
কচি কচি কেঁদু পাতায়
যেমন করে যখন তখন
ছলকে ওঠে আলো
শিরশিরিয়ে হালকা রোঁয়া
যেমন করে পাতার ভেতর
মুখ লুকোতে চায়
দূরের থেকে বনের পুকুর
যেমন করে আড়াল স্বরে
মাঝ দুপুরে ডাকে
ধুলোয় ধুলোয় বিকেল সিঁদুর
যেমন করে ফুলম তেলে
একা একাই জল সইতে যায়
আমার সব সকাল সন্ধে
রাত বিরেতের মেঘ আর
ঘাসে বিছানো কথা
তেমনি করে জড়িয়ে গেছে
তোমার পায়ে পায়ে…
কেউ জানে না, আমিই শুধু জানি
তোমার পায়ে উথলে ওঠে
পথ-হারানো বকুলতলার গান
তোমার চোখে নাগরদোলা-র ভয়
তোমার গায়ে বনতোষিণী লতা…
অনঞ্জন
তমসাহৃদি
তুমি মন্ত্র বলামাত্রই সূর্যকে অস্ত যেতে হয়,
নিশিগন্ধা ফোটে,
তুমি মন্ত্র বলামাত্রই মনের মধ্যে
ফুটে ওঠে দিগভ্রান্ত রং,
আমার মিথ্যেগুলোকেও নিপাট সত্যি করে দেয়,
তমসা আমার।
তোমার সব ফুল সুগন্ধি, মাতালের মতো
আঁধারে চুঁইয়ে চুঁইয়ে
ডুবে যাই তোমার আঁচে, সে উষ্ণতায় যাই ভিজে,
হে অন্ধবৎ গর্ব,
তোমার বিন্দু বিন্দু রাত ব্যাপ্ত করে
গোটা আকাশ, আমার আকাশ।
গভীর রাত, গন্ধরাজ আর মনস্তত্বের
খুনসুটির গল্প খুঁড়ে খুঁড়ে
পুলকিত যাতনা যত, আমায় মুক্তি দাও
এই ঠগ আলো থেকে,
আমি পুরোপুরি তোমার, হে তমসা,
বন্ধু আমার, প্রতিধ্বনি কর।
মঞ্জরী গোস্বামী
রফা
নিজের লেখার কাছে আসি
বেশ্যাপাড়ার সেই ফ্যাকাশে মেয়েটা
চোখ নয় হাত নেড়ে খদ্দের ডাকে
রফা হয় নেউলের চোখে
ছুঁড়ে দেওয়া নোটের ভিতর
সংসার পাতে
অন্ধ পরিখা, বেহালার তালকানা ছড়
যারা তাকে খেতে আসে
চিবিয়ে খায় না
জল দিয়ে গেলে আর
রেডিও ছেড়ে রেখে চলে যায় ঝোপের আড়ালে
PAINTINGS: CAMILLE PISSARRO
“পথের ফসল”
অমৃতাভ দে
পর্ব-৪
দশমীর বিকেল। জলঙ্গী নদীর দুই তীরে তখন হাজার হাজার মানুষের ভীড়। আজ যে দুগ্গা পুজোর ভাসান। দুই পারের বেশ কয়েকটি গ্রামের পুজোমণ্ডপ থেকে মা দুর্গা তার সন্তান লক্ষ্মী-সরস্বতী-কার্তিক-গণেশকে নিয়ে হাজির ঘাটের ধারে। নৌকা করে ঘুরবে তারা। সঙ্গে আরও শ’খানেক নৌকা ভাসে জলে। পরিবার-পরিজন নিয়ে নৌকোয় উঠবে অনেকেই। নদীর দু’ধারে দাঁড়িয়ে থাকবে অসংখ্য দর্শক। মাইকে বিজয়ার গান। নদীর পার থেকে প্রায়ই শোনা যাবে কবিতার পংক্তি-“ছন্দের নদী বলে গেল কানে কানে/ আমরা সবাই মেলবন্ধনে বাঁচি/ ঢাকের বাদ্যি কাশফুলেদের সাথে/ দিব্যি রয়েছে হৃদয়ের কাছাকাছি।” সূর্যের সোনালি আভা চারপাশকে করে তোলে মায়াময়। পাঁপড় ভাজা, বাদাম ভাজা, জিলিপি, নাগরদোলা, রঙিন বেলুন, খেলনাপুতুলের মেলবন্ধনে বন্যাপাড়ার মাঠ তখন উৎসবের মেজাজে। এই পাড়া আসলে ‘স্মৃতির শেতলপাটি’। রাতের অন্ধকারে জেলেনৌকার আলোগুলো জ্বলে থাকত। জেলেরা জাল বিছিয়ে রাখত মাঠে-সেলাই করত নিপুণ হাতে। এই পাড়াতেই স্নানযাত্রার মেলা বসত। বাঁকে করে জল এনে শ্রী কৃষ্ণের মাথায় ঢেলে পুণ্যার্জন করে কত মানুষ। বাঁশ বাগানের তলা দিয়ে যাবার সময় গা-ছমছম করতো। হরিনাম সংকীর্তনের সুর মন ভরিয়ে তুলত। বর্ষায় নদীর জল নদীর পাড় উপচে বারোয়ারিকে স্পর্শ করত। বন্যার জল ভাসিয়ে দিত চারপাশ, তাই নাম বন্য পাড়া (‘বন্যা’ থেকেই ‘বন্য’ শব্দটি করে নিয়েছে গ্রামের মানুষ)। কোনও কিছুই পাল্টে যায়নি। আজও বারোয়ারিতলা কত মানুষের মিলনক্ষেত্র। প্যারিস থেকে ফেরা রাজেশ দা তার সদ্য বিবাহিত বৌকে নিয়ে ঘাটের ধারে দাঁড়িয়ে ভাবছে এইসব কথা। ভাবছে ঝুলনের সময় মুসলিম বন্ধুরা একসঙ্গে নদীর পাড়ে ছুটে যেত। নিয়ে আসত পাহাড় তৈরির ঘাসমাটি। সেজে উঠত ঝুলন।
আজও কাশফুলে হিমেল বাতাস দোলা দিয়ে যায়। ঢাকের তালে মাতে ছেলে-বুড়ো সকলে। ভট্টাচাজ্জি পরিবারের সঙ্গে আলাপচারিতায় দে পরিবার। চক্রবর্তী পরিবারের নতুন বৌ নৌকায় বসেই আলাপ করে নেয় মৈত্রবাড়ির নতুন জামাইয়ের সঙ্গে। ছোট্ট কথাও তাঁর বাবার গ্রামের বাড়িতে হাজির। সবাইকে নিয়ে সে উঠেছে নৌকায়। দে বাড়ির নৌকা প্রতিবারই খুব বড় হয়। গ্রামের জনপ্রিয় ডাক্তারবাবু অবনীবাবুই অনেকদিন আগে সপরিবার নৌকায় ওঠার এই ব্যাপারটি চালু করেন। তিনিও আজ নেই। একসময় পাশ্ববর্তী প্রায় দশ-বারোটি গ্রামের মানুষ তাঁর চিকিৎসার উপরে নির্ভর করে থাকত। তাঁর পুত্র আজ ডাক্তার। বাবার মতোই তিনিও আপদে বিপদে মানুষের পাশে। কয়েকটি গ্রামের মানুষ তাঁর সহৃদয় চিকিৎসার উপর নির্ভরশীল একান্তভাবে। খুড়তুতো, জেঠতুতো, পিসতুতো দাদা-বৌদিদের সাথে দিদি-জামাইবাবু, তাদের ছেলেমেয়েরা মিলিত হয় দশমীর এই দিনটাতেই। কানাডায় বসে মেজদির ছেলে লাইভ ভিডিও দেখে এসবের। অথবা হায়দ্রাবাদ থেকে রাঙাদির ছেলে লেখে-‘খুব মিস করছি মামা’। অন্যদিকে শহরে-থাকা বড় ছেলে নারকেল নাড়ু, নিমকি করতে বসে গেছে গ্রামের বাড়ির দালানে। নৌকো থেকে নেমেই সবাই আসবে প্রণাম করতে। ফেলে-আসা এই গ্রামে আজও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে অদ্ভুত মিল। পসরা সাজিয়ে বসে ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষজন। দশমীর বিকেলের এই দৃশ্য সেই ছোটবেলা থেকেই সবাইকে বেঁধে বেঁধে থাকতে শিখিয়েছে। বিধবা মুসলিম লক্ষ্মী পিসি দীর্ঘদিন ধরেই দে পরিবারের সদস্য। তাঁর কোলেপিঠে মানুষ হয়েছে অনেকেই। আজ এই উৎসবের মুহূর্তে সেও সামিল। নবমীর সকালে বাসস্ট্যান্ড থেকে ইয়া সেখের টুকটুকিতেই বাড়ি পর্যন্ত আসা। ছোটবেলার বন্ধু বদরউদ্দিন শহরের বন্ধু এসেছে শুনেই ছুটে এসেছে বাড়ির পাশের পুজোমণ্ডপে। আব্বাস চাচা আজ আর নেই। তাঁর হাতেই তৈরি হত সবার জন্য একই ছিটকাপড়ের জামা। আজও করম মণ্ডল তৈরি করে জামা। দলিল সেখের দোকান থেকেই পুজোর আগে নতুন ফ্রিজ কেনে দে পরিবারের সেজো ছেলে। ইত্তার মণ্ডল ছুটে আসে হিন্দু পরিবারগুলোর যেকোনও প্রয়োজনে। ওর ছেলে বাপ্পা বিদেশে কাজ করতে চলে গেলেও পুজোর শুভেচ্ছা জানাতে ভোলে না ক্লাসমেট নভোনীলকে । ঈদের দিন যেমন নেমতন্ন পায় দে-পরিবার তেমনি বিজয়ার শুভেচ্ছা বিনিময় করতে ভোলেন না জয়নাল আবেদিন, হজরত আলীর মতো কবিরা। গ্রামের সেই মাস্টারমশাইও আজ বেঁচে নেই। তিনি সকলকে হৃদয়ের কাছাকাছি থাকার প্রেরণা জুগিয়েছেন সবসময়। দোলের দিন আবীর মেখে বের হতেন রাধাকৃষ্ণের বিগ্রহের সঙ্গে। তাঁকে দেখে মনে হত মেলবন্ধনের কাণ্ডারী। গ্রামের মোড়লেরা পরামর্শ নিত তাঁর। বন্যার সময় সব সম্প্রদায়ের মানুষ মিলিতভাবে বাঁধ মেরামতির কাজে নেমেছে। গ্রামের মেধাবী ছাত্র আজ সাহিত্যের অধ্যাপক। ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যে উল্লিখিত নিজের গ্রামের নাম ক্লাসের ছাত্রদের বলতে পেরে তিনি যেমন আবেগ-বিহ্বল হয়ে পড়েন, তেমনি কবি বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়ের স্মৃতিধন্য এই গ্রামের সম্প্রীতির কথা ছাত্রছাত্রীদের সামনে উপস্থাপন করে তিনি গর্ব অনুভব করেন। সুর-তাল-ছন্দের মেলবন্ধনে যেভাবে সৃষ্টি হয় সংগীতের, রং-তুলি-মন আর ক্যানভাসের মেলবন্ধনে যেভাবে জন্ম নেয় জীবন্ত সব ছবি, কলম-কালি-মন আর শব্দের মেলবন্ধনে যেমন নির্মিত হয় কবিতার ঘর, সেভাবেই ভালোবাসা-বন্ধুতা-শ্রদ্ধা-সহানুভূতির মেলবন্ধনে গড়ে ওঠে কত সুন্দর সম্পর্ক। আজ চারদিকে যখন ভাঙনের সুর তখন এই গ্রাম যেন সম্প্রীতির প্রতিমূর্তি। নদীর দু’ধারের চিত্রকল্প যেন বলে-‘লোভ-লালসা-কামনা-বাসনা ত্যাগ করো…তবেই তো বাড়ির কাছের আরশিনগরের পড়শি মনের মানুষের সঙ্গে মিলতে পারা সম্ভব।’ ধীরে ধীরে সন্ধ্যা মানে ঘাটে। বিসর্জনের বাজনা বাজে। নদীর শরীরে তখন আলোর ফোয়ারা। ছোটোদের হাতের রংমশাল, ফুলঝুরি নতুন গল্প লেখে জলঙ্গির বুকে—মেলবন্ধনের গল্প।